Barta24

শনিবার, ১৭ আগস্ট ২০১৯, ২ ভাদ্র ১৪২৬

English

স্বাধীনতা দিবস

স্বাধীনতা দিবস
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ
ইভন ভেরা


  • Font increase
  • Font Decrease

অনুবাদ ফজল হাসান

জিম্বাবুইয়ের অন্যতম সফল ও একাধিক পুরস্কার বিজয়ী ঔপন্যাসিক, ছোটগল্প লেখক এবং শিল্পকলার পরিচালক ইভন ভেরার জন্ম ১৯৬৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর, তৎকালীন দক্ষিণ রোডেশিয়ার বুলাওয়ে শহরে। মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা বুলাওয়ের জিলিকাজি হাইস্কুলে। কানাডার ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি থেকে আন্ডারগ্রাজুয়েশন, গ্রাজুয়েশন এবং পিএইচি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরে সাহিত্যে অধ্যাপনা করেন। ১৯৯৫ সালে স্বদেশে ফিরে আসেন এবং ১৯৯৭ সালে জিম্বাবুইয়ের ন্যাশনাল গ্যালারির পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন।

ইভন ভেরার উপন্যাসের মূল বৈশিষ্ট্য কাব্যিক গদ্য ভাষা, জটিল বিষয়বস্তু, নারী চরিত্র এবং জিম্বাবুয়ের অতীত কাহিনী। তাঁর একমাত্র ছোটগল্প সংকলন ‘হোয়াই ডোন্ট ইউ কার্ভ আদার অ্যানিমেলস্’ প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে। তিনি পাঁচটি উপন্যাসের রচয়িতা। এগুলো হলো—‘নেহাদা’ (১৯৯৩), ‘উ্যইদআউট্ এ নেম’ (১৯৯৪), ‘আন্ডার দ্য টাঙ’ (১৯৯৬), ‘বাটারফ্লাই বার্নিং’ (১৯৯৮) এবং ‘দ্য স্টোন ভার্জিনস্’ (২০০২)। এসব উপন্যাসের জন্য তিনি একাধিক সম্মানিত পুরস্কার লাভ করেন। ‘উ্যইদআউট্ এ নেম’ এবং ‘আন্ডার দ্য টাঙ’ উপন্যাস দু’টির জন্য তিনি দু’বার কমনওয়েলথ্ রাইটার্স’ প্রাইজ (আফ্রিকা এলাকায়) পেয়েছেন। এছাড়া ‘উ্যইদআউট্ এ নেম’ উপন্যাসের জন্য জিম্বাবুইয়ান পাবলিশার্স’ লিটারেরি প্রাইজ, ‘বাটারফ্লাই বার্নিং’ উপন্যাসের জন্য জার্মান লিটারেরি প্রাইজ এবং ‘দ্য স্টোন ভার্জিনস্’ উপন্যাসের জন্য ম্যাকমিলান রাইটার্স প্রাইজ (আফ্রিকা এলাকায়) লাভ করেন।

আফ্রিকার নারীবাদী লেখিকা হিসেবে ২০০৪ সালে তাঁকে সুইডিশ পেন টাকোলস্কি পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। তিনি ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত ‘ওপেনিং স্পেসেস: অ্যান অ্যান্থলজি অফ কন্টেম্পোরারি আফ্রিকান উইমেন’স্ রাইটিং’ সংকলন সম্পাদনা করেন। মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে এইডস্-সম্পর্কীয় মেনিনজাইটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে ২০০৫ সালের ৭ এপ্রিল টরন্টো শহরে দেহত্যাগ করেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Oct/04/1538647860596.jpg

ইভন ভেরা

 

‘পিছে যান! পিছে যান!’ পুলিশ চিৎকার করে বলল।

ইংল্যান্ড থেকে আসা রাজপুত্তুরকে দেখার জন্য জনগণ আজ শহরের রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছে। তাদের মাতৃভূমিকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য রাজপুত্তুর এসেছে। মধ্যরাতে।

মহিলা দুশ্চিন্তামুক্ত সাদা মন নিয়ে দাঁড়ায় এবং অপেক্ষা করে। নির্ধারিত সময়ের আগে স্কুলের ছেলেমেয়েদের ছুটি দেওয়া হয়েছে এবং ওরা ফাঁকা রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়েছে। মুখের ওপর সামান্য ছায়ার জন্য ছাত্রছাত্রীরা মাথার উপর বই তুলে ধরেছে। সূর্যের তীক্ষ্ণ রোদ পিচঢালা পথে এসে পড়েছে। মাঝখানে মোটা হলুদ দাগের ওপর একজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে এবং সে দূরের পানে তাকিয়ে একটা কিছু খুঁজছে। পুলিশের পায়ে ভারী বাদামি রঙের জুতা এবং খাকি কাপড়ের পোশাক। পুলিশ হাতের বন্দুক এবং লাঠি উঁচিয়ে ছেলেমেয়েদের পেছনে সরে যেতে বলছে। ইংল্যান্ডের রাজপুত্তুর ভিড় পছন্দ করবেন না।

রাস্তার বিপরীত দিকে উঁচু গাম-ট্রির ছায়ায় মহিলারা আঞ্চলিক গান গাইছে এবং গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করছে। ভবিষ্যতকে স্বাগত জানানোর জন্য অপেক্ষারত মহিলাদের মুখমণ্ডল বেয়ে ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে। পুলিশ হাতের বন্দুক এবং লাঠি উঁচিয়ে উপস্থিত জনগণকে পেছনে সরে যাওয়ার অথবা সারি বেঁধে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিচ্ছে। হাতে নিয়ে নাড়ানোর জন্য একজন লোক এক মহিলাকে ছোট্ট একটা পতাকা দেয়। নতুন দেশের নতুন পতাকা। যুবরাজকে তার মা, অর্থাৎ রানি, পাঠিয়েছেন। তাঁর জন্য অপেক্ষারত মহিলা ক্লান্ত মুখের ওপর জাকারান্ডা গাছের একটা ভাঙা ডাল ধরে রেখেছে এবং অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

রাস্তার দু’পাশে বেগুনি রঙের ফুলে ভরা জাকারান্ডা গাছ। সেই রাস্তা দিয়ে একটা লিমোজিন গাড়ি এগিয়ে আসে। ছেলেমেয়েরা উল্লসিত হয়ে চিৎকারে চারপাশ মুখরিত করে তোলে। তারা ভেবেছে, তাদের মাতৃভূমিকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সেই সূদূর ইংল্যান্ড থেকে আসা আকাঙ্খিত মানুষ। রাস্তা পেরিয়ে চলে যাওয়া গাড়ির দিকে মহিলা তাকিয়ে থাকে। একসময় সে উপলব্ধি করে যে, মানুষের মাঝে উত্তেজনা স্তিমিত হয়ে গেছে। আসলে তা চরম উত্তেজনার মুহূর্ত ছিল না। সেটি ছিল অন্য একটা গাড়ি।

‘রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় আমরা জানব না কোন গাড়ির মধ্যে রাজকুমার আছে,’ ভিড়ের মধ্যে এক লোক বলল। ‘নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু রাস্তা দিয়ে পেরিয়ে যাওয়া প্রত্যেকটি গাড়িকে আমরা হাত নেড়ে অভিবাদন জানাব। একটা গাড়ির ভেতর রাজকুমার থাকবেন।’

‘তাহলে আপনি কী বলতে চান, আমরা যুবরাজকে দেখতে পারব না?’ মহিলা জিজ্ঞাসা করে। তার চোখেমুখে বিহ্বলতা। যেই লোক তাদের কাছে মাতৃভূমি ফিরিয়ে দিয়ে ক্ষমতার হাত বদল করবেন, তাকে একনজর দেখার জন্য সে খুব ভোরে ঘুম থেকে জেগেছে। সাইরেনের শব্দ শুনতে পেয়ে সে তাকিয়ে দেখে পুলিশের মোটরগাড়ি এবং পেছনে করেকটি গাড়ি ধীরগতিতে এগিয়ে আসছে।

‘পিছে হটো ! পিছে হটো !’ পুলিশ চিৎকার করে উল্লসিত ছাত্রছাত্রীদের বলল। তারা চলমান গাড়ির উদ্দেশ্যে ছোট্ট পতাকা নিয়ে সামনের দিকে হাত বাড়ায়।
‘কোন গাড়িতে রাজকুমার?’ মহিলা জিজ্ঞাসা করে।
‘নিরাপত্তার জন্য অবশ্যই প্রথম কিংবা দ্বিতীয় গাড়িতে নেই,’ জবাবে লোকটি বলল। ‘এবং অবশ্য সঙ্গত কারণে শেষ গাড়িতে নেই।’
তাহলে নিশ্চয়ই তৃতীয় গাড়িতে। মহিলা বড় বড় চোখ করে রঙিন কাঁচের জানালা গলিয়ে গাড়ির ভেতর কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। কিন্তু সে কিছুই দেখতে পায়নি। তবুও সবাই হাত নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছে এবং আনন্দ-উল্লাসে চিৎকার-চেঁচামেচি করছে। তারা শুধু গাড়ির জানালার রঙিন কাঁচে বেগুনি রঙের ফুলে ভরা জাকারান্ডা গাছের প্রতিবিম্বের ফাঁকে নিজেদের উত্তেজিত চেহারার প্রতিচ্ছায়া দেখতে পেল। রাজকুমার নিশ্চয়ই সেই রাস্তা পেরিয়ে চলে গেছেন। যদিও তারা তাঁকে দেখেনি, কিন্তু তিনি হয়তো তাদের দেখেছেন। ‘আপনারা কি যুবরাজকে দেখেছেন?’ বাড়ি ফেরার পথে একজন আরেকজনকে জিজ্ঞাসা করে। পরবর্তীতে অনেকে তাঁকে রাতের বেলা স্টেডিয়ামে দেখতে পাবে। মহিলা সেখানে যাবে না।

***
লোকটি এক হাত দিয়ে মহিলাকে জড়িয়ে ধরে এবং তার অন্য হাতে শীতল পানীয়ের বোতল। লোকটির সম্মুখে টেলিভিশনে অনুষ্ঠান চলছে। কিন্তু সে আগে স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের অনুষ্ঠান দেখতে চায়। ইতিমধ্যে মহিলাকে সে টাকা দিয়েছে। মহিলা টাকাগুলো একটা হলুদ রুমালে গিট্টু করে ব্রা’র ফিতার সঙ্গে বেঁধে রেখেছে। ফুটবল খেলার জন্য নির্মিত স্টেডিয়ামের ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী লোকে লোকারণ্য। প্রথমে স্টেডিয়ামের মাঝখানে প্রথাগত নৃত্য পরিবেশন করা হয়। দুশ্চিন্তামুক্ত সাদা মন নিয়ে মহিলা নিজেকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেয় এবং টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে ওঠা ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে।

নয়া প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ সময় নিয়ে বক্তৃতা করেন এবং উপস্থিত জনগণ করতালির সঙ্গে চিৎকার-চেঁচামেচি করে। উল্লসিত হয়ে তারা মুষ্ঠি উপরের দিকে তুলে আনন্দ প্রকাশ করে। নয়া প্রধানমন্ত্রী মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার সময় মহিলা নাচছিল। তিনি যখন আশু পরিবর্তনের কথা বলছিলেন, তখন লোকজন পতাকা নেড়ে তাঁকে সমর্থন জানায়। চাকুরী এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে উপার্জনের আশ্বাস প্রদান করেন। জমি-জমা এবং শিক্ষার কথাও উল্লেখ করেন, এমনকি ধনধৌলত এবং খাদ্য নিয়েও কথা বলেন। মহিলা দেখে রাজকুমার নিশ্চুপ বসে আছেন। তাঁর পরনে ধবধবে সাদা পোশাক। সরকারি লোকেরা বলেছে যুবরাজের মা, অর্থাৎ রানী, আসতে পারেননি। যাহোক, এধরনের অনুষ্ঠানে তিনি রানীর মতোই সম্মানিত এবং বিশিষ্ট ব্যক্তি। রাজকুমার সম্পর্কে নয়া প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য রেখেছেন এবং প্রত্যেকে তুমুল হাততালি দিয়ে সমর্থন জানিয়েছে।

একসময় লোকটি টেলিভিশনে অনুষ্ঠান দেখা ছেড়ে আরেক বোতল ঠান্ডা পানীয় আনার জন্য রান্নাঘরে প্রবেশ করে। সে পরিপূর্ণভাবে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করতে চায়—শীতল পানীয় এবং রমণী। তখন রাত বারোটা বাজতে দশ মিনিট বাকি। নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে মহিলা পরনের কাপড়চোপড় খুলে ফেলেছে। টেলিভিশনের পর্দায় ক্রমাগত মিনিটের সংখ্যা ভেসে উঠে। স্টেডিয়ামের মাঝখানে বিশাল পতাকা স্তম্ভের দিকে নয়া প্রধানমন্ত্রী এবং যুবরাজ হেঁটে যান। স্তম্ভের উপরে পুরনো পতাকা উড়ছে এবং নতুন পতাকা স্তম্ভের নিচে ঝুলে আছে।  লোকটি ধাক্কা দিয়ে মহিলাকে মেঝেতে সরিয়ে দেয়। সে বলবান এবং সাফল্যের মাধ্যমে নতুন যুগে প্রবেশ করবে। মহিলা পা মেলে ধরে। তখন মাঝরাত এবং নতুন পতাকা উত্তোলন করা হয়। পরিবর্তনের অলৌকিক সময়। সবুজ, হলুদ, সাদা। খাবার, ধনধৌলত, পুনরায় সমন্বয়।

একসময় লোকটি মহিলাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। যখন সে ঘুম থেকে জেগে ওঠে, তখন পুরো বাড়িটাই তার নিজের মনে হয়। জাকারান্ডা গাছের নিচে তাদের দেখা হয়েছিল। তখন তারা ইংরেজ যুবরাজের জন্য অপেক্ষা করছিল।

সকালে মহিলা দেখে ছোট্ট দুটি পতাকা ঝোপের ওপর ঝুলে আছে—একটা পুরনো পতাকা এবং একটা নতুন।

আপনার মতামত লিখুন :

একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান মারা গেছেন

একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান মারা গেছেন
একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান

একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান মারা গেছেন। শুক্রবার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

রিজিয়া রহমানের ছেলে আবদুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, নানা ধরনের স্বাস্থ্য জটিলতায় ভুগছিলেন তার মা। রক্তের সংক্রমণের কারণে ঈদের পরদিন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।  

উত্তরা ৫ নম্বর সেক্টরে বাদ আসর রিজিয়া রহমানের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। মিরপুর কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে জানান তার ছেলে।

১৯৩৯ সালে কলকাতার ভবানীপুরে রিজিয়া রহমানের জন্ম। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশে চলে আসেন।

সাহিত্যের নানা শাখায় পদচারণা থাকলেও ষাটের দশক থেকে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, রিজিয়া রহমানের মূল পরিচিতি ঔপন্যাসিক হিসেবে। সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান রিজিয়া রহমান। চলতি বছর তাকে একুশে পদক প্রদান করে সরকার।

তার উল্লেখযোগ্য গন্থগুলো হলো: অরণ্যের কাছে, শিলায় শিলায় আগুন, অগ্নিস্বাক্ষরা, ঘর ভাঙা ঘর, উত্তর পুরুষ, ধবল জোৎস্না, সূর্য সবুজ রক্ত, রক্তের অক্ষর, বং থেকে বাংলা, অলিখিত উপাখ্যান, একাল চিরকাল, হে মানব মানবী, হারুন ফেরেনি, উৎসে ফেরা।

টনি মরিসন : কৃষ্ণাঙ্গ সাহিত্যের নায়িকা

টনি মরিসন : কৃষ্ণাঙ্গ সাহিত্যের নায়িকা
টনি মরিসন

সদ্য প্রয়াত টনি মরিসন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগেই সুবিখ্যাত। বিগত আশির দশকে বিশ্ব সাহিত্যের আলোচিত লেখকদের মধ্যে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। অবহেলিত কৃষ্ণাঙ্গ এবং সেই কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে অধিকতর অবহেলিত নারী সমাজের একজন সদস্য রূপে তিনি যখন পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন, তখন সবাই সচকিত হয়ে তাকিয়ে ছিলেন তার দিকে। তার উত্থান হয়েছিল আফ্রো-আমেরিকান সাহিত্য ঘরানার নায়িকার মতো।

ক্লো আর্ডেলিয়া উওফোর্ড থেকে তিনি হয়েছিলেন টনি মরিসন। জন্ম ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৩১ আর মৃত্যু ৫ আগস্ট ২০১৯ সাল। ৮৮ বছরের জীবনের পুরোটা সময়ই তিনি কাটিয়েছেন আমেরিকায় অভিবাসন গ্রহণকারী কৃষ্ণ নাগরিকদের আইডেনটিটির সন্ধানে। তাদের শেকড় আর আধুনিক কালের জীবন সংগ্রামের প্রপঞ্চ প্রাধান্য পেয়েছে টনি মরিসনের লেখায়।

একজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মার্কিন ঔপন্যাসিক, প্রবন্ধকার, সম্পাদিকা ও বিশ্বখ্যাত প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস প্রফেসর ছিলেন তিনি। তার উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য হলো মহাকাব্যিক রীতি, তীক্ষ্ণ কথোপকথন এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ চরিত্রায়ন। তার প্রথম উপন্যাস প্রকাশ পায় ১৯৭০ সালে, নাম ‘দ্য ব্লুয়েস্ট আই’। অন্যান্য বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর মধ্যে টনি মরিসনের ‘সুলা’ (১৯৭৩), ‘সং অব সলোমন’ (১৯৭৭) এবং সবচেয়ে আলোচিত ‘বিলাভেড’ (১৯৮৭) অন্যতম।

১৯৮৮ সালে মরিসন তার ‘বিলাভেড’ উপন্যাসের জন্য পুলিৎজার পুরস্কার এবং আমেরিকান বুক এওয়ার্ড বিজয়ী হন। এই গ্রন্থ ও পুরস্কারের মাধ্যমে তিনি বিশ্ব সাহিত্যের আলোচনায় চলে আসেন এবং তার নাম নোবেল পুরস্কারের মনোনয়ন তালিকায় আসতে থাকে। মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় ১৯৯৩ সালে তিনি সাহিত্যের নোবেল পুরস্কারটি অর্জনও করেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/08/1565276118367.jpg
◤ নোবেল প্রাইজ গ্রহণ করছেন টনি মরিসন ◢


টনি মরিসন নোবেল পেয়েছেন নোবেল কমিটির পুরস্কার কাঠামোর ধ্যান-ধারণা ভেঙে। কারণ, পুরস্কারদাতা আলফ্রেড নোবেল তার উইলে বলে গিয়েছিলেন, এই পুরস্কার যিনি পাবেন, তাকে অবশ্যই আদর্শিক কিছু করে দেখাতে হবে। প্রথমদিককার নির্বাচকমণ্ডলী তার কথাগুলোকে আঁকড়ে ধরে ছিলেন গোঁড়াভাবে। তাই তারা শুধুমাত্র আদর্শিক দিকটিই চিন্তা করেছেন। অনেক বিখ্যাত সাহিত্যিক, যারা হয়তো বড় কোনো আদর্শের জন্ম দিতে পারেনি, তারা নোবেল পুরস্কার পায়নি। সাহিত্যে স্মরণীয় হলেও আদর্শের প্রশ্নে পুরস্কার না দেওয়ার নীতির জন্য নোবেল পুরস্কার বহুবারই বিতর্কিত হয়েছে।

যে কারণে লিও তলস্তয়, হেনরিক ইবসেনের মতো সাহিত্য ব্যক্তিত্ব কিংবদন্তিতুল্য হয়েও নোবেল না পাওয়ায় নোবেল পুরস্কারের ইতিহাস কলঙ্কময় হয়েছে। অবশ্য পরবর্তীকালে পুরস্কারের নির্বাচকরা আরো উদার হয়েছেন। আদর্শিক নয় বরং কার সাহিত্য সকল যুগে মানুষের আবেগের ইন্ধন যোগাবে অর্থাৎ কোনটি অমরত্ব অর্জন করবে তার ভিত্তিতেই নির্বাচন করা হচ্ছে বিজয়ীদের। যে কারণে এমন অনেকে পুরস্কার পেয়েছেন যারা অতটা জনপ্রিয় বা পরিচিত নন, কিন্তু সাহিত্যে অভিনবত্ব ও সৃষ্টিশীলতার জন্য খ্যাত। এ তালিকায় ১৯৯৭ সালে নোবেল প্রাপ্ত দারিও ফো এবং ২০০৪ সালের পুরস্কৃত এলফ্রিদে ইয়েলিনেক-এর নাম করা যায়। টনি মরিসন তেমনই একজন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/08/1565276370185.jpg

◤ এলফ্রিদে ইয়েলিনেক┇দারিও ফো ◢


সাহিত্যকে আদর্শবাদের কাল্পনিক আখ্যান তৈরির জায়গা থেকে সরিয়ে টনি মরিসন নিরেট বাস্তবের পটভূমিকায় নিয়ে আসেন। আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ জাতিসত্তার জীবন ও সংগ্রাম তিনি তুলে আনেন নিউইয়র্কের পথে পথে হেঁটে, কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত হার্লেম এলাকার তস্য গলির ভেতর থেকে। আমেরিকান তথা বিশ্ব সাহিত্যে ‘ব্ল্যাক ভয়েজ’কে জায়গা করে দিতে তার রয়েছে অনবদ্য অবদান। আফ্রিকান কমিউনিটিকে আধুনিক সাহিত্যে প্রতিস্থাপনের কষ্টকর কাজে টনি মরিসনের গভীর অনুসন্ধানের তুলনা মেলা ভার।

প্রবর্তনের পর থেকে এখন পর্যন্ত যে ১১৫ জন সাহিত্যিক নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, তাদের মধ্যে দুইজন নোবেল প্রত্যাখান করেন। অনেকে ধারণা করেছিলেন টনি মরিসন হবেন পুরস্কার প্রত্যাখ্যানকারী তৃতীয় জন। এমনটি হলে তিনি নাম লেখাতেন রুশ সাহিত্যিক বরিস পাস্তেরনাক ও ফরাসি পণ্ডিত জ্যাঁ পল সার্ত্র’র সাথে।

বরিস পাস্তেরনাক ১৯৫৮ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হলে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকারের চাপে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। এ ঘটনার ছয় বছর পর ১৯৬৪ সালে জ্যাঁ পল সার্ত্র এই পুরস্কারে ভূষিত হলেও তিনি তার পূর্ববর্তী সকল সরকারি সম্মাননার মতো এই পুরস্কারও প্রত্যাখ্যান করেন। আফ্রিকান সাহিত্যিকদের অবমূল্যায়ন এবং আফ্রো ইস্যুগুলোকে অবহেলার অভিযোগে টনি মরিসন পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করতে পারেন বলে অনেকেই মনে করেছিলেন। কারণ টনি মরিসন সবসময়ই সোচ্চার ছিলেন সাহিত্যে কালো মানুষদের অধিকার ও ন্যায্য আসনের দাবিতে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/08/1565276228836.jpg

◤ বরিস পাস্তেরনাক┇জ্যাঁ পল সার্ত্র ◢


তবে টনি মরিসন ও আরো অনেকের মনোভাবের কাছে নতি স্বীকার করে নোবেল পুরস্কার রক্ষণশীল মূলনীতি থেকে সরে এসেছে। আদর্শবাদের নামে ইউরোপীয়-প্রধান ভাষার সাহিত্যকে পৃষ্ঠপোষকতা করার একচ্ছত্র মনোভাব নোবেল কমিটিকে ছাড়তে হয়েছে। পৃথিবীর প্রায়-সকল দেশের সাহিত্যের প্রতি তাদের নজর দিতে হচ্ছে। লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, মিশর, তুরস্ক, বেলারুশের সাহিত্য প্রতিভাকেও নতজানু হয়ে সম্মান জানাতে হচ্ছে।

১৮৩৩ সালে সুইডেনের স্টকহোমে জন্মগ্রহণকারী রসায়নবিদ, প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক আলফ্রেড নোবেল জীবনে অনেকগুলো উইল করে গিয়েছিলেন, নোবেল পুরস্কার এর মধ্যে অন্যতম। ১৮৯৪ সালে তিনি একটি বফর লোহা ও ইস্পাত কারখানা ক্রয় করেন, যেটিকে পরবর্তী সময়ে একটি অন্যতম অস্ত্র তৈরির কারখানায় পরিণত করেন। তিনি ব্যালিস্টিক উদ্ভাবন করেন, যা সারা বিশ্বব্যাপী ধোঁয়াবিহীন সামরিক বিস্ফোরক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তার ৩৫৫টি উদ্ভাবনের মাধ্যমে তিনি জীবদ্দশায় প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হন যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল ডিনামাইট।

১৮৮৮ সালে তিনি তার উদ্ভাবিত যুদ্ধাস্ত্রের মাধ্যমে মৃতদের তালিকা দেখে বিস্মত হন, যা একটি ফরাসি পত্রিকায় তাকে ‘এ মার্চেন্ট অব ডেথ হু ডেড’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। যেহেতু নোবেলের ভাই লুডভিগও মারা যায়, ফলে এই নিবন্ধটি তাকে ভাবিয়ে তোলে এবং খুব সহজেই বুঝতে পারেন ইতিহাসে তিনি নিকৃষ্টরূপে স্মরণীয় হতে চলেছেন। যা তাকে বারবার উইল পরিবর্তন করতে অনুপ্রাণিত করে।

ফলে নোবেল তার জীবদ্দশায় অনেকগুলো উইলের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষটি রচনা করেন মৃত্যুর মাত্র এক বছর আগে ২৭ নভেম্বর ১৮৯৫ সালে। প্যারিসে অবস্থিত সুইডিশ-নরওয়ে ক্লাবে রচিত হয় এই উইল। বিস্ময় ছড়িয়ে দিতে নোবেল তার সর্বশেষ উইলে উল্লেখ করেন, তার সকল সম্পদ পুরস্কার আকারে দেওয়া হবে তাদেরকে, যারা রসায়ন শাস্ত্র, পদার্থ বিদ্যা, চিকিৎসা, শান্তি ও সাহিত্যে ‘বৃহত্তর মানবতার স্বার্থে’ কাজ করবেন। একজন বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবক হয়েও তিনি ‘বৃহত্তর মানবতার স্বার্থে’ কাজ করতে পারেননি, যারা তা করেছেন বা করবেন নোবেল তাদের পুরস্কৃত করার ব্যবস্থা করে গেছেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/08/1565276474241.jpg

◤ আলফ্রেড নোবেল ◢


নোবেল তার মোট সম্পদের (৩১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা) ৯৪ শতাংশ এই পাঁচটি পুরস্কারের জন্য উইল করেন। ২৬ এপ্রিল ১৮৯৭ সালের আগ পর্যন্ত সন্দেহপ্রবণতার জন্য নরওয়ে থেকে এই উইল অনুমোদন করা হয়নি। নোবেলের উইলের সমন্বয়কারী রগনার সোলম্যান ও রুডলফ লিলজেকুইস্ট পরে নোবেল ফাউন্ডেশন তৈরি করেন, যা নোবেলের প্রদত্ত সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ ও নোবেল পুরস্কার অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

১৮৯৭ সালে নোবেলের উইল অনুমোদন হবার সাথে সাথেই নোবেল পুরস্কার প্রদানের জন্য নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি নামক একটি সংস্থা তৈরি করা হয়। অতি শীঘ্রই নোবেল পুরস্কার দেবার অন্যান্য সংস্থাগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। নোবেল ফাউন্ডেশন কিভাবে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হবে তার একটি নীতিমালায় পৌঁছায় এবং ১৯০০ সালে নোবেল ফাউন্ডেশন নতুনভাবে একটি বিধি তৈরি করে, যা রাজা অস্কার কর্তৃক জারি করা হয়। ১৯০৫ সালে সুইডেন ও নরওয়ের মধ্যে বন্ধন বিলুপ্ত হয়। তার পর থেকে নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি শুধুমাত্র শান্তিতে নোবেল পুরস্কার এবং সুইডেনের প্রতিষ্ঠানগুলো অন্যান্য পুরস্কারগুলো প্রদানের দায়িত্ব পায়।

আলফ্রেড নোবেলের যুদ্ধাস্ত্র ছাপিয়ে তার পুরস্কার তাকে স্মরণীয় করে রেখেছে। মেরি কুরি, টনি মরিসন এবং আরো শত শত পণ্ডিত, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক এই পুরস্কার গ্রহণ করে ১০ ডিসেম্বর ১৮৯৬ সালে ৬৩ বছর বয়সে তার নিজ গ্রাম স্যান রিমোতে মৃত্যুবরণকারী আলফ্রেড নোবেলকে বাঁচিয়ে রেখেছেন ইতিহাসের পাতায়।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র