আলেমবান্ধব ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর মৃত্যুতে স্বজন হারানোর ব্যথা



মুফতি এনায়েতুল্লাহ, বিভাগীয় প্রধান, ইসলাম
প্রয়াত ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আবদুল্লাহ

প্রয়াত ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আবদুল্লাহ

  • Font increase
  • Font Decrease

৭ জানুয়ারি ২০১৯। বঙ্গভবনে বিকাল ৩টা ৪০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চতুর্থবারের মতো শপথ নেন শেখ হাসিনা। নিয়মানুযায়ী প্রথমে প্রধানমন্ত্রী এবং পর্যায়ক্রমে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা শপথ নেন। ওই দিন টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে প্রতিমন্ত্রীর শপথ নেন আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক আলহাজ্ব শেখ মো. আবদুল্লাহ। পরে তাকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষে ১২ জানুয়ারি, শুক্রবার উপমহাদেশের অন্যতম আধ্যাত্মিক নেতা, ধর্মীয় চিন্তাবিদ ও সমাজ সংস্কারক মোজাহেদে আজম আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরি (সদর সাহেব) রহমাতুল্লাহি আলাইহির কবর জিয়ারত করতে যান শেখ মো. আবদুল্লাহ।

কবর জিয়ারত শেষে শেখ আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমি গওহরডাঙ্গা মাদরাসার ছাত্র। হজরত সদর সাহেব হুজুরের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিলো। তিনি ছিলেন আমার ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গুরু। আমি আমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আলেম-উলামাদের দোয়া নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কাজ শুরু করতে চাই। তাই এখানে এসেছি।’

মন্ত্রী
আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরি রহ.-এর কবর জিয়ারত করছে শেখ মো. আবদুল্লাহ

ধর্ম প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাকে যে গুরু দায়িত্ব দিয়েছেন, তা আমি দেশের আলেম-উলামা, পীর-মাশায়েখদের সঙ্গে পরামর্শ করে সম্পাদন করবো। আমি দেশের ঐতিহ্যবাহী এই মাদরাসার ছাত্র ছিলাম এবং দীর্ঘদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছি। আমি সবার সহযোগিতা নিয়ে মন্ত্রণালয় পরিচালনা করবো।’

আলহাজ্ব শেখ মো. আবদুল্লাহ আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার রাজনৈতিক নেতা। আর আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরি (রহ.) হলেন আমার ধর্মীয় নেতা।’

আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরি (রহ.)-এর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দেওয়া কথা তিনি আমৃত্যু রেখেছেন। তার মন্ত্রীত্বকালীন সময়ে ২০১৯ সালে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে সুন্দর ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় হজ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। তার প্রচেষ্টায় বিগত বছর হজের উড়োজাহাজ ভাড়া ১০ হাজার টাকা কমানো হয় এবং হজের কোটা বাড়ে ১০ হাজার। সৌদি আরবের বিমানবন্দরে বাংলাদেশি হজযাত্রীদের অপেক্ষার সময় ও কষ্ট কমিয়ে আনার লক্ষ্যে সৌদি আরবের পরিবর্তে বাংলাদেশেই প্রি-এরাইভাল ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করার ব্যবস্থা হয়।

সরকারের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আনা এবং সরকার যাতে ইসলামের পক্ষে বেশি বেশি কাজ করতে পারে সে লক্ষ্যে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আবদুল্লাহ কওমি, আলিয়াসহ সকল ঘরানার আলেম-উলামাদের সঙ্গে সুসর্ম্পক গড়ে তোলেন। ২০১৯ সালের হজে সারাদেশের শীর্ষস্থানীয় ৫৮ আলেমকে নিয়ে তিনি হজপালন করেন।

করোনাকালে মসজিদে জামাত ও তারাবি চালু, টঙ্গির বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে বিবদমান দু’টি গ্রুপের সমঝোতা, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দুর্নীতি বন্ধের কার্যকর পদক্ষেপ, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ, বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত আলেম-উলামা এবং ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন তিনি।

করোনা পরিস্থিতিতে দেশের আলেমদের প্রতি তার ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে। তিনি দেশবাসীকে আলেম-উলামাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। দেশের মসজিদ ও কওমি মাদরাসাগুলোর জন্য প্রধানমন্ত্রীকে বলে প্রথমবারের মতো সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা করেছেন। কওমি শিক্ষার্থীদের নানা সঙ্কটে তিনি তাদের পাশে ছিলেন। মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কওমি শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার সুযোগদানের জন্য তার প্রচেষ্টা ছিলো চোখে পড়ার মতো। শেখ মো. আবদুল্লাহ আলেমদের আস্থাভাজন ও পছন্দনীয় ব্যক্তি ছিলেন। ধর্মীয় বিভিন্ন ইস্যুগুলোকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন।

২০১৯ সালের হজে মক্কায় বসে লেখকের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি বলেছিলেন, ‘প্রতিবছর দেশ থেকে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ হজ করতে আসেন, তাদের বেশিরভাগই প্রবীণ। ধর্মপ্রাণ মানুষ চাকরি থেকে অবসরের পর কিংবা প্রৌড়ত্বে এসে সারা জীবনের সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করে পবিত্র হজব্রত পালন করতে আসেন। দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে প্রতিবছর হজে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনা মিলিয়ে প্রতিবছর সোয়া লাখের বেশি বাংলাদেশি হজে আসেন। ফলে বিমান ভাড়াসহ হজযাত্রীদের যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাপনা সুচারুভাবে সম্পন্ন করা সরকারের বিশেষ দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এটা আমি নিশ্চিত করতে চাই। আমি কোনো হাজির চোখে পানি দেখতে চাই না।’

রাজনৈতিক জীবনে তিনি সরাসরি বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য পেয়েছেন। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্বাচনী এলাকার সংসদীয় প্রতিনিধি হিসেবে সততা, নিষ্ঠা ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।

শেখ মো. আবদুল্লাহ দীর্ঘ দিন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বোর্ড অব গভর্নরসের গভর্নর হিসেবে দায়িত্বশীল ভূমিকা রেখেছেন। কওমি সনদের স্বীকৃতিতে শেখ আবদুল্লাহর ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উলামা মহাসমাবেশে প্রথমবারের মতো মসজিদে হারাম এবং মসজিদে নববীর ইমাম-খতিবদের বাংলাদেশ সফরের ব্যবস্থাপনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।

আসন্ন হজ বিষয়ে শুক্রবার (১২ জুন) বিকেলে তার সঙ্গে মোবাইলে আলাপ হয়। আলাপচারিতার ফাঁকে জানালেন- ভালো আছেন। চওড়া হাসি দিয়ে বললেন, আর যেসব রোগ শরীরে আছে, এগুলো তো আর যাবে না। না, রোগ সারেনি। কিন্তু তিনিই চলে গেলেন।

শেখ আবদুল্লাহ মতো স্বচ্ছ মানুষ রাজনীতি ও সরকারে কম আছেন। অসাধারণ বিনয়ী মানুষ ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুর সংবাদ একেবারেই অপ্রত্যাশিত। তিনি আলেমবান্ধব ছিলেন। মন্ত্রীর দায়িত্বপালনকালে অল্প সময়ের মধ্যে ধর্মীয় অঙ্গনে বেশকিছু ইতিবাচক কাজ করেছেন। শেখ আবদুল্লাহর মতো মিশুক, উচ্ছ্বল, সরল মনের মন্ত্রী আমি দেখেনি। অসাধারণ ভদ্রতাবোধ ছিল তার মধ্যে, মানুষকে সম্মান দেখানোর অসাধারণ গুণ ছিল তার। কিছুটা উচ্চস্বরে কথা বলতেন, কিন্ত তাতে গ্রামীণ সরলতা ও আন্তরিকতা থাকত। মানুষকে কাছে টানার শক্তি ছিল। যেকোনো বিষয়ে জানা থাকলে সঠিক তথ্য দিতেন। কথায় কোনো মারপ্যাচ থাকত না। মিথ্যা কোনো আশ্বাস দিয়ে মানুষকে ঘুরাতেন না। মন্ত্রী হয়ে অনেক কিছু হয়ে গেছি, এমন মনোভাব অন্তত তার মাঝে আমি দেখিনি। পেশাগত কাজের সূত্রে তার সঙ্গে পরিচয়। তখন তিনি আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক। ফোনে কিংবা সাক্ষাতে কথা বলতেন মন খুলে। তার মতো একজন ভালো মানুষ এভাবে আকস্মিক চলে গেলেন।

তাঁর মৃত্যুর খবরে স্বজন হারানোর ব‌্যাথা অনুভব করছি। দোয়া করি আল্লাহতায়ালা তাকে বেহেশত নসিব করুন। আমিন।