শ্রমিকদের ডেকে আনা যেন সাভারের ঘটনার পুনরাবৃত্তি

গওহার নঈম ওয়ারা
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

মৃত্যুর সঙ্গে কোলাকুলি আর শত্রুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তেই কি পায়ে হেঁটে, নৌকায় পদ্মা পাড়ি দিয়ে ঢাকায় ছুটে আসছে পোশাক শিল্পীরা? ২০১৩’র ২৪শে এপ্রিল যেমন পড়িমরি করে এসেছিল সাভার বাস স্ট্যান্ডের ভয়ংকর রানা প্লাজায়। তাদের রুটি রুজির জায়গায়।

পুরা দেশটা যখন ভাইরাসের ভয়ে ফাটলে ফাটলে জেরবার অন্য এক রানা প্লাজায় পরিণত হয়েছে, ভয়ংকর কোনো কিছু না ঘটার তদবিরে সবাই যখন ব্যস্ত, কেউ কেউ তকদিরের ওপর সব কিছু ছেড়ে দিতে চাচ্ছে,  সারা বিশ্ব যখন ইয়া নফসি ইয়া নফসি বলে কাঁদছে  তখন কোন স্পর্ধায় গার্মেন্টস মালিকরা ডেকে পাঠায় অভুক্ত শ্রমিকদের। ‘আসলে পাবা না আসলে লবডঙ্গা’।

২০১৩ এর এপ্রিলের সঙ্গে ২০২০ এপ্রিলের যেন কোনো ফারাক নেই। তফাত শুধু  ক্যানভাসের সাইজে, জমিনের মাপে। সাভার এখন সারাদেশ, আর নগর ঢাকা যেন রানা প্লাজা। সেও এক এপ্রিল মাসের (২০১৩) কথা। সেবার ফাটল ধরেছিল সাভারের এক দালানে। দালানের ফাটলগুলো এতোই স্পষ্ট আর ভয়ংকর ছিল যে সেই দালানে থাকা পোশাক কারখানার ভীত সন্ত্রস্ত শ্রমিকরা ২২ এপ্রিল কারখানা আপাতত বন্ধ রাখার জন্য মালিকদের অনুরোধ উপরোধ করতে থাকেন। ফাটলের সচিত্র প্রতিবেদন টেলিভিশনে দেখানো হয়। আসন্ন বিপদের শঙ্কায় এই ভবনে থাকা একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখা সরিয়ে নেয়া হয়। সংবাদ মাধ্যমের চাপে ইউএনওসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভবনটি আগের দিন পরিদর্শনও করেন।তারপর বিজিএমইএ প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে কারখানা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। বলা হয়, বুয়েটের প্রকৌশলীরা পরীক্ষা করে বলবেন, এই ভবনটি চালু রাখা কি যাবে না। এসবই ছিল লোক দেখানো মিডিয়াকে শান্ত করার চেষ্টা মাত্র। দালানটি ধসে যাওয়ার চরম ঝুঁকিতে থাকলে একদিন পরেই ২৩ এপ্রিল দালান মালিকও পোশাক কারখানার মালিকরা এক হয়ে ঠিক করেন চালু হবে কারখানা। সেই সভায় প্রশাসনের প্রতিনিধি হিসেবে ইউএনও সাহেবও উপস্থিত ছিলেন। শ্রমিকদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়া হয় ‘ফ্যাক্টরি চলবে’।বলা হয় ‘যারা কাজে আসবে না, তাদের বেতন  দেয়া হবে না। যারা কাজে আসবে তাদের বেতন দেয়া হবে।’ কেউ কেউ প্রতিবাদের চেষ্টা করলে তাদের গায়ে হাত তোলার ঘটনাও ঘটে। ২৪ এপ্রিল ২০১৩ সকাল ৮:৪৫মিঃ দালানটি ধসে পড়ে। বাংলাদেশের নাম লেখা হয় বিশ্বের ইতিহাসে ৩য় বৃহত্তম শিল্প দুর্ঘটনার দেশ হিসেবে। ঘটনায় এক হাজার ১৭৫ জন শ্রমিক নিহত এবং দুই হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হন। নিখোঁজ থেকে যান কয়েকশ মানুষ শ্রমিক উদ্ধারকর্মী।

গার্মেন্টস মালিকদের সেই জবরদস্তির কোনো বিচার হয়নি। বিষয়টি কেউ আমলেই নেয়নি। আইএলও, ইউএনডিপি কিংবা ক্রেতাদের সংগঠন অথবা ‘একরড’ সবাই চুপ থেকেছে গার্মেন্টস গভারনেন্স বিষয়ে। তারা সংস্কারের নামে মন দিয়েছে হার্ডওয়ারে। শক্ত পোক্ত কাঠামোর দালান, সিমেন্ট বালু মিশ্রণের অনুপাত, রডের ঘের, আগুন নেভানোর যন্ত্রপাতি, দ্বিতীয় সিঁড়ির মজবুতি ইত্যাদি নিয়েই অঙ্ক কষেছেন। নিয়মের লাঠি ছড়ি ঘুরিয়ে শ্রমিকদের নিরাপত্তার দড়িকে শক্ত করার সেটাই একমাত্র উপায় বলে তাঁরা বিশ্বাস করেছে সবাই।উৎপাদন ব্যবস্থার প্রাণশক্তি শ্রমিকদের আসল নিরাপত্তা যে নির্ভর করে মালিকদের খাসলতের ওপর সেটা কারো মনেই আসেনি। মালিক আর ব্যবস্থাপকদের খাসলত পরিবর্তনের কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। বলেননি ন্যায্য ব্যবস্থাপনার কথা ন্যায্য গভারনেন্সের কথা। পরিবর্তে রাষ্ট্র প্রণোদনার নামে নানা উপঢৌকন দিয়ে মালিকপক্ষের লোকদের তোয়াজ করেছে। মালিকরা মেয়র মন্ত্রী এমপি হয়েছেন। সেদিন যেটা সাভারের একটা দালানে ঘটেছিলো আজ সেটা সারা দেশে ঘটার ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে পোশাক মালিকরা। এক হাঁকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ছিনিয়ে নেয়ার পরেও তাদের একটু তর সইলো না। জীবিকার লোভ দেখিয়ে জীবন কেড়ে নেয়ার এ কোন খেলায় তারা মত্ত?

এই এপ্রিলে (২০২০) দেশের সারা শরীরে যখন ভাইরাসের ফাটল। মানুষকে যার যার ডেরায় রাখাটাই যখন ভাইরাস প্রতিরোধের একমাত্র উপায় তখন কেন এই নষ্টামি? বিজিএমইএ দায় নেবে না। সমালোচনার মুখে সংগঠনের সভাপতি রুবানা হক গত শনিবার রাতেই চোখ উল্টিয়ে সাংবাদিকদের জানিয়ে দিয়েছেন,  কারখানা খোলা কিংবা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত দেওয়ার মালিক তার সংগঠন নয়। ঠিক একই কথা বিজিএমইএ’র নেতারা বলেছিলেন ২০১৩ সালে সাভার গণশ্রমিক হত্যার পর। গলার স্বর উঁচিয়ে বলেছেন সভাপতি, আমি শ্রমিকদের ওপর কোনো অত্যাচার-অবিচার করিনি, আমার ওপর এর দায় চাপাবেন না।

ফরাসি বিপ্লবের দিনে সম্রাট লুইয়ের স্ত্রী কি এমন কথাই বলেছিলেন অন্য ভাষায়? গুগল বলতে পারবে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হেঁটে আসা মানুষদের পরিচয় নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে সংশয় প্রকাশ করেছেন। বলেছেন ‘সবাই কি পোশাক শ্রমিক’? এরপর গা ঝারা দিয়ে বলেছেন ‘অভিযোগের আঙ্গুল তোলা বন্ধ করে সমস্যার সমাধানের পথ বের করতে হবে।’ এসবই গা বাঁচানো কথা। দেশের সার্বিক নিরাপত্তাকে প্রচণ্ড হুমকি মধ্যে ফেলে দিয়ে পোশাক কারখানার মালিকরা যে অন্যায় করেছেন তা নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না, আঙ্গুল তোলা যাবে না, সেরকম কথা বলার স্পর্ধা বোধকরি কোনো হানাদার বাহিনীর কমান্ডারেরও থাকতে নেই।

এখন উপায় কী

বর্তমানের অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে যখন প্রতিটা পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে বৈশ্বিক পরিকল্পনার সঙ্গে তাল রেখে অনেক বুঝে সুঝে চিন্তা ভাবনা করে, সেখানে যে কোনো হটকারী সিদ্ধান্তই আত্মঘাতী হতে পারে।

হাজার হাজার শ্রমিকদের এই যাতায়াত চলমান পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা। করোনাভাইরাস ঠেকাতে সরকারের নেয়া উদ্যোগের সঙ্গে বিজিএমই এর হুট করে নেয়া সিদ্ধান্ত একান্তই সাংঘর্ষিক। এখন আবার বলা হচ্ছে দরজা বন্ধ। যেকোনো মহামারীকে যুদ্ধের মতো চিন্তা করতে হবে।এ ধরনের পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্তহীনতা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলবে। মনে রাখতে হবে মহামারী  বিশেষ করে বিশ্ব মহামারি কোনো দরকষাকষির বিষয় নয়, এটা বিশ্ব জনস্বাস্থ্যের বিষয়। তাই যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মহামারি নিয়ন্ত্রণের কাজে নিয়োজিত কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলতে হবে, তাদের অনুমতি নিতে হবে। এখন বিজিএমইএ কেন অন্য কেউই এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সাবেক ছাত্রনেতা ড. মুশতাক হোসেন, সদ্য সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (আইইডিসিআর) যিনি এখন সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন। তিনি টেলিভিশনে দেয়া এক বক্তব্যে বলেছেন “বিজিএমইএর ভুল সিদ্ধান্তের দায় তাদেরই নিতে হবে।এখন যদি তাদের আবার বাড়ি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয় তবে তাহলে তারা যেন পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রেখে যেতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। আর যদি তারা ঢাকায় থাকে তাহলে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে।

শ্রমিকরা বাড়ি যাওয়ার সময় একবার একটা ঝুঁকি তৈরি করেছে। এখন আসার পথে আরেকবার ঝুঁকি তৈরি করেছে। এখন তারা যদি আবার গ্রামে যায়, আবার ফিরে আসে তাহলে সংক্রমণের ঝুঁকি তো আরও বেশি বেড়ে যাবে। মোদ্দা কথা দেশটাকে বিজিএমইএ সর্বনাশের মহাসড়কে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই প্রসঙ্গে আমার এক বন্ধু পোশাক শ্রমিকদের এই হয়রানি আর আমদের আসন্ন বিপদকে ব্যাখ্যা করছেন এরকম- লঞ্চে, ফেরিঘাটে ঝালমুড়ি বানাতে দেখেছেন? একটা কৌটার মধ্যে মুড়ি রেখে তাতে চামচে করে অল্প অল্প মরিচ গুঁড়া, হলুদ গুঁড়া, মসলা গুঁড়া, সরিষার তেল ইত্যাদি দিয়ে উপরে আরেকটা কৌটা রেখে ইচ্ছেমতো হাতের তালুতে বাড়ি দিয়ে ঝাঁকানো হয়; যাতে করে ঐ অল্প তেল মশলা কৌটার সবগুলো মুড়ির গায়ে লেগে যায়। গার্মেন্টস একবার বন্ধ করে, আবার খুলে, আবার বন্ধ করে ঝাঁকা-ঝাঁকি করা হচ্ছে আসলে করোনাভাইরাসকে দেশের আনাচে-কানাচে সকল মানুষের গায়ে লাগিয়ে দেয়ার জন্য। ঝালমুড়ি মাখানে ওয়ালাদের বিচার না হলে সাভার খুনের শহীদরা শান্তি পাবে না।

গওহার নঈম ওয়ারা: লেখক, গবেষক

আপনার মতামত লিখুন :