বিপদগ্রস্ত কওমি শিক্ষকের কথা বলা কী অন্যায়?

মাওলানা শাহেদ আলম, অতিথি লেখক
কওমি মাদরাসার একটি শ্রেণিকক্ষ , ছবি: সংগৃহীত

কওমি মাদরাসার একটি শ্রেণিকক্ষ , ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনার সংক্রমণ রোধে কওমি মাদরাসাসহ দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে সরকারের নির্দেশে। এমতাবস্থায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাড়া বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত কিছু কিছু কওমি মাদরাসার পরিচালক আর্থিক সঙ্কটে শিক্ষকদের বেতন না দেওয়ার কথা বলেছেন। বিষয়টিকে অমানবিক, অন্যায্য ও চূড়ান্ত রকমের নীতিহীনতা আখ্যা দিয়ে এ বিষয়ে কওমি মাদরাসার শিক্ষকদের জন্য আপৎকালীন তহবিল গঠন, শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা প্রণয়ন, শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান সম্বলিত বেশ কয়েকটি লেখা বার্তা২৪.কম-এ প্রকাশিত হয়। হালসময়ের আলোচিত কলাম লেখকদের কলামে বিষয়গুলো উঠে এসেছে সুন্দরভাবে।

ওই সব লেখায় বলা হয়েছে, এসব বিষয়ে যথাযথ দায়িত্বশীল, কার্যকরী ও বাস্তবসম্মত ভূমিকা রাখতে পারেন কওমি মাদরাসার শিক্ষাবোর্ডগুলো। কোনো লেখায় কোনো মাদরাসা কর্তৃপক্ষ, কোনো বোর্ড অথবা মাদরাসার পরিচালক তথা মুহতামিমকে দায়ি করা হয়নি। শুধু চলমান ঘটনার বিবরণ দিয়ে প্রতিকারের জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

কওমি মাদরাসার শিক্ষক হিসেবে আমি লেখাগুলো পড়ে দারুণভাবে উপকৃত হয়েছি। মনে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই হতাশার কালো মেঘ মনের কোণে উঁকি মেরেছে ফেসবুকে এসব লেখার বিকৃত ব্যাখ্যা দেখে।

ফেসবুকে একজন লিখলেন, ‘দুই লাখ মাদরাসা শিক্ষক এর কি হবে! এই আলোচনা সমর্থন করি না।’ তিনি সমর্থন না করতে পারেন। সেটা তার ব্যক্তিগত অভিমত। আমি তার মতকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু ব্যাথিত হয়েছি লেখার ভুল ব্যাখ্যায়। তিনি লিখেছেন, ‘দুই লাখ শিক্ষকের মধ্যে এক লাখ শিক্ষক কি এই সঙ্কটে পড়েছে? পঞ্চাশ হাজার শিক্ষক কি হাত পাতার পর্যায়ে পড়েছে? আমি বিশ্বাস করি এই পরিস্থিতি হয়নি। তাহলে এত দ্রুতই কেন আমরা হাহাকার শুরু করলাম?’

তিনি আলো ঝলমলে শহরের বাসিন্দা। ঢাকার বড় মাদরাসার শিক্ষক। তিনি কী করে জানবেন অজপাড়া গাঁয়ের মাদরাসাগুলোর হালচাল? যেখানে বেতন বাকি থাকে মাসের পর মাস? তিনি এদিকে না যেয়ে, সংখ্যার বিচার শুরু করলেন, পুরো লেখায় ষড়যন্ত্রের তত্ব খুঁজলেন। সরকারি অনুদান নেওয়া না নেওয়ার যৌক্তিকতা আওড়ালেন। যদিও কোনো লেখায় সরকারি অনুদান নয়, বরং কওমি বোর্ডগুলোকে উদ্যোগী হতে বলা হয়েছে। শিক্ষকদের কল্যাণে একটি ফান্ড গঠন করতে বলা হয়েছে। যে ফান্ড বিপদ-আপদে শিক্ষকদের পাশে দাঁড়াবে। তিনি সেদিকে নজর না দিয়ে বিষয়টি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করলেন। শুরু হলো ফেসবুকীয় ঝড়। আবারও অসহায়ের পক্ষে যে কেউ নেই- সেটাই প্রমাণিত হলো। না হলে, যে মাদরাসার শিক্ষক বেতন দেবে না বলে ঘোষণা দিলো, তাকে বিচারের কিংবা সহায়তার আওতায় না এনে এখানেও খুঁজলেন রাজনীতি। সত্যি বিচিত্র আমাদের চিন্তা শক্তি!

আরেকজন ফেসবুকে লিখলেন, ‘আমাদের মসজিদ বা মাদরাসা থেকে সামান্য যা সম্মানী দেওয়া হয়, তাতেই আমাদের জীবন চলে যাচ্ছে। আমরা সম্মানী বৃদ্ধির দাবি করতে পারি, আমরা সম্মানী বাকি রাখার জন্য পরিচালকদের সমালোচনাও করি কখনও। কিন্তু মনে রাখবেন আমরা রাস্তায় নামি না। আমাদের সম্মানী আটকে রাখলে আমরা মসজিদে নামাজ পড়ানো বন্ধ করে অনশনে চলে যাই না। আমরা কর্মবিরতি দিয়ে মাদরাসার শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত করি না। আমরা যা- যতটুকু সমালোচনা ও প্রতিবাদ করি, আমাদের অঙ্গন ও সীমার ভেতরে থেকেই করি।’

এই মহাশয় কিন্তু কথাগুলো ফেসবুকে লিখেছেন। আর বেশি কিছু বলছি না। কারণ তার কথা ও কাজে মিল নেই। তিনি লিখেছেন, ‘আমরা যা- যতটুকু সমালোচনা ও প্রতিবাদ করি, আমাদের অঙ্গন ও সীমার ভেতরে থেকেই করি।’ এবার বলি ফেসবুক কী উনার বা উনাদের নিজস্ব অঙ্গন? তিনি প্রতিবাদটা আসলে কোথায় করলেন? এটা ভিন্ন বিষয় ধরে নিলাম। কিন্তু তিনি লিখেছেন, বেতন না পেলে অনশন করেন না। কর্মবিরতিতে যান না। খুবই ভালো কথা। বার্তা২৪.কম-এ প্রকাশিত কোনো লেখায় তো শিক্ষকদের অনশনে কিংবা কর্মবিরতিতে যেতে বলা হয়নি! চাওয়া হয়েছে শিক্ষক নিয়োগের জন্য স্বচ্ছ বিধিমালা। লেনদেনের স্বচ্ছতা। এসব কিন্তু ইসলাম সমর্থন করে। ইসলাম বলে, মজদুরকে ঘাম শুকানোর পূর্বে মজুরি দিয়ে দাও। লেনদেন করলে স্বচ্ছভাবে করো। এগুলো বাস্তবায়ন চাওয়া অন্যায় কিনা জানি না? তিনি মনে হয় অন্যায় ভেবেছেন। হ্যাঁ, কোনো লেখায় তো ঢালাওভাবে কোনো মুহতামিমকে দায়ি করা হয়নি। মুহতামিমদের প্রতিপক্ষ বানানো হয়নি। তার পরও কেউ কেউ হুজুগে ব্যাখ্যা দিয়ে বুঝে বা না বুঝে, নিজেকে অধিক সমঝদার কিংবা কওমি হিতাকাঙ্খী বুঝানোর নিমিত্তে মূল বিষয়কে অন্যদিকে ঘুরানোর চেষ্টা করলেন সুকৌশলে।

কওমি মাদরাসার একটি শ্রেণিকক্ষ , ছবি: সংগৃহীত

এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে বলি। করোনা পরিস্থিতিতে কওমি শিক্ষকদের সত্যিই কি কেউ কষ্টে নেই? এ কথা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন? পারবেন অস্বীকার করতে? ফেসবুকে দেখলাম গাজী ইয়াকুব করোনার কারণে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া বিভিন্ন মাদরাসার বেতন না পাওয়া ৬৪ জন আলেমকে নগদ অর্থ প্রদান করলেন। তাহলে এগুলো কী? আপনি হয়তো বলবেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এসব না বলাই ভালো। এমন বিচ্ছিন্ন ঘটনা যেনো আর না ঘটে সে জন্যই তো কওমি শিক্ষকদের কল্যাণে কিছু করার দাবি উঠেছে। এবার না হয় তাদের পেছনে গাজী ইয়াকুব দাঁড়িয়েছে, আগামীতে কে দাঁড়াবে? তার পরও হয়তো আপনি বলবেন, আমি ক্ষতিগ্রস্ত নই, ভালো কথা। আপনি ক্ষতিগ্রস্ত নন। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্তের পক্ষে কথা বললে, আপনার যদি ইজ্জত যায়, সম্মানহানী হয়, তাহলে রাবেতাতুল ওয়ায়েজীনের এই আহ্বানকে কী বলবেন? সেখানেও তো বলা হয়েছে, ‘আসুন করোনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত আলেমের পাশে দাঁড়াই। আমাদের ক্ষুদ্র প্রয়াস। আমাদের সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা আছে, ইচ্ছার সীমা নেই। মনতো চায়, দুই লক্ষ কওমি শিক্ষকের পাশে দাঁড়াই। বহু অসহায় আছেন যারা চাইতে পারেন, চলতে পারেন, কিন্তু একজন আলেম?’

আমার মনে হয়েছে বার্তায় প্রকাশিত কলামগুলোতে আলেমদের ইজ্জতের জীবনের নিশ্চয়তার কথা বারবার বলা হয়েছে। ভবিষ্যত সুরক্ষার কথা ভাবতে বলা হয়েছে। অন্যের কাছে হাত পাততে, অন্যের দারস্থ হতে কারও ভালো লাগে না। এগুলো নিয়ে ভাববার সময় হয়েছে। এখন আর হুজুগ-গুজব দিয়ে সাধারণ হিসাব পাল্টে নয়-ছয় করার সুযোগ নেই।

আসলে বাংলাদেশে সময়ে সময়ে গুজবের শেষ নেই। ধর্মীয় বিধান মতে কোনো তথ্য পাওয়ার পর তার সত্যতা না পাওয়া পর্যন্ত প্রচার করতে নিষেধ করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবেও গুজব ছড়ানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। গুজব বিষয়ে সরকারি-বেসরকারিভাবে বহু সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হলেও গুজব প্রিয় জাতির বদনাম আমরা ঘুচাতে পারিনি, বরং বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর প্রভাবে গুজব যেন রকেট গতিতে ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। এর শিকার আমার মতো কওমি মাদরাসার সাধারণ শিক্ষকসমাজ।

নিভৃতপল্লীর একজন কওমি শিক্ষকের চোখের পানি, বাচ্চার পোশাক কিনে না দিতে পারার ব্যর্থতা, অসুস্থ স্ত্রীকে পাশে নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটানোর যাতনা আমাদের কওমি শিক্ষকদের নেতৃস্থানীয় কখনও বুঝেননি। বুঝতে চাননি। সঠিক পরিসংখ্যান আমরা জানি না। এই দুই লাখ শিক্ষকের একজনও যদি কষ্টে থাকেন, অনাহারে থাকেন; নাড়িছেঁড়া ধন সন্তানের চাওয়া পূরণ করতে না পেরে চোখের পানি ফেলেন- তার দায় কি কোনো মুহতামিম, কওমি বোর্ডের নেতারা এড়াতে পারবেন? শুধু নিজে ভালো থাকাকে যথেষ্ট মনে করা তো ইসলামের শিক্ষা নয়? বরং ভালো চাওয়ার বিরোধীতা করার অর্থ কূপমুণ্ডকতা, গোঁড়ামি ও বর্বরতা। আর সব কিছুতে স্বার্থ বা রাজনীতি খোঁজার প্রবণতা আরও মারাত্মক নোংরামি। অথচ আজানা কারণে, অজানা ভীতিতে, আজানা আকর্ষণে কওমি শিক্ষকদের একাংশ তাদের পাশেই দাঁড়ান। তাদের সমর্থন করেন। তাদের বাহবা দেন।

আমি মনে করি, কওমি শিক্ষকদের একজনের মলিন মুখ দেখে অন্যরা ব্যথিত হবেন। এই ঘোর বিপদের দিনে মানবিক হবেন। মিডিয়ায় সামান্য কয়েকজন শিক্ষকের বিপদের কথা এসেছে। তাদের কেউ হয়তো রথি-মহারথি নন। তাই বলে কী তাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান অনুচিত হবে? বিচারের ভার আপনাদের কাছেই রইল।

মাওলানা শাহেদ আলম: মক্তবের শিক্ষক ও বার্তা২৪.কম এর পাঠক।

আরও পড়ুন:
কওমি মাদরাসার শিক্ষকদের জন্য আপৎকালীন তহবিল গঠন আবশ্যক

দুই লক্ষাধিক কওমি শিক্ষকের কথা ভাববার কেউ নেই!

কওমি শিক্ষকদের আর্থসামাজিক নিরাপত্তা বিষয়ে কিছু প্রস্তাবনা

কওমি মেরুদণ্ড যেভাবে সোজা রাখতে পারি

করোনার কবলে কওমি মাদরাসার শিক্ষক-পরিচালক, অতঃপর...