করোনা সংকট: আফ্রিকা কি দ্রুত সাড়া দিয়েছে?

  করোনা ভাইরাস



খুররম জামান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

বছরের শুরুর দিকে যখন চীনে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হলো তখন বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আফ্রিকাতে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়লে কী অবস্থার সৃষ্টি হবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। কারণ, মহাদেশটি ইতোমধ্যে অনেকগুলো স্বাস্থ্য সংকটের বিরুদ্ধে লড়াই করছে।

বর্তমানে করোনাভাইরাস আফ্রিকাতে ছড়িয়ে পড়ছে। তবে পরীক্ষাপ্রাপ্ত অনুসন্ধানে সংখ্যাটা অল্পই বলতে হবে।

শনিবার (২১ মার্চ) অবধি আফ্রিকার ৫৪ দেশের মধ্যে ৩৬ দেশে ভাইরাসটির সংক্রমণ হয়েছে। তবে দেড়শ ব্যক্তির সংক্রমণ পার করেছে শুধু দক্ষিণ আফ্রিকা। অন্য দেশগুলোতে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা একশোর নিচে আছে।

তা সত্ত্বেও, আফ্রিকার অনেক দেশ এ মহামারি রোধে সর্বাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। দেশজুড়ে কেবল ৮টি সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ার পরেও নাইজেরিয়ার পুরাতন রাজধানী লাগোসে স্কুল বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গত সপ্তাহে দক্ষিণ আফ্রিকা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পর্যটক নিষিদ্ধ করে দেয়। স্কুল বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি জোহানেসবার্গে তাৎক্ষণিকভাবে করোনা শনাক্ত সেন্টার চালু করে দেশটি।

আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস আফ্রিকা মহাদেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পঙ্গু করে দিতে পারে এবং এর অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিতে পারে। দাতা দেশগুলো যারা এ মহাদেশকে সহায়তা করতে পারে তারা নিজেরাই এখন বিপদে রয়েছে। তাই তাদের পক্ষে সহায়তা করাও কঠিন হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আফ্রিকা অঞ্চলের প্রধান ডা. মাতিশিদো মোতি গত বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ)
ভিডিও কনফারেন্সে সাংবাদিকদের বলেন, বেশিরভাগ রোগী ইউরোপ থেকে এসেছেন এবং এখন পর্যন্ত এই মহাদেশে ভাইরাসের সংক্রমণ সংখ্যা সীমিত
রয়েছে।

এর কারণ স্বরূপ মোতি অনুমান করেন, দক্ষিণ গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল থাকায় এটির সংক্রমণ কম। দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতেও এটি ছড়িয়ে পড়েছে, তবে আমরা উত্তর গোলার্ধে দেখেছি এটি বেশি ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা এটি বোঝার চেষ্টা করছি তাপমাত্রা বা আবহাওয়ার সঙ্গে এটি সম্পর্কিত হতে পারে কিনা।

তিনি বলেন, আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চল এবং কিছু পূর্ব আফ্রিকান দেশগুলোতে আলাদা ফ্লুর মৌসুম রয়েছে। আমরা আশঙ্কা করছি সম্ভবত কয়েক মাসের মধ্যে যখন দক্ষিণে শীত শুরু হবে তখন ভাইরাসটির সংক্রমণের হার আফ্রিকায় বৃদ্ধি পেতে পারে।

অন্যদিকে জরুরি একটি প্রশ্ন হলো করোনাভাইরাস শনাক্ত করার যথেষ্ট সামর্থ্য আফ্রিকান দেশগুলোর রয়েছে কিনা। এ কারণেই নিশ্চিত হওয়া সংক্রমণের সংখ্যা এত কম কিনা, সেটিও ভাবনার বিষয়।

ফেব্রুয়ারির শুরুতে সেনেগাল ও দক্ষিণ আফ্রিকা করোনাভাইরাস পরীক্ষা করার দক্ষতা অর্জন করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আফ্রিকার আরও ৪৩টি দেশকে তাদের জাতীয় পরীক্ষাগার স্থাপনে সহায়তা করেছে, যাতে তারাও পরীক্ষা করতে পারে।

এই ল্যাবগুলোর সামগ্রিক সক্ষমতা কম এবং শুধু রাজধানী শহরগুলোতে পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। এমনকি সীমান্তে চলাচল ও আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা চালানোর প্রাথমিক অনুষঙ্গ পাওয়ার সংকট সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।

মাতিশিদো মোতি বলেন, এই মহাদেশে একটি বড় আকারের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে। ডাব্লুএইচও-র দুটি পরামর্শ সামাজিক দূরত্ব এবং হাত ধোওয়া— সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে। কখনও কখনও পরিবারগুলো এমন বাড়িতে থাকে যেখানে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য আলাদা শয়নকক্ষ নেই। পরিবারের বেশ কয়েকজনকে একই জায়গায় থাকতে হয়, একই জায়গায় ঘুমাতে হয়। এছাড়াও তারা এমন বাড়িতে থাকে যেগুলোতে কলের জল নেই বা সাবান দিয়ে যেভাবে হাত ধোয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় সেটি মানা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ।

গণ বিজ্ঞান বিভাগের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রিটোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক টম আছোকি বলেন, ২০১৪ সালের ইবোলা প্রাদুর্ভাবের পরে অনেক দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থাগুলোর উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। তবে এখনও আফ্রিকায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা খুব দুর্বল। জরুরি শয্যার অভাব রয়েছে। কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা করার সময় তাদের রক্ষা করার জন্য মাস্ক এবং গাউন ব্যবহার করার বিষয়ে চিকিৎসক ও কর্মীদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। অনেক আফ্রিকান দেশে ডিজিটালি না হয়ে কাগজে এখনও তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সুতরাং সংক্রমণ রোধ ততটা কার্যকর নয়। এটি একটি মহামারি যা খুব দ্রুত গতিতে ছড়াচ্ছে।

তিনি বলেন, এই মহামারি প্রতিরোধে মহাদেশটি প্রস্তুত হওয়ার চেষ্টা করছে। উগান্ডা এখনও একজন রোগীর বিষয়ও নিশ্চিত করেনি। তারপরেও ইতিমধ্যে বিবাহ এবং বৃহত্তর ধর্মীয় সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে। কেনিয়া স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে। তবে বেশিরভাগ আফ্রিকান দেশ দেশব্যাপী বা শহরজুড়ে লকডাউন করতে পারে না, যেমন ইতালি এবং চীন করতে পেরেছে। কারণ, এ মহাদেশের অর্থনীতি শক্ত নয়। অধিকাংশ মানুষকে দিন এনে দিন খেতে হয়।

  করোনা ভাইরাস