করোনাক্রান্তি: কোন পথে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক?



ড. মো. কামাল উদ্দিন
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

একাডেমিক ডিসিপ্লিন হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্ম প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে হলেও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ধারণাটি প্রাচীন সোফিস্টদের থেকে পাওয়া যায়। এ ধারণার প্রাণপুরুষ থুসিডাইডিস। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জনক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন এইচ জে মর্গান্থ। যদিও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে রাজনীতি থেকে আলাদা করা খুবই কঠিন, তবুও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধি বৃদ্ধির কারণে একটি স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রায়োগিকতা ন্যায্য হয়ে পড়েছে।

বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি এক মারাত্মক সংকটকাল অতিক্রম করছে।

আর এই সংকট কোনো বিশ্বযুদ্ধকে নিয়ে নয়। পুরো পৃথিবী একযোগে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। আর এ যুদ্ধে করোনাভাইরাস জয়ী হচ্ছে, রাষ্ট্রগুলো হেরে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্ব এখানে নিরুপায়। পৃথিবীর প্রত্যেক দেশে এ মহামারির সরব উপস্থিতি।

করোনাভাইরাসের কোনো সার্বভৌম সীমারেখা নেই। ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কোনো সীমারেখাই করোনাভাইরাস মানে না। তাই এর বিচরণ সর্বত্র এবং এর ভয়াবহতা প্রখর। এ পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী দেশ আমেরিকাতে সবচেয়ে বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে এবং আক্রান্ত হয়েছে। তেমন পিছিয়ে নেই ইউরোপের উন্নত দেশগুলোও।

আর এই মহামারি করোনাভাইরাস আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কীভাবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখবে? পৃথিবী যেখানে ছিল একটি পারস্পরিক সম্পর্কের নাম, সেই জায়গা থেকে আজকের পৃথিবীর ভেতরে নতুন এক আইসোলেশন তৈরি হয়েছে। আর এই বিচ্ছিন্নতা রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের, সমাজের সাথে সমাজের, ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির।

রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একজন ছাত্র হিসেবে আমাদের আলোচনা হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বর্তমান তত্ত্ব ব্যবহার করে কীভাবে বর্তমান সংকট বিশ্লেষণ করা যায় ।

প্রথমে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি একটু ব্যাখ্যা করা‌ যাক। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বৈদেশিক নীতি সম্পর্কে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি COVID-19 এর প্রাদুর্ভাবের মত মহামারি সম্পর্কিত বিষয়ে খুব বেশি মনোযোগ দিতে পারবে কিনা বা বাস্তববাদী চিন্তার আলোকে এ সমস্যার সমাধান করতে পারবে কিনা তা আমাদের সন্দিহান করে তুলেছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের 'বাস্তববাদ' মতবাদে মূলত বিশ্বশক্তিগুলো তাদের নিজস্ব সুবিধার জন্য প্রতিযোগিতা করে। শক্তির লড়াইয়ে যুদ্ধকে কাজে লাগায়। শক্তি প্রদর্শন ও প্রয়োগ করে রাষ্ট্রগুলোকে টিকে থাকার পরামর্শ দিয়ে থাকে। তাই 'বাস্তববাদ' ভাইরাল সংক্রমণ, মহামারি, জনস্বাস্থ্যের সর্বোত্তম অনুশীলনগুলো সম্পর্কে খুব কমই চিন্তা করে। বাস্তববাদ গতানুগতিক নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দেয়। মানবিক নিরাপত্তা ও মানুষ কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে না। কিন্তু এটিও সত্য এবং স্পষ্ট যে করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট জটিলতা নিরসন করার জন্য রাষ্ট্রই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং রাষ্ট্রই মৌলিক অভিনেতার ভূমিকা পালন করে।

আর উদারবাদীরা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা দিন দিন কমে যাচ্ছে বলে দাবি করে। তারা মনে করে এক সময় রাষ্ট্রের ভূমিকা এত কমে যাবে যে আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি, বেসরকারি সংস্থা, বহুজাতিক কর্পোরেশন এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনের যেসকল বিধি-বিধান সেগুলোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালিত হবে। কিন্তু করোনাভাইরাস নির্মূলের ক্ষেত্রে বা বর্তমান সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে সে দাবি অনেকটা অকার্যকর। আন্তর্জাতিক সংগঠন ও অন্যান্য নিয়ম-নীতিগুলো COVID-19 নির্মূলের ক্ষেত্রে তেমন ভূমিকা পালন করতে পারছে না। যতটুকু ভূমিকা পালন করছে রাষ্ট্রই। এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ,পথ খুঁজে বেড়ানো কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করা যায় সবই করছে মৌলিকভাবে রাষ্ট্র।

রাষ্ট্রের কাঠামোকে সংস্কারের কথা বলে কাঠামোগত বাস্তববাদীরা। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বিভিন্ন সরকার ব্যবস্থার ক্ষমতা ও দুর্বলতা প্রকাশ করে। সাধারণত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বহু পণ্ডিতগণ দাবি করতেন যে কর্তৃত্ববাদী সরকার বা শাসকরা দুর্ভিক্ষ মহামারি বা অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবেলা করতে পারে না বরং তারা তথ্য গোপন করার চেষ্টায় থাকেন। গণতন্ত্রপন্থী ও উদার রাজনৈতিক চিন্তাধারার সরকারব্যবস্থা এক্ষেত্রে সফল।

কিন্তু তাদের এ ধারণাও এক্ষেত্রে অকার্যকর। এখনো পর্যন্ত গণতান্ত্রিক সরকার করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নির্মূল করতে প্রায় ব্যর্থ। পশ্চিমা সকল গণতান্ত্রিক দেশ এবং উত্তর আমেরিকার গণতান্ত্রিক দেশগুলো পরিপূর্ণভাবে আজকে দিশেহারা কীভাবে করোনাভাইরাসকে নির্মূল করবে। যদিও চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত ইনফরমেশন গোপন করার। কিন্তু এ অভিযোগ অনেক গণতান্ত্রিক দেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে এও সত্য যে গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে তথ্যের অবাধ প্রবাহ, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং মানুষের কাছে সঠিক তথ্য উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে চীনের তুলনায় সুযোগ অনেক বেশি।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও করোনাভাইরাসের ফলে আমাদের পারস্পরিক সহযোগিতার সুস্পষ্ট প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও এই ইস্যুতে কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অর্জন সহজ নয়। এ মহামারির সুদূরপ্রসারী পরিণতি আমরা কেবল আজ কল্পনা করতেই শুরু করতে পারি মাত্র। এটি অনেক ক্ষেত্রে নিশ্চিত যে এ মহামারি যেমন জীবনকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে, বাজারকে ব্যাহত করেছে এবং সরকারের যোগ্যতাও উন্মোচিত করেছে। ফলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির পরিবর্তন হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিকরা আবার চিন্তা করতে শুরু করেছেন যে এই মহামারি রাষ্ট্রকে আরও বেশি শক্তিশালী করবে। জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করবে। সব ধরনের সরকারগুলো সংকট পরিচালনার জন্য জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আবার অনেকে দাবি করছেন যে এই ধরনের মহামারি পূর্বে ক্ষমতা পরিবর্তন বা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি তবে অন্য কোনো মহামারি থেকে COVID-19 একেবারে আলাদা। COVID-19 এমন একটি বিশ্ব তৈরি করেছে যা সবচেয়ে কম উন্মুক্ত, কম সমৃদ্ধ! এমন একটি ভাইরাস যা অপর্যাপ্ত পরিকল্পনা এবং অযোগ্য নেতৃত্বের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে মানবতাকে সুনিশ্চিতভাবে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলেছে।

কিন্তু এর শেষ কোথায়? আমরা যদি ইতিহাস বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখা যাবে যে অ্যাথেনিয়ান বা তথাকথিত থুসিডিডিয়ান প্লেগ (৪৩০ বিসি) থেকে ইবোলা মহামারি (২০১৪-২০১৫) পর্যন্ত সব মহামারি একদিন শেষ হয়েছিল। বর্তমান করোনাভাইরাসও আমাদের বিশ্বাস একদিন নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ব্যবস্থা টিকে থাকবে, হয়তোবা নতুন রূপে।

ড. মো. কামাল উদ্দিন, সাবেক চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।