সৃষ্টিশীলদের খেয়ালিপনা



দেবদুলাল মুন্না
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

কেন সৃষ্টিশীলদের মধ্যে একটু খেয়ালিপনা থাকে? এ প্রশ্ন করা হয়েছিল পাভলভকে। তিনি বলেছিলেন, “তারা তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল ও অগ্রসর চিন্তার হন। ফলে প্রচলিত সমাজে তারা একটু মিসফিটই থাকেন। এই মিসফিট থাকাটাকেই অনেকে ভাবেন খেয়ালিপনা। এর বেশি কিছু নয়।”

“অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে গড়তে হয় একেকটি চরিত্র; সেই চরিত্রগুলো ধীরে ধীরে গল্প হয়ে ওঠে—একের এর এক শব্দের গাঁথুনি, সে বড় সহজ কাজ নয়।’ লেখক হয়ে ওঠার গল্প বলছিলেন নোবেলজয়ী সাহিত্যিক ভি এস নাইপল। “আমি লেখক হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কী লিখব তার কিছু্ই জানতাম না। কিন্তু লিখব, এটা জানতাম। আমি বুঝতে পারলাম যে এজন্য আমাকে কাঠখড় পোড়াতে হবে। আমার কাছে ব্যাপারটা খুব বিব্রতকর ছিল। আসলে লেখাঝোঁকা পাগলামি ছাড়া আর কিছু্ই না। আবার এটাও বলতে হয়, কোনো কিছুই খুব সহজ না। অনেক চিন্তাভাবনা করে তারপরেই একটা কিছু দাঁড়ায়।” নোবেলজয়ী এই সাহিত্যিক বলেন, ‘আমি লেখক হতে চাইছিলাম, কিন্তু জানতাম না কী লিখব। আমি লেখক হতে চেয়েছিলাম বাবার জন্য, আমার অনেক লেখায় আমার বাবার জীবনের ছাপ রয়েছে।” তাঁর জীবনে নাদিরা আসার পর তিনি লেখার টেবিলে বসতেন নাদিরাকে গভীর চুম্বন করে। একটা সময় তার বুকপকেটে নোটবই নিয়ে ঘুরতেন। তার কাছে যাদের ভিন্নরকম মনে হতো, তাদের সঙ্গে কথা বলতেন। এবং সেগুলো লিখে রাখতেন। একবার এক সেনা কর্মকর্তার কাছে প্রশ্ন করে বিপদেই পড়েছিলেন। প্রশ্নটা ছিল, “আপনি তো বীরের মতো লড়াই করতে পারবেন? কিন্তু আপনি কি সেক্সুয়ালি স্ট্রং?”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যেও পাগলামি ছিল। বিভিন্ন ডিজাইনের কলম সংগ্রহের শখ ছিল। কিন্তু তিনি সেই কলমগুলো দিয়ে খাতায় একটি আঁচড় কেটেও দেখতেন না। শান্তি নিকেতনে ঘন ঘন বাড়ি বদলাতেন। নারিকেল তেল দিয়ে ভেজেও রুটি খেয়ে দেখেছেন প্রথম। কাজী নজরুল ইসলামের খেয়ালের হিসাব ছিল না। নজরুলের একটা বিশেষ খেয়াল ছিল, ওঁনার মনে কোনো আনন্দ বা উল্লাস জাগলে তিনি চিৎকার করে উঠতেন, “দে গরুর গা ধুইয়ে।” ধূমকেতুর কবিকে দেখতে চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। একদিন সকালে নজরুল গেলেন ঠাকুর বাড়িতে। আঙিনায় ঢুকতে ঢুকতে ডাকলেন, কবি কবি! কবি বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। আর নজরুল রবীন্দ্রনাথকে দেখেই বলতে শুরু করলেন, “দে গরুর গা ধুইয়ে!”

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আরেক অদ্ভুত খেয়াল ছিল। বাড়িতে তো বটেই বাইরে কোথাও সভা সমিতিতে গেলে সবসময় সঙ্গে একটা মোটা মুগুর জাতীয় জিনিস নিতেন। গাড়িতে বা সভাতে যেখানে বসতেন হাতের নাগালের মধ্যেই রাখতেন। একবার এক লেখক সাহস করে জানতে চেয়েছিলেন, সঙ্গে মুগুর কেন? সহাস্য তিনি যা উত্তর দিয়েছিলেন, তার ভাবার্থ হলো, ওঁনার মধ্যে সব সময় একটা অজানা ভয় কাজ করত। ভাবতেন, কেউ বোধহয় অকস্মাৎ আক্রমণ করবে। তাই আত্মরক্ষার জন্য ওই মুগুর রাখা। অবশ্য এ খেয়াল বেশিদিন ছিল না। মাস সাতেক ছিল।

বিভূতিভূষণের সেই পারলৌকিক বিশ্বাস এতটাই তীব্র ছিল যে, মৃত্যুর কিছু দিন আগে এক শ্মশানে নিজের মৃতদেহকে নাকি নিজের চোখে দেখতে পেয়েছিলেন তিনি। তারাশঙ্করের মামলা-মকোদ্দমা করার এক উদ্ভট খেয়াল ছিল। সুযোগ পেলেই তিনি কারো বিরুদ্ধে মামলা ঠুঁকে দিতেন নিঃসঙ্কোচে। শিবরাম চক্রবর্তী, তিনি বলতেন বা লিখতেন শিব্রাম চক্কোত্তি। উচ্চ বংশের ছেলে হয়েও সারা জীবন মেসেই কাটিয়েছেন। তার এক অদ্ভুত খেয়ালের মধ্যে ছিল কোনো ব্যক্তির তথ্য, ফোন নাম্বার খাতায় সংগ্রহ করে রাখতেন। তার মেসের দেয়ালটাই ছিল বিভিন্ন ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগের একমাত্র সেতুবন্ধন। তার মেসবাড়ির ঘরের পুরনো দেয়াল বিভিন্ন লোকের নাম, ঠিকানা, ফোন নাম্বারে পরিপূর্ণ ছিল।

আরো পড়ুন ➥ সাহিত্যে জেনারেশন

এবার বলি কবি জীবনানন্দ দাশের কথা। কবি একা একা হেঁটেছেন, কখনো ঘুমের মধ্যে, কখনও বা স্বপ্নে। তাঁর কবিতার মতো কবিও এক বিচিত্র খেয়ালে শিশিরে ভেজা ঘাসে পা ডুবিয়েছেন বারবার। সরীসৃপ শীতল অন্ধকারে হেঁটে গেছেন পার্কে ঘাসে, ট্রাম লাইনের বুকে। কবিপত্নী লাবণ্য দাশ রাতে মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে গেলে দেখতেন, কবি পাশে নেই। কী করতেন তখন কবি? কোথায় যেতেন? কবির বন্ধুদের লেখায় জানতে পারি, কবি ঘর ছেড়ে অন্ধকারে একা পার্কের বেঞ্চে গিয়ে বসে থাকতেন। কখনো-বা ঘাসে পড়ে থাকা শুকনো ডাল তুলে নিয়ে অন্ধকারে গাছের দিকে ছুড়ে দিতেন। বন্ধুরা জিজ্ঞেস করলে বলতেন, গাছের ডাল দিয়ে গাছকে মারি কেন জানো? যেমন নিজের হাত নিজের গায়ে লাগলে আমাদের ঘুম ভাঙে না, তেমনই গাছের ডাল দিয়ে গাছকে মারলে গাছের ঘুম ভাঙে না। অথচ গাছে আশ্রয়কারী যে পাখিগুলো তারা জেগে উঠবে! আর সেই এক সমুদ্র অন্ধকারের বুকে তাদের কিচির মিচির শব্দ আমাকে আরো এক গভীরতর অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাবে। “অনন্ত নক্ষত্র-বীথি তুমি অন্ধকারে!” বলুন তো, এ খেয়ালের কোনো অনুভব কি আমাদের চেতনায় জাগাতে পারব?

কমল কুমার মজুমদার শেষের দিকে মনে করতেন তাকে দিয়ে কেউ লেখায়, মানে তিনি লেখেন না। তিনি বসে আড্ডা দেওয়ার চেয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতে পছন্দ করতেন। উল্টোদিকে মানিক বন্দোপাধ্যায় ও শক্তি চট্টোপাধ্যায় আড্ডা মানেই মদ থাকতে হবে। মাতাল না হলে কি আড্ডা জমে। মানিক প্রতিদিনের বাজার-খরচের তালিকায় দেশি বাংলা মদের খরচও লিখে রাখতেন। শক্তি তো খালাসিটোলায় মদ খেয়ে প্রায় পথ হারিয়ে ফেলতেন। দেখা গেল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাসায় গিয়ে সন্দীপন সন্দীপন ডাকছেন। রামকিংকর বেজ গাঁজা খেতেন। গাঁজা খাওয়ার পর কেউ তার পাশে গেলেই বলতেন, “তুমি কি সাওতালী নাচ দেখেছো কখনো? সাওতালী নাচ দেখবে? আমি নেচে দেখাব।’

আমাদের দেশের শিল্পী সুলতান একসময় শাড়ি পরতেন। হাসনাত আবদুল হাই তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, শাড়ি পরেন কেন? সুলতানের সাদাসিধে জবাব, “রাধাভাবে পাইছে।” হুমায়ুন আজাদ একা কোথাও রাত্রি যাপন করতে ভয় পেতেন। সে ভয় তাড়ানোর জন্য মদ গিলতেন। বাংলা প্রসঙ্গে ফের পরে বলি, এখন একটু পশ্চিমে তাকাই।

অ্যাডলফ হিটলার। তার বিচিত্র শখও চমকে দেওয়ার মতো। তার অদ্ভুত শখের মধ্যে ভায়োলিনের রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। অ্যাডলফ হিটলার ছোটবেলা থেকেই ভায়োলিন বাজাতে পারদর্শী ছিলেন। সেই সময়ে তিনি জার্মানির অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভায়োলিন বাদক ছিলেন। হিটলারের নির্দেশে যত খুন ও হত্যাযজ্ঞ করা হয়েছে এর প্রত্যেকটির পর তিনি তার ভায়োলিনটি বাজিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতেন। দুঃখ প্রকাশের ভঙ্গিমা আমেরিকান লেখক জ্যাক লন্ডনেরটি ছিল মজার। তিনি সেখানকার কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন। পরিচিত কেউ মারা গেলে সেখানে উপস্থিত হয়ে মাথা থেকে হ্যাট খুলে নীল ডাউনের ভঙ্গিমায় বসে বলতেন, “যীশু তোমার অসুস্থতা কামনা করি।” একেকজন মানুষের ঘুমানোর স্টাইল একেক রকম। কেউ ডান দিকে কাত হয়ে ঘুমান, কেউ বামে, চিত্ বা উপুড় হয়ে ঘুমান। চার্লস ডিকেন্সের এই অদ্ভুত শখটি ঘুমানোর স্টাইলের সাথে সম্পর্কিত। চার্লস ডিকেন্স যিনি ভিক্টোরিয়ান যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইংরেজ ঔপন্যাসিক হিসেবে সুপরিচিত। এই ইংরেজ ঔপন্যাসিক সবসময় উত্তর দিকে মাথা রেখে ঘুমাতেন। কারণ, তিনি বিশ্বাস করতেন যে এভাবে ঘুমানোর ফলে তাঁর লেখালেখি ভালো হবে। একজন বয়সে তরুণ ইংরেজ কবি, তাঁর প্রায়ই মনে হতো পাখি যদি উড়তে পারে তিনি কেন পারবেন না! যেমন ভাবা তেমন কাজ, দোতলার বারান্দা থেকে একদিন পাখি হয়ে গেলেন। মানুষ-কবি কল্পনায় যত পাখি হন না কেন, বাস্তবে তো আর পারবেন না। তাই ঘাড়মুখ গুঁজে পড়লেন বাগানের ঝোপের মধ্যে। হাতের হাড় ভেঙে সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে গেলেন।

এ রকমই খেয়ালি ছিলেন কবি জন কীটস্। কবি ওয়ার্ডস ওয়ার্থ রোজ বিকেলে তাঁর পোষা কুকুরগুলোকে নিয়ে বেড়াতে বের হতেন। একটু ফাঁকা কোনো জায়গা পেলে দাঁড়িয়ে পড়তেন। নিজের সেদিনের লেখা কবিতা জোরে জোরে আবৃত্তি করতেন। কুকুরগুলো চুপচাপ কানখাড়া করে শুনলে, উনি বুঝে যেতেন কবিতা ঠিক আছে। আর যখন কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করে আওয়াজ দিত, তখন উনি বুঝতেন এ কবিতাটা ঠিক হয়নি। ছন্দ বা শব্দচয়নে গোলমাল হয়েছে কোথাও। বাড়ি ফিরে আবার সংশোধন করতেন। তারপর বন্ধুদের সামনে পড়তেন বা পত্রিকায় ছাপতে দিতেন। কিন্তু, আপনারা কেউ শুনেছেন এমন সব সাহিত্যরসিক কুকুরদের কথা? নিশ্চয়ই না।

কৈশোরে যার অ্যাডভেঞ্চার পড়ে আমার বুক কাঁপত, আর যৌবনে যাঁর ‘টয়লার্স অব দ্য সি’ পড়েছি, সেই লেখক ভিক্টর হুগোর পাগলামি বা খেয়ালের জন্য এখন তার পরিণতির কথা ভাবলে মায়াই লাগে। জানি না কেন তার মধ্যে কোনো বিচিত্র ধ্বংসাত্মক খেয়াল ছিল। সমুদ্রে যখন ঝড় উঠত, বাতাস অস্থির, অবিরল ধারায় বৃষ্টি ঝরত, সেই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে একা নৌকো নিয়ে উত্তাল সমুদ্রে অদৃশ্য হয়ে যেতেন। তাঁর লেখার মতো তাঁর খেয়াল ছিল এমনই বুক কাঁপানো! এমন পাগলামি তার মৃত্যু ডেকে এনেছিল। সত্যি সত্যি সেই ভিক্টর হুগো খেয়ালের বশে ওই রকম এক দুর্যোগপূর্ণ রাতে অস্থির সমুদ্রের বুকে নৌকাবিহারে বেড়িয়েছিলেন, আর কোনোদিন ফিরে আসেন নি।

সাগরপ্রেমিক ছিলেন আর্নেস্ট হেমিংওয়েও ভিক্টর হুগোর মতোন। ‘ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি’ বইয়ের নাম সবার জানা। তার শখ ছিল শিকার করা। আর শুধু শিকার করলেই তো হবে না, তার স্মৃতি-চিহ্ন তো রাখতে হবে। তাই শিকার করা পশুর দেহাংশ শোভা পেত তাঁর ড্রয়িংরুমে, লেখার ঘরে, দোতলায় ওঠার সিঁড়িতে, এমন কি বেডরুম পর্যন্ত। তাঁর এই বিচিত্র খেয়ালের জন্য বন্ধু প্রতিবেশি, এমন কি আত্মজনেরা পর্যন্ত বাড়ি আসা বন্ধ করে দিয়েছিল মৃত পশুর চামড়ার পচা দুর্গন্ধের ঠেলায়। কিন্তু তিনি কোনো দুর্গন্ধ পেতেন না। তার প্রথম বউ এসব কারণে তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। কিন্তু তিনি দমেননি।

ফরাসি লেখক আলেক্সান্ডার ডুমার খেয়ালে রুচির ছাপ ছিল। তিনি বিভিন্ন রঙের কাগজ পছন্দ করতেন। এই তথ্য বেশ প্রচলিত যে, ফরাসি লেখক নীলরঙের কাগজে উপন্যাস লিখতেন, গোলাপি রঙের কাগজ রেখেছিলেন কবিতা লেখার জন্য এবং পত্রিকায় ছাপানোর জন্য তিনি লেখা পাঠাতেন হলুদ রঙের কাগজে। আগাথা ক্রিস্টিরও লেখার ব্যাপারে ছিল বিচিত্র খেয়াল। আমরা সবাই চেয়ার বা টেবিলে বসে লেখালেখি করে থাকি। কিন্তু ইংরেজ অপরাধ কল্পকাহিনীর প্রথিতযশা লেখক আগাথা ক্রিস্টি জীবনে কখনো চেয়ার বা টেবিলে বসে লিখতেন না। কখনো রান্না ঘরে রান্না করতে করতে বা ট্রেনে ভ্রমণ করতে করতে অথবা হোটেল রুমে বসে তাঁর লেখালেখি চালিয়ে যেতেন। তাঁর চেয়ার টেবিলে বসে লিখবার অভ্যাস যেমন ছিল না, এমনকি তাঁর কোনো নিজস্ব অফিস ছিল না।

আরো পড়ুন ➥ স্ট্রিট লিটারেচার

ক্যালভিনো গুরুত্বপূর্ণ ইতালিয়ান লেখক। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ইতালীয় সাহিত্যে যে বিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছিল, ক্যালভিনো ছিলেন তাদের মধ্যে অগ্রগামী। তিনি লেখার আগে জুয়া খেলতেন। যেদিন আর্থিক সংকট থাকত সেদিন জুয়াও খেলতেন না। লিখতেনও না। এমন খেয়াল অবশ্য রুশ সাহিত্যিক দস্তয়ভস্কির মধ্যে ছিল। তিনিও জুয়া খেলতেন এবং বাজির শেষদানে না হারা পর্যন্ত খেলেই যেতেন। যেই হারতেন তখন বলতেন, “এখন আমার হারানোর কিছু নেই। লেখাই এখন উপযুক্ত সময়।” এবার মনে করুন কোনো চিত্রশিল্পী এক নির্জন ফসলহীন মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে নিজের কান নিজে কাটলেন। তারপর সেই রক্তাপ্লুত যন্ত্রণাবিকৃত আপন মুখচ্ছবি ক্যানভাসে চিত্রিত করলেন। আমরা তো ভাবব পাগলামির চূড়ান্ত। সেই সাথে সাথে এটাও ভুললে চলবে না, কী অসম্ভব মানসিক যন্ত্রণা আর প্রেমহীন হতাশা থেকে সেদিন শিল্পী ওই কাজটি করেছিলেন। এই শিল্পীর নাম ভ্যান গঁঘ। পরে অবশ্য সত্যি সত্যি মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন।

মনে করুন একজন লেখক, তিনি পুরুষ। সারাদিন বসে লেখেন। কিন্তু যেই সন্ধ্যে হয়, মহিলাদের মতো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পরিপাটি করে সাজেন। স্নো পাউডার কাজল রুজ—সবই ব্যবহার হয়। তারপর গায়ে দামি আতর ছড়িয়ে নৈশ বিহারে বেরিয়ে পড়েন। ইনি একজন পৃথিবীখ্যাত ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার।নাম তার গি দ্য মোপাসাঁ। সুইডিশ লেখক অগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গ ছিলেন একাধারে নাট্যকার, ঔপন্যাসিক এবং ছোট গল্পের জাদুকর। তার জন্ম ১৮৪৯ সালে। সেই বছরেই আরেক বিখ্যাত লেখক এডগার অ্যালান পো মারা যান। অগাস্ট সবসময় ধারণা করতেন, অ্যালান পোর আত্মাই তার ওপর ভর করে আছেন। পো তাকে দিয়ে সব ধরনের লেখা লিখিয়ে নিচ্ছেন। হ্যানস ক্রিস্টিয়ান অ্যান্ডারসন লেখক হিসেবে যেমন প্রসিদ্ধ ছিলেন তেমনি নানারকম অদ্ভুত খেয়ালের ব্যাপারেও তার জুড়ি মেলা ভার। হ্যানস পুড়ে মারা যাওয়ার ভয়ে বেশ ভীত ছিলেন। তিনি এতটাই ভীত ছিলেন যে, তিনি যেখানেই যেতেন, একটা লম্বা দড়ি সঙ্গে রাখতেন। যদি কোনো কারণে আগুন লাগে আর তিনি উপরতলার কোনো ঘরে সেই সময় ঘুমোন, তাহলে যেন দড়ি বেয়ে নিরাপদে নিচে নেমে আসতে পারেন—এই আশায়।

ঔপন্যাসিক নাথানিয়েল হাওথর্নের কিশোর বয়সের একটা প্রিয় খেলা ছিল নিজেকে কোনো অন্ধকার ঘরের মধ্যে আটকে রেখে কল্পনা করা যে, ঘরটার চাবি হারিয়ে গেছে। রুশ কবি মায়াকোভস্কি খেয়াল ছিল লাল কালিতে লেখা। তাই তাঁর কবিতাকে বলা হতো লাল কবিতা। প্রেমের কবিতার জন্য তিনি পৃথিবী বিখ্যাত। কবি আত্মহত্যা করেছিলেন। আর আত্মহননের ঠিক আগে যে শেষ কবিতাটা লিখেছিলেন, সে কালির রঙও ছিল লাল। তবে তা নিজের রক্তের রঙ। হাতের শিরা কেটে সেই রক্তে কলম ডুবিয়ে লিখেছিলেন শেষতম স্বগতোক্তি!

জন শিভার ছিলেন পুলিৎজার পুরস্কারে ভূষিত হওয়া একজন আমেরিকান ঔপন্যাসিক। তার অভ্যাস ছিল বিচিত্র। তিনি সক্কাল বেলা ঘুম থেকে উঠে স্যুটেড বুটেড হয়ে বেসমেন্টে যেতেন। এরপর স্যুট প্যান্ট খুলে কেবল বক্সার এবং শার্ট পরে লিখতে বসতেন। লাঞ্চ টাইমে আবারও স্যুটেড ব্যুটেড হয়ে একটি স্যান্ডউইচ খেয়ে এসে আবারও পোশাক খুলে লিখতে বসতেন। জন শিভার তো তাও কিছু একটা পরে লিখতেন। কিন্তু তার চেয়ে পোশাকের ব্যাপারে এগিয়ে ছিলেন ট্রুম্যান ক্যাপোট। তিনি বসে লিখতে পারতেন না। আদুরে বেড়ালের মতো বিছানায় বা সোফায় শুয়ে শুয়ে লিখতেন। তাতে কোনো অবাক হওয়ার ব্যাপার নেই, তাই তো? কিন্তু তিনি লেখার সময় নগ্ন থাকতেন। কেন থাকতেন এ ব্যাপারে অবশ্য মুখ খোলেননি।

বিখ্যাত ইংরেজ কবি ও সমালোচক জন ড্রাইডেন। তিনি পড়াশোনাতেই ব্যস্ত থাকতেন বেশি। তাই তার স্ত্রী লেডি এলিজাবেথের প্রতি তেমন মনোযোগ দিতেন না। একদিন স্ত্রী তার পড়ার ঘরে ঢুকে রেগে গিয়ে বললেন, “তুমি সারাদিন যেভাবে বইয়ের ওপর মুখ গুঁজে পড়ে থাকো তাতে মনে হয় তোমার স্ত্রী না হয়ে বই হলে বোধহয় তোমার সান্নিধ্য একটু বেশি পেতাম।” ড্রাইডেন তখন বইয়ের ওপর মুখে গুঁজে রেখেই বললেন, “সেক্ষেত্রে বর্ষপঞ্জি হইও, বছর শেষে বদলে নিতে পারব।” এমন কথার পর নিশ্চয়ই ড্রাইডেনের স্ত্রীর তার সাথে সংসার করার কথা না। কিন্তু করেছেন। ড্রাইডেন ‘চিনাকা’ পুরস্কারে সম্মানিত হবার পর একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সবাই যখন তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ তখন তার স্ত্রীকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করলে তিনি বলেছিলেন, “তিনি এত জ্ঞানী যে, আমার সাথে বিছানায় বাতি নিভিয়ে শোওয়ার সময়ও হাতে বই থাকলে খুশি হন।” ড্রাইডেন তখন বলেন, “এই বই-ই আমাকে বিখ্যাত করেছে। আর তুমি তার বউ।”

বিখ্যাত বা জনপ্রিয় হওয়ার নেশা সালভাদর দালির মাঝেও ছিল। একটু বেশি পরিমাণেই। ১৯০৪ সালের ১১ মে স্পেনের ক্যাটালোনিয়ার ফিগুয়েরেস শহরে সালভাদর দালির জন্ম। বিশ্বখ্যাত চিত্রকর। যৌবনে যখন দালি আমেরিকায়, বলাই বাহুল্য তখন তিনি খুব পরিচিত মুখ ছিলেন না। নিউইয়র্কবাসীর কাছে নিজেকে তুলে ধরতে দালি রাস্তায় হাঁটার সময় হাতে ঘণ্টা রাখতেন। যখন মনে হতো পথচারীরা তাঁর ওপর দৃষ্টি দিচ্ছে না, অথবা বেশি মানুষের সমাগম যেখানে—সেখানে তাঁর দিকে দৃষ্টি ফেরাতে তিনি একটানা ঘণ্টা বাজাতে শুরু করতেন! যাতে তাঁর দিকে জনসাধারণ দৃষ্টি দিতে বাধ্য হয়। তাঁর এমন কাণ্ডের সুবাদে অল্প কদিনেই দালি হয়ে উঠলেন শহরের পরিচিত মুখ। মানুষ যখন দালিকে রাস্তায় হাঁটতে দেখত, তারা আশঙ্কা করত এবং সাথে সাথে উদগ্রীব থাকত অদ্ভুত, পাগলাটে কোনো ঘটনার জন্য। কারণ ততদিনে তারা জেনেছে, দালি মানেই বেখাপ্পা কিছু ঘটবে, ঘটতে চলেছে...। তাই সিগমুন্ড ফ্রয়েড দালিকে দেখে বলেছিলেন—“স্পেনীয়দের মধ্যে এমন ফ্যানটিক আমি আর দেখিনি।” দালির ভাষ্যমতে, “বিদায় নেওয়ার আগে ভাবলাম, প্যারানয়া বা মস্তিষ্কবিকৃতিবিষয়ক আমার (দালির) প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ তাঁকে (ফ্রয়েডকে) দিই। যে ম্যাগাজিনে লেখাটি ছাপা হয়েছিল, পাতা বের করে তাঁকে সবিনয় অনুরোধ জানালাম সময় পেলে তিনি যেন তা পড়ে দেখেন। পত্রিকাটির দিকে কণামাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে ফ্রয়েড আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলেন। তিনি আগ্রহী হবেন এই ভেবে আমি বললাম, লেখাটি কোনো পরাবাস্তববাদী চালাকি নয়, বরং অতি উচ্চাশাপূর্ণ একটি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ। লেখাটির নাম পুনরাবৃত্তি করে আঙুল দিয়ে তা দেখিয়েও দিলাম। সম্পূর্ণ অমনোযোগী ফ্রয়েডের সামনে আমার গলা ক্রমশ উচ্চকণ্ঠ হয়ে আসছিল। তারপর, আমার দিকে তাঁর তীক্ষ্ণ অভিনিবেশ পরিবর্তন না করে স্তেফান জিভিগের দিকে তাকিয়ে ফ্রয়েড মন্তব্য করলেন, ‘আমি এর আগে এরকম একজন আপাদমস্তক হিস্পানীয়কে দেখিনি। আস্ত পাগল!”

কিন্তু ফ্রয়েডও তো কম পাগল ছিলেন না। ফ্রয়েড শব্দের বাংলা অর্থ করলে যা বোঝায় তাহলো ‘আনন্দ’। তো, জীবনে তিনি মানুষের মনোজগত নিয়ে সিরিয়াস চিন্তাভাবনা করলেও তিনি কি বলতে পারবেন তিনি মাঝেমাঝে কেন একটি ঘটনা প্রায়ই ঘটাতেন? সেই ঘটনার কোনো মনোবিশ্লেষণও তিনি করেননি কোথাও। কিন্তু হ্যারি ফিলার্সের ফ্রয়েডকে নিয়ে লেখা জীবনীগ্রন্থে দেখা যায়, “ফ্রয়েড যুবা বয়সে মাঝে মাঝে কোনো রেস্তেরাঁয় ঢুকে দেখা গেল খাচ্ছেন। তার আশপাশের টেবিলেও খাবারে ব্যস্ত লোকজন। সেই রেস্তেরাঁগুলোতে কোনো মিউজিকও বাজত না। না ছিল কোনো ড্যান্স ফ্লোর। কিন্তু হঠাৎই দেখা যেত ফ্রয়েড বিল মিটিয়ে তুলনামূলক একটু খোলামেলা জায়গা রেস্তেরাঁর ভেতরই বেছে নিয়ে কোমর দুলিয়ে নাচতেন এবং বলতেন, ‘আই এ্যাম ফ্রয়েড, আই এ্যাম ফ্রয়েড।” এ কি মনোযোগ কাড়ার জন্য নয়?

আরো পড়ুন ➥ তবু সে দেখিল কোন ভূত

ফিরে আসি ফের বাংলায়। কলকাতার রমাপদ চৌধুরীর একটা অদ্বুত অভ্যাস ছিল। সেটি মাথার নিচেও বালিশ দিতেন এবং চিত হয়ে শুয়ে পায়ের নিচেও বালিশ দিতেন। বালিশের কথা যখন এলোই তখন মনে পড়ে গেল সুনীল ও শক্তির একটা যুবা বয়সের ঘটনা। তারা দুজন এলএসডি খেয়ে নেশায় মত্ত হওয়ার পর এক রুমে দু বিছানায় শুয়ে আছেন। হঠাৎ সুনীল তাকিয়ে দেখেন শক্তি ওপরের ফ্যানের দিকে তাকিয়ে বালিশের তুলা বের করে বাতাসে উড়াচ্ছেন। কেন কেন? জানতে চাইলেন? শক্তি জবাবে বললেন, “ওই ফ্যানে আমার অণ্ডকোষ ঘুরছে এমন মনে হচ্ছে।”

ফ্যান নিয়ে ঘটনা আছে গৌরকিশোর ঘোষের জীবনে। তখন তিনি ট্রিলজির ‘প্রেম নেই’ উপন্যাস লিখছেন। দেশভাগের ওপর এ উপন্যাসের পটভূমি। তখন তার মধ্যে ভীষণ মৃত্যুচিন্তা কাজ করত। তো যখনই মৃত্যুচিন্তা বেশি ভর করত তখনই ঘরে ঢুকে দরোজা বন্ধ করে ফ্যান ছেড়ে তাকিয়ে থাকতেন একদৃষ্টিতে। এরকম বহুদিন করেছেন ‘প্রেম নেই’ উপন্যাস শেষ না করা পর্যন্ত। অথচ তিনি খুব বাস্তববাদী ছিলেন। কমিউনিস্ট মতাদর্শিক।

হুমায়ূন আহমেদের অনেক খেয়ালিপনার ঘটনা এদেশের সবারই জানা। একটা ঘটনা শুধু বলি। তখনও তিনি খুব জনপ্রিয় নন। নন্দিত নরকে পাঠকসমাদৃত হয়েছে আর বিটিভিতে তার লেখা নাটক প্রচার শুরু হয়েছে মাত্র। একদিন তিনি বেইলি রোড দিয়ে বিকালে যাচ্ছিলেন। মহিলা সমিতি মঞ্চে তখন নিয়মিত নাটক হতো। তো এর সামনেই নাটকপাগল মানুষেরা ফুটপাতে বসে আড্ডা দিতেন। হুমায়ূন আহমেদ দেখলেন সেই বিকালে এক লোককে ঘিরে অনেক ভিড়। লোকটা মাউথ অর্গান বাজাচ্ছেন আর বিচিত্র কিছু ভঙ্গি করছেন। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখেন লোকটা অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি। হুমায়ূন আহমেদ দাড়াতেই ফরীদি সব থামিয়ে এগিয়ে এলেন এবং বললেন, “আরে মিতা আপনি।” এরপর ফরীদি তাকে একটা দোকান থেকে হিয়ে কলম কিনে গিফট করলেন। তো সেদিনই রাতে হুমায়ুন ফরীদি আর সুর্বণা মুস্তফার বাসার সামনে একটা লোক দাঁড়িয়ে ফোন করলেন ফরীদিকে। ফরীদি ফোনকল রিসিভ করতেই লোকটা বললেন, “আমি আপনার জন্য কিছু খাবার নিয়ে এসেছি। আজ রাতটা আপনার সাথে রাতের খাবার খেতে চাই।” তখন রাত সোয়া এগারোটা। ফরীদি নেমে এলেন। যে লোকটি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি হুমায়ূন আহমেদ।

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;