করোনায় ফুসফুসের যত্নে করণীয়

  বাংলাদেশে করোনাভাইরাস

মেহেরুন নেসা
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

কোভিড -১৯ মূলত শ্বসনতন্ত্রে সংক্রমিত একটি রোগ। এই রোগে আক্রান্ত হলে ফুসফুসের কার্যকারিতা কমে রোগীর কাশি, শ্বাসকষ্ট এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। যাদের ফুসফুস দুর্বল তাদের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা খুবই বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, করোনা ভাইরাস দ্বারা সংক্রমনের প্রায় ৩৪% রোগীর ফুসফুসে অতিরিক্ত কফ জমা হয়, ১৯% রোগীর শ্বাসকষ্ট হয় এবং ৫% রোগীর ভেন্টিলেশন  বা লাইফ সাপোর্টের প্রয়োজন হয়।তাই জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে সার্বিক সুস্থতার পাশাপাশি ফুসফুসকেও সুস্থ রাখা যায়।

ফুসফুস সুস্থ রাখতে করণীয়ঃ

১। ধূমপান ত্যাগঃ

সবার আগে ধূমপান ত্যাগ করতে হবে। ধূমপানের ফলে নিকোটিন, টার ও কার্বন মনোক্সাইডের মতো বিষাক্ত পদার্থ ফুসফুসে প্রবেশ করে ফুসফুসের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বায়ুপথগুলোকে সরু করে ফেলে, ফলে শ্বাসকষ্ট এমনকি ক্যন্সার পর্যন্ত হতে পারে। প্রত্যক্ষ ধূমপানের পাশাপাশি পরোক্ষ ধূমপানও ত্যাগ করতে হবে, অর্থাৎ ধূমপায়ী ব্যক্তিদের থেকে দূরে থাকতে হবে। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপায়ী ব্যক্তিরা করোনায় আক্রান্ত হলে মৃত্যুর ঝুকি ১৪ গুণ বেশি বেড়ে যায়।

২। পানিঃ

ফুসফুস সুস্থ রাখতে প্রচুর পানি পান করতে হবে। দৈনিক ৬-৮ গ্লাস পানি পান করার অভ্যাস করতে হবে। তবে কিডনি রোগীরা পানির পরিমাণ চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে ঠিক করে নেবেন।

৩। খাদ্যাভ্যাসঃ

খাদ্য তালিকায় বিভিন্ন শাকসবজি ও ফলমূল রাখতে হবে। প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও এন্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। যেমন- গাজর, টমেটো, লেবু, আমলকি, পেঁপে, পেয়ারা, আনারস, কলা, ছোট মাছ, ডিম, দুধ, সামদ্রিক মাছ, তোকমা, তিশি বীজ, বাদাম ইত্যাদি। চিনি, ক্যাফেইন ও অ্যালকোহলজাতীয় খাবার পরিহার করতে হবে। শিশুর ফুসফুসের বিকাশে অবশ্যই মায়ের বুকের দুধ পান করাতে হবে।

৪। লবণ দিয়ে গরম পানি কুলকুচি করতে হবে এবং গরম পানির ভাপ নিতে হবে ৩-৪ বার। এতে ফুসফুসে কফ জমে থাকলে তা পাতলা হবে এবং শ্বাসনালী পরিষ্কার থাকবে।

৫। পরিষ্কার-পরিছন্নতাঃ

ঘরের ভিতরের পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে হবে। প্রতিদিন সকালে ঘরের দরজা জানালা খুলে দিতে হবে। এতে ঘরের ভেতরে বাতাস প্রবেশ করবে। রান্না করার সময় অবশ্যই কিচেন চিমনি বা এডজাস্টার ফ্যান ব্যবহার করতে হবে। ঘড়ের ভিতরে কাপড় শুকানো বন্ধ করতে হবে। যারা মাটির চুলা ব্যবহার করেন, তারা চেষ্টা করবেন কম ধোঁয়াযুক্ত চুলা ব্যবহার করা। বাহিরে গেলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।

৬। ঘুমঃ দৈনিক কমপক্ষে ৮ ঘণ্টা ঘুমনোর অভ্যাস করতে হবে।

৭। ব্যায়ামঃ

ফুসফুস সুস্থ রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যয়াম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সপ্তাহে কমপক্ষে ১৮০-২০০ মিনিট ব্যয়াম করলে শরীর সুস্থ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ফুসফুসও অধিক কার্যক্ষম ও সুস্থ থাকবে। বিভিন্ন ধরনের অ্যারোবিক ব্যয়ামের (জগিং, দড়িলাফ, সিড়ি উঠানামা করা, স্টেশনারি সাইক্লিং, ঘড়ের ভেতরে হাটা, নাচ) পাশাপাশি ব্রিদিং বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যয়াম খুবই গুরুত্বপূর্ণ

ব্রিদিং বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামঃ

যারা সুস্থ, এখনো করোনায় আক্রান্ত হননি বা করোনায় আক্রান্ত হয়ে আইসোলেসনে আছেন (মৃদু সংক্রমণ ৮১-৮৫%) বা হাসপাতালে ভর্তি (মাঝারি সংক্রমণ ১০-১৪%) সবার জন্যই ফুসফুসকে সুস্থ রাখতে এবং ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়াতে ব্রিদিং বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামের কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া ব্রিদিং এক্সারসাইজের মাধ্যমে এন্ডোরফিন নামক এক ধরণের হরমোন নিঃসৃত হয় যা বিষন্নতা ও দুশ্চিন্তা কমিয়ে মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় খুবই কার্যকরী। এছাড়া শরীর থেকে বিষাক্ত উপাদান (প্রায় ৭০%) বের করতে, শরীরে রক্ত চলাচলের প্রবাহ  ত্বরান্বিত করতে, হজম শক্তি বৃদ্ধিতে এবং ভালো ঘুম হওয়ার জন্য ব্রিদিং এক্সারসাইজ খুবই উপকারি।

ব্রিদিং এক্সারসাইজ করার পূর্বে অবশ্যই ঘাড়, কাঁধ ও শ্বসনতন্ত্রের  মাংসপেশিকে স্ট্রেচিং এবং সংশ্লিষ্ট জয়েন্টগুলোর মোবিলাইজেশন করে নিতে হবে। ব্রিদিং এক্সারসাইজ দিনে ৩-৪ বেলা ৫-১০ মিনিট করে করতে পারলে ভালো। তবে শুরুর দিকে ২-৩ মিনিট করে করতে পারেন এবং আস্তে আস্তে বাড়াবেন। বিভিন্ন ধরনের ব্রিদিং এক্সারসাইজ আছে। বেশ কার্যকরী ও উপকারি কিছু ব্রিদিং এক্সারসাইজ গুলো হলোঃ

(ক) ডায়ফ্রাগমেটিক বা বেলিব্রিদিং এক্সারসাইজঃ

বিছানায় সোজা হয়ে দুই হাঁটু ভাজ করে নিন। প্রয়োজনে মাথা ও হাঁটুর নিচে বালিশ রাখবেন। এবার এক হাত পেটের উপর ও এক হাত বুকের উপর রাখুন। এবার নাক দিয়ে বাতাস নিন (পেট পূর্ণ ফুলা পর্যন্ত ), ৫ সেকেন্ড বাতাস ধরে রাখুন এবং মুখ দিয়ে শিস দেওয়ার মতো ( মুখের আকৃতি O এর মতো ) করে জোড়ে বাতাস ছেড়ে দিন।

(খ) পারসড লিপ ব্রিদিং এক্সারসাইজঃ

যাদের শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমা আছে তাদের জন্য এটি বেশ উপকারি ব্যায়াম। এটি অর্ধশায়িত বা উপুর হয়ে করলে ভালো কারণ এর ফলে অধিক পরিমাণে অক্সিজেন ফুসফুসে প্রবেশ করে, এতে শ্বাসকষ্ট কম হয় এবং ফুসফুসের ভিতর জমে থাকা কফ পাতলা হয়। এটি করার জন্য নাক দিয়ে বাতাস নিন, কিছু সময় (৩-৫) সেকেন্ড বাতাস ধরে রাখুন এবং মুখ দিয়ে শিস দেয়ার মতো করে যতক্ষণ বাতাস নিয়েছেন তার দ্বিগুণ সময় ধরে বাতাস ছাড়ুন। অর্থাৎ ১:২, এর মানে যদি ২ সেকেন্ড ধরে বাতাস নেন তবে ছেড়ে দেওয়ার সময় ৪ সেকেন্ড সময় ধরে ছাড়ুন।

(গ) ইকোয়াল ব্রিদিংঃ

এটি শুয়ে, বসে যে কোন অবস্থায় করা যায়। নাক দিয়ে ৫ সেকেন্ড পর্যন্ত বাতাস নিন। কিছু সময় বাতাস ধরে রাখুন এবং নাক দিয়েই ৫ সেকেন্ড পর্যন্ত বাতাস ছাড়ুন।

 

(ঘ) ডিপ ব্রিদিং এক্সারসাইজঃ

দুই হাত বুকের উপর রেখে কনুই পেছনের দিকে করে বুক প্রসারিত করুন।এবার নাক দিয়ে গভীর শ্বাস নিন, কিছুক্ষন শ্বাস ধরে রাখুন এবং নাক দিয়ে জোড়ে শ্বাস ছাড়ুন।

(ঙ) এক্টিভ সাইকেল অব ব্রিদিং টেকনিকঃ

এটি অর্ধশায়িত অবস্থায় করলে বেশি ভালো। নাক দিয়ে জোড়ে শ্বাস নিন, ৩ সেকেন্ড ধরে রাখুন, মুখ দিয়ে জোড়ে বাতাস ছাড়ুন। এভাবে ৩ বার করুন। এবার ১০ সেকেন্ড স্বাভাবিক শ্বাস নিন। এবার আগের মত ৩ বার নাক দিয়ে গভীর শ্বাস নিন, মুখ দিয়ে ছাড়ুন। তারপর হাফিং দিয়ে জোড়ে কাশি দিন। কাশি দেওয়ার সময় কাশি শিষ্টাচার মেনে চলুন। এভাবে ২ থেকে ৩ টি চক্র পূর্ণ করুন। ফুসফুসের ভিতরে জমে থাকা কফ বের করার জন্য এটি সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।

আপনারা আপনাদের সুবিধামত ও উপযোগী যে কোনো ধরনের ব্রিদিং এক্সারসাইজ করতে পারেন ।

যেহেতু শিশুরা ব্রিদিং এক্সারসাইজ করতে চাইবে না, তাই তাদেরকে বেলুন কিনে দিয়ে, বেলুন ফুলানোতে

উৎসাহিত করুন। এটিও ভালো ব্রিদিং এক্সারসাইজ।

চেস্ট ওপেনারঃ

২ হাত শরীরের পেছনে নিয়ে হাতের আঙ্গুল গুলো একে অন্যের ফাঁকে ঢোকান। বাহু দুটি সোজা করুন, যাতে বুক প্রসারিত হয়, এ অবস্থানে থাকুন ২০-৩০ সেকেন্ড। এর ফলে বুকের মাংসপেশিগুলো প্রসারিত হবে এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের সময় অধিক পরিমাণে বাতাস ফুসফুসে প্রবেশ করবে।

করোনা আক্রান্ত রোগীর পজিশনিংঃ

যারা করোনায় আক্রান্ত হয়ে বাসায় আইসোলেসনে আছেন, অথবা হাসপাতালে ভর্তি উভয়ের ক্ষেত্রে ফুস্ফুসের কার্যকারিতা বাড়াতে অন্যান্য ব্যবস্থার পাশাপাশি শুয়ার ভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ন। ঊপুর হয়ে শুয়া বা আধা শুয়া ব্যবস্থা হলো করোনা আক্রান্তদের একধরনের স্বীকৃত পদ্ধতি। ফুসফুস পেছনের দিকে বেশি বিস্তৃত হওয়ায় এভাবে শুয়ে থাকলে ফুসফুসে অক্সিজেনের পরিমান বাড়ে, মিঊকাস নিঃসৃত হয়, শ্বাসনালী বন্ধ হওয়ার প্রবনতা কমে যায়, এতে শ্বাসকষ্ট কম হয় এবং রোগী আরামবোধ করেন।

যারা বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন তারা দিনে কয়েকবার উপুর হয়ে শুয়ে থাকবেন। যারা হাসপাতালে তীব্র শ্বাসকষ্টে ভুগছেন তাদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের(আইসিইউ) ভেন্টিলেশনে নেওয়ার আগে ১৬ ঘন্টা উপুর করে শুইয়ে রাখলে ভালো ফলাফল পাওয়া। উন্নত দেশগুলো এ পদ্ধতি অনুসরণ করে ভালো ফলাফল পাচ্ছে।

নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, সচেতন হউন, সুস্থ থাকুন।

মেহেরুন নেসা, ফিজিওথেরাপি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

আপনার মতামত লিখুন :

  বাংলাদেশে করোনাভাইরাস