কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ৬)



জিনি লকারবি ।। অনুবাদ: আলম খোরশেদ
বার্তার নিজস্ব অলঙ্করণ

বার্তার নিজস্ব অলঙ্করণ

  • Font increase
  • Font Decrease

 আমার শত্রুদের উপস্থিতিতে

[পূর্ব প্রকাশের পর] সেই রবিবার বিকালে আমাদের প্রার্থনাসভা শেষ হওয়ার কয়েক মিনিট আগে খুব কাছেই প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। আমাদের গলির বাঁদিকের মোড়েই গোলাগুলি ও হত্যাযজ্ঞ চলছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের সিঁড়িতে ভারী বুটের শব্দ শোনা গেল। বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক ও নবগঠিত মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা আহতদের নিয়ে আসছিল আমাদের কাছে।

“অবশ্যই আমরা আপনাদের সাহায্য করব,” আমরা তাদের বলি। “তবে একটা বড় সমস্যা আছে। আমাদের কোনো পানি নেই।”

বিন্দুমাত্র দেরি না করে অধিনায়ক তাঁর ছেলেদের কাছাকাছি কুয়োতে পাঠিয়ে দিলেন। একটি সুসংগঠিত বালতিবাহিনী তৎক্ষণাৎ পানি আনার কাজে নেমে গেল।

বাড়িতে বালতিভরা পানির আগমন দেখে, স্বপন তার প্রার্থনার ফল ফলেছে বুঝতে পেরে খুশিতে ডগমগ হয়ে ওঠে।

আমরা আহতদের সেবা করার লক্ষ্যে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসি।

প্রথমজনের পায়ে গুলি লেগেছিল; ডিসি হিলের সামনের গোল চক্করের পাশ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময়।

এই আহত ছেলেটার বন্ধুরা ভেবেছিল গুলিটা বুঝি তার পায়ে রয়ে গেছে তখনও। তাদেরই একজন মর্চেপরা একটা সাধারণ ছুরি দিয়ে ক্ষতের পাশটা খুঁচিয়ে দেখার জন্য বলছিল আমাদের। আমরা তাকে নিরস্ত করতে না পারায়, লিন আহত ছেলেটিকে একটা ব্যথানাশক অষুধ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সে তাকে ১০০ মিলিগ্রাম ডেমেরোল দেওয়ার কথা বলে—যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যা খুবই নিরীহ মাত্রার অষুধ; কিন্তু পুষ্টিবঞ্চিত, হালকা গড়নের বাঙালিদের জন্য বেশ কড়াই বটে। এটা শুনে এক পর্যায়ে তারা পিছিয়ে যায় এবং আমাকে অন্য একটা ধারালো জিনিস দিয়ে ক্ষতটাকে পরীক্ষা করতে বলে। আমি এর আগে কখনো গুলির ক্ষত চোখে দেখিনি, ফলে ঠিক বুঝতেও পারছিলাম না আমার আসলে কী করা উচিত। রিড আমাকে ব্যাখ্যা করে বলেন গুলিটা পায়ের মধ্যে আস্ত ঢুকে গেলে কেমন দেখাবে, আর প্রথমেই ফেটে গিয়ে যদি ঢোকে তাহলে তাকে কেমন সিমের বিচির টুকরোর মতো দেখাবে।

জানি না বুলেটটা কোথায় গিয়েছিল, আমি কিন্তু সেটা ছেলেটার পায়ের মধ্যে পাইনি। আমাদের খোঁচাখুচি শেষ হবার আগেই সে ঘুমে অচেতন হয়ে যায়। মিসেস বসুর হাতে তাকে জোর করে খাওয়ানোর কয়েকটা মিনিট বাদ দিলে সারাটা রাত সে মূলত অজ্ঞানই ছিল।

এর পরের লোকটিও সাংঘাতিকভাবে আহত ছিল। তার পায়ে পাঁচটি গুলির আঘাতের পাশাপাশি মাথাতেও গুলি লেগেছিল। তার অপারেশনের দরকার ছিল—যা আমার আর লিনের সাধ্যের বাইরে। তাকে তাই প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েই আমরা ছেড়ে দিই, তার সাথীদেরকে দিয়ে এই প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়ে যে, তারা তাকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাবে। তারা সেটা করতে পেরেছিল কিনা, আমরা কখনো জানতে পারিনি।

অন্যদের আঘাতগুলো পরিষ্কার করে আমরা ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিই। আমরা এক যুবকের চিকিৎসা করার সময় সারাক্ষণ সে একটা চাইনিজ গ্রেনেড নিয়ে খোঁচাখুচি করছিল। তার রাইফেলটা সে আরেকজনকে রাখতে দিয়েছিল, যে-কিনা সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় ভুল করে একটা গুলি ছুড়ে দেয়। আহত ছেলেটা তাতে রেগে কাঁই হয়ে যায়, কেননা তাদের গোলাবারুদের এতটাই সংকট ছিল যে, প্রত্যেকটা গুলির হিসাব রাখতে হতো।

“আমি একটা গুলি নষ্ট করার চেয়ে বরং প্রাণ দিয়ে দেব।” সে ঘোষণা করে।

আমি যখন এইসব বুলেট আর তার ছররা খোঁজার কাজে ব্যস্ত ছিলাম তখন পাশের গলি থেকে একজন ঘুমের অষুধ খুঁজতে আসে।

“আমার বউ ঘুমাতে পারছে না।” সে ব্যাখ্যা করে বলে।

আমার প্রথম প্রতিক্রিয়াটা ছিল রাগের; সে এই সামান্য ব্যাপারে আমাদের সময় নষ্ট করছে বলে। ঘুমাতে পারছে না—তা কে-ই বা এখন ঘুমাতে পারছে? যখন আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় লোকেরা রক্তাক্ত হচ্ছে, বেঘোরে মারা পড়ছে—তখন এটা কোনো সমস্যা হলো! তারপর আমার মনে পড়ে, সেই নারীর তো আর ভরসা করার মতো কেউ নেই। আমি যেমন প্রতি রাতে মর্টার আর মেশিনগানের গুলির শব্দের মধ্যেও ঘুমাতে যাবার আগে প্রভুর শরণ নিতে, তাঁর কাছে প্রার্থনা করতে পারছিলাম, তার তো তেমন কেউ ছিল না।

রোগীরা চলে যায়। তখন অষুধপত্তরের জঞ্জাল একটু সাফসুতরো করার ইচ্ছা হলেও, মহামূল্য পানির অপচয় করতে মন সায় দেয় না আমাদের।

আমাদের পরবর্তী অতিথি ছিল মালুমঘাটে এবং আরো দক্ষিণের এক গ্রামে পরিবার রেখে নিরাপদে ফিরে আসা মণীন্দ্র ও গাড়ির ড্রাইভার। আমরা তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনে দ্বিগুণ খুশি হয়েছিলাম আমাদের প্রয়োজনে ব্যবহার করার জন্য রিডের গাড়িটি ফেরত পেয়ে। ফেরার পথে বারবার তাদের গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি করা হয়; ইঞ্জিন পরীক্ষা করা থেকে শুরু করে সামনের সিট তুলে ও যন্ত্রপাতি রাখার বাক্স পর্যন্ত খুলে দেখা হয়।

মণীন্দ্র হাসপাতালে আমাদের সহকর্মীদের কাছ থেকে খবর ও চিঠি নিয়ে আসে। আমরা সেগুলো পড়তে পড়তে হাসছিলাম। তাদের অবস্থা আমাদের চেয়ে কতই না আলাদা, আমরা যারা এখানে এই অন্ধকার ঘরের মেঝেতে জবুথবু হয়ে বসে আছি। তাদের জানার কোনো উপায় ছিল না মাত্র পঁয়ষট্টি মাইল দূরে আমাদের জীবনে কী ঘটছিল। তারা আমাদেরকে তাদের কাছে চলে যাওয়ার কথা বিবেচনা করতে বলেছিল, এবং যাওয়ার সময় তাদের জন্য ‘ব্যাংক থেকে টাকা, দোকান থেকে খাবার এবং দর্জিবাড়ি থেকে কাপড়’ নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছিল।

অথচ ব্যাংক ছিল বন্ধ, দোকানের সব মালপত্র গেছে লুট হয়ে, এবং দর্জি বেচারাকে সম্ভবত মেরেই ফেলা হয়েছে!

ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে এসেছে, বাইরে যাওয়া তখন খুবই বিপজ্জনক; ফলত মণীন্দ্র, ড্রাইভার, তার বন্ধু, আর সেই ‘অজ্ঞানপ্রায়’ রোগীটি আমাদের বসার ঘরের দখল নেয়। তারা হালকাভাবে রেডিও ছাড়ে। সেইরাতে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে শেষ যে-কথাগুলো শুনি আমরা, তা ছিল এরকম, “শৃঙ্খলা রক্ষার নামে তারা কার্যত কবর খুড়ছিল সারা দেশে।”

সোমবার সকালে বসবার ঘরে গোল হয়ে বসে আমরা আঠারোজন মুড়ি, চা দিয়ে নাস্তা সারি। পায়ে গুলি লাগা ছেলেটি সিদ্ধান্ত নেয় তার কাজে ফেরা উচিত। নির্মল তাকে গলির শেষ মাথা পর্যন্ত এগিয়ে দেয়। মোড়টা পেরিয়ে সে আরেকজন অস্ত্রধারী তরুণের সঙ্গে যোগ দেয়। আর তক্ষুণি পাহাড়ের ওপর থেকে গুলি ছুটে আসে এবং তাদের একজন মাটিতে পড়ে যায়। নির্মল বাড়িতে ছুটে আসে আমাদের এটা জানাতে যে, সেই রোগীটি গুলি খেয়ে মারা গেছে।

আমরা তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করারও সময় পাইনি, তার আগেই দেখি সে আমাদের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বলছে, “আমার ব্যান্ডেজটা পড়ে গেছে। আরেকটা লাগিয়ে দেবেন প্লিজ?”

চারদিকে গোলাগুলির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় আমরা লিনের ঘরেই একটি ছোটখাটো চিকিৎসালয় খুলে বসি। তারপরই আমরা আবিষ্কার করি, একটা ফিল্ড হাসপাতালের জন্য আমাদের যন্ত্রপাতি কী অপ্রতুলই না ছিল! আমাদের এমনকি প্যাঁচানো ব্যান্ডেজের কোনো রোল পর্যন্ত ছিল না!

বিভিন্ন মিশনারি দলের সদস্য ভদ্রমহিলারা যারা আমাদেরকে এগুলো পাঠাতে চেয়েছিলেন তাঁদের কথা ভেবে আমি প্রায় কেঁদে ফেলি। আমি সবসময় এই বলে তা প্রত্যাখ্যান করেছি যে, আমাদের সেসব ড্রামভরা রয়েছে। আর এখন যখন ব্যান্ডেজের দরকার পড়েছে, তখন আমরা কিনা বাচ্চাদের দিয়ে আমাদের বিছানার চাদর ছিঁড়ে, পেঁচিয়ে গোল করাচ্ছি।

প্রত্যেক কক্ষে গিয়ে আমরা আসবাবপত্রগুলো ঠেলে ঠেলে জানালার সামনে এনে রাখি। এতে ঘর একটু অন্ধকার হয়ে গেলেও, বুলেটগুলো আমাদের কাছে পৌঁছানোর আগেই আঘাত করার মতো যথেষ্ট জায়গা খুঁজে নিতে পারত। সেই সকালে খাবার ও কেরোসিন সমস্যাবিষয়ে আমরা কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত নিই। আমাদের সযত্নে মজুদ-করা টিনজাত খাবার খাবে কেবল তিন আমেরিকান। বাঙালিরা টাটকা খাবার যা থাকবে তা-ই খাবে। বাজার থেকে জব্বার ও নির্মলের আনা চালে ভাত রান্না করার পাশাপাশি সেদিন আমাদের টিন-ভরতি করতে না-পারা সব্জিগুলোও ভাজি করা হয়। আমরা যখন এই সব্জিগুলোকে কিভাবে পচে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করব ভেবে হতাশায় মরে যাচ্ছিলাম, তখন ঈশ্বর ঠিকই জানতেন, আমাদের সেগুলো প্রয়োজন পড়বে। আমি মনে মনে ভাবি, “ঈশ্বর কত বুদ্ধিমান!”

আমরা ঠিক করি, অল্প যেটুকু কেরোসিন বাকি আছে আমাদের সেটাকে আমরা খরচ করব না, যাতে করে বিদ্যুৎ চলে গেলে আমরা চুলাটা অন্তত জ্বালাতে পারি। এর অর্থ, ফ্রিজের কেরোসিন ফুরিয়ে গেলে সেটা আমাদেরকে বন্ধ করে দিতে হবে—আর সেটা ঘটতে পারে যে-কোনো সময়। ওটার কাঁটা দুদিন ধরেই প্রায় শূন্য দেখাচ্ছিল। আমরা আমাদের পানি খাওয়া, গোসল করা এবং রেডিও শোনাও কমিয়ে দিয়েছিলাম।

স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি ছিল না। এটা কখনো শোনা যেত, কখনো না। বাইরে গোলাগুলির শব্দের মধ্যে হঠাৎ করে এর ঘোষকের গলায় ’জয় বাংলা’ ধ্বনি শুনলে বেশ উত্তেজনা হতো আমাদের। যতবারই এটা শুনতে পাওয়া যেত ততবারই সারা, রেবেকা আর আমি আমাদের বসার ঘরের চারপাশে একপাক নেচে নিতাম। তারা যে তখনও টিকে আছে এটা জানাটাও এক ধরনের ভরসার মতো ছিল আমাদের কাছে। প্রচার থাকুক আর না থাকুক, আমরা রেডিওটা চালিয়েই রাখতাম, যেন তাদের কোনো অনুষ্ঠানই আমাদের বাদ না যায়। যে-তারটার মাধ্যমে আমরা এই রেডিওটা বিদ্যুতের মাধ্যমেও চালাতে পারতাম সেটা একদিন বেশি গরম হয়ে পুড়ে যায়, ফলে ব্যাটারি ব্যবহার করেই তা শুনতে হতো আমাদের, যেগুলো অবশ্য খুব কমই ‘ever-ready’ থাকত।

রেডিও পাকিস্তান খুলে আমরা শুনি তারা খুব তিক্তভাবে অভিযোগ করছে, ভারত, বিবিসি আর ভয়েস অভ আমেরিকার কোনো অধিকার নেই বাংলাদেশ নামটা ব্যবহার করার। পাকিস্তান সরকার জোর দিয়ে বলে যে, সমস্যা মিটে গেছে। অবস্থা সেনাদের নিয়ন্ত্রণে এবং সবকিছু স্বাভাবিক রয়েছে। দোকানপাট খোলা এবং লোকজনও রাস্তায় বেরুচ্ছে। আকাশবাণী অন্যদিকে জানায়, ইন্দিরা গান্ধী একে ’বাঙালি নিধনযজ্ঞ’ বলে অভিহিত করছেন।

লোকজন আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। অনেকে বিপদের ঝুঁকি নিয়ে দেখতে আসে, আমরা ঠিক আছি কিনা। আমাদের গির্জার সদস্যরা, কিছু তরুণ ছাত্র এবং মিস্টার ও মিসেস দাশও যখনই সময় পেতেন এসে আমাদের খোঁজখবর নিতেন। এদের কেউ কেউ ট্রাকভর্তি লাশ নিয়ে যেতে দেখেছেন শহরের বাইরে। কেউ কেউ নারী ও শিশুদের শহরের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার বিজ্ঞপ্তিও নাকি পড়েছেন। মনোবল-বাড়ানো বক্তৃতাসমূহ, আর শেখ মুজিবের এমন পূর্বে রেকর্ড-করা টেপ, “আমি ভালো আছি এবং চট্টগ্রামেই আছি”, বাজিয়ে শোনানো সত্ত্বেও বাঙালিরা হতাশ হয়ে পড়ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গড়া ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্যরা শহরের প্রধান প্রধান পাহাড়ের ওপরে ঘাঁটি গেড়ে থাকলেও তাদের অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদের অভাব থাকায় সেই অবস্থান ধরে রাখাটা বেশ কঠিন হয়ে পড়ছিল। [চলবে]


কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ৫)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ৪)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ৩)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ২)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১)

   

বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন: পূর্ণ স্বীকৃতি কতদূর?



প্রদীপ কুমার দত্ত
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

আমরা বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলন বলতেই বুঝি বৃটিশ শাসন পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানে ১৯৪৮-এ শুরু হওয়া এবং বায়ান্নর অমর ভাষা শহীদদের আত্মদানের মাধ্যমে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে। একুশে ফেব্রুয়ারি পৃথিবীর ভাষা আন্দোলনের জন্য একটি দিক নির্দেশক দিন। সেই আন্দোলনের সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয় পূর্ব বাংলার বাঙ্গালীরা। পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে দানা বাঁধে স্বাধিকার অর্জনের আন্দোলন। বহু আন্দোলন, সংগ্রাম ও সর্বোপরি মহান মুক্তিযুদ্ধের অবর্ণনীয় কষ্ট আর সমুদ্রসম আত্মত্যাগ এবং অসীম বীরত্বের ফলশ্রুতিতে আমরা পাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

এর বহু পরে, বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে, বাংলাদেশী কানাডা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম এর নেতৃত্বে পৃথবীর বিভিন্ন ভাষাভাষীদের নিয়ে মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স অফ দি ওয়ার্ল্ড গঠিত হয় কানাডার ভ্যাংকুভারে। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ ও নিরলস প্রচেষ্টা এবং বাংলাদেশ সরকারের সার্বিক সহযোগিতায় দিনটি বিশ্বসভায় আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত। এই দিনের জাতিসংঘ ঘোষিত অঙ্গিকার বিশ্বের প্রতিটি ভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করা এবং বিদ্যমান প্রায় ৭০০০ ভাষার একটিকে ও আর হারিয়ে যেতে না দেয়া। ইতিমধ্যে আধিপত্যবাদের কারণে ও সচেতন মহলের সচেতনতার অভাবে বহু ভাষা, সাথে সাথে তাদের সংস্কৃতি, পুরাতত্ত্ব ও ইতিহাস পৃথিবীর বুক থেকে মুছে গেছে।

কাজেই আমাদের বুঝতে হবে, ভাষা আন্দোলনের স্বর্ণখচিত ইতিহাস ও সাফল্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও কেবলমাত্র বাংলাদেশের ((তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) বাঙ্গালীরাই ভাষার জন্য সংগ্রাম করা ও প্রাণ দেয়া একমাত্র জাতিগোষ্ঠী নই। অর্ধ সহস্রাব্দের আগে স্পেনীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দক্ষিণ আমেরিকার মায়া,আজটেক,ইনকা নামের তৎকালীন উন্নত সভ্যতার জাতিসমূহকে জেনোসাইডের মাধ্যমে ধ্বংস করে দিয়েছে।প্রতি মায়া লোকালয়ে একটি করে পাঠাগার ছিল। এইরকম দশ হাজার লোকালয়ের পাঠাগারের সব বই তারা ধ্বংস করে দেয়। আজকের দিনে মাত্র আদি মায়া ভাষার তিনখানা বই (মেক্সিকো সিটি,মাদ্রিদ ও ড্রেসডেনে) সংরক্ষিত আছে। যুদ্ধ করেও মায়ানরা পাঠাগারগুলো বাঁচাতে পারেন নি। সাথ সাথে ক্রমে ধ্বংস হয়ে যায় তাঁদের সংস্কৃতি ও জাতিসত্তা।

বাংলাভাষী জনগণের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় উল্লেখ্যোগ্য অবদান রয়েছে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির সাঁওতাল পরগণার অন্তর্গত মানভূমের বাঙ্গালীদের। বহু বছর সংগ্রাম,রক্ত ও জীবনের মূল্যে তাঁরা তাঁদের দাবি অনেকটা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এরপর বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় আন্দোলনের সূচনা আসামের কাছাড়ে।বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জন দেয়া প্রথম মহিলা শহীদ কমলা ভট্টাচার্য সহ এগার তরুন প্রাণ ঝড়ে পড়েছে এই আন্দোলনে।

১৯৬১-তে আসামের বরাক উপত্যকার বাঙালি জনগণ তাদের মাতৃভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে আন্দোলনে শামিল হয়। যদিও বরাকের সিংহভাগ জনগণ বাংলা ভাষায় কথা বলেন,তবুও ১৯৬১-তে অহমিয়াকে আসামের একমাত্র রাজ্যভাষা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। ফুসে ওঠেন বরাকের বাঙ্গালীরা।বাংলাভাষা বরাক উপত্যকার অন্যতম সরকারি ভাষার মর্যাদা পায়।

মানভূম ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ। সাঁওতাল পরগণার মানভূম জেলা বাঙালি অধ্যুষিত হলেও তা দীর্ঘকাল বিহারের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভারতের স্বাধীনতার পর সেখানে হিন্দি প্রচলনের কড়াকড়িতে বাংলা ভাষাভাষীরা চাপের মুখে পড়েন। মাতৃভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন তাঁরা। ১৯৪৮ থেকে দীর্ঘ আট বছর চলা এই আন্দোলনের সাফল্যে ১৯৫৬ এর ১ নভেম্বর মানভূমের বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় পুরুলিয়া জেলা। বিহার থেকে নিয়ে পুরুলিয়াকে যুক্ত করা হয় পশ্চিমবঙ্গের সাথে। তাঁদের মাতৃভাষা বাংলা ব্যবহারের দ্বার উন্মুক্ত হয় তাঁদের সামনে।

এবারে আবার ফিরি ১৯ মে'র ইতিহাসে। আসামের বরাক উপত্যকা আদিকাল থেকেই বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল। একসময় এই এলাকার অধিকাংশ ডিমাসা জনগোষ্ঠীর কাছাড় রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ডিমাসা রাজন্যবর্গ ও বাংলাভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। কালক্রমে ব্রিটিশরা ভারত বিভাগ করে চলে গেলে আসাম প্রদেশের একাংশ সিলেট পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়। সিলেটের একাংশ ও ডিমাসা পার্বত্য ও সমতল অঞ্চল নিয়ে কাছাড় জেলা গঠিত হয়। এই জেলা বর্তমানে বিভক্ত হয়ে কাছাড়,হাইলাকান্দি,করিমগঞ্জ ও উত্তর কাছাড় পার্বত্য জেলা (ডিমা হাসাও)এই চার নতুন জেলায় রূপ নিয়েছে।

১৯৪৭ এ দেশবিভাগের পর থেকেই বরাক উপত্যকার কাছাড় জেলার অধিবাসীরা বৈষম্যের শিকার হতে থাকেন। আসাম অহমিয়াদের জন্য এবং বাঙ্গালীরা সেখানে বহিরাগত এমন বক্তব্য ও ওঠে। এখনও সেই প্রবণতা বিদ্যমান। জাতীয়তাবাদের জোয়ারে এক শ্রেণির রাজনীতিবিদরাও গা ভাসান। বঙ্গাল খেদা আন্দোলনও গড়ে ওঠে একসময়ে। সরকারিভাবে সেসব আন্দোলন ও সহিংসতা দমন হলেও পরবর্তী কালে সময়ে সময়ে এই জাতীয় সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে।

আসাম রাজ্য বিধান সভায় ভারতের স্বাধীনতার পর পর সদস্যরা বাংলা, হিন্দি বা ইংরেজিতে বক্তব্য রাখতে পারতেন।প্রথম আঘাত এলো ভাষার উপর। অহমিয়াকে একমাত্র রাজ্যভাষা ঘোষণা, শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে চালুর চেষ্টা এবং বিধানসভায় বাংলায় বক্তব্য রাখার অধিকার ক্ষুণ্ণ করে আইন চালুর বিরুদ্ধে আসামের বাঙ্গালী জনগণ দল-মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। আসাম রাজ্য সরকার কোনও গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথে গেলেন না। তাঁরা অহমিয়া জাতীয়তাবাদ এর সংকীর্ণ মানসিকতার নেতাদের প্রাধান্য দেয়ার নীতি গ্রহণ করেন। বাঙ্গালীরাও সংগঠিত হতে থাকেন।

অনুমান করা যায় আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ বাহান্নর ঢাকার ভাষা আন্দোলন ও মানভূমের ভাষা আন্দোলনের সাফল্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।১৯৬০ সালের শেষে আসাম বিধান সভায় ভাষা বিল পাশ হয়। কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা হয়ে গেলো। বাঙ্গালীরা ফুঁসে উঠলেন। লাগাতার আন্দোলন চলতে থাকলো।সত্যাগ্রহ,অসহযোগ, হরতাল, রেল রোখো,সংকল্প দিবস, ইত্যাকার অহিংস আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠল বরাক উপত্যকা। এই আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯৬১ সালের ১৯মে তারিখে বরাকের কেন্দ্রবিন্দু শিলচরের রেলস্টেশনে ভোর থেকে আন্দোলনকারী সত্যাগ্রহীরা জড়ো হয়। হাজার হাজার ছাত্র যুবা জনতা রেলস্টেশন প্রাঙ্গন ও রেললাইনের উপর অবস্থান নেয়। তাঁদের সরাতে না পেরে সরকার নির্মম দমননীতির আশ্রয় নেয়। পুলিশ বাহিনী জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। নিহত হন পৃথিবীর প্রথম মহিলা ভাষা শহীদ কমলা ভট্টাচার্য সহ মোট ১১ জন ছাত্র যুবা। তাঁরাই একাদশ ভাষা শহীদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

তাঁদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা দ্বিতীয় রাজ্যভাষার মর্যাদা পায়। শিলচর রেলস্টেশনের সামনে স্থাপিত হয় শহীদদের প্রতিকৃতি সম্বলিত শহীদ মিনার। যার পথ ধরে পরবর্তী কালে ছড়িয়ে পড়ে একই আকৃতির শহীদ মিনার সমগ্র বরাক উপত্যকায়। শিলচর রেলস্টেশনের নাম পাল্টে জনতা ভাষা শহীদ রেল স্টশন নাম রেখেছেন। যদিও পূর্ণ সরকারি স্বীকৃতি এখনও তার মেলেনি।

বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় একাদশ শহীদ সহ আন্দোলনকারীদের আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু সব এলাকার বাঙ্গালিরা কি এই ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন? উত্তরটি ‘না’ সূচক। আমাদের কর্তব্য তাঁদের আত্মত্যাগের কাহিনী সকলকে জানানোর উদ্যোগ নেয়া যাতে ভবিষ্যত প্রজন্ম তাঁদের সংগ্রামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হতে শেখে। বরাক উপত্যকার একাদশ ভাষা শহীদ অমর রহে। বাংলা সহ সকল মাতৃভাষার অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত থাকুক।

এখনও সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন এমন অনেকেই বেঁচে আছেন। বেঁচে আছেন নেতৃত্ব দেয়াদের মধ্যে অনেকে। সাথে সাথে প্রত্যক্ষদর্শীদের ও সন্ধান পাওয়া এখনও কষ্টকর নয়। তবে সামনের সিকি শতাব্দীর মধ্যে প্রাকৃতিক নিয়মেই তাঁরা আর আমাদের মাঝে থাকবেন না। এখনই প্রকৃষ্ট সময় তাঁদের সাক্ষাৎকার রেকর্ড করে রাখার। পর্যাপ্ত গবেষণা হওয়া প্রয়োজন সেই আন্দোলন,তার কুশীলব এবং শহীদ পরিবার সমূহের বিষয়ে। বীরের সন্মান উপযুক্ত ভাবে হওয়া প্রয়োজন। বাংলা ভাষার এবং বাংলা ভাষাভাষী জনগণের মর্যাদা বিশ্বব্যাপী সমুন্নত রাখার জন্য আমাদের এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আরও অনেক বীরের আমাদের প্রয়োজন। যে মাটিতে বীরের যথাযোগ্য সন্মান নেই, সে মাটিতে বীর জন্মায় না।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও পরিব্রাজক

;

রাইটার্স ক্লাব পুরস্কার পাচ্ছেন ১৫ কবি-সাহিত্যিক



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

‘বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব পুরস্কার’ ২০২২ ও ২০২৩ ঘোষণা করা হয়েছে। পাঁচ ক্যাটাগরিতে ১৫ জন কবি ও সাহিত্যিককে এই পুরস্কার দেওয়া হবে।

বৃহস্পতিবার (১৬ মে) এক অনুষ্ঠানে পুরস্কার মনোনীতদের নাম ঘোষণা করেন বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাবের জ্যৈষ্ঠ সদস্য কবি আসাদ মান্নান।

তিনি জানান, ২০২২ সালে কবিতায় পুরস্কার পেয়েছেন- শাহ মোহাম্মদ সানাউল হক ও রিশাদ হুদা। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর বিষয়ে মালিক মো. রাজ্জাক। এছাড়া প্রবন্ধে বিলু কবীর, শিশুসাহিত্যে আনজীর লিটন, অনুবাদে ইউসুফ রেজা এবং কথাসাহিত্য জুলফিয়া ইসলাম।

আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়েছে, কবি খুরশীদ আনোয়ারকে।

কবি আসাদ মান্নান জানান, ২০২৩ সালে কবিতায় মিনার মনসুর ও মারুফুল ইসলাম পুরস্কার পাচ্ছেন। প্রবন্ধে আসাদুল্লাহ, কথাসাহিত্যে জয়শ্রী দাশ, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ে নাজমা বেগম নাজু, শিশুসাহিত্য আমীরুল ইসলাম এবং অনুবাদে মেক্সিকো প্রবাসী আনিসুজ্জামান।

আগামী ১৯ মে পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি-সাহিত্যিকদের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা দেওয়া হবে। পুরস্কার ঘোষণা কমিটির প্রধান ছিলেন কবি শ্যামসুন্দর শিকদার। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা।

;

ঢাকার মিলনায়তনেই আটকে ফেলা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে! 



আশরাফুল ইসলাম, পরিকল্পনা সম্পাদক বার্তা২৪.কম
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহে তাদের জন্মজয়ন্তীর জাতীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রথা কি তবে লুপ্ত হতে চলেছে? দীর্ঘসময় ধরে মহাসমারোহে কয়েকদিন ধরে এসব জন্মজয়ন্তী আয়োজনের রেওয়াজ থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা কারণ দেখিয়ে সেই মাত্রায় আর হচ্ছে না রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তীর মহাআয়োজন। ঢাকার বাইরে উন্মূক্ত স্থানের বদলে রাজধানীতেই সীমিত পরিসরে মিলনায়তনে আটকে ফেলা হচ্ছে এসব আয়োজনের পরিধিকে। 

বাঙালির সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই দুই পুরোধা পুরুষের জন্ম ও মৃত্যুদিন ঘিরে বিশাল আয়োজনে তাদের পরিধিবহুল সৃষ্টিকর্ম ও যাপিত জীবনের আখ্যান তুলে ধরা হতো। রাজধানীর বাইরে জেলা পর্যায়ে কবিদের স্মৃতিধন্য স্থানসমূহে এই আয়োজনকে ঘিরে দীর্ঘসময় ধরে চলতো সাজ সাজ রব। যোগ দিতেন সরকার কিংবা রাষ্ট্রপ্রধান। কিন্তু নানা অজুহাতে পর্যায়ক্রমে রাজধানী ঢাকাতেই যেমন আটকে যাচ্ছে রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তীর জাতীয় আয়োজন, তেমনি রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণও কমে এসেছে। 

জাতীয় কবির ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে এবারও কোন ভিন্নতা থাকছে না জানিয়ে কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক এ এফ এম হায়াতুল্লাহ বার্তা২৪.কম-কে বলেন, ‘রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তীর জাতীয় পর্যায়ের আয়োজনগুলো সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কর্তৃক পালিত হয়। আর মৃত্যুবার্ষিকীগুলো নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান আয়োজন করে থাকে। যেমন কবি নজরুল ইনস্টিটিউট যেহেতু কবির নামে প্রতিষ্ঠিত, তাই নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানটি ইনস্টিটিউটই আয়োজন করে থাকে।’

তিনি বলেন, ‘অন্যান্য বছর যেভাবে উদযাপিত হয় এবারও সেভাবেই আয়োজন করা হচ্ছে। এবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ২৫ মে (২০২৪) বেলা ৪টায় জাতীয় জাদুঘরে শুরু হবে। রবীন্দ্র ও নজরুল জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানগুলো কবিদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহে অনুষ্ঠিত হত। এই বারও হবে, তবে জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানগুলো ঢাকার বাইরে হবে না।’

‘ঢাকার বাইরে যেসব জেলাগুলো নজরুলের স্মৃতিসংশ্লিষ্ট; যেমন-ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, মানিকগঞ্জ, চট্টগ্রাম, চুয়াডাঙ্গা-এসব জেলাগুলোতে নজরুল গিয়েছেন, থেকেছেন আত্মীয়তা বা বন্ধুত্বের সূত্রে। এবার জাতীয় পর্যায়ে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানও ঢাকায় হয়েছে, নজরুলের জন্মজয়ন্তীও ঢাকায় হবে। ঢাকার বাইরে এবার নজরুল জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠান না হওয়ার পেছনে সরকারের কাছে যে যুক্তি তা হচ্ছে-এই সময়ে দেশের উপজেলায় নির্বাচন হচ্ছে। বিশেষত জেলা প্রশাসন এইগুলো আয়োজনে মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা করে থাকে। জেলা প্রশাসনগুলো নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত থাকবে। নজরুল জয়ন্তী আয়োজনে মনযোগ হয়ত কম দেবে। যে উদ্দেশ্যে জনমানুষের কাছে পৌছানোর জন্য এই অনুষ্ঠান, তা পরিপূর্ণ সফল হবে না বিধায় এবার এই আয়োজনগুলো ঢাকায় করার সিদ্ধান্ত হয়েছে’-বলেন সরকারের এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় পর্যায়ে রবীন্দ্র ও নজরুল জন্মজয়ন্তী উদযাপনে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি আছে। এতে দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও রয়েছেন। গত ২ এপ্রিল (২০২৪) কমিটির মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়, রবীন্দ্র জয়ন্তী হবে শিল্পকলা একাডেমিতে এবং নজরুল জয়ন্তী হবে বাংলা একাডেমিতে।

জানা গেছে, বাংলা একাডেমিতে কিছু রেনুভশন ওয়ার্ক চলমান থাকায় বিদ্যুতের সমস্যা হতে পারে। ঝড়-বৃষ্টির শঙ্কা থাকায় মুক্তমঞ্চেও এই আয়োজন না করে জাতীয় জাদুঘরে প্রধান মিলনায়তনে নজরুল জয়ন্তীর তিন দিনব্যাপী জাতীয় অনুষ্ঠান করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ২৫ মে বেলা ৪টায় উদ্বোধনী দিনে প্রধান অতিথি থাকবেন আওয়ামীলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এমপি। বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব খলিল আহমদ। স্মারক বক্তা থাকবেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক। সভাপতিত্ব করবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নাহিদ ইজহার খান, এমপি। আলোচনা অনুষ্ঠানের পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে থাকবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের পরিবেশনা।

২৬মে আয়োজনের দ্বিতীয় দিনের প্রধান অতিথি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাজ্জাদুল হাসান, এমপি। বিশেষ অতিথি থাকবেন কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি শিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল। সভাপতিত্ব করবেন জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক মোঃ কামরুজ্জামান। ২৭ মে তৃতীয় দিনের আয়োজনের প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। বিশেষ অতিথি থাকবেন শিল্পী সাদিয়া আফরিন মল্লিক। শেষ দিনের স্মারক বক্তা কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক এ এফ এম হায়াতুল্লাহ।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তী উদযাপনে জাতীয় কমিটির একজন সদস্যের কাছে জয়ন্তী আয়োজনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঐতিহ্যিক ধারা বজায় না থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তবে রবীন্দ্র ও নজরুল অনুরাগীরা বলেছেন, মূল্যবোধের অবক্ষয়ের এই সময়ে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সাহিত্য-জীবনদর্শন আমাদের পাথেয়। তাদের জন্ম ও মৃত্যুদিনে মহাসমারোহে ঢাকার বাইরে কবিদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহে আয়োজনের যে ধারাবাহিকতা ছিল তা দেশজুড়ে সাংস্কৃতিক চর্চাকে বেগবান করতো। কিন্তু এই আয়োজনকে সীমিত করে রাজধানীর মিলনায়তনে আটকে ফেলা নিশ্চিতভাবেই আমাদের সংস্কৃতির বিকাশকে রূদ্ধ করারই অংশ। এর পেছনে সুক্ষ্ণভাবে কারা কাজ করছে তাদের চিহ্নিত করা জরুরি বলেও মনে করেন তারা।

;

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



অলঙ্করণ: মামুনুর রশীদ

অলঙ্করণ: মামুনুর রশীদ

  • Font increase
  • Font Decrease

পিপাসার্ত ঘোরে

প্রান্তরের মাঝে আছে নিঃস্বতার ডাক
আত্ম অনুসন্ধানের
ফিরতি ঢেউ
আছড়ে পড়ে
আশ্লেষের বালুকাবেলায়
মুমূর্ষু যেমন তীব্র পিপাসায়
জীবনের আলিঙ্গন চায়-
আর্ত রাত্রি হিমেল কামের ঘোর
নীরবে দংশায়
ঘর পোড়ে, আকাক্ষার
বাতি নিভে যায়
কোথায় প্রান্তর, শূন্যতা কোথায়
আছে সে নিকটে জানি
সুদূরের এলানো চিন্তায়
যেখানে গোধূলিদগ্ধ
সন্ধ্যা কী মায়ায়
গুটায় স্বপ্নের ডানা
দেবদারু বনে বীথিকায়
তার দিকে সতৃষ্ণ সমুদ্রঘোর
ছটফট করছি পিপাসায়।

না, পারে না

লখিন্দর জেগে উঠবে একদিন
বেহুলার স্বপ্ন ও সাধনা
বৃথা যেতে পারে না, পারে না।

কলার মান্দাস, নদীস্রোত
সূর্যকিরণের মতো সত্য ও উত্থিত
সুপ্ত লখিন্দর শুয়ে, রোমকূপে তার
জাগৃতির বাসনা অপার
এই প্রেম ব্যর্থ হতে পারে না পারে না

মনসার হিংসা একদিন
পুড়ে টুড়ে ছাই হবে
এমন প্রতীতি নিয়ে স্বপ্নকুঁড়ি নিয়ে
প্রতীক্ষা-পিদিম জ্বেলে টিকে থাকা
এমন গভীর সৌম্য অপেক্ষা কখনো
ম্লান হয়ে নিভে যেতে পারে না পারে না

রেণু রেণু সংবেদবর্ণালি-৮

ক.
আমার না পাওয়াগুলি অবরুদ্ধ দীর্ঘশ্বাসগুলি
মুক্তি চায়, বেরোতে পারে না
কার্বনের নিঃসরণ
নতুন মাত্রিক আর বিপজ্জনক
সেও তো দূষণ বটে
বলতে পারো প্রণয়দূষণ!

খ.
আদিপ্রাণ বৃক্ষতলে
ছায়াশান্তি মাঙনের সুপ্তি বর্তমান
এসো লই বৃক্ষের শরণ
পরিবেশ প্রশান্তির সেও এক
স্বস্তিমন্ত্র, অনিন্দ্য ধরন।

গ.
নদীকে বইতে দাও নিজস্ব নিয়মে
গলা টিপে ধোরো না ধোরো না,
নদী হচ্ছে মাতৃরূপ বাৎসল্যদায়িনী
দখলে দূষণে তাকে লাঞ্ছিত পীড়িত
হে মানুষ এই ভুল কোরো না কোরো না

ঘ.
উচ্চকিত শব্দ নয় বধিরতা নয়
মৃদু শব্দ প্রকৃতির সঙ্গে কথা কও
শব্দ যদি কুঠারের ঘাতকপ্রতিম
তবে হে মানুষ তোমরা অমৃতের পুত্রকন্যা নও

ঙ.
মৃত্তিকার কাছ থেকে সহনশীলতা শিখি
মৃত্তিকাই আদি অন্ত
জীবনের অন্তিম ঠিকানা
মৃত্তিকাই দেয় শান্তি সুনিবিড়
ক্ষমা সে পরমা
শরীর মূলত মাটি
গন্তব্য যে সরল বিছানা।

ছিন্ন কথন

আমি ভুখা পিপীলিকা
চেয়েছি আলোর দেখা।
পুড়ে যদি মরি তাও
ওগো অগ্নি শান্তি দাও।
অঙ্গার হওয়ার সাধ
এসো মৃত্যু পরমাদ।
চলো ডুবি মনোযমুনায়
এসো এসো বেলা নিভে যায়!

ধ্রুব সত্য

না-পাওয়াই সত্য হয়ে ফুটে থাকে।
পুষ্পিত সে প্রতারণা, চেনা মুশকিল।
বৃতি কুঁড়ি পাপড়িতে মায়াভ্রম লেপটানো
দেখলেই ছুঁতে ইচ্ছা হয়। ছুঁলেই বিপদ।
সেই ফুলে সম্মোহন জড়িয়েমড়িয়ে আছে
কোমলতা লাবণ্যও পুঁজি তার, এমত বিভ্রমে
লোভী ভ্রমরের মতো প্রেমিকারা ছোটে তার কাছে
গিয়ে মোক্ষ পাওয়া দূর, অনুতাপে আহত পাথর
মাথা কুটে মরলেও স্রোতধারা জন্ম নেয় না
যা কিছু হয়েছে পাওয়া, তাও এক দম্ভ সবিশেষ
মর্মে অভ্যন্তরে পশে গতস্য শোচনা নাস্তি
এই বিষ গলাধঃকরণ করে কী যে পাওয়া হলো
হিসাবে নিকাশে মন থিতু নয় সম্মতও নয়
না-পাওয়াই ধ্রুব সত্য চিরন্তন মানুষ-জীবনে!

;