বৃষ্টি শেষ তো ছাতাও শেষ!



মো. কামরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাসা থেকে বের হওয়ার পূর্বে বৃষ্টি শুরু হলে সবাই ছাতা নিয়ে বের হয়। বৃষ্টির ঝাপটা থেকে বাঁচার জন্য। কিন্তু বৃষ্টি শেষ হলেই ছাতার কথা বেমালুম ভুলে যায় সবাই। বৃষ্টির সময় অতি প্রয়োজনীয় ছাতাটি কখনো পাবলিক ট্রান্সপোর্টে ফেলে আসে কিংবা কর্মস্থলে অবহেলায় পড়ে থাকার নজির রয়েছে অসংখ্য।

তেমনি আমাদের সমাজে কোনো কোনো ঘটনার আবির্ভাব ঘটলেই সমাজ সংশোধনে নানা তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। অস্থির হয়ে উঠি সবাই। ক্ষণিক পরেই তা স্থিমিত হয়ে উঠে ছাতা ব্যবহারের মতো।

সমসাময়িক কিছু ঘটনার কথা চোখের সামনে ভেসে উঠে। আজ দেখুন ই-অরেঞ্জের সোহেল রানার কথাই। ইন্সপেক্টর সোহেল রানার কথা বলছি। এখন মিডিয়ায় সোহেল রানার শত কোটি টাকার গল্প শুনছি। শত কোটি তো শত কোটিই! সারা জীবন চাকরি করে একজন কত টাকা সঞ্চয় করতে পারে, বেশির ভাগ চাকরিজীবীদের সঞ্চয়ের খাতা শূন্যই থাকে। কিন্তু সোহেল রানার হয়তো আলাদীনের চেরাগ ছিলো না হলে এতো টাকা আসলো কিভাবে?

সারাজীবন শুনে এসেছি পুলিশের চাকরি মানেই বদলির চাকরি। আর এ বদলির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাদের পরিবারবর্গ। পুলিশের ছেলে মেয়েরা স্কুল-কলেজ পাশ করতে যেয়ে অনেক সময়ই তাদের দশ-বারোটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাবেক হয়ে যায়। পরপর দু’বছর এক স্কুলে পড়ারও সুযোগ হয়ে উঠে না অনেকের। অথচ সোহেল রানা ঢাকার প্রাণকেন্দ্র গুলশানে বছরের পর বছর কি করে এক থানায় পোস্টিং নিয়ে পড়ে ছিলেন। সত্যিই ভাবনার বিষয়। এই সময়ে আইজিপি, ডিএমপি কমিশনার, ডিসি গুলশান কিংবা থানার ওসিসহ কয়েকবার করে পরিবর্তন হয়েছে অথচ সোহেল রানা কি বহাল তবিয়তে নিজ স্থানে অনঢ় হয়ে আছেন? সত্যিই পুলিশের চাকরিতে অষ্টম আশ্চর্যের বিষয় এটি। ই-অরেঞ্জের ঘটনারও পরিসমাপ্তি ঘটবে আবার নতুন সোহেল রানাদের উৎপত্তি ঘটবে। বৃষ্টি ছাড়াও ছাতাকে স্মরণে রাখলে সমাজ সংশোধন হবে। কালিমামুক্ত হবে এ সমাজ।

২০১৮ সালের ২৯ জুলাই দুই বাস চালকের রেষারেষির জেরে ঢাকার শহীদ রমিজউদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত আর বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনায় তৎকালীন মন্ত্রী শাহজাহান খানের এক অনুষ্ঠানে একজন সাংবাদিকের একটি প্রশ্নে অভিব্যক্তি প্রকাশে ব্যত্যয় ঘটে, হাসোচ্ছ্বলে উত্তর দেন। তার পরের ইতিহাস আমরা সবাই জানি। সারাদেশ অনেকটা স্থবির হয়ে গিয়েছিলো। রাজপথসহ দেশের অলিগলি তথা সব জায়গায় স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের দখলে চলে গিয়েছিলো। ট্রাফিক সিস্টেম নিয়ে অনেক কথোপথন, চ্যানেলগুলোতে অনেক টকশো, পত্রিকায় অনেক কলাম আরও কত কিছু। কিছুদিন পর আমরা যেই তিমিরে থাকার কথা সেই তিমিরেই রয়ে গেলাম। একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মাঝে দীর্ঘ আট দিন সারাদেশে একটি অসহিষ্ঞু পরিবেশ বিরাজ করেছিলো। ঘটনার পরবর্তীতে দেখলাম পুরো ঘটনাটাই ছাতা হারানোর মতোই ছিলো।

পুরাতন ঢাকার নিমতলিতে কয়েক বছর পূর্বে কেমিকেল গোডাউনের অগ্নিকাণ্ডে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ দেশের আদালত পাড়াও ছিলো সরব। পুরোনো ঢাকায় কোনো কেমিকেলের গোডাউন থাকতে পারবে না। কোনো আবাসিক ভবনে কোনো শিল্পকারখানা গড়ে উঠতে পারবে না। এসব সিদ্ধান্তগুলো তো সাধুবাদ পাবার কথা কিন্তু বাস্তবে আমরা কি দেখতে পাচ্ছি?

কোনো ঘটনা ঘটার পর মানুষের মাঝে যেন বিষবাষ্প না ছড়িয়ে পড়তে পারে সে জন্যই হয়তো এই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কিছুদিন পর নতুন কোনো ঘটনার জন্ম হলে পুরাতন ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু এটাও ছাতার ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে সমাজ সংসারে। আসুন না শিশুদের মতো বুঝ না দিয়ে সহজ সরল জনগণকে প্রতিশ্রুতি দেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই সঠিক সমাজ পরিবর্তনে।

স্বাস্থ্যখাতে করোনা মহামারির মধ্যে নানারকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে দেখেছি সংবাদ মাধ্যমের কল্যাণে। আবিষ্কৃত হতে দেখেছি ডা. সাবরিনা, শাহেদদের মতো চরিত্র। চরিত্র স্খলন হতে দেখেছি, টিকা না দিয়ে খালি সিরিঞ্জ পুশ করতে দেখেছি, কত না অন্যায় অনাচার হতে দেখছি। আসুন না, নিজে বদলাই, বদলাই সমাজকে।

মাদক উৎসব চলে চতুর্দিকে। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে দেখেই চলেছি নানা রকমের মাদকের আনাগোনা। খারাপ লাগে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা যখন মাদক সেবন কিংবা মাদক ব্যবসার সাথে জড়িয়ে যায়। তখন মনে হয় গুনে ধরা সমাজের কে করবে পরিবর্তন। নীতিনির্ধারকদের প্রতিটি বক্তব্যে দেখতে পাই সন্ত্রাস, মাদক আর দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্সের কথা বলা হয়। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও একই মনোভাব দেখতে পাই। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? আসুন না কথার মধ্যে না থেকে বাস্তবে এর ফলভোগ করি সবাই।

যখন সমাজ সংশোধনে মাঝে মাঝেই শুদ্ধি অভিযান চলে, তখন নানারকম অব্যবস্থাপনা দেখতে পাই। অভিযান শেষ তো পরিবর্তনের আশাও শেষ। এইভাবে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়। শুদ্ধ হতে হবে সমাজের প্রতিটি পরতে পরতে। ছাতাকে স্মরণে রাখতে হবে যেকোনো সময় বৃষ্টি আসতে পারে, প্রয়োজন হতে পারে মহামূল্যবান ছাতারও।

লেখক, মো. কামরুল ইসলাম সভাপতি সাস্ট ক্লাব লিমিটেড