সাহিত্যে নোবেল, প্রত্যাখ্যান ও কেড়ে নেওয়ার গল্প



দেবদুলাল মুন্না
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

“সাহিত্য কি খেলাধুলা যে প্রতিযোগিতা হয়, এরপর ট্রফি তুলে দেওয়া হবে বিজয়ীর হাতে? এই পুরস্কার তুলে দেওয়ার সংস্কৃতিও উচ্চমন্য ও হীনমন্যকুলের জন্ম দেয়। যাকে বলে এলিটিজম। এ ফ্যাসিবাদেরই নামান্তর।” (ট্রিনকোয়ান লেকচার, জেমস জয়েস)

জেমস জয়েস এখনো বিশ্বসাহিত্যে লেখকদের লেখক। কিন্তু তিনি নোবেল পুরস্কার পাননি। পাননি লিও তলস্তয়, জোসেফ কনরাড বা হেনরি জেমস, মার্সেল প্রুস্ত, পল ভ্যালেরি, মিলান কুন্ডেরাসহ অসংখ্য সাহিত্যিক। আবার এমন অনেকে পেয়েছেন নোবেল যাদের এখন আর কেউ চেনেই না। কালজয়ী হয়ে ওঠেনি তাদের সৃষ্টি। নাম বললেই ভাববেন, এরা কারা? নামই তো শোনেননি আগে। অথচ পড়েননি তো কম। শোনেন তবে সাহিত্যে নোবেলজয়ী চার নাম আপাতত—হেনরিক শিয়েঙ্কেভিচ, রুদলফ ইউকেন, এলভিন্দ জনসন, জয়েস হ্যারিহননি।

আসলে সাহিত্যের ক্ষেত্রে নোবেল অনেক ক্ষেত্রে যোগ্য হলেও পান না। আবার দেখা যায় রাজনৈতিক বিবেচনায় কেউ কেউ পান না, পেলেও পরে নোবেল লরিয়েটের কাছ থেকে পুরস্কার কেড়ে নেওয়া হয়। এ এক মজার রাজনীতি। তবে অপ্রকাশ্য। নোবেল পুরস্কার নিয়ে যে অনিয়ম হয় সে বিষয়ে ২০১৯ সালে বড় স্বীকারোক্তি করেছেন নরওয়েজিন নোবেল কমিটির সেক্রেটারি লিন্ডস্ট্যাড। তিনি বলেন, “১০৬ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাদ পড়াটা (গ্রেটেস্ট অমিশন) হলো নিঃসন্দেহে মহাত্মা গান্ধীর কখনো নোবেল পুরস্কার না-পাওয়া।” পাঁচবার নোবেল পুরস্কারের জন্য শর্টলিস্টেড হয়েছিলেন গান্ধীজি। ১৯৪৬, ১৯৪৭, ১৯৪৮ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে দুবার। শতাব্দীকাল ধরে নোবেল কমিটি যে ঘরে বসে পুরস্কারপ্রাপকদের নাম নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে আসছে সেই ঘরে বসেই লিন্ডস্ট্যাড জানালেন, “তবে এটা ঐতিহাসিক একটা সত্যি হয়ে থেকে গিয়েছে যে গান্ধী কখনো নোবেল পুরস্কার পাননি।” তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ ছিল নোবেল কমিটির সদস্যদের ইউরোপ-কেন্দ্রিক মনোভাব।

আরো পড়ুন ➥ সৃষ্টিশীলদের খেয়ালিপনা

আক্ষেপের সুরে লিন্ডস্ট্যাড বলেছেন, “নোবেল প্রাইজ ছাড়াও চলে যায় গান্ধীজির। তবে গান্ধীজিকে ছাড়া নোবেল কমিটি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।” নোবেল পাননি স্টিফেন হকিং। কিন্তু তিনিই কসমোলজিতে কিংবদন্তি। তো, তিনি স্বীকার করে নিলে সাহিত্যেও যে নোবেল পুরস্কার নিয়ে রাজনীতি হয় সেটি আমাদের না বোঝার কথা না। মিলান কুন্ডেরা ২০১৩ সালে এক ইন্টারভিউতে বলেন, “কেন যে আমার নাম আসে বারবার নোবেল পুরস্কার ঘোষণার সময়। আমি কি নোবেল না পেলে আর মিলান কুন্ডেরা থাকব না?”

কিন্তু নোবেল সাহিত্য পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন দুজন খ্যাতিমান। একজন জ্যাঁ পল সার্ত্রে অন্যজন বরিস পাস্তের্নাক। আর বব ডিলানও প্রথমে নিতে চাননি। বেকায়দায় পড়েছিলেন নোবেল কমিটি। পরে অবশ্য বব ডিলান পুরস্কারটা নেন।

ফ্রান্সের জ্যাঁ পল সার্ত্রে বিশ্বখ্যাত ফিলোসফার ও সাহিত্যিক। ১৯৬৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের সময় তার নাম ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করেন সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে এবং অন্য কারণে। সার্ত্র মূলত দার্শনিক হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাটক, উপন্যাস ও ছোটগল্প লিখেছেন। রোডস টু ফিড্রম, আইরন ইন দ্য সোল কার বিখ্যাত উপন্যাস। লিখেছেন আত্মজৈবনিক। তাই তাঁকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান সাহিত্যিকদের একজন বলে বিবেচনা করা হয়। ১৯৬৪ সালের অক্টোবর মাসে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার আগেই সার্ত্র জানতে পারেন ওই বছরের মনোনীত সাহিত্যিকদের তালিকায় তাঁর নাম আছে। জানার পরপরই চিঠি লিখে তিনি যোগাযোগের চেষ্টা করেন সুইডিশ একাডেমির সঙ্গে। কিন্তু তাঁর চিঠি গিয়ে পৌঁছানোর আগেই ঘোষিত হয় পুরস্কার। পুরস্কারপ্রাপ্তি ঠেকাতে না পেরে প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নেন সার্ত্র। কমিটিকে নিজের অপারগতা জানান তিনি বেশ বিনয়ের সঙ্গে। নোবেল কমিটি বা পুরস্কারকে কোনোরূপ দোষারোপ না করে এই প্রত্যাখ্যানকে একেবারেই ‘ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত’ বলে দাবি করেন তিনি। কিন্তু অনেকে বলেন যে সার্ত্রর এই প্রত্যাখ্যানের নেপথ্যে কারণ তাঁর আগে আলবেয়ার কামুর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি। আলবেয়ার কামু ফিলোসফিক্যালি সার্ত্রে দ্বারাই প্রভাবিত ছিলেন। তাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল গুরু শিষ্যের। আলবেয়ার কামুর মৃত্যু সংবাদে সার্ত্রের চোখে কান্না দেখা গিয়েছিল। কামু পুরস্কারটি পেয়েছিলেন ১৯৫৭ সালে এবং খবরটি পাওয়ার পর খুব উচ্ছসিত হয়ে নোবেল কমিটিকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন সার্ত্রে। কিন্তু এরপর সার্ত্র আর কামুর মধ্যে সম্পর্ক তিক্ত হয়। আগে পুরস্কার পেয়ে কামু এগিয়ে গেলেও কয়েক বছর পর ওই একই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে সার্ত্র হয়তো বোঝাতে চেয়েছিলেন নোবেল প্রাপ্তি আদতে তেমন মহান কিছু নয়। কিন্তু সার্ত্রের বন্ধু প্লেভে সেসময় জানিয়েছিলেন, সার্ত্রের মধ্যে আলবেয়ার কামুকে নিয়ে কোনো সমস্যা ছিল না। থাকলে তিনি কামু মারা যাওয়ার পর কান্না করতেন না। তিনি নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখান করেন নীতিগত কারণেই। নিচে সার্ত্রের চিঠিটি দেওয়া হলো:

১৪ অক্টোবর , ১৯৬৪, প্যারিস
প্রিয় সচিব মহোদয়,
আমি আজই জানতে পেরেছি, কোনো কোনো সূত্র অনুসারে আমি এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেতে পারি। পুরস্কার ঘোষিত হওয়ার আগে তা নিয়ে কথা বলা অবিবেচনাপ্রসূত মনে হতে পারে, কিন্তু কোনো ভুল বোঝাবুঝি ঠেকানোর জন্য এই চিঠি লিখছি। আপনাকে আমি আশ্বস্ত করতে চাই যে সুইডিশ একাডেমি, যা অনেক খ্যাতিমান লেখককে সম্মানিত করেছে, তার প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা রয়েছে। তা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত ও বস্তুগত কারণে আমি সেসব লেখকের তালিকাভুক্ত হতে চাই না। শুধু ১৯৬৪ সালে নয়, এর পরে কোনো সময়েই এই সম্মান আমার কাঙ্ক্ষিত নয়।
বিনম্র শ্রদ্ধাসহ,
জ্যাঁ পল সার্ত্র

২২ অক্টোবর সুইডিশ ও ২৩ অক্টোবর ফ্রান্সের একটি পত্রিকায় ছাপা হয় তাঁর প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা। এখানে দীর্ঘ বিবৃতিতে তিনি ব্যাখ্যা করেন পুরস্কার গ্রহণে নিজের অনীহার কথা:
“আমি ১৯৪৫ সালের পর থেকে সব ধরনের অফিশিয়াল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে আসছি। আমি জ্যাঁ পল সার্ত্র লিখে স্বাক্ষর করা আর নোবেলজয়ী জ্যাঁ পল সার্ত্র লিখে স্বাক্ষর করা এক নয়। একজন লেখক যখন এই ধরনের কোনো পুরস্কার গ্রহণ করেন, তিনি আদতে পুরস্কার প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।”

সার্ত্রের বন্ধু প্লেভে জানান, “বিশ্বযুদ্ধের পর সার্ত্রে নিউটন বোমার আবিষ্কারকের ‘নোবেল’ নিতে অনাগ্রহী ছিলেন এবং মনে করতেন এ পুরস্কার নেওয়া মানেই নৈতিকভাবে তার মানবিকতার পরাজয় ঘটবে।”

আরো পড়ুন ➥ সাহিত্যে জেনারেশন

বরিস পাস্তের্নাক রাশিয়ার জনপ্রিয় কবি, ঔপন্যাসিক ও অনুবাদক। জন্ম মস্কোতে, ১৮৯০ সালে। মাই সিস্টার, লাইফ (১৯১৭) তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ। কিন্তু উপন্যাস লিখেই খ্যাতিমান হন। জীবনের শেষ ভাগে এসে লেখেন উপন্যাস ডক্টর জিভাগো (১৯৫৭) রাশিয়ার সর্বকালের সর্বাধিক পঠিত বইগুলোর মধ্যে একটি। এটি সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কম্যুনিস্ট শাসনকে ব্যঙ্গ করে লেখা। বইটি প্রকাশের পরের বছর ১৯৫৮ সালের ২৩ অক্টোবর তাঁকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করে সুইডিশ একাডেমি। তবে এ বইটির জন্য নয়। পুরস্কার দেওয়ার জন্য বেছে নেওয়া হয় তার কাব্যকে। পুরস্কারের সাইটেশনে লেখা হয়, রুশ গীতিকাব্যে অবদান এবং রাশিয়ার মহাকাব্যিক ঐতিহ্যকে জারি রাখার কারণে তাঁকে এই পুরস্কার দ্বারা সম্মানিত করা হচ্ছে। কিন্তু তিনি জানতেন যে পুরস্কারটি পেতে যাচ্ছেন ড. জিভাগো লেখার জন্য। কারণ তাঁর কাব্য তাঁর বিবেচনায় আহামরি কিছু না। সেসব কথা তিনি বলেছিলেন ওই বছরই ২১ ডিসেম্বর ফ্রান্স থেকে প্রকাশিত দ্য স্ক্রেপসি পত্রিকায়। তিনি পুরস্কার প্রত্যাখান করেন। তিনি মনে করতেন তিনি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সমালোচনা করেছেন কিন্তু এটি যেন পুঁজিবাদী সমাজ লুফে না নেয় এ পুরস্কার দিয়ে। কিন্তু তাঁর পুরস্কার প্রত্যাখানের বিষয়ে অন্য গল্পও রয়েছে। নোবেল পুরস্কারের ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রথমে নাকি আনন্দিত হন পাস্তের্নাক। সৌজন্যবোধ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে যথারীতি ২৫ অক্টোবর তিনি টেলিগ্রাম করেন সুইডিশ একাডেমিকে। কিন্তু এই পুরস্কারে তখনকার সোভিয়েত সরকার মোটেও খুশি ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী স্নায়ুযুদ্ধের সময় তখন। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঠান্ডা দ্বন্দ্ব চলছে ইউরোপ, আমেরিকার অধিকাংশ পুঁজিবাদী দেশগুলোর। আর নোবেল পুরস্কারকে সমাজতান্ত্রিক শাসকেরা বরাবরই দেখে এসেছেন পুঁজিবাদের প্রকাশ হিসেবে। ফলে ২৫ তারিখেই পাস্তের্নাকের পুরস্কারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়। ‘মস্কো লিটারেরি সোসাইটি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের দাবি তুলে স্বাক্ষর গ্রহণ কর্মসূচি শুরু করে। পাস্তের্নাক-বিরোধী আন্দোলন ও প্রচারণাও জমে ওঠে। একপর্যায়ে সেটি বড়ো আকার ধারণ করে। পাস্তের্নাককে ‘রাষ্ট্রদোহী’, ‘শত্রুর সঙ্গে আঁতাতকারী’ ইত্যাদি বলে আক্রমণ করতে থাকেন উত্তপ্ত ছাত্র-জনতাসহ সোভিয়েতের বেশ কিছু বুদ্ধিজীবী। পগুঞ্জন রয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে পরোক্ষভাবে তাঁকে বলা হয়, একবার স্টকহোমে পুরস্কার আনতে গেলে আর কোনো দিন নিজ দেশে ফিরতে দেওয়া হবে না। এ কারণে ভয় পেয়ে নাকি লেখক পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু সত্য ছিল তিনি ক্যাপিটেলিজমকে কোনো ছাড় দিতে রাজি ছিলেন না।

এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন অস্ট্রিয়ান লেখক পিটার হ্যান্ড। কিন্তু লক্ষ করুন তিনি নোবেল বিজয়ী হওয়ার পর থেকে তার পিছু ছাড়ছে না বিতর্ক। বিতর্ক এমন পর্যায়ে চলছে যে অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরাও সরাসরি জড়িয়ে পড়েছেন। অবশ্য পিটার হ্যান্ডকেও এর জন্য কম দায়ী নন বলে অনেকে মনে করছেন। বর্তমান দুনিয়ায় কিংবদন্তিতুল্য দার্শনিক জিজেক স্লাভক সিএনএনকে বলেছেন বলেছেন, “এবারের নোবেল পুরস্কার এটাই প্রমাণ করে যে, পিটার হ্যান্ডকে অতীতে ঠিক কথাটাই বলেছিলেন।” পিটার হ্যান্ডকে অতীতে কী বলছিলেন সেটি জানা যায়, গত বছরের ডিসেম্বরে অস্ট্রিয়ান নিউজপেপার ‘ডাই প্রেস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারের দিকে নজর দিলে।

তিনি তখন বলেছিলেন, “নোবেলপ্রাইজ শেষ পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া উচিত।” তিনি আরো বলেছিলেন, “সাহিত্যের মিথ্যা সিদ্ধ ঘোষণা।” ‘গার্ডিয়ান’-এ দেওয়া সাক্ষাৎকারে ব্রিটিশ লেখক হারি কানজু বলেছেন, “যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন আমাদের এমন বুদ্ধিজীবী দরকার, যাঁরা আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের অবহেলা ও বিদ্বেষপূর্ণ আচরণের মুখে মানবাধিকার রক্ষায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারবেন। হান্ডকে তেমন ব্যক্তি নন।” আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এদি রামা বলেছেন, “কখনো ভাবিনি নোবেল পুরস্কারের কথা ভেবে আমার বমিভাব হবে।”

আরো পড়ুন ➥ স্ট্রিট লিটারেচার

কসোভোর প্রেসিডেন্ট হাশিম থাচি টুইটে বলেছেন, “নোবেল পুরস্কারের এই সিদ্ধান্ত ভুক্তভোগীদের জন্য অপরিমেয় বেদনা হয়ে দাঁড়াবে।” বিশ্বজুড়ে লেখকদের সংগঠন পেন আমেরিকার সভাপতি জেনিফার ইগান টুইটারে লেখেন, “এমন একজন লেখক যিনি তাঁর কণ্ঠকে ঐতিহাসিক সত্যকে মুছে ফেলতে ব্যবহার করেছেন, তাঁকে নির্বাচিত করা খুবই বিস্ময়কর।” কেন পিচার হ্যান্ডকে এত তোপের মুখে পড়েছেন এর কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, নব্বই দশকে বসনিয়া যুদ্ধে সার্বদের সমর্থন দেওয়ার কারণে হ্যান্ডকে অত্যন্ত বিতর্কিত ছিলেন। পিটার হান্ডকের বিরুদ্ধে আলোচিত স্রেরেব্রেনিৎসা গণহত্যাকে অস্বীকার করার অভিযোগ রয়েছে। তিনি যুদ্ধাপরাধী স্লোভেদান মিলোসোভিচেরও ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। বসনিয়া যুদ্ধে সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট স্লোভেদান মিলোসোভিচের নেতৃত্বে সার্ব বাহিনী ১৯৯৫ সালের ১১ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত মাত্র ১২ দিনে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার স্রেরেব্রেনিৎসা শহরের আট হাজারের বেশি মুসলিম পুরুষ ও ছেলেশিশু হত্যা করে। নারীদের বন্দীশিবিরে রেখে ধর্ষণ করা হয়। ২০০৬ সালে পিটার হ্যান্ডকে সার্বিয়ার নৃশংসতার বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন এবং সার্বিয়ার ভাগ্যকে ইহুদিদের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। যদিও তিনি পরে ওই মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, “মুখ ফসকে বেরিয়েছে।” সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সচিব ম্যাটস ম্যালম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, “কমিটি কেবল সাহিত্যিক ও নান্দনিক গুণাবলির ভিত্তিতেই বিজয়ীকে বাছাই করেছে এবং একাডেমির জন্য এরকম বাধ্যবাধকতা নেই যে, তাকে রাজনৈতিক বিবেচনার বিপরীতে সাহিত্যমূল্যের সমন্বয় করতে হবে।”

নোবেল কমিটি যাই ব্যাখ্যা দিক, লক্ষ করুন কারা পিটার হান্ডকের সমালোচনা করেছেন? নিপীড়িত দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরাই।

আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দিকেই যদি তাকাই তবে দেখি তাঁর জীবনেও আছে অনেক বিতর্কিত অধ্যায়। তিনি হিন্দু মৌলবাদী ফাদার সংগঠন ‘হিন্দু মহাসভা’র নেতা বালগঙ্গাধর গ্রেফতার হলে চাঁদা তুলেছিলেন জামিনের জন্য। ইতালির ফ্যাসিবাদী শাসক বেনিতো মুসোলিনির প্রশংসা করেছিলেন। অবশ্য তার আগেই ১৯১৩ সালে তিনি নোবেল পেয়েছিলেন। ১৯২৫ সালে রবীন্দ্রনাথ প্রথম ইতালিতে যান। সেবার মুসোলিনির এক কাছের জন ফরমিচি রবীন্দ্রনাথের জন্য জাহাজভর্তি বই পাঠান। পরের বছর আবার যান রবীন্ত্রনাথ। দেখা হয় এবার মুসোলিনির সাথে। মুসোলিনি জানান, ইতালীয় ভাষায় অনূদিত রবীন্দ্রনাথের সব লেখা তিনি পড়েছেন। রবীন্দ্রনাথকে আর পায় কে? খুশি হয়ে যান। মুসোলিনির চাল বুঝতে পারেন না।

পরের দুই সপ্তাহে রবীন্দ্রনাথ ইতালির রাজাসহ রোমের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করেন। পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দেন। দেন কয়েকটি বক্তৃতাও। একটিতে মুসোলিনি উপস্থিত ছিলেন। সেবার সফরের শেষদিকে রবীন্দ্রনাথ ফের দেখা করেন মুসোলিনির সঙ্গে। তখন রবীন্দ্রনাথ যত্রতত্র ফ্যাসিস্ট মুসোলিনির প্রশংসা করে বেড়াচ্ছেন। পরে নিজে নিজের ভুলটা বুঝতে পারেন। পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ ফ্যাসিবাদসহ সব ধরনের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রবল বিরোধিতা করেছেন।

আরো পড়ুন ➥ তবু সে দেখিল কোন ভূত

আর্জেন্টাইন হোর্হে লুই বোর্হেসের চিলির অগাস্তো পিনোশে, স্পেনের ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো, আর্জেন্টিনার হোর্হে রাফায়েল ভিদেলারের প্রশংসায় মুখর ছিলেন। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদী হিটলারের বিরোধিতা করেন। আবার পেরন শাসনের বিরোধীতায় আর্জেন্টিনার কমিউনিস্ট পার্টির দোদুল্যমানতা দেখে বোর্হেস কমিউনিজমের প্রতিও আস্থা হারিয়ে ফেলেন। শুধু আস্থা হারিয়ে ফেলা নয়, সমর্থন করেন সামরিক জান্তাকে। বোর্হেসের সেই বিখ্যাত উক্তি জানেন তো! তিনি বলেছিলেন, গণতন্ত্রে তাঁর আর আস্থা নেই। অন্য দেশের জন্য ভালো হলেও হতে পারে, কিন্তু চিলি বা আর্জেন্টিনায় এটি কার্যকর কোনো পদ্ধতি নয়।

অবশ্য একদা কমিউনিস্ট সমর্থক ছিলেন বলেই হয়তো নোবেল কমিটি তার ব্যাপারে সতর্ক হয়ে গিয়েছিল। বোর্হেসকে আর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়নি। তবে তিনি তাদের মনোনীত সংক্ষিপ্ত তালিকায় দুবার ছিলেন। ১৯২০ সালে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন ন্যুট হামসুন। ২৫ বছর পর আডলফ হিটলারের মৃত্যুতে শোকবার্তা লিখেছিলেন, “হিটলার ছিলেন মানবজাতির যোদ্ধা। সব জাতির জন্য ন্যায়বিচারের বার্তা প্রচারক।” এরপর ন্যুট হ্যামসনের নোবেল পুরস্কারের স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান করে নেয় নোবেল কমিটি। শেষ জীবনে ন্যুট হ্যামসন মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন। তখন স্যানাটোরিয়ামে শুধু বিড়বিড় করে নাকি বলতেন, “আমার হিটলারের পক্ষ নেওয়া মোটেও ঠিক হয়নি।”

নোবল প্রাইজ পাওয়ার যোগ্য, কিন্তু উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী একজন লেখক সম্পর্কে আলোচনা করলেই এ বিষয়ে রাজনীতিটা পরিষ্কার হয়ে যায়; তিনি চিনুয়া আচেবে। পশ্চিমের অনুসারী না হবার কারণেই এই পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন নাইজেরিয়ান এই মহান লেখক। তিনি একজন মৌলিক ও অত্যন্ত শক্তিমান ঔপন্যাসিক। ম্যানবুকার প্রাইজপ্রাপ্ত লেখক চিনুয়া আচেবে আঙুল দিয়ে দেখান পশ্চিমের আফ্রিকা দেখার চোখকে: “মানুষ আফ্রিকা যায়। সেখানে তাদের চোখ তা-ই দেখে, যা তাদের মন ইতোমধ্যেই বিশ্বাস করে বসে আছে। ফলে প্রকৃতই চোখের সামনে যা আছে, ব্যর্থ হয় তা দেখতে। পশ্চিমারা আফ্রিকাকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ মহাদেশ হিসেবে গণ্য করে না। তাদের কাছে, আফ্রিকা দুনিয়ার যত আজগুবি, অবিশ্বাস্য আর অযৌক্তিক বস্তুতে ভরপুর।” 'আর কিছু বলার দরকার আছে কি? আছে আছে। ভারসাম্য রাখার জন্য অবশ্য নাইজেরিয়ারই ওলে সোয়েনকাকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। ঠিক আছে তো!

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;