সাহিত্যে চুরি



দেবদুলাল মুন্না
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

সাহিত্যে অন্য লেখকের ‘ভাব’ বা ‘ধারণা’ বা পুরো বিষয়টিই চুরি করার অভিযোগ আছে। অভিযোগ পুরনো। চুরিও পুরনো পেশা। তাই দুটিই চলছে এখনো। এ অভিযোগ থেকে রেহাই পাননি বিশ্বসাহিত্যের অনেক সেরা সাহিত্যিকরাও। তবে জর্মন কবি গ্যাটে বলেছেন, সাহিত্যে তালি মারা (মানে একজায়গা থেকে এক ভাব নিয়ে অন্য জায়গা থেকে অন্য ভাব নিয়ে মিশেল করা) আর্ট। একে চুরি বলা ঠিক না। কারণ বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশল এখানে খাটাতে হয়। শুধু হুবহু চুরি না করলেই হয়। লাতিন শব্দ ‘প্লেজিয়্যারিয়াস’-এর অর্থ হচ্ছে সাহিত্য ভাবনা চুরি বা অপহরণ।

বাংলায় এর যথার্থ শব্দ কী হবে আমি জানি না। তাই সরাসরি চুরিই ব্যবহার করছি। ইংরেজ নাট্যকার বেন জনসন ১৬০১ সালে শব্দটিকে ইংরেজি সাহিত্যে পরিচয় করিয়ে দেন। পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কারণ তাঁরই এক বন্ধু ‘ডিফল্টার’ নামে তাঁর এক নাটক ফরাসি ভাষায় হুবহু চুরি করে লিখেছিলেন। সেই বন্ধুর নাম, ফ্লবে আত্র। তবে যেসব লেখকেরা চুরির দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন তাদের মধ্যে বড় একটা অংশ অভিযোগ অস্বীকার করে যা বলেন সেটি হচ্ছে—“বিষয়টি ঘটেছে কাকতালীয় বা ভাবনার সাযুজ্যের” জন্য। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, “আর্টস ইজ আ মিউটেশান”—মানে শিল্পের রূপান্তর ঘটানো যায়। এর জন্য কী লাগে হে? শব্দের ডিনোটেটিভ বা শাব্দিক অর্থ আড়াল করা। এই আড়াল করাকে বলা হয় ইউফেমিজম। এই ইউফেমিজমের ভেতরেই থাকে প্যারাফ্রেজিং, সাবকন্সাস প্যারাফ্রেজিং, ডাইল্যুশান ইত্যাদি। যেমন একটা উদাহরণ দেওয়া যায় , কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিদ্রোহী কবিতার জন্য বিশেষ খ্যাত। নজরুলের এ কবিতার “বলো বীর—/ বলো উন্নত মম শির,/ শির নেহারি আমারি নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!/ বলো বীর—/ বলো মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি/ চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি/ ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া/ খোদার আসন আরশ ছেদিয়া,/ উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!/ মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!/ বলো বীর—/ আমি চির উন্নত শির।”-এর জায়গায় একসময় ভবকুমার প্রধান লিখেছিলেন ‘অসমছন্দ’ কবিতাটি। কবিতাটি এমন: “আমি ব্যাঙ/ লম্বা আমার ঠ্যাং/ ভৈরব রভসে বর্ষা আসিলে ডাকি যে গ্যাঙোর গ্যাং/ আমি ব্যাঙ/ আমি পথ হতে পথে দিয়ে চলি লাফ/ শ্রাবণ নিশায় পরশে আমার সাহসিকা/ অভিসারিকা/ ডেকে ওঠে ‘বাপ বাপ’।”

আরো পড়ুন ➥ বাংলা সাহিত্যে দেশভাগ

অবশ্য সেসময় প্যারোডির নামেও এসব লেখা হতো। সজনীকান্তের কাব্যপ্রতিভা তো প্যারোডি করতে করতেই ফুরাইল বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। প্রশ্ন হলো কেন এরকম চুরি করেন সাহিত্যিকরা? এর জবাবে টি এস এলিয়ট বলছেন, “অপরিণত কবিরা অনুকরণ করেন; পরিণত কবিরা চুরি করেন।” অথচ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে ব্রিটেনের অখ্যাত কবি ম্যাডিসন কেইনের কবিতা চুরির। বিশ্বখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের এমন কিছু নাম এ তালিকায় আসবে অনেকেই জেনে হোঁচট খাবেন। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে শেক্সপিয়র। ভায়া পাবলো নেরুদা থেকে ২০০২ সালে তাঁর ‘লাইফ অব পাই’ উপন্যাসের জন্য ম্যান বুকার পুরস্কার জেতা ইয়ান মার্টল হয়ে ড্রান ব্রাউন, জীবনানন্দ দাশ ও আমাদের দেশের হেলাল হাফিজসহ অসংখ্য।

এডগার এলান পো ও ন্যাথানিয়েল হর্থনের গল্পের মিল রয়েছে রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি গল্পে। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রবিবার’ গল্পটি হুবহু এলান পো-র ‘দি এথিস্ট’ গল্পের কার্বন কপি। এদিকে পাবলো নেরুদাও বসে নেই। তিনি উঠতি বয়সে রবীন্দ্রনাথের ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা’-কে “In my sky at twilight you are like a cloud” এবং ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’-কে “Come with me, I said, and no one knew” শিরোনামে প্যারাফ্রেজ করে লিখেছিলেন। পরে অবশ্য ভুল স্বীকার করেছিলেন। আর শেক্সপিয়র? তাকে নিয়ে এতকাল এমন একটি গল্প প্রচলিত ছিল যে, এক যোদ্ধা যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ঘোড়ায় চড়ে পালানোর সময় তাঁর কাছ থেকে একটি ব্যাগ পড়ে যায় সেই ব্যাগে কিছু পাণ্ডুলিপি ছিল। সেগুলো থেকেই নাকি শেক্সপিয়র লিখেছেন। ওগুলোকে গালগল্প হিসেবে শেক্সপিয় ভক্তরা চালালেও এখন তারা কি বলবেন যে শেক্সপিয়ার মহাচোর ছিলেন না ? অতি সম্প্রতি তাঁর সৃষ্ট কিং লিয়ার, ম্যাকবেথ, রিচার্ড তৃতীয়, হেনরি পঞ্চম এবং আরো সাতটি মোট এগারোটি নাটক যে চুরি করে লেখা আজ তা প্রমাণিত। এটি ধরা পড়েছে প্লেজ্যারিজম সফটওয়্যার Wcopyfind-এর সাহায্যে। ভাবুন অবস্থা! চুরি করলে কিন্তু মাফ নেই। বেরিয়ে গিয়েছে প্রযুক্তির বদৌলতে চোর ধরার সফটওয়্যারও।

ভূমেন্দ্র গুহরায়কে একবার কথায় কথায় জীবনানন্দ বলেছিলেন, “তুমি কি কুম্ভীলকবৃত্তির কথা বলছো? তুমি যে সমাজে বাস করো, সে সমাজের ভাষাও তোমার জিভে চলে আসে।... তুমি যদি অ্যাডগার অ্যালান পো-র, ইয়েটসের, কিটসের বা এলিয়টের সমাজে বাস করো, তোমার জিভে কী ভাষা আসবে? সেই ভাষাই চলে আসে জিভে। তাকে কুম্ভীলকবৃত্তি বলে না।” এ কথা বলার কারণ কী? কারণ হচ্ছে ভূমেন্দ্র গুহরায় জীবনানন্দকে বলেছিলেন, “তোমার কবিতার সঙ্গে অনেকে কিটস, ইয়েটসের কবিতার মিল খুঁজে পান। এটি কেন?” চলুন দেখি তেমন মিল। যেমন, কিটসের সনেট, ‘অন ফার্স্ট লুকিং ইন টু চ্যাপম্যানস হোমার’—
Much have I traveled in the realms of gold
And many goodly states and kingdoms seen;

আরো পড়ুন ➥ সাহিত্য করে ‘ধনী’ ও ধনী হয়ে ‘সাহিত্য’ করার গল্প

এই লাইন দুটি পড়ার পর কি আপনার জীবনানন্দের ‘অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে’ লাইন মনে পড়ছে না? এখানে চুরি কিন্তু হুবহু করা হয়নি। তবে কী করা হয়েছে? করা হয়েছে কিছুটা সরাসরি আর কিছুটা বাক্যাংশ পাল্টে। যাকে বলে ডাইলিউশান। এ ডাইলেশনের কথা শুরুতেই বলেছি। ইয়েটসের ‘He reproves the Curlew’ কবিতায় জীবনানন্দের ‘হায় চিল’ কবিতার মিলটি কেমন দেখা যাক—
O, CURLEW, cry no more in the air,
Or only to the water in the West;
Because your crying brings to my mind
Passion-dimmed eyes and long heavy hair
That was shaken out over my breast:
There is enough evil in the crying of wind.

অবশ্য জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে অনুসরণ করেই লিখে গিয়েছেন দুই বাংলার অনেক কবি। এরমধ্যে বাংলাদেশের নব্বই দশকের তিন/চারজন কবিও রয়েছেন।

আমাদের দেশের হেলাল হাফিজের জনপ্রিয় কবিতা, ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়’। এটির সঙ্গে অদ্ভুত মিল রয়েছে রোমান কবি অভিদের ‘লাভ অ্যান্ড ওয়ার’ কবিতার তিন নম্বর লাইনে। সেই লাইনটি এমন, “ইয়ুথ ইজ ফিট ফর ওয়ার”। অভিদ, লাস্ট-অ্যান্টিকুয়িটি ও মধ্যযুগের শুরুর দিকে পশ্চিমের সাহিত্যে প্রভাবশালী কবি ছিলেন। ছিলেন জনপ্রিয়ও। হুমায়ুন আজাদের ‘নারী’ বই ব্যাপক জনপ্রিয়। এই বইকে সিমন দ্যা বোভেয়ারের ‘সেকেন্ড সেক্স’ বইয়ের নকল বলে থাকেন অনেকে। কিন্তু এখানে হুমায়ুন আজাদ হুবহু নকল করেননি। সিমন দ্য বোভেয়ারের ‘সেকেন্ড সেক্স’, ফেমিনিস্ট কেইটমিলারের রচনাবলির অংশবিশেষ ও সেকেন্ড ওয়েভ নারীবাদীদের মূল বিষয়টিই ছিল নারীর যৌন স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। তারা মনে করতেন এর মাধ্যমেই পুরুষতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফাটল ধরানো যাবে। হুমায়ুন আজাদও একই সুরে কথাবার্তা বলেছেন। মানে তিনি মূলভাবটা চুরি করেছেন বলা যায়। তাঁর ‘আমার অবিশ্বাস’ বইয়ের খনি যে ব্রার্টন্ড রাসেলের ‘হোয়াই আই এম নট এ ক্রিশ্চিয়ান’ এবং ইবন ওয়ার্কের ‘হোয়াই আই এম নট এ মুসলিম’—সেটি যারা ওই দুটি বই পড়েছেন তারা সহজেই ধরতে পারবেন। ওয়ার্কের বইতে ইসলামের ‘প্যাগান’ অরিজিন সংক্রান্ত একটি বিস্তৃত অধ্যায় আছে। হুমায়ুন আজাদ একই ইস্যুতে যে তথ্যগুলো উল্লেখ করেছেন তাঁর অনেকগুলোই এই অধ্যায়ে রয়েছে। এক্ষেত্রে অবশ্য ড. আজাদের পক্ষে তাঁর ভক্তরা বলতেই পারেন আমেরিকান নাট্যকার উইলসন মিজনার কথা। মিজনার বলছেন, “একজনের লেখা বা ভাবনা অনুকরণ যদি দূষণীয় হয়, তবে দুজন বা ততোধিক লেখকের ধারণা বা ভাবনার অনুসরণ কী করে গবেষণার স্বীকৃতি পেতে পারে? তাহলে তো আর গবেষকদের ভাতই নেই। গবেষণা মাত্রই চুরি।”

আরো পড়ুন ➥ শিল্পসাহিত্যে ‘স্বাধীনতা’

মিজনার মন্দ বলেননি। গবেষকদের ক্ষেত্রে মাফ করা যায় কারণ তারা নতুন কিছু সৃষ্টি করছেন না। কিন্তু কবি-সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রে কি মাফ করা যায়? কারণ তারা তো নতুন ভাষা তৈয়ার করবেন। যে কথাগুলো এতক্ষণ বললাম মিজনারের বক্তব্যের পর সেগুলো আমার নয়। বলছেন শিল্পসাহিত্যের বড় ওস্তাদ আর্নেস্ট ফিশার। সেই হিসেবে এই লেখা বা বইয়েও আমি চোর নই। শুধু তথ্য উপাত্ত খুঁজেছি আমি। এর বেশি কিছু নয়। তসলিমা নাসরিনের লেখা খুবই নিম্নমানের বলে খুব অল্প পড়েছি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে ভারতের সুকুমারী দেবীর লেখা থেকে চুরি করার, এটা অনেকেই জানেন। কানাডীয় লেখক ইয়ান মার্টল ‘লাইফ অব পাই’ উপন্যাসের লিখে ম্যান বুকার জেতেন। কিন্তু ওই উপন্যাসটি ব্রাজিলের জনপ্রিয় লেখক মোআসির শ্লেয়ার এর ‘ম্যাক্স অ্যান্ড দ্য ক্যাটস উপন্যাসের কাট এন্ড পেস্ট। অবশ্য এরকম খ্যাতির জন্য চুরিকে মনোবিদরা বলছেন এটিও একধরনের মানসিক অসুস্থতা। কী মুশকিল, মানসিক অসুস্থতাই হয়ে যাবে লেখার জন্যে? খ্যাতির জন্যে? হলে হবে। সমস্যা হবে আপনার? ধরা না পড়লেই হলো। বাংলায় এমন কথা চালু আছে না, ‘চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না পড়ো ধরা’। ধরা পড়লেই যতসব বিপদ। ধরা পড়ে বিপদেই পড়েছিলেন ২০১১ সালে আমেরিকার লেখক কোয়েন্টিন রায়ান তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘অ্যাসাসিন অব সিক্রেটস’ প্রকাশিত হওয়ার পর। কারণ ১১ জন লেখক তাঁর বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ করেন। ঘটনা সত্যি হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে কোয়েন্টিন রায়ান সব বই বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নেন। ১৯৯৭ সালে আমেরিকার বেস্ট সেলার জ্যানেট ডাইলে স্বীকার করে নেন যে, তাঁর ‘নাইনটি থ্রি বডিস রিপার’ উপন্যাসটি, যেটি বিক্রি হয়েছিল দুশো মিলিয়ন কপি, সে উপন্যাসটির অনেক অংশ আরেক ঔপন্যাসিক নোরা রবার্টসের উপন্যাস থেকে চুরি করা। অপরাধ স্বীকার করতে গিয়ে তিনি টিভি সাক্ষাৎকারে কান্না করতে করতে বলেছিলেন, “লেখালেখিতে ক্রমাগত অপরের ভাবনা নকল বা অনুসরণ করা আমার জন্যে মনস্তাত্বিক এক বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। আমার বইয়ে নোরা রবার্টসের যেসব ধারণা বা অংশের নকল আমি করেছি, তা নকল করার ইচ্ছে আমার কোনো সময়ই ছিল না। এ সমস্যা নিয়ে আমি বর্তমানে মনোবিদের শরণাপন্ন হয়েছি। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না—এ আশ্বাস দিতে পারি আমার পাঠকদের।” মার্কিন মনেবিদরা এ রোগটির নাম দিয়েছেন, ‘স্কাপিসট্রি’।

এ রোগে ভুগতেন আমেরিকান উপন্যাসিক হ্যারল্ড কোয়োরল্যান্ডার। এরজন্য তাকে মাশুলও কম দিতে হয়নি। আমেরিকান উপন্যাসিক অ্যালেক্স হ্যালি ১৯৭৭ সালে হ্যারল্ড কোয়োরল্যান্ডারের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগে মামলা করেন। আদালতে দায়ের করা মামলায় তিনি উল্লেখ করেন, হ্যারল্ড কোয়োরল্যান্ডারের দ্য আফ্রিকান উপন্যাসটির প্রায় ৮০ পৃষ্ঠা অ্যালেক্স হ্যালির উপন্যাস রুটস থেকে হুবহু নেওয়া। নিউইয়র্কের আদালতে মামলা বিচারাধীন অবস্থায় কোয়োরল্যান্ড ছয় লাখ ৫০ হাজার ডলারের বিনিময়ে আপোস করেছিলেন অ্যালেক্স হ্যালির সঙ্গে। এরপর আর লেখালেখি নিয়মিত করেননি হ্যারল্ড কোয়োরল্যান্ডার। বিদায় নেন এ জগৎ থেকে। অস্কার ওয়াইল্ড বিশ্বখ্যাত। তিনি আবার হ্যারল্ড কোয়োরল্যান্ডারের মতো এত কাবু হওয়ার মতন মানুষ ছিলেন না। তিনি চুরি করার পর স্বীকার করে বলেছেন যে, “অপরের ধারণা যুক্ত করে চূড়ান্ত সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠা লেখকের অধিকারের মধ্যে পড়ে।” তাঁর বই ‘দ্য পিকচার অব ডোরিয়ান গ্রে’র ধারণাগুলো লেখক জেকে হাইসম্যানের এগেনস্ট দি গ্রেইন (এ রিবোর্স) বই থেকে নেওয়া বলে অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এরপরই অস্কার ওয়াইল্ড সেকথা বলেছিলেন, এডিনবার্গ ইউনিভার্সিটি প্রেস তেকে প্রকাশিত একটি সংখ্যায়।

আরো পড়ুন ➥ সাহিত্যে নোবেল, প্রত্যাখ্যান ও কেড়ে নেওয়ার গল্প

বাংলার বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়ের ধাঁচটাও ছিল অস্কার ওয়াইল্ডের মতো। তবে বঙ্কিম চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার পরও বেপরোয়া। স্বীকারই করেননি। বঙ্কিমের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ করেন প্রখ্যাত সাহিত্য সমালোচক তারকনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানান বঙ্কিম ‘দুর্গেশনন্দিনী’তে ওয়াল্টার স্কটের ‘আইভ্যানহো’র বহু অনুচ্ছেদ সরাসরি টুকেছেন। দুর্গেশনন্দিনীর আয়েষা চরিত্রটি নাকি হুবহু ‘রেবেকা’র নকল। কিন্তু বঙ্কিম তাঁর সুহৃদ-ত্রয়ী চন্দ্রনাথ বসু-শ্রীশচন্দ্র মজুমদার-কালীনাথ দত্তকে বলেছিলেন, ‘আইভ্যানহো’ জীবনে কোনোদিন উল্টেও দেখেননি এবং আমলা বলেই মামলা করে দিয়েছিলেন তারকনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। পরে তারকানাথ জেল খাটবেন না মাফ চাইবেন এরকম ত্রাহি অবস্থায় পড়েছিলেন। তবে বঙ্কিমবন্ধু কালীনাথ দত্ত পরে স্বীকার করেছিলেন যে তিনি দুই বই-ই পড়ে বলেছেন বঙ্কিম লাইনের পর লাইন চুরি করেছেন। বঙ্কিমের জীবদ্দশাতেই দুর্গেশনন্দিনীর ১৩টি সংস্করণ শেষ হয়। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরও অভিযোগ করেছিলেন, বঙ্কিমের ‘বিষবৃক্ষ’ নাকি তাঁর ‘স্বপ্নপ্রয়াণ’ উপন্যাসের অক্ষম অনুকরণ। দ্বিজেন্দ্রনাথ তাঁর ‘স্বপ্নপ্রয়াণে’র পাণ্ডুলিপি ‘বঙ্গদর্শনে’ ছাপানোর জন্য পাঠিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়: “তিনি সবগুলি ছাপান নাই। কিন্তু তাঁহার বিষবৃক্ষের মধ্যে ঠিক সেইরকম ছবির অবতারণা করিয়া বসিলেন।... বাড়ির মধ্যে গৃহস্থ বধূ গাড়ি হাঁকাইলেন, এ চিত্র একেবারে সুশোভন হইল না। কিন্তু এইরকম চিত্র সমাবেশের আইডিয়াটা যে তিনি আমার রচনা হইতে পাইয়াছিলেন, সে বিষয়ে আমার সন্দেহ নাই।”

লেখকদের চুরি করার ব্যাপারে অনেক মামলার ইতিহাসও আছে। যেমন আলফ্রেড হিচককের ‘১৯৪০ : রেবেকা’ উপন্যাসটিও চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিল। লেখক এডউইন ম্যাকডোনাল্ড আদালতে অভিযোগ করেছিলেন, হিচককের ‘রেবেকা : ১৯৪০’ তাঁর ‘ব্লাইন্ড উইডো’ উপন্যাস থেকে নকল করেছেন। শেষে বিচারকেরা দুটি উপন্যাসের ভেতর কোনো মিল খুঁজে পাননি। লেখক ইয়ান ফ্লেমিং -এর ‘সেক্স, সেডিজম অ্যান্ড স্নোবারি’ বইটির বিরুদ্ধে ভাবনা চুরির অভিযোগ করেছিলেন লেখক কেভিন ম্যাকগ্লোরি। ম্যাকগ্লোরি আদালতকে জানিয়েছিলেন ‘সেক্স, সেডিজম অ্যান্ড স্নোবারি’ বইটি লিখেছিলেন ইয়ান ফ্লেমিং, তিনি এবং অপর লেখক জ্যাক হুইটিংহাম মিলে। কিন্তু ইয়ান ফ্লেমিং অন্যদের নাম বাদ দিয়ে নিজের নামেই বইটি প্রকাশ করেন। অভিযোগ সত্যি হওয়ায় আদালত ‘সেক্স, সেডিজম এবং স্নোবারি’ বইয়ের প্রকাশককে পঁয়ত্রিশ হাজার পাউন্ড ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। লেখক ড্যান ব্রাউনের ‘দ্য ভিঞ্চি কোড’ বইটির বিরুদ্ধেও ভাবনা চুরির অভিযোগে দু-বার মামলা হয়। ড্যান ব্রাউনের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ আনেন লেখক মিখাইল বাইগনেট। তিনি ‘দ্য ভিঞ্চি কোড’ বইটিকে তাঁর ‘দ্য হলি ব্লাড অ্যান্ড দ্য হলি গ্রেইল’ বইয়ের অনুকরণ বলে অভিযোগ করেন। দ্বিতীয় অভিযোগটি আনেন লেখক লুইস পারডু। তিনি ‘দ্য ভিঞ্চি কোড’ বইটির ধারণা তাঁর ‘দ্য ভিঞ্চি লিগাসি’ (১৯৮৩) থেকে নেওয়া বলে অভিযোগ আনেন। দুটো মামলাই বিচারকেরা খারিজ করে দেন অভিযোগ সঠিক নয় প্রমাণিত হওয়ায়। এছাড়া লেখকদের যেসব ভাবনা চুরির কথা জানা যায়, এর মধ্যে রয়েছে একাদশ শতকে ইরাকের বিখ্যাত লেখক আল খতিব আল বাগদাদির জীবজন্তুদের নিয়ে লেখা বই ‘আল জাহিদ’র কথা। বইটি কম-বেশি অ্যারিস্টটলের লেখা ‘কিতাব আল হাইওয়ান’-এর অনুকরণ বলে অভিযোগ রয়েছে। ভারতের কাব্য বিশ্বনাথনের লেখা প্রথম উপন্যাস ‘হাউ অপাল মেহতা গট কিসড’ উপন্যাসটির বিরুদ্ধে একাধারে অন্য পাঁচটি উপন্যাসের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ চুরির অভিযোগ উঠলে ওই লেখক বাজার থেকে সব বই প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হন। পাকিস্তানী লেখক কিমরান হাফিজের বই ‘ডার্কনেস’ এর বিরুদ্ধে খুশবন্ত সিংয়ের ‘দ্য সানসেট ক্লাব’-এর হুবহু নকল ধরা পড়ায় কিমরান এই তো বছর তিনেক আগে ২০১৭ সালে লাহোরে নিজ বাসায় সুইসাইড করেন এবং সুইসাইড নোটে লিখে যান, “আমি কেবলই লেখক হতে চেয়েছিলাম। চোর নয়।”

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;