করোনা ভুলে ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল হাজিরা



ইসলাম ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
পবিত্র কাবায় অশ্রুসিক্ত মোনাজাতে হাজিরা, ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র কাবায় অশ্রুসিক্ত মোনাজাতে হাজিরা, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

‘আমি আশা করিনি যে, মাত্র দশ হাজার মানুষের মধ্যে এবার হজের সৌভাগ্য লাভ করব। নিবন্ধন প্রক্রিয়া শেষ করার পর ফিরতি এসএমএস দেখে আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না- আমি নির্বাচিত হয়েছি হজের জন্য। এটি একটি অবর্ণনীয় অনুভূতি ... যেহেতু এটি আমার প্রথম হজ। জীবনে প্রথমবার কাবা দেখার আশা পূরণ হয়েছে।’

বুধবার (২৯ জুলাই) দুপরে মক্কা হিল্টন হোটেলের সামনে থেকে মিনাগামী বাসে উঠতে উঠতে সৌদি আরবে বসবাসকারী আরব আমিরাতের নাগরিক আবদুল্লাহ আল কাসিরি এভাবে তার অনুভূতি ব্যক্ত করছিলেন রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেলের কাছে।

হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম এবং সক্ষম মুসলমানদের জন্য জীবদ্দশায় কমপক্ষে একবার ফরজ। এটি বিশ্বে মুসলিমদের বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশ। তবে এ বছর সৌদি আরবে অবস্থানরত মাত্র ১০ হাজার মানুষ হজে অংশ নিচ্ছেন। হজে অংশ নেওয়া সবাই অনলাইনে নিবন্ধন করে অনুমতি পেয়েছেন।

চলতি বছর হজে অংশ নেওয়া কেউই আগে হজপালন করেননি। প্রত্যেকের বয়স ২০ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে।

সৌদি হজ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১৬০টি দেশের প্রবাসীরা অনলাইন বাছাই প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিল। তবে কতজন আবেদন করেছিল তা তারা জানায়নি। হজ মন্ত্রণালয় টুইটারে প্রত্যাখ্যাত আবেদনকারীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

বুধবার (২৯ জুলাই) মিনায় অবস্থানের মধ্য দিয়ে হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এর আগে করোনা পরিস্থিতির মধ্যে সামাজিক দূরত্ব রেখে পবিত্র কাবা ঘর তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়া সায়ী করেছেন তারা। প্রতি বছর লাখ লাখ হাজিদের তালবিয়া পাঠে মুখরিত থাকে পবিত্র কাবা চত্বর। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এবার অল্পসংখ্যক মানুষের হজ করার সৌভাগ্য হয়েছে।

করোনা সংক্রমণ থেকে হাজিদের সুরক্ষা দিতে অনুসরণ করা হচ্ছে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি। এর অংশ হিসেবে হাজিদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষ বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রতি ৫০ জন হাজির জন্য একজন চিকিৎসক নিয়োগ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। হজে অংশগ্রহণকারীসহ দায়িত্বরত কর্মকর্তাদেরও বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষা ব্যবস্থা করাসহ সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে।

আরাফাতের ময়দান, দূর থেকে দৃশ্যমান জাবালে রহমত বা রহমতের পাহাড়, ছবি: সংগৃহীত

চলতি বছর হজের আনুষ্ঠানিকতায় নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। হজের সময় মাস্ক পরতে হবে সবাইকে। জমজমের পবিত্র পানি পানেও থাকছে কঠোরতা। হজ পালনকারীরা কাবা শরিফ ও হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথরে) চুমু খেতে বা স্পর্শ করতে পারবেন না।

গণমাধ্যমে সৌদি কর্তৃপক্ষ বার বার বলছেন, এ বছর হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে তারা। হাজিদের জরুরি সেবা দেওয়ার জন্য মাশায়েরে মুকাদ্দাসা বা মিনা, মুজদালিফা ও আরাফার আশপাশের অবস্থিত হাসপাতাল, মেডিকেল সেন্টার ও অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতালগুলো প্রস্তুত। এসব হাসপাতালে সব ধরনের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। হজযাত্রীদের জন্য দক্ষ চিকিৎসক দল ও অত্যন্ত উন্নতমানের চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে হজ ও উমরা বিষয়ক উপমন্ত্রী ড. আবদুল ফাত্তাহ মুশতের বরাতে হারামাইন ওয়েবসাইট জানিয়েছে, হজের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্বচ্ছ নীতি গ্রহণ করা হয়।

তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সুস্থতার বিষয়টি। বড় ধরনের কোনো রোগ নেই এমন এবং যার মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি, অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে তাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

সৌদি আরবের হজ ও উমরা মন্ত্রণালয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে হজের আয়োজন করা হয়েছে। এবার কোনো হাজি কোনো ধরনের খাবার বহন করতে পারবেন। স্বাস্থ্যসম্মত খাবার, পানীয় সরবরাহ করা হচ্ছে। এমনকি হাজিদের মাঝে বিতরণের জন্য জমজম পানির ছোট ছোট বোতল প্রস্তুত করা হয়েছে। সেগুলো বিতরণ করছে হারামাইন প্রশাসন।

আরব নিউজের খবরে বলা হয়েছে, হজযাত্রীদের মাঝে পর্যাপ্ত পরিমাণে তা সরবরাহ করা হবে। পানিগুলো অত্যন্ত স্বাস্থ্যসম্মত ও জীবাণুমুক্ত উপায়ে বোতলজাত করা হয়েছে। এক বোতল থেকে একাধিক ব্যক্তির পানি পান করার ওপরেও কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

হজ উপলক্ষে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও বিস্তাররোধে সৌদির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, জমজম পানির ছোট ছোট বোতল বিতরণ তারই অংশ বলে জানিয়েছে দেশটি।

হজের আনুষ্ঠানিকতার আগে বাড়তি সতর্কতা হিসেবে নির্বাচিত হাজিদের মক্কার বিভিন্ন হোটেলে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছিল, যেন তারা করোনা ঝুঁকিমুক্ত থাকেন। এর অঅগে হাজিদের জন্য হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ সুরক্ষিত ইহরামের কাপড়, জায়নামাজ, হজ নির্দেশিকা, জামারাতে নিক্ষেপের জন্য জীবাণুমুক্ত কঙ্কর, ছাতা এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ একটি লাগেজ সরবরাহ করা হয়। যেন তারা সুস্থতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে নির্বিঘ্নে হজের কাজ সম্পন্ন করতে পারেন।

এ বছর সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত গাড়ির ব্যবস্থা থাকায় হয়তো কাউকে পায়ে হেঁটে মক্কা-মিনা-আরাফাত ও মুজদালিফায় যেতে হবে না। তবে মুজদালিফা থেকে মিনা যারা স্বেচ্ছায় হেঁটে যেতে চান তাদের কথা ভিন্ন। নির্দিষ্ট রাস্তা দিয়ে তারা যেতে পারবেন। কিন্তু ভিড় করা যাবে না।

প্রত্যেক হজযাত্রীকে ইলেক্ট্রনিক ব্রেসলেট দেওয়া হয়েছে। যাতে তাদের অবস্থান ও গতিবিধি নিরীক্ষণ করা যায়। সৌদি আরবের সরকারি সংবাদমাধ্যম ও টেলিভিশন চ্যানেল ছাড়া বিদেশি কোনো সংবাদমাধ্যমকে হজের মক্কায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

-আল আরাবিয়া অবলম্বনে মুহাম্মদ বিন ওয়াহিদ