বন্ধুরে তোর পিরিতে লাশ হইয়া ভাসিলাম নদীতে

এরশাদুল আলম প্রিন্স
এরশাদুল আলম প্রিন্স

এরশাদুল আলম প্রিন্স

  • Font increase
  • Font Decrease

জমি বিক্রি করে, ধার-কর্জ করে অনেক আশায় পাড়ি জমায় বিদেশে। কোনো পুঁজি নেই। শ্রমই তাদের একমাত্র পুঁজি। সেই পুঁজি খাটিয়ে বিদেশ থেকে নিজের পরিবারের জন্য টাকা-পয়সা পাঠায় আমাদের প্রবাসী শ্রমিক ভাই-বোনেরা। সেই ধনেই আমরা পোদ্দারি করি। শুধু প্রবাসী শ্রমিক কেন, দেশের কৃষক, মুটে-মজুর, ধোপা, রোজগেরে গিন্নিসহ আপামর জনগণের রয়েছে এই ধনে হিস্যা।

কিন্তু এদেশের কৃষকের জন্য কিষাণী অপেক্ষা করে, দিনমজুরের আছে মহাজন, রোজগেরে গিন্নির আছে গৃহস্বামী। কিন্তু এদেশের প্রবাসী শ্রমিকের কোথাও কেউ নেই! দেশের সব ওয়ারিশ হারিয়ে তারা বিদেশে যায়, তাদের অনেকেই ফেরে বেওয়ারিশ হয়ে।

আমরা উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার ঠিক আগে আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে এক-দেড় জন উপার্জন করতো, ছয়-সাত জন খেতো। অস্বীকার করা উপায় নেই যে আমাদের সেই মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো আজ পয়সার মুখ দেখছে। সংসারে রোজগেরে মানুষ বেড়েছে। সংসারও ছোটো হয়েছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে-মেয়েরা এখন আইফোন ব্যবহার করে।

কিন্তু এর বাইরেও সমাজের আরেকটি চিত্র আছে, আছে কিছু মানুষ। উন্নয়নের মহাসড়কের পাশে তাদের ঠাঁই নেই। অন্ধগলির শেষ প্রান্তে তাদের বসতবাড়ি, তাই সমাজে তারা একেবারেই অদৃশ্য-অর্থনীতির ভাষার যাকে বলে মার্জিনালাইজড।

সমাজের এই শ্রেণিটির সংগ্রাম আজও চলছে। তাদের শিক্ষা নেই, নেই অর্থ, চাকরি, রোজগার। এই সমাজের পুরুষের পাশাপাশি তাই নারীরাও আজ সাগর-নদী সাঁতরে বিদেশের পথে পাড়ি জমায়। অনেকে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। গহীন সাগরে নৌকা ডুবিতে সলিল সমাধি বরণ করতে হয় অনেককে।

মনে পড়ে একটি গানের কথা-'বন্ধুরে তোর পিরিতে লাশ হইয়া ভাসিলাম নদীতে/আমি মান, কূল-মান সব হারাইলাম ও তবু আইলানা মোর বাড়িতে/লাশ হইয়া ভাসিলাম নদীতে।' এভাবে যারা যায় তারা সব কিছু চিরদিনের জন্য পেছনে ফেলে যায়। যদি কখনো ফিরে আসে, জীবন্ত বা লাশ হয়ে-মান, কূল-মান সব হারিয়েই আসে। বড় কঠিন সে ফেরা। তবু জীবনের জন্য এই ভালোবাসা।

অনেক আশা নিয়ে আমাদের এই প্রান্তিক নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা বিদেশে যায়। সবার যাওয়ার কাহিনীটি কমবেশি একই রকম। ধার-কর্জ করে, জমি বিক্রি করে বিদেশে যায়। তাদের একমাত্র পুঁজি কায়িক শ্রম। কিন্তু তাদের ফিরে আসার গল্পের শেষটা কিন্তু ভিন্ন। সবাই ফেরে না, কেউ কেউ ফেরে। ফেরে নিথর চোখে, নিথর দেহে, কফিনবন্দী হয়ে। তবু ভালোবাসার টানে তারা বিদেশে পাড়ি জমায়। এ ভালোবাসা জীবনের জন্য, পরিবারের জন্য।

সম্প্রতি প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদচিত্র মোটামুটি এরকমই। যায় মানুষ, আসে লাশ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে দিনে আসছে গড়ে ১১টি কফিন। গত আট মাসে এসেছে ২ হাজার ৬১১টি কফিন। হায়রে জীবন! একটু বেঁচে থাকার জন্য, একটু নতুন স্বপ্ন দেখার জন্য সহায়-সম্বল বিক্রি করে যে জীবন্ত মানুষগুলো বিদেশে যায়, তারা ফিরে আসে লাশ হয়ে। এ কেমন ফিরে আসা।

এসব প্রবাসী শ্রমিকের অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজ করে। সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইনসহ বেশ কিছু দেশে প্রবাসী শ্রমিকদের বড় একটি অংশ কাজ করে। এছাড়া ইতালি ও মালয়েশিয়ায় আছে অনেক শ্রমিক। এসব দেশ এক সময় আমাদের দেশ থেকে শ্রমিক নিতো তাদের নিজের প্রয়োজনেই। কিন্তু আজ সে দরজা প্রায় রুদ্ধ। এখন 'চোখ পল্টি' দিয়েছে। এখন চিপাচাপা দিয়ে যে ক'জন ঢুকতে পারে তাই বেশি। ফলে আমাদের দেশ থেকেও বৈধ পথের পাশাপাশি অবৈধ পথেও শ্রমিক যায়। তবে এজন্য যে কেবল ওই সব দেশের কঠিন প্রবাসী শ্রমিক নিয়োগ নীতিই দায়ী তা নয়, বরং আমাদের দেশীয় দালালচক্র বা মানবপাচারকারীরাও কম দায়ী নয়; অফিসিয়াল ভাষায় আমরা যাদেরকে আদম ব্যবসায়ী বলি। কিন্তু অবৈধ আদম ব্যবসার জন্য শুধু মানবপাচারকারীদের এককভাবে দায়ী করলে সামগ্রিক সত্যকে অস্বীকার করা হবে। এর সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি চক্র। শ্রমিক পাচারের এ অবৈধ পথ বন্ধ করার দায়িত্বটি সরকারের। কিন্তু এ চক্রভেদ সহজ কিছু নয়।

আসলে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়েছে। ধীরে ধীরে তা আরও প্রকট হয়ে উঠছে। নিজ দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে কমবেশি সব দেশই আজ চিন্তিত। আমেরিকাকে বলা হয় অভিবাসীদের দেশ। সেই আমেরিকা আজ কট্টর অভিবাসন বিরোধী। ইউরোপের একই মনোভাব। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তার ছাপ এখন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আছড়ে পড়েছে। কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, দুবাইয়ের দরজা প্রায় বন্ধ হয়ে যায় যায়। আমাদের শ্রমিকদের অন্যতম গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। বর্তমানে সে পথও কঠিন হয়ে উঠছে। মালয়েশিয়া থেকেও শ্রমিকরা ফিরতে শুরু করেছে। এদিকে নতুন কোনো গন্তব্যও আমাদের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার আশু কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় সৌদি আরব ও মালয়েশিয়া থেকে শ্রমিক প্রত্যাবর্তন আমাদের জন্য একটি অশনি সংকেতই বটে।

দেশের ওই মার্জিনালাইজড বা প্রান্তিক পরিবারের একজন সন্তান ৩-৪ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে পাড়ি জমায়। বিদেশে কোনোমতে খেয়ে-পরে দিন কাটায়। নিজের খরচ বাদ দিয়ে যদি কিছু থাকে তা দেশে পাঠায়। প্রথমে বিদেশে আসার জন্য যে ঋণ করে তা শোধ করে। কিন্তু দেখা যায়, নিজের খরচ সামলে ঋণ শোধ করতে কারো কারো কমপক্ষে তিন-চার বছরও লেগে যায়।

ওইসব দেশে শুধু থাকা-খাওয়ার খরচই নয়, ওয়ার্ক পারমিট বা আকামার খরচও দিন দিনে বেড়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো আকামার খরচ ২-৩ লাখ টাকা। ফলে, ২-৩ লাখ টাকা আকামা খরচ ও সেই সঙ্গে নিজের খরচ চালানোর মতো রোজগার অনেকেই করতে পারে না। আকামার খরচ ও নিজের চলার খরচ মিলে প্রতি শ্রমিককে কমপক্ষে মাসে বাংলাদেশি টাকায় ৩০ হাজার টাকা রোজগার করতে হয়। কিন্তু এই পরিমাণ রোজগার খুব কম শ্রমিকই করতে পারে। ফলে তারা খেয়ে-না খেয়ে কষ্ট করে কোনোমতে দিন কাটায়। এক রুমে কোনোমতে পিঠ লাগিয়ে অন্ধকারগুলো পার করে। এপাশ ওপাশ হওয়ার সুযোগও অনেকে পায় না। তার ওপর আছে ধরপাকড়।

বর্তমানে সৌদি আরবে ব্যাপক ধরপাকড় হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। রাস্তায়, গাড়িতে, কারখানায়, বাসা বাড়িতে - সব জায়গায় পুলিশ তল্লাশি করছে। ধরপাকড়ের ভয়ে অনেক শ্রমিক পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কাগজপত্রে কোনো অসংগতি থাকলে তো বটেটি, অসঙ্গতি না থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই ধরে নিজ দেশে (বাংলাদেশে) ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। অনেক ঝুঁকি নিয়েই এর ফাঁকে ফাঁকে তারা কাজ করে। ফিরে আসা অনেক শ্রমিকেরই দাবি, তাদের বৈধ কাগজপত্র ও আকামা থাকার পরও পুলিশ তাদের ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। অনেক শ্রমিকই শূন্য হাতে দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন।

খবরে প্রকাশ, গত ১০ মাসে সৌদি আরব থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন প্রায় ১৮ হাজার কর্মী। তার মানে, মাসে ১৮০০ আর দিনে ৬০ জন শ্রমিক সৌদি থেকে দেশে ফিরছেন। এর আগে ২০১৭ সালে ফিরেছেন ১৬ হাজার ও ২০১৮ সালে ফিরেছেন ২৪ হাজার কর্মী।

শুধু বাংলাদেশই নয়, সৌদি আরব তাদের দেশে অবস্থানরত অন্যান্য দেশের শ্রমিকদেরও ফেরত পাঠাচ্ছে। ২০১৭ সাল থেকে মূলত তারা এই কাজে হাত দিয়েছে।

বলছিলাম লাশ হয়ে ফিরে আসাদের কথা। মূলত নির্যাতন ও দাসত্বই এর মূল কারণ। দাসত্ব ও নির্যাতনের শিকার অধিকাংশই আমাদের দেশের নারী শ্রমিক। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আমরা বিগত কয়েক বছর ধরেই নারী শ্রমিক পাঠাচ্ছি। লাশ হয়ে ফিরে আসাদের বেশির ভাগই নারী-কারো মা, বোন, স্ত্রী।

গণমাধ্যম বলছে, গত তিন বছরে নারী শ্রমিকের লাশ এসেছে প্রায় সাড়ে তিনশ'। এদের মধ্যে আবার ৫৩ জনই আত্মহত্যা করেছে বলে দাবি করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কেন এই আত্মহত্যা? এর জবাব অজানা নয়। নির্যাতন ও দাসত্বের কাছে পরাজিত হয়ে শেষমেশ জীবন থেকে বিদায় নেয় ওইসব মা-বোনেরা। অথবা হতে পারে, তাদেরকে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা- হোক হত্যা বা আত্মহত্যা-এসব দেখার কেউ নেই। অবস্থাদৃষ্টে প্রশ্ন জাগে- সর্বহারা ওইসব প্রবাসী শ্রমিক ভাই-বোনদের কি সত্যিই কোথাও কেউ নেই?

গহীন সাগর পাড়ি দিয়ে জীবন নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো অথবা অত্যাচার-নির্যাতন-দাসত্বের অনল-সাগর পেরিয়ে জীবন নিয়ে ফিরে আসা দুটোই আজ কঠিন। এ কঠিনেরে ভালোবেসে যারা বিদেশে যায় তাদের জন্য আমাদের কি কিছুই করার নেই?

আপনার মতামত লিখুন :