রণাঙ্গনের অনাকাঙ্ক্ষিত একটি দুর্ঘটনা



সার্জেন্ট (অব.) সৈয়দ জহিরুল হক
গ্রাফিক বার্তা২৪.কম

গ্রাফিক বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের স্মৃতি ১জয়দেবপুরের গণ বিক্ষোভ
ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের স্মৃতি ২আশুগঞ্জের বিমান হামলা
ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের স্মৃতি ৩সিলেটের মাধবপুরের যুদ্ধ


একবার ক্যাপ্টেন নাসিম সাহেব আমাকেসহ ১০/১৫ জনের একটি ছোট দল তৈরি করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সিলেট রোডের ওপর একটি এন্টি ট্যাঙ্ক মাইন লাগানোর জন্য পাঠিয়ে দিলেন। সেই দলে ছিলেন সুবেদার মনির আহমেদের নেতৃত্বে বিকিউএস এইচ ফরাজ, বিডিআর মোস্তফা, সিপাহী আবু জাফর, ইসহাক ও আব্দুল জলিল। আমিও সে দলে ছিলাম। রাত ১১টার পর আমরা নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে পৌঁছলাম। পাকা রাস্তার পূর্ব পাশে কিছু জঙ্গল ও ঘরবাড়িতে আমরা এ্যাম্বুশে বসি। দুই জন সৈনিক এন্টি ট্যাঙ্ক মাইন নিয়ে রাস্তার ওপর উঠে পাকা রাস্তা খোদাই করে মাইন লাগিয়ে আমাদের অবস্থানে ফিরে আসে। সম্ভবত রাত একটার দিকে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া থেকে সিলেট অভিমুখে যাবার জন্য একটি ট্রাক যখন আমাদের এ্যাম্বুশের মাঝে আসে তখন আমরা একত্রে ঐ ট্রাকের ওপর গুলিবর্ষণ শরু করলাম। ঐ সময় পকিস্তানি বাহিনীও গাড়ি থেকে নেমে রাস্তার বিপরীত পাশে অবস্থান নিয়ে আমাদের লক্ষ্য করে ফায়ার শুরু করে। উভয় পক্ষে গোলাগুলিতে পাক সেনাদের ২/৪ জন সম্ভবত নিহত হয়েছিল। আমরা ৫/৭ মিনিট ফায়ার করার পর দ্রুত উইড্রল করি। যে পথে এসেছিলাম সেই পথ ধরে ক্যাম্পে ফিরে যাই।

ভোর ৫টায় আমরা ক্যাম্পে পৌঁছালে সকলেই শীতে কাতর হয়ে পড়েছিলাম। এসেই নাসিম সাহেবকে এ্যাম্বুশের বিবরণ বর্ণনা করি। এ সময় চা-নাস্তার জন্য আমরা যার যার মতো বিশ্রাম নিই। কিন্তু সিপাহী জলিল সে চা পান করার জন্য লঙ্গরে প্রবেশ করে। সেখানে বাবুর্চিরা আমাদের জন্য চা, পুরি তৈরি করছিল। জলিল যখন একটি মগে করে চা নিতে যাচ্ছিল তখন একজন বাবুর্চি সিপাহী আব্দুল গফুর মজা করে তাকে বলে বড় কামাই করে এসেছেন, তাকে এখনই চা দিতে হবে। তখন জলিল বলে তোর ক্ষমতা থাকে তো এ বন্দুক চালিয়ে দেখা। বন্দুকও চালাতে পারবি না, তো বাবুর্চিগিরি করবি না, কী করবি? এমন সময় গফুর বলল, আপনার বন্দুকটা দেন, আমি চালিয়ে দেখিয়ে দিই। জলিল ভালো করেই জানত ওর চায়না ৭.৬২ এমএম অটো রাইফেল চালাবার মতো জ্ঞান নেই। কেননা ওরা ট্রেনিং সেন্টারে ব্রিটিশ থ্রিনটথ্রি রাইফেলের প্র্যাক্টিস করেছে মাত্র। এ বিশ্বাসের বলে জলিল নিজের রাইফেল ওকে দেয়। এক্ষেত্রে জলিলের ভুল ছিল দুটি। এক. অপরেশন থেকে আসার পর রাইফেল আনলোড করে নাই। দুই. সেপ্টিক্যাস অফ করে নাই।

গফুর রাইফেল হাতে নিয়ে ওর সামনের দেওয়ালের দিকে লক্ষ্য করে যেই ট্রিগার চাপ দেয় ওমনি একটি বুলেট জলিলের বুক ভেদ করে চলে যায়। ওখানেই ওর মৃত্যু হয়। আমরা দৌড়ে গিয়ে দেখি, ওর কলিজা মাটির দেওয়ালের সাথে আটকে আছে। এ দৃশ্য দেখে আমরা হতভম্ব হয়ে গেলাম। ওর আর চা খাওয়া হলো না। গফুরও এ অবস্থা দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়ল। নাসিম সাহেব দৌড়ে লঙ্গর খানায় এসে এ দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে যান। এমন এক মুহূর্তে আমরা একজন সৈনিক হারালাম যখন আমাদের যোদ্ধা সৈনিকের খুবই অভাব ছিল। জলিল প্রায় প্রতিটি অপারেশনে আমাদের সঙ্গেই থাকত। এ মর্মান্তিক ঘটনাটা সম্ভবত নভেম্বরের শেষের দিকে ঘটে। অন্যদিকে রান্নাবান্নার জন্য ববুর্চির অভাব থাকাতে নাসিম সাহেবও একটু চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এমন পরিস্থিতিতে তিনি রাগে সিপাহী বাবুর্চি গফুরকে বন্দী করার নির্দেশ দিলেন। ওর যখন জ্ঞান ফিরল তখন ও অনেকটা পাগলের মতো প্রলাপ বকতে শুরু করে। আমি জানি না, দেশ স্বাধীনের পর সরকার জলিলের ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নিয়েছে। ওর বাবা মা বা আত্মীয় স্বজনরা ওর কোনো সন্ধান পেয়েছে কিনা তাও আমার জানা নেই। ওর বাড়ি ছিল সম্ভবত রাজশাহী অথবা দিনাজপুর। ওর ঠিকানা আজ আমার কিছুই মনে নেই। সম্ভবত তখনকার ২য় বেঙ্গল রেজিমেন্টে রেকর্ডপত্রে ওর নাম, নম্বর ঠিকানা থাকতে পারে। ওকে দাফন করার পর আমরা পুনরায় নিজেদের অবস্থানে ফিরে যাই। পরবর্তীতে অনেকের অনুরোধে নাসিম সাহেব সিপাহী বাবুর্চি গফুরকে ক্ষমা করে দেন।

একসময় নাসিম সাহেব আমাকে আইনটি কোর্স করার জন্য আমাদের ব্যাটেলিয়ান হেড কোয়ার্টারের ট্রেনিং সেন্টারে পাঠালেন। সেখানে একজন আইনটি হাবিলদার ও একজন আইনটি নায়েক আমাদেরকে কোর্স করান। সেখানে আমাদের ব্যাটেলিয়ানের প্রত্যেক কোম্পানি থেকে ২/১ জন করে সৈনিক পাঠিয়েছিল। তখন একদিন আমাদের ব্যাটালিয়ানের ক্লার্ক অফিসে যাই ক্লার্কদের সাথে দেখা করার জন্য। তখন হেড ক্লার্ক সুবেদার আব্দুল লতিফ হায়াত সাহেব আমাকে দেখ বললেন, “জহির! নাসিম সাহেবকে বলে তোমাকে আমাদের অফিসে ক্লার্কের জন্য নিয়ে আসি।” জবাবে আমি বলেছিলাম, “না, স্যার। যতদিন দেশ স্বাধীন না হবে ততদিন আমি রণাঙ্গনেই থাকব।” আমরা দু সপ্তাহে কোর্স শেষ করে আমাদের কোম্পানিতে ফিরে যাই।

নাসিম সাহেব মাঝে মঝে আমাদের ডিফেন্সে ওপি পোস্টের জন্য আমাকে পাঠাতেন। এবং বিভিন্ন ছোট খাট অপারেশনে ও পেট্রোলিংয়ে আমাকে তিনি সঙ্গে নিয়ে যেতেন। একদিন সন্ধ্যার সময় আমাদের পুরো কোম্পানিকে রিয়ার হেড কোয়ার্টারে নিয়ে আসলেন। আমাদের প্রত্যেকের নিকট একটি করে বেলচা এবং সামান্য কিছু গুলি নিয়ে নিজ নিজ ব্যক্তিগত হাতিয়ার নিয়ে যেতে বললেন। রাতের মধ্যে ইনফ্লেটেশন করে আমাদের ডিফেন্স থেকে আরো তিন/চার মাইল ভিতরে ঢুকে অবস্থান নিতে বলেন। এবং বললেন, “চলার পথে কেউ কোনো শব্দ করবে না। আমার হুকুম ছাড়া কেউ একরাউন্ড গুলিও করবে না। এবং যার যেখানে অবস্থান হবে সেখানে প্রত্যেকেই দ্রুত একটি করে ফক্সহোল খোদাই করে ডিফেন্স নিয়ে নিবে। ভোর ৫টা থেকে আমাদের আর্টিলারি গানে ফায়ার দিতে থাকবে। একঘণ্টা এ ঘোলাবর্ষণ চলবে। এবং আমি যখন উইড্রল সিগন্যাল দিব তখন তোমরা সকলেই চলে আসবে।” আমরা রাত ২/৩টার ভিতর ফক্সহোল খোদাই করে ডিফেন্স নিয়ে বসি। যথা সমেয় আর্টলারি গোলার ফায়ার শুরু হয়। এবং একঘণ্টার পর তা বন্ধ করে দেয়। দেখি আমাদের ডিফেন্স থেকে মাইল খানেক দূর দিয়ে ভারতীয় একটি ব্যাটালিয়ানের সৈনিক দল পাকিস্তান ডিফেন্স এলাকায় তদন্ত করে যায়। সকাল ৭টার দিকে নাসিম সাহেব উইড্রল সিগন্যাল দিয়ে দিলে আমরা চলে আসি। এত বড় অপারেশনের মাঝে আমাদের এক রাউন্ড গুলিও খরচ করতে হয়নি।

গোটা নয় মাস যুদ্ধকালে প্রতিটি মুহূর্ত শত্রুর মুখোমুখি ছিলাম। যে কোনো মুহূর্তে আমরা একটি বুলেট অথবা একটি আর্টিলারি গোলার খোরাক ছিলাম। সর্বক্ষণ মহান আল্লাহকে ডাকতাম। এবং দোয়া করতাম, “তুমি একমাত্র স্বাক্ষী। আমরা কোনো অন্যায় করিনি। ওরা আমাদের হত্যা করছে। আমাদের মা বোনদের ইজ্জত নষ্ট করছে। আমি কখনো পরের সম্পদের ওপর লোভ করিনি। কোনো নারীর প্রতি কু-দৃষ্টিপাত করিনি। বাড়িতে আমি আমার বৃদ্ধা নানী, মামী, রুগ্ন মা, বাবা এবং ছোট দুবোন, ছোট এক ভাই রেখে এসেছি। আসার সময় কারো সাথে দেখাও করে আসতে পারিনি। একমাত্র তোমার কাছে এসব কিছু সঁপে রেখে এসেছি। হে আল্লাহ! তুমি এদের হেফাজত কর। আমার দেশকে স্বাধীন করো।” এ যুদ্ধে মৃত্যু আমার নিত্যসঙ্গী। যে কোনো মুহূর্তে আমার মৃত্যু হতে পারে। তখন এদশের বুকে আমার কোন নাম চিহ্নও থাকবে না। কেউ কোনো দিন আমার খোঁজও নেবে না। আমার বাবা-মা, নানী, ভাই বোনরা জানতেও পারবে না, আমি কোথায় আছি।

যে সমস্ত রাজাকার, আলবদররা যুদ্ধকালীন আমাদেরকে হত্যা করতে চেয়েছিল বিএনপির শাসনামলে তারাই হয়েছিল দেশের হর্তাকর্তা। যে পতাকা আমার বুকে বেঁধে রেখে নয় নয়টি মাস যুদ্ধ করেছিলাম সেই পতাকা তখন তাদের গাড়িতে উড়ত। এসব দেখে আমার খুব কষ্ট লাগত। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা দেশ সেবার পবিত্র দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে রাজাকারদের বিচারের সম্মুখীন করলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের জাতির সামনে সম্মানিত করলেন। এর আগে এদেশে মুক্তিযুদ্ধের পরিচয় দিতেও লজ্জা বোধ করতাম।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমরা সীমাহীন কষ্ট করেছি। কোনো রাতে ঠিকভাবে ঘুমাতে পারিনি। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীতে প্রচণ্ড কষ্ট করেছি। বর্ষার সময় একদিকে প্রবল বর্ষণ আর বজ্রপাতের গগণবিদারী শব্দ অপর দিকে শত্রুর আর্টিলারি গোলার গর্জন আর সামনে থেকে ধেয়ে আসা গুলি ছিল আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। এছাড়াও সিলেটের জোঁক আমাদের দেহ থেকে কত রক্ত খেয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। জনমানবহীন এলাকা ছিল তখন। অনাহারে ও অর্ধাহারে অনেক সময় দিন কাটত আমাদের। শীতের সময় আমাদের কোনো গরম কাপড় ছিল না। মাঝে মাঝে কবরের গর্তের মধ্যেও আমরা ডিফেন্স নিতাম। সর্বদা এলএমজিটাকে আকড়ে ধরে থাকতাম। বারুদের গন্ধে তখন খুব খারাপ লাগত। দেশ স্বাধীনতার দিনটি তখনও অনশ্চিত ছিল। তবে এটা বিশ্বাস ছিল যে, একদিন না একদিন আমাদের দেশ স্বাধীন হবে। কেননা পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে তৎকালীনপূর্ব পাকিস্তানের সর্বদিক থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এমন এক সময় আসবে তাদের খাদ্য বস্ত্র, গুলি শেষ হয়ে যাবে। তখন তাদের বাঁচার কোনো রাস্তা থাকবে না। আমরা যুদ্ধকালীন সময় বারবার পেছাতে পেছাতে যখন একেবারে সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছাই তখন নাসিম সাহেব আমাদেরকে বললেন, “ভারতের মাটিতে তোমাদের কোনো স্থান নেই। মরতে হয় দেশের মাটিতেই মরবে।” অবশ্য আমরা পিছু হটছিলাম দুটি কারণে। প্রথমত আমাদের সৈন্য সংখ্যা ছিল খুবই কম। তাই চাচ্ছিলাম ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ট্রেনিং সেন্টার খুলে নতুন যুবকদের ভর্তি করে ট্রেনিং দিয়ে উপযুক্ত করে দেশের ভেতরে গেরিলা তৎপরতা চালাতে। যাতে পাক বাহিনীকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করা যায় ও দুর্বল করা যায়। আবার ওদের থেকে বাছাই করে কিছু লোকদেরকে আমাদের রেজিমেন্টে পেস্টিং করে ডিফেন্সকে আরো শক্তিশালী করা। দ্বিতীয়ত আমরা মুখোমুখি যুদ্ধ করে কাল ক্ষেপণ করায় খণ্ড খণ্ড যুদ্ধে প্রতিদিনই ওদের কম বেশি সৈন্য মারা যাচ্ছে।

সর্বশেষ অস্থায়ী ডিফেন্স নিই। সম্ভবত ডিসেম্বরের প্রথম দিকে। এবং ঐ ডিফেন্স ছিল আমাদের সীমান্ত এলাকা থেকে মাইল খানেক ভেতরে। সেখানে ৪/৫ দিন অবস্থান করার পর (ক্যাপ্টেন) জেনারেল নাসিম সাহেব এক রাতে রিয়ার হেডকোয়ার্টার থেকে নায়েব সুবেদার জনাব আলী সাহেবকে পাঠালেন আমাদের উইড্রল করে রিয়ার হেডকোয়ার্টারে নিয়ে আসতে। তিনি কিছু লোকের কাছে সংবাদের পাঠিয়ে তাদের উইড্রল করে নিয়ে আসেন। কিন্তু উত্তর দিক থেকে সর্বশেষ অবস্থান ছিল আমার। এবং আমার বামে বিডআর ল্যান্স নায়েক মোস্তফা। আমাদের উভয়ের কাছেই এলএমজি হাতিয়ার ছিল। এছাড়া আরো দুজন রাইফেলধারী সৈনিক ছিল। আমাদেরকে উইড্রল করার কোনো সংবাদ না পৌঁছানোতে আমরা আমাদের ডিফেন্সে রয়েছি। জেনারেল নাসিম সাহেব যখন দেখলেন আমরা চারজন ছাড়া বাকি লোক এসগেছে তখন তিনি জনাব আলীকে জিজ্ঞাসা করলেন, “লেন্স নায়েক মোস্তফা ও জহির কোথায়?” উত্তরে জনাব আলী সাহেব বললেন, “তাদের অবস্থানে যেতে পারিনি।” এ কথা শুনে নাসিম সাহেব খুব রাগান্বিত হয়ে বললেন, আপনি এখনই গিয়ে ওদেরকে নিয়ে আসুন। এদিকে ভোর হবার আগে ল্যান্স নায়েক মোস্তফা অপর দুজন সৈনিক নিয়ে আমার ডিফেন্সে আসে। এবং বলল, জহির ভাই আমাদের সব লোক চলে গিয়েছে।

এ মুহূর্তে আমরা কী করব? তখন আমি বললাম, ফজর না হওয়া পর্যন্ত চলুন কাছাকাছি কোনো গোপন স্থানে আশ্রয় নেই। এদিকে আমরা খুবই চিন্তিত ছিলাম, না জানি কী ঘটছে? তখন নিকটেই চতুর্দিকে গাছপালা দিয়ে ঘেরা একটি পুকুর পেয়ে তার পাড়ে আশ্রয় নেই। যখন ভোর হলো তখন দেখি আমাদের থেকে প্রায় হাজার গজ সামনে দিয়ে পাক বাহিনীর একটি বিরাট দল এবং কিছু সিভিলিয়ান এ্যাসাল্ট লাইনে উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে যাচেছ। এ দেখে আমি ল্যান্স নায়েক মোস্তফাকে বললাম, “চলো, এই এ্যাসাল্ট লাইনের ওপর ফায়ার দিই।” ফায়ার করার জন্য আমি লাইন পজিশনে চলে যাই। কিন্তু ল্যান্স নায়েক মোস্তফা আমাকে বাধা দিল। বলল, আপনার কি মাথা খারাপ হয়েছে। এ মুহূর্তে ফায়ার দিলে ওরা আমাদেরকে ঘেরাও করে ফেলবে এবং হাতে নাতে ধরে ফেলবে। তাই আর ফায়ার দেওয়া হল না। কিছুক্ষণ পর দেখি পাক বাহিনীর এ্যাসাল্ট লইন শেষ হয়ে গেল। আমরা তখন ঐ জায়গা থেকে বেরিয়ে আগরতলা অভিমুখে রওনা হই। জনাব আলী সাহেবকে দেখি, একটি বাড়ির আড়ালে বসে আছে। আমাদের দেখে সে অনেকটা নিশ্চিন্ত হলো। [চলবে]

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;

কল্পনা ও ইতিহাসের ট্রাজিক নায়িকা আনারকলি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আনারকলির নাম উচ্চারিত হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহে এক করুণ-মায়াবী প্রেমকাহিনী সবার মনে নাড়া দেয়। ইতিহাস ও কল্পকথায় আবর্তিত এই রহস্যময়ী নতর্কীর পাশাপাশি শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাট আকবর, সম্রাজ্ঞী যোধা বাঈ চোখের সামনে উপস্থিত হন। ভেসে আসে পরামক্রশালী মুঘল আমলের অভিজাত রাজদরবার ও হেরেম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশ-পূর্ব উপমহাদেশের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক দ্যুতি, বহুত্ববাদী পরিচিতির রাজকীয় অতীত এসে শিহরিত করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিকদের। 

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত ৩৩১ বছরের বিশ্ববিশ্রুত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বহু সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদীর নাম বীরত্বে ও বেদনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আনারকলির নাম বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক বিবরণের কোথাও লেখা নেই, যদিও মুঘল হেরেমের এই রহস্যময়ী নারীর নাম আজ পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ও লোকশ্রুতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্রাজ্ঞী, শাহজাদী কিংবা কোনও পদাধিকারী না হয়েও মুঘল সংস্কৃতির পরতে পরতে মিশে থাকা কে এই নারী, আনারকলি, যিনি শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছেন, এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। ইতিহাসে না থাকলেও শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে চিত্রিত হচ্ছেন তিনি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তায়। ইতিহাস ও মিথের মিশেলে তাকে নিয়ে আখ্যান ও কল্পকথার কমতি নেই। তার নামে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে মাজার, সমাধি স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাজার, মহিলাদের পোষাকের নান্দনিক ডিজাইন। ইতিহাসের রহস্যঘেরা এই নারীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’। রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ ও গবেষণা।

যদিও বাংলা ভাষায় আনারকলিকে নিয়ে আদৌ কোনও গ্রন্থ রচিত হয়নি, তথাপি উর্দু সাহিত্যে তাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক নাটক ও উপন্যাস। ইংরেজিতে রয়েছে বহু গ্রন্থ। বিশেষত উর্দু ভাষার বলয় বলতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের যে বিশাল এলাকা পূর্বের বিহার থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত, সেখানে আনারকলি একটি অতি পরিচিত ও চর্চিত নাম। সাহিত্যে ও লোকশ্রুতিতে তিনি এখনও জীবন্ত। অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে রয়েছে আনারকলি মাকবারা। মাকবারা হলো কবরগাহ, সমাধিসৌধ। মুঘল স্মৃতিধন্য শহর দিল্লি, লাহোরে আছে আনারকলি বাজার। সাহিত্য ও লোককথার মতোই আনারকলিকে নিয়ে নির্মিত নানা লিখিত ও অলিখিত উপাখ্যান। 

অথচ মুঘল রাজদরবার স্বীকৃত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর কোথাও উল্লেখিত হন নি আনারকলি। প্রায়-প্রত্যেক মুঘল রাজপুরুষ লিখিত আকারে অনেক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখলেও তার নাম আসে নি কোনও মুঘলের আত্মস্মৃতি বা ইতিহাস গ্রন্থে। তাহলে কেবলমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে তার নাম অর্ধ-সহস্র বছর ধরে লোকমুখে প্রচারিত হলো কেন এবং কেমন করে? সত্যিই আনারকলি বলে কেউ না থাকতেন কেমন করে সম্ভব হলো পাঁচ শতাধিক বছর ধরে নামটি টিকে থাকা? এসব খুবই বিস্ময়কর বিষয় এবং আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

ভারতবর্ষে মুঘল ইতিহাসের এক রহস্যময় নারী চরিত্র রূপে আনারকলিকে নিয়ে আগে বহু চর্চা হলেও সবচেয়ে সফল ও ব্যাপকভাবে তিনি চিত্রিত হয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রস্থল বলিউডের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেরা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’-এ। ছবির কাহিনী মুঘল-ই-আজম তথা শাহানশাহ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের দরবারে আবর্তিত। আকবরপুত্র শাহজাদা সেলিম, যিনি পরবর্তীতে হবেন সম্রাট জাহাঙ্গীর, মুঘল দরবারের এক নবাগত নর্তকী আনারকলির প্রেমে বিভোর। দীর্ঘ ছবিটি সেলিম-আনারকলির প্রণয়ের রোমান্টিকতায় ভরপুর। কিন্তু সম্রাট আকবর সেই ভালোবাসা মেনে নিতে নারাজ। প্রচণ্ড ক্রোধে আকবর আনারকলিকে শাহজাদার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, সম্রাটপুত্রকে ভালোবাসার অপরাধে তুচ্ছ নর্তকী আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করেন। 

প্রশ্ন হলো, সত্যিই যদি আনারকলি নামে কোনও চরিত্র না-ই থাকবে, তাহলে এতো কাহিনীর উৎপত্তি হলো কেমন করে? সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে আনারকলিকে কেন্দ্র করে যা বলা হয়েছে বা দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা কতটুকু? সত্যিই কি আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? নাকি আনারকলি বলে ইতিহাসে কোনও চরিত্রই ছিল না? নাকি সব কিছুই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কোনও মিথ, উপকথা বা গল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও মেলে নি।

আনারকলি যদি ‘কাল্পনিক’ হবেন, তাহলে, মুঘল আমলে ভারতে আগত ইংরেজ পরিব্রাজকের বর্ণনায়, লখনৌর লেখকের উপন্যাসে, লাহোরের নাট্যকারের নাটকে, বলিউডের একাধিক সিনেমায় আনারকলি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন কেন? কেন শত শত বছর কোটি কোটি মানুষ আনারকলির নাম ও করুণ ঘটনায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন? কেন আনারকলির নামে ভারতের প্রাচীন শহরগুলোতে থাকবে ঐতিহাসিক বাজার? লাহোরে পাওয়া যাবে তার কবরগাহ, যেখানে শেষ বয়সে শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর হাজির হয়ে নির্মাণ করবেন সমাধিসৌধ আর রচনা করবেন করুণ প্রেমের কবিতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্যে ‘কিছুটা ঐতিহাসিক, কিছুটা কাল্পনিক চরিত্র আনারকলি’ ও তাকে ঘিরে প্রবহমান প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ভিত্তিক এই রচনা। আমার রচিত ‘দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো’ (প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ) গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করায় মুঘল মূল-ইতিহাসের বাইরের এই রহস্যময়ী চরিত্র ও আখ্যানকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনে উৎসাহী হয়েছি। উর্দু ও ইংরেজিতে আনারকলির ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক ইতিহাস নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। যেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। আনারকলির প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে নির্মিত অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’ সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। চেষ্টা করেছি ইতিহাস ও মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুঘল হেরেমের রহস্যময়ী নতর্কী ও বিয়োগান্ত প্রেমের নায়িকা আনারকলিকে অনুসন্ধানের।

;

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনায় আক্রান্ত



আন্তর্জাতিক ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মঙ্গলবার (১১ জানুয়ারি) তাঁর কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। বতর্মানে তিনি নিজ বাড়িতেই আইসোলেশনে আছেন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বইমেলার উদ্বোধনের জন্য গত ২ জানুয়ারি মালদহ গিয়েছিলেন শীর্ষেন্দু। সেই বইমেলা স্থগিত হয়ে যায়। মালদহ থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর তাঁর সর্দি, কাশি এবং শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। সন্দেহ হলে সোমবার তিনি নমুনা পরীক্ষা করান। মঙ্গলবার কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। এ খবর তিনি নিজেই জানিয়েছেন।

লেখক বলেন, ‘জ্বর আসেনি কখনও। উপসর্গ হিসেবে ক্লান্তি, দুর্বলতার সঙ্গে স্বাদহীনতা রয়েছে।

;