দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান



মহীবুল আজিজ
গ্রাফিক্স: বার্তা২৪.কম

গ্রাফিক্স: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

লুইগি ডাক্তার বলেই যখন সুবর্ণদ্বীপে চিকিৎসা না পেয়ে একজন রোগি মারা পড়ে, তার হতাশা সীমা ছাড়িয়ে যায়। তা-ও আবার সন্তানসম্ভবা মেয়ে। দ্বীপে এমনিতে কোন ডাক্তার কখনও ছিল না কিন্তু রোগশোকের প্রতিষেধে তা বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি। লোকেরা তাদের নিজেদের প্রয়োজনে নিজেদের মত করে কাজ চালাবার মত করে এক ধরনের চিকিৎসাবিদ্যার প্রয়োগ শিখে নিয়েছিল। অথবা কয়েকজন লোক এই পেশার জায়গাটা পুরোপুরি ফাঁকা দেখে নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে চিকিৎসার তৎপরতা শুরু করে দিয়েছিল। কেউ তাদের কাছে জানতে চায় নি, আপনি কোত্থেকে পাশ করেছেন বা আপনার ডিগ্রিটা কোন্ পর্যায়ের? তারা এই কাজ আরম্ভ করবার আগে পান দোকানদার আবদুল গনি হাওলাদারের কাছ থেকে ঔষধ কিনতো। গনির দোকানে বিক্রি হতো পান, সিগ্রেট, কলা, বিস্কিট, চা এবং চার ধরনের প্রয়োজনীয় ঔষধ- প্যারাসিটামল, হিস্টাচিন, এ্যান্টাসিড এবং মেট্রোনিডাজল। গনি নিজে বলে সে অষ্টম শ্রেণি পাশ কিন্তু সেটাও সন্দেহাতীতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এক রোগিকে পেটের গ্যাসের সমস্যায় সে দিয়ে দেয় হিস্টাচিন। ফলে, সে খালি ঘুমায় কিন্তু ঘুমায় পেটের ব্যাথা নিয়ে। শেষে তার প্রায় মরনদশা। বলে, গনি আমারে কী অষুধ দিল চোহে খালি ঘুম আহে। দু’টো ট্যাবলেটের প্রায় একই রকম প্যাকেট হওয়ায় ভুল গনিরই হয়। কিছুকাল পরে দ্বীপে একজন পুরুষ এবং একজন মহিলা ডাক্তারের আবির্ভাব ঘটে। পুরুষ ডাক্তার পেটের ব্যাথায় এক আশ্চর্য নিরাময়-পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটাতে শুরু করলে তা নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য জেগে ওঠে। ব্যাথার জায়গাটাতে পায়ের গোড়ালি দিয়ে অনেকটা সময় ধরে চেপে ধরে রাখলে ব্যাথা বিদায়। লোকদের অনেকেই বলল, ব্যাথা যাচ্ছে, আবার অনেকেই বলে, ব্যাথা বাড়ছে। এই কমা আর বাড়া নিয়েই তার দিনকাল একরকম কেটে যেতে থাকে। মহিলা ডাক্তার মেয়েদের চিকিৎসায় কী পদ্ধতির আশ্রয় নেয় সেটা জানা দুঃসাধ্য যেহেতু অন্তঃপুরে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণাধীন। তবু যে-জনশ্রুতি অন্তঃপুর থেকে কালক্রমে এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে পড়ে তা থেকে জানা যায়, একধরনের মন্ত্রপূত পানিই মহিলা চিকিৎসকের সর্বরোগহর অবলম্বন। সেক্ষেত্রেও একই কথা প্রয়োজ্য- রোগ ভাল হয় এবং হয় না। এই হওয়া না-হওয়া নিয়ে তারও দিন একরকমভাবে কেটে যায়। 

কিন্তু কারও পক্ষেই আবুল খায়েরের স্ত্রী ফুলবানুকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। গোলাম কবিরের কাছে লক্ষণ জেনে লুইগির ধারণা হয়, ফুলবানু সম্ভবত এ্যাকলেমসিয়া বা প্রি-এ্যাকলেমসিয়ায় মারা গেছে। লুইগির হতাশা এ-কারণেই, ডাক দিলে শোনা যেত এমন দূরত্বে থেকেও সে বাঁচাতে পারে নি একজন মানুষকে। অথচ এটি কোন দুরূহ বা দুশ্চিকিৎস্য রোগ মোটেও ছিল না। সে বাঁচাতে পারে নি মানে তার পক্ষে প্রচেষ্টা নেওয়াই সম্ভব হয় না। মরে গেলেও তারা কখনও একজন পুরুষ ডাক্তারের কাছে মেয়েদের নিয়ে যাবে না। তার সংকট দেখে তার এক প্রতিবেশী খবর দেয় গোলাম কবিরকে। কবির বলল, নিরাময়ে চলো, বিদেশি ডাক্তার দেইখা দিবো নে। একে পুরুষ, তার ওপর বিদেশি, প্রাণ গেলেও তারা আসবে না নিরাময়-কেন্দ্রে। প্রাণই গেল ফুলবানুর। দ্বীপে একজন মহিলা ডাক্তারের অভাব প্রবলভাবে অনুভব করে লুইগি। বিস্তারিত জানিয়ে সে তার সদর দফতরে বার্তা পাঠায়। প্রত্যুত্তরে তারা জানায়, এত-এত মানুষ একটা দেশে, হয়তো পৃথিবীর সবচাইতে ঘনবসতিপূর্ণ একটা দেশ অথচ একজন মহিলা ডাক্তার পাওয়া কেন যায় না! একজন স্বদেশি মহিলা ডাক্তারকে সেখানে নিয়োগ দেওয়াটাই সবচেয়ে শ্রেয়। লুইগি তখন চেষ্টা-তদবির চালাতে থাকে একজন মহিলা ডাক্তারের খোঁজে। পরিচিত যারা শহরাঞ্চলে থাকে তাদের মাধ্যমে খোঁজখবর নিয়েও একজন মহিলা ডাক্তার মেলে না। নিমরাজি একজনকে পাওয়া যায় যিনি তাঁর জেলা-সদর ছেড়ে হলেও ছোট্ট থানাটিতে আসতে আগ্রহী কিন্তু তাঁর ব্যাংকার স্বামীর উপযুক্ত চাকরি দ্বীপটিতে না-থাকায় তিনি নিরুপায়। যদি দ্বীপে সেই ব্যাংকের একটি শাখা খোলা যায় এবং সেখানে তাঁর স্বামীকে সেটির ব্যবস্থাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যায় তাহলে তিনি দেশসেবার ব্রতে আত্মনিয়োগের চিন্তা করতে সম্মত আছেন। সাহসিকা একজনকে পাওয়া যায়- কিন্তু সেক্ষেত্রেও সমস্যা থাকে। মেয়েটি বছরখানেক আগেই তার ডিগ্রিটি অর্জন করেছে। এখন তার বিবাহের প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত তাকে প্রায়ই শহরে ছুটতে হবে, কেননা, সম্ভাব্য পাত্রপক্ষ কখনই এরকম দ্বীপে আসতে চাইবে না। তাছাড়া সে জানে, দ্বীপে অবতরণকালে লোকেদের কাদামেখে বা কাদা-লেপ্টালেপ্টি হয়ে তবে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। হতাশায় মনটা ছেয়ে গেলেও হতোদ্যম হয় না লুইগি। গোলাম কবিরের মাধ্যমে সে খোঁজ নিয়ে জেনেছে, দ্বীপের দু’টি ছেলে এবং তিনটি মেয়ে প্রতিবেশী জেলা সদরের কলেজে প্রথম ও শেষ বর্ষে পড়ছে। তাদের মধ্যে দু’জন বিজ্ঞানের ছাত্র। ভাল ফল করে তারা যদি ডাক্তার হতে পারে তাহলে নিশ্চয়ই তারা তাদের হিতৈষণা দ্বীপটির জন্যে নিয়োগ করবে। আবার, এমনও ভয় তার জাগে, দ্বীপের অনেকের স্বপ্নই নাকি লেখাপড়া শিখে চিরদিনের জন্যে দ্বীপ ত্যাগ করে চলে যাওয়া। তাদের ধারণা, দ্বীপটি আকস্মিকভাবে ডুবে গেলে তাদের লেখাপড়া-জ্ঞানগম্যি কিছুই আর কাজে লাগবে না।

আরও পড়ুন: দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান (পর্ব-১)

লোকেরা যে সবসময় হতোদ্যম এবং অদৃষ্টের হাতে সমর্পিত সেটাও সত্যি নয়। সন্তানসম্ভবা মেয়েটির মৃত্যু হৃদয়বিদারক হলেও সেটি এক ধরনের দৃষ্টি-উন্মোচক দৃষ্টান্তরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। লোকেরা একটু-একটু করে প্রশ্নশীল হতে থাকে। তারা সর্বরোগহর মন্ত্রপূত পানিকে বিনা প্রশ্নে মেনে নিতে নারাজ। আরও এক গর্ভবতী মেয়ের ঝুঁকি দেখা দিলে তার পরিবারের লোকজন তাকে নিয়ে রওনা দেয় প্রতিবেশী জেলা-শহরের দিকে। যদিও সেটি মফস্বল শহর তবু সেখানে ক্লিনিক এবং ডাক্তার মেলে। কিন্তু সুবর্ণদ্বীপ থেকে চাইলেই সেখানে যাওয়া সম্ভব নয়। আর সেটি যদি হয় সূর্য ডুবি-ডুবি করে এমন সময়ে। প্রথমে তারা বোরখাবৃত মেয়েটিকে ওঠায় একটা ভ্যানগাড়িতে। সেখান থেকে যায় ঘাটের দিকে যেখানে ছিল একটা স্পিডবোট। তখন শরৎকালের আকাশে ছিল হাল্কা মেঘের আনাগোনা। হয়তো এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল, তারপর আকাশ ফর্সা। নদী-সাগরের সংযোগস্থল যে-জায়গাটাকে তারা বলে চ্যানেল সেটাও প্রশান্ত। ভ্যান থেকে তাকে ওঠানো হলো স্পিডবোটে। একটুখানি দুলুনি দিয়ে চলতে আরম্ভ হলো বোট। ঝড়ো হাওয়া থাকলে আধাঘণ্টার পথের জন্যে লেগে যায় প্রায় এক ঘণ্টা। হঠাৎই কোত্থেকে এক উটকো মেঘ এসে অশনির মত দাঁড়ায় তাদের মাথার ওপরে। খানিকটা দমকা হাওয়ার মত উঠে যাত্রীসহ গোটা স্পিডবোটকে দেয় কাঁপিয়ে। ভয়ে গর্ভবতী মেয়েটির সমগ্র সত্তা কেঁপে ওঠে। কম্পমান মেয়েটি তার অভ্যন্তরে কেমন যেন এক অব্যক্ত বেদনা বোধ করতে থাকে। সেটি যে প্রসববেদনাই সেটা সঙ্গে-সঙ্গে তার বোধিতে আসে না যেহেতু সেটাই ছিল তার প্রথম সন্তানের অভিজ্ঞতা। বোটের মধ্যেই তার সন্তানের জন্ম হয়ে যায়। সঙ্গে থাকা মাঝবয়েসি এক নারীর কল্যাণে মা এবং সন্তান দু’জনেরই প্রাণরক্ষা হয়। মেয়েটির নাম রাখা হয় বাতাসি। মেয়েটির কথা উঠলেই লোকেদের ঝড়ো হাওয়ার কথা মনে পড়ে আবার ঝড়ো হাওয়া উঠলে তাদের মনে পড়ে বাতাসির কথা।

এইটুকু সচেতনতাও বড় কম নয়- বাতাসির জন্মবৃত্তান্ত শুনে আশান্বিত হয় লুইগি পালোমার। ভাল কোন বিদ্যায়তন নেই যেখানে তারা লেখাপড়া করে সচেতনতা অর্জন করবে। একটি বিদ্যায়তন যদি খোলা যায় দ্বীপে তাহলে লোকেরা নিশ্চয়ই নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে  দিন-দিন আরও জেগে উঠবে। তারা সর্বরোগহর ঔষধের ওপর আস্থা হারিয়ে দ্বীপ ছেড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যখন ঢেউয়ের তোড়েও দিকভ্রষ্ট হয় না তখন তাদের ভবিতব্য বিষয়ে নিশ্চয়ই আশাবাদী হওয়া যায়। কিন্তু চাইলেই বিদ্যায়তন বা স্কুল খোলা যায় না। দ্বীপের অধিকাংশ লোক দরিদ্র। তাদের অধিকাংশের ধারণা, ক্ষেতেখামারে কাজ না করে বই নিয়ে বসে থাকাটা অকর্মণ্যতার লক্ষণ। বই পড়লে জমিতে ফসল হয় না, যদি তার পরিবর্তে বই-পড়ার সময়টাকে খাটাখাটুনিতে প্রয়োগ করা যায় তাহলে অন্তত জমিতে কয়েক সের বেশি হলেও শস্য মেলা সম্ভব। আর, যেটুকু পঠনপাঠন দ্বীপের ছেলেমেয়েরা সকালবেলা তাদের ধর্মীয় শিক্ষকদের নিকট থেকে লাভ করে তার বাস্তব কোন প্রয়োগ লুইগি দ্বীপের কোথাও দেখতে পায় না। তাই সে তার সহকারী গোলাম কবিরকে একদিন জিজ্ঞ্যেস করে, এখানকার লোকদের বাপ-দাদারা কী লেখাপড়া করে নি কখনও? যদি সেটা তারা করে থাকে তাহলে নিজেদের সন্তানকে তারা লেখাপড়া কেন করাচ্ছে না? কবির তখন লুইগিকে বোঝায়, সুবর্ণদ্বীপের আদি বসতি-স্থাপনকারীরা সবাই এসেছিল কাস্তে-কোদাল-খুরপি-টুকরি নিয়ে। তাদের তল্পি-তল্পা অবলম্বন-সম্বল কোথাও কোন কিছুর মধ্যেই ছিল না একটা বইয়ের পাতাও। কাজেই তাদের কাছ থেকে উত্তরপ্রজন্মমুখি শিক্ষা-সচেতনতা আশা করা অনুচিত। তবু, একবার ডেনমার্কের একটি সাহায্য-সংস্থা সচিত্র বর্ণমালার বই সাহায্য হিসেবে দিয়ে যায় দ্বীপের ছেলেমেয়েদের জন্যে। আরেকবার কানাডার একটি সাহায্য-সংস্থা স্বাস্থ্যবিষয়ক ক্ষুদ্র পুস্তিকা বিতরণ করে যায় দ্বীপে। বর্ণপরিচয় না থাকলেও, লেখাপড়া না জানলেও ছবি দেখে অনেকেই তখন স্বাস্থ্যসম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য জানতে পারে। যেমন, একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি শিশু টুথব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজে। আরেকটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি শিশু সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে পরের ছবিতে খেতে বসেছে বাবা-মা’র সঙ্গে। অশিক্ষিতদের মধ্যেও যেসব পিতামাতা খানিকটা সচেতন তারা ডেনমার্কের সাহায্য-সংস্থার দেওয়া বইগুলিকে বর্ণমালা শেখার কাজে লাগিয়ে পরবর্তীতে কানাডার সাহায্য-সংস্থার সচিত্র পুস্তকটিকে সূত্র হিসেবে ব্যবহার করে দু’টোর সমন্বয় দিয়ে একটা ঘরোয়া শিক্ষাব্যবস্থা নিজেদের অজান্তেই চালু করে দেয়। তাতে খানিকটা বিপরীতে হিত গোছের প্রতিক্রিয়াও হয়। বর্ণমালা এবং সচিত্র বইয়ের যৌথ অবদানে সমৃদ্ধ ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটা প্রবল তৃষ্ণার ভাব জেগে ওঠে। সেই তৃষ্ণার ফলে তারা বলতে থাকে, আমরা আরও বই চাই, আমরা আরও বই চাই। যতই তাদের পিতামাতা তাদের ধমকায় ‘চুপ র্ক’ ‘চুপ র্ক’ বলে ততই তারা চেঁচায়, ‘বই চাই বই চাই’ বলে। এইসব জেনেশুনে লুইগি ভাবে, সুবর্ণদ্বীপে একদিন লোকেরা ঘরে-ঘরে পাঠ করতে থাকবে- বই।

আরও পড়ুন: দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান(পর্ব-২)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান

চলবে...

৫ম পূর্ব পড়ুন আগামী শুক্রবার