কেন বলবেন আলহামদুলিল্লাহ?



নোমান আলী খান
একজন মুসলিম কখনও হতাশ হতে পারে না

একজন মুসলিম কখনও হতাশ হতে পারে না

  • Font increase
  • Font Decrease

মুসলিম সমাজের একদল মানুষ রয়েছেন, যারা তাদের জীবনের বেশিরভাগ সময়ে সবক্ষেত্রে বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ।’ নিঃসন্দেহে এটি আল্লাহর রহমত যে, আমরা এমন গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত যারা ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলার সৌভাগ্য পেয়েছি। আমাকে যদি বলা হয় ‘আলহামদুলিল্লাহ’র অর্থ নিয়ে আলোচনা করতে, আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করতে পারব ইনশাআল্লাহ; তবে প্রকৃতপক্ষে এর মূল অর্থ দুটি। প্রথমটি হলো, আল্লাহর প্রতি আপনি কৃতজ্ঞ, কৃতজ্ঞতা (শুধু) আল্লাহর জন্য। আর দ্বিতীয় অংশ হলো, প্রশংসা, প্রশংসা আল্লাহর জন্য। বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করলে দেখা যায়, কৃতজ্ঞতা এবং প্রশংসা দুটি আলাদা বিষয়।

একদিকে প্রশংসা করা অর্থে বোঝানো আর অন্যদিকে কৃতজ্ঞতা অর্থে, দুটি ভিন্ন দিক। এখন চলুন আমরা এই দুটি বিষয়ের পার্থক্য বোঝার চেষ্টা করি।

মনে করুন, আপনি একটি সুন্দর বাড়ি দেখে প্রশংসা করলেন, এক্ষেত্রে কিন্তু আপনি বাড়িটিকে ধন্যবাদ দিতে যাবেন না। আবার আপনি হয়তো একজন খেলোয়াড় দেখলেন, যিনি ফুটবল খেলেন এবং তিনি একটি অসাধারণ গোল করলেন। আপনি ওই খেলোয়াড়ের প্রশংসা করবেন; কিন্তু আপনি ওই খেলোয়াড়কে ধন্যবাদ দেবেন না অথবা আপনি তার প্রতি কৃতজ্ঞ হবেন না। আবার মাঝে মাঝে উল্টোটাও ঘটে। কিছু মানুষের প্রতি আপনি কৃতজ্ঞ থাকেন যদিও আপনি কখনও তাদের প্রশংসা করবেন না।

এমনটাও ঘটতে পারে, যার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছে- আল্লাহতায়ালা একজন মুসলিমকে সব অবস্থাতেই তার বাবা-মার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে আদেশ করছেন, এমনকি বাবা-মা অমুসলিম হলেও! যদি তারা আপনাকে শিরক করার জন্য জোর করেন, তারা চান আপনি ঈমান ত্যাগ করেন, তারপরও আপনাকে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। আপনি তাদের শিরকের প্রশংসা করবেন না; কিন্তু তারপরও আপনি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবেন।

সুতরাং, জীবনের মোড়ে মোড়ে আপনি প্রশংসা পেতে পারেন কৃতজ্ঞতা ছাড়া, আবার কখনও কখনও কৃতজ্ঞতা পাবেন প্রশংসা ছাড়া। বিষয়টি আরও সহজ করে তুলে ধরার জন্য আমি আপনাদের কাছে আরও একটি উদাহরণ দেব। যেখান থেকে একজন ব্যক্তি যার মধ্যে কৃতজ্ঞতা আছে; কিন্তু প্রশংসা নেই, বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়।

আপনারা ফেরাউনের কথা জানেন। ফেরাউন পছন্দ করুক কিংবা না করুক সে হজরত মুসা (আ.) কে তার প্রাসাদে বড় করেছে। পরে দীর্ঘ সময়ের পর হজরত মুসা (আ.) ফেরাউনের কাছে ফিরে আসেন। এরপর ফেরাউন হজরত মুসা (আ.) কে মনে করিয়ে দিয়ে বলেছিল, তুমি কি এখানে অনেক বছর থাকনি? তুমি কি এখানে অনেক বছর পার করোনি? আমি কি তোমাকে শৈশবকাল থেকে বড় করিনি? ফেরাউন কথাগুলোর মাধ্যমে তার দয়ার কথা হজরত মুসা (আ.) কে মনে করিয়ে দিচ্ছিল। স্বাভাবিকভাবে কেউ যখন আপনার উপকার করে, আপনি তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকেন। তাই হজরত মুসা (আ.) স্বয়ং এই উপকারের কথা স্বীকার করেন এবং ফেরাউনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। হজরত মুসা (আ.) বলেন, ‘হ্যাঁ, তুমি আমার প্রতি দয়া করেছিলে।’

আপনি যখন কারও প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবেন ঠিক সঙ্গে সঙ্গেই আপনি তাকে ধন্যবাদ দেবেন। একই কাজ হজরত মুসা (আ.)ও করেন; তিনি ফেরাউনকে ধন্যবাদ দেন। কিন্তু হজরত মুসা (আ.) তার জীবনদ্দশায় কখনোই তার প্রশংসা করেননি। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, আপনি কাউকে ধন্যবাদ দিতে পারেন প্রশংসা ছাড়া আর কাউকে প্রশংসা করতে পারেন কৃতজ্ঞতা ছাড়া।

যখন আমরা আলহামদুলিল্লাহ বলি, এর অর্থ আমরা বলছি যে, ‘আমরা আল্লাহর প্রশংসা করছি তিনি যা কিছু করেন তার জন্য।’ আল্লাহ পাক যা করেন তার চেয়ে ভালো কিছু হতে পারে না। তার প্রশংসার পর আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকি যে, তিনি যা করেছেন সেটার জন্য।

আলহামদুলিল্লাহ, আমরা আল্লাহর প্রশংসা করছি তিনি যা কিছু করেন তার জন্য 

 

আজ উপস্থিত অনেকেই বাইরে বসে আছেন। আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন যার জন্য হয়তো এয়ারকন্ডিশন যথেষ্ট নয় এবং ভাবছেন- উফ যা গরম। কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে আপনার মনে প্রথমে আসা উচিত ছিল-আলহামদুলিল্লাহ আজ বেশ গরম। এর মানে কি আপনি জানেন? এর অর্থ আল্লাহকে ধন্যবাদ গরমের জন্য এবং আমি আল্লাহর প্রশংসা করি গরমের জন্য। এটি ভিন্ন ধারার চিন্তা, যা আর দশজনের মতো নয়।

কিছু মানুষ আছে যারা স্রষ্টায় বিশ্বাস করে। সব ধর্মের মানুষের সঙ্গেই আমার দেখা হয়। কিছু মানুষ আছে যারা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করে; কিন্তু তাদের যেটা নেই, সেটা হলো ‘আলহামদুলিল্লাহ।’

আবার কিছু মুসলিম আছে যারা আলহামদুলিল্লাহ অর্থ বোঝে না। তাই মাঝে মধ্যে তারা বলে, ‘আমি বেতন বেশি পাই না, তবে যাই হোক, আলহামদুলিল্লাহ!’ বাস্তবিক অর্থে আপনি তখন আলহামদুলিল্লাহ বলছেন না। আপনি অভিযোগ করছেন আলহামদুলিল্লাহ বলার মধ্য দিয়ে। আবার হয়তো আপনি এবং আপনার পরিবার সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করা হয়- পরিবারের সবাই কেমন আছে? আর জবাবে যদি বলেন, এই আছে আরকি, আলহামদুলিল্লাহ। তাহলে কিন্তু বিষয়টি ভিন্ন। কেননা, এই আলহামদুলিল্লাহ বলা কিন্তু সত্যিকারের আলহামদুলিল্লাহ নয়। আলহামদুলিল্লাহ হচ্ছে আপনার অন্তরের অন্তস্থল থেকে আপনি কৃতজ্ঞ। যা কিছু ভুল ঘটে যাচ্ছে, তার মাঝেও আপনি ভালো কিছু খুঁজে পাবেন।

আপনি যদি গরম অনুভব করেন, অন্তত আপনি অসুস্থ তো বোধ করছেন না। আপনার আরও কিছু খারাপ হতে পারত। আপনি জানেন, যদি আপনার গাড়ির ট্রান্সমিশন সমস্যা থাকে, অন্তত গাড়ির ইঞ্জিনে তো কোনো সমস্যা নেই। আপনার অনেক কিছুই ঠিকমতো চলছে।

আমরা সে দলের মানুষ, যারা আলহামদুলিল্লাহ বলি। কিন্তু তার অর্থ জানেন কি? এর অর্থ-আমরা সবসময় কৃতজ্ঞ, আমরা সবসময় ইতিবাচক। আমরা যদি আলহামদুলিল্লাহ শব্দটা বুঝতাম, তাহলে আমরা কখনও হতাশ হতাম না। একজন মুসলিম কখনও হতাশ হতে পারে না।

বর্তমান সময়ে আপনি উম্মাহর মধ্যে দেখতে পারবেন, কিছু মানুষ মুসলিমদের অবস্থার জন্য অভিযোগ করছে। যেমন ধরুন, আমরা মুসলিমদের অজ্ঞতার জন্য অভিযোগ করি অথবা মুসলিমদের মাঝে দুর্নীতির ব্যাপারে অভিযোগ করি। আমরা মূলত করতে পারি অভিযোগ, অভিযোগ আর শুধু অভিযোগ। আমি আপনাদের বলছি, তিনি আল্লাহ, যিনি আমাদের অবস্থার পরিবর্তন করেন। আমাদের যা করতে হবে তা হলো, আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে হবে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে। আমাদের ইতিবাচক থাকতে হবে, ইতিবাচক দলের মানুষ হতে হবে।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ : কারিশমা আনান

ইসলামে জ্ঞান চর্চার গুরুত্ব



তাসফিয়া ইয়াসফা, অতিথি লেখক, ইসলাম
ইসলাম জ্ঞান চর্চায় মানুষকে উৎসাহ দেয়

ইসলাম জ্ঞান চর্চায় মানুষকে উৎসাহ দেয়

  • Font increase
  • Font Decrease

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। দুনিয়ায় সৃষ্টিকর্তার যত রকম সৃষ্টি রয়েছে, সবার ওপরে মানুষের স্থান। মানুষের সুবিধার্থে আল্লাহতায়ালা এত রকমের নেয়ামত দান করেছেন। তার পরিধেয় বস্ত্র থেকে নিত্য আহার্য পর্যন্ত মানুষ সৃষ্টিকূল থেকে সংগ্রহ করে। তাই মহান আল্লাহ যা বলেছেন বা যা সৃষ্টি করেছেন, এসব সম্পর্কে জানা এক প্রকার ইবাদত। যেখানে আমরা জ্ঞান অন্বেষণকে শুধুমাত্র পার্থিব জীবনে অর্থ উপার্জনের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করি, সেই জ্ঞান অর্জনকে ইসলামিক জীবনাদর্শে ফরজ করা হয়েছে। নবী মুহাম্মাদ (সা.) বলেন, ‘ইলম (জ্ঞান) অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ।’ -ইবনে মাজাহ

জানা, জ্ঞান ইত্যাদি শব্দের আরবি প্রতিশব্দ হচ্ছে- ইলম। ইসলামি পরিভাষায় এর অর্থ, কোনো বস্তুর প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধি করা। মহান আল্লাহ মানুষকে শুধুমাত্র একটি শরীর দিয়ে এই দুনিয়াতে পাঠান। পরবর্তীতে তার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশের মাধ্যমে সে জীবন উপলব্ধি করতে শেখে। ভালো-মন্দের পার্থক্য, ভুল-সঠিকের পথ, সত্য-মিথ্যা সবকিছু সম্পর্কে তার ধারণা আসে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে। তাই কোনো কিছু জানার ইচ্ছাকে সমুন্নত রাখতে হবে, সচল রাখতে হবে। নবী-রাসুলদের জীবনী থেকে, হাদিস-কোরআনের বাণী থেকে দ্বীনি ইলম সম্পর্কে জানতে হবে এবং অন্যান্য বই-পুস্তকের মাধ্যমে দুনিয়াবি জ্ঞান অর্জন করতে হবে।

হাদিসে বর্ণিত আছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুমিন বান্দা কল্যাণ হতে কখনও তৃপ্তি পায় না। কল্যাণ অর্থ জ্ঞানার্জন এবং শিক্ষা। অতপর বান্দা জান্নাতে প্রবেশ করে।’ –সুনানে তিরমিজি

যে ব্যক্তি দ্বীন-দুনিয়া সম্পর্কে জানে, সে কখনও দুশ্চরিত্রবান হতে পারে না। কারণ সে ভালো-খারাপের তফাৎ করতে জানে। সে জানে মন্দের শাস্তির ব্যপারে। একজন মূর্খ এবং একজন বিজ্ঞ কখনও এক হতে পারে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তুমি বলে দাও, যারা জ্ঞানী এবং মূর্খ তারা কি সমান হতে পারে?’ -সুরা যুমার

বস্তুত শেখার কোনো শেষ নেই। নানা রকম ডিগ্রী অর্জন করতে পারলে কিংবা জীবনের পঞ্চাশ-ষাট বছর কাটিয়ে দিতে পারলেই মানুষে নিজেকে মহাজ্ঞানী ভাবতে পারে না, সে জ্ঞানী হয়ও না। অনেক বিষয় সম্পর্কে জানা শেষ হলেও, প্রকৃত অর্থে মানুষ বিশাল এ সৃষ্টিজগত সম্পর্কে খুব সামান্য পরিমাণ জানার সুযোগ পায়।

তাই জ্ঞানার্জনের প্রচেষ্টা সবসময় চালিয়ে যেতে হবে। জানার মধ্যে যে আনন্দ রয়েছে, তা পৃথিবীর কোনো ধন-সম্পদ উপার্জনের মধ্যে নেই।

;

পানির ওপর জায়নামাজে নামাজ পড়ার ঘটনা প্রসঙ্গে



ইসলাম ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

হজরত রাবেয়া বসরি (হবে রাবেয়া বসরিয়্যাহ্) দ্বিতীয় হিজরি শতকের একজন প্রসিদ্ধ আবেদা নারী ছিলেন। ইমাম জাহাবি (রহ.)-এর সিয়ারু আলামিন নুবালা, ইবনে খাল্লিকান (রহ.)-এর অফাইয়াতুল আইয়ান, শারানি (রহ.)-এর আততাবাকাতুল কুবরাসহ আরও বিখ্যাত বিখ্যাত বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থে তার জীবনী সন্নিবেশিত হয়েছে। তার বিষয়ে সমাজে বিভিন্ন বানোয়াট কিচ্ছা-কাহিনী প্রচলিত আছে।

তার ও প্রসিদ্ধ তাবেয়ী হজরত হাসান বসরি (রহ.)-এর বিষয়ে একটি কাহিনী অনেককে বলতে শোনা যায়। সেটি হলো-

একবার হজরত হাসান বসরি (রহ.) পানির ওপর জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়লেন। হজরত রাবেয়া বসরি একথা জানতে পারলেন এবং তিনি শূন্যের ওপর জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়লেন। হজরত হাসান বসরি (রহ.) যখন একথা জানতে পারলেন তখন বললেন, রাবেয়ার মাকাম (স্থান) আমার অনেক ওপরে।

বস্তুত এ কিচ্ছার কোনো ভিত্তি নেই। এটি একেবারেই কল্পনাপ্রসূত একটি কাহিনী, বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। নির্ভরযোগ্য কোনো ইতিহাসগ্রন্থ কিংবা রাবেয়া বসরির ওপর রচিত কোনো নির্ভরযোগ্য জীবনীগ্রন্থে এ ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় না।

তারা কত বড় বুজুর্গ ছিলেন, এ কথা বুঝাতে এ জাতীয় কিচ্ছা-কাহিনীর অবতারণা করা হয়।

হ্যাঁ, তারা অনেক বড়মাপের বুজুর্গ ছিলেন, একথা স্বীকৃত। তারা জুহ্দ (সাধনা) ও তাকওয়ায় (আল্লাহভীতি), দুনিয়াবিমুখতা ও খোদাভীতিতে অনেক অগ্রগামী ছিলেন। কিন্তু এ ধরনের কাহিনী দিয়ে তাদের বুজুর্গি প্রমাণ করার কোনো প্রয়োজন নেই। আর এ সবের সঙ্গে বুজুর্গির কোনো সম্পর্ক নেই।

আর আল্লাহর অলিদের থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারামত প্রকাশিত হয় এ কথা স্বীকৃত। সেই সঙ্গে এ কথাও স্বীকৃত যে, কারামতের সঙ্গে বুজুর্গির কোনো সম্পর্ক নেই। বুজুর্গি ও আল্লাহর প্রিয়পাত্র হওয়ার মাপকাঠি হলো, তাকওয়া তথা আল্লাহর ভয় ও সুন্নত অনুযায়ী জীবন-যাপন করা।

আর বানোয়াট এ ঘটনায় আরেকটি দিক দেখা যাচ্ছে। তা হলো, একজন পানির ওপর জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়েছেন তা শুনে অপরজন শূন্যের ওপর জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়ছেন; যেন বুজুর্গি প্রকাশে প্রতিযোগিতা চলছে। এর দ্বারাই বুঝা যায়, এগুলো বানোয়াট গল্প। কারণ, আল্লাহওয়ালারা নিজেদেরকে আড়াল করতে চান। আর তাদের মতো অনুসরণীয় বুজুর্গরা যেন নিজেদের বুজুর্গির প্রদর্শন করছেন। নাউযুবিল্লাহ। এটা তাদের ব্যাপারে মস্তবড় অপবাদও বটে!

আরেকটি বিষয় হলো, হজরত হাসান বসরি (রহ.) ইন্তেকাল করেছেন ১১০ হিজরিতে। আর রাবেয়া বসরির জন্মই হয়েছে ৯৯ অথবা ১০০ হিজরিতে। অর্থাৎ হাসান বসরি (রহ.)-এর ইন্তেকালের সময় রাবেয়া বসরির বয়স ছিলো সর্বোচ্চ ১১/১২ বছর। সিয়ারু আলামিন নুবালায় (৮/২৪১) ইমাম জাহাবি (রহ.) বলেন, রাবেয়া বসরি ১৮০ হিজরিতে ইন্তিকাল করেছেন। কথিত আছে, তিনি আশি বছর হায়াত পেয়েছেন। সুতরাং এ বিষয়টিও এ ঘটনার অসারতা প্রমাণ করে।

;

ইসলামে হিজড়াদের অধিকার



ইসরাত জাহান সারা, অতিথি লেখক, ইসলাম
ইসলামি স্কলাররা মতে দিয়েছেন, হিজড়াদের অবহেলা করা যাবে না। তাদের গালি দেওয়া যাবে না

ইসলামি স্কলাররা মতে দিয়েছেন, হিজড়াদের অবহেলা করা যাবে না। তাদের গালি দেওয়া যাবে না

  • Font increase
  • Font Decrease

সমাজে হিজড়াদের অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে ইসলাম দিক-নির্দেশক। ইসলাম মতে, মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। তদ্রূপ হিজড়াও মহান আল্লাহর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব আশরাফুল মাখলুকাতের এক অনন্য মানব সম্প্রদায়। সুরা ত্বীনের ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি শ্রেষ্ঠতম-সুন্দর আকৃতিতে।’

বাংলা একাডেমীর সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান বলছে, ‘হিজড়া’ শব্দটি হিন্দি ভাষা থেকে এসেছে। হিজড়া বিষয়ক গবেষকদের মতে, হিজড়া শব্দটি এসেছে ফার্সি থেকে। ফার্সি ভাষায় হিজড়া অর্থ হলো- ‘সম্মানিত ব্যক্তি।’

নারীও নয় আবার পুরুষও নয়, এ ধরনের এক শ্রেণির মানুষকে আমরা প্রায়ই রাস্তাঘাটে বিভিন্ন রকম অঙ্গভঙ্গি করে চাঁদা তুলতে দেখি, এই অবহেলিত শ্রেণির লোকদেরকে ‘হিজড়া’ বলা হয়।

হিজড়াদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হিজড়া শব্দকে তারা অভিশাপ বা গালি হিসেবে মনে করেন। তারা এক ধরনের প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধীরা সমাজে নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলে হিজড়ারা এসব থেকে বঞ্চিত। সমাজ তাদেরকে বোঝা মনে করে দূরে ঠেলে দেয়। তাদের প্রতি ঘৃণা নয় বরং ভালোবাসা ও স্নেহ দরকার। প্রতিবন্ধী মানুষের যেমন শারীরিক ত্রুটি থাকে তদ্রূপ এটিও একটি ত্রুটি।

মনে রাখতে হবে, মহান আল্লাহর কাছে মানুষের বাহ্যিক আকার-আকৃতির কোনো মূল্য নেই। হাশরের ময়দানে তিনি দেখবেন শুধু মানুষের আমল। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তোমাদের চেহারা এবং সম্পদ দেখেন না বরং তিনি তোমাদের হৃদয় এবং আমলসমূহ দেখেন।’ -সহিহ মুসলিম : ৬৭০৮

ইসলামি স্কলাররা মতে দিয়েছেন, হিজড়াদের অবহেলা করা যাবে না। তাদের গালি দেওয়া যাবে না। তাদেরকে নিয়ে উপহাস করা যাবে না। তারা সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করবে। তাদের ওপর ইসলামের বিধান কার্যকর হবে। যার মধ্যে মেয়েলি ভাব বেশি তার ওপর নারীদের বিধান এবং যার মধ্যে পুরুষের স্বভাব বেশি বিদ্যমান, তার ওপর পুরুষদের বিধান কার্যকর হবে।

ইসলাম মানবতার ধর্ম। তাই ইসলাম হিজড়াদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ মনে করে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে অঙ্গ ও আকৃতির ভিত্তিতে মানুষকে ভাগ করা হয়নি। আল্লাহতায়ালার কাছে সব ত্রুটিহীন অথবা ত্রুটিপূর্ণ মানুষই সমান এবং হাশরের ময়দানে সব ধরনের মানুষই জিজ্ঞাসিত হবে। সে জন্যই সকলের মতো নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত- পালন করা হিজড়াদের ওপর ফরজ।

ইসলামের দৃষ্টিতে সব মানুষ সমান। ইমান ও তাকওয়া হচ্ছে- মানুষের মর্যাদার মানদণ্ড। যে যত বেশি মুত্তাকি, আল্লাহ তাকে তত বেশি ভালোবাসেন। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে; পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন, যে বেশি মুত্তাকি।’ -সুরা হুজুরাত : ১৩

;

নামাজের উপকারিতা



মোহাম্মদ এনামুল হক ফজলে রাব্বী, অতিথি লেখক, ইসলাম
শাশ্বত আহ্বান, এসো নামাজের দিকে, এসো নামাজের দিকে

শাশ্বত আহ্বান, এসো নামাজের দিকে, এসো নামাজের দিকে

  • Font increase
  • Font Decrease

ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম হচ্ছে- নামাজ। ঈমানের পরেই নামাজের মর্যাদাগত অবস্থান। রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে এ সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন, ‘বলুন! আমার বান্দাদেরকে, যারা ঈমান এনেছে তারা যেন নামাজ প্রতিষ্ঠা করে এবং আমি যা তাদেরকে দান করেছি তা হতে ব্যয় করে।’

ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় নামাজ বলা হয়, রুকু, সিজদাসহ নির্দিষ্ট আহকাম সম্বলিত এমন বিশেষ ইবাদত অনুষ্ঠানকে- যার মাধ্যমে বান্দা ও স্রষ্টার মাঝে সুনিবিড় সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক নর-নারী মুসলিমের ওপর আদায় করা ফরজ।

নামাজ ফরজ ইবাদত হলেও নামাজ আদায়ের মূল উপকারিতা হচ্ছে, অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে মানুষকে বিরত রাখা। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় নামাজ অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে।’

এ প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও প্রতিটি জুমার নামাজ রীতিনীতিসহ আদায় করে এবং প্রতি বছর রমজানের রোজাগুলো যথাযথভাবে পালন করে, তাকে আল্লাহতায়ালা এক নামাজ হতে অপর নামাজ, এক জুমা হতে অপর জুমা এবং এক রমজান হতে অপর রমজানের মধ্যকার সময়ে সংঘটিত যাবতীয় গোনাহ ক্ষমা করে দেন। তবে শর্ত হলো, তাকে কবিরা গোনাহ থেকে বিরত থাকতে হবে।’ কেননা আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা যদি নিষেধাজ্ঞাসমূহের পাশাপাশি কবিরা গোনাহ থেকে বিরত থাকো, তবে আমি তোমাদের সগিরা গোনাহগুলো মিটিয়ে দেব।’ সুতরাং সগিরা গোনাহ থেকে ক্ষমালাভের জন্য আমাদের উচিত কবিরা গোনাহ থেকে বিরত থেকে যথাযথভাবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমা ও রমজানের রোজাগুলো পালন করা। আল্লাহতায়ালার হুকুম পালনের পাশাপাশি নামাজের মাধ্যমে অনেক বৈষয়িক উপকারিতা ও অর্জিত হয়। যেমন-

মুসলিম ঐক্য : নামাজ মুসলিম ঐক্যের এক শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। মুসলমানগণ দৈনিক পাঁচ বার নামাজের উদ্দেশ্য মসজিদে একত্রিত হয়ে ঐক্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

আনুগত্যের শিক্ষা : নামাজে ইমামের অনুসরণ ও আনুগত্যের মাধ্যমে নেতার আনুগত্যে শিক্ষা লাভ হয়।

চরিত্র গঠন : নামাজ চরিত্র গঠনের উত্তম উপায়। দৈনিক পাঁচ বার তাওহিদ, রেসালাত ও আখেরাতকে স্মরণের মাধ্যমে চরিত্রের মন্দ দিকগুলো দূরীভূত হয়।

নেতৃত্বের দায়িত্ববোধ : নামাজ দ্বারা নেতৃত্বের দায়িত্ববোধের শিক্ষা অর্জিত হয়। এমনকি সমাজ ও জাতিকে নেতৃত্ব দেওয়ার শিক্ষা এখান থেকে অর্জিত হয়।

পারস্পরিক সহযোগিতা : সমাজে মসজিদ তৈরি ও এর রক্ষণাবেক্ষণকারী ইত্যাদি কার্যাবলী মাধ্যমে মানুষ মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতামূলক সামাজিক গুণ সৃষ্টি হয়।

পারস্পরিক সম্প্রীতি সৃষ্টি : মুসলমানগণ প্রত্যহ পাঁচ বার নামাজ কায়েমের লক্ষ্যে মসজিদে সমবেত হওয়ায় তাদের মাঝে সামাজিক সম্প্রীতি, একতার বন্ধন, ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতামূলক মনোভাব গড়ে ওঠে।

শৃঙ্খলার প্রশিক্ষণ : মুসলমানরা নামাজ আদায়ের লক্ষ্যে প্রত্যেহ পাঁচ বার নির্ধারিত সময়ে মসজিদে সমবেত হয় এবং কাতারবন্দি হয়ে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলার সঙ্গে নামাজ আদায় করে। এতে মানুষ নিয়ম শৃঙ্খলার প্রশিক্ষণ লাভ করে।

নামাজ পরিত্যাগের পরিণাম : ইচ্ছেকৃতভাবে নামাজ পরিত্যাগকারীর ব্যাপারে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। এ ছাড়া বেনামাজির জন্য ১৪ প্রকার শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি নামাজের ব্যাপারে অবহেলা প্রদর্শন করে। আল্লাহতায়ালা তাকে চৌদ্দ প্রকার শাস্তি প্রদান করেন।’

নামাজে যত্নবান হওয়া মুমিনের দায়িত্ব

 

দুনিয়ায় পাঁচ শাস্তি
১. তার জীবন ও জীবিকার বরকত কেড়ে নেওয়া হবে।
২. তার চেহারা হতে নেককার লোকদের নূর মুছে ফেলা হবে।
৩. সে যেকোনো নেক আমল করুক, আল্লাহ তাতে কোনো সওয়াব দান করেন না।
৪. তার কোনো দোয়াই কবুল করা হয় না।
৫. নেককারদের দোয়ায় তার কোনো অংশ থাকে না।

মৃত্যুকালীন তিন শাস্তি
১. অপমানিত ও লাঞ্ছিত অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
২. ক্ষুধার্ত অবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করবে।
৩. চরম তৃষ্ণার্ত অবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করে। যদি সমস্ত পৃথিবীর সাগরের পানিও তাকে পান করানো হয়, তবুও তার তৃষ্ণা কমবে না।

কবরের তিন শাস্তি
১. তার কবর এত সংকীর্ণ করা হবে যে, তার এক পাঁজরের হাড় অন্য পাঁজরের মধ্যে ঢুকে যাবে।
২. তার কবরে আগুন জ্বালানো হয়, সে আগুনের শিখার ওপর দিনরাত উলট-পালট অবস্থায় দগ্ধ হতে থাকবে।
৩. তার কবরে একটি ভয়ংকর বিষধর অজগর নিয়োগ করা হবে। যার চোখ দু’টি আগুনের এবং নখরগুলো লোহার মতো শক্ত কিছু দ্বারা তৈরি হবে। অজগরটি বজ্রের ন্যায় আওয়াজ দেবে এবং মৃত ব্যক্তিকে চব্বিশ ঘন্টা রাতদিন কেয়ামত পর্যন্ত দংশন করতে থাকবে।

কেয়ামতের তিন শাস্তি
১. অত্যন্ত কড়াকড়িভাবে বেনামাজির হিসাব নেওয়া হবে।
২. তাকে কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি দেওয়া হবে।
৩. অত্যন্ত অপমানের সঙ্গে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, কেয়ামতের দিন বেনামাজি কপালে তিনটি লাইন লেখা অবস্থায় উঠবে। ‘হে আল্লাহর হক বিনষ্টকারী।’ ‘হে আল্লাহর গজবের পাত্র! দুনিয়াতে তুমি যেভাবে আল্লাহর হক নষ্ট করেছো, সেরূপ আজ তুমি আল্লাহর রহমত হতে বঞ্চিত।’ অতএব জ্ঞান থাকা অবস্থায় কোনো মুমিন-মুসলমানের জন্য কোনো অবস্থায় নামাজ পরিত্যাগ করা বৈধ নয়।

;