যাদের লক্ষ্য বিসিএস ক্যাডার!



প্রফেসর ড. মু. আলী আসগর
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে বিভিন্ন ক্যাডারের শূন্য পদগুলো পূরণ করা হয় বিসিএস প্রিলিমিনারি, লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষার মাধ্যমে। বিসিএসের সাধারণ ক্যাডার হিসেবে পররাষ্ট্র, প্রশাসন, পুলিশ, কর, শুল্ক, নিরীক্ষা ও হিসাব ইত্যাদিকে গণ্য করা হয় এবং কারিগরি ক্যাডারগুলো মূলত বিশেষায়িত (Specialized) চাকরি। এর মধ্যে প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, চিকিৎসক সহ সরকারি কলেজের সব বিষয়ের শিক্ষক অন্তর্ভূক্ত।

বিসিএস সিলেবাসে সবার জন্য ২০০ নম্বরের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা রয়েছে। ৪১তম বিসিএসে আবেদন করেছিলেন ৪ লাখ ৭৫ হাজার জন, যা রেকর্ড। এবং উক্ত প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় করোনা সংকটের মধ্যে প্রায় ৭৫% প্রার্থী অংশগ্রহণ করেছিলেন। সাধারণত ৫ শতাংশের কম টেকেন লিখিত পরীক্ষার জন্য। দুই ঘণ্টার ২০০ নম্বরের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় ২০০টি প্রশ্ন থাকবে। প্রার্থী প্রতিটি শুদ্ধ উত্তরের জন্য ১ নম্বর পাবেন। তবে ভুল উত্তর দিলে প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য প্রাপ্ত মোট নম্বর থেকে শূন্য দশমিক ৫০ (শূন্য দশমিক পাঁচ শূন্য) নম্বর কাটা যাবে।

লিখিত পরীক্ষায় প্রতিটি বিষয়ে পাস মার্ক হচ্ছে-  শতকরা ৫০। এক বা একাধিক বিষয়ে ৫০ শতাংশের কম নম্বর পেলেও সব বিষয়ে গড়ে ৫০ শতাংশ নম্বর পেলেই পাস। অর্থাৎ মোট ৯০০ নম্বরের মধ্যে অন্তত ৪৫০ পেতে হবে। তবে কোনো বিষয়ে শতকরা ৩০ ভাগের কম নম্বর পেলে তা মোট নম্বরের সঙ্গে যোগ হবে না।

লিখিত পরীক্ষায় ৪৫০-৫০০ নম্বর পেয়ে ভাইভা বোর্ড পর্যন্ত গেলেও বিসিএস ক্যাডার পদে সুপারিশ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ক্যাডার পদে সুপারিশ পেতে হলে অত্যাবশ্যক- সুনির্দিষ্ট টার্গেট ও সঠিক পথে কঠোর পরিশ্রম।

লিখিত পরীক্ষায় যত ভালো করতে পারবেন, ক্যাডার পাওয়ার দৌড়ে তত এগিয়ে থাকবেন। অগোছালোভাবে সারা দিন পড়াশোনা করে লিখিত পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া সম্ভব নয়। জেনে-বুঝে পরিকল্পিতভাবে পড়তে হবে।

বাংলা-২০০ নম্বরের মধ্যে ব্যাকরণভিত্তিক প্রশ্ন, ভাবসম্প্রসারণ, সারাংশ বা সারমর্ম ও সাহিত্য বিষয়ে সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন থাকে। বিসিএস পরীক্ষার্থীদের জন্য এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্য, শুদ্ধিকরণসহ ব্যাকরণভিত্তিক প্রশ্নগুলো নির্ভুল উত্তর করতে পারলে এই অংশে ৭৫ থেকে ৯০ নম্বর পাওয়া যায়। বাংলায় বড় রচনা ধরণের লেখাগুলো সঠিক তথ্যবহুল ও উপস্থাপনা সুন্দর হলে ৭০-৭৫ নম্বর পাওয়া যায়। বানান ও বাক্য শুদ্ধ হওয়া আবশ্যক।

ইংরেজিতে কমবেশি সকলেরই দুর্বলতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে গ্রামার, ট্রান্সলেশন, লেটার রাইটিং অংশগুলো ভালো করতে পারলে প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র মিলে ১১০-১২০ নম্বর পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ বিষয়াবলি ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি সহ অন্যান্ন বিষয়ে ভালো নম্বর পেতে করণীয় সম্পর্কে নিম্নে আলোকপাত করছি।

ক. বিসিএস প্রস্তুতিতে যা করণীয়-

১) যারা অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছে, তাদের উচিত নিজ একাডেমিক বিষয়কে অবহেলা না করে ও অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট না করে প্রস্তুতি শুরু করা। তবে যারা অন্যান্ন বর্ষে পড়ছে, তাদের অবশ্যই অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হবে। প্রবাদ আছে, ‘সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়”। প্রথমেই বিসিএসের প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষার সিলেবাসটা খুব ভালো করে পড়ে প্রস্তুতি শুরু করতে হবে।

২) গাইডকে কম গুরুত্ব দিয়ে বিসিএস সিলেবাস সংশ্লিস্ট বেসিক বইগুলো বিভাগের একাডেমিক পড়ার পাশাপাশি পড়াটা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন নির্বাচন করে ক্লাস সিক্স টু ক্লাস টেন এর বোর্ডের বই সহ এইচএসসি এর পৌরনীতি এবং  তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বই মনোযোগ সহকারে পড়াটা আবশ্যক।

Note: গত কয়েক বছরের বিসিএস এর প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রশ্নগুলো, আমি জেএসসি এর বাংলা ব্যকরণ, ইংরেজি গ্রামার, গণিত, বিজ্ঞান ও এসএসসি এর বাংলা ব্যকরণ, ইংরেজি গ্রামার, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং এইচএসসি এর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, পৌরনীতি প্রশ্নের সাথে যথেষ্ট মিল খুঁজে পেয়েছি।

৩) কোচিং সেন্টারে বা টিউশনে ইংরেজি, গণিত বা বিজ্ঞান পড়ালে তা বিসিএস প্রস্তুতিতে  নিজেরও কাজে লাগবে এবং একই সাথে বিসিএস ভাইভায় কথা বলার আড়ষ্টতা কাটবে।

৪) স্নাতক অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তির শুরু থেকে বা স্নাতক অনার্স ভর্তির যত শীঘ্র সম্ভব ভালো মানের বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা নিয়মিত মনোযোগ সহকারে পড়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য খাতায় নোট রাখলে বাংলাদেশ বিষয়াবলী ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী প্রস্তুতিতে ভিত (Base) তৈরি করতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি বিবিসি বাংলা খবর ও বিবিসির বিশ্লেষণধর্মী আন্তর্জাতিক নিউজ এই প্রস্তুতিতে কাজে লাগবে।

৫) বিসিএস সিলেবাস অনুযায়ী ইংরেজি গ্রামার ও লিটারেচার প্র্যাকটিসের পাশাপাশি ইংরেজি vocabulary (শব্দভাণ্ডার) নিয়মিত বৃদ্ধি করাটা জরুরী। ইংরেজি পত্রিকা থেকে  প্রতিদিন অন্তত ৫টি Words (প্রত্যেকটির Synonyms and Antonyms সহ) মেমোরাইজ করে নোট খাতায় লিখে রাখতে হবে এবং শেখা Words পরে পুনরায় প্র্যাকটিস করতে হবে।

৬ ) বাংলা সাহিত্য ও ইংরেজি লিটারেচারের কবি ও সাহিত্যিকদের পরিচিতি ও বইগুলোর নাম ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংগ্রহ করে নোট খাতায় লিখে বারবার চর্চা করতে হবে।

খ. বিসিএস প্রস্তুতিতে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বইগুলো-

বিসিএস প্রস্তুতিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই আছে। যেমন- ১।  অসমাপ্ত আত্মজীবনী (শেখ মুজিবুর রহমান) ২।  কারাগারের রোজনামচা (শেখ মুজিবুর রহমান)  ৩। লাল নীল দীপাবলি (ড. হুমায়ুন আজাদ) ৪। বিদ্যাকোষ; বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি (ড আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ) ৫। Applied English Grammar and Composition (P. C. Das; ভুল এড়ানোর জন্য ভারতের অরিজিন্যাল বইটি বেশী উপকারী) ৬। A Passage to the English Language (S. M. Zakir Hussain) ৭। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (মুনতাসীর মামুন ও মো. মাহবুবুর রহমান) ৮। বাংলাদেশের ইতিহাস (১৯০৫-১৯৭১) লেখক ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেন ৯। নয়া বিশ্বব্যবস্থা ও সমকালীন আন্তর্জাতিক রাজনীতি (ড. তারেক শামসুর রেহমান ১০।  বিশ্বরাজনীতির ১০০ বছর (ড. তারেক শামসুর রেহমান) ১১। জীবনের বালুকাবেলায় (ফারুক চৌধুরী) ১২। আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি (আকবর আলি খান) ইত্যাদি।

গ. বিসিএস প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের সংবিধান গুরুত্বপূর্ণ-

বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সঙ্গে কারা জড়িত ছিল, খসড়া রূপ, উপস্থাপন ও গৃহীত হওয়ার তারিখ,  সংবিধানে কারা স্বাক্ষর করেছেন ও করেন নাই, সংবিধানের কমিটি গঠনের নেপথ্য, অধ্যাদেশ জারি, মহিলা জড়িত ছিলেন কি না, কে হাতে লিখল, অঙ্গসজ্জাকারী কে, অন্য কোন দেশের সংবিধান অনুসরণ করা হয়েছে কিনা ইত্যাদি ভালোভাবে মনে রাখতে হবে। সংবিধানের সাতটি তফসিলের মধ্যে তৃতীয়, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তফসিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ সংবিধান এ পর্যন্ত কত বার সংশোধিত হয়েছে তা জানাটা আবশ্যক। এই সংশোধনীর কোনগুলো বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। কিছু বিষয় সংশোধন অযোগ্য কেন। দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, অষ্টম, দ্বাদশ, ত্রয়োদশ, চতুর্দশ, পঞ্চদশ, ষোড়শ সংশোধনীর সাল ও মূল বিষয়বস্তু ভালো করে মনে রাখবেন।

সংবিধানের ১৫৩ অনুচ্ছেদের মধ্যে নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদগুলো বিসিএসের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ-

২ (ক), ৩, ৪, ৪ (ক), ৫, ৬, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬, ১৭,১৮, ১৮ (ক) ১৯, ২০, ২১, ২২, ২৩, ২৩ (ক), ২৪, ২৫, ২৭, ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৪, ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১, ৪২, ৪৩, ৪৯, ৫২, ৫৫, ৫৭, ৫৯, ৬০, ৬৪, ৬৫, ৬৬, ৬৭, ৭০, ৭৬, ৭৭, ৮১, ৮৭, ৯১, ৯৩, ৯৪, ১০২, ১০৬, ১০৮, ১১৭, ১১৮, ১২১, ১২২, ১২৩, ১২৭, ১৩৭, ১৩৮, ১৩৯, ১৪০, ১৪১, ১৪১ (ক), ১৪১ (খ), ১৪১ (গ), ১৪২, ১৪৮ ও ১৫৩।

সংবিধানের অধিক প্রচারিত বিষয়গুলো মনে রাখবেন । উদাহরণস্বরূপ ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রয়োজনীয় কিনা, রাষ্ট্রধর্ম সম্পর্কে আপনার অভিমত ইত্যাদি। কিছুক্ষেত্রে উচ্চ আদালত সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ বা সংশোধনী নিয়ে মন্তব্য বা রায় দেন, তা জানা আবশ্যক।

ঘ) বিসিএস ভাইভা প্রস্তুতি-

২৭তম বিসিএস থেকে থেকে সিলেকশন বোর্ডের সামনে  লিখিত পরীক্ষার নম্বর থাকে না। অর্থাৎ, লিখিত পরীক্ষায় কী করেছেন বোর্ড তা দেখেন না। ভাইভাতে আপনাকে মূল্যায়ন করা হবে শুধু ২০০ নম্বরের ওপর। আপনি বোর্ড থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বোর্ডের চেয়ারম্যান সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে নম্বর দিয়ে দেন। এটিই আপনার ভাইভার চুড়ান্ত নম্বর।

বিসিএস ভাইভায় সচরাচর দুই ধরনের উপাদান সম্পর্কিত প্রশ্ন হয়ে থাকে। প্রথমটি হলো সুনির্দিষ্ট উপাদান, যেমন আপনার নাম, পিতামাতার নাম, পেশা, একাডেমিক রেজাল্ট ইত্যাদি। উদাহরণস্বরূপ, আপনার নাম যদি হয় ‘শামসুর রহমান’, তবে  বাংলাদেশ ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমান সম্পর্কে জানতে চাইতে পারে।

দ্বিতীয়টি হলো অনির্দিষ্ট উপাদান, যেগুলো আপনি একটি ভালো প্রস্তুতি নিয়ে ভালো নম্বর পেতে পারেন। যেমন আপনার একাডেমিক জ্ঞান, নিজ জেলার তথ্য, কমনসেন্স, সাধারণ জ্ঞান, অধ্যয়নের মাধ্যমে আপনার অর্জিত বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি। যেহেতু এই অংশের পরিধি অনেক বড়, ভালো করতে অনেক কিছু পড়তে হয়। In fact, ভাইভায় কোন ধরনের প্রশ্ন হবে, তার নির্দিষ্ট কোনো সিলেবাস নেই। এটি সম্পূর্ণরূপে সিলেকশন বোর্ডের ওপর নির্ভর করে। তবে যারা খুব ভালো প্রস্তুতি নেয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা সফল হয়।

বিসিএস ভাইভা প্রস্তুতিতে যা গুরুত্বপূর্ণ-

১) ভাইভায় সাধারণত পাঁচটি বিষয়ের ওপর প্রশ্ন করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। যথা ক) নিজ জেলা, খ) নিজ পঠিত বিষয়, গ) মুক্তিযুদ্ধ ঘ) সংবিধান, ঙ) সাম্প্রতিক বিষয়াবলি। এই বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে পড়বেন।

২) যদিও সিলেকশন বোর্ড কিছু প্রশ্ন বাংলায় করতে পারে, তবে অধিকাংশ প্রশ্ন ইংরেজিতে করার সম্ভাবনাই বেশি। ইংরেজি বলার জন্য এখন থেকেই অনুশীলন করতে হবে। ইংরেজি vocabulary (শব্দভাণ্ডার) নিয়মিত বৃদ্ধি করাটা জরুরী। ইংরেজি পত্রিকা থেকে প্রতিদিন অন্তত ৫টি Words (প্রত্যেকটির Synonyms and Antonyms সহ) মেমোরাইজ করে নোট খাতায় লিখে রাখতে হবে এবং শেখা Words পরে পুনরায় প্র্যাকটিস করতে হবে। ভুল হলেও ক্যারিয়ার সচেতন বন্ধুদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলার  চর্চা করতে হবে। যে কোন পেশায় প্রবেশে ও সফল হতে ইংরেজিতে দক্ষতা অপরিহার্য।

৩) ১০০% প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে সাধারণ বিষয়াবলী অর্থাৎ যা জানা উচিৎ, তা না পারলে ভাইভা বোর্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। উত্তর জানা না থাকলে বিনীতভাবে সরি বা দুঃখিত বলবেন। নার্ভাস হয়ে চুপ করে থাকবেন না ও ভুল উত্তর দিবেন না।

৪) কিছু কমন প্রশ্ন নিজের মতো করে মনে ইংরেজিতে সাজিয়ে নেবেন। উদাহরণস্বরূপ, নিজ details পরিচয়, পরিবার, এলাকা/শহর, জেলা, বিসিএস দেওয়ার উদ্দ্যেশ্য, ১ম ও ২য় ক্যাডার পছন্দের কারণ, নিজ পঠিত বিষয় ও ১ম/২য় পছন্দের সম্পর্ক, বর্তমান অবস্থা বা পেশা, স্মৃতিবহুল ঘটনা, শখ (হবি) , শৈশব-কৈশোর,কলেজ/ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন ইত্যাদি। আপনি যে সাবজেক্টে অনার্স ও মাস্টার্স করছেন, তার সঙ্গে আপনার পছন্দের ক্যাডারের কোনো সম্পর্ক আছে কি না বা কীভাবে আপনার একাডেমিক জ্ঞান পেশাগত কাজে লাগাবেন, তার একটা উত্তর সাজিয়ে নেবেন। ভাইভা বোর্ডে এগুলো বলার সময় মুখস্থের মত বলবেন না।

৫) নিজ জেলা সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে। যেমন, জেলার নামকরণের কারণ, আয়তন, প্রতিষ্ঠার তারিখ সহ সাল, উপজেলা ও থানার সংখ্যা, খ্যাতিমান ব্যক্তির জীবনবৃত্তান্ত, প্রধান কৃষিপণ্য, শিল্পকারখানা (যদি থাকে), নামকরা নদ-নদী ইত্যাদি।

৬) ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্যায়, ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, এগার দফা, বঙ্গবন্ধ, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা থাকা অবশ্যই প্রয়োজন।

৭) সর্বশেষ বাজেট সম্পর্কে একটা ধারণা রাখতে হবে; যেমন, মোট বাজেটের আকার, কোন খাতে কত বরাদ্দ, কত ঘাটতি, দেশের কততম বাজেট ইত্যাদি। অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২০ বা সর্বশেষ অর্থনৈতিক সমীক্ষা থেকে বাছাই করে বেশ কিছু তথ্য জেনে নেবেন। জিডিপিতে বিভিন্ন খাতের অবদান সহ বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবেশ, অবকাঠামোগত তথ্যাবলী ইত্যাদি।

৮ ) বাংলাদেশ সংবিধান সম্পর্কে এ লেখায় পূর্বে আলোচিত বিষয়গুলো বিসিএস ভাইভায় বেশি জিজ্ঞাসা করা হয়।

৯) ফরমাল রুচিশীল পোশাক পরে ভাইভা বোর্ডে যাবেন। পুরুষ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে চুল আদর্শ মান পর্যন্ত ছেঁটে রাখা উচিত। মেয়েদের ক্ষেত্রেও আদর্শ মান বজায় রাখা উচিত। সকলের জন্য পরিচ্ছন্নতা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

১০) ভাইভা কক্ষে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় যথেষ্ট সচেতন থাকবেন। সাধারণ ভদ্রতাগুলো মেনে চলবেন। যেমন, অনুমতি নেওয়া, সালাম দেওয়া, বিনয়ী থাকা, ইত্যাদি। তবে অতিবিনয়ী হয়ে কাঁচুমাচু করবেন না। কক্ষে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় সালাম সকলকে দেবেন না। শুধুমাত্র বোর্ডের সভাপতিকে লক্ষ্য করে একবার দেবেন। গলার স্বর অধিক উচ্চ বা অধিক নিম্ন না করে স্টান্ডার্ড মান বজায় রেখে প্রশ্নের উত্তর দিবেন। মাথা প্রয়োজন অনুযায়ী মুভ করে প্রশ্নের উত্তর দিবেন। কথোপকথনের সময় হাত নাড়াবেন না এবং পা ঝাঁকাবেন না। চেয়ারে হেলান দিয়ে আরাম করে বসতে যাবেন না ও  লেখা ছাড়া টেবিলে হাত হেলান দিয়ে বসবেন না।

বি.দ্র. ভাইভায় ফেল বা কম নম্বর পাওয়ার মুখ্য কারণগুলো হলো- বেয়াদবি করা, নার্ভাস থাকা, অস্বাভাবিক আচরণ করা, বেশি জানার ভাব করা, উচ্চারণে আঞ্চলিকতা থাকা, ব্যর্থতা স্বীকার না করে একগুয়ে থাকা, না পারলেও উত্তর দেওয়া, সঠিক উত্তর কম দেওয়া ইত্যাদি।

ড. মু. আলী আসগর: প্রফেসর, ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

বই হোক নিত্যসঙ্গী



সোহেল মিয়া
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

অন্তহীন জ্ঞানের উৎস বই। আধুনিক সভ্যতায় মানব জীবনে বইয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মানুষ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব। মানুষের অনন্ত জিজ্ঞাসা, অসীম কৌতুহল তার এই সকল প্রশ্নের সমাধান আর অন্তহীন জ্ঞান ধরে রাখে বই। শতাব্দী থেকে শতাব্দী ধরে মানুষের সকল জ্ঞান জমা হয়ে রয়েছে বইয়ের ভেতর। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার এই যুগে বই যেন রঙিন মোলাটে কাঠের চার দেওয়ালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

আমাদের প্রিয় স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য কি ছিল সেটা আমরা বেমালুল ভুলে যেতে বসেছি। জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করায় ছিল আমাদের স্বাধীনতার মূলমন্ত্র। কিন্তু বাস্তবতা আজ ভিন্ন। স্বাধীনতার এতো বছর পরেও আজ জ্ঞান-বিজ্ঞান উৎকর্ষে আমরা পিছিয়ে রয়েছি। প্রযুক্তির অপব্যবহার আজ আমাদের গ্রাস করেছে তরুণ প্রজন্মকে। যাদের হাতে নির্ভর করছে বঙ্গবন্ধুর আগামীর সোনার বাংলা। আমাদের প্রজন্মকে আমরা যদি জ্ঞান অর্জনের অন্যতম বাহন বইয়ের প্রতি মনোনিবেশ করাতে না পারি তাহলে আমাদের অদূর ভবিষ্যৎ খুব একটা সুখকর হবে না।

বর্তমানে জাতিকে উন্নত করার লক্ষ্যে সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনে কাজ করছে। স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনে আলোর মুখ দেখতে হলে অবশ্যই বইকেই প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে নিতে হবে। এক্ষেত্রে বিশ্বের ইতিহাস, দেশের ইতিহাস, নিজ দেশের মক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সামাজিক, রাজনৈতিক, দর্শন, বিজ্ঞান, ভাষা, শিল্প, সাহিত্য সম্পর্কিত জ্ঞান যত বেশি অর্জিত হবে তত মনন জগত সমৃদ্ধ হবে। একটি ভালোমানের বই পারে সামাজিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটাতে। আর সামাজিক ও মানসিকভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে পারলেই মূল লক্ষ্য তথা স্মার্ট বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে।

আমাদের মধ্যে এখনো ধারণা রয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশ মানে- মোবাইল, কম্পিউটার ব্যবহার আর ইন্টারনেট। বর্তমান সরকার ৫ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছেন। যা অত্যন্ত আনন্দদায়ক এবং খুবই প্রশংসনীয় উদ্যােগ। তবে শুধুমাত্র জাতীয় দিবস ঘোষণা করলেই হবে না। এক্ষেত্রে সবাইকে গ্রন্থাগারমুখী করে গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। সেই সাথে গ্রন্থাগারের সার্বিক উন্নয়ন তথা ডিজিটালাইজেশন এবং পেশাজীবী গ্রন্থাগারিক সৃষ্টি ও তাদের জীবন মানোন্নয়ন বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রশিক্ষিত ও দক্ষ পেশাজীবী গ্রন্থাগারিক সৃষ্টি করতে পারলে তবেই স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়ন সম্ভব।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস ২০২৩ উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন। যা আশার আলো দেখায়।

জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে বই পড়ার চর্চা বাড়াতে হবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, কালের পরিক্রমায় সভ্যতার সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করে গ্রন্থাগার। তথ্য প্রযুক্তির উৎকর্ষে বই সংরক্ষণ ও পড়ার অভ্যাস ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। সে- প্রেক্ষিতে মানুষকে বই পড়ায় উৎসাহিত করতে ‘জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস’ পালন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, গ্রন্থাগার হলো তথ্যের অফুরন্ত ভান্ডার। সরকার সর্বসাধারণের জন্য আধুনিক অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সুবিধাসম্পন্ন গ্রন্থাগার নির্মাণে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। ফলে পাঠক, গবেষক ও তথ্য সংগ্রহকারীদের কাছে গ্রন্থাগারের ভূমিকা আরো আকর্ষণীয় ও কর্মপোযোগী হয়ে উঠবে। তিনি প্রত্যাশা করেন, গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার হয়ে উঠুক সকলের পথ চলার পাথেয়।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের দেশের গ্রন্থাগারগুলো তথ্য-প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আন্তর্জাতিকমানের গ্রন্থাগারের মতো উন্নত এবং সমৃদ্ধ হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রন্থাগারগুলোকে ডিজিটালাইজেশন করার জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, গণগ্রন্থাগার অধিদফতরসহ সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি-সম্বলিত এবং অত্যাধুনিক ও নান্দনিক গণগ্রন্থাগার ভবনে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ‘গণগ্রন্থাগার অধিদফতরের বহুতল ভবন নির্মাণ’ প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

সরকারপ্রধান বিশ্বাস করেন, ‘জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস’ পালন গ্রন্থাগার ব্যবহারে দেশের মানুষকে আরো উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করবে এবং জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ তথা স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলায় সহযোগী ভূমিকা রাখবে।

আমরাও বিশ্বাস রাখি- সমাজ পরিবর্তনে বই হবে হাতিয়ার। বই হবে সবার জীবনের নিত্য সঙ্গী। বইয়ে বইয়ে ভরে উঠবে আমাদের আগামি প্রজন্মের সম্ভাবনাময় কোমল হাত। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে তৈরি হবে স্মাট গ্রন্থাগার ও স্মার্ট পাঠক।

লেখক: সোহেল মিয়া, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম ও সহকারি শিক্ষক, বালিয়াকান্দি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, রাজবাড়ী

;

স্বপ্নযাত্রায় স্বপ্নের বিস্তৃতি আকাশ সমান



মো. কামরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আমরা সবাই ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখি, ঘুম ভাঙলে চিমটি কেটে দেখি ঘুমিয়ে আছি নাকি জেগে আছে। ঘুমিয়ে দেখা স্বপ্ন ক্ষণিকের মধ্যে বাতাসে ভেসে ভেসে দূর আকাশে হারিয়ে যায়। বাংলাদেশ এভিয়েশনে একজন স্বপ্নবাজ ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন জেগে জেগে স্বপ্ন দেখায় অভ্যস্ত। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

আজ থেকে ১০ বছর পূর্বে কোনো এক নিরব নিস্তব্ধ শব্দহীন আবহে বাংলাদেশ এভিয়েশন, কন্টকাকীর্ণ আকাশ ভ্রমণ, প্রায় ১০ মিলিয়ন প্রবাসী শ্রমিক ভাই বোন, শত সহস্র ছাত্র-ছাত্রীদের আকাশ পরিবহনের যাত্রা, আর সারা বছরের পর্যটন পিপাসু পর্যটকবান্ধব পরিবেশ সব কিছু নিয়ে যখন অসামঞ্জস্যতা, তখনই স্বপ্নযাত্রায় এয়ারলাইন্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। শুধু সিদ্ধান্ত নয়, বাংলাদেশ এভিয়েশনে নতুন সূর্য হয়ে উদিত হয় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। এক বছরের মধ্যেই ড্যাশ ৮-কিউ ৪০০ এয়ারক্রাফট দিয়ে ঢাকা-যশোর রুটে বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেন।

প্রতি মুহূর্তে স্বপ্নের ভেলায় ভাসতে থাকেন ইউএস-বাংলার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন। দুইটি ড্যাশ ৮-কিউ ৪০০ এয়ারক্রাফট দিয়ে শুরু, বছর ঘোরার আগেই তিনটিতে রূপান্তর। এক বছরের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে সকল চালু বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। যে স্বপ্ন জেগে দেখা হয় তা কি করে থেমে থাকবে। দুই বছর পূর্ণ হওয়ার পূ্র্বেই দেশের গন্ডি ছেড়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে ডানা মেলেছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স।

সময় পেরিয়ে যায় স্বপ্ন বড় হতে থাকে। স্বপ্নের ডালপালা বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে। স্বল্প আসনের এয়ারক্রাফটে স্বপ্নগুলোর পূর্ণতা দিতে পারছে না। তাই তিন বছরের মধ্যেই নিয়ে আসে বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এয়ারক্রাফট। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছে অসংখ্য রেমিট্যান্স যোদ্ধা। দেশীয় এয়ারলাইন্স এর স্বল্পতা তাদের আকাশ ভ্রমণকে করে তুলেছে দূর্বিষহ। সেই অসহনীয় অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য জাগ্রত স্বপ্নবাজ ইউএস-বাংলাকে ধারাবাহিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের এয়ারলাইন্সগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত করে মাস্কাট, দোহা, দুবাই. শারজাহ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করেছে।

বাংলাদেশী কমিউনিটি পৃথিবীর যেসব দেশে অবস্থান করছে, তাদেরকে সেবা দেয়ার মানসে সেসব দেশে ফ্লাইট পরিচালনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দৃঢ় চিত্তে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সকে মানবিক এয়ারলাইন্স এর রূপ দিতে গিয়ে স্বাধীনতার ৫০ বছরে প্রথমবারের মতো চিকিৎসা সেবা নেয়ার জন্য গমণকারী যাত্রীদের জন্য ভারতের কলকাতার পাশাপাশি চেন্নাই রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে।

বাংলাদেশে প্রাইভেট এয়ারলাইন্স এর শুরুর পর থেকে চালু কিংবা বন্ধ হওয়া সকল এয়ারলাইন্স এর উড়োজাহাজগুলোর গড় বয়স প্রায় ১৯ বছর কিংবা তার চেয়েও পুরাতন। যা যাত্রীদের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করতে পারে। সেখানে ইউএস-বাংলার ব্যবস্থাপনা পরিচালক দৃঢ়ভাবে সংকল্পবদ্ধ ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজগুলোর গড় বয়স হবে ১০ বছরের নিচে। যার ফলে বাংলাদেশী এয়ারলাইন্স হিসেবে ইউএস-বাংলা আস্থার প্রতীক হয়ে উঠছে। স্বপ্ন ছিলো অভ্যন্তরীণ রুটে ব্র্যান্ডনিউ এয়ারক্রাফট দিয়ে যাত্রীদের সেবা দেয়া। আর সেই স্বপ্ন পূরণে ইউএস-বাংলায় যোগ করেছে ৭টি ব্র্যান্ডনিউ এটিআর ৭২-৬০০ এয়ারক্রাফট।

২টি ড্যাশ ৮-কিউ ৪০০ এয়ারক্রাফট নিয়ে যাত্রা শুরু করা ইউএস-বাংলার বহরে রয়েছে ১৮টি এয়ারক্রাফট। যার মধ্যে তিনটি ড্যাশ৮-কিউ৪০০, ৭টি এটিআর৭২-৬০০ এবং ৮টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এয়ারক্রাফট। অনিন্দ্য সুন্দর মায়াবী মালদ্বীপে প্রায় লক্ষাধিক বাংলাদেশী বাস করে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সই প্রথম দেশীয় এয়ারলাইন্স হিসেবে মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছে ২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর থেকে।

থাইল্যান্ডের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য ইউএস-বাংলা ঢাকা থেকে ব্যাংকক ফ্লাইট পরিচালনা করছে পর্যটকদের ভ্রমণকে আনন্দময় করার জন্য। আর চীনের গুয়াংজুতে ফ্লাইট পরিচালনা ছিলো অনেকটা স্বপ্নযাত্রার পথে একধাপ নিজেকে এগিয়ে রাখার জন্য। সেই যাত্রাকে সফলভাবে সম্পন্ন করেছে ঢাকা থেকে গুয়াংজু রুটে ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে।

স্বপ্ন দেখার বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন আকাশ সমান পরিধি নিয়ে। পবিত্র মক্কা-মদিনাতে হজ্জ্ব ওমরাহ পালন করার সুবিধার্থে সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনার স্বপ্ন বুনছে। সেই স্ব্প্নকে বাস্তবে রূপ দিতে আগামী মে মাসে ইউএস-বাংলার বহরে দুইটি এয়ারবাস ৩৩০ যোগ করতে যাচ্ছে। যা দিয়ে ঢাকা থেকে জেদ্দা, রিয়াদ, দাম্মাম রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করবে ইউএস-বাংলা।

স্বপ্ন আর বাস্তব, পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন যেন একটি আরেকটির পরিপূরক হয়ে উঠছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুনের স্বপ্নযাত্রায়।

দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে, এশিয়ার গন্ডি পেরিয়ে, প্রত্যাশার পাহাড়ে বিশ্বময় দ্যূতি ছড়িয়ে দিক ইউএস-বাংলার অগ্রযাত্রা।

লেখক: মো. কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

;

গণজাগরণের ১০ বছর: ‘ফিকে’ হতে যাওয়া স্বপ্ন আমার!



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

৫ ফেব্রুয়ারি; বাংলাদেশের তারুণ্যের অগ্নিঝরা দিন। ২০১৩ সালের এই তারিখে জেগেছিল দেশ, যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে। মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের দুঃখজনক গণহত্যা অধ্যায়ের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশীদার মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বিক্ষুব্ধ জনতার প্রকাশ ঘটেছিল, গণজাগরণে।

এই গণজাগরণ সফল হয়েছিল, যার পথ ধরে আইনের সংশোধনী আনা হয় সংসদে। মানবতাবিরোধী অপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন রায় উচ্চ আদালতে গিয়ে ফাঁসির দণ্ডে পরিণত হয়। এরপর আইনি পথ ধরে একে একে সর্বোচ্চ দণ্ড ঘোষিত হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের। অনেকের দণ্ড কার্যকর হয়েছে, অনেকের বিচার উচ্চ আদালতে আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। কেবল বিচারই নয়, দেশের মানুষ বিশেষ করে তরুণ সমাজ একাত্তরকে কতটা ধারণ করে তার প্রকাশ ঘটেছে। যুদ্ধাপরাধে সরাসরি জড়িত জামায়াতে ইসলামি ও এর ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্রশিবিরের প্রতি মানুষের ঘৃণার প্রকাশ ঘটেছে। দাবি ওঠেছে নিষিদ্ধের, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই দাবি পূরণ হয়নি।

দীর্ঘ মুক্তির সংগ্রাম শেষে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত দেশ, এই যুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহিদের আত্মত্যাগ, দুই লাখ নারীর প্রতি সহিংসতা- বিশ্বের ইতিহাসে এত বেশি আত্মত্যাগ ও সহিংসতার নজির না থাকলেও এই দেশ মুক্তিযুদ্ধের পথ ধরে এগোয়নি। মুক্তিযুদ্ধকে ভুল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধে শহিদের সংখ্যা নিয়ে অযাচিত বিতর্ক তোলা হয়েছে, একাত্তরকে ভুলে যাওয়ার নসিহত দেওয়া হয়েছে; যা স্পষ্টত একাত্তরকে অস্বীকার করা, তবু জাগেনি দেশ এতদিন। নব্বই দশকে শহিদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলন হয়েছে, সেই আন্দোলন দমাতে অসম সাহসী এই বীরমাতার বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাও। শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম নির্বিঘ্নে রাজনীতি করে গেছে, তার দলের একাধিক নেতা পেয়েছে মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব। মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদ নামের এ দুজনও ছিল শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী, বাংলাদেশের সরাসরি শত্রু; তাদের গাড়িতেও তুলে দেওয়া হয়েছে লাল-সবুজের পতাকা। অপমানিত পতাকার বাতাসের দুলুনিতে নড়তে দেখেছি আমরা অথচ চাপা কান্নার আওয়াজ শুনিনি। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-সরকার এ দুজনকে মন্ত্রী করেছে। কেবল মন্ত্রিত্ব দানই নয়, আদর্শিক মোহনায় মিলিত হয়েছিলে তারা; একই সঙ্গে অযাচিত ও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে দেশকে ঠেলে দিয়েছিলেন পাকিস্তানি ভাবধারার দিকে। একাত্তরের পরাজিতদের স্বাধীন দেশে এমনতর বিজয়ে সংক্ষুব্ধ হয়েছিল ঠিক একাত্তরধারী প্রজন্ম, তবে এর প্রকাশ আগে সেভাবে হয়নি; হয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর অনুকম্পার রায়ে। ইতিহাস তো এমনই, এক ঘটনা ধরে টান দিতে জানে পুরো শেকড়। তেরোর গণজাগরণ তেমনই এক!

একাত্তরকে ভুলে যাওয়ার সেই সে নসিহত, একাত্তরের গণহত্যাকারীদের রাজনৈতিক পুনর্বাসন সত্ত্বেও এই দেশের মানুষের মধ্যকার দেশপ্রেম, একাত্তর-সংযোগের যে ধারাবাহিকতা সেটাকে সফল করতে ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অঙ্গীকার করে। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ তারুণ্য আওয়ামী লীগের সেই অঙ্গীকারে আস্থা স্থাপন করে তাদেরকে এনে দেয় ভূমিধ্বস বিজয়। ক্ষমতায় যাওয়ার পর শেখ হাসিনা অঙ্গীকারকে ভুলে না গিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচারের পথ রচনা করেন। তারপর ২০১৩ সালে আসে প্রথম রায়, যে রায়ে যুদ্ধাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন দণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সে রায়কে মানেনি তারুণ্য। সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানায়, নেমে আসে রাজপথে। যাবজ্জীবন দণ্ড পেয়ে ভি-সাইন দেখানো কাদের মোল্লার ঔদ্ধত্য তাদেরকে বিক্ষুব্ধ করে। তারুণ্যের সেই গণজাগরণে সরকার অপরাধের ব্যাপকতা বুঝতে পেরে মানবতাবিরোধী অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তিকে প্রচলিত আইনের সর্বোচ্চ শাস্তির সমান করে, যাতে খুলে যায় দণ্ডের সর্বোচ্চ ব্যবহারের সুযোগ। গণজাগরণ সফল হয়।

গণজাগরণ কেবল মানবতাবিরোধী অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তির নিশ্চয়তার পথ খুলেনি, এটা একাত্তরবিরোধীদের রাজনীতির সুযোগের বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে যা অসাম্প্রদায়িক একটা দেশের কথা বলছিল। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের বিরুদ্ধে বলেছে, জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি করার অধিকারের জায়গায় প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকেছে। এতে বিক্ষুব্ধ হয়েছে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি, পাকিস্তানি ভাবধারায় পরিচালিত রাজনৈতিক দলগুলো। জামায়াত-শিবির, বিএনপি, হেফাজতে ইসলামের আদর্শে টান দেওয়ায় তারা এই গণজাগরণের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নামে। এরপর ব্যাপক শো-ডাউনে দেশকে অচল করে দেওয়ার স্পর্ধা দেখায়। রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতের শো-ডাউন, সহিংসতায় প্রকাশ্যে-গোপনে সহায়তা করে বিএনপি-জামায়াত ও আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে থাকা সুযোগসন্ধানীর দল। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবির গণজাগরণের বিরুদ্ধে নামতে তারা আশ্রয় নেয় ধর্মের। গণজাগরণের সঙ্গে জড়িতদের ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে তারা প্রচার চালায়, হামলে পড়ে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জায়গার শহিদ মিনারে। গণজাগরণ রুখতে ধর্মের এই অপব্যবহারে বিভ্রান্ত হয় একাত্তর নিয়ে দোদুল্যমান জনগোষ্ঠী, তাদের অনেকেই গলা মেলায়।

তেরোর সেই সে গণজাগরণে একাত্তরের পর দেশ ফের জেগেছিল একাত্তরের চেতনায়, হয়েছিল ঐক্যবদ্ধও। সরকারও শুরুতে বাধা দেয়নি। তবে যে-ই না ধর্মের ব্যবহার হয়েছে তখন থেকেই সরকারের ভেতরে থাকা আদর্শিক চেতনার দোদুল্যমান গোষ্ঠীও বিভ্রান্ত হয়েছে। গণজাগরণ ইসলামবিরোধী, গণজাগরণে অংশ নেওয়া তরুণ-তরুণীরা ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত- এমন প্রচারণা জোরদার হওয়ায় শুরু আদর্শিক স্খলনের। এটা রুখে দেওয়া সম্ভব ছিল সরকার-দলের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ জনগোষ্ঠীর আধিক্য থাকলে। হতাশার কথা এই সংখ্যা খুব বেশি অবশিষ্ট নেই। ফলে গণজাগরণের রাজনৈতিক সুফল ভোগ করলেও গণজাগরণের আদর্শিক ফল ঘরে তুলতে আগ্রহ দেখায়নি সরকার। তারুণ্যের কাঁধে চড়ে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অংশগ্রহণহীন পরের নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েছে। তারুণ্য এখানে নির্বাচনী গণতন্ত্রকে মুখ্য না ভেবে একাত্তরের চেতনাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার বাসনায় হয়ে পড়েছিল নীরব দর্শক।

তবু কি গণজাগরণের দাবিগুলো পূরণ হলো? না, হয়নি। এখানে রাজনৈতিক যে প্রতারণার অধ্যায় সূচিত হলো তাতে অনুঘটক হয়েছে ‘বিকল্প কোথায়’ শীর্ষক সস্তা স্লোগান! এই ‘বিকল্প কোথায়’ সস্তা স্লোগান হলেও সত্যি কথা বলতে কী এটাও ছিল তখনকার বাস্তবতার একটা অংশও। কারণ সরকারবিরোধী প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি দলীয়ভাবে এই গণজাগরণের বিরোধিতা করেছিল। বিএনপি চেয়ারপারসন নিজেই গণজাগরণের আন্দোলনকারীদের ‘নষ্ট ছেলে-মেয়ে’ বলে কটূক্তি করেছিলেন। বিএনপির এই বিরোধিতা মূলত তাদের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলামির প্রতি অন্ধ পক্ষাবলম্বনের পাশাপাশি তাদের নিজেদের দলের একাধিক মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বাঁচাতে।

আওয়ামী লীগ তারুণ্যের এই আন্দোলনের চেতনাকে ধরে রাখতে চায়নি মূলত দলটির আদর্শিক রূপান্তরের কারণে। শহিদ জননী জাহানারা ইমামের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার অংশগ্রহণ ছিল, ছিল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতার অংশগ্রহণও। সে অংশগ্রহণ যতটা না ছিল রাজনৈতিক অভিলাষ পূরণের নিমিত্তে তারচেয়ে বেশি ছিল আদর্শিক। তেরোর গণজাগরণে আওয়ামী লীগের সমর্থনকে অস্বীকার করার উপায় নাই, কিন্তু এই সমর্থনের পাশাপাশি তারা এটাকে রাজনৈতিকভাবেই ক্যাশ করতে চেয়েছে, করেছেও। মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেও দলটি আদর্শিকভাবে কতটা ধারণ করে সেটা এখন প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ রাষ্ট্রধর্মের ধারণার নির্বাসন এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দলটি ওই পথে হাঁটছে না, এড়িয়ে যাচ্ছে। একাত্তরের গণহত্যার অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামির রাজনীতিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি। বরং এর জন্যে তারা আদালতের দোহাই দিচ্ছে। অথচ জামায়াতে ইসলামিকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নতুন কিছু নয়, এর আগেও বাংলাদেশে এমনকি পাকিস্তানেও নিষিদ্ধ হয়েছিল গণধিকৃত বিতর্কিত এই দল।

তেরোর গণজাগরণ সফল হয়েছিল, তবে সাফল্যের এই ধারাবাহিকতা আমরা ধরে রাখতে পারিনি; সরকারও ধরে রাখতে চায়নি। ফলে শীর্ষ কজন যুদ্ধাপরাধীর দণ্ড কার্যকরের পর গতি-মন্থরতায় ভুগছে এই বিচার প্রক্রিয়া। এখনও বেশ ক’জন যুদ্ধাপরাধীর আপিল উচ্চ আদালতে শুনানির অপেক্ষায়। গত পাঁচ-ছয় বছরে একজন যুদ্ধাপরাধীরও শাস্তি কার্যকর হয়নি। বিচারের অপেক্ষায় থাকা মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত অনেকের স্বাভাবিক মৃত্যুও হচ্ছে। গণজাগরণের সকল দাবির যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণ অনেক, তবে মূল কারণ নিজেদের স্বার্থে একটা সময়ে ব্যবহারের পর দাবির প্রতি ক্ষমতাসীনদের অনীহা। এছাড়া আছে আদর্শিক স্খলনের পথে অনেকের অনেক দূর হেঁটে যাওয়া হয়ে গেছে যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন। ধর্মকার্ড এখানে শক্তিমান হয়েছে যেখানে গণজাগরণকে সমর্থন দেওয়া মানে ধর্মবিরোধী হয়ে যাওয়ার অপপ্রচারে বিশ্বাস অনেকের। এছাড়া আছে সেই তারুণ্য যারা নিজেদের দাবি আদায় করেই ঘরে ফিরে গেছে, পুনর্বার মাঠে নামার তাগিদ অনুভব করছে না। তবে মাঠে নামার তাগাদা না থাকুক তবে সচেতনতা থাকার দরকার ছিল সেই সে তারুণ্যের। এখানে দলীয় বিভাজনের সংকীর্ণতা আছে, আছে হতাশাও। এর সুযোগ যারা নেওয়ার নিয়েছে, নিয়ে চলেছে।

তেরোর গণজাগরণের তারুণ্যের বড় অংশ এখনও স্বপ্ন দেখে একাত্তরের সেই চেতনার সফল বাস্তবায়নের। স্বপ্ন দেখে সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির, স্বপ্ন দেখে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দল জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের। তাদের নিজেদের গড়া ইতিহাস নিয়ে তারা গর্বিত। তাদের এই গর্ব ব্যক্তিগত অর্জনই থেকে যাচ্ছে সকল দাবির বাস্তবায়ন না হওয়ায়।

তেরোর গণজাগরণের এক দশক পূর্ণ হয়েছে আজ। এই দশ বছরে যুদ্ধাপরাধীমুক্ত ধর্মনিরপেক্ষ দেশ আর বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার আমাদের স্বপ্ন ‘ফিকে’ হতে যাওয়ার বাস্তবতা টের পাচ্ছি!

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

;

বাংলায় রায়: এখনও ‘প্রতীকী’ কেন হবে?



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনে বাংলা ভাষায় রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। ভাষা শহিদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে ভাষার মাসের শুরুর দিনে এই রায় ঘোষণা করেছেন বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলম সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। রায় ঘোষণার সময়ে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি নাইমা হায়দার বলেছেন, ‘আজ ১ ফেব্রুয়ারি। ভাষার মাস আজ থেকে শুরু। ভাষা শহিদদের আত্মার প্রতি সম্মান জানিয়ে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রতি সম্মান জানিয়ে আজকের প্রথম রায়টি বাংলায় ঘোষণা করছি।’

দেশের নিম্ন আদালতগুলোতে রায় ও আদেশ অধিকাংশ বাংলায় দেওয়া হলেও উচ্চ আদালতে প্রাধান্য পায় ইংরেজিই। আইনি প্রতিশব্দের বেশিরভাগই বাংলায় না থাকা এর অন্যতম কারণের পাশাপাশি আছে দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ব্যাপারও। তাই প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও উচ্চ আদালতে রায়ের প্রধান ভাষা বাংলা হতে পারেনি। কিংবা এই দিকটাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাই বাংলায় দেওয়া যেকোনো রায়কে এখনও প্রতীকী হিসেবে দেখতে হচ্ছে। আজকের এই রায়ও তাই। তবে উচ্চ আদালতে এটাই প্রথম বাংলায় দেওয়া রায় নয়, এরআগে অতিব গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো মামলার রায় বাংলায় দিয়েছেন বেশ ক’জন বিচারপতিরা।

ভাষার প্রচলন নিয়ে আইনও আছে দেশে। কিন্তু এই আইন সকল জায়গায় সমানভাবে কার্যকর কিনা এনিয়ে প্রশ্ন আছে। বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭-এর ‘প্রবর্তন ও কার্যকরী’ অংশের ৩(১) বলছে, “এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস, আদালত, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সাথে যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন আদালতের সওয়াল জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগত কার্যাবলী অবশ্যই বাংলায় লিখিতে হইবে.” এবং (২) “৩(১) উপ-ধারায় উল্লেখিত কোন কর্ম স্থলে যদি কোন ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন তাহা হইলে উহা বেআইনি ও অকার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে।”

আদালতসহ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের নির্দেশনা চেয়ে একটি রিটও হয়েছিল হাইকোর্টে। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আইনজীবী ইউনুস আলী আকন্দের সেই রিটের প্রেক্ষিতে রুল জারি করা হলেও এখনও ওই রুলের চূড়ান্ত শুনানি হয়নি। ফলে এনিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি উচ্চ আদালত থেকে। এদিকে, সংবিধান যখন বলছে প্রজাতন্ত্রের ভাষা হবে বাংলা, যখন বাংলা ভাষা প্রচলন নিয়ে একটা আইন আছে দেশে তখন কি উচ্চ আদালত এটাকে এড়িয়ে যেতে পারেন? এখানে বাংলায় আইনের প্রতিশব্দের সীমাবদ্ধতা নিয়ে কথা আসতে পারে, কথা আসতে পারে সংবিধান অনুযায়ী বিচারপতিরা স্বাধীন এই কথাও তবে উচ্চ আদালত নিশ্চয়ই সংবিধান ও দেশের আইনের বাইরে নয়।

বিচারপতিরা স্বাধীন, এই যুক্তিতে তারা সংবিধানে বর্ণিত রাষ্ট্রভাষার বাইরে থাকতে পারেন? এখানে রাষ্ট্রভাষা, সরকারের ভাষা বা নির্বাহী ভাষা, আদালতের ভাষা হিসেবে ভাষার প্রকারভেদ নিয়ে যে কথা সামনে আসে সেটা কতখানি যৌক্তিক? প্রশ্ন আমাদের।

বাংলাবান্ধব বিচারব্যবস্থা গড়তে সমস্যা কোথায়? রাষ্ট্রভাষা বাংলার দেশে ইংরেজিতে দেওয়া রায় কতজনইবা বুঝতে পারেন, ক’জন বিচারপ্রার্থী বুঝতে পারেন? অথচ আদালতের এই রায় বিচারপ্রার্থীদের জন্যেই। মানুষ আদালতে আসেন আইনি প্রতিকার পেতে। যারা আসছেন তাদের কাছে অবোধগম্য ভাষায় রায়-আদেশ দেওয়া হলে সেখান থেকে বিনাভোগান্তিতে কীভাবে তারা উপকৃত হবেন?

ইংরেজি ভাষার আন্তর্জাতিক উপযোগিতা রয়েছে। উচ্চ আদালতের অনেক রায় অনেক ক্ষেত্রে সীমান্ত ছাড়িয়ে দেশে-দেশে উদাহরণ হয়, এটাও স্বীকৃত। তবে বিচারপ্রার্থীদের কাছে কতখানি বোধগম্য এবং সেখান থেকে কতখানি উপকৃত হলো তারা সেটাও নিশ্চয়ই কম জরুরি নয়। বাংলাকে অগ্রাহ্য করে কিংবা কম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখে এখানে ভিন ভাষায় দেওয়া রায়গুলো বিচারপ্রার্থীর কাছে বোধগম্য হচ্ছে কিনা সেটাও দেখা কি জরুরি নয়?

ইংরেজিতে দেওয়া রায় দীর্ঘদিনের অনুশীলন। এটা যতখানি আন্তর্জাতিক রূপের তারচেয়ে বেশি ঔপনিবেশিক আমলের ধারা বলেই ধারণা। বেশিরভাগ আইন ও আইনের প্রতিশব্দ বাংলায় নেই এটা একটা কারণ হতে পারে, তবে এই ধারা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা উচিত বলে মনে করি। এনিয়ে যে কাজ হয়নি তাও না। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের সকল রায় বাংলায় রূপান্তরের জন্যে একটি সফটওয়্যার ব্যবহার শুরু হয়েছে। এরআগে ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আইন কমিশন বাংলা ভাষা প্রচলন আইন ১৯৮৭ বাস্তবায়নে কতিপয় সুপারিশমালা পেশ করেছে। কমিশন উচ্চ আদালতসহ সব আদালতের বিচারকার্যে বাংলাভাষা চালু করার সুবিধার্থে ইংরেজিতে রচিত বিদ্যমান আইনগুলো বাংলায় অনুবাদের সুপারিশ করে। এটা সম্ভবত বিবিধ কার্যাবলী শেষে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছে।

আজ ভাষা শহিদদের সম্মানের হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ বাংলায় যে রায় দিয়েছেন সেটাকে প্রতীকী হিসেবে এখনও দেখতে হচ্ছে আমাদের। অথচ এমনটা হওয়া উচিত হবে না। বাংলায়ই হোক সকল রায়। যে সকল বিচারপতি ইতোমধ্যে কিছু রায় বাংলায় দিয়েছেন তারা এ ক্ষেত্রে হতে পারেন অনুকরণীয়। বিবিধ সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলা ভাষাতেই রায় দেওয়া সম্ভব বলে তারা প্রমাণ করেছেন।

সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন কেবল সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন এবং গৎবাঁধা বয়ানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সত্যিকার অর্থে এর যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। “প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা হইবে বাংলা” যখন সংবিধান দিচ্ছে এ ঘোষণা তখন দেশের সকল আদালতও এর আওতায় আসতে হবে। আদালতকে এর বাইরে রাখা কিংবা রাখতে চেষ্টা করা সমীচীন হবে না!

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

;