সাহিত্য করে ‘ধনী’ ও ধনী হয়ে ‘সাহিত্য’ করার গল্প



দেবদুলাল মুন্না
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বের ধনী লেখক হন ফোর্বস ম্যাগাজিনের জরিপে আর সেরা বই বিবেচিত হয় টাইমের বিবেচনায়। বাংলা সাহিত্যে শুধুমাত্র লেখালেখি করে ধনী হয়েছিলেন মাত্র দুইজন। একজন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অন্যজন হুমায়ূন আহমেদ। বর্তমানে বিশ্বের ধনী লেখক হ্যারি পটারখ্যাত জে কে রাউলিং। তিনি বছরে ৯৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করছেন। ‘হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য কার্সড চাইল্ড’ বইটির জন্য প্রচুর পরিমাণে টাকা আয় করেন তিনি। বইটি ২০১৬ সালের সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছিল। তাছাড়া হ্যারি পটারের জন্য ইউনিভার্সাল স্টুডিও, ফ্যান্টাস্টিক বিস্টস এবং হোয়ার টু ফাইন্ড দেম সিনেমা দুটির জন্যও নগদ অর্থ পেয়েছেন রাউলিং। ১৯৯৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত অন্তত তিনবার ধনী লেখকের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছেন এই কল্পকাহিনী লেখক।

জে কে রাউলিং

বিশ্বজুড়ে হ্যারি পটারের সিরিজগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। প্রাপ্তবয়স্কদেরও রূপকথার জগতে দিনরাত বিচরণ করতে বাধ্য করেছেন। জীবনের একটা পর্যায় পর্যন্ত তাঁকে অনেক কঠিন সময়ের মুখোমুখী হতে হয়েছে। একটি কন্যা সন্তানসহ তাঁকে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছে। এই প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেই তিনি শুধুমাত্র অর্থ আয়ের উদ্দেশ্যে লেখালেখি শুরু করেন। পরপর ১২টি প্রকাশনা সংস্থার ফিরিয়ে দেওয়ার পর অবশেষে ১৩ নম্বর সংস্থাটি বইটি প্রকাশ করতে সম্মত হয়, এরপর শুধুই সামনে এগিয়ে যাওয়া। ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে কাজ করতে রাউলিং ১৯৯০ সালে পর্তুগালে পাড়ি জমান। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় পর্তুগিজ সাংবাদিক জর্জ আর্নেটসের সাথে। অল্পদিনের মধ্যেই তাঁরা বিয়ে করেন এবং ১৯৯৩ সালে জেসিকা নামে তাঁদের একটি মেয়ের জন্ম হয়। জেসিকার জন্মের অল্পকিছুদিনের মধ্যেই জর্জের সঙ্গে রাউলিংয়ের দাম্পত্য কলহ শুরু হয় এবং তা বিবাহবিচ্ছেদে গড়ায়। জর্জের সাথে সম্পর্কের ইতি ঘটিয়ে রাউলিং জেসিকাকে নিয়ে স্কটল্যান্ডের এডিনবুরোতে ফিরে এসে তাঁর ছোটবোন দাইয়ের সাথে থাকতে শুরু করেন। স্কটল্যান্ডে ফিরে রাউলিং তাঁর মেয়েকে নিয়ে দারুণ আর্থিক অনটনের শিকার হন। মেয়ে এবং নিজের জন্য কোনোভাবেই যথেষ্ট অর্থের যোগাড় করতে না পেরে অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যেই তিনি হ্যারি পটারের প্রথম বইটি লিখতে শুরু করেন। ব্রিটিশ লেখক ও সিনেমার চিত্রনাট্যকার জোয়ান রাউলিংয়ের জেকে রাউলিং ছদ্মনাম নেওয়ার পেছনে কিন্তু একটা ইতিহাস আছে। একজন নারীর লেখা বই কম বিক্রি হতে পারে এই কারণে তিনি তাঁর মূল নামের বদলে শুধুমাত্র আদ্যক্ষর দিয়ে তাঁর ছদ্মনামটি তৈরি করেন। তাঁর মূল নামের সাথে কোনো মধ্যবর্তী নাম (middle name) না থাকলেও তিনি ছদ্মনামের সাথে ‘K’ অক্ষরটি যোগ করেন তাঁর দাদী ক্যাথরিনের সম্মানে।

আরো পড়ুন ➥ শিল্পসাহিত্যে ‘স্বাধীনতা’

তাঁর জন্ম ১৯৬৫ সালের ৩১ জুলাই। বাবা ছিলেন এয়ারক্রাফট ইঞ্জিনিয়ার পিটার জেমস রাউলিং, এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল এ্যান রাউলিং। ১৯৯৭ সালে তাঁর প্রথম বই ‘হ্যারি পটার এ্যান্ড দি ফিলোসফারস্ স্টোন (Harry Potter and the Philosopher’s Stone)’ প্রকাশিত হওয়ার আগে তিনি তাঁর এক সন্তানকে নিয়ে স্কটল্যান্ডের এডিনবুরোতে অর্থনৈতিকভাবে খুবই বাজে অবস্থায় বসবাস করতেন। কিন্তু শিশুতোষ রূপকথার বইটি প্রকাশ হওয়ার পর রাতারাতি আন্তর্জাতিক বেস্টসেলারে পরিণত হয় এবং রাউলিং পরিণত হন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন বড় লেখক হিসেবে। ১৯৯৯ সালে যখন হ্যারি পটারের প্রথম তিনটি বই নিউইয়র্ক টাইমসের বেস্টসেলার তালিকার প্রথম তিনটি জায়গা একসাথে দখল করে নেয় তখন পৃথিবীর সাহিত্যজগৎ আরো একবার নড়েচড়ে বসে। এরপর একে একে হ্যারিপটার সিরিজের আরো চারটি বই বের হয়—এবং প্রতিটি বই আগেরটির থেকে বেশি সাফল্য লাভ করে। হ্যারি পটার সিরিজের মোট সাতটি বই আজ পর্যন্ত সারা বিশ্বে ৪৫ কোটি কপিরও বেশি বিক্রি হয়েছে। হ্যারি পটারের বইগুলো থেকে বানানো প্রতিটি সিনেমাই ব্লকবাস্টার হিট। ছবিগুলো সবগুলো মিলিয়ে আয় করেছিল ৭.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রথম সিরিজের সফলতার পর রাউলিং এরপর একে একে আরো বেশ কয়েকটি বই বের করেন। ২০১২ সালে বের হওয়া তাঁর ‘ক্যাজুয়্যাল ভ্যাকেন্সি (Casual Vacancy)’ বইটি দারুণ প্রশংসা কুড়ায়—যার প্রধান কারণ ছিল হ্যারি পটারের ছায়া থেকে সম্পূর্ণভাবে এই বইয়ের মাধ্যমে তিনি বের হয়ে আসতে পেরেছিলেন। বইটিতে ফ্যান্টাসির বদলে ছিল নির্মম বাস্তবতার এক অদ্ভুত প্রতিফলন। অনেক পাঠক অবশ্য হ্যারি পটারের মতো কিছু একটা আশা করে বইটি পড়া শুরু করে হতাশও হয়েছিলেন। এরপর ২০১৩ সালে রবার্ট গ্যালব্রেইথ (Robert Galbraith) ছদ্মনাম নিয়ে “Cuckoo’s Calling” নামে আরো একটি বই বের করেন তাঁর বিখ্যাত নামের ছায়া থেকে বের হয়ে এসে। ২০১৬ সালে তিনি আরো একবার হ্যারি পটারের জগতে প্রবেশ করেন মঞ্চনাটক ‘হ্যারি পটার এ্যান্ড দি কার্সড চাইল্ড (Harry Potter and the Cursed Child)’ এবং সিনেমা ‘ফ্যান্টাসটিক বিস্টস্ এ্যান্ড হয়্যার টু ফাইন্ড দেম (Fantastic Beasts and Where to Find Them)’-এর মাধ্যমে। প্রথমটির গল্প গড়ে উঠেছে হ্যারি পটার সিরিজ শেষ হওয়ার ঊনিশ বছর পরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে, আর ফ্যান্টাস্টিক বিস্ট-এর কাহিনী গড়ে উঠেছে হ্যারি পটার সিরিজের ঘটনা শুরুর বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে।

ড্যান ব্রাউন

ড্যান ব্রাউনও ধনী লেখকদের একজন। জনপ্রিয় মার্কিন থ্রিলার লেখক। জন্ম ১৯৬৪ সালের ২২ জুন। তার বেশিরভাগ উপন্যাসই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ওপর নিজের কল্পনা মিশ্রিত। তিনি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ওঠেন দ্য ভিঞ্চি কোড বইটি লিখে। ২০০৩ সালে এই বইটি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। এ পর্যন্ত তাঁর লেখা বই বিশ্বের ৫২টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং ২০ কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে। টাইম ম্যাগাজিনের বিচারে পৃথিবীর প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির অন্যতম তিনি। তার লেখা উল্লেখযোগ্য বই হলো ডিজিটাল ফোর্টট্রেস, ডিসেপশন পয়েন্ট, দ্য ভিঞ্চি কোড, অ্যাঞ্জেলস অ্যান্ড ডেমন্স, দ্য লস্ট সিম্বল ও ইনফার্নো। তার গল্পের গতি এবং বাঁক সত্যিই পাঠককে মুগ্ধ করে। বিস্মিত হয়ে উপভোগ করতে হয় তার বইগুলো। কিন্তু তার জীবনও সুখের ছিল না একসময়। আর্থিক অনটনে ভুগতে হয়েছে তাকেও। আসুন তার মুখেই শুনি তার কথা—

“আমি যখন বড় হচ্ছিলাম, তখন আমাদের বাসায় টেলিভিশন ছিল না। তাই আমি যা পেতাম, তা-ই পড়তাম। আমার সবচেয়ে পুরনো স্মৃতি হলো মেডেলিন এল ইঙ্গলসের অ্যা রিঙ্কল ইন টাইম বইটি। এটি নিয়ে আমি বুঁদ হয়ে থাকতাম। আমার মনে পড়ে, আমি যখন বইটি অর্ধেক শেষ করেছি, মা তখন এসে বললেন, এখন ঘুমানোর সময়। কিন্তু আমি বইয়ের চরিত্রগুলো নিয়ে এতটাই চিন্তিত ছিলাম যে সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। পরদিন যখন বইটি শেষ করলাম, তখন আমার চোখে পানি। কারণ, সেটা ছিল একটা সুখের সমাপ্তি। বইটির আবেগ আমাকে ছুঁয়ে গিয়েছিল, প্রতিটি চরিত্রকে আমি অনুভব করছিলাম। এসব সেই মুহূর্ত, যখন আমি গল্প বলার জাদু এবং ছাপার অক্ষরের শক্তিকে বুঝতে শিখলাম। আমি প্রকৃতপক্ষে অসংখ্য বইয়ের মধ্যে বড় হয়ে উঠেছি। আমি এবং আমার বোন প্রতি সপ্তাহে এক্সেটার পাবলিক লাইব্রেরিতে যেতাম এবং দুই হাত ভর্তি করে আমাদের পছন্দের বই নিয়ে বাসায় ফিরতাম। এগুলোর মধ্যে থাকত ড. সিউস, রিচার্ড স্কারি, কিউরিয়াস জর্জ, মেডেলিন এবং বাবার। আমরা যখন বড় হয়ে উঠছিলাম, আমার মনে পড়ে, প্রতি রাতেই মা-বাবা আমাদের গল্প পড়ে শোনাতেন। তাঁদের মুখেই আমার অনেক গল্প শোনা—‘মেক ওয়ে ফর ডাকলিং’, ‘দ্য ভেলেভটিন র্যাবিট’, ‘চিকেন স্যুপ উইদ রাইস’। কিন্তু যে গল্পটি আমার ছোট্ট মনোজগৎকে ভীষণভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল, সেটি ছিল ‘হোয়ার দ্য ওয়াইল্ড থিংগস আর’। আমার পরিবারে অগডেন ন্যাশের কবিতা খুব পড়া হতো, যেটা আমার লেখার ওপর অনেক প্রভাব ফেলেছে।

আরো পড়ুন ➥ সাহিত্যে নোবেল, প্রত্যাখ্যান ও কেড়ে নেওয়ার গল্প

আমার প্রিয় লেখকদের মধ্যে আছেন জন স্টেইনবেক। তাঁর গল্পের স্থানগুলো আমাকে মুগ্ধ করে। আমি বিস্মিত হয়ে উপভোগ করি রবার্ট লুডলামের গল্পের জটিল পটভূমি। শেক্সপিয়ার তাঁর ভাষাশৈলি দিয়ে চিরকালই আমাকে পথ দেখিয়ে এসেছেন। আমি প্রচুর নন-ফিকশন পড়ি। এর কারণ রিসার্চ ও আনন্দ লাভ করা। কিন্তু যখন আমি ফিকশন পড়ি, আমি সব সময়ই থ্রিলার পড়ি। যে থ্রিলারগুলো শুরুর কয়েক অধ্যায়ই আমাকে ধাঁধায় ফেলে দেয়, সেগুলোই আমার সবচেয়ে পছন্দের। আমি মনে করি, একটি ভালো থ্রিলার অবশ্যই আমাকে বাস্তব জগৎ সম্পর্কে কিছু শেখাবে। কোমা, দ্য হান্ট ফর রেড অক্টোবর, দ্য ফার্ম—এই থ্রিলারগুলো আমার মনে চিরস্থায়ী দাগ কেটেছে, বাস্তব জগৎকে নতুনভাবে বুঝতে শিখিয়েছে; একই সঙ্গে চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাবমেরিন প্রযুক্তি ও আইন সম্পর্কে আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। আমি যখন কলেজ থেকে স্নাতক শেষ করে বের হলাম, আমার হাতে দুটি পথ খোলা ছিল। দুটিই ছিল আমার ভালোবাসার কাজ—গল্প লেখা অথবা গান লেখা। আমি বেশ কিছুদিন হলিউডে ছিলাম, গান লেখার জন্য। কিন্তু গানের জগতে আমি খুব বেশি সাফল্য পাইনি। কলেজ থেকে বের হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি কোনো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে লেখা আধুনিক উপন্যাস পড়িনি, চিরন্তন ক্লাসিক উপন্যাসগুলোই ছিল আমার আকর্ষণের কেন্দ্রে। ১৯৯৪ সালে তাহিতিতে ছুটি কাটানোর সময় আমি সিডনি শেল্ডনের লেখা ডুমসডে কন্সপিরেসি-এর একটি পুরনো কপি সাগরপাড়ের একটি দোকানে পাই। বইটির প্রথম পৃষ্ঠা পড়া শুরু করলাম, এরপর দ্বিতীয় পৃষ্ঠা—এভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমি বইটি শেষ করি। এটি শেষ করে একটি চিন্তাই আমার মাথায় আসে—আরে, এটা তো আমি লিখতে পারি। এভাবেই গল্প লেখার জগতে আমার প্রবেশ। ডিজিটাল ফোর্টট্রেস (১৯৯৬) ছিল আমার লেখা প্রথম উপন্যাস। আমি খুবই ভাগ্যবান ছিলাম। কারণ, পাঠকেরা বইটি পছন্দ করেছে। যদি তারা না করত, হয়তো আমি আবার গান লেখার জগতে ফিরে যেতাম। আমি একজন শিক্ষক এবং প্রচুর বই পড়েছি। এই বইগুলোর কাহিনী ও চরিত্রবিন্যাস নানাভাবে সজ্জিত হয়েছে। ক্লাসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমি এগুলো নিয়ে আলোচনা করি। এতে করে আমি আমার গল্পে নতুন ধারণা পাই এবং এটা আমার গল্পকে আরো সমৃদ্ধ করে। যারা নতুন লিখছে কিংবা স্বপ্ন দেখছে যে একদিন তাদের লেখাও ছাপা হবে, তাদের জন্য একটাই পরামর্শ থাকবে, আর সেটা হলো বাজারে বিক্রির জন্য বই লেখো। কিন্তু এর মানে এটা নয় যে তোমাকে গোয়েন্দা গল্পই লিখতে হবে। ব্রিজেস অব মাডিসন কাউন্টি অথবা কোল্ড মাউন্টেইন—বইগুলো কিন্তু ব্যবসায়িক সাফল্যের কথা ভেবেই লেখা। লেখার ক্ষেত্রে দুটি জিনিস সব সময়ই মেনে চলতে হবে। প্রথমত, চিত্রপটকে কাহিনীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। দ্বিতীয়ত, চিত্রপটকে আকর্ষণীয়ভাবে সাজাতে হবে। তুমি যদি কোনো স্কুলের কাহিনী লেখো, কিন্তু সেই স্কুলের কোনো গোপন ঘটনা কিংবা স্কুলের কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্য না বলো, তাহলে তোমার কাহিনী অনাকর্ষণীয় হতে বাধ্য। এটা খুবই মজার, যখন আমি সাহিত্যের কোনো আঙিনায় নিজেকে স্থান দেব, সেটা ভাবি। কিন্তু আমি কেবল সে রকম গল্পই লিখি, আমি নিজে যে রকম গল্প পড়তে চাই। সহজ কথায় বলতে গেলে আমি নিজের জন্যই লিখি।’’

স্টিভেন কিং

মার্কিন লেখক স্টিভেন কিংয়ের বই বিক্রি হয় বিশ্বজুড়ে। তার মোট বিক্রিত বইয়ের পরিমাণ ৩৫ কোটি কপির বেশি। তিনি ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল বুক ফাউন্ডেশন মেডেল পান। এছাড়াও তিনি ব্রাম স্টোকার অ্যাওয়ার্ডস, ওয়ার্ল্ড ফ্যান্টাসি অ্যাওয়ার্ডস, ব্রিটিশ ফ্যান্টাসি সোসাইটি অ্যাওয়ার্ডস লাভ করেন। তার অনেক বই থেকে চলচ্চিত্র, টিভি সিরিজ, মিনি সিরিজ, কমিকস নির্মিত হয়েছে। তার লেখা বিখ্যাত দুটি ছোটগল্প হচ্ছে ১৯৮২ প্রকাশিত অ্যাপ্ট পিউপিল, ২০০২ সালে প্রকাশিত ১৪০৮ অল দ্যাট ইউ লাভ উইল বি ক্যারিড অ্যাওয়ে। আর বিখ্যাত উপন্যাসগুলো হলো—ক্যারি, দ্য শাইনিং ইট, দ্য ডার্ক টাওয়ার, রিটা হেওয়ার্থ অ্যান্ড শশাঙ্ক রিডেম্পশন, আন্ডার দ্য ডোম, দ্য বডি। তিনিও বিলিওনার। নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের সম্পর্কে এভাবে বলেন, “আমি কখনো ভাবতে পারতাম না গল্প লেখেই ধনী হওয়া যায়! তাও আবার হরর মুভি। এখন বিজ্ঞানের যুগ। মানুষ তো জানে হররের যুগ নেই আর। তবু কেন পড়ে হরর গল্প বা দেখে মুভি? আমার ধারণা মানুষের অবচেতনে এমন কিছু কাজ করে যে সে একটু রহস্য পছন্দ করে। আমি পাঠকের কাছে এ রহস্যই বিক্রি করে ধনী হয়েছি। আমার কৈশোর সুখের ছিল না। যে এলাকায় থাকতাম সেটি ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন, বিষণ্ণ। আমাদের পরিবারে অনেক সময় বিকালে নাস্তা করার অবস্থাও ছিল না। তাই রাতের খাবার এমন এক সময় খাওয়া হতো যে না সন্ধ্যা না রাত। সেসব দিনকে এখন খুব মিস করি।’’

জন গ্রিশাম লিগ্যাল

জন গ্রিশাম লিগ্যালকে বলা হয় থ্রিলার ফিকশনের রাজা। নব্বই দশক থেকে প্রতি বছরই একটি করে প্রকাশিত হওয়া গ্রিশামের বই নিউইয়র্ক টাইমস বেস্ট সেলার লিস্টে স্থান পেয়েছে। তাও আবার ১ বা ২ নম্বর অবস্থানে থেকেই। নব্বইয়ের দশকে লেখক জন গ্রিশাম ক্যারিয়ারের চরম ফর্মে ছিলেন। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত বিশটিরও বেশি থ্রিলারের সব বই ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে। নব্বই দশকের থ্রিলার লেখক বলতেই সবার আগে চলে আসে এই লেখকের নাম। প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত টানটান উত্তেজনার একটি অবিশ্বাস্য লেভেলের থ্রিলার জন গ্রিশামের ‘দ্য পার্টনার’। এটির মতো আরো অসাধারণ থ্রিলার রয়েছে এই লেখকের। দ্য পার্টনারের চমত্কার কাহিনী ছাপিয়ে উঠে এসেছে কিভাবে অতি সূক্ষ্মভাবে একটি ক্রাইম করতে হয় এবং সেই ক্রাইম থেকে কিভাবে নিজেকে মুক্ত করতে হয়। তার বয়স যখন সাত তখন তিনি পরিবারের সঙ্গে মিসিসিপিতে বসবাস শুরু করেন। তিনি একটা সময় হতাশা তেকে ড্রাগস নেওয়া শুরু করেছিলেন। সেসময়ই অপরাধজগতের কিছু বন্ধু জুটে যায়। যদিও তিনি নিজে কোনো অপরাধ করেননি কিন্তু অপরাধী বন্ধুদের গল্প শুনতেন এবং যতটুকু যেভাবে পারেন সাহায্য করতেন। এ জন্যই অপরাধ জগৎটা তার মুখস্থ। এগুলোই পরবর্তী সময়ে তাঁকে থ্রিলারে নিয়ে আসে। এখন সুখী মানুষ। বিলিওনার। ড্রাগস তো তরুণ বয়সেই রিহ্যাবে গিয়ে ছেড়েছিলেন। এখন সানসেটের পর বেলকনিতে বসে সমুদ্রের জোয়ার দেখতে দেখতে মাত্র ছয় আউন্স হুইস্কি খান।

জেমস পেটারসন

জেমস পেটারসন নামের সঙ্গে অনেকেই খুব বেশি পরিচিত নিশ্চয়ই। বিখ্যাত সাহিত্যিক জেমস পেটারসন রচিত অ্যালেক্স ক্রস সিরিজের বইগুলো প্রায় ২৫ বছর ধরে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে ব্যবসা করে আসছে। এর প্রত্যেকটি বই সব সময় বেস্ট সেলার হয়ে এসেছে। তবে এর মধ্যে অ্যালং কেম এ স্পাইডার-এর কথা না বললেই নয়। এর কাহিনীতে দেখা যায়, এক নিখোঁজ মেয়ে, নাম ম্যাগি রোজি। যার বাবা-মা নৃশংসভাবে খুন হন। কিন্তু খুনি থাকেন প্রাথমিক স্কুলের এক সাধারণ শিক্ষক, যে কিনা নিজেকে অতি বুদ্ধিমান মনে করেন। তিনি একের পর এক খুন করেই যান। এই খুনিকে খুঁজতে বের হন বিখ্যাত গোয়েন্দা অ্যালেক্স ক্রস। এরপরই ঘটতে থাকে নানা রোমহর্ষক ঘটনা। ১৯৪৭ সালের ২২ মার্চ জেমস পেটারসন জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে তার বয়স প্রায় ৭১ বছর। তিনি প্রতিদিন ভোরে উঠে লিখতে পছন্দ করেন। তার লেখনীর শক্তি অসাধারণ এ কথা বলাই বাহুল্য। থ্রিলার, রহস্য উপন্যাস, রোমান্স ইত্যাদি নানা রকম লেখায় তিনি ইতোমধ্যে কিংবদন্তি। তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য সিরিজ হলো ‘উইমেন্স মার্ডার ক্লাব’। এই সিরিজের সর্বশেষ বই ১৬ সডোকশন এবারে নিউইয়র্ক টাইমস-এর সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

আরো পড়ুন ➥ সৃষ্টিশীলদের খেয়ালিপনা

এর কাহিনী অনেকটা এ রকম—পনেরো মাস আগেও আদরের ছেলে আর চৌকস স্বামীকে নিয়ে ডিটেকটিভ লিনসে বক্সারের জীবন ছিল ছবির মতো। সানফ্রানসিসকোতে এক বোমা হামলায় নিহত হলো ১৫ জন। লিনসে তার স্বামীর সহায়তার বোমা হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করতে সমর্থ হয়। কিন্তু এই মামলা যখন কোর্টে ওঠে, তখন সরকারি উকিল গাফিলতি থাকার ইঙ্গিত করে আঙুল তোলেন লিনসে ও তার স্বামীর বিরুদ্ধ। লিনসে নিজেকে ও তার স্বামীকে নির্দোষ প্রমাণে কিভাবে ষড়যন্ত্রের জাল খুলল, এই নিয়েই কাহিনী। বর্তমানে শিশুদের বই পড়তে উৎসাহিত করতে এবং অভিভাবক ও শিক্ষকদের শিশু-কিশোরেরা কী বই পড়তে পারে, তা জানাতে তিনি রিডজকিডোরিড (readzkiddoRead.com) নামের একটি ওয়েবসাইট চালু করেছেন।

ই এল জেমস

ব্রিটেনে যৌনতানির্ভর উপন্যাস লিখে ধনী হয়েছেন এক নারী, যার নাম ই এল জেমস। এ বইয়ের মাধ্যমেই ই এল জেমস বিশ্বের সেরা ধনীর তালিকায় প্রবেশ করেন। বইটির বিষয়বস্তু যৌনতা। ‘ফিফটি শেডস অব গ্রে’ বইয়ের পাতায় পাতায় রয়েছে টানটান উত্তেজনা। ব্যবসায়ী ক্রিস্টিয়ানো গ্রের সঙ্গে সাহিত্যের ছাত্রী অ্যানাস্টাসিয়া স্টিলের প্রেমের গল্প নিয়ে রচিত হয়েছে এই উপন্যাসটি। বহুল বিক্রিত এই উপন্যাসটির অপর দুটি সিকুয়েন্স হচ্ছে ‘ফিফটি শেডস ডার্কার’ আর ‘ফিফটি শেডস ফ্রিড’। এই তিনটি বই মিলে একটি রেকর্ড করেছে তা হলো, তিনসপ্তাহে এই সিরিজের তিনটি বইয়ের মোট দেড় কোটি কপি বিক্রি হয়েছে। এই সিরিজ নিয়ে চলচ্চিত্রও তৈরি হয়েছে। এটি বানিয়েছে চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সাল।

আরো পড়ুন ➥ সাহিত্যে জেনারেশন

ইএল জেমসের ইরোটিক এই উপন্যাসটির কাহিনী গড়ে উঠেছে কলেজ শিক্ষার্থী আনাস্তাসিয়া স্টিলির দিকে থেকে। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার আগে তিনি রহস্যময় এবং বিয়ের উপযুক্ত শতকোটিপতি ক্রিস্টিয়ান গ্রের ইন্টারভিউ নেন তার স্কুল পেপারের জন্য। তিনি সাংবাদিকতায় পড়ছিলেন না। ইন্টারভিউটি নেওয়ার কথা ছিল সাংবাদিকতায় পড়ে তার এমন এক রুমমেটের। কিন্তু তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ায় আনাস্তাসিয়া তার হয়ে ইন্টারভিউ করতে যান। প্রথম দেখার পর থেকেই আনা ক্রিস্টিয়ান গ্রেতে অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। ক্রিস্টিয়ান যখন আনার টেপ রেকর্ডার নিয়ে উসখুস করেছিলেন তখন স্নায়বিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ায় আনা চোখমুখ লাল হয়ে যাচ্ছিল এবং ঘাম ঝরতে শুরু করে। তার সামনে কথা বলতে গিয়েও আনা তোতলাতে শুরু করেন। আর ক্রিস্টিয়ানের শান্ত কিন্তু কঠোর মেজাজ আনার হার্টবিটও বাড়িয়ে দিচ্ছিল কয়েকগুণ। স্বাভাবিকভাবে ক্রিস্টিয়ানও আনার প্রতি ঝুঁকে পড়তে শুরু করেছিল। কিন্তু ঠিক কী কারণে তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল না। আনা ছিল অস্থির প্রকৃতির। কলেজের পড়া শেষ করার পর কী করবে সে ব্যপারেও তার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। আর আনা কিছুটা অগোছালোও ছিল। কিন্তু কথা বলার ফাঁকে আনা যখনই তার নিচের ঠোঁটটি কামড়ে ধরতেন তা দেখে কী এক অজানা কারণে যেন ক্রিস্টিয়ান নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারতেন না। এরপর একদিন ক্রিস্টিয়ান আনার কর্মস্থলে গিয়ে হাজির হন। প্রায়ই দামি সব উপহার কিনে পাঠান। ব্যক্তিগত হেলিকপ্টারে করে ঘুরতে নিয়ে যান। এতে আনার আশেপাশের অন্যান্য পুরুষরা ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠে। রোমান্টিক মনে হচ্ছে কি এতটুকু জেনে আপনাদের? মোটেই কিন্তু তা না। এখানে এসেই রয়েছে আখ্যানের বড় মোচড়।

আরো পড়ুন ➥ স্ট্রিট লিটারেচার

একটা সময়ে ক্রিস্টিয়ানের অবিবাহিত থাকার কারণ জানা যায়। তিনি আসলে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দাসত্ব ও আধিপত্য চান। তিনি ধর্ষকামী ও মর্ষকামী লোক। আনাকেও ক্রিস্টিয়ান তার নিজের প্রতি আনুগত্যশীল বানাতে চায়। আনার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার প্রস্তাব দিয়ে একটি গোপন চুক্তির খসড়া তৈরি করেন ক্রিস্টিয়ান। এতে নিরাপদ শব্দ এবং সীমা আছে। আর দুজনকে যেসব বিচিত্র ধরনের যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হতে হবে তার বিস্তারিত বিবরণও দেওয়া আছে। আনা ওই চুক্তিতে সাক্ষর করবেন কি করবেন না তা নিয়ে আনার সিদ্ধান্তহীনতার বিষয়টি ফুটিয়ে তোলা হয়।

ড্যানিয়েল স্টিল

আমেরিকান লেখক ড্যানিয়েল স্টিলের আসল নাম ড্যানিয়েল ফার্নান্দেজ ডমিনিকিউ স্টুয়েলিয়েন স্টিল। তিনি বিশ্বের আরেক নারী ধনী লেখক। তার জন্ম আমেরিকার নিউইয়র্ক সিটিতে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট। তার বাবা জার্মান, মা পর্তুগিজ। ড্যানিয়েলের শৈশব কেটেছে ফ্রান্সে। কিশোরী বয়স থেকেই লেখালেখির সঙ্গে জড়িত এই লেখক। তখন থেকেই কবিতা লেখার হাতেখড়ি। তিনি সাহিত্য ডিজাইন ও ফ্যাশন ডিজাইনের ওপর পড়াশোনা করেন। পারসন স্কুল অব ডিজাইনে ১৯৬৩ সালে এবং নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত শিক্ষা লাভ করেন। সম্প্রতি তিনি বেস্ট সেলিং লেখকের তালিকায় নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁর লেখা বই ৮০০ মিলিয়নেরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে। এই বই থেকে তার আয় ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘গোয়িং হোম’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে। তাঁর উপন্যাসের সংখ্যা ৯৫। বিশ্বের ৪৭টি দেশে ২৮টি ভাষায় তাঁর লেখা অনূদিত হয়েছে। নারী লেখকদের মধ্যে মাত্র ২৬ বছর বয়সেই ভেরোনিকা রথ ফোর্বসের শীর্ষ তালিকায় ধনী লেখক হিসেবে নিজের স্থান করে নিয়েছেন। তিনি জার্মান এবং পোলিশ বংশোদ্ভূত। বর্তমানে তাঁর বয়স ২৯। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা এ লেখকের বর্তমান আয় ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১৯৪ কোটি টাকা প্রায়। তাঁর জনপ্রিয় বই ‘ট্রিলোজি ডিভারজেন্ট’ থেকে তিনি আয় করেন ৩ দশমিক ৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর তাঁর লেখা থেকে তৈরি ইনসারজেন্ট চলচ্চিত্রটি সারা বিশ্ব থেকে আয় করে ২৯৫ মিলিয়ন ডলার।

পলা হকিন্স

ব্রিটিশ লেখক পলা হকিন্স সৌভাগ্যবানদের একজন। বিশ্বের সেরা ধনী লেখকদের তালিকায় রয়েছে পলা হকিন্সের নাম। ফোর্বস সাময়িকীতে প্রকাশিত বিশ্বের সবচেয়ে ধনী লেখকের তালিকায় স্থান পেয়েছেন তিনি। ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক পলার জন্ম ও বেড়ে ওঠা বর্তমান জিম্বাবুয়ের হারারেতে। তিনি লন্ডন ও অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করেন। বর্তমানে বসবাস করছেন সাউথ লন্ডনে। ফোর্বস-এর তথ্যানুযায়ী পলা হকিন্সের ‘দ্য গার্ল অন দ্য ট্রেন’ উপন্যাসটি এ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ১ কোটি ২০ লাখ কপির বেশি বিক্রি হয়েছে। তাঁর নতুন উপন্যাস ‘ইনটু দ্য ওয়াটার’ বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বজুড়ে হৈচৈ পড়ে যায়। উপন্যাস দুটি প্রসঙ্গে এই লেখক বলেন, “দুটি উপন্যাসই মনস্তাত্ত্বিক সাসপেন্স উপন্যাস। তারপরও একটি অপরটি থেকে খুব ভিন্ন, কারণ ইনটু দ্য ওয়াটার অনেক বেশি মৌলিক। গল্পটি একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণনা করা হয়েছে, তারপরও আমার এ গল্পে অনেক বেশি চরিত্র আছে।”

জ্যাকি কলিন্স

বিখ্যাত ঔপন্যাসিক জ্যাকি কলিন্স। তিনিও বিশ্বের ধনী লেখকদের মধ্যে অন্যতম। ২০১৫ সালে ৭৭ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু এখনো তার বইগুলো বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছে। মৃত্যুর আগে দীর্ঘ সাত বছর স্তন ক্যান্সারে ভুগছিলেন তিনি। কিংবদন্তি এই লেখক জীবনের শেষ কয়েকটি দিন লস অ্যাঞ্জেলেসের বাসভবনেই ছিলেন। তার বোন জোয়ান কলিন্স একজন বিখ্যাত অভিনেত্রী। জোয়ান কলিন্স বলেন, “জ্যাকির মৃত্যুর খবরে আমি একদম ভেঙে পড়েছি। ও আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু ছিল। জ্যাকি স্কুলে পড়ার সময়ই লিখতে শুরু করেন। তার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ ফুল অব ম্যারেড ম্যান’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে। প্রথম বই দিয়েই বাজিমাত করেছিলেন এই লেখক। বইটি বেস্ট সেলার হয়েছিল তখন। সেই থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দুই হাত ভরে লিখে গেছেন জ্যাকি।

রিচার্ড চার্লস নিকোলাস ব্রানসন

এদের যাদের কথা বললাম তাঁরা সবাই কিন্তু লেখালেখি করেই ধনী হয়েছেন। কিন্তু ধনী হওয়ার আগে লেখেননি এক অক্ষরও অথচ ধনী হওয়ার পর লিখে লেখকখ্যাতি পেয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়। যেমন ‘লুজিং মাই ভার্জিনিটি’ হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম সেরা একজন ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী রিচার্ড চার্লস নিকোলাস ব্রানসনের লেখা আত্মজীবনীমূলক একটি বই। রিচার্ড ব্রানসন ভার্জিন গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৪০০টি কোম্পানি রয়েছে। এয়ারলাইন্সের ব্যবসার জন্য তিনি অধিক বেশি বিখ্যাত। তার এই বইটি বেশ আনন্দদায়ক ও অনুপ্রেরণামূলক। তিনি তার প্রাথমিক জীবনের প্রায় ৪৩ বছরের বিভিন্ন ঘটনা, এই বইটিতে তুলে ধরেছেন। তিনি এই বইটিতে এমনভাবে বর্ণনা তুলে ধরেছেন, একজন পাঠকের এই বইটি পড়ার সময় মনে হবে, তিনি যেন রিচার্ড ব্রানসনের সঙ্গে গল্প করছেন। একজন বন্ধু অন্য বন্ধুর সঙ্গে যেমনভাবে কথোপকথন করে থাকে, অনেকটা প্রায় তেমন ভঙ্গিতেই ব্রানসন বইটিতে আলোচনা তুলে ধরেছেন। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে। মূলত রিচার্ড ব্রানসনের প্রাত্যহিক নোটবুক থেকে লেখাগুলোকে একত্রিত করে, লুজিং মাই ভার্জিনিটি বইটির রূপ দেওয়া হয়েছে।

বিল গেটস

বিশ্বের শীর্ষ ধনী ও মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের বিখ্যাত একটি বই হচ্ছে ‘বিজনেস অ্যাট দ্য স্পিড অব থট।’ এই বইটি ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত হয়। বইটি প্রকাশ হওয়ার পরই বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ৯৫ শতাংশ পাঠক এই বইটি পড়ে সন্তুষ্ট প্রকাশ করেছে।

হলেন ওয়ারেন বাফেট

‘দ্য এসেস অব ওয়ারেন বাফেট’ নামের বইটি লিখেন বিশ্বের আরেক শীর্ষ ধনকুবের হলেন ওয়ারেন বাফেট। যিনি বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডারদের প্রতিবছর বার্ষিক চিঠি লিখে থাকেন। এই চিঠিতে তিনি তার ব্যবসায়িক চিন্তাচেতনা এবং বিনিয়োগ ও বাজার ব্যবস্থা সম্পর্কে তার মতামত ও চিন্তা-ভাবনাগুলো তুলে ধরেন। আর এই চিঠিগুলোই একত্রিত করে ১৯৯৭ সালে দ্য এসেস অব ওয়ারেন বাফেট বইটি প্রকাশ করা।

মাইকেল ডেল

বর্তমানে ডেলকে অন্যতম শীর্ষ কম্পিউটার ও প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এই ডেল কোম্পানিরই প্রতিষ্ঠাতা হলেন মাইকেল ডেল। যিনি মাত্র ১ হাজার ডলার দিয়ে ব্যবসা শুরু করে, বর্তমানে শীর্ষস্থানীয় একটি কম্পিউটার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়েছেন। তাঁর জীবনের লড়াইয়ের বিভিন্ন ঘটনা এবং তাঁর সফলতা অর্জনের কৌশল নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘ডিরেক্ট ফ্রম ডেল’ বইটি। তিনি তাঁর ব্যবসায়িক জীবন শুরু করার আগে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন।

সাম ওয়াল্টন

‘মেড ইন আমেরিকা’ হচ্ছে সাম ওয়াল্টনের আত্মজীবনীমূলক বই। ১৯৯২ সালে তার মৃত্যুর কিছুদিন আগে এই বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। সাম ওয়াল্টন খুবই ছোট একটি দোকানের মাধ্যমে তার ব্যবসা শুরু করেছিলেন। তারপর তিনি হয়েছিলেন ওয়াল-মার্টের মতো বিখ্যাত সাম্রাজ্যের মালিক। ওয়াল-মার্টকে বিশ্বের অন্যতম বড় রিটেইল স্টোর হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। তিনি কিভাবে ছোট একটি দোকান থেকে এরকম বিশাল প্রতিষ্ঠানের মালিক হলেন; এই সাফল্যময় গল্পেরই বর্ণনা তুলে ধরেছেন এই বইটিতে। এ পাঁচ ধনকুবেরের এ পাঁচটি বইয়ের সাহিত্যমূল্য যদিও নেই তবু পাঠকের কাছে সমাদৃত মোটিভেশনাল চরিত্রের জন্যে।

সর্বকালের সেরা ১০ বিক্রিত বই

এবার সর্বকালের সেরা ১০ বই হিসেবে বেশি বিক্রিত বইয়ের একটা তালিকা দিয়ে শেষ করা যায়। তবে এসব বইয়ের লেখকরা লিখে ধনী হতে পারেননি, সাহিত্যিক হিসেবে সমাদৃত। যেমন, লিও তলস্তয়ের ‘আনা কারেনিনা’ ও ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’, গুস্তাভে ফ্লবার্টের ‘মাদাম বোভারি’।


আরো পড়ুন দেবদুলাল মুন্নার দুটি গল্প
জবাফুলের দুনিয়া
ধুসাইলা


ভ্লাদিমির নাবোকভের ‘ললিতা’, মার্ক টোয়েনের ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব হাকলবেরি ফিন’, উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’, স্কট ফিজেরাল্ডের ‘দ্য গ্রেট গ্যাটসবাই’, মারসেল প্রোস্টের ‘ইন সার্চ অব লস্ট টাইম’, অ্যানটন শেকভের ‘দ্য স্টোরিজ অব অ্যানটন শেকভ’, জর্জ ইলিয়টের ‘মিডলমার্চ’। যে বইগুলোর নাম নিলাম এগুলো টাইম ম্যাগাজিনের সর্বশেষ সেরা বই।

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;