শিল্পসাহিত্যে ‘স্বাধীনতা’



দেবদুলাল মুন্না
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজের মত প্রকাশ করে সক্রেটিসকে পান করতে হয়েছিল হেমলক, রাশিয়ায় বরিস পাস্তেরনাকসহ অনেক লেখককে হতে হয়েছিল নির্বাসিত, হুমায়ুন আজাদ হয়েছিলেন হামলার শিকার, তসলিমা নাসরিন, দাউদ হায়দার হয়েছেন নির্বাসিত। এমন অজস্র উদাহরণ দুনিয়া জুড়ে। কথা হচ্ছে ‘কতটুকু স্বাধীনতা আপনি পেতে চান?’ এ প্রশ্ন ছিল ডিডোডাসের—প্লেটোর কাছে। প্লেটো উত্তরে বলেছিলেন, “যতটুকুর দায় মানুষকে ভালোবেসে নেওয়া যায় ততটুকু।”

কিন্তু তার উত্তরে আমরা পরিষ্কার নই ‘দায়’টা কতটুকু? আর ‘ভালোবাসাবোধ’ তো ব্যক্তি, মতাদর্শ বিশেষে আলাদা। ঢাকা শহরে কি চাইব পূজা বেদির মতো নেকেড হয়ে কোনো সুস্থ মানুষ হেঁটে যাক? এ বিষয়ে উত্তর খোঁজার আগে দেখা দরকার ঠিক এখন বিশ্বে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেমন? দেখা যাচ্ছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে সোচ্চার ইউরোপের দেশ জার্মানিতে লেখকদের স্বাধীনতাই ‘হুমকির’ মুখে। কখনো সরাসরি, কখনো সামাজিক মাধ্যমে আক্রমণ ও হুমকির ফলে অনেক ক্ষেত্রে অনেক কিছু লিখতেও ভয় পাচ্ছেন লেখকরা।

২০১৮ সালে জার্মানির পেন সেন্টার এক গবেষণায় প্রকাশ করেছে এমন ‘ভয়াবহ’ তথ্য।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিশ্বব্যাপী কাজ করা পেন ইন্টারন্যাশনালের সদস্য জার্মানির পেন সেন্টার। ‘ফ্রি স্পিচ আন্ডার প্রেশার’ বা ‘চাপের মুখে মতপ্রকাশ’ শীর্ষক এই গবেষণায় সহযোগী ছিল উত্তরপূর্ব জার্মানির রোস্টোক ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর মিডিয়া রিসার্চ। গবেষকদের দাবি, এটিই জার্মানিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে করা প্রথম পূর্ণাঙ্গ গবেষণা। গবেষণার আগে এক জরিপের মাধ্যমে লেখকদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। শুধু জার্মান রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদেরই এই জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়৷ তাদের কাছে অনলাইনে একটি ফরম পাঠানো হয়, সেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ে তারা তাদের অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত আক্রমণের ঘটনা ও কিভাবে এমন ঘটনা তাদের কাজকে প্রভাবিত করেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন।

কোন দেশে গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন বা পরাধীন, তা মূল্যায়ন করে প্রকাশিত এ বার্ষিক প্রতিবেদনে তুরস্ককে উল্লেখ করা হয়েছে ‘সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় জেল’ হিসেবে। ২০১৬ সালের কথিত ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর থেকে সে দেশে অনেক সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করেছে এরদোয়ান সরকার। প্রতিবেদনে তুরস্ক আছে ১৫৭ নম্বরে।

৫২৬ অংশগ্রহণকারীর মধ্যে প্রতি চার জনে তিন জন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ৬০ শতাংশ লেখক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তাঁদের লেখার স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মনে করেন।

প্রতি দুইজনে একজন নিজের বা বন্ধুদের ওপর ব্যক্তিগত আক্রমণ ও সহিংসতার শিকার হওয়ার ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে ৩৭ শতাংশ ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, ৩১ শতাংশ করা হয়েছে সরাসরি মৌখিকভাবে৷ অবশ্য শারীরিক সহিংসতার কথা বলেছেন কেবল ২ শতাংশ লেখক।

জার্মান পেনের মহাসচিব কার্লোস কলাডো সাইডেল এক বিবৃতিতে বলেছেন, “একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক দেশে এমন ফল ভয়াবহ।” তারমানে রাষ্ট্র, সরকার, সমাজ তার স্বার্থে আঘাত লাগলেই টেনে ধরবে আপনার টুটি। তাহলে সক্রেটিসের হেমলক পানের সমাজ থেকে আমরা কতদূর এগুলাম? একসময় গ্রিসীয়রা মনে করতেন, কবি ও কবিতা একটা দৈবসত্তা এবং তা সব কিছুর ঊর্ধ্বে—যা ছিল প্লেটোর স্বাধীন চিন্তার বিরোধী। একজন স্বাধীন চিন্তার মানুষের কাছে কোনো কিছুই যুক্তি-তর্কের উপরে নয়। প্লেটো নিশ্চয়ই স্বীকার করতে চাইবেন না যে, কবির কোনো কবিতা আলোচনা সাপেক্ষ নয়। এবং সেটিই শেষ কথা। গ্রিক মহান কবি হোমার নিঃসন্দেহে কালোত্তীর্ণ কবি। কিন্তু তাই বলে তার কবিতা সব কিছুর ঊর্ধ্বে এমন ভাবা প্লেটোর পক্ষে সঙ্গত ছিল না। তাই তিনি তার আদর্শ রাষ্ট্রে সব কিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন দার্শনিক রাজাকে। যিনি একদিকে হবেন প্রচুর জ্ঞানী অন্যদিকে হবেন প্রখর নেতা। প্লেটো মনে করতেন, স্বাধীনতা যেন স্বেচ্ছাচারিতার রূপ না নেয়। কিন্তু তিনিও স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন।

আরো পড়ুন ➥ সাহিত্যে নোবেল, প্রত্যাখ্যান ও কেড়ে নেওয়ার গল্প

তার অনেক অনেক পরে নাইজেরিয়ায় ১৯৫৯ সালে জন্ম নেওয়া বুকার পুরস্কার পাওয়া বেন ওকরি নতুনভাবে প্রশ্ন তুলেছেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ে। তিনি মূলত উত্তারধুনিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের শক্তিশালী লেখক হিসেবে সারা দুনিয়াতেই ব্যাপক পরিচিত। তিনি বলছেন, নিঃশর্ত স্বাধীনতা ছাড়া একটি রাষ্ট্রের জনগণ ভালো বা পরিপূর্ণ হতে পারে না। এটি ব্যতীত সাহিত্যও ভালো হতে পারে না। সাহিত্যের পূর্বশর্ত হলো স্বাধীনতা। জন বেভেরলি রবিনসনের বক্তব্যও তাই। মাত্র দেড় পৃষ্ঠার একটা প্রবন্ধ আছে তাঁর। প্রবন্ধটা লিখেছিলেন ১৮৯৪ সালে। নাম ‘হোয়াট ইজ ফ্রিডম?’ এ প্রবন্ধ পড়ে ভেবেছি এত আগে জন্মানো মানুষ এত দূরের চিন্তা কিভাবে করেছিলেন। রবিনসনের জন্ম ১৮৫৩ সালে এবং মারা যান ১৯২৩ সালে। তিনি একজন individualist anarchist লেখক। লেখক freedom এবং liberty দুটো শব্দ বারেবারে ব্যবহার করছিলেন। ফলে অনুবাদের সময় যাতে বিভ্রান্তি তৈয়ার না হয় করা হয় সেজন্যে ‘স্বাধীনতা’ই রাখা হলো।

হোয়াট ইজ ফ্রিডম (মূল প্রবন্ধ)

‘আপনার কি মনে হয় স্বাধীনতা সবার জন্যে মঙ্গলজনক?’ এক মেধাবী নারী আমার কাছে জানতে চাইলেন ‘লাগামহীন ক্ষমতার নানা উদাহরণ যদি ধরুন, যেমন রোমান সম্রাটেরা, তাদের তো নিশ্চয়ই স্বাধীনতা ছিল, কিন্তু, সেটা থাকা কি ভালো ছিল?’তাই স্বাধীনতার সম্পূর্ণ ধারণা মনে জায়গা করে নেয়ার আগে মানুষ তা নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করে। যে চুরি করে সে কি স্বাধীন নয়? যে বউ পিটায়, সে কি স্বাধীন নয়?

এসময় আমরাও পাল্টা জানতে চাই, ‘যখন রোমান সম্রাটরা শাসন করেছিলেন, তারা হয়তোবা স্বাধীন ছিলেন, কিন্তু, শাসিতরা কি স্বাধীন ছিল? চোর হয়তোবা স্বাধীন হতে পারে, কিন্তু যাকে চুরি করছে সে যে নিগৃহীত হচ্ছে তাতে তো কোন সন্দেহ নাই। যে তার বউকে পেটাচ্ছে, সে হয়তোবা তার শারীরিক শক্তির জোরে বউ পিটাতে স্বাধীন, কিন্তু বউ কি স্বাধীন? স্বাধীনতা মানে আরেকজনের মাথায় মুগুর মারার স্বাধীনতা নয়।’

বুঝলাম এখানেও আপনার আপত্তি রয়েছে। আপনি হয়তোবা বললেন, ‘ধরুন, দুজন ব্যক্তি একই কাজ করতে চায়, এক্ষেত্রে তারা সমঝোতায় আসবে কিভাবে? মনে করুন, আমি একটা নির্দিষ্ট জমিতে একটা বাড়ি তৈরি করতে চাই এবং অন্য আরেকজনও একই জমিতে তার বাড়ি তৈরি করতে চায়। এক্ষেত্রে কিভাবে আমরা দুজনেই নিজেদের খুশিমতো কাজ করার স্বাধীনতা পেতে পারি?’

এ প্রশ্নের জবাব হলো, ‘সকলের স্বাধীনতাই যৌক্তিক এই রীতি যদি আমরা মেনে নেই, তাহলে যে ঘটনাগুলো অন্যের স্বাধীনতা চর্চার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে, সেগুলোর সমাধান খুব সহজেই হয়ে যাবে। একই জমি নিয়ে সমস্যাটা সমাধান এভাবে করা যায় যিনি আগে দাবি করবেন তিনি ওই জমিতে বাড়ি বানাতে পারবেন।’
ধরেন, রাস্তায় হাঁটার স্বাধীনতা সবারই আছে, কিন্তু এর মানে এই না যে একে অন্যের গায়ে এসে পড়তে হবে।

কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, সাংঘর্ষিক কর্ম ও একে অন্যকে দখল করার মতো ঘটনা ব্যতীত যখন আমরা সবার জন্যেই স্বাধীনতা এই নীতি পরিত্যাগ করি; সে স্বাধীনতা যথেষ্ট নয়, কেউ না কেউ কাউকে না কাউকে দমন করবেই। এই দমন প্রক্রিয়ারও কোনো সীমানা নাই। যে ঘটনায় কর্মের সাথে কর্মের সংঘর্ষ হয় সেটা হতে শুরু করে একেবারে যেখানে সংঘর্ষ দূরে থাক, সবার সম্মতি আছে এমন ঘটনা পর্যন্তও সে (দমন প্রক্রিয়া) নিজেকে প্রসারিত করে থাকে। রোববারের আইন (Sunday laws), অন্যান্য দিনে স্বাধীনভাবেই যা কেনা যায় তা সপ্তাহের একদিন কিনতে নিষিদ্ধ করা, স্পষ্টতই জঘন্য। কেনাকাটার কর্ম যেখানে সপ্তাহের ছয়দিন অন্য কারো স্বাধীনতায় বাধা দেয় না, সেখানে সপ্তম দিন এটা বাধা দেবে তা চিন্তা করাই নির্বুদ্ধিতা। এই আইনগুলো প্রণীত হয় যারা এটাকে সমর্থন করে তাদের স্বাধীনতার জন্যে নয়, বরং, এই জন্যে যে তারা অন্যের ওপর তাদের চিন্তা ও কর্ম চাপিয়ে দিতে চায়, এবং সেটা অন্যদের স্বাধীনতার বিনিময়েই। তারা চান, এবং আমাদের প্রত্যেক আইন-প্রণেতারাই চান, সবার ওপর কিছু নির্দিষ্ট কর্ম চাপিয়ে দিতে, কারণ এগুলো ধর্ম অথবা প্রথা অথবা কুসংস্কার দ্বারা অনুমোদিত। প্রকৃতপক্ষে, এই হোয়াইট ক্যাপরা সাধারণত কমিউনিটিতে সর্বোচ্চ সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ, চার্চ ও রাষ্ট্রের স্তম্ভ।

একটা সময় ছিল যখন স্বাধীনতা বরাদ্দ ছিল মাত্র এক ব্যক্তির জন্যে, যার কাছে সবাই ছিল স্বেচ্ছাদাস। কিন্তু এখন ভিন্ন পরিস্থিতি। প্রচুর লোকের হাতে ক্ষমতা আছে এবং তা ব্যবহার করাও তারা শিখছে। মুষ্টিমেয় কিছু লোকের থেকে নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষার জন্যে সবাইকে তাগাদা দেওয়ার প্রয়োজন আর এখন নেই। বরং, আমাদের এখন এই প্রেরণা দিতে হবে যে, স্বাধীনতা মানে নিজের স্বাধীনতা চর্চার পাশাপাশি অন্যকে স্বাধীন হতে দেওয়া। তবে এর বিপরীতে দাসত্বের মনোভাব যা আমরা অতীত থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি, যা অন্যকে আমাদের পথে চলতে বাধ্য করে, তার ওপরেই বর্তমানের শাসন-ক্ষমতা নির্ভর করে। যারা মনে করে তা দিয়ে শাসন করবে তারা আসলে নিজেরাই দাসত্বকে কবুল করে।

এটা সত্য যে, সংখ্যাগরিষ্ঠের হাতে ক্ষমতা আছে, কিন্তু এর অন্ধ ব্যবহার সবসময়ই ব্যবহারকারীকে পাল্টা আঘাত করবে। এবং সেটা করবে অর্থনৈতিক দাসত্বের এই ব্যবস্থাকে সমর্থনের মাধ্যমে যা কিনা শাসক ও শাসিতকে সমানভাবেই পেষণ করে থাকে। সংখ্যাগরিষ্ঠকে বুঝতে হবে যে, যা আমরা বোঝাতে চাচ্ছি একমাত্র স্বাধীনতা রক্ষার কাজে ক্ষমতাকে ব্যবহার করাটাই সবচেয়ে নিরাপদ ও যথার্থ।

এরমানে স্বাধীনতাকে কিভাবে আদায় করে নিতে হবে এটা বোঝা যায়। আরেকটি দিক রয়েছে সেটি হলো রাজনীতিকে বোঝার জন্যও লেখকদের স্বাধীনতা জরুরি। যেমন ধরুন আমরা জীবনানন্দ পড়ি ঘোরগ্রস্ত হওয়ার জন্যে। ফ্লাবার্ট পড়ি সৌন্দর্যের জন্য, জেমস জয়েস পড়ি হাওয়া ও আগুনের ভাষা বোঝার জন্য, কোয়েলহো পড়ি শিকার বোঝার জন্যে, পড়ি জেন অস্টেন তার মনস্তত্ত্বের জন্য। কিন্তু কালো এবং আফ্রিকান লেখকদের মাঝে কি পাই? পাই সেখানকার দাসত্ব, উপনিবেশিকতা, দারিদ্র্য, গৃহযুদ্ধ, বন্দিদশা, নারী হেনস্থা—এসব বোঝার জন্যে।

বেন ওকরি বলছেন, ‘দ্য ওয়ে টু ফ্রিডম’ প্রবন্ধে, “জেমস জয়েসের ‘দ্য ডেড’ মূলত একটি পার্টিকে ঘিরে রচিত যেটি এক শীতের রাতে ডাবলিন শহরের একটি পরিবারে অনুষ্ঠিত হয়। সেই পার্টিতে লোকজন কথা বলে, মিউজিক বাজতে থাকে এবং একজন মহিলা একজন তরুণের কথা স্মরণ করে যে বহু বছর আগে তার বিরহে মৃত্যুবরণ করে। আইরিশদের দুর্ভিক্ষ, আইরিশ জাতীয়তাবাদ অথবা সম্ভাব্য কোনো বিষয় এখানে বিষয়বস্তু নয়। মূল বিষয় হলো স্মৃতি, মিউজিক অথবা আয়ারল্যান্ডে তুষারপাত। গল্পের তাৎপর্য হলো মানব হৃদয়ের পরোক্ষ প্রকাশ, এবং হৃদয়ভঙ্গের কোনো গল্প, ছলাকলার কাহিনী এবং কোনো সুদৃশ্য সংক্ষেপে বর্ণনা করা। যদি তিনি আইরিশদের দুর্ভিক্ষ নিয়ে লিখতেন তাহলে তিনি আমাদেরকে ‘দ্য ডেড’র মতো কালোত্তীর্ণ একটি লেখা উপহার দিতে পারতেন না।

আমাদের সময়ে আমরা বিষয়বস্তুর প্রতি অন্ধ হয়ে আছি কেননা আমরা শিল্পের সত্যিকারের তাৎপর্য হারিয়ে ফেলেছি। যদি একটি উপন্যাস দাস ব্যবস্থা নিয়ে রচিত হয়, আমরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মনে করি এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একজন ছোকরা যে কিনা অত্যধিক পাম ওয়াইন পান করে তার থেকেও অত্যাধিক গুরুত্বপূর্ণ। কালো এবং আফ্রিকান ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে থাকা বিয়োগান্তর ( tragedies), অবিচার এবং নিরন্তর সংগ্রামের ঘটনাগুলো প্রকাশ করার জন্য আফ্রিকান লেখকদের মুখপাত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আর এটি অন্যান্য সাহিত্যের তুলনায় এই আফ্রিকান সাহিত্যকে অনেক বেশি কমিটেড বা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করে তোলে। এই কারণে হয়তো এই সাহিত্য কম বৈচিত্র্যপূর্ণ, কম উপভোগ্য এবং স্বাভাবিকভাবে কম টেকসই।”

মানে যারা পলিটিক্যাল ইতিহাস পড়ার কারণে আফ্রিকান সাহিত্য পড়বেন বলছেন তাদের উত্তরটা দিলেন বেন ওকরি।

উত্তর তো দিলেন না, খোঁচা মারলেন। বুঝেছেন তো, নাকি?

তিনি ওই প্রবন্ধে বলছেন, “আপনি লেখকের স্বাধীনতা চান? স্বাধীনতা পেলে কী করছেন? ধরুন আপনি শেক্সপিয়রের লেখা থেকে সাধারণ মানুষের কঠিন জীবনযাপন সম্পর্কে ধারণাও করতে পারবেন না। তার নাটকগুলোতে আপনি কোথাও জানতে পারবেন না যে তার সময়ে লোকজন তাদের শৌচাগারের বালতিসমূহ জানালার বাইরে খালি করে রাখত এবং স্ট্রাটফোর্ড—আপন—এভন’র স্ট্রিটগুলো দুর্গন্ধে ভরে উঠত। তার সৃষ্টিকর্মগুলো স্থায়িত্ব লাভ করেছে। এই সাহিত্য অনবরত মানবাত্মাকে উদ্ভাসিত করে এবং মানব জগতের মহত্ত্ব এবং অদ্ভুতুড়ে বিষয়গুলো সম্পর্কে আমাদের সজাগ করে।

আরো পড়ুন ➥ সৃষ্টিশীলদের খেয়ালিপনা

এখানে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো Cervantes দাসত্ব সম্পর্কে জানতেন, মুরদের নির্বাসন সম্পর্কে জানতেন। তিনি লেপান্টের যুদ্ধে তার হাত হারিয়েছিলেন। তিনি স্পেনের নিষ্ঠুর ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিলেন না। তারপরেও তিনি Don Quixote-এর তুলনায় আমাদের মানসপটে খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলতে পারেননি। Don Quixote এই উপন্যাসটি একজন মানুষকে ঘিরে যিনি অ্যাডভেঞ্চারের জীবন বেছে নেন।

হোমার একজন মানুষের অসন্তুষ্টি চিত্রায়নের মধ্য দিয়ে ট্রয় নগরীর পতনের কাহিনী বলেছেন। সফোক্লিস একজন রাজার নিন্দনীয় কর্মকাণ্ডের ইতিহাস বলেছেন। তারা গ্রিক ইতিহাসের ভয়ংকর ঘটনার গল্প বলেননি। তলস্তয়ের ‘ওয়ার এন্ড পিস’-এ একটি মহৎ বিষয়বস্তু আছে। তবে এটি তার অন্তর্দৃষ্টি এবং তাঁর লেখনী এই বিষয়বস্তুকে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিয়েছে। পুশকিন রাশিয়ার ভয়ানক এবং অসাধারণ ইতিহাসে মগ্ন থাকতেন। তিনি বয়ারের উৎপীড়ন সম্পর্কে জানতেন। ইভান দ্য টেরিবলের দীর্ঘ ছায়া, কৃষকগোষ্ঠীর মানবেতর জীবনযাপন সম্পর্কে জানতেন। তিনি নির্বাসন সম্পর্কেও অবগত ছিলেন। তারপরেও তার বিখ্যাত Eugene Onegin যাকে রাশিয়ান সাহিত্যের উৎস বলে বিবেচনা করা হয়, রচিত হয়েছে নির্লিপ্ত অভিজাতবর্গদের নিয়ে এবং তার ছোট গল্প The Queen of Spades, অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ ছোট গল্প; সেটিরও মূল বিষয় ছিল জুয়া খেলা।

এরমানে সেল্ফ সেন্সরশিপ থাকাটাও উচিত একজন স্বাধীনতাকামী লেখকের জগতে।এখনো মনে হয় ভলতেয়ারের সেই কথাটা প্রাসঙ্গিক। সেই যে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি তোমার মত মানি না, কিন্তু তুমি যাহাতে তোমার মতো অবাধে বলিতে পার, তাহার জন্য আমি নিজের প্রাণ অবধি বিসর্জন দিতে প্রস্তুত।”

কিন্তু এখন আমরা যেন স্মরণে রাখি রবিনসনের সেই কথাও এক রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে আপনার পা যেন আমি মাড়িয়ে না দিই। ব্যঙ্গ কবিতা রচনার মাধ্যমেই ভলতেয়ার সাহিত্যজগতে আত্মপ্রকাশ করেন। খ্রিস্টান গির্জা ও তৎকালীন ফরাসি সামাজিক আচার ছিল তার ব্যঙ্গবিদ্রুপের লক্ষ্য। ভলতেয়ার তার সাহিত্যজীবনে সর্বোচ্চ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন একজন গদ্যলেখক হিসেবে। ভলতেয়ারের সাহিত্যকর্মের মধ্যে দু হাজার গ্রন্থ এবং ২০ হাজার চিঠি রয়েছে। ভলতেয়ারের আসল নাম ফ্রাঙ্কো ম্যারিক এ্যারোয়েট। একসময় এ্যারোয়েট অজ্ঞাত কারনে ভলতেয়ার নাম গ্রহণ করেন।

পরবর্তী জীবনে ভলতেয়ার ইতালীয়, স্পেনীয় ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। নাগরিক স্বাধীনতা, বিশেষত ধর্মের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে তার অবস্থান ছিল অটল। সে সময় ফ্রান্সের কঠোর সেন্সর আইন উপেক্ষা করে সামাজিক সংস্কারের অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন ভলতেয়ার।

তিনি বলেছেন যেখানে ‘অজ্ঞতা যত বেশি’ সেখানে ‘অসহিষ্ণুতা এবং নিষ্ঠুরতা তত বেশি’... এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চিন্তাশক্তি বিকশিত না হওয়ার কারণেই সমাজে এইসব অন্যায় ঘটে থাকে। তিনি বলতেন শুধুমাত্র বিশেষজ্ঞরাই অশুভ শক্তির পরিণতি সম্বন্ধে জানলে চলবে না, তাঁদের জানাতে হবে দেশের তরুণদের। তবেই তারা যথাযথ উদ্যোগ নিয়ে একে প্রতিহত করতে পারবে।

ভলতেয়ার কারা অন্তরিন অবস্থায় মাত্র এগার মাসে ‘হেনরিয়ের্ডে’ নামে একটা মহাকাব্য রচনা করেন। কাব্যগ্রন্থটি পরর্বতীকালে তাঁকে প্রভূত খ্যাতি এনে দিয়েছিল। তাঁকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের মধ্যে অন্যতম বিবেচনা করা হয়। ১৭১৮ সালে ভলতেয়ার রচনা করেন ’ওয়েডিপে’ নামক এক ট্রাজিক নাটক। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সের বিদগ্ধ সমাজ এই অসাধারণ কবিকে হোমার এবং ভার্জিলের সমকক্ষ বলে অভিনন্দিত করেছেন। তার মতোই ছিলেন ফ্রান্সের দেকার্ত।

১৫৯৬ সালের ৩১ মার্চ, ফ্রান্সের তোরাইন গ্রামে এক ধনাঢ্য পরিবারে রেনে দেকার্ত জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামের বর্তমান নাম তার সম্মানে ‘দেকার্ত’ রাখা হয়েছে।

ফরাসি দার্শনিক দেকার্ত একটা নতুন দর্শন দিতে ব্যস্ত না হয়ে দর্শন নির্মাণের জন্য একটা পদ্ধতি বের করতেই আগে মন দেন। তাঁর এই শুরুর রচনার নাম ‘মেডিটেশন্স্ অন ফার্স্ট ফিলোসফি’। এর প্রথম কথাই হচ্ছে, সন্দেহ করো, অস্বীকার করো। তার লেখালেখি জগতে আসার গল্পটা বেশ মজার। জার্মানির নিউবার্গ শহরে তখন কনকনে শীত। শীতে কাঁপতে কাঁপতে এসে নিজের রুমে ঢুকলেন ২৩ বছরের যুবক রেনে দেকার্ত। লিখতে শুরু করলেন দেবতার বাতলে দেওয়া উপায়সমূহ। তিনটি বিষয়ের ওপর কাজ করবার উপায় বলেছেন দেবতা, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, বিশ্লেষণাত্মক জ্যামিতি আর দর্শন। সে রাতের প্রায় ১৮ বছর পর ১৬৩৭ সালে প্রকাশিত হয় তার ‘ডিসকোর্স ডি লা মেথড’ (ডিসকাশন অব দ্য মেথড) এবং ‘লা জিওম্যাত্রি’ (জিওমেট্রি)। এই দুটি বই তাকে ইতিহাসে চিরস্থায়ী আসন দিয়েছে। দুটি বইয়ের মাঝেই তিনি উল্লেখ করেছেন ১০ নভেম্বরের সেই শীতের রাতের কথা।

আরো পড়ুন ➥ সাহিত্যে জেনারেশন

দেকার্ত মানুষের চিন্তা ও ধারণাকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন: ১) সৃষ্ট ধারণা যা মানুষ ভেবে-চিন্তে তৈরি করে, ২) অস্থানিক ধারণা, যা ভাববার প্রয়োজন হয় না; যেমন, গরম পানি হাতে পড়লে তৎক্ষণাৎ গরম লাগার কথা চিন্তা করবে মানুষ এবং ৩) সহজাত চিন্তা যা মানুষের মধ্যে সৃষ্টিকর্তা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এগুলো চাইলেও পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ, মানুষ চাইলেই একটি ত্রিকোণ বস্তুকে চতুষ্কোণ বলে ভাবতে পারে না। অন্যদিকে দেকার্তের দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ‘ডুয়েলিজম’ বা দ্বৈতবাদ। এই তত্ত্বের প্রধান কথা হচ্ছে, আমাদের দেহ এবং মন সম্পূর্ণ পৃথক দুটি সত্তা। তাই দেকার্তে লেখকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সম্পর্কে বলেছেন, “স্বাধীনতা আপেক্ষিক। চূড়ান্ত স্বাধীনতা বলতে কিছু নেই। আর স্বাধীনতাকে বোঝার জন্য পরাধীনতাও অস্তিত্ব রয়েছে।” তিনি ভলতেয়ারের চেয়ে অন্য ঘরানার চিন্তা জগতে। তবে ভলতেয়ারের সঙ্গে মিল রয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে মন্টেস্কুর।

মন্টেস্কু তার বিখ্যাত ‘দ্য স্পিরিট অফ লজ’ (The Spirit of Laws)-এ রাজার দৈবস্বত্ব নীতির সমালোচনা করে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষার জন্য আইন, শাসন ও বিচারবিভাগের পৃথকীকরণের কথা বলেন। মন্টেস্কুর আর-একটি বিখ্যাত গ্রন্থ হলো ‘দ্য পার্সিয়ান লেটারস’ (The Persian Letters)। এই বইয়ে তিনি বিপ্লব-পূর্ব ফরাসি সমাজব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেন।

রানি মেরি অ্যান্টয়নেটের নিজস্ব সহচরীসংখ্যা ছিল ৫০০। রাজা, রানি, রাজকুমার ও রাজকুমারীদের প্রমোদভ্রমণের জন্য রাজদরবারে প্রায় দুই হাজার ঘোড়া ও ২০০ অশ্বশকট সব সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকত। এসব বিষয় ফরাসি জনগণের মধ্যে দারুণ ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল। এতে রাজতন্ত্রের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি একেবারেই বিনষ্ট হয়ে যায়। অবস্থা এমন হয়েছিল যে ৫ অক্টোবর প্যারিস থেকে মহিলাদের ভুখামিছিল বা হাঙ্গার মার্চ অব দ্য ওমেন ভার্সাই রাজপ্রাসাদের কাছে পৌঁছে রুটির দাম কমানোর দাবি জানায়। তখন রানি মেরি অ্যান্টয়নেট অবাক হয়ে মিছিলের দিকে তাকিয়ে জানতে চান, এরা কী চায়? তাঁর সহচরী উত্তর দেন, এরা রুটির দাম কমাতে বলছে, রুটি চায়। রানি অবাক হয়ে বললেন, রুটি কেন? এরা কেক খেতে পারে না! প্রকৃতপক্ষে রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে বিলাস ব্যসনে জীবনযাপন করে রানি অ্যান্টয়নেট নিজ দেশের সাধারণ মানুষের জীবন সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেননি। এ প্রসঙ্গে মন্টেস্কু বলেছেন, “বিক্ষোভ করা যেমন ন্যায্যত রানীর বিরুদ্ধে আবার রানীর প্রমোদ করারও পক্ষে আমি।”

কিন্তু ঠিক ভলতেয়ার, মন্টেস্কুর মতন এত উদার রেডিক্যাল না কবি আদোনিস। তার সাথে মিল রয়েছে বেন ওকরির। তারা স্বাধীনতা কারা হরণ কেন শোষকরা সে প্রশ্নও তুলেছেন। আদোনিসের জন্ম সিরিয়ায় ১৯৩০ সালে। জেল খেটেছেন। দেশ থেকে নির্বাসিত হয়ে প্রথমে লেবাননে পরে প্যারিসে বসবাস করছেন। তার সেরা কবিতার বইয়ের নাম ‘সংস অব মিহিয়ার অব দামাস্কাস’। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলছেন, “আগের আরব কবিরা ধর্মে আগ্রহী বা অনাগ্রহী যা-ই হয়ে হোন না কেন, ধর্মকে দেখেছেন খুবই ট্রিপিক্যালি। আরবের প্রখ্যাত কবি আবুল আলা ইমামি খুব সুন্দর করে বলেছিলেন, ‘মানুষ দুই রকমের। কারো ধর্ম আছে, যুক্তি নেই। কারো যুক্তি আছে, ধর্ম নেই।’ সংস অব মিহিয়ার-এ এই ধারণাটিকে আমি চূড়ান্তভাবে পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছি। পরম বিচারে তো ধর্ম ব্যক্তির একান্ত উপাদান। সমাজকে গড়ে উঠতে হবে মূল্যবোধ, মানবাধিকার আর স্বাধীনতার ওপর ভিত্তি করে। তাই সাহিত্য করার জন্য স্বাধীনতা জরুরি। ইসলামি সংস্কৃতির ভেতরে আমরা ইবনে রুশদের মতো ভাবুককে জন্ম দিয়েছি, পাশ্চাত্যের কাছেও যিনি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিলেন। ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর চিন্তাধারা পড়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। ফলে ইউরোপে যে স্বাধীনতা আছে বলা হয় সেটি ‘খুবই স্থুল অর্থে দেখানো স্বাধীনতা’। আমাদের মতো দেশের কবিদের লড়তে হচ্ছে রক্ত ঝরিয়ে ঝরিয়ে। আমাদেরকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়তে হবে সব ধরনের ক্ষমতার ভরকেন্দ্রের ওপর।”

আরো পড়ুন ➥ স্ট্রিট লিটারেচার

কিন্তু রাষ্ট্রেরও ধারণক্ষমতা রয়েছে তার চরিত্রানুযায়ী। লেখক তার দৃষ্টিকে কেবল সমকালেই সীমাবদ্ধ রাখেন না, সে যেমন অতীতকে অভিজ্ঞতা করে বর্তমানে দাঁড়িয়ে লেখে, লেখে বর্তমানের বিবর্তিত আগামীর রূপ, তখন তার বিষয়গুলোও রূপলাভে নতুন কাঠামো দাবি করে, তা পূরণে প্রয়োজন হয়ে পড়ে স্বাধীনতা, কিন্তু সমাজ-রাষ্ট্র তা দিতে অক্ষম। টলস্টয় তার ‘শিল্প কী’ বইয়ে শিল্পসাহিত্যকে গণমুখী করার কথা বলেছেন এবং সমাজচিত্রটি স্পষ্টতর করে সৃষ্টির পক্ষে থেকেছেন। সে কারণে স্বাধীনতা পেতে হলে মোহ ত্যাগ ও দলবাজি অবশ্যই পরিহার করতে বলেছেন।

শেকসপিয়র, গ্যাটে, সারভানতেস, বালজাক, পুশকিন এরকম আরো অনেকে যে সৃজনশীল কাজে সেরা হয়ে আছেন তা স্তুতির সাহিত্য বা শিল্পকর্মের জন্য নয়, তা ছিল সেসময়ের সামাজিক চাহিদাকে সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত করা, যেহেতু সমাজের বিবর্তনের রূপ বদল ঘটলেও বদল ঘটেনি সমাজ অস্তিত্বের মূল চেহারাটার। কিন্তু সৃজনসম্পৃক্তরা তার মৌলিক ধারাগুলো অনুধাবন না করে অস্থির প্রবণতাগুলোকে উপজীব্য করে সৃজনে সম্পৃক্ত রয়েছেন ফলে এক দিকে তাদের স্বাধীনতা যেমন তেমন কোনো দরকারি নয়, তেমনি তারা যে আবদ্ধতায় আছে তাও অনুধাবনে তারা সক্ষম নয়। অথচ একজন ভালো ঔপন্যাসিক যেমন সমাজচিত্র তৈরি করে নিখুঁতভাবে রাজনৈতিক চেহারাটার মুখোশ উন্মোচন করতে পারেন, তেমনি একজন রাজনীতিবিদও পারেন না। একজন সাহিত্যিক যেমন করে সমাজটা জানেন তেমন রাজনীতির কোনো ব্যক্তিও জানেন না। এই সত্য শিল্পী-সাহিত্যিকেরা উপলব্ধি করতে পারলে স্বাধীনতার প্রশ্নটি তার কাছেও পরিমাণগত ও গুণগতরূপে ধরা দেবে। তখন তিনি লিখবেন সেই বিষয়ের বাস্তবতা কিভাবে কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে বা আবৃত রয়েছে নানা ষড়যন্ত্রকারী শক্তির কাছে এর বিরুদ্ধে। এ এক অন্যরকম লড়াই। একজন চে গুয়েভারা বিপ্লবী হয়ে ওঠেন পাবলো নেরুদাকে পড়েই। একজন চার্লি চ্যাপলিন কমিউনিস্ট হয়ে ওঠেন মহাত্মা কার্ল মার্কসের চিঠি পড়েই। নকশাল আন্দোলনই অমিয়ভুষন মজুমদারকে স্বাধীনতা প্রশ্নে এও ভাবতে শিখিয়েছে, প্রতিটি ইজমই কারাগার। যারা কোনো না কোনো ইজমে আস্থা রাখে তারা আসলে ওই কারাগারেই বাস করে।

শুরুর দিকে ‘হোয়ট ইজ ফ্রিডম’ দিয়ে শুরু হয়েছিল। তাই শেষটা করি এবছর সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী পিটার হান্ডেকে দিয়ে। তিনি বলেছেন, “মানুষ স্বাধীনতা চাইলেও প্রকৃতপ্রস্তাবে পরাধীনই থাকতে পছন্দ করে। নাহলে বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষ ইশ্বরের পরাধীনতা মেনে নিত না। আর ঈশ্বরকেও যারা অস্বীকার করে বিজ্ঞানবাদী হয়ে ওঠেন তারাও ‘বিজ্ঞান’কে ‘রিলিজিয়ন’ এই রূপ দেন। ফলে ‘ফ্রি উইল’ নেই। তাঁর ‘দ্য ফ্লাইট’ বইটি লেখার পর এ বিষয়ে গার্ডিয়ানকে সাক্ষাৎকারে এসব বিষয়ে বলেছিলেন। ফ্লাইট বইতে দেখা যায় অনিশ্চয়তার শিকার হওয়াই যেন মানুষের করুণ পরিণতি।

মানে জীবন ও জগতকে যদি কারাগার ভাবেন বা ভাবতে শেখেন তবেই আপনি সেই ফাঁদগুলো টপকে ধীরে ধীরে এগুতে থাকবেন ফানা হতে হতে নিঃসঙ্গ শেরপার মতো স্বাধীন সত্তার লড়াইয়ে। নাহলে? ঘুম আর স্বপ্ন। ঘুমের ভেতরই সব।

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;