জাহালম কারামুক্ত, দুদকের দায়মুক্তি!

নাজমুল হাসান সাগর, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

জাহালমের কারামুক্তির মাধ্যমে দায় মুক্ত হয়ে বছর শুরু। এরপর বহুল আলোচিত বালিশ, পর্দা ও ক্যাসিনো কাণ্ডসহ দুর্নীতিগ্রস্ত দুদক কর্মকর্তাদের বরখাস্ত এবং গ্রেফতার করার মাধ্যমে ইতিবাচক আলোচনায় আসে দুদক। অন্যদিকে সরকার ঘোষিত শুদ্ধি অভিযান দুদকের কর্মকাণ্ডের পালে দিয়েছে জোর হাওয়া। কর্মকাণ্ড বাড়ার সাথে সাথে দুদকের সক্ষমতা ও কর্ম পদ্ধতিতেও এসেছে পরিবর্তন। বছরের শেষে এসে দুর্নীতিবাজদের অবৈধ টাকা বাজেয়াপ্ত করে তুমুল আলোচনার জন্ম দেয় দুর্নীতি বিরোধী এই সংস্থাটি।

নিরপরাধ জাহালম গ্রেফতার ও কারামুক্তি

সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগে আবু সালেক নামে একজনের বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। পরবর্তী সময়ে চার্জশিটে আসলে জাহালমকে সালেক নামে গ্রেফতার করা হয়।

পাঁচ বছর আগে সালেককে তলব করে দুদক চিঠি দিলে সেই চিঠি পৌঁছে জাহালমের টাঙ্গাইলের বাড়ির ঠিকানায়। ভাই শাহীনের কাছে খবর পেয়ে নরসিংদীর ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুট মিলের শ্রমিক জাহালম বাড়িতে আসেন। পরে দুই ভাই একসঙ্গেই যান দুদক কার্যালয়ে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জাহালম দুদককে জানান, তিনি আবু সালেক নন। সোনালী ব্যাংকে তার কোনো অ্যাকাউন্টও নেই। ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য আবু সালেকের যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটিও তার নয়। কিন্তু দুদকে উপস্থিত বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তারা অনুসন্ধানকালে জাহালমকেই ‘আবু সালেক’ হিসেবে শনাক্ত করেন। মামলার চার্জশিট হওয়ার পর জাহালমের বিরুদ্ধে আদালত থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। পরে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঘোড়াশাল থেকে জাহালমকে গ্রেফতার করে দুদক।

২০১৮ সালে জাহালমের বড় ভাই শাহানূর মিয়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের দ্বারস্থ হন। পরে মানবাধিকার কমিশনের তদন্তে বেরিয়ে আসে, আবু সালেক আর জাহালম এক ব্যক্তি নন। এ নিয়ে একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তা হাইকোর্টের নজরে আনেন একজন আইনজীবী। ফেব্রুয়ারিতে বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের বেঞ্চ জাহালমকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে মুক্তির আদেশ দেন।

দুর্নীতিগ্রস্ত দুদক পরিচালক বাছির গ্রেফতার

চল্লিশ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের ঘটনায় দুদকের পরিচালক এনামুল বাছিরসহ পুলিশের বিতর্কিত ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে চলতি বছর ১৭ জুলাই মামলা করে দুদক। ফরেনসিক পরীক্ষায় ঘুষ লেনদেন নিয়ে তাদের কথোপকথনের অডিওর সত্যতা পাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। বরখাস্ত হওয়া পুলিশ কর্মকর্তা মিজান আগে গ্রেফতার হলেও বাছির গ্রেফতার হন ২৩ জুলাই।

নিজস্ব কার্যালয়ে দুদকের মামলা

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনের সংশোধিত বিধিমালার মাধ্যমে এ বছর ২৪ জুন থেকে ২২টি সমন্বিত কার্যালয়ে মামলা করতে পারছে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক। সংশোধিত বিধিমালার গেজেট হওয়ার পর থেকেই পুরনো বিধির কার্যকারিতা স্থগিত হয়ে গেছে। নতুন বিধি অনুযায়ী দুর্নীতির যেকোনো অভিযোগের মামলা প্রতিষ্ঠানটির নিজ দফতরেই করা যাচ্ছে।

ক্যাসিনো কাণ্ড

সরকার ঘোষিত শুদ্ধি অভিযানের পরে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেছে দুদক। ক্যাসিনো কাণ্ডে এখন পর্যন্ত ১০৫ জনের একটি দীর্ঘ তালিকা করেছে সংস্থাটি। এই তালিকা ধরে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ, মামলা ও গ্রেফতার অব্যাহত আছে। এর মধ্যেই ক্যাসিনো কাণ্ডে সম্পৃক্ত বেশ কয়েকজন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের কমিশনার, বিতর্কিত ঠিকাদার, বিভিন্ন ক্লাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাসহ ক্ষমতাসীন দলের বড় নেতা-কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মামলা দায়ের করে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করেছে দুদক। মামলার পরে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে যাদের আদালতে হস্তান্তর করা হয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম বিতর্কিত ঠিকাদার জিকে শামীম, যুবলীগ নেতা খালিদের ঘনিষ্ট সহযোগী আরমান, বিসিবি পরিচালক লোকমানকে আদালতে প্রেরণ করেছে দুদক। এছাড়া সম্রাটসহ আরো অনেকেই আছেন এই তালিকায়।

রূপপুর বালিশকাণ্ড

৩১ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ এনে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের বালিশকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ৪টি মামলা করেছে দুদক। পাবনা গণপূর্ত বিভাগের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল আলমসহ ১৩ প্রকৌশলীকে গ্রেফতার করা হয়েছে এই চার মামলায়। গত ১২ ডিসেম্বর পাবনা ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ১১ প্রকৌশলী ও দুই ঠিকাদারকে গ্রেফতার করে দুদক। এর আগে গত নভেম্বর মাসের ৬, ৭ ও ৮ তারিখ পর্যন্ত গণপূর্তের ২৯ প্রকৌশলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক।
বালিশকাণ্ডের ঘটনায় ৪টি মামলা হয় পাবনার দুদকে। অভিযোগে বলা হয়, রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আবাসিক প্রকল্পে একটি বালিশের পেছনে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬ হাজার ৭১৭ টাকা। একইভাবে টেলিভিশন, খাট, রেফ্রিজারেটরসহ বিভিন্ন সামগ্রী ভবনে তুলতে অস্বাভাবিক খরচ দেখানো হয়।

ফরিদপুর মেডিকেলের পর্দাকাণ্ড

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অপ্রয়োজনীয় এবং অবৈধভাবে প্রাক্কলন ব্যতীত উচ্চমূল্যে হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ক্রয়ের মাধ্যমে সরকারের ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের চেষ্টার অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক। চলতি বছরের ২৭ নভেম্বর দুদকের ফরিদপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলা করেন সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী। মামলায় ঠিকাদার ও চিকিৎসকসহ মোট ছয়জনকে আসামি করা হয়।

ডিআইজি পার্থ

গত ২৮ জুলাই সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের ডিআইজি (প্রিজন) পার্থ গোপাল বণিককে ঘুষের ৮০ লাখ টাকাসহ গ্রেফতার করেছিলো দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তার ফ্ল্যাটের বিভিন্ন কক্ষের তোশক, বালিশের কভার এবং আলমিরায় লুকিয়ে রাখা এসব টাকা উদ্ধার করে পার্থ গোপালকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেফতার করা হয়।

ডিআইজি প্রিজন্স বজলুর রশীদ গ্রেফতার

গত ২০ অক্টোবর দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুদক কার্যালয়ে ডাকা হয় কারা অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বজলুর রশীদকে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দুর্নীতির কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়া তাৎক্ষণিক মামলা দায়েরের মাধ্যমে তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করে দুদক।

দুর্নীতিবাজদের অর্জিত ৫২৪ কোটি অবৈধ টাকা বাজেয়াপ্ত

গত ১৭ ডিসেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত ইউনাইটেড কনভেনশন এগেইন্সট করাপশন শীর্ষক এক কনফারেন্সে বাংলাদেশের পক্ষে ইকবাল মাহমুদ বক্তব্য প্রদানকালে জানান, বিভিন্ন দুর্নীতির মামলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৫২৪ কোটি ১১ লাখ টাকা বা ৬১.৬৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়েছে।

এছাড়াও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এ বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দুদক ২৫টি ব্যাংক হিসাব, ৬ জন উপকারভোগীর বিভিন্ন বন্ড, সিকিউরিটিজ এবং বিমা পলিসি জব্দের মাধ্যমে ২.৯২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের অর্থ জব্দ করেছে। একই সময়ে ৫টি বৈদেশিক ব্যাংক হিসাবের ০.৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারও জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া ১২.৪৪ একর জমি, বিভিন্ন প্রকারের ১০টি বাড়ি, ৪টি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট, দুইটি বাণিজ্যিক স্থাপনা এবং ৬টি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করা হয়েছে।

বেড়েছে সাজার হার

দশ বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় সাজার হার ৪৪ ভাগ বেড়েছে বলে দাবি করছে সংস্থাটি। সংস্থাটির প্রধান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, এখন দুর্নীতি ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ২০১১ সালে কমিশনের মামলায় সাজার হার ছিল মাত্র ২০ শতাংশ। যা ২০১৯ সালে ৬৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

দুদক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি বছরের বাড়তি কাজগুলো নিয়ে আগামী বছরে আরো কিছু নতুন কাজের সাথে খুব কর্ম ব্যস্ত সময় যাবে দুদকের। আসতে পারে দুর্নীতিবাজদের নতুন তালিকা, বাড়বে অর্থ হস্তান্তর, রূপান্তর ও পাচারের দায়ে মামলার সংখ্যা।

আপনার মতামত লিখুন :