রিডিফাইনিং ইন্ডিয়া : বাংলা ও ভারতীয় ইতিহাস চর্চায় বহুমাত্রিক পাঠ

ফাহমিদা তাপসী
রিডিফাইনিং ইন্ডিয়া বইয়ের প্রচ্ছদ

রিডিফাইনিং ইন্ডিয়া বইয়ের প্রচ্ছদ

  • Font increase
  • Font Decrease

‘রিডিফাইনিং ইন্ডিয়া’ ভারত ও বাংলার ইতিহাস চর্চায় নবতর সংযোজন। ভারতের ঔপনিবেশিক ও উপনিবেশোত্তর কালপর্বের নানা দিক নিয়ে মোট ১৫টি প্রবন্ধ এ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। প্রবন্ধগুলোতে ঔপনিবেশিক বাংলার ইতিহাস প্রসঙ্গ; মীর মশাররফ হোসেনের সাহিত্য চর্চার বিবর্তন, বাংলার রেশম শিল্পের আধুনিকীকরণে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা উপস্থাপিত হয়েছে। বইটিতে এক মলাটের মধ্যে ভারত ও বাংলার ইতিহাস, লৈঙ্গিক ইস্যু, স্থাপত্য, ধর্ম এবং অর্থনীতি বিষয়ে আলোচনা উপস্থাপিত হয়েছে। বইটি যেমন পাঠক, গবেষকদের কৌতূহল মেটাবে তেমনি আরো নতুন গবেষণার ক্ষেত্র উন্মোচন করবে। পাঠক, শিক্ষার্থী ও গবেষক সবাই গ্রন্থটি থেকে উপকৃত হবেন।

রিডিফাইনিং ইন্ডিয়া বইতে ড. অমিত দে তার প্রবন্ধে দেখিয়েছেন বিংশ শতকের বাংলার ইসলামীকরণ প্রক্রিয়া এবং সে প্রেক্ষিতে বাংলার মুসলমানদের রাজনীতিকরণের ইতিহাস বুঝতে মীর মশাররফ হোসেনের সাহিত্যচর্চার সৃজনশীল থেকে আরোপিত ধারায় বিবর্তন সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

ড. শেখর শীল ঊনিশ শতকের বাংলার সমাজ সংস্কার নিয়ে আলোচনা করেছেন। বেশিরভাগ সংস্কার উদ্যোগই ছিল নারীদের কেন্দ্র করে। কিন্তু সব সংস্কারই শুরু করেছিলেন পুরুষ সংস্কারকরা এবং পুরো যাত্রাতে নারীদের নিজেদের কণ্ঠস্বর প্রায় ছিলই না।

ড. রবের্তো দাভিনি তার প্রবন্ধে দেখিয়েছেন—অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কোর্ট অব ডিরেক্টররা বুঝতে পারছিলেন যে বাংলা থেকে আমদানি করা সিল্কের বিক্রি বৃদ্ধি করতে হলে বাংলার প্রথাগত রিলিং পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। তাই বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা হাসিল করার পর তারা বাংলার রেশম শিল্পের আধুনিকীকরণে বড় পদক্ষেপ নেয় ও স্থানীয় উৎপাদকদের ওপর ইউরোপীয় পদ্ধতি চাপিয়ে দেয়।

চতুর্থ প্রবন্ধটির লেখক ড. গিরীশ চন্দ্র পাণ্ডে প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি উৎস ব্যবহার করে অষ্টাদশ শতকের বেনারসের দস্যু দলগুলোর বিবর্তন এবং তাদের সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক গুরুত্ব আলোচনা করেছেন।

ড. পি এস হরিশ দক্ষিণ ভারতের শ্রীরঙ্গপাট্টানাম দুর্গ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক ও প্রতিরক্ষা স্থাপনার প্রেক্ষিত থেকে আলোচনা করেছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হায়দার আলী, টিপু সুলতান দুর্গে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটান এবং কৌশলগত অবস্থানে দুর্গটিকে অত্যন্ত শক্তিশালী করে তোলেন যেন ব্রিটিশসহ সব ধরনের বহিঃআক্রমণকে রুখে দেওয়া যায়।

ড. কে. মাভালি রাজন মধ্যযুগে দক্ষিণ ভারতে মন্দিরের নানাবিধ ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেছেন। মন্দিরগুলো ছিল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র, আশেপাশের মানুষের জীবনের সব বিষয়েরই মূল কেন্দ্র ছিল মন্দির।

ড. সৌরভ কুমার রাই দেখিয়েছেন ঔপনিবেশিক আমলে বায়োমেডিসিনের আধিপত্যের প্রেক্ষাপটে ভারতে আয়ুর্বেদিক ঔষধবিদ্যার ‘অতীত গৌরব’ ফিরিয়ে আনার ধারণা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। আয়ুর্বেদের প্রবক্তা এবং চর্চাকারীরা তাদের চিকিৎসাবিদ্যার গণ্ডি ছেড়ে ‘নেশন’ তৈরির প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন।

শুভনীত কৌশিক আলোচনা করেছেন ১৯৩৮ সালের হেলথ সাব-কমিটি অব ন্যাশনাল প্লানিং কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে। স্বাস্থ্যবীমা, মা শিশুর যত্ন বিষয়ে এই প্রতিবেদন সোভিয়েত রাশিয়া ও ইংল্যান্ডের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে প্রেরণা নিয়েছিল।

ড. অনিকেত তথাগত ছেত্রী তার প্রবন্ধে দেখিয়েছেন মঙ্গলকাব্যের পারফর্মিং চরিত্রের কারণেই বাংলায় এর জনপ্রিয়তা বেড়েছিল। মঙ্গলকাব্যের গীত-পালা গ্রামের মানুষের জন্য উপার্জনের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল। একারণেই এই কাব্য রচনায় পণ্ডিত নয় বরং গ্রাম্য বাহ্মণরাই মুখ্য ভূমিকা রেখেছিল।
মোইচিংমায়ুম মুশতাক আলিশ আইজাজা লিখেছেন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ভূভাগের মনিপুরের প্রাণিকূলের বৈচিত্র ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে।

ড. ফখরুল ইসলাম লস্কর ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে আসামের মানুষ কেমন সাড়া দিয়েছিল এবং কিভাবে অংশগ্রহণ করে সে সম্পর্কে অনুসন্ধান করেছেন। একইসঙ্গে তিনি আন্দোলনের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ প্রশাসনের সহিংসতা ও নিষ্ঠুর দমন অভিযানকে নথিপত্র ঘেঁটে তুলে এনেছেন।

শংকর কুমার বসু ও ড. নিরুপম খনিকার আলোচনার সূত্রপাত করেছেন আহোম রাজধানী ঘরগাওয়ের কাছে ধিতাইফুরি গ্রামে পাওয়া মুদ্রাকে কেন্দ্র করে। লেখকদ্বয় সংশ্লিষ্ট শাসনামলে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে আহোম রাজত্বের রফতানি বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা করেছেন।

শানজিদ অর্ণব তার প্রবন্ধে আলোচনা করেছেন ভারত ও হিন্দুধর্ম নিয়ে প্রাথমিকালে মুসলমানদের ধারণা নিয়ে। আরবরা ভারতের বিজ্ঞান, দর্শন, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ের জ্ঞানকে গ্রহণ করেছিল। প্রাথমিককালে ভারতের মুসলমানদের অনেকে ব্রাহ্মণদের জ্ঞানের প্রশংসা করেছেন। লেখক ভারত ইতিহাসের অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত এই অধ্যায় নিয়ে আলোচনা করেছেন।

শ্রেয়া রায় আলোচনা করেছেন ‘নওয়াবদের শহর’ বলে পরিচিত লখনৌ নিয়ে। এই প্রবন্ধে লেখিক ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ পরবর্তী ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে লখনৌ শহরের নগর সংস্কৃতি ও প্রশাসন নিয়ে আলোচনা করেছেন।

বইয়ের সর্বশেষ প্রবন্ধটির লেখক সংযুক্তা দে। তিনি আলোচনা করেছেন বাংলার ধর্মীয় ঐতিহ্য নিয়ে। এই প্রবন্ধে তিনি বাংলার দেবীদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত ও অজানা অনেক তথ্য অনুসন্ধান করেছেন।

প্রবন্ধকারগণ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজের অধ্যাপক, ইতিহাস গবেষক ও লেখক।

‘রিডিফাইনিং ইন্ডিয়া’ গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস গবেষক রাহুল কুমার মোহন্ত। তিনি ইন্ডিয়ান হিস্টরি কংগ্রেস ও ঢাকার ইতিহাস একাডেমির সদস্য। রাহুল কুমার মোহন্ত ‘এক্সপ্লোরিং বেঙ্গল’ নামেও একটি গ্রন্থের সম্পাদনা করেছেন।
‘রিডিফাইনিং ইন্ডিয়া’ বইটি প্রকাশ করেছে নয়া দিল্লির কুমুদ পাবলিকেশনস। বইটি অ্যামাজন ডট ইনে পাওয়া যাচ্ছে।

অ্যামাজনে বইটির হদিস পেতে এখানে ক্লিক করুন।

আপনার মতামত লিখুন :