পরিত্যক্ত মুঘল রাজধানীতে



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
পরিত্যক্ত মুঘল রাজধানীতে, ছবি: বার্তা২৪.কম

পরিত্যক্ত মুঘল রাজধানীতে, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

উত্তর ভারত ঘুরে: ষোড়শ শতকে শুরু হয়ে (৩০ এপ্রিল, ১৫২৬) উনিশ শতকে সমাপ্ত (১৪ সেপ্টেম্বর, ১৮৫৭) কয়েক শতাব্দী ব্যাপী মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে মাত্র ১৪ বছর রাজধানী ছিল ফতেহপুর সিক্রি। সে আমলে রাজা-বাদশাহের খেয়াল-খুশির অন্ত ছিল না। আর সেসব ছিল বড়ই বিচিত্র ও সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের চেয়ে অনেক আলাদা। ফতেহপুর সিক্রিতে মিশে আছে সেইসব রাজসিক খেয়ালের খানিকটা ঝলক।

স্বল্প জীবনপ্রাপ্ত হলেও ফতেহপুর সিক্রির দীর্ঘ ইতিহাস ও তাৎপর্য রয়েছে। ১৫৭১ সালে এখানে রাজধানী বানিয়ে তৃতীয় মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৫ সালেই তা সরিয়ে নেন। ১৬১০ সালে শহরটি সম্পূর্ণরূপে বর্জিত হয়। পরিত্যক্ত হয়ে নিঃসঙ্গ ভাবে পড়ে থাকে বিশাল স্থাপনাসমূহ, যা এখন ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ।

রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি ফতেহপুর সিক্রির সঙ্গে মিশে আছে আধি ভৌতিক রহস্যময়তা। টুপটুপ বৃষ্টিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন রাজধানীর পাদদেশে দাঁড়াতেই সেই পরশ এসে শরীরে লাগলো। ততক্ষণে বৃষ্টির আঁচ কমে এসেছে। পায়ে পায়ে ফতেহপুরের ভেতরে প্রবেশের সময় এর অতীত ও ইতিহাসের কথাগুলো সঙ্গী হলো।

সম্রাট আকবর এখানে রাজধানী স্থাপন করার আগে এখানে সিক্রি নামের একটি গ্রাম ছিল। মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর এ জায়গাটি চিনতেন এবং পছন্দও করতেন। ফলে জায়গাটি মুঘলদের কাছে অচেনা-অজানা ছিল না। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, সিক্রি নামটি সম্রাট বাবরের দেওয়া। বাবর এই এলাকটিকে বিশ্রাম ও বিনোদনের জন্য অনেকবার ব্যবহার করেছিলেন এবং সিক্রির নিকটবর্তী সীমান্তে রাজস্থান-পাঞ্জাব থেকে আগত মহারাজা রানা সংগ্রাম সিংহের বাহিনীকে পরাজিত করেছিলেন।

বাবরের জীবনীকার বেভারেজ লিখেছেন, রানা সংগ্রাম সিংহকে পরাজিত করে বাবুর এখানে ‘ফতেহবাগ’ বা ‘বিজয় উদ্যান’ নামে একটি বাগান প্রতিষ্ঠা করেন। মধ্য এশিয়ান মুঘলদের উদ্যান প্রীতি ছিল সর্বজনবিদিত। তারা যেখানেই কর্তৃত্ব করেছে, সেখানেই সুপরিকল্পিত বাগান বা উদ্যান বানিয়েছেন। বাগানকে তারা বলতেন ‘গুলিস্তাঁ’। আগ্রার চারদিকে শত শত বছর পরেও ছড়িয়ে আছে মুঘলদের উদ্যান প্রেমের চিহ্ন। দিল্লি, ঢাকা, কাশ্মীর, লাহোর, সর্বত্র মুঘল-প্রতিষ্ঠিত বাগানের দেখা পাওয়া যায় এখনো।

ফতেহপুর সিক্রি

ফতেহপুরে বাবুরের বাগান সম্পর্কে তার কন্যা ও সম্রাট হুমায়ূনের জীবনী ‘হুমায়ূননামা’র রচয়িতা গুলবদন বেগম লিখেছেন, ‘বাবুর সেই বাগানে একটি আটকোণা চাতাল বানিয়েছিলেন, যা তিনি বিনোদন ও লেখার কাজে ব্যবহার করতেন। তিনি নিকটবর্তী ঝিলের মাঝখানে একটি বেদীও নির্মাণ করেন।

সম্রাট আকবর রাজধানী বানানোর সময় (১৫৭১) এর কোনও নামকরণ করেন নি, ‘ফতেহপুর’ বা ‘বিজয়ের শহর’ নামটি দিয়েছেন ১৫৭৩ সালে গুজরাট জয় উপলক্ষে। তারও আগে, ১৫৬৯ সালে বেশ পরিণত বয়সে এই স্থানে এক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে আকবরের ঔরসে। আগে থেকেই এখানে শেখ সেলিম চিস্তি নামে একজন বুজুর্গ পীরের খানকাহ বা আশ্রম ছিল এবং পীরের দোয়ায় আকবর পুত্রসন্তান লাভ করেছিলেন বলে পুত্রের নামও রাখা হয় পীরের নামানুসারে। সেলিম, যিনি পরবর্তীতে সম্রাট জাহাঙ্গীর নামে খ্যাত। জাহাঙ্গীরের দ্বিতীয় জন্মদিনে আকবর এখানে রাজধানী নির্মাণ শুরু করেন।

জয়পুর-আগ্রা হাইওয়ে থেকে ডানে মোড় দিয়ে যে গলিপথ, তাতে কিছুদূর এগিয়ে আবার ডানে কিঞ্চিত উপরের দিকে উঠতে হয় ফতেহপুর সিক্রিতে যেতে। আকবর বাদশাহের এই রাজধানী নগরীটি কিছুটা উচ্চভূমিতে অবস্থিত। নগরের প্রবেশের মুখেই ‘বুলন্দ দরওয়াজা’ নামে বিশাল গেট। মধ্যযুগের বিবেচনায় সুবিশাল তোরণে এক সুপরিকল্পিত নগরীর প্রাচীন আবছায়া ভেসে আসে প্রথম দর্শনেই। মুঘল পূর্ব-পুরুষ তৈমুর লং প্রচলিত পারসিক আদালতের আদলে আকবর এটি নির্মাণ করতে চাইলেও এতে স্থানীয় স্থাপত্যরীতির মিশেল হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। পার্শ্ববর্তী রাজস্থানে প্রচুর ও বিচিত্র বেলেপাথর থাকায় ভেতরের অট্টালিকাগুলো পাথুরে এবং অধিকাংশই লালচে রঙের।

মুঘলরা ভারতকে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও স্থাপত্য উপহার দিয়েই শেষ করেনি, আয়ের পথও খুলে দিয়ে গেছে। টিকেট কেটে ঢুকতে হচ্ছে এসব স্থাপনায়। এতে ভারতীয়দের জন্য টিকেটের দাম কম হলেও বিদেশিদের জন্য যথেষ্ট উচ্চমূল্য। তাজমহল, আগ্রা ফোর্ট, কুতুব মিনারসহ বিভিন্ন মুঘল ও মুসলিম স্থাপনায় লক্ষ লক্ষ পর্যটক কোটি কোটি টাকা দিচ্ছে ভারত সরকারের তহবিলে। টিকেটের পাশাপাশি দালাল ও গাইডের লম্বা বহর। সব কিছু জানিয়ে দেওয়ার জন্য পিছু নেয় তারা। ভারতের মুঘল ঐতিহ্য এমনই এক নিঃশেষ না হওয়া বিষয়, যা এখনো খুলে রেখেছে রোজগারের পথ!

বৃষ্টির কারণে ফতেহপুর সিক্রিতে ভিড় কম। দালাল ও গাইডরাও তেমন নেই। ড্রাইভার সুরজিৎ সঙ্গী হলো। রাজপুত যুবক এ পথে পর্যটক আনা-নেওয়া করতে করতে ইতিহাস-ঐতিহ্য, স্থান-কাল সম্পর্কে বেশ ওয়াকিবহাল। যথারীতি ‘বুলন্দ দরওয়াজা’ দিয়েই প্রবেশ করি আমরা। তবে ‘বাদশাহী দরওয়াজা’ নামে আরেকটি প্রবেশদ্বারও রয়েছে। লাল-হলুদ বেলে পাথরে নিমির্ত ফটকে সাদা-কালো মার্বেল দিয়ে নকশা করা। মাটি থেকে ৫৪ মিটার লম্বা দরওয়াজা পর্যন্ত পৌঁছাতে ৪২টি সিঁড়ির ধাপ উঠতে হলো। দরজার পাল্লাগুলো কাঠের কারুকাজ করা এবং এর মাথায় এক সারি প্যারাপেট ও পেছনে তিনটি ছত্রী রয়েছে। মূল দ্বারের দেওয়ালে খোদাই করা আছে ধর্মকথা, যাতে এক বিশ্বের নশ্বরতার উল্লেখ করে অবিনশ্বর সৃষ্টিকর্তার গুণকীর্তন করা হয়েছে। বুলন্দ বা সুমহান নামে খ্যাত প্রবেশ তোরণে সৃষ্টিকর্তার মহিমাব্যঞ্জক বাণীই স্বাভাবিক।

ফতেহপুরের ভেতরে প্রাসাদ প্রাঙ্গণ, যেখানে জ্যামিতিক ভাবে সজ্জিত বেশ কিছু চাতাল দেখা গেলো। রয়েছে পীর সেলিম চিস্তির মাজার শরিফ। দুর্দান্ত শিল্প ভাবনা ও নান্দনিক স্থাপত্যের ফতেহপুর সিক্রির চারদিকে তাকিয়েই নিজের বোকামির জন্য লজ্জিত হলাম। বৃষ্টি সিক্ত বিরূপ আবহাওয়া আর স্বল্প সময় নিয়ে এখানে আসার কোনও মানেই হয় না। পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে অনুসন্ধান করে দেখতে হলে দীর্ঘ সময় নিয়ে এখানে আসাই শ্রেয়। তা না হলে দুই মাইল লম্বা ও এক মাইল চওড়া প্রাসাদ আর প্রাঙ্গণ দেখা মোটেও সম্ভব নয়।

পুরো ফতেহপুর সিক্রি পাঁচ মাইল প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। মনে করা হয়, রাজপুত, জাঠ, মারাঠা, শিখ আক্রমণের কারণে শহরটিকে দূর্গ-সদৃশ করা হয়েছে। আগ্রা দূর্গও তেমনি। রাজস্থানেও দূর্গ শহর দেখেছি। মধ্যযুগের শহরগুলো সামরিক নিরাপত্তার কারণে সুদৃঢ় প্রাচীর বেষ্টিত দেখতে পাওয়া যায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, শত শত বছর পরেও প্রাচীর বেশ মজবুত ও সুরক্ষিত।

সুললিত ও সুসজ্জিত ফতেহপুর আবাসস্থল দেখে মুঘলদের পরিচ্ছন্ন রুচি ও গুছানো প্রশাসনিক কার্যক্রমের নমুনা বোঝা যায়। রাষ্ট্রীয় কাজ, বসবাস ও অন্যান্য তৎপরতায় জীবনকে চমৎকার অবকাঠামোয় প্রবাহিত করেছিলেন মুঘলরা। তৎকালের পশ্চাৎপদ ভারতে সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত, খাদ্য, উন্নত প্রশাসনের পাশাপাশি দিয়েছিলেন স্থাপত্য সুষমায় বিস্তৃত বসবাসের আমেজ।

হাতের সময়কে যথাসম্ভব কাজে লাগানোর পরও ফতেহপুর সিক্রি পুরো ঘুরে না দেখার অতৃপ্তি নিয়ে ফিরতে হলো। ভেতরে অনেক ছোট বড় স্থাপনা, মহল, প্রাঙ্গণ এবং এসবের ইতিহাস ও শিল্প গুণ পরখ করে দেখার জন্য পুরো একটি দিনও মনে হয় যথেষ্ট নয়। অনুচ্চ ফতেহপুর সিক্রির চারপাশে প্রসারিত বিশাল ভারতের সবগুলো দিক, যেখানে বসে মধ্য এশিয়ার পারস্য-তুর্কি-মোঙ্গল শিল্প ঐতিহ্যের ভারতীয় সাংস্কৃতিক বিনির্মাণ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মুঘলরা।

মুঘলরা কয়েক শত বছর ভারত শাসন করে চুঘতাই তুর্কি ও পার্শি ভাষা ও সংস্কৃতি ছেড়ে হিন্দি ও উর্দুর সঙ্গে এদেশীয় অনেক কিছুই নিয়েছিলেন তথাপি ফতেহপুর সিক্রিতে দাঁড়িয়ে মনে হলো, তারা ছিলেন মিলনের দূত। তারা না ছিলেন বিদেশি, না ছিলেন এদেশীয়। তারা ছিলেন এ উপমহাদেশে সংস্কৃতি, শিল্পকলার সমন্বয়ের প্রতীক। উন্নত সকল কিছুর মিশ্রণে ভালোবাসার ভারতে তারা সাজিয়ে ছিলেন।

মুঘলরা একই সঙ্গে তৈমুর ও চেঙ্গিস খানের বংশধারার ঐতিহ্য বহন করলেও তাদের ধমনীতে মিশেছিল এদেশের রক্ত। এজন্যই তারা ছিলেন দেশজ কাঠামোতে উত্তর-পুরুষের ঐতিহ্যের সমন্বয়ক। ইতিহাস বলে, শুধুমাত্র বাবুর ও হুমায়ূন ছিলেন প্রকৃত মধ্য এশীয়। আকবর ছিলেন পার্সিয়ান হামিদা বানুর গর্ভজাত অর্ধেক ইরানি। মাতা যোধাবাঈ’র কারণে জাহাঙ্গীর ছিলেন অর্ধেক রাজপুত।পূর্বের বাংলা থেকে পশ্চিমের কাবুল আর উত্তরের কাশ্মীর থেকে দক্ষিণের কাবেরী নদী পর্যন্ত শাসন করেছিলেন তারা সমন্বয় ও মিলনের মাধ্যমে। ৪ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার জায়গায় ১৫০ মিলিয়ন মানুষকে নিয়ে যে সাম্রাজ্য ভারতবর্ষে মুঘলরা শাসন করেছিলেন, তা ছিলো তৎকালীন বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ এবং সমৃদ্ধতম দেশ, যার অপসৃয়মান ঝলক এখনো মিশে আছে আগ্রা, দিল্লি, লাহোর, ঢাকা এবং সংক্ষিপ্ততম রাজধানী ফতেহপুর সিক্রির সুনিপুণ বিন্যাসে।

ফতেপুর সিক্রির শান বাঁধানো চত্বরে হাঁটতে হাঁটতে অতীত ঐতিহ্যের সেইসব কথা প্রতিধ্বনি তুলে। বার বার মনে জাগে, শ্রেষ্ঠ মুঘল সম্রাট ও নগরের গোড়াপত্তনকারী আকবরের কথাও। স্বল্প সময়ের রাজধানী হলেও ফতেহপুর সিক্রিতে আকবর তার অভিনব দ্বীন-ই-ইলাহি বিষয়ে নানা ধর্মের পণ্ডিতদের সঙ্গে আলোচনায় মত্ত হতেন। নিঃসন্তান আকবরের শেষজীবনে একমাত্র পুত্রও পির সেলিম চিস্তির দোয়ায় ভূমিষ্ঠ হয় ফতেহপুরের মাটিতে। আর এখানেই পরবর্তীকালে শেষ দিকের মুঘল সম্রাট মোহাম্মদ শাহ তার প্রতিনিধি সৈয়দ হাসান আলি খানকে হত্যা করা হয়। মুঘলরা দুর্বল হলে এই পরিত্যক্ত রাজধানী কখনো মারাঠা, কখনো রাজপুত, জাঠ বা শিখ জাতির দখলে আসে। সর্বশেষে ইংরেজরা ভারত দখল করলে তারা এখানে গড়ে সেনা ছাউনি। এতো কিছুর হয়েছে সংক্ষিপ্ত রাজধানী শহরে, যাতে রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পাশাপাশি রয়েছে আনন্দ ও বেদনার অশ্রু। বৃষ্টিভেজা ফতেহপুর সিক্রি ঘুরে ফিরে আসার সময় সেসব কথাই বার বার মনে দোলা দেয়।

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;

কল্পনা ও ইতিহাসের ট্রাজিক নায়িকা আনারকলি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আনারকলির নাম উচ্চারিত হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহে এক করুণ-মায়াবী প্রেমকাহিনী সবার মনে নাড়া দেয়। ইতিহাস ও কল্পকথায় আবর্তিত এই রহস্যময়ী নতর্কীর পাশাপাশি শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাট আকবর, সম্রাজ্ঞী যোধা বাঈ চোখের সামনে উপস্থিত হন। ভেসে আসে পরামক্রশালী মুঘল আমলের অভিজাত রাজদরবার ও হেরেম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশ-পূর্ব উপমহাদেশের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক দ্যুতি, বহুত্ববাদী পরিচিতির রাজকীয় অতীত এসে শিহরিত করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিকদের। 

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত ৩৩১ বছরের বিশ্ববিশ্রুত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বহু সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদীর নাম বীরত্বে ও বেদনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আনারকলির নাম বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক বিবরণের কোথাও লেখা নেই, যদিও মুঘল হেরেমের এই রহস্যময়ী নারীর নাম আজ পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ও লোকশ্রুতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্রাজ্ঞী, শাহজাদী কিংবা কোনও পদাধিকারী না হয়েও মুঘল সংস্কৃতির পরতে পরতে মিশে থাকা কে এই নারী, আনারকলি, যিনি শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছেন, এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। ইতিহাসে না থাকলেও শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে চিত্রিত হচ্ছেন তিনি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তায়। ইতিহাস ও মিথের মিশেলে তাকে নিয়ে আখ্যান ও কল্পকথার কমতি নেই। তার নামে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে মাজার, সমাধি স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাজার, মহিলাদের পোষাকের নান্দনিক ডিজাইন। ইতিহাসের রহস্যঘেরা এই নারীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’। রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ ও গবেষণা।

যদিও বাংলা ভাষায় আনারকলিকে নিয়ে আদৌ কোনও গ্রন্থ রচিত হয়নি, তথাপি উর্দু সাহিত্যে তাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক নাটক ও উপন্যাস। ইংরেজিতে রয়েছে বহু গ্রন্থ। বিশেষত উর্দু ভাষার বলয় বলতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের যে বিশাল এলাকা পূর্বের বিহার থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত, সেখানে আনারকলি একটি অতি পরিচিত ও চর্চিত নাম। সাহিত্যে ও লোকশ্রুতিতে তিনি এখনও জীবন্ত। অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে রয়েছে আনারকলি মাকবারা। মাকবারা হলো কবরগাহ, সমাধিসৌধ। মুঘল স্মৃতিধন্য শহর দিল্লি, লাহোরে আছে আনারকলি বাজার। সাহিত্য ও লোককথার মতোই আনারকলিকে নিয়ে নির্মিত নানা লিখিত ও অলিখিত উপাখ্যান। 

অথচ মুঘল রাজদরবার স্বীকৃত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর কোথাও উল্লেখিত হন নি আনারকলি। প্রায়-প্রত্যেক মুঘল রাজপুরুষ লিখিত আকারে অনেক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখলেও তার নাম আসে নি কোনও মুঘলের আত্মস্মৃতি বা ইতিহাস গ্রন্থে। তাহলে কেবলমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে তার নাম অর্ধ-সহস্র বছর ধরে লোকমুখে প্রচারিত হলো কেন এবং কেমন করে? সত্যিই আনারকলি বলে কেউ না থাকতেন কেমন করে সম্ভব হলো পাঁচ শতাধিক বছর ধরে নামটি টিকে থাকা? এসব খুবই বিস্ময়কর বিষয় এবং আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

ভারতবর্ষে মুঘল ইতিহাসের এক রহস্যময় নারী চরিত্র রূপে আনারকলিকে নিয়ে আগে বহু চর্চা হলেও সবচেয়ে সফল ও ব্যাপকভাবে তিনি চিত্রিত হয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রস্থল বলিউডের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেরা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’-এ। ছবির কাহিনী মুঘল-ই-আজম তথা শাহানশাহ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের দরবারে আবর্তিত। আকবরপুত্র শাহজাদা সেলিম, যিনি পরবর্তীতে হবেন সম্রাট জাহাঙ্গীর, মুঘল দরবারের এক নবাগত নর্তকী আনারকলির প্রেমে বিভোর। দীর্ঘ ছবিটি সেলিম-আনারকলির প্রণয়ের রোমান্টিকতায় ভরপুর। কিন্তু সম্রাট আকবর সেই ভালোবাসা মেনে নিতে নারাজ। প্রচণ্ড ক্রোধে আকবর আনারকলিকে শাহজাদার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, সম্রাটপুত্রকে ভালোবাসার অপরাধে তুচ্ছ নর্তকী আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করেন। 

প্রশ্ন হলো, সত্যিই যদি আনারকলি নামে কোনও চরিত্র না-ই থাকবে, তাহলে এতো কাহিনীর উৎপত্তি হলো কেমন করে? সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে আনারকলিকে কেন্দ্র করে যা বলা হয়েছে বা দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা কতটুকু? সত্যিই কি আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? নাকি আনারকলি বলে ইতিহাসে কোনও চরিত্রই ছিল না? নাকি সব কিছুই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কোনও মিথ, উপকথা বা গল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও মেলে নি।

আনারকলি যদি ‘কাল্পনিক’ হবেন, তাহলে, মুঘল আমলে ভারতে আগত ইংরেজ পরিব্রাজকের বর্ণনায়, লখনৌর লেখকের উপন্যাসে, লাহোরের নাট্যকারের নাটকে, বলিউডের একাধিক সিনেমায় আনারকলি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন কেন? কেন শত শত বছর কোটি কোটি মানুষ আনারকলির নাম ও করুণ ঘটনায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন? কেন আনারকলির নামে ভারতের প্রাচীন শহরগুলোতে থাকবে ঐতিহাসিক বাজার? লাহোরে পাওয়া যাবে তার কবরগাহ, যেখানে শেষ বয়সে শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর হাজির হয়ে নির্মাণ করবেন সমাধিসৌধ আর রচনা করবেন করুণ প্রেমের কবিতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্যে ‘কিছুটা ঐতিহাসিক, কিছুটা কাল্পনিক চরিত্র আনারকলি’ ও তাকে ঘিরে প্রবহমান প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ভিত্তিক এই রচনা। আমার রচিত ‘দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো’ (প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ) গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করায় মুঘল মূল-ইতিহাসের বাইরের এই রহস্যময়ী চরিত্র ও আখ্যানকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনে উৎসাহী হয়েছি। উর্দু ও ইংরেজিতে আনারকলির ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক ইতিহাস নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। যেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। আনারকলির প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে নির্মিত অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’ সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। চেষ্টা করেছি ইতিহাস ও মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুঘল হেরেমের রহস্যময়ী নতর্কী ও বিয়োগান্ত প্রেমের নায়িকা আনারকলিকে অনুসন্ধানের।

;

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনায় আক্রান্ত



আন্তর্জাতিক ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মঙ্গলবার (১১ জানুয়ারি) তাঁর কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। বতর্মানে তিনি নিজ বাড়িতেই আইসোলেশনে আছেন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বইমেলার উদ্বোধনের জন্য গত ২ জানুয়ারি মালদহ গিয়েছিলেন শীর্ষেন্দু। সেই বইমেলা স্থগিত হয়ে যায়। মালদহ থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর তাঁর সর্দি, কাশি এবং শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। সন্দেহ হলে সোমবার তিনি নমুনা পরীক্ষা করান। মঙ্গলবার কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। এ খবর তিনি নিজেই জানিয়েছেন।

লেখক বলেন, ‘জ্বর আসেনি কখনও। উপসর্গ হিসেবে ক্লান্তি, দুর্বলতার সঙ্গে স্বাদহীনতা রয়েছে।

;