পাখির ডাকে ঘুম ভাঙে কাঞ্চন দিঘির পাড়ের মানুষের



সুমন আলী, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, নওগাঁ
ছবি: বার্তা ২৪.কম

ছবি: বার্তা ২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

‘সব পাখি ঘরে আসে-সব নদী-ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন‘ জীবনানন্দ দাশের কবিতার এ চরণটুকু বলে দেয় জীবনের সঙ্গে পাখি আর প্রাণপ্রকৃতি কতটা নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। যেখানে পাখি আছে, সেখানে প্রকৃতিতে একটা প্রাণ আছে। পাখি ও প্রকৃতির এক অপরূপ মেলবন্ধন এখন নওগাঁর পত্নীতলার প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী জলাশয় কাঞ্চন দিঘি। সাড়ে ১৪ একর আয়তন এ দিঘির। শীতের আগমনে দিঘিতে ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে অতিথি পাখির দল। এই দিঘি যেন এখন দেশি-বিদেশি পাখির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ভোরবেলা পাখির কিচিরমিচির ডাকে ঘুম ভাঙে এখানকার মানুষের।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পাখিদের অবাধ বিচরন, জলকেলি ও খুনশুটি কিচিরমিচির কলতানে মুখর দিঘিটি। বালিহাঁস, সরালিহাঁস, পানকৌড়ি, পিয়াংহাঁস, পাতি সরাল, লেংজাহাঁস, ছন্নিহাঁস, পাতিকূট, শামুকখোলসহ বিভিন্ন ধরনের পাখিতে মুখরিত দিঘি এলাকা। দিঘির স্বচ্ছ পানির উপর দিয়ে ডানা ঝাপটে উড়ে বেড়াচ্ছে তারা। সন্ধ্যা নামলেই দিঘিপাড়ের গাছগাছালিতে আশ্রয় নেয় এসব পাখি। এদের কোলাহল চারদিকে দারুণ এক দ্যোতনা সৃষ্টি করে। সেখানে উপস্থিত হলেই কেবল বোঝা যায়, এ কেমন সুন্দর ও নান্দনিক এক অপরূপ দৃশ্য। তাইতো প্রকৃতিপ্রেমীরা বৈচিত্র্যময় এ দৃশ্য দেখতে ভিড় করেন প্রতিদিন।

প্রতিবছর শীতে বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে শত শত অতিথি পাখি আসে।

স্থানীয়রা জানান, প্রতিবছর শীতে বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে শত শত অতিথি পাখি আসে। এছাড়া পাড়ার প্রতিটি গাছেই আছে দেশীয় পাখি ঘুঘু, বক, সারক, পেঁচা। সকালবেলা এসব পাখি খাবারের সন্ধানে যখন একসঙ্গে আকাশে ওড়ে, তখন সূর্য যেন আড়াল হয়ে যায়। পাখিদের কলরবে মুখর হয়ে ওঠে দিঘি পার এলাকা। আবার সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার সময় কোলাহলপূর্ণ দৃশ্য উপভোগ করতে ভিড় জমান পাখিপ্রেমীরা। এছাড়াও পাখিদের সাথে তাদের গড়ে উঠেছে গভীর মিতালী। পাখির ডাকেই সকালে ঘুম ভাঙ্গে তাদের।

দিঘির পূর্বপারের বাসিন্দা সবিতা রানী বলেন, যখন পাখিগুলো থাকে না, খুব খারাপ লাগে, মনে হয় আর তারা ফিরে আসবে না। আবার যখন ফিরে আসে, তখন মন আনন্দে ভরে যায়। প্রতিদিন অনেকে পাখি দেখতে আসেন।

পাখিদের কলরবে মুখর হয়ে ওঠে দিঘী পার এলাকা।

মালতি রানী বলেন, যখন পাখিগুলো থাকে, তখন পুরো দিঘি মুখর করে রাখে। আবার যখন থাকে না, দিঘিটি খালি খালি লাগে। এসব পাখি দেশের সম্পদ, এদের রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। তাই আমরা সবাই পাখিগুলোকে দেখে রাখি, যাতে কেউ পাখি শিকার করতে না পারে।

পাখি দেখতে আসা জাহিদুল ইসলাম জানান, অনেক প্রজাতির পাখি এখানে আছে। এত বেশি পাখি অন্য কোথাও দেখিনি। একসঙ্গে এত পাখি দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছি।

শাহেদ নামে এক দর্শনার্থী জানান, শুনলাম এই দিঘিতে নাকি অনেক পাখি এসছে। তাই এই পাখিগুলো দেখার জন্যই মূলত এখানে এসেছি। একসঙ্গে এতগুলো পাখি এর আগে দেখা হয়নি। দেখে খুবই ভালো লাগলো।

পত্নীতলা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি সুমন কুমার জানান, সারা বছরই এখানে দেশীয় প্রজাতির পাখি থাকে শীত মৌসুমে আসে পরিযায়ী পাখি। দিঘিটি লিজ দিয়ে বানিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করায় পাখিগুলো নিরাপদে থাকতে পারে না। সন্ধ্যায় আসে আবার দিনের বেলায় চলে যায়। আমাদের কমিটির পক্ষ থেকে মানুষকে সচেতন করেছি যাতে পাখি শিকার না করে।

উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, পাখি শিকার বা হত্যার ব্যাপারে সবসময় আমরা মানুষকে নিরুৎসাহিত করি। কোন পাখি আহত হলে আমরা চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকি। কেউ যাতে পাখিগুলোকে বিরক্ত করতে বা শিকার করতে না পারে সে বিষয়ে আমাদের নজরদারি আছে।

   

আমাদের মৌটুসি পাখিরা



ড. আ ন ম আমিনুর রহমান পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বহুপুষ্পিকা গাছে সিঁদুরে মৌটুসির টোনা। ছবি- লেখক।

ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বহুপুষ্পিকা গাছে সিঁদুরে মৌটুসির টোনা। ছবি- লেখক।

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রজাপতি বাদে পৃথিবীতে কোনো উড়ন্ত সৌন্দর্য থাকলে তা হলো পাখি। তবে পাখির রাজ্যে কোনটি সুন্দরতম তা বলা কঠিন। কারণ, একেকটি পাখি একেক দিকে সুন্দর। এদেশের কমবেশি ৭২৩ প্রজাতির পাখির মেলায় সুন্দর পাখির সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। তবে, অনেকের মতে মধুচুষকি (Nectariniidae) গোত্র বা পরিবারের পাখিরাই সুন্দরতম, বিশেষ করে মৌটুসি পাখিরা (Sunbird)। কারণ, ওদের সৌন্দর্য সবখানেই ছড়িয়ে আছে-কী গায়ের রঙে, কী ওড়ার ঢঙে, কী গান গাওয়ায়, কী বাসা তৈরিতে? আবার মৌটুসিদের মধ্যে পুরুষ নীলটুনিকে (Purple Sunbird) এদেশের সুন্দরতম পাখি হিসেবে গণ্য করা হয়। 

বিশ্বের ক্ষুদ্রতম পাখির গোষ্ঠি হামিংবার্ডের (Hummingbird) মতো মৌটুসিরাও বাতাসে স্থির থেকে উড়তে পারে। এরা প্রজাপতি, ভ্রমর ও মৌমাছিদের মতো ফুলে ফুলে নেচে নেচে মধু পান করে বেড়ায়। অত্যন্ত চঞ্চল পাখি এরা, বেশিক্ষণ এক জায়গায় থাকে না। বাতাসে ঢেউ খেলিয়ে আলোর ঝিলিকের মতো এগাছ থেকে ওগাছে, এ ফুল থেকে ও ফুলে উড়ে বেড়ায়। পুরুষ পাখি বা টোনা বেশ আমুদে। ফুলের নির্যাস বা মধু পানের জন্য মৌটুসিদের রয়েছে লম্বা ও নিচের দিকে বাঁকানো ঠোঁট বা চঞ্চু, যা ফুলের ভেতরে ঢুকিয়ে খাঁজকাটা ও রবারের ডগারের মতো জিহ্বাটি দিয়ে মধু পান করে। নির্যাসের অভাবে ছোট ছোট পোকামাকড়ও খেতে পারে। ফুলের বোঁটার ওপর বসে বাদুড়ের মতো ঝুলে পড়ে যেভাবে ফুলের রস চুষে তা দেখতে বেশ লাগে!

ঢাকার রমনা পার্কে হামিংবার্ডের মতো শূন্যে স্থির হয়ে উড়ছে নীলটোনা। ছবি- লেখক

মৌটুসিদের পালক অত্যন্ত বাহারি রঙের। তবে, এই বাহারি রং শুধু পুরুষ বা টোনাদের মধ্যেই দেখা যায় এবং তা শুধু প্রজননকালে সীমাবদ্ধ। বাহারি পালকগুলোর উপর সূর্যের আলো পড়লে চকচক করে উঠে, তখন সৌন্দর্য যেন বহুগুণ বেড়ে যায়!

মৌটুসিরা পুরনো বিশ্ব অর্থাৎ আফ্রিকা, ইউরোপ, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার পাখি। বিশ্বে সর্বমোট ১৪৬টি প্রজাতির মৌটুসি দেখা যায়। এদের মধ্যে এদেশে রয়েছে ৯টি, যার ৫টি আবাসিক ও ৪টি পরিযায়ী। এদেশের ৯ প্রজাতির মৌটুসি পাখির মধ্যে আমি এ পর্যন্ত ৬টি প্রজাতির দেখা পেয়েছি। বাকি ৩টি অতি বিরল, সম্প্রতি কেউ দেখেছে বলে শুনিনি। এখানে এই ৬ প্রজাতির মৌটুসি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচরা করা হয়েছে।

১. নীলটুনি (Purple Sunbird): দুর্গাটুনটুনি বা বেগুনটুনি নামেও পরিচিত। এটি এদেশের সুন্দরতম ও বহুল দৃশ্যমান আবাসিক পাখি। যদিও সেই ছোটকাল থেকেই পাখিটিকে দেখছি, কিন্তু ওর প্রথম ছবিটি তুলি ১৯৯৬ সালে বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার সাতশৈয়া গ্রামে। ঢাকার আমার বাসার কাঁঠাল গাছে বেশ ক’বার পাখিটি বাসা করেছিল। নীলটুনি মানুষের কাছাকাছি থাকতেই বেশি পছন্দ করে। শহর-বন্দর-গ্রাম-বন-জঙ্গল সবখানেই দেখা যায়। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইরান, চীন প্রভৃতি দেশে বিস্তৃত। পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Cinnyris asiaticus (সিন্নিরিস এশিয়াটিকাস)।

নীলটুনির দেহের দৈর্ঘ্য অর্থাৎ চঞ্চুর আগা থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত ১০ সেন্টিমিটার লম্বা, যার মধ্যে চঞ্চুটিই ৪ সেন্টিমিটার। পাখিটির রঙের কি বাহার! দূর থেকে নীলটোনাকে একদম কালো দেখায়। কিন্তু কাছে এলে বোঝা যায় এর গাঢ় নীল রঙ, রোদ লাগলে যা উজ্জ্বল ধাতব বেগুনি-নীল দেখায়। মাথা ও পিঠ ধাতব বেগুনি; বুক বেগুনি-কালো। বুক ও পেটের মাঝখানে পিঙ্গল ও লালচে বলয় থাকে। কালো যে কতটা সুন্দর হতে পারে তা নীলটোনাকে না দেখলে বোঝা যাবে না। তবে এই রূপ শুধু বাসা বাঁধা ও ডিম পাড়ার মৌসুমেই। ছানারা বাসা ছেড়ে উড়ে যাবার পর থেকে এই নীলচে-বেগুনি ও কালো রঙ ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হতে হতে একসময় প্রায় মিলিয়ে যায়, শুধু বুকে একটা কালো চওড়া টান ও ডানার উপরিভাগে কালচে রঙটা থাকে। কিশোর নীলটুনিও দেখতে একই রকম। টোনা এত সুন্দর হলেও স্ত্রী বা টুনি ততটা সুন্দর নয়। টুনির পিঠ হলুদাভ-বাদামি। দেহের নিচের অংশ হালকা-হলুদাভ। লেজ ধূসর কালো।

লেখকের বাসা ঢাকার জিগাতলায় কাঠাল গাছে নীলটোনা। ছবি- লেখক

২. সিঁদুরে মৌটুসি (Crimson/Yellow-backed/Scarlet-throated/Scarlet-breasted Sunbird): সিঁদুরে-লাল মৌটুসি নামেও পরিচিত। ছোট্ট সুদর্শন পাখিটি এদেশের অন্যতম সুন্দর ও দুর্লভ আবাসিক পাখি। এটি এদেশের চিরসবুজ ও পাতাঝরা বন, ক্ষুদ্র ঝোপ ও বাঁদাবনে বিচরণ করে। অনেক সময় গ্রাম ও শহরতলীর সুমিষ্ট মধুসম্পন্ন ফুল বাগানেও ঘুর ঘুর করতে দেখা যায়। পাখিটিকে আমি প্রথম দেখি রংপুরে, ২০১০ সালে। তবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় একসঙ্গে দেখেছি ময়মনসিংহে ২০১৪ সালে। এছাড়াও প্রতিবছরই দেখি হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে। বাংলাদেশ ছাড়াও প্রজাতিটিকে ভারত ও চীনসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা যায়। এটি সিঙ্গাপুরের জাতীয় পাখির মর্যাদা লাভ করেছে। পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Aethopyga siparaja (ইথোপিগা সিপারাজা)।

সিঁদুরে মৌটুসির টোনা লম্বায় প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার ও টুনি ১০ সেন্টিমিটার। ওজনে ৮ থেকে ১১ গ্রাম। টোনা-টুনির পালকের রঙে অনেক পার্থক্য। টোনার গলা, বুক ও বুকের দু-পাশ উজ্জ্বল লাল। চঞ্চুর গোড়া থেকে গলার দু-পাশে গোঁফের মতো ধাতব নীলচে-সবুজ ডোরা রয়েছে। মাথার চাঁদি ধাতব সবুজ। রোদের আলোয় মাথার চাঁদি ও গোঁফ চকচক করতে থাকে। পিঠ কালচে গাঢ় বা মেরুন লাল। কোমড়ের পালক হলুদ। লেজের লম্বা পালক সবুজ যার আগার বাইরের দিকটা সাদা। পেট ও পায়ুর পালক হলদে-জলপাই। ডানার গোড়া লালচে-জলপাই ও বাকিটা গাঢ় জলপাই। টুনির দেহের উপরটা জলপাই-সবুজ ও নিচটা হলদে-জলপাই। লেজ গোলাকার, যার আগা সাদা। গলা ও বুকের উজ্জ্বল লাল আভা ছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে মায়ের মতো। টোনা-টুনি নির্বিশেষে পা, আঙুল, নখ ও বাঁকানো চঞ্চুটি কালচে-বাদামি।

বহুপুষ্পিকা গাছে সিঁদুরে মৌটুসির টুনি। ছবি- লেখক

৩. সবুজাভ মৌটুসি (Ruby-cheeked Sunbird/Rubycheek): এটি চুনিকন্ঠি মৌটুসি নামেও পরিচিত। এদেশের সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখিটিকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেট বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ, পাতাঝরা ও বাঁদাবন এবং বনের আশেপাশের ঝোপঝাড়ে দেখা যায়। আমি সর্বপ্রথম ওকে কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে দেখেছি। পরবর্তীতে সুন্দরবন ও সিলেট বিভাগে দেখেছি। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাখিটির বিস্তৃতি রয়েছে। পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Anthreptes singalensis (অ্যানথ্রেপ্টেস সিঙ্গালেনসিস)।

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে সবুজাভ মৌটুসির টোনা। ছবি- লেখক

সবুজাভ মৌটুসির চঞ্চুর অন্যান্য প্রজাতির মৌটুসির তুলনায় খাটো ও ফুলঝুরির (Flowerpecker) থেকে বড়। দেহের দৈর্ঘ্য ১০ থেকে ১১ সেন্টিমিটার। টোনা ও টুনির দেহের রঙে পার্থক্য থাকে। টোনার মাথার চাঁদি, ঘাড়, পিঠের উপরাংশ, কোমড় ও লেজের উপরটা ধাতব সবুজ বা পান্না। ডানা ও লেজ কিছুটা কালচে। চিবুক চুনি থেকে বেগুনি। গলা ও বুক গাঢ় লালচে-কমলা। পেট ও লেজের তলা হলদে। অন্যদিকে, টুনির দেহের উপরটা অনুজ্জ্বল জলপাই-সবুজ। গলা ও বুক হালকা লালচে-কমলা। পেট ও লেজের তলা হলদে। তবে, টোনার মতো গালে চুনি রঙ দেখা যায় না। টোনা-টুনি নির্বিশেষে চোখ লাল এবং পা, আঙুল ও নখ সবুজাভ-ধূসর। চঞ্চু ছোট, সোজা ও কালচে। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে হুবহু মায়ের মতো, তবে দেহের নিচটা পরোপুরি হলুদ।

কাপ্তাই নেভি ক্যাম্পে যাওয়ার পথে গাছের ছায়ায় সবুজাভ মৌটুসির টুনি। ছবি- লেখক

৪. মৌটুসি (Purple-rumped Sunbird): মনচুঙ্গী নামেও পরিচিত। এটি এদেশের বহুল দৃশ্যমান আবাসিক পাখি। নীলটুনির মতো বাগান ও গাছপালাসম্মৃদ্ধ এলাকায় বাস করে। আমি সর্বপ্রথম ওকে ঢাকার রমনা পার্কে দেখেছি। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, শ্রীলংকা ও মিয়ানমারে দেখা যায়। পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Leptocoma zeylonica (ল্যাপটোকোমা জেইলোনিকা)।

মৌটুসির দেহের দৈর্ঘ্য ১০ সেন্টিমিটারের কম। নিচের দিকে বাঁকানো চঞ্চুটি মাঝারি আকারের। টোনা ও টুনির দেহের রঙে পার্থক্য রয়েছে। টোনার দেহের উপরটা গাঢ় মেরুন। মাথা নীলাভ-সবুজ, নির্দিষ্ট কোণ থেকে যা চকচকে দেখায়। ঘাড় গাঢ় সবুজ ও পাছা বেগুনি। কালচে গলায় বেগুনি আভা ও বুকে মেরুন ডোরা। দেহের নিচটা সাদাটে। অন্যদিকে, টুনির দেহের উপরটা জলপাই বা বাদামি। গলা সাদা ও বুক হলদে। লেজের উপরের পালক-ঢাকনি কালো। চোখের উপরে একটি হালকা দাগ থাকতে পারে। টোনা-টুনি নির্বিশেষে চোখের মনি লালচে। চঞ্চু, পা ও আঙুল কালচে।

ঢাকার রমনা পার্কে একটি পুরুষ মৌটুসি। ছবি- লেখক
  

৫. বেগুনি-গলা মৌটুসি (Purple-throated/Van Hasselt’s  Sunbird): বেগুনি-বুক মৌটুসি নামেও পরিচিত। এটি এদেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি। চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনের বাসিন্দা। বনের কিনারা, ছড়ার আশপাশ, বন লাগোয়া আবাদি জমি ও বাগানের ফুলে ফুলে বিচরণ করে নির্যাস পান করে। ওকে প্রথম দেখি শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে। পরবর্তীতে কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে এবং সবশেষে এ বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারিতে হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাখিটির দেখা মিলে। বেগুনি-গলা মৌটুসির বৈজ্ঞানিক নাম Leptocoma sperta (ল্যাপটোকোমা স্পারটা)।

কাপ্তাই বন বাংলোর একটি গাছে বেগুনি-গলা মৌটুসির টোনা। ছবি- লেখক

পাখিটির দেহের দৈর্ঘ্য মাত্র ১০ সেন্টিমিটার, যার মধ্যে ঠোঁটই প্রায় ১.৬ সেন্টিমিটার। টোনা ও টুনির চেহারায় কোনো মিল নেই। টোনাটি প্রথম দর্শনে কালচে পাখি। তবে, রোদের আলোয় মাথার চাঁদি ধাতব সবুজ দেখায়। ঘাড়, পিঠ, ডানা ও লেজ কালচে। দেহের পেছনটা ও কোমড় নীল। বুক ও পেটের উপরটা লালচে, তলপেট বাদামি। টুনির দেহের উপরটা জলপাই-বাদামি ও নিচটা হালকা হলুদ। সাধারণ মানুষের পক্ষে অন্যান্য প্রজাতির স্ত্রী মৌটুসি থেকে এটিকে আলাদা করা কঠিন। টোনা-টুনি নির্বিশেষে সরু ও সামনের দিকে বাঁকানো চঞ্চুটি কালো। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল কালো। চোখের মনি বাদামি।

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের বড় ছড়ায় সীমগাছে বেগুনি-গলা মৌটুসির টুনি। ছবি- লেখক
   

৬. সিঁদুরে হলুদ মৌটুসি (Mrs. Gould's sunbird): মিসেস গোল্ডের মৌটুসিও বলা যায়। বিখ্যাত বৃটিশ পক্ষীবিদ জন গোল্ডের স্ত্রী এলিজাবেথ গোল্ডের নামে এই পাখির নাম রাখা হয়েছে, যিনি ছিলেন একজন চিত্রকর। জন গোল্ডের বেশ ক’টি পাখির বইয়ের ছবি উনি এঁকেছেন। অতি সুন্দর বিরল পাখিটি পরিযায়ী হয়ে কালে-ভদ্রে এদেশে আসে। পাখিটিকে প্রথম দেখি সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের মান্দার গাছে ২০১৯ সালের ৯ মার্চ। পরের দু’বছরও একই সময় ওদের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে দেখলাম। মূল আবাস হিমালয়ের আশপাশের দেশ, যেমন- ভারত, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম, চীনের দক্ষিণাঞ্চল ইত্যাদি। পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Aethopyga gouldiae  (ইথোপিগা গোল্ডি)।

হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের মান্দার গাছে সিঁদুরে হলুদ মৌটুসির টোনা। ছবি- লেখক

সিঁদুরে হলুদ মৌটুসির টোনা লম্বায় ১৪ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার, যার মধ্যে লেজ ৪ ও ঠোঁট ২ সেন্টিমিটার। তবে, টুনি মাত্র ১০ সেন্টিমিটার লম্বা। বাহারি এই পাখিটির রঙের মেলা শুধু টোনার দেহেই। অন্যান্য প্রজাতির মৌটুসির মতো টুনির দেহ অনুজ্জ্বল জলপাই। লেজ ছোট ও গোলাকার। পেট হালকা হলদে। মাথা ও মুখম-ল ধূসর বা নীলচে-ধূসর। অন্যদিকে, বাহারি টোনার মাথার চাঁদি, মুখমণ্ডল, কান-ঢাকনি ও গলা ধাতব নীল থেকে বেগুনি। মাথার পিছন, ঘাড়, পিঠ ও দেহের উপরটা সিঁদুরে লাল। ডানার উপরটা জলপাই। বুক-পেট ও লেজের নিচের দিক হলুদ। লেজের পালক নীল। চোখ বাদামি। চঞ্চু, পা, আঙুল ও নখ কালো।

প্রজাতিভেদে মৌটুসিরা ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে প্রজনন করে। তবে কোন কোন প্রজাতি বছরের যে কোন সময় ডিম-ছানা তুলতে পারে। গ্রামে বাসকারী মৌটুসিরা সাধারণত গেরস্থ বাড়ির আঙিনায় বরই-ডালিম গাছের চিকন ঝুলে পড়া শাখা প্রশাখায় অথবা লাউ-সিম লতানো গাছের ডগায় বাসা বাঁধে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, গেরস্থ বাড়ির আশপাশে ছাড়া এরা বাসা বাঁধতেই চায় না। মানুষের সান্নিধ্য এদের চাই-ই চাই। এই যে মানুষের এত কাছে বাসা বাঁধে তবুও সচরাচর তা চোখে পড়ে না। হঠাৎ দেখলে বাসাটাকে ঝোপ-জঙ্গল ছাড়া অন্য কিছু মনে হবে না। শত্রুর হাত থেকে রক্ষা পেতেই এ ধরনের ছদ্মবেশী (Camouflage) বাসা বানায়। নীলটুনি ও মৌটুসির বাসা দেখতে প্রায় একই রকম।

তবে মৌটুসির তুলনায় নীলটুনির বাসা খানিকটা বড় হয়। শহরের মৌটুসিরা লতানো গাছে, যেমন- কলকে জবা, বাগান বিলাস, মাধবী লতা, মালঞ্চ, ঝুমকো প্রভৃতি ঝোঁপেও বাসা বাঁধে। বাসা মাটি থেকে দুতিন মিটার উঁচুতে থাকে। সিঁদুরে মৌটুসি ছোট গাছ বা ঝোপঝাড়ের ঝুলন্ত সরু ডালে শিকড় বা চিকন আঁশ দিয়ে ঝুলন্ত বাসা বানায়। এদের বাসা নীলটুনির থেকে লম্বা ও চাপানো এবং দেখতে খোসা ছাড়ানো পাকা ধুন্দল-এর মতো। অন্যদিকে, পাহাড়ে বসবাসকারী বেগুনি-গলা মৌটুসি লম্বা থলের মতো ঝুলন্ত বাসা বানায় গাছের সরু শাখায় ঘাস, আঁশ, পাতা, বাকল, মাকড়সার জাল ইত্যাদি দিয়ে। টোনা-টুনি একসঙ্গে মিলেমিশে বাসা বানায়।

কাঠাল গাছে নিজ বাসায় ডিমে তা দানরত নীলটুনি। ছবি- লেখক

মৌটুসিদের বাসার গড়নে ও সাজসজ্জায় রুচি ও বিলাসের ছাপ দেখা যায়। সৌন্দর্য ও প্রকৌশলী গুণে বাবুইয়ের পরই এদের বাসার স্থান। মাকড়সার জাল দিয়ে বাসার ভিত রচনা করে। বাসাটা দেখতে অনেকটা থলের মতো। বাসায় ঢোকার পথ উপরের দিকে। ঢোকার পথের মুখের উপরে সানশেডের মতো ছাদ থাকে। বৃষ্টির পানি আটকানোর জন্যই হয়তো এ ব্যবস্থা। বাসায় ডিম বাচ্চা রক্ষার জন্যও সব ধরনের ব্যবস্থা আছে।

বাসাটি ঝোঁপ-ঝাড়-লতার সঙ্গে ভালোভাবে আটকানো থাকে, বাতাসে দোলে। বাতাসের সময় ভারসাম্য রক্ষার জন্য বাসার নিচের দিকে মাকড়সার জাল ও লতাপাতা সূতোর মতো ঝুলানো থাকে। এরা অত্যন্ত বিলাসি পাখি। এদের বাসার ভেতরে থাকে চমৎকার অলংকরণ। মিহি ঘাস, সরু পাতা ও কোমল লতাকাঠি দিয়ে বাসা তৈরি করে। বাসার উপরে ফুলের পাঁপড়ি মাকড়সার আঠা দিয়ে সেঁটে দেয়। গোলাপ পাঁপড়ি, বাগান বিলাসের শুকনো পাঁপড়ি, রঙিন কাগজের টুকরো, শিমুল তুলো, কাশ ফুল, পাটের মিহি সাদা আঁশ ইত্যাদি বাসায় সাঁটা থাকে। বাসার ভেতরে ডিম রাখার জন্য থাকে কোমল বিছানা।

 মেহেরপুরে নিজ বাসায় একটি স্ত্রী মৌটুসি। ছবি- লেখক

এরা প্রতি মৌসুমে নতুন বাসা বানায়। তবে পুরনো বাসাটি শক্তপোক্ত থাকলে অনেক সময় দু’বারও ব্যবহার করতে পারে। আমার বাসার কাঁঠাল গাছে, আমার ঠিক জানালা বরাবর একজোড়া নীলটুনি বাসা বানিয়েছিল। এরা পরপর দুই মৌসুম সেই বাসাটিতে বাচ্চা তুলেছে। তৃতীয় মৌসুমেও বাসাটিকে একটু ঠিকঠাক করে চালিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু একদিন এক ঝড়ে বাসাটি ভেঙ্গে যাওয়ার ফলে ওরা আর সেটা ব্যবহার করতে পারে নি।

বাসার জায়গা পছন্দ করা ও বাসা তৈরির পুরো দায়িত্ব মেয়ে পাখির। ছেলেটি শুধু মাঝে মাঝে এসে কাজ তদারকি করে। প্রজাতিভেদে স্ত্রী মৌটুসি ২ থেকে ৩টি সাদা, ধূসর বা সবুজাভ সাদা ডিম পাড়ে। তার উপর থাকে লালচে, গোলাপি বা বাদামি ছোপ। টুনি বাসায় বসে যখন ডিমে তা দেয়, তার লম্বা ছুঁচালো ঠোঁটটি দরজার মুখে বেরিয়ে থাকে। এ সময় মৃদু বাতাস এলে অল্প অল্প দোদুল্যমান বাসাটি দেখতে চমৎকার সুন্দর লাগে।

টোনা কখনোই ডিমে তা দেয় না; এ দায়িত্বটুকু টুনির। ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে বের হতে ১৪ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। বাবা-মা একত্রে মিলে বাচ্চাদের খাইয়ে-দাইয়ে বড় করে তোলে। বাচ্চারা বেশ দ্রুত বাড়ে। ডিম থেকে ফোটার ১৬ থেকে ১৭ দিনের মাথায় বাচ্চারা বাসা ছাড়ে। বাসা ছাড়ার পরও এরা সপ্তাহ দুয়েক বাবা-মার সঙ্গে সঙ্গে থাকে। এরপর একসময় ঘর বাঁধে। আমাদের মৌটুসিরা ৮ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে।

;

এদেশের চেরালেজি প্রজাপতিগুলো



অধ্যাপক ড. আ ন ম আমিনুর রহমান পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
-শেরপুরের রাঙটিয়া বনে তিতিমৌরাল প্রজাপতি। ছবি- লেখক।

-শেরপুরের রাঙটিয়া বনে তিতিমৌরাল প্রজাপতি। ছবি- লেখক।

  • Font increase
  • Font Decrease

দশ বছর আগের কথা। বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় সফর করছি। কাজের ফাঁকে এক ছুটির দিনে কুয়ালা লামপুরের আমপাং এলাকার হুলু কেলাং-এ অবস্থিত মালয়েশিয়ার জাতীয় চিড়িয়াখানায় গেলাম। ছয় বছর আগের শেষ সফরের চেয়ে চিড়িয়াখানার বেশ উন্নয়ন ঘটেছে বলে মনে হলো। চিড়িয়াখানার ভিতরে ছোট্ট কিন্তু সুন্দর একটি প্রজাপতি পার্ক তৈরি করা হয়েছে। প্রজাপতির প্রতি আগ্রহের কারণে অনেকটা সময় নিয়ে পুরোটা পার্ক ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন প্রজাতির প্রজাপতি দেখলাম ও ওদের ছবি তুলতে থাকলাম। ছবি তুলতে তুলতে এক সময় পার্কের শেষ প্রান্তে চলে এলাম। আর ওখানেই দেখা হয়ে গেল কালো-সবুজের সমন্বয়ে বেশ বড় আকারের এক প্রজাপতির সঙ্গে। এত বড় প্রজাপতি কমই দেখেছি! সত্যিই অপূর্ব! সেটি ছিল একটি পুরুষ প্রজাপতি। খানিক পরে স্ত্রীটিরও দেখা পেলাম। এই প্রজাপতির নাম রাজা ব্রুক-এর বিহন (Raja Brook’s Birdwing।

পৃথিবীতে যত সুন্দর, রঙিন ও বড় আকারের প্রজাপতি দেখা যায় তার বেশিরভাগই লেপিডপ্টেরা বর্গের প্যাপিলিওনিডি (Papilionidae) বা চেরালেজি গোত্রের অর্ন্তভুক্ত। পিছনের ডানায় সোয়ালো পাখির মতো দেখতে চেরা লেজ থাকে বলেই এই নাম। তবে, এই গোত্রের সব প্রজাতিরই কিন্তু এরকম চেরা লেজ নেই, যেমন- অভ্রকুট (Blue Mormon),  কৃষ্ণকটক (Common Mime), নীরদ সিন্ধু (Common Jay) ইত্যাদি। সর্বমোট তিনটি উপগোত্রে বিশ্বব্যাপী এই গোত্রের প্রজাপতির সংখ্যা ৫৫০ থেকে ৭০০টি। এরমধ্যে ভারতীয় উপমাহদেশে দেখা যায় ১০৭টি, যার ৩৬টির দেখা মিলে আমাদের এই সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশে। বিশ্বের বৃহত্তম প্রজাপতি রাণী আলেকান্দ্রার বিহন (Queen Alexandra’s Birdwing), মালয়েশিয়ায় দেখা রাজা ব্রুক-এর বিহন ও বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রজাপতি বেণুবিহন (Common Birdwing) এই গোত্রেরই সদস্য। 

যদিও বেশিরভাগ প্রজাতিই গ্রীষ্মম-লীয়, তথাপি অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া বিশ্বের প্রতিটি মহাদেশেই এই গোত্রের প্রজাপতি বাস করতে পারে। শিকারী প্রাণী থেকে জীবন বাঁচাতে এই গোত্রের অনেক প্রজাতির প্রজাপতিই অন্যান্য বিস্বাদযুক্ত প্রজাপতির রূপ ধারণ করে থাকে। এই গোত্রের প্রজাপতিদের শণাক্তকারী বৈশিষ্ট্যর মধ্যে সু-বিকশিত সামনের পা, সামনের পায়ের জঙ্ঘাস্থির উপর শক্ত যুদ্ধাস্ত্র, পিছনের ডানায় লেজ (সোয়ালোলেজি/চেরালেজি) অথবা লাল বা কমলা ফুটকি (পার্নাসান) ইত্যাদি প্রধান। ডিম থেকে ফোটার পর শুককীট প্রথমে নিজ ডিমের খোসা ও পরবর্তীতে কাগজি লেবু, লেবু ও কারিপাতা থেকে স্বর্ণ চাপা, আতা, ঈশ্বরমূল, গাজর প্রভৃতি গাছের পাতা খায়। বয়স্কগুলো ফুলের রস পান করে, কিন্তু কাদামাটি ও মলমূত্র থেকেও রস চুষতে দেখা যায়। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া স্ত্রী প্রজাপতি পাতার উপর বা নিচের দিকে একটি করে গম্বুজাকৃতির, মসৃণ বা অস্পষ্ট গর্তযুক্ত, চওড়া ও অসচ্ছ ডিম পাড়ে। শুককীট (Caterpillar or lava) শক্তপোক্ত ও মসৃণ বা পিঠে সারি সারি মাংসল কন্দযুক্ত হয়; কখনও কখনও দেহের ৪র্থ খণ্ডে উত্থিত মাংপি- বা ঝুঁটির মতো থাকে। মূককীট (Chrysalis or pupa) আকারে পরিবর্তনশীল, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পিছনের দিকে বাঁকা হয়, যা সাধারণভাবে লেজের মাধ্যমে উল্লম্ব অবস্থানে যুক্ত থাকে ও মাঝখানে একটি বৃত্তাকার সিল্কের সূতো দিয়ে আরও সুরক্ষিত থাকে। এখানে বাংলাদেশে পাওয়া যায় এমন ১৩টি চেরালেজি প্রজাপতির পরিচয় ও সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া হয়েছে।

মালয়েশিয়ার কুয়ালা লামপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানায় স্ত্রী (বায়ে) ও পুরুষ (ডানে) রাজা ব্রুক-এর বিহন প্রজাপতি। ছবি- লেখক

০১. বেণুবিহন (Common Birdwing): পশ্চিমবঙ্গে এটি সোনাল নামে পরিচিত। এদেশের বিরল (Rare) ও সংকটাপন্ন (Vulnerable) এই প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম Triodes helena (ট্রায়োডেস হেলেনা)। সিলেট (উত্তরপূর্বাঞ্চল), চট্টগ্রাম (দক্ষিণপূর্বাঞ্চ) ও ঢাকা বিভাগ (মধ্যাঞ্চল) জুড়ে এর বিস্তৃতি। অন্যদিকে, বিশ্বব্যাপী দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা মিলে। এটি এদেশের বৃহত্তম প্রজাপতি। প্রসারিত অবস্থায় প্রাপ্তবয়ষ্ক প্রজাপতির বাম ডানার একপ্রান্ত থেকে ডান ডানার বিপরীত প্রান্ত পর্যন্ত দৈর্ঘ্য হয় ১৪০ থেকে ১৯০ মিলিমিটার। সামনের ডানার উপর ও নিচের অংশ কালো; ডানার শিরাগুলোতে হালকা ধূসর আভা থাকে। পিছনের ডানা হলুদ ও শিরা কালো, ডানার প্রান্ত কালো ও ঢেউ খেলানো। লেজ নেই। স্ত্রী-পুরুষ আলাদা। প্রজাপতিটি চিরসবুজ ও পত্রঝরা বন ও বনসংলগ্ন খোলা প্রান্তরে বাস করে। সচরাচর উঁচু গাছের উপর দিয়ে উড়ে। পাতার উপর ডানা মেলে রোদ পোহায়। ফুলের রস পান করে। স্যাঁতসেঁতে মাটির রসও চোষে। এদের জীবন চক্র ঈশ্বরী, ঈশ্বরমূল, হংসলতা ইত্যাদি গাছে সম্পন্ন হয়। স্ত্রী একটি করে গোলাকার কমলা রঙের ডিম পাড়ে, যা ৬ দিনে ফুটে শুককীট বের হয়। শুককীট ১৫ দিনে ৫ বার খোলস পাল্টে মূককীটে পরিণত হয়। শক্ত আবরণীর ভিতর ১৯ থেকে ২০ দিন সুপ্ত থাকার পর মুককীটের খোলস কেটে নতুন প্রজাপতি বেরোয়। জীবন চক্র ৪০ থেকে ৪১ দিনে সম্পন্ন হয়। পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতির আয়ুষ্কাল ৬ সপ্তাহ।

মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে বেনুবিহন প্রজাপতি। ছবি- লেখক

০২. সপ্ত পদ্মরাগ (Common Rose): পশ্চিমবঙ্গে এটি আলতে নামে পরিচিত। এদেশের সচরাচর দৃশ্যমান (Common) ও স্বল্প ঝুঁকিসম্পন্ন (Least Concern) প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম Pachliopta aristolochiae (পাচলিওপটা অ্যারিস্টোলোচি)। সিলেট, চট্টগ্রাম, খুলনা (দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চল) ও ঢাকা বিভাগের আবাসিক প্রজাপতিটিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও দেখা যায়। এটি একটি লাল দেহের কালো ডানাওয়ালা প্রজাপতি। ডানার বিস্তার ৮০ থেকে ১১০ মিলিমিটার। সামনের ডানা পুরোপুরি কালো। পিছনের ডানার মধ্যাংশে সাদা ছোপ ও প্রান্তে গোলাপি-বাদামি ফুটকি, নিচের অংশে যা আরও বড় ও লাল হয়েছে। পিছনের ডানায় লেজ রয়েছে। স্ত্রী-পুরুষ একই রকম। বাদাবনসহ দেশের বিভিন্ন বন ও বনপ্রান্তে বাস করে। ধীরে ডানা ঝাপটানোর মতো করে উড়ে। গাছের মগডালে রোদ পোহায়। রসের জন্য ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ায়। স্যাঁতসেঁতে মাটির রসও চোষে। স্ত্রী ঈশ্বরী, গন্ধম, চাকরাণী প্রভৃতি পোষক গাছে পাতাপ্রতি একটি করে গোলাকার লালচে ডিম পাড়ে যা ৩ দিনে ফোটে। শুককীট ১৪ থেকে ১৫ দিনে মূককীটে পরিণত হয়। মূককীট থেকে ১১ থেকে ১২ দিন পর নতুন প্রজাপতি বেরোয়।

Caption

 

০৩. কেশবতী (Common Batwing): বিরল ও বিপন্ন (Endangered) এই প্রজাপতিটি নামটি পশ্চিমবঙ্গে প্রচলিত। বৈজ্ঞানিক নাম Atrophaneura varuna (অ্যাট্রোফানিউরা ভারুনা)। সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের প্রজাপতিটিকে ভারত, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারেও দেখা যায়। এটি একটি লেজবিহীন কালো প্রজাপতি। স্ত্রী আকারে বড়সড় হয়। প্রসারিত ডানা ৮৮ থেকে ১৩৬ মিলিমিটার। পুরুষের ডানার উপরটা মখমলে নীলচে-কালো ও দাগহীন। স্ত্রীর ডানার উপরটা বাদামি-কালো, সামনের ডানার ভূমিকোণ বরাবর সাদা দাগ ও শিরার মাঝে গাঢ় ডোরা। এরা আধা-চিরসবুজ বনের প্রজাপতি হলেও জঙ্গলেও দেখা যায়। ধীরে ও মার্জিতভাবে উড়ে। খাদ্যের জন্য ফুলের কাছে ঘুরঘুর করে। যদিও জীবন চক্র সম্পর্কে তথ্যের ঘাটতি রয়েছে তথাপি বুনো হংসলতা, ঈশ্বরমূল গাছে বংশবৃদ্ধি করে জানা যায়।

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের বড় ছড়ায় কেশবতী প্রজাপতি। ছবি- লেখক

০৪. উদয়াবল্লী (Common Mormon): পশ্চিমবঙ্গে কালিম নামে পরিচিত। বহুল দৃশ্যমান (Very Common) ও স্বল্প ঝুঁকিসম্পন্ন প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম Papilio polytes (প্যাপিলিও পলিটেস)। পুরো দেশজুড়ে প্রজাপতিটির দেখা মিলে। দেশের বাইরে পাকিস্তান, পশ্চিম চীন, ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারে বিস্তৃত। প্রসারিত অবস্থায় ডানার বিস্তার ৮০ থেকে ১১৫ মিলিমিটার। পিছনের ডানার প্রান্ত ঢেউ খেলানো ও মধ্যাংশে এক সারি সাদা ফুটকি বাদে পুরো দেহ কুচকুচে কালো। লেজ আছে। স্ত্রী পুরুষ থেকে বড় ও ভিন্ন রকমের। পুরুষের ডানার দাগগুলো হালকা ও অস্পষ্ট, স্ত্রীরগুলো স্পষ্ট। স্ত্রীতে ৩টি রূপ দেখা যায়। ফুলের বাগান, পার্ক, কৃষি জমি, উন্মুক্ত বন ইত্যাদিতে বসবাসকারী প্রজাপতিটি দ্রুত উড়ুক্কু, কিছুটা এঁকেবেঁকে উড়ে। মাটির কাছে গুল্মে রোদ পোহায়। ফুলের রস পছন্দ করে। পুরুষগুলো ভিজা মাটির রস থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করে। স্ত্রী বেল, পাতি বা জামির লেবু, মটকিলা, কারিপাতা প্রভৃতি গাছের পাতার উপর ও নিচে একসঙ্গে ২০ থেকে ২৫টি হালকা হলুদ গোলাকার ডিম পাড়ে। জীবন চক্র সম্পন্ন হতে ২৭ থেকে ৩৫ দিন সময় লাগে। পুরুষ মাত্র ৩ থেকে ৪ দিন ও স্ত্রীর ৬ থেকে ৮ দিন বাঁচে।

মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে উদয়াবল্লী প্রজাপতি। ছবি- লেখক

০৫. চন্দ্রাবল্লী (Yellow Helen): পশ্চিমবঙ্গে রাজেশ্বরী নামে পরিচিত। দুর্লভ (Uncommon) ও সংকটাপন্ন প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম Papilio nephelus (প্যাপিলিও নেফেরাস)। সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের প্রজাপতিটিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই দেখা যায়। বড় ও কালো লেজওয়ালা প্রজাপতিটির ডানা ১১৫ থেকে ১৩০ মিলিমিটার লম্বা। দেখতে অনেকটা লাল চন্দ্রাবল্লীর (Red Helen) মতো হলেও ডানায় ৩টির বদলে ৪টি স্পষ্ট বড় ঘিয়ে-সাদা দাগ থাকে। সামনের ডানার নিচে চেইনের মতো সাদা ফুটকি রয়েছে। পিছনের ডানা ঢেউ খেলানো। চিরসবুজ বনের বাসিন্দাটিকে উন্মুক্ত এলাকায়ও ঘুর ঘুর করতে দেখা যায়। বেশ দ্রুত উড়ে। স্ত্রীগুলো ফুলের নির্যাস পছন্দ করে। পুরুষগুলো ভিজা মাটির রস চোষে। দাহান, আশশ্যাওড়া, গোলাবাজনা প্রভৃতি গাছে জীবন চক্র সম্পন্ন করে। এদের জীবনচক্র অনেকটা লাল চন্দ্রাবল্লীর মতো; তবে স্ত্রী সচরাচর পাতার উপর দিকে ডিম পাড়ে।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে দুটি চন্দ্রাবল্লী প্রজাপতি। ছবি- লেখক

০৬. উতলকূট (Great Mormon): বনকালিম (পশ্চিমবঙ্গ) নামেও পরিচিত। সচরাচর দৃশ্যমান ও স্বল্প ঝুঁকিসম্পন্ন প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম Papilio memnon (প্যাপিলিও মেমনন)। সিলেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগের প্রজাপতিটিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ও জাপানে দেখা যায়। এটি অভ্রকূট প্রজাপতির নিকটাত্বীয়। ডানার বিস্তার ১২০ থেকে ১৫০ মিলিমিটার। প্রাপ্তবয়স্কগুলো অত্যন্ত অনুকরণকারী ও বহুরূপী; পুরুষের ৪টি ও স্ত্রীর ৯টি রূপ রয়েছে। পুরুষ বড়, লেজহীন, কালো, ডানার উপরের শিরায় নীলচে-ধূসর আঁশ ছড়ানো। স্ত্রী প্রজাপতির বিভিন্ন রূপ দেখতে বিভিন্ন প্রজাতির ক্লাবটেইল ও কেশবতীর মতো। মূলত বন, বনের ধার ও বনের ভিতরের ফাঁকা জায়গায় দেখা যায়। পুরুষ দ্রুত ও স্ত্রী ধীরগতিতে উড়ে। স্ত্রী ফুল ও পোষক গাছের এবং পুরুষ ভিজা মাটির আশেপাশে থাকে। বেল, কাগজী লেবু, সাতকরা, জাম্বুরা প্রভৃতি গাছে ৩৪ থেকে ৩৫ দিনে জীবন চক্র সম্পন্ন করে। স্ত্রী গোলাকার ও ফ্যাকাশে ঘিয়ে-হলুদ রঙের ডিম পাড়ে, যা ৩ দিনে ফোটে।

মৌলভীবাজারের আদমপুর বিটে উতলকুট প্রজাপতি। ছবি- লেখক

০৭. হলদে খঞ্জর (Five-bar Swordtail): পশ্চিমবঙ্গে লাঠিয়াল নামে পরিচিত। বিরল ও সংকটাপন্ন প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম Graphium antiphates (গ্রাফিয়াম অ্যান্টিফেইটস)। প্রজাপতিটিকে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে দেখা যায়। দেশের বাইরে দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বেশকিছু দেশে বিস্তৃত। প্রাপ্তবয়ষ্ক প্রজাপতির ডানার বিস্তার ৮০ থেকে ৯৫ মিলিমিটার। সামনের সাদা ডানার উপর ৫টি কালো ডোরা দেখা যায়; নিচটা উপরের মতোই, তবে কালো ডোরার মধ্যবর্তী অংশে সবুজাভ-সাদা আভা থাকে। পিছনের ডানার নিচের পক্ষমূল সবুজ, তাতে কমলা-হলদে ছোঁপ রয়েছে। তলোয়ারের মতো লম্বা কালচে-বাদামি লেজটি সাদায় মোড়ানো। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। আর্দ্র চিরসবুজ বনের এই বাসিন্দা দ্রুততার সঙ্গে গাছের উপরের দিকে উড়ে। প্রায়শঃই ভিজা বালিতে নেমে রস চোষে। স্ত্রী বিভিন্ন প্রজাতির অ্যান্ননা, স্বর্ণ চাপা ইত্যাদি গাছের কুঁড়ি বা কচি পাতার নিচদিকে পাতাপ্রতি একটি করে ঘিয়ে সাদা, মসৃণ ও গোলাকার ডিম পাড়ে। জীবন চক্র সম্পন্ন করতে ২৫ থেকে ২৮ দিন সময় লাগে।

 হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে হলদে খঞ্জর প্রজাপতি। ছবি- লেখক

০৮. শ্বেত ফড়িংলেজী (White Dragontail): এটি একটি বিরল ও বিপন্ন প্রজাপতি। বৈজ্ঞানিক নাম Lamproptera curius (লেমপ্রোপটেরা কিউরিয়াস)। সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের প্রজাপতিটিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেরই দেখা যায়। এটি ক্ষুদ্রতম লেজযুক্ত প্রজাপতি। ডানার বিস্তার মাত্র ৪০ থেকে ৫০ মিলিমিটার। সামনের ডানা সচ্ছ ও কালো ডোরাযুক্ত; পিছনের ডানায় সাদা আগাযুক্ত লম্বা লেজ। ডানার উপরটা কালো, সামনের ডানার বাইরের অর্ধাংশে কালো ডোরায় ঘেরা ত্রিকোণাকার রংবিহীন সচ্ছ অংশ রয়েছে। দু’ডানার কালো গোড়ায় তেরছা সাদা ডোরা থাকে। দু’ডানার নিচটা উপরের মতো। প্রজাপতিটিকে আধা-চিরসবুজ বনের ঝরনা ও প্রবাহমান পাহাড়ি জলধারা এবং নদীর পাশে দেখা যায়। অত্যন্ত দ্রুত উড়তে পারে। ফুল ও ভিজা বালির রস চোষে। স্ত্রী প্রজাপতি ইলিগেরা করডাটা নামক এক ধরনের গাছের কচি পাতায় একক বা গুচ্ছাকারে ডিম পাড়ে, যা ৪ থেকে ৫ দিনে ফোটে। শুককীট কালো ও মসৃণ এবং মূককীট হলদে-সবুজ। জীবন চক্র সম্পন্ন হতে প্রায় ৪২ দিন লাগে।

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের বড় ছড়ায় শ্বেত ফড়িংলেজি প্রজাপতি। ছবি- লেখক

০৯. মনমেঘা (Tailed Jay): পশ্চিমবঙ্গে এটি চইতক নামে পরিচিত। টেইলড জে ছাড়াও আরও ইংরেজি নাম রয়েছে, যেমন- গ্রিন-স্পটেড ট্রায়েঙ্গেল, টেইলড গ্রিন জে, গ্রিন ট্রায়েঙ্গেল ইত্যাদি। সচরাচর দৃশ্যমান ও স্বল্প ঝুঁকিসম্পন্ন প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম- Graphium agamemnon (গ্রাফিয়াম আগামেমনন)। পুরো দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। বিশ্বব্যাপী ভারতীয় উপমহাদেশ, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে দেখা যায়। ডানার বিস্তার ৮৫ থেকে ১০০ মিলিমিটার। অসংখ্য আপেল-সবুজ ফুটকিসহ সামনের ও পিছনের ডানার উপরটা কালো; আর একই রকমের ফুটকিসহ নিচটা বেগুনি-বাদমি। পিছনের ডানার নিচটায় লাল ফুটকি ও ডানাপ্রতি একটি করে খাটো লেজ থাকে। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম হলেও স্ত্রীর লেজ লম্বা। বৃষ্টিপ্রবণ বনের কিনারা, গ্রাম, পার্ক, বাগান ইত্যাদিতে বাস করে। বিরামহীনভাবে দ্রুতগতিতে গাছের উপরের দিকে উড়ে। ফুলের রস পান করে। আতা, দেবদারু, স্বর্ণ চাপা ইত্যাদি গাছে ৩২ থেকে ৩৬ দিনে জীবন চক্র সম্পন্ন হয়। ডিম, শুককীট, মুককীট ইত্যাদি নীরদসিন্ধুর মতোই।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মনমেঘা প্রজাপতি। ছবি- লেখক

১০. কৃষ্ণকটক (Common Mime): পশ্চিমবঙ্গে খাগড়া নামে পরিচিত। এদেশের সচরাচর দৃশ্যমান ও স্বল্প ঝুঁকিসম্পন্ন প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম Chilasa clytia (চিলাসা ক্লাইটিয়া)। এটি পুরো দেশে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। এছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই রয়েছে। ডানার বিস্তার ৯০ থেকে ১০০ মিলিমিটার। লেজবিহীন প্রজাপতিটির দুটি রূপ রয়েছে। ক্লাইটিয়া রূপের স্ত্রী-পুরুষ উষসী বায়স (Common Crow)-এর মতো এবং ডিসসিমিলিস রূপের স্ত্রী-পুরুষ নীলকমলের (Blue Tiger) মতো। ঘিয়ে দাগছোপ ও প্রান্তীয় ফুটকিসহ ক্লাইটিয়ার ডানার উপরটা গাঢ় বাদামি। চওড়া ঘিয়ে সাদা ডোরাসহ ডিসসিমিলিস-এর ডানার উপরটা কালো। গাছপালাপূর্ণ সমতলভূমি ও পাহাড়ি বনাঞ্চলের এই বাসিন্দা অলসভাবে বৃত্তাকারে উড়ে। ফুল ও ভিজা বালির রস চোষে। স্ত্রী প্রজাপতি দারুচিনি, সাদা কুকুরচিতা, লরেল ইত্যাদি গাছের কচি কা-ে এক বা একাধিক হলুদ দানাযুক্ত ঘিয়ে সাদা রঙের গোলাকার ডিম পাড়ে। জীবন চক্র ২৬ থেকে ২৯ দিনে সম্পন্ন হয়।

রাজশাহী শহরের তালাইমারি এলাকায় কৃষ্ণকটক প্রজাপতি। ছবি- লেখক

১১. শীতলপাটি (Great Zebra): প্রজাপতিটির কোনো বাংলাদেশী নাম নেই, শীতলপাটি পশ্চিমবঙ্গে প্রচলিত নাম। বিরল ও বিপন্ন প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম Graphium xenocles  (গ্রাফিয়াম জেনোক্লেস)। সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে বসবাসকারী প্রজাপতিটিকে ভারত, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারেও দেখা যায়। লেজবিহীন শীতলপাটির ডানার বিস্তার ৮৫ থেকে ১০০ মিলিমিটার। এটি দেখতে অনেকটা খয়েরি শার্দুল (Chocolate Tiger), ভূঁইচাচার (Glassy Tiger) ও শুভ্রছড়া (Courtesan)-এর মতো। ডানার উপরের ভিত্তি রং কালো। সামনের ডানার কিনারায় সাদা ফুটকির মালা এবং মাঝখান ও সামনের প্রান্তে সাদা ডোরার সারি থাকে। সাদা ফুটকিসহ পিছনের ডানার প্রান্ত ঢেউ খেলানো। ডানার নিচের কারুকাজ উপরের মতোই, কিন্তু ভিত্তি রং বাদামি। আধা-চিরসবুজ পাহাড়ি বনের এই বাসিন্দা কম উঁচুতে উড়ে; পুরুষগুলো দ্রুত ও স্ত্রীগুলো ধীরে উড়ে। স্ত্রী ফুলের রস ও পুরুষ ভিজা বালির রস চোষে। জীবন চক্র ও পোষক গাছ সম্পর্কে জানা যায়নি।

আদমপুর বিটের ছড়ায় শীতলপাটি প্রজাপতি। ছবি- লেখক

১২. সাত ডোরা (Lime Swallowtail): এছাড়াও দোল বাসন্তী বা রুরু (পশ্চিমবঙ্গ) নামেও পরিচিত। লাইম সোয়ালোটেইল ছাড়াও এর বহু ইংরেজি নাম রয়েছে, যেমন- কমন লাইম বাটারফ্লাই, লেমন বাটারফ্লাই, সাইট্রাস বাটারফ্লাই, চেকারড সোয়ালোটেইল, ডিঙ্গি সোয়ালোটেইল, সাইট্রাস সোয়ালোটেইল ইত্যাদি। বহুল দৃশ্যমান ও স্বল্প ঝুঁকিসম্পন্ন প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম Papilio demoleus (প্যাপিলিও ডেমোলিয়াস)। এটি দেশের সর্বত্র ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। বিশ্বব্যাপী মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, পাপুয়া ননিউগিনি, অস্ট্রেলিয়া ও হাওয়াই-এ দেখা যায়। লেজবিহীন হলুদ ফুটকিযুক্ত কালো প্রজাপতিটির ডানার বিস্তার ৮০ থেকে ১০০ মিলিমিটার। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। সামনের ডানার উপর ও নিচের অনিয়মিত হলুদ ডোরা ভেঙ্গে অনিয়মিত বড় ফুটকি ও কারুকাজ তৈরি হয়েছে। পিছনের ডানার ভূমিকোণ প্রান্তে লাল গোলাকার ও শীর্ষপ্রান্তে কালোর উপর নীল ফুটকি দেখা যায়। প্রজাপতিটিকে গ্রাম ও শহরের ফুলের বাগান, পার্ক, কৃষি জমি ও উন্মুক্ত বনে ব্যপকভাবে দেখা যায়। এটি দ্রুত উড়ুক্কু ও চঞ্চল; কদাচ গাছে বসে। ফুলের রস প্রধান খাদ্য। এছাড়াও দলবেঁধে ভিজা মাটির রস চোষে। বেল, পাতি লেবু, মটকিলা, বড়ই ইত্যাদি গাছে ৩০ থেকে ৪৩ দিনে জীবন চক্র সম্পন্ন করে। স্ত্রী হালকা হলুদ রঙের গোলাকার ডিম পাড়ে। প্রাপ্তবয়ষ্ক প্রজাপতির আয়ুষ্কাল মাত্র ৩ থেকে ৬ দিন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাতডোরা প্রজাপতি। ছবি- লেখক

১৩. তিতিমৌরাল (Paris Peacock): এটিরও কোনো বাংলাদেশী নাম নেই, এই নামটি পশ্চিমবঙ্গে প্রচলিত। এদেশের বিরল ও তথ্য অপ্রতুল (Data Deficient) এই প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম Papilio paris (প্যাপিলিও প্যারিস)। যদিও নথিপত্রে এটিকে একমাত্র সিলেট বিভাগে দেখার তথ্য রয়েছে কিন্তু সম্প্রতি লেখক শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতি থানার রাংটিয়া এলাকার গাড়ো পাহাড় এলাকায় পেয়েছেন। বিশ্বব্যাপী এটি ভারতীয় উপমহাদেশ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বিস্তৃত। প্রসারিত অবস্থায় বয়ষ্ক প্রজাপতির ডানার বিস্তার ৯০ থেকে ১৪০ মিলিমিটার। প্রজাপতিটির কালো ডানার উপর সোনালি-সবুজ আবির মাখানো। পিছনের ডানার উপরটায় উজ্জ্বল নীল দ্যূতি রযেছে যা পাতি পিকক (Common Peacock) থেকে বড়, বাঁকা ও অভ্যন্তরীণ প্রান্তে সুষ্পষ্ট; নীল দ্যূতি থেকে একসারি সবুজ ফুটকি ভুমিকোণের দিকে চলে গেছে। এরকম সারি সামনের ডানাতেও রয়েছে। লেজ লম্বা। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। এটি মিশ্র চিরসবুজ ও পত্রঝরা বনের বাসিন্দা। দিবাচর প্রজাপতিটি ভালো উড়ুক্কু; উড়তে উড়তে কখনো কখনো মাটির কাছাকাছি চলে আসে। ফুলের রস পছন্দ হলেও স্ত্রী-পুরুষ উভয়েই কাদামাটি ও ভিজা বালির রস চোষে। কমলা গুল্ম, সাইট্রাস ইত্যাদি গাছে ৬৯ দিনে জীবন চক্র সম্পন্ন করে। স্ত্রী পাতাপ্রতি একটি করে ঘিয়ে সাদা রঙের গোলাকার ডিম পাড়ে। 

আদমপুর বিটে প্রজাপতির ছবি তোলাশেষে লেখক। ছবি- লেখক (সেলফি) 

 

প্রজাপতি পরিবেশের সুস্থতার নির্নায়ক। প্রকৃতির সৌন্দর্য প্রজাপতি দেখে আমরা মুগ্ধ হলেও এদের প্রতি মোটেও সচেতন নই। এদেশের শিশু-কিশোর এমনকি বড়রাও সঠিকভাবে প্রজাপতি চিনেন না। তাছাড়া পরিবেশের এদের উপকারিতা সম্পর্কেও অনেকই বিশেষ কিছু জানেন না। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় উদ্ভিদ ও প্রাণী-পাখির মতো প্রজাপতিরও যে ভূমিকা রয়েছে তাও অনেকের কাছেই অজানা। বর্তমানে এদেশে কত প্রজাতির প্রজাপতি বিলুপ্তির দোড়গোড়ায় ও কতটি প্রজাতি ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে তার কোন সঠিক হিসেব নেই। তবে বিভিন্ন প্রজাতির প্রজাপতি বিভিন্ন প্রজাতির পোষক গাছ বা উদ্ভিদের উপর সরাসরি নির্ভরশীল। কাজেই এসব গাছ সংরক্ষণ করে প্রজাপতি রক্ষা করা সম্ভব। তা না হলে অচিরেই অনেক প্রজাতির প্রজাপতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

ড. আ ন ম আমিনুর রহমান : বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী, প্রাণীচিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।

;

রনথাম্বোরের রয়েল বেঙ্গল বাঘ



আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
-রয়েল বেঙ্গল বাঘের রাজকীয় চাহনি। ছবি- লেখক।

-রয়েল বেঙ্গল বাঘের রাজকীয় চাহনি। ছবি- লেখক।

  • Font increase
  • Font Decrease

দুই হাজার উনিশ সালের জুলাইয়ের ঘটনা। বর্ষায় সুন্দরবনের রূপ দেখার জন্য দশজনের টিমে ছোট্ট লঞ্চ ‘এম বি গাংচিল’-এ ওঠেছি মংলা জেটি থেকে। সকালে মেঘলা আকাশ মাথায় নিয়ে দুপুর নাগাদ হাড়বাড়িয়া ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্রে পৌঁছুলাম। ঘন্টাখানেক ঘোরাফেরার পর যখন লঞ্চে উঠব এমন সময় দু-তিন ফোঁটা বৃষ্টির পানি মাথায় এসে পড়ল। তবে সেই অর্থে বৃষ্টি হলো না। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় কটকটার উদ্দেশ্যে লঞ্চ ছাড়ল। লঞ্চ উল্টো দিকে ঘুরে জয়মনির গোল হয়ে শেলা নদী দিয়ে কটকায় যখন পৌঁছুল তখন সন্ধ্যা হয় হয়।

সুন্দরবন অভিযানের দ্বিতীয় দিন সকালের হালকা রোদের আলোয় কটকা টাওয়ারের প্রায় পঞ্চাশ গজ সামনে একটি ঝুনঝুনি বা বন অতসী গাছে সুন্দরী বায়স (সুন্দরবন ক্রো) নামের মহাবিপন্ন এক প্রজাপতির ছবি তুলছিলাম। ছবি তুলতে তুলতে উড়ন্ত পতঙ্গটির পিছু পিছু আমরা ক’জন বনের এতটাই গহীনে চলে গেলাম যে সুন্দরবনের স¤্রাটের কথা মাথায়ই এল না। প্রজাপতিটির প্রজনন ক্ষেত্র আর আমাদের জাতীয় পশু সুন্দরবনের স¤্রাট রয়েল বেঙ্গল টাইগার বা বাংলা বাঘের বাড়ি যে একই জায়গায় তা ছবি তোলায় মশগুল আমরা ক’জন খেয়ালই করিনি। অথচ এর আগে যতবার কটকা এসেছি, সবসময় স্থানটি এড়িয়ে চলেছি। সেকারণেই দেশের সবচেয়ে বিরল ও মহাবিপন্ন সুন্দরী বায়স বা সুন্দরবন ক্রো প্রজাপতির প্রজনন ক্ষেত্রটিও কখনও দেখিনি। বিশ্বের আর কোথাও এই প্রজাপতিটিকে দেখা যায় না।

রনথাম্বোরের ঘাসঝোপে রয়েল বেঙ্গল বাঘ। ছবি- লেখক।  

সেদিন সুন্দরবনের সম্রাটের বাড়িতে যা দেখলাম তাতে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। ঝুনঝুনি বাগানে মহাবিপন্ন পতঙ্গটির মেলা বসেছে যেন! মহা আনন্দে যখন ছবি তুলছিলাম, তখন আমাদের সুন্দরবন ভ্রমণের গাইড ফেমাস ট্যুর বিডির কর্ণধার তানজির হোসেন রুবেল কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলল এক ঝলকের জন্য সে ও বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী নাজিম সুন্দরবনের সম্রাটকে হেঁটে যেতে দেখেছে। রক্ত হিম করা এ সংবাদে মুহূর্তেই প্রজাপতির প্রাকৃতিক বাগান মানবশূণ্য হয়ে পড়ল। সবাই প্রাণ হাতে নিয়ে দ্রুত ঘাটে বাঁধা ইঞ্জিন নৌকার দিকে ছুটলাম কটকা অফিসের পাশে নোঙর করা ছোট্ট লঞ্চ ‘এম বি গাংচিল’-এ ওঠার জন্য। সেদিন লঞ্চের প্রায় সকলেই বাঘ আতঙ্কে ছিলাম। এরপরও দুপুরে ভয়ে ভয়ে কটকা থেকে জামতলী সমুদ্র সৈকত পর্যন্ত একবার ঘুরে এসেছিলাম, তবে সম্রাটের কোনো হদিস পাইনি।

গত আটাশ বছর ধরে নিয়মিত সুন্দরবন যাচ্ছি প্রকৃতি-পাখি-প্রজাপতি-বন্যপ্রাণী দেখতে ও ওদের ছবি তুলতে। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির বিরল ও দুর্লভ পাখি-প্রাণীর প্রচুর ছবি তুলতে পারলেও পায়ের ছাপ ও মল ছাড়া বাঘ মামার কোন ছবি তুলতে সক্ষম হইনি। বেশ কয়েকবার সম্রাটের বেশ কাছাকাছি থেকেও তাকে দেখতে ব্যর্থ হয়েছি, ছবি তোলা তো দূরের কথা। একবার বাঘের বৈঠকখানাখ্যাত কচিখালীতে এক বাঘিনীর গর্জন শুনেছিলাম। দু’বছর আগে বাঘের খোঁজে পাঁচদিন সুন্দরবন ঘুরে ব্যর্থ হয়ে ঘরে ফিরলাম। এর ঠিক একমাস পর আমাদের টিম সুন্দরবনের হোমরা বা সুন্দরী খালে গাছের ডালে বসা এক বাঘের দেখা পেল। প্রায় ঘন্টাখানেক সময় ধরে তারা ওর ছবি তুলল। কিন্তু দুর্ভাগ্য সেদিন আমি ওদের সঙ্গে ছিলাম না।

তবে, বার বার সুন্দরবন গিয়ে ছবি তুলতে ব্যর্থ হলেও ভারতের ‘রণথামভোর জাতীয় উদ্যান’ আমাকে হতাশ করেনি। ওখানে পরপর দুদিন দুটি আলাদা স্থানে গিয়ে দুটি ভিন্ন বাঘের দেখা পেয়েছি ও চমৎকার সব ছবি তুলেছি। সুন্দরবনে না দেখলেও রণথামভোরে বাঘ দেখে আমি তৃপ্ত একারণে যে, ওখানকার ও আমাদের সুন্দরবনের বাঘ জিনগতভাবে সবচেয়ে কাছাকাছি। বিশ্বের পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সমন্বয়ে সম্পন্ন এক গবেষণার ফলাফলে জিনগতভাবে রণথামবোরের বাঘের সঙ্গেই সুন্দরবনের বাঘের সবচেয়ে বেশি মিল পাওয়া গেছে। এবার রণথামভোরের বাংলা বাঘ দেখার সে গল্পই বলছি।

ঘাসবনে সচকিত বাংলা বাঘ। ছবি- লেখক।  

ফেব্রুয়ারি ২০২০ সালের ঘটনা। ছয় জনের টিমে মারুতি জিপসি গাড়িতে ভারতের রাজস্থানের সারিস্কা টাইগার রিজার্ভে ঘুরছি রয়েল বেঙ্গল বা বাংলা বাঘের সন্ধানে। এই সংরক্ষিত এলাকাটি রাজস্থানের আলওয়ার জেলায় অবস্থিত। ৮৮১ বর্গ কিলোমিটারের বিশাল বনটি কাঁটাওয়ালা শুষ্ক জঙ্গল, শুষ্ক পর্ণমোচী, তৃণভূমি ও পাথুরে পাহাড়ের সমন্বয়ে গঠিত। একসময় এটি আলওয়ার রাজ্যের শিকারের ক্ষেত্র ছিল যা ১৯৫৮ সালে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে রূপান্তরিত হয়। বর্তমানে এখানে ২০টি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বাস। তবে, সারাদিন ধরে বিশাল বনের বিভিন্ন স্থান ঘুরে বহু প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও পাখি দেখলেও বাঘের কোন চিহ্ন দেখলাম না। বিফল মনোরথ হয়ে জয়পুর শহরে ফেরত এলাম।

পরদিন সকালে জয়পুর থেকে সাওয়াই মধুপুর শহরের দিকে রওয়ানা হলাম। উদ্দেশ্য ওখানকার বিখ্যাত ‘রণথামভোর জাতীয় উদ্যান’-এ রণথামভোরের রাজা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের খোঁজ করা। এখানকার বাঘরা এ নামেই পরিচিত। দুপুরে রণথামভোর প্যালেস হোটেলে পৌঁছে ব্যাগপত্র রেখে লাঞ্চ না সেরেই ‘রণথামভোর জাতীয় উদ্যান’-এর জন্য দাঁড়িয়ে থাকা ক্যানটার-এ (ছাদখোলা ২০ জন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ট্রাক) ওঠলাম। ফোর হুইল ড্রাইভ জিপ (মারুতি জিপসি) জোগাড় না হওয়ায় বিশজনের সঙ্গে বাধ্য হয়েই ক্যান্টারে করে পার্কে ঢুকলাম। এত মানুষের সঙ্গে যে কি বাঘ দেখব সে চিন্তায়ই মন ভেঙ্গে পড়ল।

ক্যানটার এগিয়ে চলল। নানা ধরনের পাখি-প্রাণীর দেখা পাচ্ছি। কিন্তু, ছবি তোলায় মনোনিবেশ করতে পারছি না। এত কষ্ট করে এত দূর এসেও যদি রণথামভোরের রাজার দেখা না পাই তাহলে এ দুঃখ কোথায় রাখব? ক্যান্টরে ঘুরছি প্রায় ঘন্টা দেড়েক হলো। এরমধ্যে রাজার কোন গন্ধও পাচ্ছি না। ধরেই নিয়েছি আজ দেখা হবে না। কাল সকালে জিপসি পাব। কাজেই কালকের অপেক্ষায়ই থাকতে হবে। এমন সময় ফিরতি পথে আসা একটি জিপসির গাইড বলল বেশ কিছুটা সামনে ওরা মামার দেখা পেয়েছে। এটা শোনামাত্রই ড্রাইভার দ্রুত ক্যান্টর ছোটাল। পনের মিনিটের মধ্যেই আমরা জায়গামতো পৌঁছে গেলাম।

শিকার খাওয়ার পর রনথাম্বোরের ঘাসবনে ঘুমিযে থাকা বাঘ মামা। ছবি- লেখক।  

প্রাকৃতিক পরিবেশে জীবনের প্রথম মামার দেখা পেয়ে ক্যানটারের সবাই বেশ উত্তেজিত। ওখানে আরও ৪-৫টি ক্যান্টর-জিপসি দাঁড়িয়ে ছিল। আমাদের সামনে একটা ছোট খাল। সেই খালের মাঝে পাথর খ-ের উপর একটি ছোট কুমির বসে আছে। তারপর এক চিলতে জমি। ওখানে ৩-৪টি তিতির খাবার খাচ্ছে। তারও খানিকটা উপরে শুকনো ঘাসের উপর রাজকীয় ভঙ্গিতে রণথামভোরের রাজা বসে আছে। যাক, অবশেষে রাজার দেখা পেলাম। জীবনে এই প্রথম বনের খোলা প্রান্তরে সত্যিাকরের বুনো বাংলা বাঘ দেখলাম, গত সাতাশ বছর সুন্দরবন ঘুরেও যার দেখা পাইনি। বিকেলের হালকা রোদে মনপ্রাণ ভরে মামার ছবি তুললাম।

পরদিন ভোরে কনকনে শীতে আবারও ‘রণথামভোর জাতীয় উদ্যান’-এ ঢুকলাম ৬ জনের টিমে জিপসি করে। মামার খোঁজে ঘন্টাখানেক ঘোরাঘুরির পর একটি পয়েন্টে গিয়ে ৪-৫টি জিপসি একত্রিত হলো। সবাই বলাবলি করছে আশেপাশে কোথাও মামা লুকিয়ে আছেন। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি না। পাশেই একটি পুরনো একতলা বিল্ডিং। অনেক চেষ্টা-তদবিরের পর শেষমেষ বিল্ডিংয়ের ছাদে ওঠার অনুমতি মিলল। ছাদে ইতোমধ্যেই ভিড় লেগে গেছে। লম্বা লেন্সের ক্যামেরা হাতে ছাদভর্তি ব্যাঘ্র আলোকচিত্রীদের ভিড় বাড়তে লাগল। শেষ পযর্ন্ত বহু কষ্টে ছাদের একপাশে দাঁড়ানোর মতো একটা জায়গা পেলাম। যথেষ্ট ঝুঁকি নিয়ে দেহটাকে যতটা বাইরের দিকে বাঁকোনো যায় বাঁকিয়ে ১৫০-৬০০ মিমি লেন্স মামার দিকে তাক করলাম। ভাগ্য সুপ্রসন্নই বলতে হবে। সকালের তীক্ষ্ণ রোদে মামার ঝলমলে সোনালি-হলুদ বর্ণের উপর কালো ডোরা চোখে পড়ল। আর যায় কোথায়, শাটারে ক্লিকের বন্যা বয়ে গেল। এই বাঘটির চাহনি গতকালেরটির থেকেও রাজকীয়! রণথামভোরের রাজার চমৎকার কিছু ছবি তুলে জিপসি চেপে ফিরতি পথ ধরলাম।

আসছে ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস বা আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র দিবস। বাঘ সংরক্ষণে বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রতিবছর দিনটি পালন করা হয়। রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত বাঘ সম্মেলনে এই দিবসটির সূচনা হয়। সে সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী শেখ হাসিনাও উপস্থিত ছিলেন। বিশ্বব্যাপী এই দিবস পালনের মূখ্য উদ্দেশ্য বাঘের প্রাকৃতিক আবাসভূমি রক্ষা ও বাঘ সংরক্ষণের জন্য মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করে বাঘ সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারনা ও ভীতি দূর করা। বাঘ বাংলাদেশের জাতীয় পশু হওয়ায় এই দিবসের গুরুত্ব এদেশে অনেক বেশি। একসময় সারাদেশজুড়ে বাঘের উপস্থিতি থাকলেও বর্তমানে বাঘ এদেশে অত্যন্ত বিরল ও মহাবিপন্ন প্রাণী ও বিশ্বব্যাপী বিপন্ন বলে স্বীকৃত।

রনথাম্বোরের রাজা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ঝিমুনি। ছবি- লেখক।  

আগে সারাদেশের বনজঙ্গলে বাঘ বাস করলেও পঞ্চাশের দশকের পর এদেরকে সুন্দরবন ছাড়া দেশের অন্য কোথাও দেখা যায় নি। সর্বশেষ ১৯৬২ সালে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধায় শেষ গ্রামীণ বনের বাঘটি মারার পর এদেশের গ্রামে আর কোন বাঘ দেখার রেকর্ড নেই। বাংলাদেশে সর্বমোট কতগুলো বাঘ আছে এ নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। বিভিন্ন সময় এদেশের সুন্দরবনে বাঘ শুমারির মাধ্যমে ৩০০-৫০০টি বাঘের উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে ক্যামেরাট্র্যাপভিত্তিক বাঘ শুমারিতে সুন্দরবনে ১০৬টি বাঘের অস্তিত্ব ধরা পড়ে, যা ২০১৮ সালের শুমারিতে ৮% বেড়ে ১১৪টি হয়। এটিই এখন এদেশের বাঘের সর্বমোট সংখ্যা। তবে, আগের তুলনায় ইদানিং সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারনা। কারণ, গত দু’বছর ধরে প্রায়ই বাঘ সুন্দরবন ভ্রমণকারীদের নজরে আসছে। সূত্র মতে, বর্তমানে সুন্দরবনে বাঘের আরেকটি ক্যামেরাভিত্তিক শুমারি চলমান যার ফলাফল ২০১৪ সালের ২৯ জুলাই জনসমক্ষে প্রকাশ করবে বাংলাদেশ বন বিভাগ। তবে আশার কথা, সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিভাগের মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকা, যেমন- কাসালং রিজার্ভ ফরেস্ট ও সাঙ্গু-মাতামুহুরি অভয়াণ্য এবং সিলেট বিভাগের ভারতীয় সীমান্তবর্তী পাথারিয়া হিল রিজার্ভ ফরেস্টে বাঘের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

বাঘ এদেশে ব্যাঘ্র বা বাঘ মামা নামে পরিচিত। ইংরেজি নাম Tiger বা Bengal Tiger। সুন্দরনের বাঘকে Royal Bengal Tiger বলেই ডাকা হয়, যা বৃটিশদের দেয়া। ফ্যালিডি গোত্রের সদস্য বাঘের বিজ্ঞানভিত্তিক নাম Panthera tigris। পৃথিবীতে বাঘের একটিই প্রজাতি। যদিও ইতোপূর্বে বিজ্ঞানীরা বাঘকে ৮টি (তিনটি বিলুপ্তসহ) উপপ্রজাতিতে বিভক্ত করেছিলেন, কিন্তু সম্প্রতি দুটি উপপ্রজাতিতে পুনঃশ্রেণিভুক্ত করেছেন, যেমন- মহাদেশীয় (Continental- Panthera tigris tigris) ও সুন্দা (Sunda- Panthera tigris sondaica) বাঘ। মহাদেশীয উপপ্রজাতিটিকে এশিয়ার মূল ভূখণ্ডে পাওয়া যায়, যা বাংলা, মালয়ান, ইন্দোচীনা, আমুর, ক্যাস্পিয়ান (বিলুপ্ত) এবং দক্ষিণ চীনা (কার্যকরীভাবে বিলুপ্ত) বাঘের জনসংখ্যা নিয়ে গঠিত। অন্যদিকে, সুন্দা উপপ্রজাতিটিকে (যা একসময় ইন্দোনেশিয়ার সুন্দা দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন অংশে পাওয়া যেত), শুধুমাত্র সুমাত্রায় পাওয়া যায় এবং জাভা ও বালিতে বসবাসকারীগুলো বর্তমানে বিলুপ্ত।

সুন্দরবনের বাঘকে ঘিরে রয়েছে নানা গল্প, কিংবদন্তী বা মিথ (Myth)। বনের বাওয়ালি (অর্থাৎ কাঠুরে), মৌয়াল (বা মধু সংগ্রহকারী), জেলে ও আশেপাশের এলাকার লোকদের ধারণা বাঘের নাম মুখে নিলে তাকে অপমান করা হয়; এতে তাদের অমঙ্গল হবে। তাই বিভিন্ন বিশ্বাস মতে এর বিভিন্ন নাম রয়েছে। বড় মামা, বড় শিয়াল, বনরাজা, বড়কর্তা, বড় সাহেব, গাজী ঠাকুর, বড় পাইক এসবই বাঘের এক একটি নাম।

অলস ভঙ্গিতে রনথাাম্বোরের রাজা। ছবি- লেখক।  

রয়েল বেঙ্গল টাইগার বা বেঙ্গল টাইগার বিড়াল পরিবারের প্রাণী। বিজ্ঞানীদের মতে বাংলা বাঘ ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় ১২,০০০ বছর আগে আবির্ভূত হয়। বাঘের পূর্বপুরুষের নাম খড়গ-দাঁতি বা তলোয়ার-দাঁতি বাঘ (Saber-toothed tiger)। এদের উপরের চোয়ালের ছেদন দাঁত দুটো দেখতে তলোয়ারের মতো ছিল যা দিয়ে সহজেই শিকারকে বিদ্ধ করা যেত। তারপর অনেক বছর গড়িয়ে গেছে। উপরের চোয়ালের ছেদন দাঁত ছোট হয়ে বর্তমান আকারে এসেছে। উৎপত্তি হয়েছে বর্তমানকালের বাঘ প্রজাতির। এরপর উৎপত্তি হয়েছে বাঘের দুটি উপপ্রজাতি ও জনসংখ্যাগুলো; অবশ্য ইতোমধ্যে কোন কোনটি হারিয়েও গেছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও বাঘের শিকার ঘায়েল করার ক্ষমতা কিন্তু কমেনি এতটুকুও। তবে কোনো কারণে বাঘ এই দাঁত হারালে আর স্বাভাবিক নিয়মে শিকার করতে পারে না। জীবনরক্ষার জন্য তাকে বেছে নিতে হয় ভিন্ন পথ। যাক সে কথায় পরে আসছি।

বাঘ সবচেয়ে বড় বিড়ালজাতীয় প্রাণী। লেজবাদে দেহের দৈর্ঘ্য ১৪০-২৮০ সেন্টিমিটার (সেমি), লেজ ৬০-১১০ সেমি ও উচ্চতা ৯৫-১১০ সেমি। বাংলাদেশের জাতীয় পশুর দেহের লোম সোনালি বা কমলা ও তাতে চওড়া কালো ডোরা থাকে। দেহতলের মূল রং সাদা। লম্বা লেজটিতে থাকে কালো ডোরা। পুরুষের মাথার দুপাশে থাকে লম্বা লোম। চোখ অত্যন্ত উজ্জ্বল। বিশাল আকারের মাথাটা গোলাকার। ১৮০-২৮০ কেজি ওজনের বাঘ মামা অত্যন্ত শক্তিশালী। নিজের থেকে দু’তিনগুণ বেশি ওজনের পশু শিকার করে অনায়াসেই টেনে নিয়ে যেতে পারে।

সুন্দরবনের সম্রাট বাঘ নির্জন অন্ধকারাচ্ছন্ন এলাকা আর নিঃসঙ্গতা পছন্দ করে। তাছাড়া সে চলেও একা। দক্ষ সাঁতারুও বটে। মল-মূত্রের মাধ্যমে নিজের বিচরণ এলাকা চিহ্নিত করে। এই গন্ধ পেলে অন্য কোনো বাঘ সেখানে যায় না। তাছাড়া তার নির্দিষ্ট এলাকায় অন্য কোনো বাঘকে সে বরদাস্তও করে না। মূত্র ছাড়াও বাঘ গাছের বাকল আচঁড়েও নিজের সীমানা নির্ধারণ করতে পারে। বাদাবন, চিরসবুজ ও কনিফার বন, শুষ্ক কণ্টকময় বন, উঁচু ঘাসবন ইত্যাদি এলাকায় বাঘ বাস করে। দিনে কাঁটায় ভরা হেতাল গাছের আড়ালে শুয়ে থাকে। নদী বা খালের পাড়ে জন্মানো অত্যন্ত ঘন গোলপাতার বনও মামার প্রিয় জায়গা। বাঘ যেমন হিংস্র তেমনি বুদ্ধিমানও বটে। সাধারণত ভোরবেলা ও সন্ধ্যায় শিকারে বের হয়; কখনও কখনও রাতে। মামা শিকারও করে একা, আর ভোজও সাড়ে একা।

চিত্রা হরিণ, বুনো শুয়োর, বানর, সজারু, গিরগিটি, বড় পাখি ইত্যাদি প্রিয় খাবার। তবে খাদ্যের অভাবে মাছ, কাঁকড়া ইত্যাদিও খায়। তবে এরা কিন্তু জন্মসূত্রে মানুষখেকো হয় না। বরং মানুষকে এড়িয়ে চলে। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে শক্তি কমে এলে, কোনো কারণে আহত হলে (সজারুর কাঁটায় আহত হওয়াটা সচরাচর দেখা যায়), ছেদন দাঁত বা কুকুর দাঁত ভেঙ্গে গেলে, জেলে-বাওয়ালি, বাজ-ঈগল-বানরের অত্যাচারে, মৌমাছির হুলের জ্বালায় এদের মাথা ঠিক থাকে না। আর তখনই মানুষকে আক্রমণ করে। অনেক সময় বনের চরে কবর দেয়া মৃত জেলে-বাওয়ালির মাংস খেয়েও মানুষের নোনা মাংসের স্বাদ পায় যা আর কোনদিন ভুলতে পারে না। ফলে পরিণত হয় মানুষখেকোতে। সন্তানহারা বাঘিনীও রাগে-দুঃখে, প্রতিহিংসায় মানুষখেকো হতে পারে। আবার মানুষখোকো বাঘিনীর শিকার করা নরমাংস খেয়ে বাচ্চারাও যে নোনা স্বাদ পায় তার ফলে বড় হয়ে মানুষখেকোতে পরিণত হতে পারে।

মামা কখনোই পিছু হটতে জানে না। একবার কোনো শিকারকে তাক করলে ঝাঁপিয়ে পড়বেই। তবে, ব্যর্থতার বিন্দুমাত্র আশংকা থাকলে সেই শিকার ধরা থেকে বিরত থাকে। আবার নতুন করে পজিশন নেয়। শিকারের জন্য দেড়-দুই কিলোমিটার চওড়া নদীও পার হতে পারে। মামা কোনো শিকারকেই সামনের দিক থেকে ধরে না। পেছন থেকে অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়াই তার স্বভাব। তাছাড়া বাতাসের বিপরীত দিক থেকে আক্রমণ করে বলে শিকার বাঘের গন্ধ টের পায় না। দেহ বিশাল হলেও শিকার ধরার মুহূর্তে তা কুঞ্চিত করে ছোট করে ফেলে। মাটিতে কয়েকবার লেজ দিয়ে আঘাত করে। পায়ের থাবায় লুকানো নখ বের করে আনে। লেজ পাকিয়ে খাড়া করে নেয়। পায়ের তলায় নরম মাংসপিন্ড থাকায় শিকারের একবারে আগ মুহূর্তেও কোনো শব্দই হয় না। এরপর হঠাৎ করেই বিশাল এক হুংকার দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকারের উপর। শিকার ধরে তাতে দাঁত বসিয়ে টেনে শ’খানেক মিটার দূরে নিয়ে যায়। সেখানেই ভূড়িভোজ সারে। ভোজশেষে পেটপুরে পানি পান করে। তারপর দেয় লম্বা ঘুম। ভোজ একবারে শেষ করেতে না পারলে তা মাটি, পাতা দিয়ে লুকিয়ে রাখে ও অন্য সময় খায়। একবারে প্রায় ২৫-৩০ কেজি মাংস খেতে পারে। সুন্দরবনের সৌন্দর্য রয়েল বেঙ্গলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পচাব্দী গাজীর নাম। সুন্দরবনের এই কৃতি সন্তান প্রায় ষাটটি বাঘ শিকার করেছেন, যার বেশিরভাগই ছিল মানুষখেকো।

বাংলা বাঘের ছবি তোলার পর রনথাম্বোরের ঘাসবনে লেখক। ছবি- লেখক (সেলফি) 

বাঘ বছরের যে কোনো সময়ই প্রজনন করতে পারে। এ সময় মামার গগনবিদারী বা আকাশ কাঁপানো হুংকার শোনা যায়। সে হুংকারে কেঁপে ওঠে বন-জঙ্গল, খাল-নদী আর বনের পশু-পাখি। বাঘিনী ১০৪-১০৬ দিন গর্ভধারণের পর ৩-৫টি অন্ধ বাচ্চার জন্ম দেয়। এ সময় সে অত্যন্ত নিরিবিলি জায়গায় আশ্রয় নেয়। আমাদের মধ্যে একটি ধারনা প্রচলিত আছে যে, পুরুষ বাঘ বাচ্চাদের খেয়ে ফেলে, তাই বাঘের চোখকে ফাঁকি দিয়ে বাঘিনী সতর্কতার সাথে বাচ্চাদের রক্ষা করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি ঠিক নয়। কারণ পুরুষ বাঘ কখনোই তার ঔরশজাত বাচ্চাকে খায় না, বরং রক্ষা করে। তবে, সে অন্য বাঘের বাচ্চা খায়। আর একারণেই জন্মানোর পর অর্ধেক বাচ্চাও বড় হতে পারে না। বাচ্চাহারা বাঘিনী অত্যন্ত হিংস্র ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়। জন্মের প্রায় দশ দিন পর বাচ্চাদের চোখ ফোটে। এরা প্রায় আট সপ্তাহ মায়ের দুধ পান করে। এরপর মায়ের শিকার করা খাবারে মুখ লাগায়। ধীরে ধীরে মায়ের কাছ থেকে শিকার করা শেখে। বাঘিনী এক-দেড় বছর বাচ্চাদের চোখে চোখে রাখে। আর আড়াই-তিন বছর বয়সে যখন দ্বিতীয়বার এদের দাঁত গজায় তখন থেকেই এরা পুরোপুরি স্বাধীন। আর মায়ের সঙ্গে থাকে না। পুরুষ বাচ্চা ৪-৫ ও স্ত্রী ৩-৪ বছরে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়। এরা দু’তিন বছরে একবারমাত্র প্রজনন করে। বাঘ ১৫-২০ বছর বাঁচে।

একটি কথা জেনে রাখা ভালো। আমাদের দেশের চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্কগুলোতে যেসব রয়েল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে তার একটিও কিন্তু আমাদের সুন্দরবনের নয়, বরং সবগুলোই এসেছে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্ক থেকে। যদিও ভারতীয় সুন্দরবন, রণথামভোর, সারিস্কা ও অন্যান্য কয়েকটি এলাকার বাঘের সঙ্গে বাংলাদেশের বাঘের খুব মিল, কিন্তু অন্যান্য এলাকার বাঘের সঙ্গে জিনগত পার্থক্য দেখা যায়। সূত্র মতে, বর্তমানে যদিও এদেশের বাঘ রক্ষার জন্য বেশকিছু প্রকল্প চলমান রয়েছে, তথাপি এদেশের গৌরব সুন্দরবনের সম্রাট চোরা শিকারিদের হাত থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। কাজেই এ ব্যাপারে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; অন্যথায় একদিন হয়ত সুন্দরবনের সম্রাট ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ চিরতরে হারিয়ে যাবে পৃথিবীর বুক থেকে। সেটা নিশ্চয়ই কারো কাম্য নয়।

;

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে: পরিবেশমন্ত্রী



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। আরো নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরকার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। বন্যপ্রাণী রক্ষার্থে ডিজিটাল প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও গবেষণা করা হচ্ছে।

বুধবার (৬ মার্চ) দুপুরে আগারগাঁও বন অধিদপ্তরে বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস-২০২৪ উদযাপন উপলক্ষে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী এ সব কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, টেকসই অভিযোজন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে ডিজিটাল উদ্ভাবনী প্রয়োগে নাগরিক সমাজ, প্রযুক্তিবিদ এবং সংরক্ষণবাদীসহ সবাইকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।

‘মানুষ ও ধরিত্রীর বন্ধন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে ডিজিটাল উদ্ভাবন’ প্রতিপাদ্যে বন অধিদপ্তরের আয়োজনে বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস- ২০২৪ উদযাপন করা হয়।

অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন, বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমির হোসাইন চৌধুরী। ভবিষ্যত প্রজন্মের উদ্দেশে তিনি বন্যপ্রাণী হত্যা না করা এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ। তিনি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন সম্পর্কে সচেতন এবং যথাযথ আইন প্রয়োগের নির্দেশনা প্রদান করেন।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন- জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) প্রফেসর ড. মো. মোস্তফা ফিরোজ।

বন্যপ্রাণী দিবস আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন চ্যানেল আইয়ের মুকিত মজুমদার বাবু। তিনি বন সংরক্ষণে তহবিল ও বাজেটের ওপরে জোর দেওয়ার কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন- ড. আনারুল হক, অতিরিক্ত সচিব ইকবাল আব্দুল্লাহ হারুনসহ বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

অনুষ্ঠান শেষে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিষয়ক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী প্রতিযোগীদের মধ্যে সনদ ও পুরস্কার প্রদান করেন মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী।

 

;