সৃষ্টিশীলদের বন্ধুত্ব ও বিবাদ



দেবদুলাল মুন্না
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

আমার কাছে এখনো জগতের সেরা বন্ধু কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস। তাদের বন্ধুত্বের বড় কারণ মনে হয় দুজনেই জগতের সব মেহনতি মানুষের শোষণ থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন। তাদের বন্ধুত্বের বড় ভিত্তি বৃহত্তর। শুধু ‘আমি কেন্দ্রিক’ না।
কিন্তু বন্ধুত্ব নিয়ে আপনার কী ভাবেন? যেমন ধরুন একটা উদাহরণ দিই—
বন্ধু কে ?
অসুস্থ মানুষ ও চিকিৎসক বন্ধু।
কেন?
অসুখ।
কেন? অসুখ কেন হবে বন্ধুত্বের সেতু?
কারণ, বিপদে বন্ধুর পরিচয়। রোগীকে রোগমুক্ত করেন ডাক্তার। তাই।
তাহলে অসুখ মানে খারাপ। বিপদ। বিপদ দিয়ে শুরু হয় বন্ধুত্ব?
সে তো বটেই।
তবে স্বাস্থ্য কী?
স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য যা কিছু উপকারী সেও বন্ধু।
স্বাস্থ্য ভালো রাখে সুইমিং, জগিং, অষুধ । সেসবও তবে বন্ধু?
কেন নয়? তারাও বন্ধু।
কিন্তু তারা কি আমার প্রাণের ভাষা বুঝবে?
না বুঝলে বিপদে তাদেরই লাগে কেন?
তাহলে আমার স্বাস্থ্য যদি ভালো থাকে তবে তো সুইমিং, জগিং, অষুধ বা অসুখ বন্ধু নয়?
না তখন অসুখ তোমার এনিমি। তোমার বন্ধু স্বাস্থ্য।
এরমানে বন্ধুত্বও পরিবর্তনশীল?
অবশ্যই।

এতটুকু পড়ে কী মনে হচ্ছে আপনার? বন্ধুত্ব আসলে কী? উপরের যে কথাগুলো পড়লেন সেসব আমার না। এরকম ডায়লগের ভেতর দিয়ে উত্তর খুঁজেছিলেন ফিলোসফার প্লেটো। বইটির নাম, ‘ক্রাইসিস অব ফ্রেন্ডশিপ’। লেখা খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে। তবে কার্ল মার্কস এমন বন্ধুত্বের বাহাসে আস্থা রাখতেন না। তিনি ‘এথনোলজিক্যাল নোটবুক’-এ ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের মতো মতাদর্শিক বন্ধু না পেলে শ্রেণীসংগ্রামের লড়াইয়ের পথ খুঁজে পেতে কষ্ট হতো বলে স্বীকার করেছেন।

ফের ঝামেলা দেখা দিল, লক্ষ করুন। মতাদর্শ মালটা আবার কী? মানে ইজম মানেই তো কারাগার। এখন একই কারাগারের বাসিন্দা হয়ে বন্ধু হলে তো সে বড় সীমাবদ্ধ। আপনি অন্য কারাগারের বাসিন্দাদের বন্ধু করতে রাজি নন। বন্ধুত্বের দরজা আটকিয়ে দিলেন—এ হয় কিছু?

ব্রার্টান্ড রাসেলের মত ছিল এমন—“সব মতাদর্শই একেকটি কারাগার। তাই মতাদর্শিক বন্ধুত্ব কোনো বন্ধুত্বই না।” এসব তর্ক শেষ হবার নয়। তবু বন্ধুত্ব হয়। কখনো আজীবনের জন্য স্থায়ী হয়। কখনো বন্ধু শক্রুতে পরিণত হন। বন্ধুত্বের দুটি তত্ত্ব আছে। একটি হলো, উপযোগিতাভিত্তিক অন্যটি আনন্দভিত্তিক। আমার ধারণা উপযোগিতাভিত্তিক বন্ধুত্বই ছিল কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের মধ্যে। আর আনন্দভিত্তিক বন্ধুত্ব ছিল আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ও গারট্রুড স্টেইনের মধ্যে। ১৯২০-এর দশকে প্যারিসে গারট্রুড স্টেইন ছিলেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘ফ্রেন্ড ফিলোসফার অ্যান্ড গাইড’। হেমিংওয়ে দম্পতিকে প্রবাসজীবনে অনেক সাহায্য করেছেন গারট্রুড স্টেইন। কারণ নিছকই হেমিংওয়ের সঙ্গতা তিনি উপভোগ করেন। ১৯২৪ সালে হেমিংওয়ে বিয়ে করবেন তখন তিনি গারট্রুড ও তাঁর নারীসঙ্গী এলিস টোকলাসকে তাঁর ‘গডপ্যারেন্টস’ হতে বলেন। তাঁরা সানন্দে রাজি হন। লেসবিয়ান গারট্রুড স্টেইন ছিলেন প্যারিসের সবচেয়ে পরিচিত বিত্তশালী নারী। তিনি পরে এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, “হেমিংওয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব নিছক আনন্দের জন্যে। আমাদের মধ্যে অনেক অমিল ছিল। যেমন আমি সমকামী। আর সে সমকামিতা পছন্দই করত না।”

নারী সমকামী বন্ধুর কথা যখন এসেই গেল তখন সমকামী বিট প্রজন্মের দুই প্রধান কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ ও জ্যাক ক্যারুয়াকের কথা বলি। এখানে বলে রাখি গিন্সবার্গ যদিও পরে তার পুরুষ সঙ্গী অরলভস্কির সাথে ঘর বেঁধেছিলেন এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাদের বাসায় বেড়াতে গেলে গিন্সবার্গ অরলভস্কিকে ‘নিজের স্ত্রী’ পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু তারও আগে গিনসবার্গের সাথে জ্যাক ক্যারুয়াকের ভালো বন্ধুত্ব ছিল। এবং তারাও দুজনেই সমকামী ছিলেন। তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে একসময় রগরগে আলোচনা হতো সাহিত্যআড্ডায়। ট্রুম্যান ক্যাপোট ও হারপার লি-কে নিয়েও কম আলোচনা হয়নি সাহিত্যমহলে। একটি গল্প বলি, হারপার লি তখনও বিখ্যাত লেখক হিসেবে যশ কুড়াননি। সেসময়ই বিখ্যাত তার বন্ধু ট্রুম্যান ক্যাপোট। তারা ছিলেন শৈশবের বন্ধু। আদি ও অকৃত্রিম। মারা যাওয়ার আগে পর্যন্তও তাই ছিলেন। তো হলো কী, একসময় হারপার লি-র অসাধারণ জনপ্রিয় উপন্যাস ‘টু কিল আ মকিং বার্ড’ প্রকাশিত হলো। সেসময় বাজারে তাদের বন্ধুত্বে ফাটল ধরাতে দুজনেরই পরিচিতরা রটিয়ে দিল বইটি আসলে ট্রুম্যানের লেখা। কেউ বললেন, তা নয়, ট্রুম্যান ভালোভাবে সম্পাদনা করেছেন। হারপার লি এ বিষয়ে কিছুই বললেন না। ট্রুম্যান সত্য ঘটনা বলতে চাইলেও কেউ বিশ্বাস করলেন না। এ ঘটনার পর হারপর লি আর লেখেননি। কিন্তু সত্যটি জানা গেল অনেক পরে। নিজের খালাকে লেখা ট্রুম্যানের একটি চিঠি অনেক বছর পর ছাপা হলো কাগজে। চিঠিটি ‘টু কিল আ মকিং বার্ড’ প্রকাশের আগে লেখা। তিনি লিখেছেন, হারপার লি-র উপন্যাসটি পড়ে তিনি মুগ্ধ। তিনি আরো লিখলেন, “হারপার লি আসলেই একজন শক্তিশালী লেখক।”

আরো পড়ুন ➥ সাহিত্যে ‘নারীবাদ’

এমন বন্ধুত্বকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন? ফ্রেডরিখ নিৎসে বলেছেন, বন্ধু হচ্ছে ‘আমি’ এবং ‘আমাকে’র মাঝখানের একটি সত্তা। মানে বন্ধুর আয়নায় নিজের মুখ দেখা। মানে রিলেশনশিপের সমঝোতা। মানে নিজের ভেতরে বন্ধুকে দেখা। কিন্তু নিৎসে তেমন রাজনৈতিকভাবে হয়তো বন্ধুত্ব বা যে কোনো রিলেশনকে ব্যাখ্যায় যাননি। যেমনটি কার্ল মার্কস দেখেছেন বা জ্যাক দেরিদা দেখেছেন। দেরিদার একটি বইয়েরই নাম, ‘দ্য পলিটিকস অব ফ্রেন্ডশিপ’, বন্ধুত্বের রাজনীতি। ‘ও মাই ফ্রেন্ড, দেয়ার ইজ নো ফ্রেন্ড’—এই বক্তব্য সামনে রেখে দেরিদা বন্ধুত্বের রাজনীতি কেমন সেটি দেখাতে চেয়েছেন। তিনি এই বইতে বলছেন, “বন্ধুত্বেরও একটা রাজনীতি থাকে। সহবস্থানে থেকে অন্যপক্ষকে গুরুত্বহীন করার। এখানেই বন্ধুত্বের সম্পর্কে রাজনীতি ক্রিয়াশীল।” কথাটি তো মন্দ বলেননি। এমন কথা বহু বহু বছর আগে এরিস্টোটল বলেছিলেন। এরিস্টোটল বলেছেন, “বন্ধুত্ব ও গণতন্ত্র সাংঘর্ষিক। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গণতন্ত্র বন্ধুত্বকে সন্দেহের চোখে দেখে। এবং চূড়ান্ত গণতন্ত্র বা ন্যায়বিচারসহ অন্য উপাদানগুলা তাদের শক্তিতে সক্রিয় হয়ে উঠলে বন্ধুত্বের জন্য শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা তৈরি হয়। নাগরিকরা কোনো বিষয় আর আপোষে, দ্বিপাক্ষিক বন্ধুত্বের সূত্রে নিষ্পত্তি করতে চান না। তখন তাদের মধ্যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ন্যায়বিচারের কথা বলে বিচারক হয়ে ওঠে। গণতন্ত্রে আইনের চোখে সবাই সমান। কেউ কারো বন্ধু হলে অন্য আরেকজনের চেয়ে তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া গণতন্ত্রে কঠিন।” (সূত্র: এরিস্টোটলের রাজ্যে বন্ধু: গোপিকানাথ বসু, এক্ষণ প্রকাশন)

কিন্তু দেরিদা তার বইতে বলছেন, “বন্ধুত্ব শক্রু তৈরি করে। আর এটাই বন্ধুত্বের রাজনীতি।”

দেখা যাচ্ছে এরিস্টোটল ও জ্যাক দেরিদার চিন্তার মধ্যে মিল রয়েছে। রাজনীতিগতভাবে না দেখে একটা প্রতিক্রিয়া দেখব এখন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের। ২০১০-এ মারিও ভার্গাস য়োসার সাহিত্যে নোবেল প্রাপ্তিতে প্রতিক্রিয়া হিসেবে লাতিন আমেরিকার আরেক নোবেলজয়ী গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের টুইটার বার্তা ছিল “এবার আমরা সমকক্ষ”। দেরিদাপন্থীদের কাছে এই টুইট বার্তার মাজেজা অন্যরকম হলেও গণমাধ্যমগুলো অবশ্য এ মন্তব্যের পেছনের কারণটুকু বুঝে নিয়েছিল সাধারণভাবেই। পেরুর মারিও ভার্গাস য়োসা এবং কলম্বিয়ার গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মধ্যে একসময় যেমন তুমুল বন্ধুত্ব ছিল, তেমনি ঘটনাচক্রে তারা পরস্পর মুখদর্শন পর্যন্ত স্থগিত রাখেন। যদিও নিজমুখে এরা কেউই একে অন্যের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত করেননি, তথাপি অনেকেই ধারণা করে থাকেন য়োসার স্ত্রীর প্রতি নজর দেওয়াই ছিল মার্কেজের চোখে কালো দাগ বসিয়ে দেওয়া য়োসার ঘুষির কারণ। সম্পর্কের ইতি বস্তুত সেদিন থেকেই এবং তা জারি ছিল শেষ পর্যন্ত। এরকম একটি মুখরোচক ঘটনার কারণেই মারিও ভার্গাস য়োসার নোবেল প্রাপ্তির পরপরই গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের নামও উঠে এসেছে গণমাধ্যমগুলোতে। সেসব জটিল হিসেবনিকেশে না গিয়ে বন্ধুত্ব ও বন্ধু থেকে শক্রতে পরিণত হওয়া চরিত্রগুলো আসেন দেখি।

ফরাসি কবি গিওম আপোলিনেয়ারের সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব ছিল শিল্পী পাবলো পিকাসোর। মাঝেই মাঝেই তারা বিভিন্ন দেশ ঘুরতে বেরুতেন। হোটেলের এক রুমেই থাকতেন। প্যারিসের রাস্তায় একই রঙের পোশাক পরেও হাঁটতে দেখেছেন অনেকে যারা তাদের চিনতেন। এমনই গভীর বন্ধুত্ব হয়েছিল ফিলোসফার সক্রেটিসের সঙ্গে এক যৌনকর্মীর। নাম, থিওজেট। থিওজেট যাতে ওই পেশা ছেড়ে দেন এজন্য সক্রেটিস অনেক চিঠি লিখেছেন তাকে। কিন্তু থিওজেট বারবারই প্রশ্ন করতেন, “এই পেশা ছেড়ে দিলে আমি কিভাবে চলব? আমার আয়?” সক্রেটিস এর ফয়সালা করতে পারেননি। থিওজেট বন্ধু সক্রেটিসকে বলেছিলেন, “বন্ধু, আপনিই আমার ব্যবসায়ে একমাত্র ক্লায়েন্ট হন তবে?” সক্রেটিস ছিলেন নিরুত্তর। যদিও এমন কথাও শোনা যায় যে সক্রেটিস বলেছিলেন, যেভাবে তাঁর জ্ঞানপিপাসু শিষ্যরা নিয়মিত তাঁর কাছে ভিড় জমায়, থিওজেট যদি তা করতে রাজি থাকেন, তাহলে তিনি তাঁর বন্ধু ও ব্যবসায়ের অংশীদার হতে সম্মত থাকবেন। কিন্তু সক্রেটিসের চরিত্র বিবেচনায় বন্ধু হিসেবে তিনি থিওজেটের কাছে নিরুপায়ই ছিলেন। নিরুপায় ছিলেন বন্ধুত্ব রক্ষায় রালফ ওয়াল্ডো এমার্সন। তবু বন্ধুত্ব টিকিয়ে রেখেছিলেন আজীবন হেনরি ডেভিড থোরিও-র সাথে। কারণ হেনরি ডেভিড থোরিও একসময় নেশাসক্ত হয়ে পড়েন। নেশার জন্যে আড্ডা থেকে সামান্য জিনিসও চুরি করতেন। সেসবের জন্য বন্ধুরা তাকে বয়কটেরই ঘোষণা দিল। কিন্তু বাধ সাধলেন রালফ ওয়াল্ডো এমার্সন। তিনি অন্য বন্ধুদের মিথ্যা বললেন, “সে (হেনরি ডেভিড থোরিও) যা কিছু চুরি করে সেটি তো আমার জন্য। আমার খরচাপাতিতে সে আমাকে আর্থিক সাহায্য করে। অতএব তাকে বয়কট করলে আমিও আর তোমাদের বন্ধু নেই।” রালফ ওয়াল্ডো এমার্সন তার অন্যসব বন্ধুকে ত্যাগ করলেন হেনরি ডেভিড থোরিও-র সঙ্গে বন্ধুত্ব রক্ষা করার জন্যে। পরে ডেভিড থোরিও তার কাছে জানতে চাইলেন, “তুমি এমন করলে কেন, আমি নেশা করি। তুমি তো করো না। কেন এক নেশাখোর বন্ধুর বদনামকে প্রশ্রয় দিলে।” এমার্সন মুখ ফিরিয়ে শুধু বলেছিলেন, “জানি না, আমি তোকে ভালবাসি। তুই কেন নেশা করিস সেটি স্পর্শ করে আমাকেও। তোর বেদনা বন্ধু হিসেবে আমারও।” দুজনেরই কথা হচ্ছিল নিচারা পাহাড়ের উঁচু ঢালে। কথাগুলো এমার্সন মুখ ঘুরিয়ে বলেছিলেন। তার গাল বেয়ে পড়ছিল ফোঁটা ফোঁটা কয়েক বিন্দু কান্না।

এছাড়া বন্ধু হিসেবে সেরা জুটি ছিলেন শার্লট ব্রন্টি ও এলিজাবেথ গাসকেল, জে আর আর টেলেকিচ এবং সিএস লিউইস, ক্রিস্টোফার আইশারহুড ও ডব্লিউ এইচ আডন, গুন্টার গ্রাস এবং জন আরভিং। গুন্টার গ্রাস মারা যাওয়ার পর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে তার বন্ধু জন আরভিং বলেছিলেন, “আমি হয়তো লেখালেখি করতাম না। আমাকে লেখায় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন চার্লস ডিকেন্স আর হাতে ধরে বলা যায় শিখিয়েছিল আজ যে মারা গেল, আমার বন্ধু গুন্টার গ্রাস। আজ থেকে আমি বন্ধুহীন। আমার ভেতরের কথাগুলো শেয়ার করার আর কেউ থাকল না।”

টি এস এলিয়ট এবং এজরা পাউন্ড। এই দুই কবি ইংরেজিতে মর্ডানিজমের প্রারম্ভিক পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন কাব্য জগতে। তাদের বন্ধুত্ব ছিল অন্যতম। এজরা পাউন্ড একটু দক্ষিণপন্থী রাজনীতির পক্ষে ছিলেন। উল্টোদিকে এলিয়ট রাজনীতিবিমুখ ছিলেন, কিন্তু মানবতাবাদী, ফ্যাসিস্টদের বিপক্ষেই তিনি ছিলেন সোচ্চার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এক রূপান্তরিত পৃথিবীতে মানুষের অসহায়ত্বকে এলিয়ট তুলে এনেছেন ‘দ্য লাভ সং অব জে আলফ্রেড প্রুফ্রক’, ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড, দ্য হলৌ মেন’সহ তার বিভিন্ন কবিতার বইয়ে। জন্ম তাঁরও এজরা পাউন্ডের মতো আমেরিকায়। পরিচয়ও দুজনেরই ওখানেই। পরে দুজনেই স্থায়ী হন ব্রিটেনে। পরিচয়ের দিন তাঁরা ওয়াশিংটন ডিসির একটা কফিশপে বসে কফি খাচ্ছিলেন। পাশাপাশি। তখন এজরা জানতে চান, “কী করেন আপনি?” এলিয়ট জবাবে বলেন, “কবিতা লেখি।” এজরা মজা করে বলেন, “এটা কোনো করা হলো? পেশা তো না আর।” এলিয়ট ফের জবাবে বলেন, “আমি পেশাদারী না। আমি কবিতার নোশাখোর একটা মানুষ।” সেকথা শুনেই এলিয়টকে জড়িয়ে ধরেন পাউন্ড। এরপর বন্ধুত্ব। সেই বন্ধুত্ব এমনই যে এলিয়ট ব্রিটেনে স্থায়ীবসবাস শুরু করলে পাউন্ডও সেখানে স্থায়ী।

ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও কোলরিজ, টনি মরিসন এবং অ্যাজিলা ডেভিস, পল ভ্যালেরি ও আঁতুর রেবো; হেনরি মিলার এবং লরেন্স ভারেল, ভ্লাদিমির নবোকভ, এডমুন্ড উইলসন নরম্যান নেইমার ও জ্যাক অ্যাবট, ভিক্টর হুগোর সঙ্গে পিয়ানোবাদক ফ্রানৎস লিজ, ফ্রানৎস কাফকা ও ম্যাক্সেব্রড এমন অনেক বন্ধুত্বের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।

জীবনে বন্ধুত্ব ও শিল্পের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন প্রখ্যাত ইংরেজ কবি লর্ড বায়রন। তিনি কবি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর সঙ্গে প্রখ্যাত রোমান্টিক কবি পার্সি বিশি শেলির বন্ধুত্ব হয় কাকতালীয়ভাবে। বায়রনের সঙ্গে শেলির বন্ধুত্ব হয়ে গেল প্রথমবারের আলাপচারিতায়। যদিও এর আগে শেলি বায়রনের ভক্ত ছিলেন, কিন্তু তাদের দেখা সেবারই প্রথম। এরপর শেলি এবং বায়রন দুজন একসঙ্গে প্রচুর সময় কাটিয়েছেন লেক জেনেভার পাড়ে। তারা নতুন নতুন জায়গা ও ঘটনার খোঁজে বেরিয়েছেন। শেলি লিখেছেন, বায়রনের সাহচার্য তাকে কবিতা লেখার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছিল। শেলির ‘হেইম টু ইন্টেলেকচুয়াল বিউটি’ তাদের দুজনের নৌ-ভ্রমণ থেকে উদ্বুদ্ধ হয়েই লেখা। অপর এক বন্ধুর কাছে লেখা চিঠিতে শেলি বায়রন সম্পর্কে লিখেছেন: “সে খুবই মজার মানুষ, কিন্তু অপমান ও অন্যায়ের শিকার।” বায়রনের বন্ধুত্ব শুধু শেলির সঙ্গে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তাঁর পরিবারের সঙ্গেও হয়েছে। এক বৃষ্টির রাতে ভৌতিক গল্পের আসরে বায়রন সেখানে উপস্থিত অন্যদের একটি করে ভূতের গল্প লেখার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। সেখানে পার্সি বিশি শেলির স্ত্রীও ছিলেন। সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেই ম্যারি শেলি লিখে ফেললেন বিখ্যাত উপন্যাস ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’।

আলবেয়র কামু ও জাঁ পল সার্ত্রে দুজনই প্রভাবশালী দার্শনিক ও সাহিত্যিক। কিন্তু তাদের মধ্যে চিন্তার অমিলও ছিল অনেক। যেমন, মানুষের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে দুই জনের দুই মত। দুজনেই অস্তিত্ববাদী হলেও সার্ত্রে শেষে সমাজতান্ত্রিক হন। কামু হননি। এভাবেই দুজনের বিরোধের শুরু। নোবেল পুরস্কার জেতার পর কামু একবার বলেছিলেন, “সার্ত্রের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অসাধারণ। কারণ আমরা কেউ কারো মুখ দেখি না।” আবার সার্ত্রেকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন কামুকে আগে দেওয়া হয়েছে বলেও রটনা রয়েছে। কিন্তু গাড়ি দুর্ঘটনায় কামু মারা গেলে সার্ত্রে ধীরে ধীরে অনুধাবন করেন, কামুই ছিল তার শেষ বন্ধু। সার্ত্রে ও কামুর মতো চার্লস ডিকেন্স ও হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের বন্ধুত্ব টেকেনি শেষঅব্দি। দুজনের প্রথম দেখা ১৮৪৭ সালের জুলাই মাসে। এরপর নয় বছর দেখা হয়নি তাদের। ডিকেন্স বন্ধুকে লেখেন: “নয় বছরে ভেবো না তুমি ইংরেজদের মন থেকে হারিয়ে গেছো। তোমার অবস্থান তাদের অন্তরে আরো পোক্ত হয়েছে। এসেই একবার দেখে যাও।” হ্যান্স চলে যান। ডিকেন্সের বাড়িতে তাঁর জন্য বরাদ্দ কক্ষটিতে থাকলেন। থিয়েটারে গিয়ে ডিকেন্সের অভিনয় করা নাটক দেখে চোখের পানি মুছলেন। তবে দ্বিতীয় দিনই ঘুম থেকে উঠে তাঁর দাড়ি কামিয়ে দেওয়ার মতো কাউকে না পেয়ে অসন্তুষ্ট হলেন তিনি। ডিকেন্সের বড় ছেলেকে দিয়ে ঘোড়ার গাড়ি আনিয়ে শহর থেকে শেভ করে এলেন। ডিকেন্স ও হ্যান্সের বেড়ে ওঠা এবং সাংস্কৃতিক পরিচিতি ভিন্ন ধরনের হওয়ায় প্রতিদিনই জমা হতে থাকল অসন্তোষ। ওদিকে দুই সপ্তাহের জন্য এসে হ্যান্স রয়ে গেলেন পাঁচ সপ্তাহ। যেদিন তিনি বিদায় নিচ্ছেন, দেখলেন, দরজায় একটি কাগজে ডিকেন্স লিখে রেখেছেন—“এই কক্ষে হ্যান্স পাঁচ সপ্তাহ ছিলেন। কিন্তু আমাদের মনে হয়েছে কয়েক যুগ।”

আরো পড়ুন ➥ সাহিত্যে চুরি

বন্ধুত্বে ফাটলও ধরেছে এমন উদাহরণ কম নয়। কম হওয়ার কথাও নয়। যেমন, জন কিটস ও লর্ড বায়রন। তাদের বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছিল। বায়রন ছিলেন উন্নাসিক ও উচ্চবিত্ত। অন্যদিকে কিটস ছিলেন নিতান্তই মধ্যবিত্ত। ফলে বায়রনের সফলতা কিটসকে ঈর্ষান্বিত করত সবসময়। কেউ কারো কাজের প্রশংসা করতেন না। জন লে কার ও সালমান রুশদি ভালো বন্ধু ছিলেন। সালমান রুশদির ১৯৮৯ সালে ‘দি স্যাটানিক ভার্সেস’ বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর ইসলামপন্থী উগ্রবাদীরা তার মুণ্ডু চেয়েছিল ‘নাস্তিক’ ঘোষণা দিয়ে। এরপর ১৯৯৭ সালে যখন গার্ডিয়ান-এ তার বন্ধু লে কার একটি লেখায় রুশদির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন, তিনি কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করতে পারেন না। অভিযোগের জবাব দেন সালমান রুশদি। তিনি বলেন, “তিনি এত উদারপন্থী আমার জানা ছিল না। যতটুকু জানি সে তো বেশ্যাগমন করে এবং উপাসনালয়ে যায় না।” এর উত্তরে লে কার জানান, “রুশদির ওপর করা আক্রমণের বৈধতা নিয়ে আমার কোনো সমর্থন ছিল না। আমি ছিলাম ধর্মের পক্ষে। কোনো আইনই বৈধতা দেয় না এমন মহৎ ধর্মকে অপমান করার।”

ড্যারেক ওয়ালকট ও ভি এস নাইপল ভালো বন্ধু ছিলেন। কিন্তু খ্যাতির বিড়ম্বনার কারণে কিনা জানা যায়নি একসময় ওয়ালকট নাইপলের বিরুদ্ধে অনেক বিরূপ সমালোচনা করেন। ২০০৮ সালে এক আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে ড্যারেক ওয়ালকট একটা কবিতা ‘দি মনগুজ’ পাঠ করেন। কবিতাটি শুরু হয় এভাবে:
“আমাকে কামড়েছে। আমার ইনফেকশন এড়াতে হবে
নয়তো আমি মরে যাব; নাইপলের উপন্যাসের মতোই।
তার শেষ উপন্যাসটা পড়লেই বোঝা যাবে যা বলছি আমি।”
নাইপল কী এমন করেছেন যে জন্য ওই কবিতা দিয়ে আঘাত করলেন ওয়ালকট? কেন এত ক্ষেপেছিলেন ওয়ালকট বন্ধু হয়ে? কারণ নাইপল তার উপন্যাস ‘অ্যা রাইটার্স পিপল’-এ ওয়ালকটের উদ্দেশ্যে বলেন, “একজন মানুষ যার অনেক প্রতিভা থাকলেও তিনি উপনিবেশিক ধারণা দ্বারা বেষ্টিত।”

রবীন্দ্রসংগীতে সখী মানে (বন্ধু)কে এভাবেই বলা হয়েছে—“ভালোবেসে সখী নিভৃত যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনেরও মন্দিরে।” এই বন্ধু, সখা, ও সই নিয়ে বাংলা গান ও কবিতার উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। কবি জসীমউদদীন আহমেদ ‘আমার বাড়ি’ কবিতায় বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করেছেন এভাবে—
“আমার বাড়ি যাইও ভোমর,
বসতে দেব পিঁড়ে,
জলপান যে করতে দেব শালি ধানের চিঁড়ে।
শালি ধানের চিঁড়ে দেব,
বিন্নি ধানের খই,
বাড়ির গাছের কবরী কলা
গামছা বাঁধা দই।”


বাংলা ভাষায় সনেটের প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি হিন্দু কলেজে পড়ার সময় ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজনারায়ণ বসু, গৌরদাস বসাক, ভোলানাথ চন্দ্র, বঙ্কুবিহারী দত্তরা তার সহপাঠী ও বন্ধু ছিলেন। কখনো ফারসি গজল গান গেয়ে, কোনোদিন বিলেতি দোকানে চুল কাটিয়ে, কখনো শেক্সপিয়র-বায়রন আবৃত্তি করে তিনি বন্ধুদের চমকে দিতেন। আবার শিক্ষকের প্রতি সরব অশ্রদ্ধা, মদ্যপান, অমিতব্যয়িতা সবই ছিল তার নাটকীয়। গুঞ্জন রয়েছে বন্ধু গৌরদাস বসাকের সঙ্গে সমকামী রিলেশনও গড়ে তুলেছিলেন। এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘সেইসময়’-এ। মাইকেলের বিদেশ থেকে ফেরার পর এবং অতিরিক্ত মদ্যপানসহ আর্থিক সংকটে যখন তার বিপর্যস্ত অবস্থা তখন বন্ধুর মতো তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন একজন ঈশ্বরচন্ত্র বিদ্যাসাগর। তিনি টাকা পয়সা দিয়ে মাইকেলকে সবসময় সাহায্য করতেন। পঞ্চানন নামের একজন একদিন বিদ্যাসাগরকে বলেছিলেন, “আপনি মাইকেলের মতো মদ্যপকে টাকা দেন বিপদে পড়লে, কই আমাদেরকে তো সাহায্য করেন না?” জবাবে বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, “আগে মাইকেলের মতো যোগ্যতা অর্জন করে এসো, তবে সাহায্য করব।”

আমাদের দেশে একসময় ভালো বন্ধু ছিলেন কবি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ। কিন্তু একসময় তাদের বন্ধুত্বে ফাটল ধরে মতাদর্শিক কারণে। শামসুর রাহমান মনে করতেন তার বন্ধু আল মাহমুদে ‘ইসলামী মৌলবাদী’ হয়ে গেছেন। কলকাতায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বন্ধুত্ব নিয়ে রয়েছে অনেক কাণ্ড-কীর্তি। তারা দুজনে একসাথে বহু জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন। রাতে মদ খেয়ে শক্তি বন্ধু সুনীলের বাসায় গিয়ে বন্ধুপত্নী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়কে ম্যানেজ করার জন্য বলতেন, “আপনার সামনে এলেই আমার সব মাতলামি ছুটে যায়।” (শক্তিকে নিয়ে স্বাতীর লেখা, আনন্দবাজার পত্রিকা) একদা রাতের কলকাতাকে শাসন করতেন তারা। তাদের বন্ধু ছিলেন আমাদের দেশের বেলাল চৌধুরী। পঞ্চাশের দশকে সৈয়দ শামসুল হক-কাইয়ুম চৌধুরীর মধ্যে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব টিকে ছিল দীর্ঘদিন। আবার ষাটের দশকে এসে আবুল হাসান-নির্মলেন্দু গুণ, নাট্যজন মামুনুর রশীদ-মহাদেব সাহা—এই চারজনের বন্ধুত্বময় জীবনের বিচিত্র গল্প কতই না মনকাড়া!

একদিনের একটা গল্প বলি, তখন কবি গুণ ও মামুনুর রশীদ বয়সে তরুণ। থাকেন তেজগাঁও পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের হোস্টেলে। এক সকালে দুই বন্ধু পুরান ঢাকায় গিয়েছেন। আড্ডা সেরে পড়ন্ত বিকেলে ফেরার পথে দুজনেই টের পেলেন অতি ক্ষুধার্ত তারা। কী করা। তো, গুণ মামুনুর রশীদকে বললেন, “আয়, একটা হোটেলে ভাত খাই। খাওয়ার পর আমি যা করি তা-ই শুধু করবি। চল।” দুজনে হোটেলে ভাত খেলেন। মামানুর রশীদ ভাবলেন গুণের কাছে নিশ্চয়ই টাকা আছে। হাত মুখ ধুয়ে গুণ এগিয়ে গেলেন ক্যাশ কাউন্টারের দিকে। পেছনে মামুনুর রশীদ। গুণ তাকে বললেন আগে যা। মামুনুর রশীদ আগে গেলেন। এবার ক্যাশ কাউন্টারের সামনে গিয়ে গুণ বললেন, “এই বিল কত হয়েছে?” ম্যানেজার বিল বলার আগেই গুণ এমন একটা ভাব নিয়ে যেন পান খাবেন হোটেলের একদম লাগোয়া পান সিগারেটের দোকানে সেভাবে এগুলেন। ম্যানেজার বিল বললেন। কত কে জানে। দে দৌড়। রাস্তায় তেমন ভিড় নেই। দুজনই দৌড়ে বায়তুল মোকাররমের কাছাকাছি এসে থামলেন একটা গলিতে। মামুনুর রশীদ কবি গুণের দিকে তাকিয়ে আছেন, গুণ শুধু বললেন, “বন্ধু, জীবনটা এই দৌড়ই।”

২১ আগস্ট ১৯১১। ল্যুভ মিউজিয়াম থেকে চুরি হয়ে যায় লিওনার্দো দা ভিঞ্চির বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘মোনালিসা’। পরদিন শিল্পী লুই বেরুদ মিউজিয়ামে গিয়ে দেখলেন, পাঁচ বছর ধরে ‘মোনালিসা’ যেখানে শোভা পাচ্ছিল, সেখানে দেয়ালে কেবল চারটি পেরেক, শিল্পজগতের সবচেয়ে আলোচিত এই নারী নেই। প্রথমে মনে করা হলো, ল্যুভের কোনো বিজ্ঞাপনী প্রয়োজনে ছবি তুলতে হয়তো ‘মোনালিসা’কে অন্য কোথাও সরানো হয়েছে; কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এমন কিছু ঘটেনি বলে জানালেন। অর্থাৎ ‘মোনালিসা’ চুরি হয়ে গেছে। গোটা সপ্তাহের জন্য বন্ধ হয়ে গেল ল্যুভ মিউজিয়াম।

গিওম আপোলিনেয়ার একবার ল্যুভ পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। সুতরাং পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করল, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুরল জেলে। গিওম পুলিশি প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে শিল্পী পাবলো পিকাসোর নাম বলে দিলেন। গ্রেপ্তার হলেন তিনিও। অবশ্য চুরির সঙ্গে তাঁদের কারোরই কোনো যোগসূত্র না পাওয়ায় একসময় ছেড়ে দেওয়া হয় দুজনকেই। উদ্ধারকৃত ‘মোনালিসা’ ৪ জানুয়ারি ১৯১৪ ল্যুভে ফিরে আসে।

গিওমের মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্তিতে পিকাসো আবার তাঁকে স্মৃতি থেকে এঁকেছিলেন। গিওমকে এঁকেছেন অঁরি রুশো, মাতিসে, মার্ক শাগাল, মিখাইল লারিনোভ, জুয়ান গ্রিস, জ্যা ম্যাটজিঞ্জার, মার্সেল জর্জিও চিরিকো এবং অভিন্নহৃদয় বন্ধু পিকাসো তো বটেই।

‘শুধু তোমার বাণী নয় গো হে বন্ধু, হে প্রিয়’—রবীন্দ্রনাথ শুধু বাণীতে সন্তুষ্ট থাকতে চাননি, প্রাণে তাঁর পরশও চেয়েছেন। একটা সময় ছিল সানন্দে, সগর্বে বন্ধুর কথা বলা যেত। তারপর কী যে হলো, বেশ জোর দিয়ে বন্ধুর দাবি যিনিই করুন, নারী বা পুরুষ—আমরা কিছুটা সন্দিহান হয়ে উঠি।

একালের বন্ধুত্বের যে ব্যাখ্যাই থাক না কেন, সেকালের অন্তত ১০ জন শ্রেষ্ঠ মানুষ বন্ধুত্বের গুরুত্ব ও মহিমা প্রচার করেছেন এবং বলেছেন, হীনম্মন্য মানুষের জন্য বন্ধুত্ব নয়। তাঁরা হলেন হোমার, সোপোক্লেস, হেরোডোটাস, হিপ্পোক্র্যাটস, অ্যারিস্টোফেনস, ইউরিপিডেস, সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল ও ইউক্লিড।

আরো পড়ুন ➥ বাংলা সাহিত্যে দেশভাগ

সৃজনশীল মানুষের বন্ধুত্বের কাহিনী শতসহস্র বছরের দূরত্ব ডিঙিয়ে আমাদের কাছে পৌঁছায়। রোমান লেখক প্লিনি দ্য এন্ডার (মূল নাম গাইয়াস প্লিনিয়াস সেকান্দার) তাঁর লেখকবন্ধুর জন্য আক্ষরিক অর্থেই জীবন দিয়েছেন। তাঁর জন্ম ২৩ খ্রিস্টাব্দে, মৃত্যু ২৫ আগস্ট ৭৯ খ্রিস্টাব্দে। রোমান লেখক এবং প্লিনির নারী বন্ধু রেকটিনার একটি বার্তা তাঁর কাছে পৌঁছে: বিসুবিয়াস আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং লাভাক্ষরণ শুরু হয়েছে, রেকটিনা ও পম্পোনিয়াসকে উদ্ধার করতে হবে। প্লিনি যখন তাঁদের উদ্ধার করতে গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছান, বিসুবিয়াসের অগ্নিক্ষরণ শুরু হয়। তাঁর নৌকার মাঝিরা তাঁকে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেন। প্লিনির মুখ থেকে বের হলো সেই ঐতিহাসিক জবাব, “ফরচুন ফ্যাভার্স দ্য ব্রেভ”। তীরে নেমে তিনি পম্পোনিয়াসকে আলিঙ্গন করলেন, কিন্তু কোথাও রেকটিনাকে পেলেন না। আবার অগ্ন্যুৎপাত শুরু হলো। তিনদিন পর আগ্নেয়গিরি শান্ত হলে দেখা গেল জমাট লাভার মাঝখানে প্লিনি দ্য এন্ডার বসে আছেন, এতটুকু ক্ষতও তাঁর দেহে নেই। কিন্তু তিনি নিষ্প্রাণ। বিসুবিয়াস পম্পেই ও হারকুলিয়াম নগর দুটিকে ধ্বংস করে দেয়। রেকটিনারও কোনো হদিস মেলেনি। কোনো সন্দহ নেই, প্লিনি দ্য এল্ডার এবং রেকটিনার বন্ধুত্ব ধ্রুপদ ধরনের। পরবর্তীকালের গবেষকেরা দুজনের মধ্যে শারীরিক সম্পর্কের সম্ভাবনার কথাও উড়িয়ে দেননি।

খ্রিস্টজন্মের শতবর্ষ আগের বিখ্যাত লেখক মার্কাস সিসেরো বন্ধুত্ব নিয়ে তাঁর বিখ্যাত অভিসন্দর্ভ De Amicitia তাঁর বন্ধু টাইটাস পম্পিনাস এট্টিমাসকে উৎসর্গ করেন। টাইটাস ও সিসেরোর মধ্যে বহুসংখ্যক পত্রবিনিময় হয়েছে এবং তা গ্রন্থভুক্ত হয়েছে। সিসেরো দর্শন, আইন, রাষ্ট্রনীতি, প্রশাসন, সাহিত্য—প্রায় সব বিষয়েই লিখেছেন। বেন জনসন ও উইলিয়াম শেকসপিয়ারের চরিত্র হয়ে উঠেছেন মার্কাস সিসেরো।

প্লেটো, অ্যারিস্টটল ও সিসেরোর পথ ধরে বন্ধুত্বের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দিকের বিশ্লেষণ করেছেন সেইন্ট অগাস্টাস (৩৪৫-৪৩০), সেইন্ট থোমাস একুইনাস (১২২৫-১২৭৪), আল গাজ্জালি (১০৫৮-১১১১), ফ্রান্সিস বেকন (১৫৬১-১৬২৬)

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;