সাহিত্যে চুরি

দেবদুলাল মুন্না
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

সাহিত্যে অন্য লেখকের ‘ভাব’ বা ‘ধারণা’ বা পুরো বিষয়টিই চুরি করার অভিযোগ আছে। অভিযোগ পুরনো। চুরিও পুরনো পেশা। তাই দুটিই চলছে এখনো। এ অভিযোগ থেকে রেহাই পাননি বিশ্বসাহিত্যের অনেক সেরা সাহিত্যিকরাও। তবে জর্মন কবি গ্যাটে বলেছেন, সাহিত্যে তালি মারা (মানে একজায়গা থেকে এক ভাব নিয়ে অন্য জায়গা থেকে অন্য ভাব নিয়ে মিশেল করা) আর্ট। একে চুরি বলা ঠিক না। কারণ বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশল এখানে খাটাতে হয়। শুধু হুবহু চুরি না করলেই হয়। লাতিন শব্দ ‘প্লেজিয়্যারিয়াস’-এর অর্থ হচ্ছে সাহিত্য ভাবনা চুরি বা অপহরণ।

বাংলায় এর যথার্থ শব্দ কী হবে আমি জানি না। তাই সরাসরি চুরিই ব্যবহার করছি। ইংরেজ নাট্যকার বেন জনসন ১৬০১ সালে শব্দটিকে ইংরেজি সাহিত্যে পরিচয় করিয়ে দেন। পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কারণ তাঁরই এক বন্ধু ‘ডিফল্টার’ নামে তাঁর এক নাটক ফরাসি ভাষায় হুবহু চুরি করে লিখেছিলেন। সেই বন্ধুর নাম, ফ্লবে আত্র। তবে যেসব লেখকেরা চুরির দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন তাদের মধ্যে বড় একটা অংশ অভিযোগ অস্বীকার করে যা বলেন সেটি হচ্ছে—“বিষয়টি ঘটেছে কাকতালীয় বা ভাবনার সাযুজ্যের” জন্য। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, “আর্টস ইজ আ মিউটেশান”—মানে শিল্পের রূপান্তর ঘটানো যায়। এর জন্য কী লাগে হে? শব্দের ডিনোটেটিভ বা শাব্দিক অর্থ আড়াল করা। এই আড়াল করাকে বলা হয় ইউফেমিজম। এই ইউফেমিজমের ভেতরেই থাকে প্যারাফ্রেজিং, সাবকন্সাস প্যারাফ্রেজিং, ডাইল্যুশান ইত্যাদি। যেমন একটা উদাহরণ দেওয়া যায় , কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিদ্রোহী কবিতার জন্য বিশেষ খ্যাত। নজরুলের এ কবিতার “বলো বীর—/ বলো উন্নত মম শির,/ শির নেহারি আমারি নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!/ বলো বীর—/ বলো মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি/ চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি/ ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া/ খোদার আসন আরশ ছেদিয়া,/ উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!/ মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!/ বলো বীর—/ আমি চির উন্নত শির।”-এর জায়গায় একসময় ভবকুমার প্রধান লিখেছিলেন ‘অসমছন্দ’ কবিতাটি। কবিতাটি এমন: “আমি ব্যাঙ/ লম্বা আমার ঠ্যাং/ ভৈরব রভসে বর্ষা আসিলে ডাকি যে গ্যাঙোর গ্যাং/ আমি ব্যাঙ/ আমি পথ হতে পথে দিয়ে চলি লাফ/ শ্রাবণ নিশায় পরশে আমার সাহসিকা/ অভিসারিকা/ ডেকে ওঠে ‘বাপ বাপ’।”

আরো পড়ুন ➥ বাংলা সাহিত্যে দেশভাগ

অবশ্য সেসময় প্যারোডির নামেও এসব লেখা হতো। সজনীকান্তের কাব্যপ্রতিভা তো প্যারোডি করতে করতেই ফুরাইল বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। প্রশ্ন হলো কেন এরকম চুরি করেন সাহিত্যিকরা? এর জবাবে টি এস এলিয়ট বলছেন, “অপরিণত কবিরা অনুকরণ করেন; পরিণত কবিরা চুরি করেন।” অথচ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে ব্রিটেনের অখ্যাত কবি ম্যাডিসন কেইনের কবিতা চুরির। বিশ্বখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের এমন কিছু নাম এ তালিকায় আসবে অনেকেই জেনে হোঁচট খাবেন। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে শেক্সপিয়র। ভায়া পাবলো নেরুদা থেকে ২০০২ সালে তাঁর ‘লাইফ অব পাই’ উপন্যাসের জন্য ম্যান বুকার পুরস্কার জেতা ইয়ান মার্টল হয়ে ড্রান ব্রাউন, জীবনানন্দ দাশ ও আমাদের দেশের হেলাল হাফিজসহ অসংখ্য।

এডগার এলান পো ও ন্যাথানিয়েল হর্থনের গল্পের মিল রয়েছে রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি গল্পে। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রবিবার’ গল্পটি হুবহু এলান পো-র ‘দি এথিস্ট’ গল্পের কার্বন কপি। এদিকে পাবলো নেরুদাও বসে নেই। তিনি উঠতি বয়সে রবীন্দ্রনাথের ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা’-কে “In my sky at twilight you are like a cloud” এবং ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’-কে “Come with me, I said, and no one knew” শিরোনামে প্যারাফ্রেজ করে লিখেছিলেন। পরে অবশ্য ভুল স্বীকার করেছিলেন। আর শেক্সপিয়র? তাকে নিয়ে এতকাল এমন একটি গল্প প্রচলিত ছিল যে, এক যোদ্ধা যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ঘোড়ায় চড়ে পালানোর সময় তাঁর কাছ থেকে একটি ব্যাগ পড়ে যায় সেই ব্যাগে কিছু পাণ্ডুলিপি ছিল। সেগুলো থেকেই নাকি শেক্সপিয়র লিখেছেন। ওগুলোকে গালগল্প হিসেবে শেক্সপিয় ভক্তরা চালালেও এখন তারা কি বলবেন যে শেক্সপিয়ার মহাচোর ছিলেন না ? অতি সম্প্রতি তাঁর সৃষ্ট কিং লিয়ার, ম্যাকবেথ, রিচার্ড তৃতীয়, হেনরি পঞ্চম এবং আরো সাতটি মোট এগারোটি নাটক যে চুরি করে লেখা আজ তা প্রমাণিত। এটি ধরা পড়েছে প্লেজ্যারিজম সফটওয়্যার Wcopyfind-এর সাহায্যে। ভাবুন অবস্থা! চুরি করলে কিন্তু মাফ নেই। বেরিয়ে গিয়েছে প্রযুক্তির বদৌলতে চোর ধরার সফটওয়্যারও।

ভূমেন্দ্র গুহরায়কে একবার কথায় কথায় জীবনানন্দ বলেছিলেন, “তুমি কি কুম্ভীলকবৃত্তির কথা বলছো? তুমি যে সমাজে বাস করো, সে সমাজের ভাষাও তোমার জিভে চলে আসে।... তুমি যদি অ্যাডগার অ্যালান পো-র, ইয়েটসের, কিটসের বা এলিয়টের সমাজে বাস করো, তোমার জিভে কী ভাষা আসবে? সেই ভাষাই চলে আসে জিভে। তাকে কুম্ভীলকবৃত্তি বলে না।” এ কথা বলার কারণ কী? কারণ হচ্ছে ভূমেন্দ্র গুহরায় জীবনানন্দকে বলেছিলেন, “তোমার কবিতার সঙ্গে অনেকে কিটস, ইয়েটসের কবিতার মিল খুঁজে পান। এটি কেন?” চলুন দেখি তেমন মিল। যেমন, কিটসের সনেট, ‘অন ফার্স্ট লুকিং ইন টু চ্যাপম্যানস হোমার’—
Much have I traveled in the realms of gold
And many goodly states and kingdoms seen;

আরো পড়ুন ➥ সাহিত্য করে ‘ধনী’ ও ধনী হয়ে ‘সাহিত্য’ করার গল্প

এই লাইন দুটি পড়ার পর কি আপনার জীবনানন্দের ‘অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে’ লাইন মনে পড়ছে না? এখানে চুরি কিন্তু হুবহু করা হয়নি। তবে কী করা হয়েছে? করা হয়েছে কিছুটা সরাসরি আর কিছুটা বাক্যাংশ পাল্টে। যাকে বলে ডাইলিউশান। এ ডাইলেশনের কথা শুরুতেই বলেছি। ইয়েটসের ‘He reproves the Curlew’ কবিতায় জীবনানন্দের ‘হায় চিল’ কবিতার মিলটি কেমন দেখা যাক—
O, CURLEW, cry no more in the air,
Or only to the water in the West;
Because your crying brings to my mind
Passion-dimmed eyes and long heavy hair
That was shaken out over my breast:
There is enough evil in the crying of wind.

অবশ্য জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে অনুসরণ করেই লিখে গিয়েছেন দুই বাংলার অনেক কবি। এরমধ্যে বাংলাদেশের নব্বই দশকের তিন/চারজন কবিও রয়েছেন।

আমাদের দেশের হেলাল হাফিজের জনপ্রিয় কবিতা, ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়’। এটির সঙ্গে অদ্ভুত মিল রয়েছে রোমান কবি অভিদের ‘লাভ অ্যান্ড ওয়ার’ কবিতার তিন নম্বর লাইনে। সেই লাইনটি এমন, “ইয়ুথ ইজ ফিট ফর ওয়ার”। অভিদ, লাস্ট-অ্যান্টিকুয়িটি ও মধ্যযুগের শুরুর দিকে পশ্চিমের সাহিত্যে প্রভাবশালী কবি ছিলেন। ছিলেন জনপ্রিয়ও। হুমায়ুন আজাদের ‘নারী’ বই ব্যাপক জনপ্রিয়। এই বইকে সিমন দ্যা বোভেয়ারের ‘সেকেন্ড সেক্স’ বইয়ের নকল বলে থাকেন অনেকে। কিন্তু এখানে হুমায়ুন আজাদ হুবহু নকল করেননি। সিমন দ্য বোভেয়ারের ‘সেকেন্ড সেক্স’, ফেমিনিস্ট কেইটমিলারের রচনাবলির অংশবিশেষ ও সেকেন্ড ওয়েভ নারীবাদীদের মূল বিষয়টিই ছিল নারীর যৌন স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। তারা মনে করতেন এর মাধ্যমেই পুরুষতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফাটল ধরানো যাবে। হুমায়ুন আজাদও একই সুরে কথাবার্তা বলেছেন। মানে তিনি মূলভাবটা চুরি করেছেন বলা যায়। তাঁর ‘আমার অবিশ্বাস’ বইয়ের খনি যে ব্রার্টন্ড রাসেলের ‘হোয়াই আই এম নট এ ক্রিশ্চিয়ান’ এবং ইবন ওয়ার্কের ‘হোয়াই আই এম নট এ মুসলিম’—সেটি যারা ওই দুটি বই পড়েছেন তারা সহজেই ধরতে পারবেন। ওয়ার্কের বইতে ইসলামের ‘প্যাগান’ অরিজিন সংক্রান্ত একটি বিস্তৃত অধ্যায় আছে। হুমায়ুন আজাদ একই ইস্যুতে যে তথ্যগুলো উল্লেখ করেছেন তাঁর অনেকগুলোই এই অধ্যায়ে রয়েছে। এক্ষেত্রে অবশ্য ড. আজাদের পক্ষে তাঁর ভক্তরা বলতেই পারেন আমেরিকান নাট্যকার উইলসন মিজনার কথা। মিজনার বলছেন, “একজনের লেখা বা ভাবনা অনুকরণ যদি দূষণীয় হয়, তবে দুজন বা ততোধিক লেখকের ধারণা বা ভাবনার অনুসরণ কী করে গবেষণার স্বীকৃতি পেতে পারে? তাহলে তো আর গবেষকদের ভাতই নেই। গবেষণা মাত্রই চুরি।”

আরো পড়ুন ➥ শিল্পসাহিত্যে ‘স্বাধীনতা’

মিজনার মন্দ বলেননি। গবেষকদের ক্ষেত্রে মাফ করা যায় কারণ তারা নতুন কিছু সৃষ্টি করছেন না। কিন্তু কবি-সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রে কি মাফ করা যায়? কারণ তারা তো নতুন ভাষা তৈয়ার করবেন। যে কথাগুলো এতক্ষণ বললাম মিজনারের বক্তব্যের পর সেগুলো আমার নয়। বলছেন শিল্পসাহিত্যের বড় ওস্তাদ আর্নেস্ট ফিশার। সেই হিসেবে এই লেখা বা বইয়েও আমি চোর নই। শুধু তথ্য উপাত্ত খুঁজেছি আমি। এর বেশি কিছু নয়। তসলিমা নাসরিনের লেখা খুবই নিম্নমানের বলে খুব অল্প পড়েছি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে ভারতের সুকুমারী দেবীর লেখা থেকে চুরি করার, এটা অনেকেই জানেন। কানাডীয় লেখক ইয়ান মার্টল ‘লাইফ অব পাই’ উপন্যাসের লিখে ম্যান বুকার জেতেন। কিন্তু ওই উপন্যাসটি ব্রাজিলের জনপ্রিয় লেখক মোআসির শ্লেয়ার এর ‘ম্যাক্স অ্যান্ড দ্য ক্যাটস উপন্যাসের কাট এন্ড পেস্ট। অবশ্য এরকম খ্যাতির জন্য চুরিকে মনোবিদরা বলছেন এটিও একধরনের মানসিক অসুস্থতা। কী মুশকিল, মানসিক অসুস্থতাই হয়ে যাবে লেখার জন্যে? খ্যাতির জন্যে? হলে হবে। সমস্যা হবে আপনার? ধরা না পড়লেই হলো। বাংলায় এমন কথা চালু আছে না, ‘চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না পড়ো ধরা’। ধরা পড়লেই যতসব বিপদ। ধরা পড়ে বিপদেই পড়েছিলেন ২০১১ সালে আমেরিকার লেখক কোয়েন্টিন রায়ান তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘অ্যাসাসিন অব সিক্রেটস’ প্রকাশিত হওয়ার পর। কারণ ১১ জন লেখক তাঁর বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ করেন। ঘটনা সত্যি হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে কোয়েন্টিন রায়ান সব বই বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নেন। ১৯৯৭ সালে আমেরিকার বেস্ট সেলার জ্যানেট ডাইলে স্বীকার করে নেন যে, তাঁর ‘নাইনটি থ্রি বডিস রিপার’ উপন্যাসটি, যেটি বিক্রি হয়েছিল দুশো মিলিয়ন কপি, সে উপন্যাসটির অনেক অংশ আরেক ঔপন্যাসিক নোরা রবার্টসের উপন্যাস থেকে চুরি করা। অপরাধ স্বীকার করতে গিয়ে তিনি টিভি সাক্ষাৎকারে কান্না করতে করতে বলেছিলেন, “লেখালেখিতে ক্রমাগত অপরের ভাবনা নকল বা অনুসরণ করা আমার জন্যে মনস্তাত্বিক এক বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। আমার বইয়ে নোরা রবার্টসের যেসব ধারণা বা অংশের নকল আমি করেছি, তা নকল করার ইচ্ছে আমার কোনো সময়ই ছিল না। এ সমস্যা নিয়ে আমি বর্তমানে মনোবিদের শরণাপন্ন হয়েছি। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না—এ আশ্বাস দিতে পারি আমার পাঠকদের।” মার্কিন মনেবিদরা এ রোগটির নাম দিয়েছেন, ‘স্কাপিসট্রি’।

এ রোগে ভুগতেন আমেরিকান উপন্যাসিক হ্যারল্ড কোয়োরল্যান্ডার। এরজন্য তাকে মাশুলও কম দিতে হয়নি। আমেরিকান উপন্যাসিক অ্যালেক্স হ্যালি ১৯৭৭ সালে হ্যারল্ড কোয়োরল্যান্ডারের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগে মামলা করেন। আদালতে দায়ের করা মামলায় তিনি উল্লেখ করেন, হ্যারল্ড কোয়োরল্যান্ডারের দ্য আফ্রিকান উপন্যাসটির প্রায় ৮০ পৃষ্ঠা অ্যালেক্স হ্যালির উপন্যাস রুটস থেকে হুবহু নেওয়া। নিউইয়র্কের আদালতে মামলা বিচারাধীন অবস্থায় কোয়োরল্যান্ড ছয় লাখ ৫০ হাজার ডলারের বিনিময়ে আপোস করেছিলেন অ্যালেক্স হ্যালির সঙ্গে। এরপর আর লেখালেখি নিয়মিত করেননি হ্যারল্ড কোয়োরল্যান্ডার। বিদায় নেন এ জগৎ থেকে। অস্কার ওয়াইল্ড বিশ্বখ্যাত। তিনি আবার হ্যারল্ড কোয়োরল্যান্ডারের মতো এত কাবু হওয়ার মতন মানুষ ছিলেন না। তিনি চুরি করার পর স্বীকার করে বলেছেন যে, “অপরের ধারণা যুক্ত করে চূড়ান্ত সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠা লেখকের অধিকারের মধ্যে পড়ে।” তাঁর বই ‘দ্য পিকচার অব ডোরিয়ান গ্রে’র ধারণাগুলো লেখক জেকে হাইসম্যানের এগেনস্ট দি গ্রেইন (এ রিবোর্স) বই থেকে নেওয়া বলে অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এরপরই অস্কার ওয়াইল্ড সেকথা বলেছিলেন, এডিনবার্গ ইউনিভার্সিটি প্রেস তেকে প্রকাশিত একটি সংখ্যায়।

আরো পড়ুন ➥ সাহিত্যে নোবেল, প্রত্যাখ্যান ও কেড়ে নেওয়ার গল্প

বাংলার বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়ের ধাঁচটাও ছিল অস্কার ওয়াইল্ডের মতো। তবে বঙ্কিম চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার পরও বেপরোয়া। স্বীকারই করেননি। বঙ্কিমের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ করেন প্রখ্যাত সাহিত্য সমালোচক তারকনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানান বঙ্কিম ‘দুর্গেশনন্দিনী’তে ওয়াল্টার স্কটের ‘আইভ্যানহো’র বহু অনুচ্ছেদ সরাসরি টুকেছেন। দুর্গেশনন্দিনীর আয়েষা চরিত্রটি নাকি হুবহু ‘রেবেকা’র নকল। কিন্তু বঙ্কিম তাঁর সুহৃদ-ত্রয়ী চন্দ্রনাথ বসু-শ্রীশচন্দ্র মজুমদার-কালীনাথ দত্তকে বলেছিলেন, ‘আইভ্যানহো’ জীবনে কোনোদিন উল্টেও দেখেননি এবং আমলা বলেই মামলা করে দিয়েছিলেন তারকনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। পরে তারকানাথ জেল খাটবেন না মাফ চাইবেন এরকম ত্রাহি অবস্থায় পড়েছিলেন। তবে বঙ্কিমবন্ধু কালীনাথ দত্ত পরে স্বীকার করেছিলেন যে তিনি দুই বই-ই পড়ে বলেছেন বঙ্কিম লাইনের পর লাইন চুরি করেছেন। বঙ্কিমের জীবদ্দশাতেই দুর্গেশনন্দিনীর ১৩টি সংস্করণ শেষ হয়। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরও অভিযোগ করেছিলেন, বঙ্কিমের ‘বিষবৃক্ষ’ নাকি তাঁর ‘স্বপ্নপ্রয়াণ’ উপন্যাসের অক্ষম অনুকরণ। দ্বিজেন্দ্রনাথ তাঁর ‘স্বপ্নপ্রয়াণে’র পাণ্ডুলিপি ‘বঙ্গদর্শনে’ ছাপানোর জন্য পাঠিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়: “তিনি সবগুলি ছাপান নাই। কিন্তু তাঁহার বিষবৃক্ষের মধ্যে ঠিক সেইরকম ছবির অবতারণা করিয়া বসিলেন।... বাড়ির মধ্যে গৃহস্থ বধূ গাড়ি হাঁকাইলেন, এ চিত্র একেবারে সুশোভন হইল না। কিন্তু এইরকম চিত্র সমাবেশের আইডিয়াটা যে তিনি আমার রচনা হইতে পাইয়াছিলেন, সে বিষয়ে আমার সন্দেহ নাই।”

লেখকদের চুরি করার ব্যাপারে অনেক মামলার ইতিহাসও আছে। যেমন আলফ্রেড হিচককের ‘১৯৪০ : রেবেকা’ উপন্যাসটিও চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিল। লেখক এডউইন ম্যাকডোনাল্ড আদালতে অভিযোগ করেছিলেন, হিচককের ‘রেবেকা : ১৯৪০’ তাঁর ‘ব্লাইন্ড উইডো’ উপন্যাস থেকে নকল করেছেন। শেষে বিচারকেরা দুটি উপন্যাসের ভেতর কোনো মিল খুঁজে পাননি। লেখক ইয়ান ফ্লেমিং -এর ‘সেক্স, সেডিজম অ্যান্ড স্নোবারি’ বইটির বিরুদ্ধে ভাবনা চুরির অভিযোগ করেছিলেন লেখক কেভিন ম্যাকগ্লোরি। ম্যাকগ্লোরি আদালতকে জানিয়েছিলেন ‘সেক্স, সেডিজম অ্যান্ড স্নোবারি’ বইটি লিখেছিলেন ইয়ান ফ্লেমিং, তিনি এবং অপর লেখক জ্যাক হুইটিংহাম মিলে। কিন্তু ইয়ান ফ্লেমিং অন্যদের নাম বাদ দিয়ে নিজের নামেই বইটি প্রকাশ করেন। অভিযোগ সত্যি হওয়ায় আদালত ‘সেক্স, সেডিজম এবং স্নোবারি’ বইয়ের প্রকাশককে পঁয়ত্রিশ হাজার পাউন্ড ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। লেখক ড্যান ব্রাউনের ‘দ্য ভিঞ্চি কোড’ বইটির বিরুদ্ধেও ভাবনা চুরির অভিযোগে দু-বার মামলা হয়। ড্যান ব্রাউনের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ আনেন লেখক মিখাইল বাইগনেট। তিনি ‘দ্য ভিঞ্চি কোড’ বইটিকে তাঁর ‘দ্য হলি ব্লাড অ্যান্ড দ্য হলি গ্রেইল’ বইয়ের অনুকরণ বলে অভিযোগ করেন। দ্বিতীয় অভিযোগটি আনেন লেখক লুইস পারডু। তিনি ‘দ্য ভিঞ্চি কোড’ বইটির ধারণা তাঁর ‘দ্য ভিঞ্চি লিগাসি’ (১৯৮৩) থেকে নেওয়া বলে অভিযোগ আনেন। দুটো মামলাই বিচারকেরা খারিজ করে দেন অভিযোগ সঠিক নয় প্রমাণিত হওয়ায়। এছাড়া লেখকদের যেসব ভাবনা চুরির কথা জানা যায়, এর মধ্যে রয়েছে একাদশ শতকে ইরাকের বিখ্যাত লেখক আল খতিব আল বাগদাদির জীবজন্তুদের নিয়ে লেখা বই ‘আল জাহিদ’র কথা। বইটি কম-বেশি অ্যারিস্টটলের লেখা ‘কিতাব আল হাইওয়ান’-এর অনুকরণ বলে অভিযোগ রয়েছে। ভারতের কাব্য বিশ্বনাথনের লেখা প্রথম উপন্যাস ‘হাউ অপাল মেহতা গট কিসড’ উপন্যাসটির বিরুদ্ধে একাধারে অন্য পাঁচটি উপন্যাসের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ চুরির অভিযোগ উঠলে ওই লেখক বাজার থেকে সব বই প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হন। পাকিস্তানী লেখক কিমরান হাফিজের বই ‘ডার্কনেস’ এর বিরুদ্ধে খুশবন্ত সিংয়ের ‘দ্য সানসেট ক্লাব’-এর হুবহু নকল ধরা পড়ায় কিমরান এই তো বছর তিনেক আগে ২০১৭ সালে লাহোরে নিজ বাসায় সুইসাইড করেন এবং সুইসাইড নোটে লিখে যান, “আমি কেবলই লেখক হতে চেয়েছিলাম। চোর নয়।”

আপনার মতামত লিখুন :