Barta24

বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯, ৫ ভাদ্র ১৪২৬

English

ইফতারের জৌলুস ও পার্থিব আলোচনা সভা

ইফতারের জৌলুস ও পার্থিব আলোচনা সভা
প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তা২৪.কম
প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম


  • Font increase
  • Font Decrease

রমজানে সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতার করে একজন রোজাদার তার দেহ-মনের পবিত্রতা ও প্রফুল্লতা লাভ করে থাকেন। শুধু খাদ্যসামগ্রী দিয়ে রোজা ভঙ্গ করাই নয়, ইফতারির সময় দোয়া কবুলেরও সময়। এসময় খাঁটি রোজাদাররা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে দোয়া করে পানাহ চেয়ে থাকেন। এতে রোজারদের দেহ-মনে স্বর্গীয় প্রশান্তি আসে।

আমদের দেশে পবিত্র রমজানের রোজাকে সামনে রেখে আলোচনা সভা ও ইফতার একসংগে করার হিড়িক পড়ে যায়। এরকম কোনো কোনো আয়োজনে দীর্ঘ সময়ব্যাপী নানা ধরনের পার্থিব বিষয় নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা, বিতর্ক, এমনকি গালাগালি, বিষোদগার, ঝগড়াঝাটি শেষে ইফতার করা হয়। অনেক সময় হাস্যকর বিষয়েও ইফতারে হট্টগোল বাঁধতে দেখা যায়। এতে ইফতারের মতো একটি মহান ধর্মীয় বিষয়ের মাহাত্ম্য, সৌন্দর্য ও স্বর্গীয় আমেজ-অনুভুতি নষ্ট হয়ে পড়ে।

অনেকে আজকাল ইফতারকে নিছক পার্টির আবরণে ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু ইফতার তো কোনো বিয়ে-জন্মদিন বা রাজনৈতিক-ব্যবসাপাতির কোনো বিষয় নয়। রোজাদারগণ ভুলেই বসেন কোনটা ভালো কোনটা মন্দ অথবা কোনটা গিবত কোনটা রিয়া আর কোনটা শিরক্ কোনটা তাকওয়া ! তাই রিয়া, বেদআত, ও তাক্ওয়া বিষয়গুলো বোঝাটা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে বলে আমার মনে হয়।

কারণ, রিয়া হলো অহেতুক লোক দেখানো বিষয়। ইসলাম অহেতুক জৌলুস করে লোক দেখানো বিষয় সমর্থন করে না। রোজা একটি সাধনার ব্যাপার ও সর্বোপরি এটা আত্মিক ইবাদত। এখানে লৌকিকতার কোনো স্থান নেই। রোজা আল্লাহর প্রদত্ত বিধান। মানুষের অধ্যাত্মিক শিক্ষা ও প্রগতির জন্য রোজা হচ্ছে একটি উপায়। রোজা মানুষকে অশালীন প্রবৃত্তিরোধ করে শৃংখলাবদ্ধ হতে সক্ষম করে। এটা ধনী-গরীব সব মানুষকে একই ক্ষুৎ-পিপাসার অভিজ্ঞতা প্রদান করে থাকে। তাই একজন খাঁটি মুসলমান শুধু মিডিয়ায় প্রচারের জন্য স্বার্থপরের মত ভোগবিলাসী বড়লোকী খানাপিনায় মত্ত হবার মতো ইফতার করতে পারেন না।

বেদআত হলো যেটা মূল বিষয় থেকে বিকৃত করে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। ধর্মকাজে নতুনত্ব সৃষ্টি করা বা পরিবর্তন করাকে বেদআত বলে (ওয়াজ ও খুতবা ১০৯, ২৬০)। শরীয়তের মধ্যে কিছু বৃদ্ধি বা সংমিশ্রণ করে মনগড়া ও বিকৃত জিনিস হলো বেদআত। এর ফলে শয়তানের ধোঁকার মধ্যে পড়ে গুমরাহির পথ প্রশস্থ হয়।

তাক্ওয়া হলো- খোদাভীরু হওয়া, মুত্তাক্কী হওয়া। সবসময় আল্লাহর কথা স্মরণ করা ও তাঁর ভয়ে ভীত থাকা। আল্লাহতায়ালা সবসময় বিরাজমান, সঙ্গে আছেন, সব কাজ দেখছেন-মানুষের অন্তরে এমন বিশ্বাস হওয়াটাই তাক্ওয়া । রোজাদার ব্যক্তির মধ্যে মুত্তাকীর ভাব চলে আসে। তাই সে খারাপ কাজ করতে চায় না।

বলা হয়ে থাকে আমরা বাংলাদেশীরা সংকর বাঙালি। এ জাতির ভাবনা চিন্তাও সংকর ও কিছুটা মিশ্র। আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষতার একটি মুলনীতি রয়েছে। বলা হয়ে থাকে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। তাই সব ধর্মের মানুষ এদেশে সমান ধর্মীয় সুবিধা ও অধিকারের সুযোগ পেয়ে থাকেন।


প্রায় পঁচাশি ভাগ ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের এদেশে রোজা ও ইফতার পালন একটি অন্যতম বৃহৎ ও মহৎ ধর্মীয় অনুষঙ্গ। এদেশের মানুষ আশাবাদী, কর্মঠ ও ভাগ্যে চরম বিশ্বাসী। বার আওলিয়ার এ পূণ্যভূমিতে ধর্মপরায়ণ মানুষের সংখ্যা অবাক করার মত। আমাদের অনেক ক্রিকেট খেলোয়াড়রা ভালো কিছু করলে বহি:র্বিশ্বের মাঠে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ পবিত্র ক্কাবার দিকে সিজদা দিতে দেরি করেন না। ঢাকা মসজিদের শহর হিসেবে খ্যতি পেয়েছে বহু পূর্বেই। একবার এক বিদেশী অতিথিকে হোটেলে ঘুমিয়ে দিয়ে আমি বাসায় এসে ঘুমিয়েছিলাম। পরদিন সকালে জিজ্ঞাসা করলাম- ‘ঘুম কেমন হয়েছে?’ সে বলল- ‘ভোর বেলা কে যেন লাউড স্পীকারে সুর করে কিছুক্ষণ কিছু বলল। আমি সে সুরেলা আওয়াজে বিমোহিত। চল তার সাথে দেখা করব।’ আমি বললাম, সেটা কোনো মেলোডি নয় ‘আজান- আই মিন মর্নিং প্রেয়ার কল।’ সে বলেছিল, আমরা রোজ সকালবেলা প্রার্থনা করি না, অথচ তোমরা সৃষ্টিকর্তার প্রতি দৈনিক পাঁচবার নত হও, তোমরা কতো কৃতজ্ঞ। তাই তো তোমরা বিশ্বের সবচে’ সুখী মানুষের কাতারে নাম লিখিয়েছ!


হ্যাঁ, আমরা বাংলাদেশের মুসলমান তথা সবাই খুব সুখী জীবনযাপন করি। যদিও আমরা জাতি হিসেবে এখনও কোনো কোনো দেশের মানুষের চোখে দরিদ্র, হাতপাতা ও মিসকিন মানুষ বলে পরিচিত। সেসব দেশের মানুষও একসময় অভাবী ছিল, খেতে পেতো না। তারা এখন অনেকে সমুদ্রে শততলা বাড়ি বানিয়ে বিলাসী জীবন যাপন করে। শ্রমজীবি বিদেশিদের তারা বেশি খাঁটিয়ে নিয়ে কম মজুরী দেয়, নির্যাতন করে, ঘৃণা করে। নিজেদের বিলাস-ব্যসনের পাশাপাশি তাদের অনেকের মনে দারিদ্র্য ও হতাশা জন্ম নিয়েছে।

মনে দারিদ্র্য ও হতাশা থাকলে সুখী হওয়া যায় না। আজকাল আমাদের দেশেও অনেকে নব্য ধনবান হয়েছেন, তাদের অনেকের মনে অসুখ ধরেছে। কেউ কেউ দু’চার বছরে এত বেশি ধনবান ও ক্ষমতাশালী বনে গেছেন যে- সবসময় ধরাকে সরা জ্ঞান করে চলাফেরা করে থাকেন। এরা রাস্তায় রং সাইডে চলেন। কেউ তাদের অন্যায় কাজে বাঁধা দিলে বা প্রতিবাদ করলে তাদেরও টুঁটি চেপে ধরতে উদ্যত হন।

ক’দিন আগে একজন পাতি নেতা রং সাইডে গাড়ি চালিয়ে উল্টো ট্রাফিক পুলিশকে চাকরি খেয়ে নেয়ার ভয় দেখিয়ে গালাগালি করে পত্রিকার শিরোনাম হয়েছেন। এর কোনো বিহিত হতে দেখিনি। এ ধরনের অনেক পাতি নেতা বড় বড় ইফতার ‘পার্টি’ দেন। অনেক পাতি নেতার চৌদ্দপুরুষের ভিটেমাটিতে চালচুলো ছিল না। এখন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন।

এছাড়া আজকাল অনেক বড় বড় কর্তারাও ইফতার ‘পার্টি’ দেন। সেসব ‘পার্টি’ তাঁদের নিজেদের বেতন বা বাবার টাকায় নয়। তাঁরা আদেশ দেন বড় বড় ঠিকাদার, অবৈধ চোরাচালানী, মাদক ব্যবসায়ীকে এ সব ‘পাটির্র’ খরচ দিতে। এতে উঠতি পাতি নেতা ও অবৈধ মালদারগণ লক্ষ টাকা চাঁদা দিয়ে এসকল ‘পাটির্র’ আয়োজন করে দিয়ে নিজেরা আরো কোটি কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা বাঁচিয়ে রাখার সুযোগ পান। এরা-ওরা মাসতুতো ভাই। ইফতার বা অন্য যে অবয়বেই হোক না কেন- এই অনৈতিক ‘পার্টি-কালচার’ অচিরেই বন্ধ করতে হবে।

আজকাল এসব ইফতার ‘পার্টিতে’ রঙ-রেজিনী দিয়ে সুদৃশ্য গেট সাজানো হয়, রঙীন আলো দিয়ে মঞ্চ তৈরি হয়। দেশের হোমড়া-চোমড়া মানুষরাই এখানে দাওয়াত পেয়ে থাকেন। জৌলুসে ভরা, লোক দেখানো এসকল ইফতার পার্টিতে আদৌ কোনো ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য থাকে না। পাক-নাপাক, পর্দা-বেপর্দার সমন্বয়ে আজকাল ব্যবসা অথবা রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ইফতারকে ব্যবহার করা হচ্ছে। আজ অমুকের সম্মানে ইফতার-তা হবে কেন? এসব ইফতার ‘পার্টিতে’ দামী রেস্টুরেন্ট বা পাঁচতারা হোটেলের বহু পদের বাহারী খাবার আনানো হয়। ইফতার ‘পার্টি’-র সুস্বাদু বহুপদের স্বাদ নিতে গিয়ে মাগরিবের নামাজের কথা অনেকেরই খেয়াল থাকে না। অনেকে অশালীনভাবে সেজেগুজে ইফতার করতে বসেন। প্রতিদিন টিভিতে এসব দেখানোও হয়ে থাকে। এগুলো রোজার সংযম, আত্মশুদ্ধির প্রচেষ্টা নয়। বরং এগুলো দ্বারা রমজান মাস, রোজা ও ইফতারের মর্যাদাকে প্রহসনে রুপান্তরিত করা হয় মাত্র। লৌকিক, ভোগবাদী এসকল ইফতার ‘পাটির্র’ বা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বর্তমানে আমরা আসল ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছি।

কেউ লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে প্যান্ডেল টাঙ্গিয়ে উচ্চস্বরে মাইক বজিয়ে শতপদের ইফতারীর পসরা নিয়ে বন্ধু-বান্ধবীদের নিয়ে উল্লাস করে ইফতার করবেন-আর প্যান্ডেলের পাশের অভাবী মানুষের খোঁজ নেবেন না অথবা কেউ একটু ছোলা-মুড়ি পাবার আশায় থালা হাত বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াবে- এটা রোজার শিক্ষা নয়। পাশাপাশি আলোচনা সভার নামে ইফতার করতে এসে ‘পার্টিতে’ বসে রোজার আহকাম-আরকান ভুলে গিয়ে আমরা কোনটা গিবত, কোনটা রিয়া আর কোনটা বেদআত গুলিয়ে ফেলছি।

এসকল ইফতার ‘পাটির্র’ আয়োজন ধর্মীয় কাজের মোড়কে আমাদের ধর্মে নব্য অপচয় সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। আজকাল মা-বাবা, ছেলে-মেয়ে, ভাই বোন নিয়ে পরিবারের সংগে বসার ফুরসৎ হয় না। সবাই একত্রে ইফতার করার সময় যেন একবারেই উধাও হয়ে গেছে। এতে চিরায়ত পারবারিক বন্ধন কমে যাচ্ছে। মা-বাবারা তাদের উঠতি বয়সের সন্তানদের সাথে ভালো করে কথা বলার সময় পান না। একটি ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে থাকলে নৈতিকতা শাণিত হয়। সাথে বাবা মায়ের স্বেহের বচন, উপদেশ পরামর্শ ইত্যাদি থেকে সুসন্তান তৈরি হয়। এভাবে একটি ইতিবাচক জনগোষ্ঠী তৈরি হয়ে থাকে। নব্য ইফতার পার্টি সংস্কৃতির আলোচনা অনুষ্ঠান থেকে রাজনৈতিক নেতাদের একে অপরের মুখের বিষোদ্গার শুনে নবীনরা নেতিবাচক মানসিকতা অর্জন করছে।

ইসলামে মানুষ মানুষে ভেদাভেদের কোন স্থান নেই। সকল মানুষের সম-সুযোগের ভিত্তিতে সামাজিক সহ-অবস্থান নিশ্চিত করতে না পারলে সামাজিক বৈষম্য আরো প্রকট হবে। সামাজিক বৈষম্য প্রকট হলে সামাজিক বঞ্চনা থেকে নানামুখি সংকট তৈরি হতে থাকবে। সামাজিক এসব সংকট আজকাল অপরাধ বৃদ্ধি করে চলেছে। বর্তমানে সুবিধাভোগী রং সাইডে চলা পাতি নেতারা এবং তাদেরকে অবৈধ মদদদাতা একশ্রেণির নৈতিকতা বিবর্জিত কর্মকর্তা ও সংগঠকরা চরম অনৈতিক কাজে ভীষণভাবে সক্রিয়। এসব লুটেরা এখন দেশের নিম্ন ও মধ্যমশ্রেণির কর্মজীবি, সৎ, ধর্মভীরু মানুষের ঝুলি ও হাঁড়ির ওপর নজর দিয়েছে।


রমজান মাসে আলোচনা সভা ও ইফতার ‘পার্টির’ নামে এখন বিকৃত ভোগবাদী সংস্কৃতি আমাদের সুমহান ধর্মীয় ঐতিহ্যকে বিতর্কিত করে চলেছে। কারণ, লৌকিকতা, জৌলুসে ভরা বে-হিসেবী তথা অবৈধ উৎসের অর্থে কেনা বা সংগৃহীত খাবার মু’মিনদের ইফতারের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে না। তাই এখনই সতর্ক হয়ে সেসকল পথ পরিহার করা আমাদের আশু করণীয়।


আসুন আমরা সবাই পবিত্র রমজানের সুযোগকে কাজ লাগিয়ে সংযমী হই, কল্যাণ, ক্ষমা, মুক্তি তথা মাগফেরাত ও নাজাতের এই ভরা মৌসুমকে কাজে লাগিয়ে নেতিবাচক ইফতার সংস্কৃতি পরিহার করে খাঁটি রোজাদার ও পূণ্যবান হয়ে উভয় জগতের সাফল্য খোঁজার চেষ্টা করি।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান

আপনার মতামত লিখুন :

সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্পের বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে ভাবতে হবে

সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্পের বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে ভাবতে হবে
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

বাংলাদেশের অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও রফতানিমুখী অর্থনৈতিক খাত চামড়াশিল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। চামড়াশিল্পের বিকাশে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অভাব, চামড়া শিল্পনগরীতে সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি, বর্জ্য ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন (সিইটিপি) সমস্যা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ট্যানারি মালিকদের কারসাজি, আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতন, ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তি ও আদায়ে দীর্ঘসূত্রতা প্রভৃতি কারণে চামড়াশিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহল থেকে বলা হচ্ছে।

এর বাইরে একটি বড় বিষয় হলো, বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সেক্টরগুলো সিন্ডিকেটের হাতে বন্দি। ধান, পাট, শেয়ারবাজার, ঠিকাদারি- সবখানে এক শ্রেণির অসৎ ও দুর্বৃত্তের অবাধ বিচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দ্রব্যমূল্য ও বাজার ওঠা-নামার পেছনেও তাদের কালোহাত সক্রিয়।

চামড়ার ক্ষেত্রে একই পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়। ফলে, আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, কোনো কোনো স্থানে গরুর চামড়া সর্বনিম্ন ৫০ এবং ছাগলের চামড়া মাত্র ২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে! খোদ বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু বিশ্বাসের মতে, চামড়ার দাম অবিশ্বাস্য হারে কমে যাওয়ার পেছনে রয়েছে ব্যবসায়ীদের কারসাজি। জানা দরকার ৫০ বছরের ইতিহাসে এটাই চামড়ার সর্বনিম্ন রেট।

সরকারের পক্ষ থেকে এবার গরুর কাঁচা চামড়ার দাম ঢাকায় নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। আর ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। সারা দেশে খাসির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং বকরির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৩ থেকে ১৫ টাকা। বিগত সাত বছরের মধ্যে সরকার নির্ধারিত এটাই সর্বনিম্ন রেট। ২০১৩ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল সর্বনিম্ন ৮৫ আর সর্বোচ্চ ৯০ টাকা। একইভাবে লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট খাসির চামড়ার দর নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল সর্বনিম্ন ৫০ আর সর্বোচ্চ ৫৫ টাকা। কিন্তু কোনো আড়তদার বা ট্যানারির মালিক এ দামে চামড়া কিনতে সম্মত হননি। বলা বাহুল্য, আমাদের দেশের চেয়ে ভারতের আভ্যন্তরীণ বাজারে চামড়ার মূল্য ছিল বেশি।

ন্যায্য দাম না পেয়ে ঢাকার লালবাগ, কুমিল্লা, সিলেট, মৌলভীবাজার, রাজশাহী, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষ কোরবানির চামড়া রাস্তায় রেখে গেছে; ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে অথবা মাটিতে পুঁতে ফেলেছে। সিলেট পৌর কর্তৃপক্ষ ১০ টন চামড়া ভাগাড়ে নিক্ষেপ করেছে। মৌলভীবাজারে এক লাখ চামড়া পচে গেছে। অনেকে চামড়াকে লোমমুক্ত করে রান্না করে খাওয়ার সচিত্র বর্ণনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন।

কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে চট্টগ্রামে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। অস্বাভাবিক দরপতনের কারণে আড়তদারদের কাছে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে নগরীর বিভিন্ন স্থানে এক লাখেরও বেশি কোরবানির পশুর চামড়া বাধ্য হয়ে রাস্তায় ফেলে দেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। রাস্তা থেকে সেই পচা চামড়া ট্রাকে করে দুটি আবর্জনার ভাগাড়ে ফেলেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। এ অবস্থায় মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনও অনেকটা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, 'এ ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক ও নজিরবিহীন। এর পেছনে কোনো চক্রান্ত আছে কি না, তদন্ত হওয়া উচিত।'

তাই প্রশ্ন উঠেছে, চামড়ার বাজার ধ্বংসের পেছনে সিন্ডিকেট কাদের স্বার্থে কাজ করছে? অপরদিকে, আড়তদারদের বক্তব্য হলো, ট্যানারি মালিকদের কাছে তাদের ৫০ কোটি টাকা বকেয়া পাওনা থাকায় অর্থাভাবে তারা চামড়া কিনতে পারেননি। উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে আড়তদারের সংখ্যা ২৬২। ইতোমধ্যে বেশ কিছু ট্যানারি বন্ধ হয়ে গেছে।

চামড়াশিল্পে বিপর্যয় নেমে আসার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মোসুমি কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন এতিমখানা কর্তৃপক্ষ। ব্যবসায়ীরা পুঁজি হারিয়ে পথে বসে গেছেন। চামড়া বিক্রি করলে তা অনাথ, এতিম, দরিদ্র ও দুস্থদের দান করাই শরিয়তের বিধান। এই স্বেচ্ছাদানের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মাদরাসা, হিফজখানা ও এতিমখানার লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের শিক্ষার্থীদের খাবার জোগান দেয়া হয়। বিক্রি করতে না পেরে তাদের অনেকে চামড়া পুঁতে ফেলতে বাধ্য হয়েছে। অনেকে লবণ মেখে সংরক্ষণ করেছেন যাতে পরবর্তীকালে কোনো সময় দাম পাওয়া গেলে তখন তা বিক্রির আশায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে চামড়া রফতানি করে বছরে পাঁচ হাজার কোটি টাকা আয় করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, দেশে বিভিন্ন প্রয়োজনে মাসে ৫০ লাখ বর্গফুট চামড়া বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। অথচ রফতানি করার পরও ১১ কোটি ঘনফুট চামড়া আমাদের দেশে অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। দেশে চামড়াজাত দ্রব্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে ২২ কোটি ঘনফুট চামড়া রফতানি করা যায়। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে ১১৩ কোটি ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে চামড়া খাত থেকে আয় হয় ৮৩ কোটি ৭১ লাখ ডলার। ছয় বছরে ৩০ কোটি টাকা হ্রাস পেয়েছে এই আয়।

বাংলাদেশে সারা বছরই পশু জবাই হয়। শহর, নগর ও গ্রামের বাজারে সর্বত্র গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার গোশত বিক্রি করা হয়। এতে জনগণের দৈনিক পুষ্টির চাহিদা যেমন মিটে, তেমনি চামড়ার উৎপাদনও বাড়ে। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, সারা বছর এ দেশে প্রায় দুই কোটি ৩১ লাখ গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া জবাই হচ্ছে। এর অর্ধেকই হয় কোরবানির ঈদে। গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া মিলিয়ে দেশে এ বছর কোরবানি হয়েছে প্রায় এক কোটি ১৬ লাখ পশু। বাংলাদেশের ২২০টি ট্যানারি থেকে বছরে প্রায় ২৫০ কোটি বর্গফুট কাঁচা চামড়া (হাইড ও স্কিন) প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এর মধ্যে ৬৩ দশমিক ৯৮ শতাংশই গরুর চামড়া। ছাগলের চামড়া ৩২ দশমিক ৭৪ শতাংশ ও মহিষের চামড়া ২ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং ভেড়ার চামড়া রয়েছে ১ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। প্রক্রিয়াজাত চামড়ার মধ্যে ৭৬ শতাংশের বেশি রফতানি করা হয়। বাংলাদেশের ৯৩টি বড় নিবন্ধিত জুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বছরে প্রায় ৩৭ কোটি ৮০ লাখের বেশি জোড়া জুতা তৈরি করে থাকে।

চীন বাংলাদেশি চামড়ার অন্যতম প্রধান আমদানিকারক। এটা দিয়ে তারা জুতা, স্যান্ডেল, পার্স, ব্যাগ, বেল্ট তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাঠাত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক ধার্যের হুমকি দিলে চীনের আমদানিকারকরা আগের দামে চামড়া কিনতে আগ্রহী নন। ফলে বাংলাদেশের চামড়া রফতানি বাণিজ্যে শুরু হয়েছে ভাটার টান।

দরপতনের কারণে বিপুল পরিমাণ চামড়া চোরাই পথে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পাচার হয়ে যায়। ভারত চামড়ার আন্তর্জাতিক বাজার ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। প্রতি বছর ৫১ মিলিয়ন গরু, ১২৮ মিলিয়ন ছাগল ও ভেড়ার চামড়া উন্নত দেশে রফতানি করে ভারত আয় করে ৬৭৭ মিলিয়ন ডলার। এর আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, হংকং, চীন, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভিয়েতনাম। ভারতীয় চামড়ার বাজার ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে তা।

বাংলাদেশের ট্যানারিগুলো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর না হওয়ায় এবং সিইটিপি সুবিধাসংবলিত পর্যাপ্ত বর্জ্যশোধনাগার গড়ে না ওঠায় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য কেনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি গরু, মহিষ, ভেড়া ও ছাগলের চামড়ার কদর রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার চাহিদা নেই, ট্যানারিগুলোতে আগের বছরের ৫০ শতাংশ চামড়া অবিক্রিত অবস্থায় রয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমান অবস্থায় এত চামড়ার চাহিদা নেই, চামড়া কেনার জন্য পর্যাপ্ত ব্যাংক ঋণ পাওয়া যায়নি, ইত্যাদি কারণ দেখিয়ে এতদিন ট্যানারি মালিকরাই কাঁচা চামড়া কেনার প্রতি অনাগ্রহ দেখিয়ে এসেছেন। ফলে এ বছর কোরবানির ঈদের পর সারা দেশে কাঁচা চামড়া বিক্রিতে ধস নামে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য গত ১৩ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত নিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত মূল্যে কাঁচা চামড়া ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে না। তাই চামড়ার উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করতে সরকার কাঁচা চামড়া রফতানির অনুমতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে চামড়া শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল হওয়ারও আহ্বান জানানো হয়।

সরকারের কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্তের পর নড়েচড়ে বসেন ট্যানারি মালিকরা। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) এবং বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএলএলএফইএ) ১৪ আগস্ট সংবাদ সম্মেলন করে কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসার দাবি জানায়। এতে দেশীয় ট্যানারিগুলো কাঁচা চামড়ার সঙ্কটে পড়বে বলে তাদের অভিযোগ। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এখনো চামড়া রফতানির সিদ্ধান্তে অটল কূটনৈতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশকে চামড়ার বাজার খুঁজতে হবে। সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চামড়াজাত দ্রব্য রফতানির কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এই সিদ্ধান্তটি আগেভাগে নিলে মাঠ পর্যায়ের মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচতে পারতেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিবর্গের সাথে বসে সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের পথ বের না করলে ঐতিহ্যসমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্প ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা এবং দরিদ্র-এতিমদের কষ্টের মাধ্যমে সামাজিক সমস্যারও উদ্ভব হবে। ফলে বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ স্তরের গভীর মনোযোগ দাবি করে।

লেখক: ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন: বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ইসলামী চিন্তাবিদ।

ভিআইপিতান্ত্রিক বাংলাদেশ

ভিআইপিতান্ত্রিক বাংলাদেশ
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

বাংলাদেশ ফেরি ঘাটে আটকে আছে যেন বাপ্পি হয়ে। ভিআইপির ভারে ন্যুব্জ মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ। সংবিধানের ব্যাখ্যাদাতা হাইকোর্ট জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আর কেউ ভিআইপি নন।

ইউরোপ নিজ দেশে গণতান্ত্রিক আইন চালু করলেও উপনিবেশ-আধা উপনিবেশ ও পরাধীন অঞ্চলগুলোতে জমিদারি বা ভিআইপি কানুন বহাল রেখেছে। ১৭৭৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন, ১৮৬০ সালের পেনাল কোড, ১৮৬১ সালের পুলিশ অ্যাক্ট, ১৮৭২ সালের এভিডেন্স অ্যাক্ট, ১৮৭৮ সালের আর্মস অ্যাক্ট, ১৮৯৮ ক্রিমিন্যাল প্রসিডিউর অ্যাক্ট, ১৯০৮ সালের সিভিল প্রসিডিউর কোডসহ ১৯১০ সালের মধ্যে পরাধীন ভারতের আইনগত কাঠামো নির্মাণ মোটামুটি শেষ হয়। এরই মধ্যে এই অঞ্চলের লড়াই ও রাজনীতির নিজস্ব পথ শেষ করা সম্ভব হয়। এর ফলে কথিত ভিআইপি সংস্কৃতির আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়। ফলে ট্রেন-বাস-হাসপাতাল থেকে শুরু করে সর্বত্র এটি চালু হয়।

আজকের বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদের 'প্রচলিত আইন' ও 'আইন' এর সংজ্ঞা অনুসারে এই ব্রিটিশ বিধি মুক্তিযুদ্ধের সংবিধানে আত্মীকৃত হয়। একজন উপজেলা চেয়ারম্যান জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন কিংবা ডিসি আমলাতান্ত্রিক বিধানে নিযুক্ত হন; তারা একই একেকজন জমিদারে পরিণত হন। তারা দাবি করেন, জনগণ তাদের স্যার বলুক। বাংলাদেশ ভিআইপিতান্ত্রিকই থেকে যায়। কিছুদিন আগে সুপ্রিমকোর্ট একটি বক্তব্যে বলেছিলেন, আমরা এমন একটি পঙ্গু সমাজে বসবাস করছি যেখানে ভাল মানুষ স্বপ্ন দেখতে পারছে না, রাজনীতি বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে,... আমাদের পূর্বপুরুষরা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, কোনো ক্ষমতার দৈত্য নয়।

সংবিধানের ৭(ক) অনুসারে জনগণ রাষ্ট্রের মালিক বটে, তবে যখন সেই মালিকানা সংবিধানের অধিন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হয়, তখন সংবিধানই বলে, সেই মালিকানা একচ্ছত্রভাবে ভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী। আর প্রচলিত আইন অনুসারে জেলা, উপজেলার শীর্ষ কর্তারা একেকজন ছোট প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ভোগ করেন। ডিসি সম্মেলনগুলোয় বছর বছর যে দাবিগুলো উঠে, এ তারই প্রতিফলন। আলিশান বাড়ি ও গাড়ির দাবি যে ক্যাডাররা দাবি করেন, সেটাও। চাকরির ট্রেনিংগুলোতেও তাই শেখানো হয়, তারা বিশেষ কিছু। এই জন্যই আমলারা জনপ্রতিনিধিদের ঠাট্টা করে বলেন, তাদের ক্ষমতা পাঁচ বছরের নয়। ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পরেই কেবল এটা আলোচনায় এল।

আইন প্রণয়নে সংসদের একচ্ছত্র ক্ষমতা আছে বলে মনে করি। অথচ ১৫২ অনুচ্ছেদে আইন অর্থ কোনো আইন, অধ্যাদেশ, আদেশ, বিধি, প্রবিধান, উপ-আইন, বিজ্ঞপ্তি ও অন্যান্য আইনগত দলিল এবং বাংলাদেশের আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন যেকোনো প্রথা বা রীতি। মানে ডিসি, সচিবদের সেইসব আদেশ, বিধি, প্রবিধান, উপ-আইন আর বিজ্ঞপ্তিও আইন। এইভাবে সংসদ ছাড়াও আইন তৈরি হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশের অধিকাংশ আইন এইভাবে তৈরি হয়। তাই একজন ইউএনও কিংবা পুলিশ সুপার চুলের ছাঁট বা গণঅধিকার সংকুচিত করতে পারেন আইন শৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে। পুলিশ সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কিংবা সরল বিশ্বাসে গুলি করে মেরে ফেলতে পারে। আমলাদের বেলায় সরল বিশ্বাস দুর্নীতি নয়। কিংবা বিভাগীয় মামলার নামে সামরিক আদালতের মতো আলাদা আদালতি কর্ম সারতে পারেন। যা বাংলাদেশের কোনো আদালতে আপিল করা যাবে না।-এইভাবে ভিআইপিতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠিত হয়েছে। অথচ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়ে সাম্য, মৈত্রী আর স্বাধীনতাকে লক্ষ্য ধরে। অথচ বাংলাদেশ কাঁতড়াচ্ছে ফেরি ঘাটে।

১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন ও ১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট অ্যাক্ট এর অধীনে ভারত-পাকিস্তান নামে স্বাধীন ডোমিনিয়নে বিভক্ত হয়। মানে বৃটিশদের প্রণীত সংবিধানের অধিনে দুটি দেশ স্বাধীনতার পথে যাত্রা শুরু করে। আর মুক্তিযুদ্ধের দামে কেনা বাংলাদেশও এক বছরের মাথায় একই পথে যাত্রা করে। ফলে ভিআইপিতন্ত্রের কবল থেকে বাংলাদেশের মুক্তি ঘটে না।

লেখক: রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সভাপতি।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র