বোতলার পাড় পারছে, আপনার গ্রাম?

ড. তুহিন ওয়াদুদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

‘দশের লাঠি একের বোঝা’ এই সত্য আমরা জেনে বড় হয়েছি। তারপরও জাতির চরম দুর্বিপাকে আমরা অনেকটাই নিজেদের আলাদা করে রেখেছি। অথচ আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু করার আছে। এ সত্য ভুলে গেলে তো আমাদের দেশপ্রেম নিয়েই প্রশ্ন তোলা যেতে পারে।

করোনাকালে দেশজুড়ে বিচিত্র সংকট দেখা দিয়েছে। যদি আমরা শৃঙ্খলায় ফিরতে না পারি তাহলে আরও নতুন নতুন সংকট দেখা দেবে। ত্রাণের দাবিতে মানুষ সড়কে নেমে আসছে। করোনা সন্দেহে মা-বাবা সন্তান ফেলে পালাচ্ছে। ছেলে-মেয়েরা বাবা-মাকে ফেলে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। অথচ, করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। এই দুর্যোগের কালে সরকার তার সাধ্য মতো চেষ্টা করছে। অথচ জনপ্রতিনিধি বিশেষত সাংসদগণ অনেকেই গা ঢাকা দিয়েছেন। উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যায়ের অনেক জনপ্রতিনিধি অসহায়দের জন্য বরাদ্দকৃত সম্পদ চুরি করার কাজে নিয়োজিত। এ অবস্থায় কি আমাদের দেশ অনিরাপদ হয়ে থাকবে? আমরা কি হাত-পা গুটিয়ে সরকারের, জনপ্রতিনিধিদের তুলোধুনো করে ফেসবুকসহ অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যম উত্তপ্ত করব নাকি নিজেদের করণীয় ঠিক করব? সমালোচনার পাশাপাশি নিজেরাও কিছু করতে পারি।

সর্বোচ্চ সাত দিনে সারাদেশে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব। আমি নিজেই একটি প্রস্তাবনা ঠিক করেছি। এই প্রস্তাবনার একটি পরীক্ষামূলক কার্যক্রমও চালানো হয়েছে। সাংগঠনিক প্রস্তাবনাটুকু এখানে অবিকৃত তুলে ধরলাম।

কার্যক্রম:

১.গ্রাম সুরক্ষা কমিটি গঠন। একজন আহ্বায়ক, সদস্যসচিব নিয়ে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন। প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মীবাহিনীও থাকবেন এর সদস্য। তরুণরা এ কাজে অগ্রণী শক্তি। ২. গ্রামটিকে কয়েকটি ছোট ছোট ভাগে ভাগ করা। প্রয়োজনে পাড়াভিত্তিক করে তার ওপর নজর রাখা। ৩. গ্রামে কারও মধ্যে করোনা উপসর্গ দেখা গেলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। কেউ করোনায় মারা গেলে তার দাফনসংশ্লিষ্ট কাজে সহায়তা করা। ৪. গ্রামে সামান্য জমিও যাতে পড়ে না থাকে সে ব্যবস্থা করা। লক্ষ্য হচ্ছে গ্রামে উৎপাদিত সবজি দিয়ে গ্রামের চাহিদা পূরণ করা। ৫. গ্রামবাসীকে করোনা বিষয়ে সচেতন করা। ৬. সামর্থ্যহীনের পাশে থাকবে সামর্থ্যবানরা।

উল্লিখিত কার্যক্রম শুধু তত্ত্বকথায় না রেখে আমরা একটি গ্রামে তা প্রয়োগ করে দেখেছি। অভাবনীয় ফলও পাওয়া গেছে। সেই বাস্তবতা এখানে তুলে ধরছি।

উৎসাহের কমতি নেই বোতলার পাড়ে

বাংলাদেশের সবচেয়ে গরিব জেলা কুড়িগ্রাম। এই জেলার রাজারহাট উপজেলার বোতলার পাড় নামক একটি গ্রামে আমরা এই কার্যক্রম শুরু করেছি। শুরুতেই আমি কৃষিবিদ নুরুজ্জামানের সাথে আলোচনা করি। তিনি বললেন, ‘জীবনের মানে আমি বুঝে গেছি। অপরের জন্য কিছু করতে পারাটাই জীবন। আর কিছু নয়।’ তারপর সরকারি কলেজের শিক্ষক প্রদীপ মিত্র আপেল, ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম, আরেফিন বাবু, সিরাজুল, মণি, সরকারি চাকরিজীবী শাহরিয়র সুমন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহাবুল ইসলামসহ গ্রামের অনেকেই এগিয়ে আসে। দেশের যে কোন গ্রামে এই পরিকল্পনা গ্রহণ করলে এরকম অথবা এরচেয়েও ভালো সাড়া পাওয়া যাবে।

তরুণরা অপরের ভালো করার জন্য নিবেদিত

স্নাতক-স্নাতকোত্তর পর্যায়ের তরুণরা এখন গ্রামেই আছে। তরুণশক্তি সবসময়ই চায় অপরের জন্য ভালো কিছু করতে। এই তরুণদের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করামাত্রই তারা কাজে নেমে পড়েছে। তারাই সুরক্ষা কমিটির দায়িত্বশীলদের পরামর্শে গ্রামে অতি অসহায়দের প্রথম তালিকা প্রণয়ন করেছে। সামর্থ্যবানদেরও আরেকটি তালিকা প্রস্তুত করেছে। তারাই নিরাপদ দূরত্বে থেকে সেই তালিকা যাচাই-বাছাই করেছে। রাতে এরাই সহায়তা বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কাজে সহায়তা করেছে। এরাই এখন গ্রামে সবজি চাষের পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। সারাদেশের তরুণরা এই সংকটকালে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য অধীর হয়ে আছে। তাদের ডাকলেই পাওয়া যাবে। বোতলার পাড়ের সুমন, মিজান, আজাদ. পারভেজ, মুশফিক আপেল, মিঠুসহ যে তরুণরা অদম্য আগ্রহ নিয়ে এ কাজে নেমে পড়েছে। এরকম তরুণেই তো দেশটা ভরা।

আন্তরিকতায় অর্থ প্রদান

বাংলাদেশে সবচেয়ে গরিব জেলার একটি গ্রাম বোতলার পাড়। আমরা জানি না কতদিন চলবে এই সংকট। তবে দীর্ঘ মেয়াদের কথা ভেবে আমরা সামর্থ্যবানদের কাছে আর্থিক সহায়তা চাইতে শুরু করি। প্রত্যেকেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এবং বলেছে যতদিন সংকট চলবে ততদিন তারা সহায়তা দেবে। আমরা প্রথম পর্যায়ে একশ সাতটি পরিবারে এই সহায়তা পৌঁছে দিয়েছি। দেশের অনেক গ্রাম আছে যেখানে গরিব মানুষের সংখ্যা খুবই কম। ওইসব গ্রামের সামর্থ্যবানেরা এগিয়ে এলে তাদের সামান্য সহায়তায় তাদের গ্রাম বাঁচবে। ভয়াবহ গরিব জেলা কুড়িগ্রামে যে কাজ সম্ভব হয়েছে সে কাজ দেশের অন্য যে কোন জেলার জন্য আরও সহজ হবে। উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে শুধু।

সমন্বয়

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে তালিকা যাচাই বাছাই করা হয়েছে। সরকারি ত্রাণ যদি কেউ পর্যাপ্ত পেয়ে থাকে তাকে নাম আপাতত তালিকা থেকে বাদ দিয়েছি। স্থানীয় প্রশাসনের সাথেও সমন্বয় থাকতে হবে। যারা কোনভাবে সহায়তা পাচ্ছে না তাদের পাশে আগে দাঁড়াতে হবে। আইনশৃঙ্খলা সুরক্ষিত করার কাজেও সমন্বয় করা যেতে পারে। সমন্বয় যথাযথ হলে অনেক সামাজিক অপরাধ থেকেও গ্রামকে এখন রক্ষা করা সম্ভব।

আমাদের গ্রামটাই একটি পরিবার। আমরা যদি আমাদের গ্রামটিকে পরিবার ভাবতে পারি তাহলে পরিবারের একজনকেও না খাইয়ে রেখে আমরা খেতে পারব না। যাদের সামর্থ্য অনেক তারা প্রয়োজনে নিজ উপজেলা-জেলাকেও নিজেদের পরিবার ভাবুক। আপাতত যদি আমরা গ্রামভিত্তিক কাজ শুরু করতে পারি তাহলে যে ফল পাবো তাতেই গোটা দেশ রক্ষা পাবে। দেশ সুরক্ষার প্রস্তাবনা বাস্তবায়িত করতে তিন থেকে সাত দিনের বেশি লাগবে না। সামান্য চেষ্টা-আর শ্রমে অসামান্য বাংলাদেশ গড়ে উঠতে পারে। আসুন আমরা সবাই মিলে সেই বাংলাদেশ গড়ি।

ড. তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর (পোস্ট ডক্টরাল ফেলো, ইউজিসি) এবং পরিচালক, রিভারাইন পিপল

আপনার মতামত লিখুন :