সাহিত্যে জেনারেশন



দেবদুলাল মুন্না
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

“রাস্তার নাম পাল্টায় একদিন
ধারা পাল্টায় মাও সে তুংয়ের চীন
প্রেম পাল্টায়, শরীরও পাল্টে যায়
ডাকছে জীবন, আয়, পাল্টাবি আয়”
- কবীর সুমন

সবার ফিলোসফি একইরকম হবে এটি ভাবা অবান্তর। আবার কিছু কিছু মানুষের চিন্তাজগত কাছাকাছি থাকে। কেউ পাল্টায়। কেউবা না। তবে সময়ের গর্তে পাল্টে যায় সবই। এমন একটা সময় ছিল, আমাদের দেশেও গ্রামে বাড়ির উঠোনে বসত গল্প বলার আসর। একজায়গা থেকে একজন শুরু করে একজন থেমে যেত, অন্যজন সেখান থেকে শুরু করত। যেমন চিনুয়া আচেবে নোবেল পাওয়ার পর আমাদের জানান, তিনি গল্প লেখা শিখেছেন শৈশবে, যখন তাদের বাড়ির উঠোনে গল্প বলার আসর বসত। কবিগান তো এখনো রয়েছে। আবার রয়েছে ধরেন ইজম বা মতাদর্শিক ভিত্তিক সাহিত্যের ঘরানা। যেমন রোমান্টিক ঘরানা, জাদুবাস্তবতা ঘরানা, সুররিয়ালিস্টিক ঘরানা, পোস্ট মর্ডানিস্টিক ঘরানা, পোস্ট কলোনিয়াল ঘরানা এরকম অনেক অনেক।

আধুনিক বিশ্ব-সাহিত্যে আমরা বিভিন্ন গোষ্ঠীতন্ত্র কিংবা ধারণাবাদের সঙ্গে পরিচিত হই। রেনেসাঁ-পরবর্তীকালে লেখকদের দলবদ্ধ কার্যক্রম আমাদের নজরে আসে। কখনো কখনো কোনো কোনো ধারণার সঙ্গে ব্যক্তি-লেখকের নাম জড়িয়ে পড়ে। আবার কখনো-বা দশক বা শতাব্দী পেরোনোর পর জানা যায়, ওই সময়ে কবি-সাহিত্যিকরা দলগতভাবে একটি ধারণা কিংবা আদর্শ নিয়ে কাজ করেছেন। ১৭ ও ১৮ শতকে রোমান্টিক লেখকদের ‘অ্যামাটরি ফিকশন’ সম্ভবত প্রথম গোষ্ঠীগত সাহিত্যের ধারণার জন্ম দেয়। এরপর আবির্ভূত হয়েছে মেটাফিজিক্যাল পোয়েটস, দ্য অগাস্টানস্। ১৯ শতকের রোমান্টিসিজম, গোথিক নভেল, লেক পোয়েটস, ডার্ক রোমান্টিসিজম, রিয়েলিজম, ন্যাচারালিজম, সিম্বলিজম পৃথিবীময় খ্যাতি নিয়ে আজও বহাল রয়েছে। ২০ শতকে আসে অস্তিত্ববাদ, মডার্নিজম, দ্য লস্ট জেনারেশন, ডাডাবাদ বা এন্টি-আর্ট, সুররিয়ালিজম, সাউদার্ন অ্যাগ্রেরিয়ানস, ওলিপো, পোস্ট-মডার্নিজম, ব্ল্যাক মাউন্টেইন পোয়েটস, বিট পোয়েটস, হাঙরিয়ালিস্ট পোয়েটস, কনফ্যাশনাল পোয়েট্রি, নিউ ইয়র্ক স্কুল, ম্যাজিকেল রিয়ালিজম, পোস্ট-কলোনিয়ালিজম, প্রোকল্পনা মুভমেন্ট, স্পোকেন ওয়ার্ল্ড। ২০ শতকের শেষে এবং একুশ শতকের প্রথমপাদে নিউ ফরমালিজম এবং পারফরমেন্স পোয়েট্রি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। সাহিত্য-আন্দোলন কিংবা গোষ্ঠীতন্ত্র কোনো কোনো চিন্তা বা ভাবধারা প্রতিষ্ঠায় দায়িত্ব পালন করলেও অন্তরালে কিন্তু ব্যক্তির চিন্তার বিকাশই সবসময় প্রাধান্য পেয়েছে।

গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠার চেয়ে ব্যক্তিই সাহিত্যে প্রভাব ও পরিচিতি নিয়ে হাজির থেকেছেন সর্বকালে। এখনো পর্যন্ত ব্যক্তিরই জয়-জয়কার। তবু কিছু সাহিত্যে দলবাজির কথা বলি। যেমন, ব্ল্যাক লাইটার জেনারেশন। “এক ধরনের অঙ্গীকার, এক ধরনের বার্তা প্রদান, এক ধরনের প্রতিবাদ করা—এসব ছাড়া আর কিছুই লেখা সম্ভব নয়। আফ্রিকার জীবনটাই এমন হয়েছে যে আপনাকে প্রতিবাদ করতেই হবে; আপনাকে ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্ম ইত্যাদি নিয়ে কথা বলতেই হবে।” আফ্রিকার মহান সাহিত্যিক চিনুয়া আচেবে বলেছিলেন এই কথা। তিনি এইসব কথা বলেছিলেন আফ্রিকার উপনিবেশ ও উত্তর-উপনিবেশিকতার প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে। তিনি তাঁর সাহিত্য করেছেন এই দায়বদ্ধতা থেকেই। তার অনবদ্য উপন্যাস ত্রয়ী (ট্রিওলজি) ‘থিংস ফল এ্যাপার্ট’, ‘নো লংগার এট এজ’ ও ‘এ্যারো অফ গড’-এর দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। এর বাইরে ‘দেয়ার ওয়াজ এ কান্ট্রি’ ও ‘এন্টহিল অফ দ্য সাভানা’-এ প্রসঙ্গগুলো আরো জোরালোভাবে এসেছে। তিনি একসময় ব্ল্যাক লাইটার জেনারেশনের নেতৃত্ব দেন। এমন আরেকজন হচ্ছেন, হামিদুকেন। ছিল জেনারেশন টুয়েন্টি সেভেন। এ জেনারেশন গ্রুপের নেতৃত্ব দেন ফেদেরিকো ডেল সেগরাদো কোরাজন ডি জিসাস গার্সিয়া লোরকা। সেই বিপ্লবী কবি। ছিলেন একজন স্পেনিশ কবি, নাট্যকার ও থিয়েটার পরিচালক। জন্ম ৫ জুন ১৮৯৮ সাল। জন্মস্থান ফুয়েন্তি ভ্যাকুয়ারস আন্দালুসিয়া, স্পেন, আর মৃত্যু ১৯ আগস্ট, ১৯৩৬ সাল। তার মৃত্যু স্থান ছিল গ্রানাডায়। সাহিত্যচর্চায় তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন সালভাদর দালি, উইলিয়াম শেক্সপিয়ার, লুইস বানুয়েল ও প্রমুখ লেখকদের দ্বারা। বিশ্বখ্যাত সাকরেড হার্ট বিশ্ববিদ্যালয়, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পড়াশোনা করেন।

১৯১৯ সালে লোরকা মাদ্রিদে আসেন এবং সেখানে তিনি চিত্রশিল্পী সালভাদর দালির সাথে সাক্ষাত লাভ করেন যিনি তাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা করেছিলেন। স্পেনিশ ভাষায় লেখা লোরকার দুটি বিখ্যাত কাব্য সংকলন হলো ‘কনসিয়নস’ বা সঙ্গীত এবং ‘রোমানসিরো গিতানো’ বা দ্য জিপসি বালাদ। লোরকা ছিলেন স্পেনের বিখ্যাত কবিদের অন্যতম ও একজন সেরা নাট্যকার। লোরকার কাব্যে ছিল তিন মাত্রার সাহিত্য অলঙ্কার ও রোমান্স। ১৯৩৬ সালে স্পেনিস সিভিল ওয়ার শুরু হলে তিনি গেরিলাদের হাতে আটক হন। আগস্টের ১৯ কিংবা ২০ তারিখ ফ্রাঙ্কোর লোকেরা কবিকে বিনা বিচারে গুলি করে হত্যা করেন। তার মৃতদেহ কখনো খুঁজে পওয়া যায়নি।

আরো পড়ুন ➥ স্ট্রিট লিটারেচার

‘জেনারেশন টুয়েন্টি সেভেন’ ছিল বিখ্যাত সব কবিদের আন্তর্জাতিক একটি সংগঠন। তাদের কাজ ছিল কবিতার মাধ্যমে দেশে দেশে বিপ্লব করা। এরকম আরেকটি গোষ্ঠীর নাম ‘জেনারেশন অব ফোরটি ফাইভ’। ১৯২৩ সালে জন্ম নেওয়া ইদা হচ্ছেন উরুগুয়ের ‘জেনারেশন অব ৪৫’ নামে পরিচিত শিল্প আন্দোলনে অংশ নেওয়া সর্বশেষ জীবিত ব্যক্তি। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ইদা রোমানস ভাষার সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে গত বছর মেক্সিকোর এফআইএল সাহিত্য পুরস্কার পান। এ জেনারেশনের লেখক-কবিরা বিশেষত বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন।

নারীবাদী কবি-লেখকরা একটি দল করেছিলেন। সেটির নাম, ‘থার্ড ওয়েব জেনারেশন’। রেবেকা ওয়াকার কুইয়ার (এলজিবিটি) এবং অশ্বেতাঙ্গ নারীদের ওপর অধিক দৃষ্টি দেবার জন্য প্রথম ‘তৃতীয় তরঙ্গ’ শব্দটিকে ব্যবহার করেন। নারীবাদের তৃতীয় তরঙ্গ একটি বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় নারীবাদী কর্মকাণ্ড এবং আলোচনা নিয়ে পরিবেষ্টিত। যদিও তৃতীয় তরঙ্গের সঠিক সীমানা কী সেটি একটি বিতর্কের বিষয়, তবু সাধারণত নব্বয়ের দশক থেকে বর্তমান পর্যন্ত সময়কালকেই তৃতীয় তরঙ্গের ব্যাপ্তিকাল হিসেবে ধরা হয়। একে একটি ইন্ডিভিজুয়াল মুভমেন্ট বা ‘একক আন্দোলন’ বলা হয়, কারণ নারীবাদীকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করাও এর আওতায় পড়ে। তৃতীয় তরঙ্গের উত্থানের আংশিক কারণ হলো দ্বিতীয় তরঙ্গের ব্যর্থতা, এবং ষাট, সত্তর ও আশির দশকে তৈরি হওয়া আন্দোলন ও কর্মপ্রচেষ্টাগুলোর বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া। তৃতীয় তরঙ্গে নারীবাদকে বিস্তৃত করে আরো অনেক পরিচয়কে এর আওতাভুক্ত করা হয় এবং আরো অনেক বর্ণ, জাতিসত্তা, জাতীয়তাবাদ, ধর্ম ও সাংস্কৃতিক পটভূমিকে এখানে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এভাবে একে নারীবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গের প্রতিক্রিয়া ও অবিচ্ছিন্নতা হিসেবে দেখা যায়। এতে দ্বিতীয় তরঙ্গের কনস্ট্রাক্ট বা অবকাঠামোর একটি আংশিক অস্থিতিশীলতাও বিদ্যমান। তৃতীয় তরঙ্গ শুরুর কয়েক বছর পূর্বে, ১৯৮৯ সালে একটি সম্পর্কযুক্ত ধারণা ইন্টারসেকশনালিটির জন্ম হয়। কিন্তু এই তৃতীয় তরঙ্গেই এই ধারণাটিকে গ্রহণ করা হয়।

রেবেকা ওয়াকার কুইয়ার ১৯৯২ সালে এনিটা হিল কেসের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। যেসব পুরুষ নারীদের ওপর যৌন হয়রানি ও অন্যান্য নির্যাতন করে, এবং এরকম অবিচার করেও তাদের প্রিভিলেজ বা সুযোগ-সুবিধাকে ব্যবহার করে তারা বিচারের হাত থেকে রেহাই পেয়ে যায়, সেইসব পুরুষের দ্বারা নারীদেরকে চুপ করিয়ে রাখার যে ঘটনাগুলো তার চোখে পড়ে, তার বিরুদ্ধে রেবেকা ওয়াকার কলম ধরেছিলেন, এবং বলেছিলেন, “আমি উত্তর-নারীবাদ নারীবাদী নই। আমি হলাম তৃতীয় তরঙ্গ।” থার্ড ওয়েব জেনারেশনের সদস্যদের মতে, নারীবাদ রাজনৈতিক পরিবর্তনের চাইতে ব্যক্তিগত ও ব্যক্তিতাবাদী পরিচয়ের ওপরে অধিক দৃষ্টিনিক্ষেপ করে।

কিন্তু এ জেনারেশনের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে কলম ধরেন যেসব কবি-লেখকরা তাদের গ্রুপের নাম, ‘ফেপফে’ জেনারেশন। ‘ফেপফে’র পুরো মিনিং হলো ‘ফেমিনিজম পলিটিক্যাল ফেনামেনা’। এ জেনারেশনের নেতৃত্ব দেন জুডিথ অ্যাস্টেলারা। এ গ্রুপের জন্ম ২০০৭ সালে। নারীবাদী তত্ত্বের বিভিন্ন প্রকারভেদ আছে, এর মধ্যে লিবারেল, মার্কসিস্ট বা সোশ্যালিস্ট, রাডিকাল, ইকো, কালচারাল, গ্লোবাল—এ জাতীয় নানা শ্রেণী বিন্যাস করে বিভিন্ন বিশ্লেষক, গবেষক তার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং গবেষণা দ্বারা নারীবাদের প্রকারভেদ নির্ধারণ করেন। জুডিথ অ্যাস্টেলারা তার বই ‘Political Feminism’-এ বলেছেন, “নারীবাদ হচ্ছে সামাজিক পরিবর্তন ও আন্দোলনের লক্ষ্যে একটি পরিকল্পনা, যা নারী নিপীড়ন বন্ধ করার লক্ষ্যে চেষ্টা করে থাকে। এ প্রসঙ্গে ভার্জিনিয়া উলফের একটি উক্তি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার মতে, আত্মার মাঝে দু ধরনের শক্তি রয়েছে—পুরুষ সুলভ ও নারী সুলভ। পুরুষদের মস্তিষ্কে নারীসুলভ শক্তির ওপর পুরুষসুলভ শক্তি প্রাধান্য বিস্তার করে আর মেয়ের মস্তিষ্কে এর বিপরীত। স্বাভাবিক ও সুখকর অবস্থা তখনই আসবে যখন এ দুয়ের সমন্বয় সাধন ঘটবে। পুরোপুরি পুরুষসুলভ ও পুরোপুরি নারীসুলভ মন কোনোটাই সম্ভবত সৃষ্টিশীল কিছু ভালোমতো করতে পারে না।”

আরো পড়ুন ➥ তবু সে দেখিল কোন ভূত

এই জেনারেশনের লেখকদের মতোই মেইনস্ট্রিম কালচারের বিরুদ্ধে ক্রিটিক করার জন্য তৈরি হয়েছিল বিট জেনারেশন। এই আন্দোলনটি গড়ে তোলেন প্রথম দিকে আমেরিকার কয়েকজন কবি তারপর এটি নিউইয়র্কসহ কয়েক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলনটি ১৯৫০-৬০ সালের দিকে শক্তিশালী রূপ নেয়। এই বিট জেনারেশনের কবি লেখকরা সাধারণত লিটলম্যাগাজিনগুলোতে লিখতেন। তবে পোস্ট মডার্ন যুগে এই বিট জেনারেশনের সাহিত্যকে অস্বীকার করার জো নেই। এটা এমন একটা সমাজ যেখানে সবাইকে আইন, আদেশ আর জাগতিকতাকে মেনে চলতে হবে। ৫০ সালের দিকে বিট আন্দোলন আরো বেড়ে উঠতে থাকে। নিউইয়র্কের গ্রির উইচ ভিলেজ আর সান ফ্রান্সিকোর নর্থ বিচ এই আন্দোলনের পুণ্যভূমি হিসেবে খ্যাত। বিট সরাসরি সমাজের যে কোনো বিষয়কে ও প্রতিষ্ঠিত আইনকে চ্যালেঞ্জ জানায়। তারা আমেরিকার রূপ নিয়েও প্রশ্ন তোলে। এই জেনারেশনের একজন উল্লেখযোগ্য হলেন জ্যাক কেরুয়াক, অ্যালেন গিন্সবার্গ, বব কাউফম্যান। তিনি তার ব্যকইত্ব দিয়ে এই বিট আন্দোলনের আত্মাকে সামনে টেনে আনেন। তিনি একমাত্র যিনি পঞ্চাশের সেই সময়টায় বিট স্বরকে প্রোজ্বলিত করে তোলেন এবং তার যুগে কৃষ্ণাঙ্গ কবিদের মধ্যে তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। অনেক বিট জেনারেশনের অনুসারীদের মতো তিনিও নিউইয়র্ক থেকে শুরু করেন এবং পরে তার ঠিকানা মেলে সান ফ্রান্সিসকোতে। এখানে এলেই গিন্সবার্গ কবিতা পড়তেন, কাউফম্যান পেয়ে যান আরকেটি পথ। তিনি রাস্তার কবি বিষয়ে একটা কিছু ভাবতে থাকেন। কাউফম্যানের কবিতাগুলো এমন যেখানে তার পরাবাস্তব একটা চেহারায় পাওয়া গেলেও তাতে থাকে উচ্চণ্ড একটা স্বভাব আর রাজনৈতিক সংলাপ। কাউফম্যান নিজেকে বুদ্ধবাদী বলে দাবি করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন কবিতায় এমন কিছু আছে যা উচ্চমার্গীয় একটা কিছু করার আদেশ করে। তিনি আধ্যাত্মিকতার চর্চা শুরু করেন। এবং বস্তুবাদকে অস্বীকার করেন। এমনও হতো মানুষ ব্যাগল শপ নামক একটি জায়গায় জড়ো হতেন তার মুখে কবিতা শোনার জন্য, তিনি একটি টেবিলে লাফ দিয়ে উঠে পড়তেন একটি নতুন কবিতা বের করতেন অথবা এলিয়ট, পাউন্ড বা ব্লেকের মতো কারো কবিতা পড়তেন। তিনি যখন কবিতা পড়তেন চারপাশ নিশ্চুপ হয়ে যেত। তার প্রতিটি শব্দেই যেন শ্রোতারা একটা বিশেষ কিছু পেতেন। একসময় তিনি পুলিশের নজরে পড়লেন। ৬০-এর দিকে তিনি মাদকাসক্ত হয়ে পড়লেন। তখনই তাকে নিউইয়র্কে একটি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। বিটরাই একমাত্র আন্দোলনকারী যারা তাদের জীবনকেই একটি আখ্যান করে ফেলতেন, এবং তারা তাদের জীবনকে পৃথিবীর সমগ্র পাঠকের কাছে তুলে ধরতেন। ১৯৫৮ সালের দিকে বিট জেনারেশনের লেখকেরা সান ফ্রান্সিসকো থেকে মেক্সিকো, ভেনিস ও ক্যালিফোর্নিয়ার দিকে আসতে থাকে। বিটনিক থেকে তাদেরকে বলা হতে থাকে ব্রান্ট অফ জোক্স (brunt of jokes). গণমাধ্যম কেবল তাদের দুইটি বিষয়কেই সামনে টেনে আনে—১. তাদের জীবন আর ২. তাদের প্রতিবিম্বিত শিল্প।

বিট প্রজন্মেরই অনন্য সাহিত্য প্রতিভা জ্যাক কেরুয়াক। তিনি বলেন, “গিন্সবার্গ বামপন্থী রাজনীতিতে আগ্রহী হয়ে পড়ল। জয়েসের মতো বলছিলাম আমি, ’২০-এ এজরা পাউন্ডকে জয়েস বলেছিল, ‘রাজনীতি নিয়ে বিরক্ত কোরো না আমায়, স্টাইল ছাড়া আর কোনো কিছুতে আমার আগ্রহ নেই। তা ছাড়া, এসব নব্য আঁভ-গার্দ আর আকাশছোঁয়া ইন্দ্রিয় ঘনতায় মহাবিরক্ত ছিলাম আমি। তখন পাসকাল পড়ছি, ধর্ম সম্পর্কে নানা কথা টুকে রাখছি। এখন তো যত অ-বুদ্ধিবাদীদের সঙ্গে মিশি আমি, কোনো দলে ফেলে নাম লেখাতে রাজি নয়কো মোটেই। এখন তো ওরা হ্যাপিনিংয়ে মুরগি ধরে ধরে ক্রুশুবিদ্ধ করেছে—কী করবে এর পরে...আস্ত মানুষকে ধরে ঝুলিয়ে দেবে, অ্যাঁ?...হ্যাঁ, ’৬০-এ সবাই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই, যে যার পথে গেছে, আমার এ-ই পথ : ঘরোয়া জীবন, কখনো-সখনো স্থানীয় শুঁড়িখানায় দু-পাত্তর মেরে আসি।”

অ্যালেন গিন্সবার্গ তিনি মার্কিন সামরিকতন্ত্র, অর্থনৈতিক বস্তুবাদ এবং যৌন নিপীড়ন বিষয়ে জোরালোভাবে বিরোধিতা করেন। শুরুতে গিন্সবার্গ তার ‘হাউল’ (১৯৫৬) মহাকাব্যের জন্য সর্বাধিক পরিচিত হন; যেখানে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাদের ধ্বংসাত্মক শক্তিকে নিন্দা করেন। এই কবিতাটি লিখেছিলেন তার বিট প্রজন্মের বন্ধুদের বরণ করে নিয়ে এবং বস্তুবাদের ধ্বংসাত্মক শক্তিকে আক্রমণ করে। কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ ছিলেন বাংলাদেশের বন্ধু। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষদিকে তিনি কলকাতায় এসেছিলেন। কলকাতার বেশ কয়েকজন সাহিত্যিকের সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল, যার মধ্যে একজন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি সুনীলের বাড়িতেই উঠেছিলেন। তখন বাংলাদেশ থেকে অনেক শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। কলকাতা ও বাংলাদেশের মধ্যে সংযোগকারী সড়ক হিসেবে কাজ করত ‘যশোর রোড’। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অনেক বৃষ্টি হওয়ায় যশোর রোড পানিতে ডুবে গিয়েছিল। সড়কপথে না পেরে গিন্সবার্গ অবশেষে নৌকায় বনগাঁ পেরিয়ে বাংলাদেশের যশোর আসেন। তার সাথে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও ছিলেন। যশোর রোডের পাশে গড়ে ওঠা শরণার্থী শিবির এবং এপার থেকে ওপারে যাত্রা করা হাজার হাজার নিরীহ মানুষের নির্মম হাহাকারের প্রতিধ্বনি গিন্সবার্গ ফুটিয়ে তুলেছিলেন তার বিখ্যাত ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটিতে। তিনি তিন দিন বসে দীর্ঘ এই কবিতাটি লেখেন।

কলকাতাতেও শুরু হয়েছিল হাংরি জেনারেশনের লেখালেখি ষাটের দশকে। দেশভাগের পর পশ্চিম বাংলায় এক বিশৃঙ্খল অবস্থা। একদিকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সাথে উদ্বাস্তু কলোনিতে বাড়ছে মানুষের ভিড়, অন্যদিকে স্বরাজের স্বপ্নকে গুঁড়িয়ে চলছে স্বার্থ আর নোংরা রাজনীতির নগ্ন খেলা। ঠিক এই সময় আবির্ভাব ঘটল একদল তরুণ কবির।

আরো পড়ুন ➥ সাহিত্যে যৌনতা

কোনো কবিতার প্রথম লাইন “আমি খালি পেটে ইন্টারভ্যু দিতে গিয়ে বলে এলুম অর্থমন্ত্রীর কাকিমার নাম।” বাংলা সাহিত্যকে এই প্রথমবারের মতো বুদ্ধিজীবীদের সভা থেকে নামিয়ে আনা হলো রাস্তায়, সাধারণ মানুষের মাঝে। যে ক্ষুধার্ত তরুণ কবিরা এই বিপ্লব ঘটাল, তাদের নেতৃত্ব দেন ২১ বছরের এক তরুণ, মলয় রায়চৌধুরী; ভবিষ্যতে যিনি নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলবেন, “একজন কালচারাল বাস্টার্ড।” তিনি এখনো জীবিত ও ফেসবুকে সক্রিয়। হাংরি আন্দোলনকারীরা তাদের মুভমেন্টকে ‘কালচারাল কাউন্টার’ বলতেন। পশ্চিমা বিশ্বে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী একটি প্রজন্ম, কালচারাল কাউন্টার ঘটিয়ে নতুনধারার এক সমাজের বীজ বুনে ফেলেছে। আমেরিকার ‘বিট জেনারেশন’ আর ব্রিটেনের ‘অ্যাংরি ইয়াংম্যান’ গোষ্ঠীর লেখকেরা মূলধারার সাহিত্য-সংস্কৃতিতে আঘাত হেনে বিশ্বে জনপ্রিয়। অনেকে এজন্য হাংরি জেনারেশনকে বিট জেনারেশনের সাথে তুলনা করলেন। বিট জেনারেশনের অনুপ্রেরণাতে হোক বা যেভাবেই হোক না কেন, ১৯৬১ সালে পাটনা থেকে রীতিমতো ইশতেহার ছাপিয়ে আন্দোলন শুরু করলেন মলয় রায়চৌধুরী। বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন প্রচলিত ধারার সাহিত্য আর সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। কবিতার ইশতেহারে তিনি লিখলেন, “শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা কবিতা সৃষ্টির প্রথম শর্ত।” লিখলেন, “এখন কবিতা রচিত হয় অরগ্যাজমের মতো স্বতঃস্ফূর্তিতে।”

আমাদের দেশেও এমন জেনারেশন বা গ্রুপ তৈরি করেছিলেন কবি রফিক আজাদ। এর নাম, স্যাড জেনারেশন। রফিক আজাদ এখন আর জীবিত নেই। তিনিই লিখেছিলেন কবিতায়, “ভাত দে হারামজাদা, নাইলে মানচিত্র চিবিয়ে খাব।” মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েডের মতে, মানুষের মধ্যে ‘ইরোস’ আর ‘থ্যানাটোস’ নামে পরস্পরবিরোধী দুটি শক্তি সমভাবে ক্রিয়াশীল; একটির কারণে মানুষ জীবনবাদী হয়, সৃজনশীল পথে চিন্তা ও অনুভূতির প্রকাশ ঘটায়। আর থ্যানাটোসের কারণে মানুষ হয় মৃত্যুমুখী—অন্ধকার আর ধ্বংসাত্মক পথে যার প্রকাশ ঘটে। স্যাড জেনারেশনের অন্যতম প্রবক্তা এই কবি জীবনকে মেপেছেন দুঃখ আর যন্ত্রণার চামচে। T. S Eliot এর J. alfred prufrock-ও জীবনকে মেপেছিলেন কফির চামচে—I have measured out my life with coffee spoons. চলুন তার একটা আমার প্রিয় কবিতা পড়ি।

বালক ভুল করে নেমেছে ভুল জলে
বালক জানে না তো পুষবে অনুরাগ
হৃদয়ে কতদিন, কার বা চলা-পথে
ছড়াবে মুঠো-মুঠো বকুল ফুলগুলো;
কোথায় যেতে হবে, যাবে না কোন দিকে,
ব্যাপক হাঁটাহাঁটি করবে কোন পথে!
বালক জানল না—মানুষ ম্লানমুখে
কেন যে তারা গোনে; পায়ের নিচে কার
কেন যে ফুল ঝরে, কতটা ফুল ঝরে!
মানুষ ভুল পথে গিয়েছে কত দূর,
বেপথু কাকে বলে বালক জানে না তা!
বালক জানে না তো কতটা হেঁটে এলে
ফেরার পথ নেই—থাকে না, নিরুপায়—
যে আসে সে-ই জানে—ভুলের দামে কিনে
আনে সে প্রিয় ম্যাপ—পথিক ম্রিয়মাণ,
উল্টোরথে চ’ড়ে চলেছে মূল পথ!

বালক জানে না তো অর্থনীতি আর
মৌল রাজনীতি—উল্টো ক’রে ধরে
সঠিক পতাকাটি—পতাকা দশদিশে
যেনবা কম্পাস স্বদেশ ঠিক রাখে।
বালক জানে না সে বানানে ভুল ক’রে
উল্টাসিধা বোঝে : সঠিক পথজুড়ে
পথের সবখানে কাঁটার ব্যাপকতা!
বালক ভুল ক’রে পড়েছে ভুল বই,
পড়েনি ব্যাকরণ, পড়েনি মূল বই!
বালক জানে না তো সময় প্রতিকূল,
সাঁতার না শিখে সে সাগরে ঝাঁপ দ্যায়,
জলের চোরাস্রোত গোপনে ব’য়ে যায়,
বালক ভুল ক’রে নেমেছে ভুল জলে!
বালক জানে না তো জীবন থেকে তার
কতটা অপচয় শিল্পে প্রয়োজন।
পাথর বেশ ভারী, বহনে অপারগ
বালক বোঝে না তা—বালক সিসিফাস
পাহাড়ে উঠে যাবে, পাথর নেমে যাবে
পাথুরে পাদদেশে!—বিমূঢ়, বিস্মিত
বালক হতাশায় অর্তনাদ ক’রে
গড়িয়ে প’ড়ে যাবে অন্ধকার খাদে।
বালক জানে না তো সময় প্রতিকূল,
ফুলের নামে কত কাঁটারা জেগে থাকে
পুরোটা পথজুড়ে, দীর্ঘ পথজুড়ে—
বালক জানে না তা, বালক জানে না তো!
বালক জানে না তো কতটা হেঁটে এলে
ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;