সাহিত্যে ‘নারীবাদ’



দেবদুলাল মুন্না
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক এক সাক্ষাৎকারে এক যুগ আগে বলেছিলেন, “এদেশের নারীবাদীরা মনে করেন ‘শি’ থেকে ‘হি’ হয়ে ওঠা বা ‘হি’র সমান অধিকার ভোগ করা। কিন্তু যে সমাজেই একজন মানুষ সিটিজেন হিসেবেই মুক্ত না সেই সমাজে আলাদাভাবে নারীমুক্তির আন্দোলন নির্বিশেষ আন্দোলন বা বিপ্লবের পথ থেকে মুখ সরিয়ে বিশেষ ইস্যু তৈরি করা।”

উনার একথার সাথে আমি সম্পূর্ণ সহমত। ফলে দেখা যাচ্ছে আমি মোটেও নারীবাদী নই। তবে কি পুরুষতান্ত্রিক? না তাও নই। আমার মতোই কথা বলেছিলেন রুশ বিপ্লবের অন্যতম নায়ক জোসেফ স্ট্যালিন। তিনি বলেছিলেন, “আমি না নারীবাদী না পুরুষতান্ত্রিক। রাষ্ট্রের চরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখি যে-ই ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে থাকে আমি তারই উৎখাতের পক্ষে। কারণ রাষ্ট্র না নারী না পুরুষ। একটা শোষণ-ব্যবস্থা।” কিন্তু নারীবাদের মধ্যেও তো অনেক কিসিম আছে। এর মধ্যে পলিটিক্যাল ফেমিনিজম তো খুব বেশি দূরে নয় মার্কসিজমে বর্ণিত নারী অধিকার লড়াইয়ের বিষয়ে। তাই পলিটিক্যাল ফেমিনিস্ট আমি নিজেকে দাবি করতেই পারি। নারীকে মানুষ হিসেবেই তো দেখা কাজ। তফাত করার কিছু নেই।

তবে তফাত করেছিলেন অনেক সৃষ্টিশীলরা। যেমন শেক্সপীয়রের মতে—“নৈতিক বিচ্যুতির নামই নারী।” রুশো বলেছেন—“নারী দরকারি অশুভ।” হেগেল বলেছেন—“নারীর ঘিলু ১০ আউন্স কম।” নিৎসে বলেছেন, “নারীরা বন্ধুর উপযুক্ত নয়। তারা এখনো বিড়াল কিংবা পাখি কিংবা খুব বেশি গাভী। পুরুষ নেবে যুদ্ধের প্রস্তুতি, আর নারী হবে যোদ্ধাদের প্রমোদ সামগ্রী।”—এখানেই ক্ষান্ত হননি তিনি। তাঁর প্রবল নারীবিদ্বেষের পরিচয় পাওয়া যায় তার সতর্ক বাণীতে—“যদি মেয়েদের কাছে যাও, তবে চাবুক নিতে ভুলো না।” অবসাদগ্রস্ত বোদলেয়ার প্রেয়সীকে চুমো দিতে গিয়ে দেখলেন নারীর মুখগহ্বরটা একটি পুঁজভর্তি আঠালো চামড়ার থলে। তবে রবীন্দ্রনাথ এখানে ভারসাম্য রক্ষা করতে চেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ নারীকে করে তুলেছেন দুর্জ্ঞেয়—“অর্ধেক মানবী তুমি অর্ধেক কল্পনা।” আহমদ ছফা তো বই-ই লিখে ফেললেন ‘অর্ধেক মানবী অর্ধেক ইশ্বরী’ নামে। বইটির পাণ্ডুলিপি আমার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, “বুঝলা, নারী হইল রহস্যের আধার।” নারীর মধ্যে রহস্য খোঁজার বিরুদ্ধে ছিলেন নারীবাদী মেরি ওলফোনস্টোন। তিনি বলেছিলেন, ‘নারীরাও একটি প্রাণীর মতো সব কিছুই করে। মলত্যাগ করে। যৌনকর্মে লিপ্ত হয়। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার সৌন্দর্য্যবোধ এত নিম্নমানের যে তারা অযথাই নারীর সৌন্দর্য্যকে রহস্যময় করে তোলে।” তা এ কথা তিনি মন্দ বলেননি। কিন্তু আমাদের লেখক ইমদাদুল হক মিলন এক ইন্টারভিউতে জানিয়েছিলেন তিনি ভাবতে পারেন না যে কোনো সুন্দরী টয়লেটে কেন পাদও মারতে পারে! হয়তো এসব চিন্তার প্রতিচিন্তা হিসেবেই প্রতিবাদী মুভমেন্ট হিসেবে শুরু হয়েছিল পশ্চিমে প্রথম নারীবাদী মুভমেন্ট।

আরো পড়ুন ➥ সাহিত্যে চুরি

নারীবাদ বা Feminism শব্দটি ফরাসি ‘Feminine’ থেকে এসেছে। এর অর্থ ‘নারী’। এই শব্দটির সঙ্গে ‘Ism’ বা ‘বাদ’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে Feminism-এ পরিণত হয়। আর নারীবাদী ওইসব নারী-পুরুষকে বোঝায়, যাঁরা নারীর পক্ষালম্বন করেন অবশ্যই যুক্তির মাধ্যমে। জুডিথ অ্যাস্টেলারা তাঁর ‘Feminism and Democratic Transition in Spain’ বইতে নারীবাদ বিষয়ে বলেন, “নারীবাদ হচ্ছে সামাজিক পরিবর্তন ও আন্দোলনের লক্ষ্যে একটি পরিকল্পনা, যা নারী নিপীড়ন বন্ধ করার লক্ষ্যে চেষ্টা করে থাকে। সব কয়টি নারীবাদ সম্পর্কে আলোচনা না করে শুধু লিবারেল, মার্কসিস্ট বা সোশ্যালিস্ট এবং র্যাডিকাল নারীবাদ সম্পর্কে প্রথমে অল্পতে বোঝার চেষ্টা করব।

লিবারেল বা মডারেট ফেমিনিজম চিন্তাধারাটি এসেছে রাজনৈতিক উদারতাবাদের তত্ত্ব থেকে। মেরি ওলস্টোন ক্রাফট (১৭৫৯-৯৭) এই চিন্তাধারার অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁকে বলা হয় নারীবাদের আলোকবর্তিকা। বেটি ফ্রাইডান (The Feminine Stique-1963/The Second Stage-1981) আধুনিক যুগের, বিশ শতকের উদারতাবাদে বিশ্বাসী নারী। উদারতাবাদ নারীতত্ত্ব মনে করে, সমাজ একটি টোটাল সত্তা। নারী-পুরুষ নিয়েই সমাজ গঠিত। সমাজকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। নারী-পুরুষের মাঝে সমতা আনতে হবে। কাজেই নারীকে শিক্ষিত করে কর্মজীবী নারীতে পরিণত করতে হবে। লিবারেল ফেমিনিজম মনে করে, আইনগত বৈষম্য, চাকরি ক্ষেত্রে বৈষম্য এবং সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতাই নারী-পুরুষ বৈষম্যের মূল কারণ। নারীদের অধস্তন অবস্থানটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ গ্রহণ করায় এ অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে। অবস্থান পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সমাজ সচেতনতা এবং শিক্ষা বিস্তার। তবে নারী যত দিন আত্মসচেতন না হবে, ততদিন নারীর অধস্তনতা দূর হবে না। লিবারেল ফেমিনিস্টদের কেউই নারী-পুরুষ বৈষম্যের গোড়ার ওপর কিছু লেখেননি। মনে হয়, তাঁরা একেবারেই ধরে নিয়েছেন, প্রকৃতিগত বৈষম্যের ফলেই নারী-পুরুষ পৃথক; এবং এর ফলেই নারীর অধস্তন অবস্থা। তাঁদের মতে, উন্নত জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি যতদিন পর্যন্ত আবিষ্কার না হবে, ততদিন নারীরা সন্তান জন্মদান এবং লালন-পালনের জন্য অধিকাংশ সময় ব্যয় করবেন। লিবারেল ফেমিনিস্টরা পুরুষকে তাদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেন না। কাজেই মাতৃত্ব এবং পরিবার তাঁদের সমালোচনার বিষয়বস্তুও নয়। তবে বর্তমানে পরিবার যেভাবে গঠিত, তার বিরুদ্ধে সোচ্চার। বেটি ফ্রাইডানের মতে, যখন একজন নারী একজন মানুষের মতোই সম্পূর্ণ স্বাধীন হবেন, পরিবার তখন তাঁর ওপর কোনো অত্যাচার করতে পারবে না।

আরো পড়ুন ➥ বাংলা সাহিত্যে দেশভাগ

লিবারেলবাদীরা সমাজ পরিবর্তনে বিপ্লবের কথা বলেন। কিন্তু বিপ্লবকে তাঁরা আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করেননি। তাঁদের মতে, বর্তমান সমাজব্যবস্থার মধ্যে থেকেও পরিবর্তন আনা সম্ভব, নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যে সমতা আনা যায়। তাঁদের অধিকাংশই মনে করেন, সমাজ সংশোধনের মাধ্যমেই ঈপ্সিত পরিবর্তনটি সম্ভব। মার্কসীয় নারীবাদে নারীসমাজের নিপীড়নের ব্যাখ্যা অপ্রতুল। মার্কসবাদে শ্রমিক শ্রেণীর ওপর বুর্জোয়া শ্রেণীর শোষণ-নিপীড়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রচুর। কিন্তু নারীর ওপর পুরুষের নির্যাতনের ভয়াবহতা তেমনভাবে প্রকাশ করা হয়নি। আসলে মার্কসীয় নারীবাদের অপ্রতুলতার কারণেই সমাজতন্ত্রী নারীবাদের জন্ম। এই মতবাদে বিশ্বাসীরা মনে করেন, সভ্যতার ঊষালগ্নে নারীদের এই অধস্তন অবস্থানটি ছিল না। বরং সমাজে তাঁরা নেতৃত্ব দিতেন। পরিবার প্রতিপালনের দায়িত্ব ছিল প্রধানত নারীদের। পুরুষরা সেই যুগে খাবার সংগ্রহে বা শিকারে যেতেন। কিন্তু এ দুটোই ছিল অনিশ্চিত। অন্যদিকে নারীরা নিশ্চিত খাবার অর্থাৎ ফলমূল জোগাড় এবং সন্তান লালনের কর্তব্য কাঁধে নেওয়ায় সমাজ ও পরিবারের উপরের আসনটি দখল করে নিয়েছিলেন। কিন্তু সভ্যতার ক্রমবিকাশের ফলে চাষাবাদের অগ্রগতি, নিত্যনতুন প্রযুক্তির আবিষ্কার নারী জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনলেও নারীর আসনটিকে সমাজে পুরুষের চেয়ে অধস্তন করে দেয়। কারণ পুরুষ প্রযুক্তিগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। এক্ষেত্রে নারীরা ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয় পুরুষতান্ত্রিক পরিবার, ব্যক্তিমালিকানা, শ্রেণীবিভক্ত সমাজ, কেউ উৎপাদক/কেউ উৎপাদিত দ্রব্যের মালিক। এগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্র পুরুষের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে যুক্ত হয়। কালক্রমে সমাজে পরিবারের দায়িত্বও পরিবর্তিত হয়—পরিবার পুঁজি গঠনের সহায়ক ব্যক্তির মানসিক শান্তি বা ব্যক্তিত্বও বিকাশের কেন্দ্রস্থল নয়। সেই যে নারীরা বৈষম্যের শিকার হলো, যুগের পর যুগ তা-ই চলে আসছে। সব যুগ, বিশেষ করে পুঁজিবাদী যুগ নারী শোষণকে আরো তীব্রতর করেছে। পুঁজিবাদ নারীর নারীত্বকে পুঁজি করে ব্যবসা করছে, আবার পুরুষের সঙ্গে একই শ্রমে নারীকে মজুরি কম দিচ্ছে। যেহেতু ব্যক্তিমালিকানা এবং শ্রেণী বিভাজিত পুঁজিবাদ সমাজই পুরুষ প্রাধান্য এবং নারী বৈষম্যের মূল কারণ, সুতরাং নারী মুক্তি এবং নারী-পুরুষ সমতার জন্য সমাজে একটি ‘সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব’ প্রয়োজন। এসব সমাজতান্ত্রিক নারীবাদী চিন্তাভাবনার মূল যোগানদার ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস।

রেডিক্যাল ফেমিনিজমের ধারণা সাম্প্রতিক বিশ্বের বিশ শতকের সত্তর দশক থেকে। শুলামিথ ফায়ারস্টোন তাঁর নারীবাদী একটি বইয়ে ধারণাটি বিশ্লেষণ করেন। মতবাদে পুঁজিবাদকে নারী বৈষম্য-বঞ্চনার সোর্স হিসেবে স্বীকার করা হয় না। বরং বলা হয়, নারী-পুরুষ বৈষম্য প্রকৃতিগত। বলেন এইটা বলার পর আর নারীবাদের ভিত্তি মজবুত থাকে রেডিক্যালদের। রেডিক্যাল ফেমিনিস্টরা মনে করেন, বেশিরভাগ কর্মজীবী মহিলাই এখনো দুটো কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। তাঁদের মতে, একত্রে বসবাসেও পরিবারের ধারণা অনেক কমে আসবে। ফায়ারস্টোন মনে করেন, নারী নিপীড়নের মূল যেহেতু জৈবিক, কাজেই উভয়লৈঙ্গিক সমাজ গঠিত হলে সমাজে নারীর ওপর অত্যাচার থাকবে না। কিন্তু কিভাবে এ ধরনের সমাজ প্রতিষ্ঠা হতে পারে? তার পদ্ধতিও র্যাডিক্যাল ফেমিনিস্টরা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, নারীমুক্তিতে বিপ্লবই প্রয়োজন। সে বিপ্লবই নারীমুক্তি বিপ্লব; অর্থনৈতিক মুক্তির বিপ্লব নয়। কাজেই আমরা দেখি, সোশ্যালিস্ট ফেমিনিস্ট এবং র্যাডিক্যাল ফেমিনিস্ট—উভয়েই বিশ্বাস করেন, নারীরা বৈষম্য-বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন, নির্যাতিত হচ্ছেন। কিন্তু কেন এই অসমতা দুই দলের, দুই ধরনের মতবাদ। প্রথম দলটি মনে করে, অর্থই অনর্থের ভূমিকা পালন করছে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি তথা পুঁজিবাদ এর মূল কারণ। আর দ্বিতীয় দলটি মনে করে, পিতৃতন্ত্র অথবা পুরুষ প্রাধান্য অথবা পুরুষত্বই নারী নির্যাতনের প্রধান কারণ। তবে দুটি দলই পৃথিবীতে শান্তিপূর্ণ সমাজব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা চাচ্ছে। নারীমুক্তি, নারী স্বাধীনতা, লিঙ্গ বিতর্ক এবং নারীবাদ একেবারেই আধুনিক প্রপঞ্চ, এবং উদ্ভব প্রায় একইসঙ্গে ইউরোপ ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে। এই শব্দবন্ধগুলি ব্যবহার শুরু হয় ১৮৩০ সাল থেকে। একধরনের বৈশিষ্ট্য নিয়ে এটি ব্যাপ্ত হয় ১৯২০ সাল পর্যন্ত, এটা ছিল মূলত নারীশিক্ষা ও ভোটাধিকার অর্জনের আন্দোলন। নারীবাদের ইতিহাসে এই কাল-পরিসরকে প্রথম পর্যায় বা তরঙ্গ ধরা হয়। দ্বিতীয় তরঙ্গ বা পর্যায়ের শুরু ১৯৬০ সাল থেকে, এটি সংগঠিত আন্দোলনের কাল। এই পর্যায়ে এসে নারী স্বাধীনতার প্রশ্নটি প্রকাশ্য ও বহুমাত্রিকতা লাভ করে, শুরু হয় এর বাস্তবায়ন ও অনুশীলনও। পরিবার ও সমাজে নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার, সর্বস্তরে চাকরি ও কাজ করার অধিকার, বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ এবং গর্ভপাত ও জন্মনিয়ন্ত্রণের স্বাধীনতা, ইত্যাদি ছিল এর মূল বিবেচ্য বিষয়।

আরো পড়ুন ➥ সাহিত্য করে ‘ধনী’ ও ধনী হয়ে ‘সাহিত্য’ করার গল্প

১৯২১ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত সময়টুকুকে এই পর্যায়ের মাঝখানে সেতুবন্ধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই অন্তর্বর্তীকালের মধ্যেই ফ্রান্সের মহিলা দার্শনিক সিমোন দ্য বোভেয়ারের ‘দি সেকেন্ড সেক্স’ (নিজ ভাষায় ১৯৪৯ সালে, ইংরেজি অনুবাদে ১৯৫৩ সালে) বইটি প্রবাশিত হয়। সেসময় বেশিরভাগ দেশেই গর্ভপাত এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ নিষিদ্ধ ছিল। এই বইয়ের অনেক বিষয় এবং দৃষ্টিভঙ্গিই ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়, কালে কালে কিছু-কিছু অগ্রহণযোগ্যও হয়ে পড়ে, তথাপি এই বইটির নৈতিক প্রভাব নারীবাদী আন্দোলনের ওপর এখনো বর্তমান। সেসময় ‘সমমানের কাজের জন্য সমান পারিশ্রমিক চাই’ (equal pay for equal work)—এই সমানাধিকারমূলক নারীবাদী (equality feminism) ধারণার উদ্ভাবক আমেরিকান নারী নেত্রী বেটি ফ্রিড্যান, তাঁর বইটির নাম ‘দ্য ফেমিনাইন মিসটিক’, এটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে। বোভেয়ারকে যেমন ইউরোপে দ্বিতীয় পর্যায়ের নারীবাদী আন্দোলনের বাতিঘর হিসেবে গণ্য করা হয়, তেমনি ফ্রিড্যানকে আমেরিকায় একই মর্যাদা দেওয়া হয়। ১৯৬৬ সালে তিনি ‘ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অফ উইমেন’ (NOW) গঠন করে নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করেন।

পরবর্তীকালে বোভেয়ারের অ্যান্টি-এসেনশিয়ালিস্ট চিন্তাধারাকে এগিয়ে নিতে বিশেষভাবে ভূমিকা রেখেছেন আমেরিকান উগ্রপন্থী নারীবাদী চিন্তাবিদ শুলামিথ ফায়ারস্টোন। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত তাঁর গ্রন্থ দ্য ডায়ালেকটিক অফ সেক্স নারীমুক্তি আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়কে গতিমান করে। এই বইতে তিনি পূর্বসূরি বোভেয়ারের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে দাবি করেন, নারীকে তার জীববৈজ্ঞানিক সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করার জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।

আরো পড়ুন ➥ শিল্পসাহিত্যে ‘স্বাধীনতা’

আমেরিকান নারীবাদী ধর্মতত্ত্ববিদ মেরি ডালির একটি বই ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হয়। Gyn, Ecolog. তাঁর মতে, ধর্ম, আইন এবং বিজ্ঞান পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার হাতিয়ার। তিনি বিশেষভাবে খ্রিস্টতত্ত্বের ‘প্রভু পিতা’ (God the father) ধারণার কঠোর সমালোচনা করেন এবং একে নারীমুক্তির পথে বিরাট প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি প্রথম নারীবাদী অভিধানও লেখেন। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন, নারীরা ভালো। পুরুষরা খারাপ। প্রকৃতিগতভাবেই। আর এখান থেকেই উদ্ভূত হয়েছে ‘ইকোফেমিনিজম’ (Ecofeminism)। বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকের শান্তিবাদী আন্দোলন এই ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলে। তখনই আরো দুটি ধারার মুভমন্টে শুরু হয়, যেমন, ‘সেপারেটিস্ট ফেমিনিজ’, ‘লেসবিয়ান ফেমিনিজম’। এই দুই ধারা পুরুষবর্জন করে। তবে মধ্যপ্রাচ্য, চীন এবং ভারতীয় উপমহাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোতে যে নারীবাদী চিন্তার বিকাশ ঘটে এগুলো ইউরোপ-আমেরিকার চিন্তাধারা থেকে বেশ পৃথক।

ইসলামী নারীবাদ আবার পাশ্চাত্যীয় ধারার আধুনিক ধর্মবিমুখ নারীবাদ বিরোধী। ইসলামী নারীবাদ চেয়েছে ইসলামের মৌলিক জীবনদর্শনের মধ্যে থেকেই নারীর সকল অধিকার আদায় করতে ইসলাম সুস্পষ্টরূপে নারীকে যেসব অধিকার দিয়েছে সেগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন ইসলামী বিধানের প্রচলিত ভুল ব্যাখ্যার অপনোদন বা নতুন ব্যাখ্যা উপস্থাপনের মাধ্যমে। এসেনশিয়ালিস্ট ফেমিনিজম-এর অনেক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ইসলামিক ফেমিনিজম-এর সমিলতা লক্ষ্য করা যায়। এই দুটো ধারাই নারীকে নারী হিসেবেই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত দেখতে চায়, নারীত্ব ও মাতৃত্ববোধ এবং প্রকৃতির সঙ্গে নারীর সাযুজ্যকে (Ecofeminism) বিশেষ গুরুত্ব দান করে। নারীবাদী আন্দোলন মুসলিম বিশ্বে শুরু হয় ঊনবিংশ শতাব্দীতে, প্রথমে ইরান ও মিসরে। এরপর আরববিশ্বসহ অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোতেও তা ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত মিসরীয় আইনবিদ ক্কাসিম আমিনের ‘তাহরির আল-মার’ (Women’s Liberation) বইটি এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। ১৯২৩ সালে হোজা শারাভি ‘ইজিপশিয়ান ফেমিনিস্ট ইউনিয়ন’ গঠন করেন। ১৯৫৬ সালে প্রেসিডেন্ট গামাল আব্দুল নাসের ‘রাষ্ট্রীয় নারীবাদ’ প্রবর্তন করেন। আরববিশ্বসহ সকল মুসলিম দেশেই নারীবাদের ইসলামী ও ধর্মনিরপেক্ষ ধারা পাশাপাশি বিকশিত হয়েছে।

আরো পড়ুন ➥ সাহিত্যে নোবেল, প্রত্যাখ্যান ও কেড়ে নেওয়ার গল্প

ঊনবিংশ শতাব্দীতে মহান সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়ের প্রস্তাবিত ‘সহমরণ বিষয় প্রবর্ত্তক ও নিবর্ত্তকের সম্বাদ’-এর মাধ্যমে হিন্দু সমাজ থেকে ‘সতীদাহ প্রথা’ চিরতরে রদ হলেও এই একবিংশ শতাব্দীতেও বিভিন্ন অমানবিক প্রথা বন্দী করে রেখেছে বাঙালি নারীকে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবিনাশী অবদানে বিধবা বিবাহ প্রচলন; বাল্যবিবাহ বন্ধের মাধ্যমে ‘নারী’ ফিরে পেয়েছিল তার আধেক মুক্ত জীবন। কিন্তু পুরোপুরি পায়নি এটা আমরা সবাই জানি।

বাংলা সাহিত্যে নারীর অবস্থান এখনো অনেকটা রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’র মতো—
“পূজা করি রাখিবে মাথায়, সেও আমি নই,
অবহেলা করি পুষিয়া রাখিবে
পিছে সেও আমি নহি। যদি পার্শ্বে রাখো
মোরে সংকটের পথে, দুরূহ চিন্তার
যদি অংশ দাও, যদি অনুমতি করো
কঠিন ব্রতের তব সহায় হইতে,
যদি সুখ-দুঃখে মোরে করো সহচরী
আমার পাইবে তবে পরিচয়।”
১৮৭৩ সালে কুমিল্লায় নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণী নারীশিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় একই সময়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের নবাব ফেরদৌস মহল এবং খুজিস্তা আখতার সোহরাওয়ার্দী কলকাতায় মেয়েদের জন্য পৃথক দুটি স্কুল করেন। বেগম রোকেয়া ১৯০৯ সালে বিহারের ভাগলপুরে মেয়েদের স্কুল করেন। সেটি ১৯১১ সালে কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়। কিন্তু সংগঠিত নারীবাদী আন্দেলন বলতে যা বোঝায় তা তখনও শুরু হয়নি, যদিও বেগম রোকেয়া তাঁর সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে সেই কাজটি সম্পূর্ণ একাকীই শুরু করেছিলেন।

নারীবাদী আন্দোলনের একটি বড় ফসলতা ‘নারীবাদী সাহিত্যতত্ত্ব’। এটা নারীবাদী আন্দোলনের দ্বিতীয় তরঙ্গ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। সাহিত্য সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টির প্রয়াস থেকে এই তত্ত্বের জন্ম। বিংশ শতাব্দীর সত্তর দশকের আগে সাহিত্যকর্ম এবং সাহিত্যবিচারপদ্ধতি ছিল পৌরুষীয় দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন। ভার্জিনিয়া উল্ফ, জেন অস্টিন, জর্জ এলিয়ট এবং শার্লট ব্রন্টি ছিলেন ব্যতিক্রম। নারীবাদী সাহিত্যতত্ত্বের কাজ আরো আগেই শুরু করেছিলেন ভার্জিনিয়া উলফ। তাঁর ‘একজনের নিজের ঘর (A Room for One’s Own) প্রবন্ধে তিনি নারীদের যে নিজস্বতার প্রয়োজনীয়তা, স্বাতন্ত্র্য ও অধিকারের কথা বলেন সত্তর দশকে এসে নারীবাদী সাহিত্যিকরা তারই ধারাবাহিকতায় কাজ শুরু করেন। এরপর বেভোয়ারের পর ১৯৬৯ সালে কেইট মিলার প্রকাশ করেন তাঁর জনপ্রিয় বই ‘যৌনতার রাজনীতি’ (Sexual Politics)। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত ডালি স্পেন্ডারের মাদার্স অফ দি নভেল এবং জেন স্পেন্সারের দি রাইজ অফ দি উইম্যান নভেলিস্টস বই দুটি বেশ সাড়া ফেলেছিল। নারীবাদী সাহিত্যতত্ত্ব এখন একটি প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যতত্ত্ব, যার শাখা-প্রশাখাও ছড়িয়েছে বেশ কিছু, যেমন ‘গে সাহিত্য’ এবং ‘লেসবিয়ান সাহিত্য।’ উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যতত্ত্ব এবং উত্তর-আধুনিক সাহিত্যতত্ত্ব নারীবাদী সাহিত্যতত্ত্বকে শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক করে তোলে।

আরো পড়ুন ➥ স্ট্রিট লিটারেচার

এদিকে ১৯০৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয় বেগম রোকেয়ার প্রথম বই ‘মতিচুর’ (প্রথম খণ্ড)। সাতটি চিন্তাশীল প্রবন্ধ নিয়ে এই বইটি রচিত। বেগম রোকেয়ার প্রথম ইংরেজি রচনা, ব্যঙ্গরসাত্মক রূপক রচনা Sultana’s Dream প্রকাশিত হয় মাদ্রাজ থেকে কমলা সাতথিয়া নাথান ও সরোজিনী নাইডু সম্পাদিত Indian Ladies Magazine পত্রিকায়, ১৯০৫ সালে। এটি বই হিসেবে প্রকাশিত হয় ১৯০৮ সালে।

বেগম রোকেয়া ‘মতিচুর’-এ লিখেছিলেন, “আমি ভগিনীদের কল্যাণ কামনা করি, তাঁহাদের ধর্ম্মবন্ধন বা সমাজবন্ধন ছিন্ন করিয়া তাঁহাদিগকে একটা উন্মুক্ত প্রান্তরে বাহির করিতে চাহি না। মানসিক উন্নতি করিতে হইলে হিন্দুকে হিন্দুত্ব বা খ্রিস্টানকে খ্রিস্টানী ছাড়িতে হইবে এমন কোনো কথা নাই। আপন আপন সম্প্রদায়ের পার্থক্য রক্ষা করিয়াও মনটাকে স্বাধীনতা দেওয়া যায়। আমরা যে কেবল উপযুক্ত শিক্ষার অভাবে অবনত হইয়াছি, তাই বুঝিতে ও বুঝাইতে চাই।”

তিনিই লিখেছিলেন, “যে পর্যন্ত পুরুষগণ শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে স্ত্রীলোকদিগকে তাহাদের প্রাপ্য অধিকার দিতে স্বীকৃত না হয়, সে পর্যন্ত তাহারা স্ত্রীলোকদিগকে শিক্ষাও দিবে না। যাহারা নিজের সমাজকে উদ্ধার করিতে পারিতেছে না, তাহারা আর দেশোদ্ধার কীরূপে করিবে? অর্ধ্বাঙ্গীকে বন্দিনী রাখিয়া নিজে স্বাধীনতা চাহে, এরূপ আকাঙ্ক্ষা পাগলেরই শোভা পায়! সদাশয় ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট যেমন ভারতবাসীর উচ্চাকাঙ্ক্ষা সহ্য করিতে চাহেন না—আমার মনে পড়ে প্রায় ২১ বৎসর পূর্ব্বে মিস্টার মর্লি বলিয়াছিলেন, “যদি তাহারা চাঁদের জন্য আবদার করে (If they cry for the Moon), তাহা আমরা দিতে পারি না” ইত্যাদি এবং আমাদের অমুসলমান প্রতিবেশীগণ এখন সাধারণত যেরূপ মুসলমানদের দাবি-দাওয়া সহ্য করিতে পারেন না, সেইরূপ মুসলমান পুরুষগণও নারীজাতির কোনো প্রকার উন্নতির অভিলাষ স্বীকার করিতে চাহেন না।” উল্টোদিকে তসলিমা নাসরিন তার শোধ উপন্যাসে দেখান, স্বামী পরকিয়া প্রেম করে বলে স্ত্রীও পরকিয়া প্রেমে মেতে ওঠে। বা নারীদের পুরুষ বেশ্যাও তিনি খুঁজতে বলেছেন। উল্টোদিকে বেগম রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’ একটি স্বল্পায়তনিক রচনা। এটিকে ছোটগল্প বলাই সমীচীন। এটি একটি ব্যাঙ্গ-রসাত্মক সৃষ্টি। একে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীও বলা চলে। নারী যে কোনো অংশেই পুরুষের তুলনায় কম নয় সেটি একটি কল্পকাহিনীর মাধ্যমে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন বেগম রোকেয়া। এই গল্পে নারীরা তাঁদের জ্ঞান, দক্ষতা, উদ্যম এবং কর্মতৎপরতার জোরে যে দেশ গড়ে তুলেছেন সেটি ‘নারীস্থান’, অর্থাৎ নারীদের বা নারীশাসিত বা নারী-প্রাধান্যের দেশ। এখানে লেখক নারীকে পুরুষের সমান নয়, বরং তার চেয়ে শ্রেষ্ঠতর হিসেবে চিত্রিত করেছেন।

আরো পড়ুন ➥ তবু সে দেখিল কোন ভূত

এছাড়া বাংলা সাহিত্যে নারীবাদী রচনার মধ্যে রয়েছে আশাপূর্ণা দেবীর বিখ্যাত ট্রিলজি, প্রথম প্রতিশ্রুতি (১৯৬৫), সুবর্ণলতা (১৯৬৭), ও বকুল কথা (১৯৭৪)। মোটামুটিভাবে আশাপূর্ণা দেবীর সব লেখাই নারী কেন্দ্রিক। তবে এসব লেখা নারীকেন্দ্রিক হলেও নারীবাদী নয়।

ষাটের দশক পেরিয়ে সত্তরে পৌঁছে নারীকেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্যে এক লক্ষণীয় পরিবর্তন এলো। এ পর্যন্ত সাহিত্যের জগতে ঘোরাফেরা করেছে মধ্যবিত্ত মেয়েরা; গল্প উপন্যাস গড়ে উঠেছে তাদের মানসিক টানাপড়েন নিয়ে। এবারে আনাগোনা আরম্ভ হলো শ্রেণী, বর্ণ, ধর্ম, ও দারিদ্রসীমার বাইরে দাঁড়ানো মহিলাদের। এবারে শুধু মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নয়, দৈনন্দিন খাওয়া পরা, রাজনৈতিক নির্যাতন, বেঁচে থাকার তাগিদ নিয়ে সাহিত্য গড়ে উঠল। এই নতুন প্রবণতার সূচনা হয়েছিল আগেই, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (বুড়ি, ১৯৬৩; নিচু চোখে একটি মেয়েলী সমস্যা, ১৯৬৩) ও তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের (ডাইনী, ১৯৭৩) কিছু ভিন্নধর্মী রচনা প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। তবে মহাশ্বেতা দেবীর হাতে এই জাতের গল্প যেন প্রাণ পেল। তাঁর গল্পে আমরা পাই পুলিশী অত্যাচারে নিহত নকশাল সন্তানের ফুরিয়ে যাওয়া মাকে (হাজার চুরাশীর মা), দোপদি মেঝেনকে (দ্রৌপদী), ধনীর ছেলের স্বাস্থ্যের খাতিরে বুকের দুধ বিক্রি করে বেঁচে থাকা যশোদাকে (স্তন্যদায়িনী)। এদের জীবনের মধ্যে দিয়ে সার্বজনীন নারীবাদের জটিলতা মহাশ্বেতা দেবী তাঁর লেখায় তুলে ধরেছেন। আমাদের দেশে পূরবী বসু এবং শফি আহমেদ সম্পাদিত একটি সঙ্কলনে বাংলাদেশের প্রবীণ থেকে নবীন, নানা বয়সের লেখকের একগুচ্ছ নারীবাদী ছোটগল্প আমাদের উপহার দিয়েছেন। এর অনেকগুলিই সাহিত্যের চেয়ে রাজনৈতিক জবানীর প্রতি বেশী মনোযোগী। দরিদ্র নারী আর সমাজের বৃত্তচ্যুত সংসার ঘিরে এই নারীবাদী লেখিকারা তাঁদের গল্পের জাল বুনেছেন। সেলিনা হাসান (মতিজানের মেয়েরা), নয়ন রহমান (বীরপুরুষ), রাবেয়া খাতুন (নাগমোতির হাটে), ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ (সূর্য তৃষিতা) মধ্য বা উচ্চবিত্ত সমাজের ধার ঘেঁষেননি। তাঁদের নায়িকারা বাড়ির ঝি, গ্রামের বৌ, বিক্রিত কন্যা। এঁদের অনেকেই নারী-শরীরের সরিকত্ব নিয়েও সচেতনতা আনতে চেয়েছেন। আমার শরীর আমার কাছে, অন্যের কী বলার আছে। এগুলো নারীবাদী সাহিত্যের বাইরেই রাখতে চাই আমরা।

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;