আমি চাই গাছ কাটা হলে শোক সভা হবে মন্ত্রিসভায়



প্রভাষ আমিন
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমি বছার দুয়েক দৈনিক জনকণ্ঠে কাজ করেছি। তখন জনকণ্ঠ অফিস ছিল মতিঝিলে। আর আমার বাসা ছিল রাজাবাজারে। কাজ সেরে মধ্যরাতে বাসায় ফিরতাম অফিসের বেবি ট্যাক্সিতে। টু স্ট্রোক ইঞ্জিনের সেই বেবি ট্যাক্সি এখন পরিচিত ‘সিএনজি’ হিসেবে। মধ্যরাতে খোলা হাওয়ায় চুল উড়িয়ে বাসায় ফিরতে দারুণ লাগতো। কাকরাইল মোড়ে ডানে ঘুরলেই হঠাৎ একটা ঠান্ডা হাওয়া শীতল করে দিতো দেহ মন। কারণ কাকরাইলের মোড় ঘুরলেই রমনা পার্ক। এ শুধু আমার অনুভব নয়, রীতিমত গবেষণা করে দেখা গেছে, মতিঝিলের সাথে রমনা ও ধানমন্ডি লেক এলাকার তাপমাত্রায় বেশ ব্যবধান।

এখন যেটা রমনা, একসময় সেটা পরিচিত ছিল রমনা গ্রিন হিসেবে। আর শাহবাগ ছিল ঢাকার নবাবদের বাগান। রমনা আর শাহবাগ মিলে ছিল সবুজ বেষ্টনী। কিন্তু কালের গহবরে হারিয়ে গেছে তার অনেকটাই। আসলে বলা ভালো, আমাদের সর্বগ্রাসী লোভ গিলে খেয়েছে সেই সবুজ। মানুষের মধ্যে একধরনের আত্মহনন প্রবণতা আছে। আর বাঙালির মধ্যে জাতিগতভাবেই আত্মহনন প্রবণতা আছে। নিজের ভালোটা নাকি পাগলেও বোঝে। কিন্তু আমরা বুঝি না। খাল-বিল-নদী-নালা একটা দেশের জন্য কতটা দরকারি, কাগজে-কলমে আমরা বুঝি বটে; কিন্তু সুযোগ পেলেই নদী দখল করি, দূষণ করি। আপনি যে কোনো মানুষকে জিজ্ঞাসা করুন, গাছপালা, সবুজ আমাদের কতটা দরকার। সবাই একবাক্যে বলবে, অনেক দরকার। কিন্তু সুযোগ পেলেই গাছ কেটে বিল্ডিং বানাবে। আমাদের এই আত্মহনন প্রবণতার মধ্যেই বিলীন হয়ে গেছে অনেক নদী, ঢাকার খাল এখন শত চেষ্টায়ও উদ্ধার করা যাচ্ছে না। অনেক কষ্টে টিকে ছিল রমনা গ্রিনের কিছুটা স্মৃতিচিহ্ন। এবার বাণিজ্যের করাল থাবা সেই সবুজে, করাত চলছে গাছের গোড়ায়। নিজের পায়েই আমরা নিজেরা কুড়াল মারছি।

ঢাকার বাইরে, গ্রামে-গঞ্জে মানুষ চুপে-চাপে গাছ কাটে। কিন্তু ঢাকা শহরের একদম প্রাণকেন্দ্রে এভাবে দিনেদুপুরে গাছ কাটার কথা কেউ ভাবতে পারে, এটাই অস্বাভাবিক। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, শুধু ভাবনা নয় রীতিমত পরিকল্পনা করে, বাছাই করে গাছ কাটা হচ্ছে। এরই মধ্যে শতবর্ষী গাছসহ শতাধিক গাছ কাটা শেষ। আরো অনেক গাছে গায়ে মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে দাড়িয়ে আছে। গাছের গায়ে চিহ্ন এঁকে দেয়া হয়েছে। তার মানে সামনে কাটা হবে। গাছ প্রতিবাদ করতে পারে না বটে, কিন্তু গাছেরও প্রাণ আছে। সেই জীবন্ত গাছগুলো হত্যা করতে একটুও কাঁপে না আমাদের প্রাণ?

এখন যেটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, একসময় সেটি ছিল রেসকোর্স ময়দান। এখানে ঘোড়দৌড় হতো। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু ঘোড়দৌড় বন্ধ করে তার প্রিয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে এখানে উদ্যান গড়ে তোলেন। এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান আসলে ইতিহাসের আধার। ৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর এই উদ্যানেই শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়া হয়। ৭১ সালের ৭ মার্চ এই উদ্যানে দাড়িয়ে কোটি মানুষের আবেগকে ধারণ করে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।‘ নয়মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর একাত্তর সালের ১৬ ডিসেম্বর এই উন্মুক্ত প্রান্তরেই আত্মসমর্পণ করেছিল পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে এই উদ্যানেই প্রথম জনসভা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অকৃত্রিম বন্ধু ইন্দিরা গান্ধীকে বরণ করে নেয়া হয়েছিল এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই। তাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মানে নিছক কিছু গাছপালা নয়, এটি ইতিহাসের অংশ, আস্ত একটি জাদুঘর। তবে নানা সময়ে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে মুছে দিতে চেয়েছে ইতিহাস। এখানে বানানো হয়েছে শিশুপার্ক, পুলিশ কন্ট্রোল রুম, শাহবাগ থানা, শিশু একাডেমী। এভাবে চারপাশ থেকে গলা টিপে ধরার চেষ্টা হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের। কিন্তু এখন স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থেকেই ইতিহাস সংরক্ষণের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নিয়ে সরকারের বড় পরিকল্পনা রয়েছে, এটা ভালো উদ্যোগ। এরই মধ্যে শিখা চিরন্তন, গ্লাস টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে। প্রকৃতিতে যাতে কোনো আচড় না লাগে সে জন্য মাটির নিচে স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এবার সেই প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে এসে ওয়াকওয়ে, কফিশপ, জলাধার আর পার্কিং নির্মাণের জন্য নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে।

একটা জিনিস আমার মাথায় ঢোকে না, উন্নয়ন করতে হলেই গাছের ওপর, প্রকৃতির ওপর, নদীর ওপর আক্রমণ করতে হবে কেন? এই প্রবণতা আমরা রামপালে দেখি, জাহাঙ্গীরনগরে দেখি, টিএসসিতে দেখি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেখি। উন্নয়ন মানেই কি দখল, উন্নয়ন মানেই কি ধ্বংস, উন্নয়ন মানেই কি ভবন? গাছ না কেটে যারা উন্নয়ন করতে পারবেন না, তাদের বাদ দিন। স্থপতি, নগর পরিকল্পনাবিদদের ডেকে বলুন, আমরা এই এই করতে চাই, একটি গাছ না কেটেও যারা এটি করতে পারবেন, তারা এগিয়ে আসুন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ওয়াকওয়ে দিয়ে গাড়ি চলবে না, যে এটা একদম খাতায় রুল টেনে বানাতে হবে। গাছ না কেটে একটু বাঁকা করে ওয়াকওয়ে বানালে কি কেউ মাইন্ড করবে? আর আমার মাথায় ঢোকে না সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই কেন পার্কিংএর জায়গা বানাতে হবে? সোহরাওয়া্র্দী উদ্যানে ঘুরতে যাওয়া কেউ কি কফিশপের দাবি তুলেছে? তাহলে কোন হাইব্রিডের পকেট ভারি করতে ৭টি কফিশপ দিয়ে ঘিরে ফেলা হচ্ছে প্রিয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে? মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় বলছে, তারা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গরড় তুলতে চায়। খুব ভালো কথা। কিন্তু আন্তর্জাতিক মান মানে কী? পার্কিং প্লেস আর কফিশপ কি আন্তর্জাতিকতার মানদণ্ড? একটা বিষয় নীতিনির্ধারকরা মাথায় রাখলে ভালো, কফিশপ আর ওয়াকওয়ে বানিয়ে কিছু লোকের পকেট ভারি হবে, কিন্তু আন্তর্জাতিক মান ছোঁয়া যাবে না,পর্যটকদেরও নজর কাড়া যাবে না। পর্যটকরা আসবেন ইতিহাসের সন্ধানে, প্রকৃতির টানে। 

বিভিন্ন ব্যক্তি, রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠন গাছ কাটার প্রতিবাদ করছে এটা ভালো। তবে গাছ কাটা প্রতিবাদ করতে হবে কেন, এটাই আমার মাথায় ঢোকে না। কিছু দুর্বৃত্ত যদি ফাক-ফোকর বের করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গাছ কেটে থাকে, জানাজানি হওয়ার সাথে সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটি বন্ধ হয়ে যাবে। এটি নিয়ে এত আলোচনা, প্রতিবাদের কী আছে। কিন্তু আমি বিস্ময়করভাবে দেখছি, গাছ কেটেই ক্ষান্ত নয়, এরপক্ষে আবার দেখি অনেক যুক্তিও দাড় করাতে চাচ্ছেন। আপনারা যা যা বলেছেন, আমরা সব শুনেছি; কিন্তু গাছ কাটার পক্ষে কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। স্থাপত্য অধিদপ্তর, গণপূর্ত অধিদপ্তর না মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় কার মাথা থেকে গাছ কেটে উন্নয়ন করার কুবুদ্ধিটা কার মাথা থেকে এসেছে জানি না, একটা বিষয় খালি জানি, আর একটি গাছও কাটা যাবে না। গাছ না কেটে উন্নয়ন যদি আপনি পারেন, করেন; না পারলে সরে যান। গাছ আপনাকে কাটতে দেওয়া হবে না। এর আগে একবার ওসমানী উদ্যানে গাছ কাটার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তখনও প্রতিবাদ করে ঠেকানো হয়েছিল। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা গাছ বাঁচাতে গাছ জড়িয়ে ধরে দাড়িয়েছিলেন। এবারও প্রয়োজনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রতিটি গাছ জড়িয়ে ধরে দাড়িয়ে থাকবে প্রকৃতিপ্রেমীরা যাতে প্রকৃতির শত্রুদের কুড়াল থেকে বাঁচতে পারে গাছগুলো। বলা হচ্ছে, প্রকল্প শেষে এখানে এক হাজার গাছ লাগানো হবে। খুব ভালো কথা। আপনি এখনই গাছ লাগান, কিন্তু কোনো গাছ কাটতে পারবেন না। যে কটা গাছ কেটেছেন, তার ক্ষতিপূরণ কয়েক হাজার গাছ লাগিয়েও পূরণ করা যাবে। শতবর্ষী গাছ কেটে ছোট গাছ লাগানোকে গরু মেনে জুতা দানের চেয়ে বেশি কিছু মনে হয় না।

মুক্তিযুদ্ধবিষয় মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, 'আপনাদের কথা শুনলে কোনো কাজই করা যাবে না। এখানে কোনোদিনই উদ্যান ছিল না। রেসকোর্স ময়দানে ঘোড়দৌড় হতো। জনসভা হইছে। মিথ্যাচার করে বলা হচ্ছে বন ছিল। আমরাই হাজার হাজার গাছ লাগাইছি, আরো লাগাবো।' হাজার হাজার গাছ লাগানোর জন্য এবং আরো গাছ লাগানোর পরিকল্পনার জন্য মাননীয় মন্ত্রীকে ধন্যবাদ। কিন্তু হাজার হাজার গাছ লাগানোর সুযোগ আপনার আছে, কিন্তু একটি গাছ কাটারও অধিকার নেই; এমনকি আপনি নিজ হাতে লাগালেও, এমনকি নিজের বাড়িতে হলেও। আপনি লাগাতে পারবেন, কিন্তু গাছ হলো প্রকৃতির সন্তান। মন্ত্রী আরো বলেছেন, 'যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পছন্দ করেন না, তারাই বিভিন্ন কথা বলে কাজে বাধা দেয়ার চেষ্টা করছেন'।তবে এ কথা শুনে আমি অবাক হইনি, মন্ত্রীকে দোষও দিচ্ছি না। এটা আওয়ামী লীগের পুরোনো সমস্যা। যুক্তিতে না পারলেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সামনে টেনে আনা আর প্রতিপক্ষকে জামাত-শিবির ট্যাগ লাগিয়ে দেয়া। মাননীয় মন্ত্রী, গাছ কাটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নয়। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হলো উন্নত, সমৃদ্ধ এবং অবশ্যই সবুজ। মাননীয় মন্ত্রী আরেকটা কথা, আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পরিদর্শন করেছেন। তিনি প্রকৃতিবিরোধী উন্নয়নের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। মন্ত্রীর কথা অনুযায়ী দেলোয়ার হোসেনও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পছন্দ করেন না। তাহলে দেলোয়ার হোসেনের মত এমন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী লোক আওয়ামী লীগে এত বড় পদ পেলেন কীভাবে?

করোনা এসে আমাদের অক্সিজেনের গুরুত্ব বুঝিয়েছে। আর আমরা অক্সিজেনের প্রাকৃতিক কারখানা ধ্বংস করছি। রমনা পার্ক আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হলো ঢাকার ফুসফুস। আর ফুসফুস আক্রান্ত হলে যে মানুষ বেশিদিন বাঁচে না, এটা এখন সবাই জানে। এ কারণেই শুরুতে বলেছি, আমরা আত্মহনন প্রবণ জাতি। জাতির ক্ষতি জেনেও, দেশের ক্ষতি জেনেও বাণিজ্যের স্বার্থে আমরা যে কোনো কাজ করতে পারি, নদী দখল করতে পারি, নদীতে ময়লা ফেলতে পারি।

আগেও বলেছি, গাছ কাটার স্বতস্ফুর্ত প্রতিবাদ দেখে ভালো লাগছে। কিন্তু রাজপথে আমাদের প্রতিবাদ করতে হবে কেন। গাছ কাটার প্রতিবাদ হবে সংসদে, মন্ত্রিসভায়। সুমন চট্টোপাধ্যায়ের একটা গান আছে, 'আমি চাই গাছ কাটা হলে শোকসভা হবে বিধান সভায়/আমি চাই প্রতিবাদ হবে রক্ত পলাশে রক্ত জবায়।' আমিও তেমন চাই, রাস্তায় আমরা রক্ত পলাশে, রক্ত জবায় প্রতিবাদ করবো আর গাছ কাটা হলে শোকসভা হবে মন্ত্রিসভায়।

লেখকপ্রভাষ আমিনহেড অব নিউজএটিএন নিউজ