গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার কি নিয়ন্ত্রণের আধুনিক হাতিয়ার?



শরিফুল হাসান সুমন
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশ যতই সমৃদ্ধি, উন্নতি আর জনগণের জন্য উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করুক না কেন আইন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নামে বাংলাদেশকে চোখ রাঙানি দিচ্ছে উন্নত বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তাদের চোখ রাঙানি কখনো উন্নত গণতন্ত্রের নামে, কখনও মানবাধিকারের নামে, কখনও দারিদ্র আর বৈষম্যের নামে।

একদা চাষাভুষার দেশ, তলাবিহীন ঝুড়ি স্বাধীনতার ৫০ বছরে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এমনভাবে আনয়ন করেছে যে মানুষের পার ক্যাপিটা ইনকাম ২ হাজার ৪৭১ মার্কিন ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। যে বাংলাদেশ ব্রিফকেস হাতে আইএমএফের কনফারেন্সে ছুটে বেড়াত বৈদেশিক অনুদান, মিডল ইস্টের যাকাত-ফেতরা এনে মানুষের ক্ষুধা মেটাতে, সেই বাংলাদেশকে এখানে বৈশ্বিক সংস্থাগুলো বিনা দ্বিধায়, শর্ত ছাড়াই ঋণ দেয়। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র বুক চিতিয়ে মোকাবিলা করে পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্প করেছে, কোনভাবেই বাংলাদেশের সম্ভাবনা আর সমৃদ্ধি দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না বঙ্গবন্ধুর সেই উক্তির মতো, ‘আমাদের কেউ দাবায়া রাখতে পারবা না’।

ঠিক তখনই বাংলাদেশকে শাসন আর শোষণ করার, দমিয়ে রাখার নতুন নতুন হাতিয়ারের খুঁজে ব্যস্ত পশ্চিমা বিশ্ব। মানবাধিকার তেমনই একটি নতুন হাতিয়ার, যার প্রয়োগ এতদিনে এসে শুরু হয়েছে বাংলাদেশের উপর। অথচ ১৯৭৫ এ বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করা, ১৯৭৭-৭৮ এ বাংলাদেশের হাজারে হাজারে মুক্তিযুদ্ধপন্থী সামরিক অফিসারদের হত্যা করা ২০০১ সালে নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশে নৌকায় ভোট দেওয়ার অপরাধে দুই বছরে ২০ হাজার সংখ্যালঘু আর দলীয় কর্মীকে হত্যার সময় পশ্চিমা-মানবাধিকার ঘুমিয়ে ছিল। এটা তখনই জেগে উঠেছে যখন বিশ্বব্যাংক আর দালাল গংদের চ্যালেঞ্জ দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে বাংলাদেশ পদ্মা সেতুর মতো মেগা স্ট্র্যাকচার করে ফেলল। তখন এসে ২০১৮-১৯/২০ সালে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং এর জন্য র‍্যাবকে নিষিদ্ধ করা হলো, আর বাংলাদেশকে চোখ রাঙানো শুরু হলো মানবাধিকার দিয়ে।

২০১৮-১৯-২০ সালের আইন বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বিভিন্ন সালের রিপোর্টগুলো থেকে সাধারণত জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনগুলো তাদের বাৎসরিক ডাটা নেয়। অধিকারের আদিলুর রহমানও তথ্য দেয়। আদিলুর রহমান যেমন ২০১৩ সালের হেফাজতের সমাবেশে হতাহতের মিথ্যা তথ্য আর নাম সম্বলিত রিপোর্ট দিয়েছিল, সেটা ব্যতিরেকেই ধরে নেওয়া যাক আইন ও সালিশ কেন্দ্র যেই তথ্য তাদের বাৎসরিক রিপোর্টে উল্লেখ করেছে তা সত্য ও নির্ভুল, এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সেই ডাটার ভিত্তিতেই আজকের এই বিশ্লেষণ।

কী হয়েছিল ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে যে এই তিন বছরে প্রায় ১ হাজার মানুষকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয় বাংলাদেশে?

এই হত্যাকাণ্ডের বেশিরভাগই ঘটেছিল টেকনাফ আর বার্মা সীমান্তবর্তী এলাকায়। ইয়াবা আর মাদকদ্রব্য চোরাচালান আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছিল সেই সময়ে। টেকনাফে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। ইয়াবা আর মাদক চোরাচালানের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছিল টেকনাফ কক্সবাজার এলাকা, আর সেই মাদক ছড়িয়ে পড়েছিল ঢাকাসহ দেশের সকল প্রান্তে।

গ্রাফ

এই গ্রাফ মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সূত্রে প্রাপ্ত। ইয়াবা আর মাদক চোরাচালান রোধে বিশেষ অভিযান চালানো হয় টেকনাফসহ মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে। তার ফলে ২০১৮-১৯-২০ সাল মিলে প্রায় হাজারের অধিক লোক আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অপারেশনে বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যার শিকার হয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় চোরাকারবারিদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে প্রতিরোধে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী প্রতি-আক্রমণ চালিয়েছে, তাতেই মৃত্যুর সংখ্যাটা অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি হয়েছে। এই উদ্যোগ ইয়াবা ও মাদক চোরাকারবারের মেরুদণ্ড ভাঙতে সক্ষম হয়েছিল। এখনও টেকনাফে রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি দেখা যায় যেগুলোতে ইয়াবা’ ব্যবসায়ী গডফাদাররা বসবাস করতো। শত শত মানুষে জাঁকজমক ছিলো সেই প্রাসাদগুলো, কিন্তু বর্তমানে সেগুলো জনমানুষহীন।

গণতন্ত্র, আইনের শাসন বনাম বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড

পশ্চিমা বিশ্বের ভাষায় বাংলাদেশের বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড আইনের শাসনের অন্তরায়, যা গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করে। গার্ডিয়ান পত্রিকায় গত ৫/৬ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে আইন বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের লাইভ ট্র্যাকিং করে আসছে। সেই তথ্য মতে দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বরের ১৬ তারিখ পর্যন্ত আইন বহির্ভূতভাবে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক হত্যার শিকার হয়েছে ১২ হাজার ৯৯ জন। এত বড় গণতন্ত্রের দেশে এত হত্যাকাণ্ড তো তাহলে আইনের শাসনকে সমূলে উৎপাটন করে দিয়েছে, এবং গণতন্ত্র সেখান থেকে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে! তেমনই তো অর্থ দাঁড়ায়!

সাল ভিত্তিক পরিসংখ্যান

অথচ সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের ধারক আর আইনের শাসক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বছরে যে পরিমাণ হত্যাকাণ্ড ঘটে, সেটা বাংলাদেশের ১০ বছরের আইন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সমান।

আনুপাতিক হার

এখানে একটা ব্যাখ্যা আসতে পারে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বড় দেশ। সেই কারণেই একটা আনুপাতিক হারের তুলনা করা দরকার। প্রতি ১০ লক্ষ মানুষের অনুপাতে যদি দেখা হয় তাহলে দেখা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গত ১১ বছরের প্রতি ১ মিলিয়ন মানুষের মাঝে ৩.৪৮ জন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক হত্যার শিকার হয়। তার বিপরীতে গত ১১ বছরে বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে বছরে ১ জনের কাছাকাছি মানুষ এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিংয়ের শিকার হয়েছে।

যদিও ২০১৭/১৮/১৯ সালের মাদকবিরোধী অভিযানের কারণে আনুপাতিক হারটা বেশি কারণ ঐ ৩ বছর গড়ে প্রতি মিলিয়নে ২ জন বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল বাংলাদেশে। স্পেশাল অপারেশনের ঐ ৩ বছর বাদ দিলে, বাংলাদেশের গড় দাঁড়ায় বছরে প্রতি ১ মিলিয়নে ১ জনেরও কম।

আনুপাতিক হার


 

গত ৩ বছরে বাংলাদেশে সেই অনুপাত নেমে এসেছে অর্ধেকেরও নিচে। আমেরিকায় যেখানে গত বছরে ২০২২-এ আইন বহির্ভূতভাবে হত্যার সংখ্যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০১ জন, সেখানে ২০২২ সালে বাংলাদেশে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে মারা যায় মাত্র ১৯ জন। যার মধ্যে ৪ জন অসুস্থতাজনিত কারণে হাসপাতালে মারা যায়, আর দুইজন পুলিশ কাস্টডিতে সুইসাইড করে। এই সংখ্যা বাদ দিলে ২০২২ সালে আমেরিকায় যেখানে ইতিহাসের সর্বোচ্চ হত্যাকাণ্ড ঘটে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা সেখানে বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বনিম্ন হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যার সংখ্যা ১৩ জন। ২০২৩ সালের এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ১১ জন হত্যার শিকার হয়েছে, অথচ আমেরিকায় সংখ্যাটা আজকের তারিখেই ১ হাজার ৯৩ জন।

মৃতের সংখ্যা

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডেও বর্ণবাদী বৈষম্য

সংখ্যাগুরু সাদাদের দেশ আমেরিকা। যেখানে জনসংখ্যার প্রায় ৬০ ভাগ সাদা চামড়ার বসবাস। অন্যদিকে ব্ল্যাকদের বসবাস ১৩% প্রায়। হিস্পানিক ১৯%, এশিয়ান ৬.৩% আর শংকর জাতির বাস ৩.০%। জাতিগত নির্মূলের শিকার আমেরিকার আদিবাসীদের অবস্থান কমতে কমতে এখন এসে থেমেছে ১.৩% এ।

গণতান্ত্রিক দেশ, মানবাধিকার দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সংখ্যালঘুরাই আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক সবচেয়ে বেশি বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হচ্ছে। ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ১২ হাজার ৯৯ জন এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং এর মধ্যে সাদা ৫ হাজার ৩৪৮ জন, কালো ৩ হাজার ৩৯ জন, হিস্পানিক ২ হাজার ২১২ জন, এশিয়ান ২১৫ জন, আদিবাসী ১৬৭ জন, এবং মিশ্র জাতি ১ হাজার ৭১ জন।

যুক্তরাষ্ট্রে জনসংখ্যার জাতিগত অনুপাতের ভিত্তিতে হিসাব করলে দেখা যায় পুলিশ কর্তৃক হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও সংখ্যালঘুরা সবচেয়ে বেশি নিগ্রহ আর হত্যার শিকার হচ্ছে।

 

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডেও বর্ণবাদী বৈষম্য


 

এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সংখ্যালঘুরা বিশেষ করে পুলিশি জুলুম আর রাষ্ট্র কর্তৃক হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে।

বাংলাদেশে যে সকল সংস্থা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকাণ্ড নিয়ে গবেষণা চালায়, তাদের কোন রিপোর্টে দেখা যায়নি বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর আইন ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে ধর্ম, জাতিসত্তা, সংখ্যালঘু শোষণ বা রাজনৈতিক মতাদর্শ কোন ভূমিকা রেখেছে। অথচ মানবাধিকার, আইনের শাসন আর গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় দিকপাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে শতাব্দী আগে নেটিভ আমেরিকান আদিবাসীদের সমূলে উৎপাটন করেছে, সেই ধারা অক্ষুণ্ণ রেখে এখনও সংখ্যালঘুদের উপরে নির্যাতন আর শোষণ চালিয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মদদে।

বিচারহীনতা

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট ও ২০২০ সালে র‍্যাবের ওপর স্যাংশনের পর বাংলাদেশের সরকার নড়চড়ে বসে আইন বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে। র‍্যাব পুলিশ বিডিআর থেকে শুরু করে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সকল বিভাগে বড়সড় রদবদল থেকে শুরু করে সার্বিক তত্ত্বাবধান এবং ডিসিপ্লিনারি সাজার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। যার প্রভাবে ২০২১ সাল থেকে আশা জাগানিয়া হারে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান কমতে থাকে। জবাবদিহি এখানে সবচেয় বড় নিয়ামক হিসাবে কাজ করেছে। এর সাথে যোগ হয় কক্সবাজারে মেজর সিনহা হত্যায় পুলিশের দায়। সেই মামলার বিচার হয়, ওসি প্রদীপসহ তার সহকারী পরিদর্শককে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয় আদালত। এছাড়াও র‍্যাবের সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর ৭ জনের হত্যাকাণ্ডে র‍্যাব অফিসারসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আদালত। এছাড়াও আরও অনেকগুলো বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মামলা আদলতে চলমান যেখানে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্র অভিযোগ দায়ের করেছে এবং মামলা পরিচালনা করছে যেখানে কোন বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া অপরাধীদের হত্যা করে বা পুলিশ কাস্টডিতে নির্যাতনের কারণে আসামি মারা যায়।

বিচারহীনতা


 

কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন। আইনের আর মানবাধিকারের রক্ষক ও বিজয় কেতন উত্তোলনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গত ১১ বছরের হওয়া ১২ হাজার ৯৯টি এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিংয়ে মাত্র ৪টি ঘটনায় বিচার শুরু করেছে, যা চলছে বছরের পর বছর ধরে। যা মোট অপরাধের মাত্র ১.৯%। বাকি ৯৮.১% বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কোন সাজা তো দূর, কোন একশনই নেয়নি মার্কিন আদালত আর প্রশাসন।

বিচার আর জবাবদিহির মধ্যে আনলে যে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা কমে যায়, সেটা গত ৩ বছরে বাংলাদেশ আর যুক্তরাষ্ট্রের পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায়। বাংলাদেশে বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপ আর সরকারের সদিচ্ছার কারণে যেখানে গত ৩ বছরের বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ৮০, ১৯ আর ১১-তে নেমে এসেছে। সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিচারহীনতার কারণে এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং এর সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে। গত তিন বছরে এই হত্যার সংখ্যা যথাক্রমে ১ হাজার ১৪৫, ১ হাজার ২০২, ১ হাজার ৯৩ (২০২৩ এর ১১ মাসে)।

অপরাধের মাত্রা

২০১৭-১৮-১৯ সালে বাংলাদেশের হওয়া আইন বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বৃদ্ধির মূল কারণ যেখানে ছিল মাদক চোরাচালানকারীদের সাথে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ আর বন্দুকযুদ্ধ, সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাফিক রুল ভায়োলেশনের কারণেও ৮% লোক পুলিশের হাতে মারা যায়, অর্থাৎ গত ১১ বছরে ৯৬৮ জন লোক শুধুমাত্র ট্রাফিক রুল অমান্য করার কারণে পুলিশের হাতে হত্যার শিকার হয়।

আর কোন অপরাধের অভিযোগ ছাড়াই ২১% লোক, মানে মোটের উপর ২ হাজার ৫৪০ জন লোক পুলিশি হামলায় মারা গেছে গত ১১ বছরে, যারা কোন অপরাধ করেনি বা যাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ ছিলো না পুলিশের। সহিংস অপরাধ করে হত্যার শিকার হয়েছে ৩ হাজার ৭৫০ জন মার্কিন নাগরিক যা মোট সংখ্যার মাত্র ৩১%

অপরাধের মাত্রা


 

“যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা”। পশ্চিমা দেশগুলোর যখন উন্নয়নশীল দেশের ওপর মানবাধিকার, গণতন্ত্র, বর্ণবৈষম্যের দোহাই দিয়ে সেই সকল দেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তখন এটাই সবার মনে আসে, সম্ভবত তারা বাংলাদেশের উন্নতিকে পছন্দ করছে না, অথবা আঞ্চলিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের উত্থানকে তারা নিজেদের জন্য হুমকি দেখছে। মানব সভ্যতার ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, কোন জাতি উন্নত হতে থাকলে সেই জাতির নৈতিক অবস্থাও ধীরে ধীরে উন্নত হয়। অথচ ধর্ম পালন না করার অজুহাতে মানুষ পুড়িয়ে মেরে ফেলা, ডাইনি নিধনের নামে হাজার হাজার নারীদের পুড়িয়ে মারা দেশগুলো তো উন্নয়নের যাত্রা শুরু করেছে আরও কয়েক শতাব্দী আগে, তারা কেন পারল না উন্নয়নের সাথে সাথে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থামাতে বা অপরাধের মাত্রা কমাতে?

আসলে অপরাধ দমনের নামে হত্যাকাণ্ড, দখলদারিত্ব মুক্ত করতে যুদ্ধ, সবাই করে, নাম দেয় শান্তি রক্ষার জন্য বা সন্ত্রাসবাদ দমনে অভিযান। তবে এই তারাই যখন যুদ্ধাপরাধী, নৃশংস দেশবিরোধী রাজাকারদের পাশেও মানবতার বুলি নিয়ে দাঁড়ায়, তখন নিশ্চিত সন্দেহ জাগে, তাদের উদ্দেশ্য কি আসলে মানুষের জীবন বাঁচানোর অধিকার, নাকি মানবতার নামে দেশকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা!

রাজনৈতিক দলে নেই জনগণের গণতন্ত্র



সায়েম খান, লেখক ও কলামিষ্ট
ছবি: সায়েম খান, লেখক ও কলামিষ্ট

ছবি: সায়েম খান, লেখক ও কলামিষ্ট

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায় রাজনীতির মাঠে বিরোধী দলের কর্মকাণ্ড খানিকটা নিস্পৃহ। এদের দলীয় কর্মকাণ্ড দেখলে মাঝে মাঝে মনে হয় বিরোধী দল সরকার নিয়ন্ত্রিত। ক্ষমতাসীনদের চাপে কোনঠাসা হয়ে এরা ক্ষয়িষ্ণ হতে হতে বিলুপ্তির পথে চলছে। যে দল সরকারে থাকবে সে ক্ষমতার প্রভাবে আধিপত্য বিস্তার করবে এটা একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।বিরোধী দলের সরকারের প্রতি একটি প্রচলিত অভিযোগ হচ্ছে সরকার বিভিন্ন মামলা হামলার মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যহত করছে। কিন্তু বিরোধী দল কি তাদের নিজেদের সমস্যার মূল উদঘাটন করে তার কোন সমাধানের পথে এগিয়েছেন? দলের প্রতিটি স্তরে নেতাকর্মীরা সুসংগঠিত না হওয়া, দলের সকল কমিটি উপকমিটিগুলোতে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব-বিরোধ, দলীয় নেতাকর্মীদের মামলা পরিচালনায় দলের সহযোগিতার সীমাবদ্ধতা, হাজার হাজার নেতাকর্মীদের দলছুট হওয়ার প্রবণতা, দলের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বে সিদ্ধান্তহীনতা ইত্যাদি বিএনপিকে ক্রমশ একটি ভঙ্গুর রাজনৈতিক দলে পরিণত করছে।

আপাতঃদৃষ্টিতে বিএনপি'র এই দৈন্যদশায় সরকার একটি নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত কমফোর্ট জোনে অবস্থান করলেও দেশ ও জাতি গণতান্ত্রিক সুফল পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একটি দেশের বিরোধী দল শ্যাডো গভঃমেন্ট বা ছায়া সরকার হিসাবে বিবেচিত। কিন্তু বর্তমান সময়কালে বাংলাদেশের সার্বিক গণতান্ত্রিক ধারায় বিরোধী দলের অবস্থান নিস্ক্রিয়। দেশ গঠনে সরকার ও বিরোধীদলের যে স্ব স্ব অবস্থান থাকা উচিত, সেই জায়গা থেকে আমরা দেখি তার উল্টো চিত্র। সরকারের যেকোন জাতীয় সিদ্ধান্ত ও আইন প্রণয়নে বিরোধী দলের গঠনমূলক আলোচনা, সমালোচনা ও পর্যালোচনা থাকা বাঞ্চনীয়। সরকার পক্ষের সংসদে যেকোন বিল উপস্থাপন, আইন প্রণয়ন কিংবা জাতীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধী দলের সাথে হবে সরকার দলের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়, গঠনমূলক সমালোচনায় মুখরিত থাকতে পারত জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের গ্যালারী। আওয়ামীলীগ সরকারের আমলের বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে বিরোধী দলবিহীন সংসদ। বিএনপি'র আওয়ামীলীগের প্রতি বিভিন্ন কারণে অনাস্থা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে দেখেছি বিগত কয়েকটি সংসদ নির্বাচনে। আসলে জনগণ কি চায় তা আমার মনে হয় কোন রাজনৈতিক দলই বুঝতে চায় না কিংবা বুঝেও না বুঝার ভান করে থাকে। দেশের সাধারণ জনগণ চায় সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচন ও সুষ্ঠু ধারার রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করা। সর্বদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি দেশের উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

আমরা যদি যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক এই দুটি দলের গণতান্ত্রিক কর্মপন্থা পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাই, সরকারে বা বিরোধী পক্ষে যে দলই থাকুক না কেন, তারা জাতীয় স্বার্থে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় অবস্থান করে। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর নেই কোন জাতীয় ঐক্য। জাতীয় যেকোন বড় সাফল্যে কিংবা ব্যর্থতায় আমরা দলমত ভূলে একীভূত হতে পারি না। বিশ্ব দরবারে আমরা গণপ্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্লেকার্ড ঝুলালেও আমাদের গণতান্ত্রিক চর্চা খুব সংকীর্ণ। গণতন্ত্রকে রাজনৈতিক দলগুলো ব্যবহার করে নিজেদের দলীয় স্বার্থে। সাধারণ জনগণের আশা-আকাংখার সঠিক প্রকাশ ঘটে না এসব কারণে। যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে বঙ্গবন্ধু এদেশ স্বাধীন করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সেই রাজনৈতিক দর্শন কি বর্তমান আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে দেখতে পাই? গণতন্ত্র আমাদের সমাজ সংস্কারের রাজনীতি করতে বলে। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনেও তিনি সমাজ সংস্কারের পাশাপাশি জনগণের অধিকারের কথা বলেছেন।

সময়ের সাথে সাথে মানুষের জীবনধারার পরিবর্তন ঘটলেও সাধারণ মানুষের মনে রাজনীতি নিয়ে এখনও বিরুপ প্রতিক্রিয়া কাজ করে। কারণ বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী সময় পার করেও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চার পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকে শাষকশ্রনীর ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। এই ক্ষমতা লাভের আশায় হত্যা, ক্যু, দুর্নীতি সহ নানাবিধ নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছে বিভিন্ন আমলে ক্ষমতায় আসা শাষক শ্রেনী।

এদেশের জনগণ নানা সময়ে আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রাপ্তিলাভ করেছে। কিন্তু জনগণের সেই কষ্টার্জিত গণতন্ত্রকে সুসংহত রাখতে পারেনি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো। ৫২'র ভাষা আন্দোলন, ৬৯'র গণ অভ্যোত্থান, ৭১'র মুক্তিযুদ্ধ, ৯০'র গণ অভ্যুত্থান - প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে গণতন্ত্র পূণঃপ্রতিষ্ঠার জন্য এবং এর জন্য বাংলাদেশের জনগণের বিলিয়ে দিতে হয়েছে বুকের তাজা রক্ত। জনগণের সেই রক্তের সঠিক মুল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো। দ্বিধাবিভক্ত এদেশের মানুষ জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে হয়তো আবারও প্রয়োজনের তাগিদে গণতন্ত্রিক দাবি আদায়ের জন্য লড়াই করবে, কিন্তু এর সুফল ভোগ করবে কে?

;

রাজাকার দাবির অমার্জনীয় ধৃষ্টতা



কবির য়াহমদ, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

‘তুমি কে আমি কে— রাজাকার রাজাকার’; মধ্যরাতে দেশের ক্যাম্পাসে-ক্যাম্পাসে এমন স্লোগান ওঠেছে কাল। অবিশ্বাস্য ধৃষ্টতায় স্বাধীন বাংলাদেশ লজ্জিত হয়েছে পুনর্বার। এ লজ্জা দিয়েছে তারা, যাদেরকে আমরা সোনালী ভবিষ্যতের আধার ভাবি; সেই শিক্ষার্থীরা। অনতি-তরুণ এই শিক্ষার্থীদের হাতে থাকার কথা আগামীর বাংলাদেশ, অথচ তারা প্রকাশ্যে দেশবিরোধী স্লোগানে প্রকম্পিত করছে দেশের শিক্ষাঙ্গন।

ধারণা করা হচ্ছে এর শুরু স্বাধিকার-স্বাধীনতা এবং বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এরপর বুয়েট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সকল ক্যাম্পাসে এমন স্লোগান ওঠেছে। ধারণা করছি, এমন ন্যক্কারজনক স্লোগান বাদ যায়নি কোন ক্যাম্পাসেই। ফলে এটাকে কোন ক্যাম্পাসের কোন গোষ্ঠীর অতি-উৎসাহী, অতি-বিপ্লবী স্লোগান ভাবার কারণ নাই। বরং বলা যায়, এটা পূর্ব পরিকল্পিত এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব থেকেই নির্দেশিত।

নিজেদের ‘রাজাকার’ দাবিকে হালকাভাবে দেখার অবকাশ নাই। কারণ এই একটা শব্দের সঙ্গে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ত্রিশ লক্ষ শহিদ এবং দুই লক্ষের অধিক নারীর সম্মানহানির ইতিহাস আছে। বাংলাদেশে একাত্তরে যে জেনোসাইড চালিয়েছিল পাকিস্তানিরা তার প্রত্যক্ষ সহযোগী ছিল রাজাকার গোত্রীয়রা। তারা পাকিস্তানের পক্ষে বাংলাদেশের জেনোসাইড সংঘটনে ছিল চাকরি করা অংশ। আদর্শিক ভাবে ছিল যেমন পাকিস্তানি, তেমনি ছিল তাদের আর্থিক প্রাপ্তিও। সেই রাজাকার গোষ্ঠী একাত্তরের ভূমিকার জন্যে ক্ষমা চায়নি, বরং সময়ে-সময়ে এ নিয়ে গর্ববোধও করেছে।

একাত্তরের রাজাকাররা তাদের কৃতকর্মের জন্যে এখনো গর্ব করে। জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতারাসহ আরও কিছু রাজনৈতিক দলের নেতারা এখনো প্রকাশ্যে বলে থাকেন, পাকিস্তান থাকলে বুঝি ভালো হতো। দেশবিরোধী এই অংশের আদর্শিক অনুসারী, উত্তরাধিকাররা নানা বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে থাকা পাকিস্তানকে এখনো তাদের দেশ ভেবে থাকেন। তারা অনুসরণ-অনুকরণ করেন পাকিস্তানকে এখনো। সময়ে-সময়ে তাই দেখা যায় তাদের থেকে মুক্তিযুদ্ধ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং শহিদদের অপমান, জেনোসাইডে শহিদদের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক মন্তব্য, এবং বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে কটাক্ষ।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, মুক্তিযুদ্ধ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কটাক্ষ নিয়ে দেশে কোন আইন নেই। মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে অপমানজনক কথা বললে নির্দিষ্ট কোন কারণে কাউকে আইনে মুখোমুখি হতে হয় না। অথচ জেনোসাইড ডিনাইয়াল প্রিভেনশন অ্যাক্ট নামের একটা আইনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দেশে দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানানো হচ্ছে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার বলে দাবিদার আওয়ামী লীগ সেই দাবিকে পাত্তা দিচ্ছে না। ফলে চাইলেই কেউ প্রকাশ্য সভায়, প্রকাশ্য স্লোগানে মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে কটাক্ষ করতে পারছে, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করতে পারছে, এবং দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে নিজেদের ‘রাজাকার’ দাবি করে স্লোগান দিতে পারছে।

কাল রাতের আঁধারে কোটা বাতিলের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা যে স্লোগান দিয়েছে সেটা ধৃষ্টতা, সেটা একাত্তরকে অস্বীকার করা, সেটা একাত্তরের জেনোসাইডের প্রমাণিত অংশীদার রাজাকারদের বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা। ঘৃণিত শব্দ রাজাকারকে মহিমান্বিত করার এই চেষ্টা অমার্জনীয় অপরাধ, কারণ এই শব্দের সঙ্গে সরাসরি যোগ জেনোসাইডের, এই গোষ্ঠী সরাসরি জড়িত ত্রিশ লক্ষ লোকের হত্যা এবং দুই লক্ষের অধিক নারীর সম্মানহানির সঙ্গে।

বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটা মন্তব্যকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের নিজেদের এই ‘রাজাকার’ দাবি করা। তবে দেখা যাক কী বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী? চীন সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী গতকাল রোববার সংবাদ সম্মেলন সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে এত ক্ষোভ কেন’ এমন প্রশ্ন রেখে বলেছিলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতি কোটা পাবে না তাহলে কী রাজাকারের নাতি-পুতিরা কোটা পাবে? সেটা আমার প্রশ্ন। দেশবাসীর কাছে প্রশ্ন।’ প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছিলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা খেয়ে না খেয়ে কাদামাটি মাখিয়ে তারা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল বলেই আজ দেশ স্বাধীন। আজ সবাই বড় বড় পদে আসীন। নইলে তো ওই পাকিস্তানিদের বুটের লাথি খেয়ে চলতে হতো।’

প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর উদ্দেশ যথার্থই প্রশ্ন রেখেছেন। একজন নাগরিক হিসেবে আমরাও মনে করি, রাজাকারদের সন্তানেরা নয়, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানেরাই চাকরি পাওয়ার অগ্রাধিকার রাখে। যে রাজাকার ও তাদের সন্তান-নাতিপুতিরা দেশটাকেই স্বীকার করে না, বাংলাদেশের চাইতে এখনো যারা পাকিস্তানকেই নিজেদের দেশ ভাবে, তারা কোনোভাবেই বাংলাদেশে সুযোগসুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখে না। বাংলাদেশে কিছু পেতে হলে আগে দেশকে স্বীকার করতে হবে তাদের। কিন্তু সেটা তারা যখন করেনি, তখন কোন যুক্তিতে রাষ্ট্র তাদের জন্যে সুযোগ সুবিধা রাখবে।

যদিও বাংলাদেশে রাজাকারদের তালিকা, তাদের সন্তান ও নাতিপুতিদের রাষ্ট্রীয় সুযোগসুবিধা থেকে দূরে রাখার কোন আইন নেই, বিধিমালা নেই, নির্দেশনা নেই; আছে কেবল বীর মুক্তিযোদ্ধা, তাদের সন্তান ও নাতিপুতিদের জন্যে সুযোগ। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর বীর মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করেছিল সরকার। এরপর ওই পরিপত্রের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের রিটের নিষ্পত্তিতে যে কোটা ফিরেছিল সেটাও অদ্যকার আন্দোলনের পর রাষ্ট্রপক্ষের আপিলে স্থগিত হয়ে গেছে। কোটা নিয়ে সরকার কঠোর নয়, বরং সরকারও আন্দোলনকারীদের দাবির সঙ্গে অনেকটাই একমত। এমতাবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর এক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে, যদিও এই মন্তব্য বিতর্কিত নয়, তবু এটাকে ভিন্নার্থে বিশ্লেষণ করে নিজেদের ‘রাজাকার’ দাবি করে শিক্ষার্থীরা যে স্লোগান দিয়েছে, এতে পুরো বিষয়টিকে জটিল করে তুলবে।

এখন তাই মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যারা পাকিস্তানিদের জেনোসাইডের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ অংশীদার ছিল, তাদের তালিকা প্রকাশ অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়েছে। জরুরি হয়ে পড়েছে রাজাকারদের সন্তান ও নাতিপুতিদের বিষয়ে কী অবস্থান হবে রাষ্ট্রের সেটা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার।

‘রাজাকার’ ঘৃণিত এক শব্দ। মীরজাফর নাম যেমন রাখে না কোন অভিভাবক তাদের সন্তানদের, রাজাকার দাবিও প্রকাশ্যে করতে লজ্জা পায় বেশিরভাগই। কিন্তু দেশবিরোধী এই শব্দকে মহিমান্বিত করার হঠকারী এ স্লোগান দেওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছে শিক্ষার্থীরা। কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে তারা তাদের রাজনৈতিক অভিলাষ, আদর্শকে সামনে নিয়ে এসেছে। যদিও তারা সভা-সমাবেশ-অবস্থান কর্মসূচিতে জাতীয় পতাকা উড়াচ্ছে, মাথায় বাঁধছে পতাকা; কিন্তু এটা যে লোকদেখানো ‘তুমি কে আমি কে— রাজাকার রাজাকার’ স্লোগানে প্রমাণিত হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল চাইতে গিয়ে তারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কটাক্ষ করছে, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করছে—এসবকে শুরুতে বিশাল আন্দোলনের বিচ্ছিন্ন রূপ ভাবা গেলেও নিজেদের ‘রাজাকার’ দাবির পর এখন আর এভাবে সহজভাবে দেখার সুযোগ কমে এসেছে। এমন না যে এটা কোন একটা ক্যাম্পাসে অতি-উৎসাহী বিচ্ছিন্ন কোন অংশ করেছে, এই স্লোগান যখন দেশের ক্যাম্পাসে-ক্যাম্পাসে উঠেছে, তখন বিষয়টি আর সাধারণ থাকছে না। বরং এটাকে পরিকল্পিত বলেই মনে হচ্ছে।

এই প্রজন্মের তরুণদের কেউ ‘রাজাকার’ থাকার কথা নয়, এদের পূর্বপুরুষদের কেউ দেশবিরোধী রাজাকার ছিল কিনা এটা আমরা নিশ্চিত নই। তবে এরা একাত্তরের সেই ‘রাজাকারদের’ আদর্শিক অনুসারী হিসেবে অদ্য নিজেদের দাবি করছে। তাদেরকে কেউ ‘রাজাকার’ বলছে না, কিন্তু তারা নিজেরা নিজেদের ‘রাজাকার’ ভাবছে, প্রচার করছে। যারা নিজেদের ‘রাজাকার’ বা দেশবিরোধী দাবি করে তাদেরকে জোর করে আমরা বাংলাদেশের স্বপক্ষের তবে বলি কীভাবে?

চিরায়ত সেই দ্বন্দ্ব তাই ফিরে আসে, ‘রাজাকার’ ও তাদের আদর্শিক অনুসারীদের কীভাবে দেখবে রাষ্ট্র—সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বুঝি এসেই গেল!

;

ধার্মিকরা বাটপার হয় না, বাটপাররা ধার্মিক সাজে



মবিনুল ইসলাম স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার প্রশ্নপ্রত্র ফাঁসে গ্রেফতার বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলীকে গ্রেফতারের পর প্রশ্নফাঁসে তার স্বীকারোক্তি, লেবাস ও অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ আল্লাহর রাস্তার দান করা নিয়ে তুমুল আলোচনা সমালোচনা চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে। তাকে বাটপার আখ্যায়িত করে অনেকেই পোস্ট দিচ্ছেন ধার্মিকরা বাটপার হয় না, বাটপাররাই ধার্মিক সাজে।

এখানে কয়েকটি শব্দ নিয়ে আগে আলোচনা করবো। পরবর্তীতে এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে কী বলা আছে এবং ইসলামে এর ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করবো।

ধর্ম শব্দটির আভিধানিক অর্থ, ‘যা ধারণ করে।’ ধৃ ধাতু + মন্ (প্রত্যয়) মিলেই ধর্ম । ধৃ ধাতুর অর্থ ধারণ করা। তাহলে ধর্ম অর্থ যা দাঁড়ায় তা হলো, মানুষের হৃদয় বা মন যা ধারণ করে তাই-ই ধর্ম। অর্থাৎ বাইরের লেবাস ধর্ম নয়।

বাটপাররা বাটপারি করতে গেলে একটি বিশ্বাসযোগ্যতার প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে তারা লেবাসকে ব্যবহার করে। এতে করে বাটপারি করার পথ সহজ হয়। এতে করে প্রকৃত ধার্মিকরা বিব্রত হন। কেননা শার্ট-প্যান্ট, স্যুট পরে দুর্নীতি করলে কেউ পোষাকের দোষ দেয় না, কিন্তু জুব্বা-পাঞ্জাবী পরে দুর্নীতি করলে পোষাকের দোষ হয়।

বাটপার শব্দের অর্থ - প্রতারণা করা, ডাকাত, লুটেরা, চোখের উপর যে চুরি করে। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে চোরের উপর বাটপারি। অর্থাৎ বাটপাররা চোর থেকেও ভয়ংকর। বাংলা একাডেমির সহজ বাংলা অভিধানের ২৬৬ পৃষ্ঠায় বাটপার অর্থ বলা আছে প্রতারক, ঠগ, লুটেরা।

ধর্ম সংস্কৃত শব্দ। আরবিতে ধর্মকে ‘দ্বীন’ বলা হয়। ইসলামি শরিয়াতে পরিভাষায় ‘দ্বীন’ হলো এক আল্লাহ তায়ালার প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস রেখে তাকওয়া ও পরহেজগারিতা অর্জন করাকে ‘দ্বীন’ বলে।

ধোঁকা দেওয়া বা প্রতারণা করা ইসলামে নিষিদ্ধ তথা হারাম। প্রতারণার বিষয়ে ইসলাম খুবই কঠোর। একাধিক হাদিসে হযরত মুহম্মদ (স.) বলেছেন, ‘যে আমাদের ধোঁকা দেয় তথা প্রতারণা করে সে আমার উম্মতের দলভূক্ত নয় (মুসলিম, তিরমিজি, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ) ।

প্রশ্নফাঁস না হলে হয়তো ওই চাকুরিটি অন্যজনের হতে পারতো। সেক্ষেত্রে প্রশ্নপত্র ফাঁস অপরাধটি হলো হক্কুল ইবাদ বা বান্দার অধিকার হরণের শামিল। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি ভয়ংকর এক অপরাধ। যে অপরাধ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ক্ষমা না করলে স্বয়ং আল্লাহও ক্ষমা করেন না।

প্রশ্নফাঁসে আবেদ আলী গ্রেফতারের পর সাংবাদিকদের বলেন, প্রশ্নফাঁসে অর্জিত অর্থ তিনি আল্লাহ রাস্তার দান করেছেন। ধোঁকা বা প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ দিয়ে দান-সহযোগিতা, ধর্মীয় কাজ কুরবানি, মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণ, জনসাধারণের জন্য রাস্তাঘাট-কালভার্ট নির্মাণ কোনোটিই বৈধ নয়। আর এতে সাওয়াবও মিলবে না।

কেননা দান-সহযোগিতা, সমাজ সংস্কারসহ জনকল্যাণমূলক কাজ কোনো ব্যক্তির জন্য আবশ্যক নয়। আর ধোঁকা বা প্রতারণা ইসলামে হারাম ও নিষিদ্ধ কাজ।

প্রতারণা রাষ্ট্রীয় আইনেও জঘন্য অপরাধ। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪১৫ ধারায় প্রতারণার সংজ্ঞা ও ৪২০ ধারায় এ অপরাধের শাস্তি বর্ণনা করা হয়েছে। যা সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও একই আইনের ৪০৬, ৪০৮ এবং ৪০৯ ধারায় বিশ্বাস ভঙ্গের অপরাধের শাস্তির কথা বর্ণিত আছে। দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারাটি বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের সিডিউলভূক্ত। এ অপরাধে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

;

কোটা আন্দোলন: চেতনার থেকে চেতনা-নাশকের প্রভাব অধিক হবার ফল



অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান, লেখক ও গবেষক
ছবি: অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান

ছবি: অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

গত কয়েকদিন ধরে আমার পরিচিত সুধীমহল ক্রমাগত আমাকে অনুরোধ করে যাচ্ছে, আমি যেন কোটা এবং কোটা আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে একটা লেখা প্রকাশ করি। কোটা এখন ‘টক অব দ্যা কান্ট্রি’, এমন একটা আলোচ্য বিষয় নিয়ে কেনইবা লিখছি না, সেটাও তাদের উৎসুক প্রশ্ন। এ বিষয়ে যদিও আমি একটা দায়সারা গোছের লেখা প্রকাশ করেছি কিন্তু সেটা নাকি আমার মানের হয়নি এবং তাদের মনও ভরেনি। তাদের মতে- আমার লেখা মানেই প্রথাবিরোধী, ব্যতিক্রমী, যৌক্তিক এবং তথ্যবহুল- সুতরাং এ বিষয় নিয়ে আমাকে লিখতেই হবে। আমি আমার সুহৃদদের কাছে করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে বলছি- কোটা এবং কোটা আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে আমি লিখব না। এই কঠিন সময়ে বরং আসেন হালকা টপিক, কবিতা নিয়ে আলাপ করি।

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ও সুরারোপিত ‘সন্ধ্যা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘নতুনের গান’ নামক দাদরা তালের গানটি, বাংলা ১৩৩৫ সনে শিখা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এই সংগীতটিকে ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে বাংলাদেশের রণ-সংগীত হিসেবে নির্বাচন করা হয়। বাংলাদেশের যে-কোনো সামরিক অনুষ্ঠানে গানটির ২১ লাইন যন্ত্রসংগীতে বাজানো হয়। ২০০৬ সালে বিবিসি বাংলার জরিপে গানটি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বিশটি বাংলা গানের মধ্যে ১৮তম স্থান অধিকার করে। পুরো গানটিই তরুণদের উদ্দেশ্যে, তারুণ্যের অপরিমেয় শক্তিকে আহ্বান করে লেখা। আমি মাত্র কয়টি লাইন নিয়ে লিখব।

চলরে নও-জোয়ান,
শোনরে পাতিয়া কান-
মৃত্যু-তোরণ-দুয়ারে-দুয়ারে
জীবনের আহ্বান।
ভাঙরে ভাঙ আগল,
চলরে চলরে চল।
চল চল চল।

ব্রিটিশ শাসিত পরাধীন ভারতবর্ষের প্রতিটি ক্ষেত্র ছিল মৃত্যুফাঁদ, যে দরোজা দিয়ে, যে সেক্টরের, যেখানেই প্রবেশ করা হোক-না-কেন, সেটাই ছিল প্রাণনাশী দরজা অর্থাৎ মৃত্যু-তোরণ। ওই মৃত্যু-তোরণকে পরিবর্তন করে জীবনের আহ্বান জানানো তোরণে পরিণত করে, সমস্ত অন্যায্য বাধাবিপত্তি বা আগলকে ভেঙেচুরে দুমড়ে-মুচড়ে দৃঢ় প্রত্যয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার জন্য কবি তারুণ্যকে উদ্দীপ্তভাবে উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। যেহেতু এটিকে জাতীয় রণ-সংগীত করা হয়েছে সুতরাং এই গানে যে আহ্বান জানানো হয়েছে বাঙালি জাতি তা বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর ও অঙ্গীকারবদ্ধ বলেই করা হয়েছে। অর্থাৎ জাতি হিসেবে আমরা কবির এই আহ্বানের সাথে সম্পূর্ণ একমত।

দুই. ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের ইংরেজি ডিসেম্বর মাস অনুযায়ী বাংলা ১৩২৮ সালের অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে কবি কাজী নজরুল ইসলাম মাত্র ২২ বৎসর ৬ মাস বয়সে আড্ডার ফাঁকে একটুখানি সময়ের মধ্যে ‘ভাঙার গান’ শিরোনামে ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ কবিতাটি গানের সুরে রচনা করেন। 'ভাঙার গান' শিরোনামেই কবিতাটি 'বাঙ্গলার কথা' পত্রিকার ২০ জানুয়ারি ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দ অনুযায়ী বাংলা পৌষ-মাঘ ১৩২৮ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়। কবিতা হলেও এটি ছিল মূলত একটি বিদ্রোহাত্মক গান।

১৯২৪ সালের আগস্ট মাস অনুযায়ী বাংলা ১৩৩১ সালে ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকার আষাঢ়-শ্রাবণ সংখ্যায় কবিতাটির সাথে আরও ১০টি কবিতা যোগ করে মোট ১১টি কবিতা নিয়ে ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের দুই মাস পর ১১ নভেম্বর ১৯২৪ তারিখে তৎকালীন ব্রিটিশ-ভারত শাসনাধীন বঙ্গীয় সরকার গ্রন্থটি বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ করে। ব্রিটিশ সরকার আর কখনো এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেনি। ফলে পরাধীন ব্রিটিশ-ভারতে গ্রন্থটি আর প্রকাশিত হতে পারেনি। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর ১৯৪৯ সালে স্বাধীন ভারতে ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। আমি এখানে কবিতাটির কয়েকটি লাইন আলোচনা করছি।

ওরে ও তরুণ ঈশান!
বাজা তোর প্রলয় বিষাণ!
ধ্বংস নিশান
উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদী।

ঈশান শব্দের অর্থ শিব, মহাদেব, মহেশ্বর। এর আরেকটা অর্থ উত্তরপূর্ব কোণ। হিন্দুমতে শিব প্রলয়ের দেবতা এবং ধ্বংসের রাজা বা নটরাজ। এখানে কবি ‘তরুণ ঈশান’ বলতে শিবশক্তির প্রলয়ের সাথে তুলনীয় পরাধীন ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামী তরুণ বীর সন্তান ও বিপ্লবীদের বুঝিয়েছেন। ‘প্রলয়’ অর্থ ধ্বংস, ‘বিষাণ’ শব্দের অর্থ শিঙা। ইসলামি মতে ইসরাফিল শিঙায় ফু দিলে পৃথিবীর প্রলয় বা ধ্বংস শুরু হবে। কবি পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতাকামী তরুণ বীর সন্তানদেরকে তাদের ‘প্রলয় বিষাণ’ বাজানোর আহ্বান জানিয়ে সকল অন্যায়-অনাচার, পরাধীনতার শৃঙ্খলকে ভেঙেচুরে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন।

‘নিশান’ মানে পতাকা,‘ধ্বংস নিশান’ মানে যে পতাকা ধ্বংসের প্রতীক, ধ্বংসের নির্দেশনা দেয়। ‘প্রাচীর’ অর্থ দেওয়াল, ‘ভেদী’ মানে ভেদ করা বা ভেঙে-ফুড়ে বেরিয়ে আসা। কবি স্বাধীনতাকামী তরুণ বীর সন্তানদেরকে এমনভাবে ‘ধ্বংস নিশান’ বা ধ্বংসের পতাকা ওড়াতে বলেছেন যেন তা স্বাধীনতাকামী সূর্যসন্তানদেরকে যে বদ্ধ কারাগারে আটক রেখেছে, সে কারাগারের পরাধীনতার প্রাচীর ভেদ করে মাথা উঁচু করে বেরিয়ে আসে। সে পতাকা দেখে যেন সমগ্র পরাধীন ভারতবাসী মুক্ত-স্বাধীন হবার লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ হয়।

মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সাহস যোগাতে, দেশবাসীর মনোবলকে চাঙ্গা রাখতে স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে অসংখ্যবার এই গানটি বাজানো হয়েছে। আমাদের জাতীয় ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলিতে গানটির কদর আজো আকাশছোঁয়া। গানটির মর্মবাণী আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার এবং সর্বকালের জন্য প্রযোজ্য।

তিন. ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের কাব্যগ্রন্থ ‘বলাকা’। এই কাব্যগ্রন্থের উল্লেখযোগ্য কবিতাগুলির মধ্যে একটি হলো ‘সবুজের অভিযান’। কবিতাটি একসময়ে স্কুলের টেক্সটবুকে ছিল। এখনকার অতিপ্রত্যাশি, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যহীন, হাইব্রিড, কাউয়া কারিকুলামে আছে কিনা জানি না। কারিকুলামে থাকা মনেই হলো, আমরা আমাদের শিশুদেরকে যেভাবে মানুষ করতে চাই, তাদেরকে যেভাবে দেখতে চাই, সেই ধরনের কন্টেন্ট ওই কবিতাটিতে আছে। আমি ‘সবুজের অভিযান’ কবিতার কয়েকটি লাইন আলোচনা করছি।

ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা,
ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ,
আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।

বাহিরপানে তাকায় না যে কেউ,
দেখে না যে বাণ ডেকেছে
জোয়ার-জলে উঠছে প্রবল ঢেউ।

চলতে ওরা চায় না মাটির ছেলে
মাটির 'পরে চরণ ফেলে ফেলে,
আছে অচল আসনখানা মেলে
যে যার আপন উচ্চ বাঁশের মাচায়,
আয় অশান্ত, আয় রে আমার কাঁচা।

কবিতাটি, বয়সে অগ্রগামী কিন্তু প্রাচীনপন্থী জড়-চিন্তার মানুষদের কঠিন সমালোচনা করেছে এবং তরুণ প্রজন্মকে উদ্দীপ্ত হবার গুরুত্বপূর্ণ আস্থা দিয়েছে। প্রাচীনপন্থী জড়-চিন্তার সুবিধাভোগী মানুষদেরকে কবি বলছেন ‘আধমরা’ এবং তাদেরকে ঘা মেরে বাঁচানোর জন্য তরুণ প্রজন্মকে আহ্বান জানিয়েছেন। এর পরেই কবি সুবিধার মোড়কে মোড়ানো ওই আধমরাদের উদ্দেশ্যে বলছেন- ওরা বাহিরপানে তাকায় না, অর্থাৎ পৃথিবী যে এগিয়ে যাচ্ছে সেদিকে এদের খেয়াল নাই। পরিবর্তিত পৃথিবীর যুতসই পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে নেবার যোগ্যতাও এদের নাই।

ওরা মাটির ছেলে অর্থাৎ দেশের জলবায়ু, কৃষ্টি-সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে উঠলেও, মুখে মুখে দেশ-জাতির মূল্যবোধের বুলি ছড়ালেও ওরা এগুলো কেয়ার করে না। এরা উচ্চ বাঁশের মাচায় এক অচল আসনে বসে আছে, অর্থাৎ সাধারণ মানুষের আয়ত্তের বাইরে এক অধরা, সুনিশ্চিত, সুরক্ষিত অবস্থান দখল করে এরা সুখের ঢেকুর তুলে জীবনযাপন করছে। এরা আত্মমগ্ন, দুনিয়ার কোনোদিকে এদের খেয়াল নাই। বড়ো বড়ো বুলি আওড়ানো ছাড়া কোনোকিছুর প্রতি এদের কোনো দায়বোধ নাই। অশান্ত, কাঁচা, তরুণ প্রজন্মকে কবি আহ্বান করছেন তারা যেন তাদের তারুণ্যের দীপ্ত দিয়ে এই অযোগ্য, অপদার্থ, আধমরাদের উৎখাত করে সুন্দর পৃথিবী গড়তে ব্রতী হয়।

চার. সারাবিশ্বের তরুণ সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে, তারা তাদের মেধার প্রতিফলন ঘটিয়ে তাদের দেশকে পাল্টে দিচ্ছে। তাদের দেশ তাদের মেধা বিকাশের সেই সুযোগ দিয়েছে। তাদের দেশের রাষ্ট্র পরিকল্পনা, তাদের মেধা বিকাশের জন্য সহায়ক। তাদের মেধা বিকাশের জন্য জীবনের নির্ভরতা, নিশ্চয়তা, আস্থা সবকিছুর জন্য তাদের দেশ তাদেরকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। শুধু তাদের জন্যই নয়, আমাদের দেশের মেধাবীরাও দেশে মেধার যথাযথ প্রয়োগ ও কাঙ্ক্ষিত সম্মান ও সম্মানী না পেয়ে ওইসব দেশে চলে যাচ্ছে এবং মেধার বিনিময়ে সেই পরবাসে থেকে যাচ্ছে। নিজের দেশের চেয়ে সে দেশে তারা বেশি মূল্যায়িত হচ্ছে।

স্বাধীনতার ৫৩ বছর পেরিয়ে গেছে, আমরা আমাদের শিক্ষিত তরুণ সমাজের ভবিষ্যৎ প্রতিষ্ঠার জন্য কী নিশ্চয়তা দিতে পেরেছি? তার মন-মানসিকতার বিকাশ ঘটিয়ে মন প্রশস্ত করতে কী উদাহরণ সামনে রেখেছি? প্রতিদিন মিডিয়াতে সে কী দেখছে, যাতে আত্মবিশ্বাসী হয়ে দেশের প্রতি তার কমিটমেন্ট বাড়বে? রাস্তা-ঘাট, অফিস-আদালত, আলয়-আগার কোথায় গেলে সে প্রমিত ও অনুকরণীয় চর্চা দেখছে যা তাকে আস্থা দেবে, তাকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে? শুধু এই দেশে জন্মেছে বলে? এই দেশের আলো-ছায়া-মাটিতে বড়ো হয়েছে বলে? তাহলে এই দেশের জড়পদার্থের সাথেই তার আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হবে, মানুষের সাথে নয়।

যে তরুণ আজ প্রশস্ত মনের অধিকারী হবে, শিক্ষা-গবেষণা, উন্নয়নের নতুন নতুন দিক উন্মোচনের চিন্তা করবে- সেই তরুণটিকে কেন আজ সামান্য একটা চাকরির নিশ্চয়তার জন্য আন্দোলন করতে হবে? কেন তাকে রাস্তা বন্ধ করে তার মূল্যবান সময় নষ্ট করতে হবে? পৃথিবীর সব চিন্তা ভুলে, দেশ, সমাজ, জাতি বাদ দিয়ে কেন তার ধ্যান, জ্ঞান, চিন্তা সবকিছু আজ একটা চাকরিকেন্দ্রিক হবে? তরুণদের কথা না হয় বাদই দিলাম, এই তরুণদের অভিভাবকদেরকে এই দেশ তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎকে নির্ভয় করতে কতটুকু অভয় দিচ্ছে? অভিভাবকরা কতটুকু আস্থা ও নির্ভরতার যায়গায় আছে?

যদি বলেন, এই তরুণ প্রজন্ম অযোগ্য, অপদার্থ, লোভী, আত্মকেন্দ্রিক, অজ্ঞানী- তাহলে এর বিপরীতে প্রশ্ন আসে, কেন? এতো বড়ো একটা প্রজন্ম কেন এমন হয়ে গেলো? দেশের সার্বিক পরিকল্পনা, কাঠামো ও বাস্তবায়নের কোথায় ভুল ছিল? রাষ্ট্রের কোন ব্যর্থতার কারণে এতো বড়ো প্রজন্মকে আজ দায়-দায়িত্বহীন, অপদার্থ হতে হলো? বিগত ৫৩ বছর ধরে যারা দেশের নেতৃত্ব দিয়েছে, যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে এর জন্য কি তাদের কোনোই দায়ই নাই? এই ব্যর্থতা কি তাদের নয়? মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ বখে গেলে তার দায় হয়তো ব্যক্তির উপরে বর্তায় কিন্তু একটা প্রজন্মের অধিকাংশ তরুণ বখে যাবার দায় তো ব্যক্তির উপরে চাপানোর সুযোগ নাই! এ দায় রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র কোনোভাবেই এ দায় এড়াতে পারে না। ফলে তরুণদের গালি দেবার আগে নিজেদেরকে গালি দিন। ওদের বখে যাবার দায় আপনার।

এতো বড়ো সমস্যার রুট খুঁজে দেখুন, দায়িত্বশীল পদে থেকে ইফেক্ট দেখে ভাসা ভাসা মন্তব্য করে নিজেদের আর সঙ বানাবেন না।

বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন রিপোর্ট ২০২০-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৩৫ থেকে ৩৯ এই ৫টা বিসিএস পরীক্ষায় মোট নিয়োগ পেয়েছে ১৪ হাজার ৮১৩ জন। বছরে গড়ে ৩ হাজার জনেরও কম! প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশে বছরে মাত্র ৩ হাজার! বছরে কতজন তরুণ শিক্ষা সমাপ্ত করে বের হচ্ছে আর কতজনের জন্য কর্মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে? এই তরুণদের সমালোচনা করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করে জানার চেষ্টা করুন, ওদের আশঙ্কা ও অনাস্থার জায়গাটা কোথায়?

আপনি-আমি কর্মঠ, দায়িত্বশীল, বিনয়ের অবতার, ফেরেশতা বা দেবতা ছিলাম আর ওরা সব হয়েছে শয়তান! কেন হয়েছে? আপনি-আমি দেবতা, ও শয়তান- তাহলে আপনি-আমি কী করেছি? আপনার আমার মতো আদর্শ দেবতারাই আজ আবেদ আলী, বেনজীর। আপনার কয় টাকা বেতন আর কেমনে জীবনযাপন করেন তা ওরা বোঝে। আদর্শ দেখে তৈরি হয়, ওরা যা দেখছে তাই শিখছে।

উল্লিখিত ৫টি বিসিএস পরীক্ষায় পিএসসির বিদ্যমান পদ্ধতিতে মেধায় নিয়োগ হবার কথা ৪৪% এবং কোটায় ৫৬%। কিন্তু কোটায় উপযুক্ত প্রার্থী না থাকায় মেধায় নিয়োগ হয়েছে ৬৬.২% এবং কোটায় পেয়েছে ৩৩.৮%। অর্থাৎ কোটা থাকলেই যে সেখানে অযোগ্য প্রার্থী নিয়োগ পেয়ে যাবে বিষয়টা তেমন নয়। কোটায় বিবেচনাকারী পরীক্ষার্থীকেও প্রিলিমিনারি, রিটেন, ভাইবা, মানসিক স্বাস্থ্য, শারীরিক স্বাস্থ্য ইত্যাদি পরীক্ষার ধাপ যোগ্যতাবলে পেরিয়েই কোয়ালিফাই হতে হয়। কারণ, একেবারে সর্বশেষ ধাপে, নিয়োগের আগে গিয়ে তবেই কোটার সুবিধা বিবেচনা করা হয়।

মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০% বরাদ্দ থাকলেও উল্লিখিত ৫টি বিসিএস পরীক্ষায় মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পেয়েছে মোট ১ হাজার ২৯৮ জন, যা বরাদ্দকৃত কোটার মাত্র ৮.৭%। অর্থাৎ উপযুক্ত যোগ্যতা না থাকলে কাউকে কোটার জন্য এমনকি মুক্তিযোদ্ধা কোটার জন্যও বিবেচনা করা হয় না। যারা মনে করছেন মুক্তিযোদ্ধা কোটায় অমেধাবীরা চাকরি পেয়ে যাচ্ছে তারা পুরোপুরি ঠিক ভাবছেন বলে মনে হয় না।

কোটা থাকবে, কোটা থাকার যৌক্তিকতা আছে এবং এ কারণে পৃথিবীর বহু দেশেই কোটা আছে। কিন্তু কোটা হতে হবে যৌক্তিক। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় উল্লিখিত ৫টি বিসিএস-এর গড় ৮.৭%, তাহলে এই কোটায় কেন ৩০% রাখা হয়েছে সেটি আমি জানি না। তবে আমি বিষয়টাকে একটু ভিন্নভাবে দেখি।

দেশের ক্ষমতায় থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দলকে কেন আজ মুক্তিযোদ্ধার কোটা বেশি রেখে মুক্তিযুদ্ধপ্রীতির প্রমাণ দিতে হবে? কেন তাদের এই কোটার বরাদ্দকে জোরেশোরে প্রচার করে দেখানোর প্রয়োজন পড়বে? তারা যদি সত্যিই মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজ করতো তবে তো দেশের এই হতাশাজনক অবস্থা হতো না! একটা চাকরির জন্য আজ এভাবে তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন করার প্রয়োজন পড়তো না। সরকারি চাকরি লোভনীয় হয়ে উঠত না। কোনো ভালো বিকল্প নাই বলে, কোনো ভালো বিকল্প তৈরি করা হয়নি বলে, দেশের মানুষের জীবন আজ ওষ্ঠাগত বলে, অনিয়ম-ঘুষ-দুর্নীতিতে দেশ ছেয়ে গিয়ে সমস্ত জায়গায় আস্থার ভয়াবহ সঙ্কট তৈরি হয়েছে বলে- এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

দেশে কতজন পিকে হালদার, আফজাল হোসেন, লোকমান হোসেন, বনখেকো ওসমান গণি, মোশাররফ হোসেন, বেনজীর, আবেদ আলী, মতিউর প্রমুখ তৈরি করেছেন এবং এর বিপরীতে কতজন প্রখ্যাত গবেষক, বিজ্ঞানী, কবি-লেখক, সাংবাদিক ইত্যাদি তৈরি করেছেন?

যে প্রযুক্তি দিয়ে বর্তমান পৃথিবী চলছে, আমাদের দেশ চলছে তার একটি প্রযুক্তিও আমাদের তৈরি নয়। এই পৃথিবী, এই দেশ চলার জন্য যা কিছু আছে তার কোনো মৌলিক ভিত্তি তৈরিতে আমাদের কোনো অবদান নাই। আমরা সবকিছুতে পরনির্ভরশীল। কাকের পিছনে পুচ্ছ লাগানো ময়ূর। এতেই আমাদের গর্ব ও অহংকারের কোনো সীমা-পরিসীমা নাই। গর্বে আমাদের মাটিতে পা পড়ে না।

পৃথিবীর বুদ্ধিবৃত্তিক ইনডেক্সে আমাদের জাতির জ্ঞান পৃথিবীর গড় ইনডেক্সেরও নিচে। অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেও আমরা একটা পঙ্গু জাতি। মুক্তচিন্তার স্বাধীনতা যেখানে নাই, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সে জাতির তো পঙ্গুই থাকার কথা।

মুক্তিযুদ্ধের কোটা কত বছর থাকবে সেটা নির্ধারণ করা উচিত। হতে পারে স্বাধীনতার হীরক জয়ন্তী বা ৬০ বছর, প্লাটিনাম জুবিলি বা ৭৫ বছর। অনন্ত কাল ধরে এটা চলতে পারে বলে মনে করি না। সব সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধার প্রজন্ম রাখতে চাইলে, সরাসরি স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকা করে তাদের প্রজন্মকে ওই সময়ের জন্য সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া বন্ধ রাখুন। কিন্তু সে তালিকা তো নাই। নিজের ঘরে ঘোগের বাসা হলে ঘোগের তালিকা করা মুশকিলই বটে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রতি এই প্রজন্মের আস্থা ও শ্রদ্ধা এমনিতে আসবে না। কোটা তৈরি করেও সেটা তৈরি করা যাবে না। তাদের আস্থা আসবে ক্ষমতায় থাকা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের চর্চা দেখে। মুক্তিযুদ্ধের শক্তির ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়া এবং ক্ষমতায় থেকে সোনার বাংলা তৈরির সাধনা দেখে তারা শিখছে। কী শিখছে তা আমি জানি না। তবে যা দেখেছে তা শিখেছে এটা ধারণা করতে পারি।

পৃথিবী প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। ছয়মাস আগের টেকনোলজি পাল্টে নতুন টেকনোলজি আসছে। অথচ আমরা এখনো ঢাকঢোল পিটিয়ে মহাগৌরবে চার/পাঁচ দশক আগে বিগত হওয়া আমাদের প্রয়াত মহান নেতাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। কেন? এখন পৃথিবী যেখানে এসেছে চার/পাঁচ দশক আগে এগুলো ছিল স্বপ্নেরও অতীত। এখনকার জন্য যে উন্নয়ন দরকার সেই সময়ে এ স্বপ্ন দেখার সুযোগ ছিল না। দুনিয়া এতো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে যে, এখনকার স্বপ্ন তখন দেখার কথাও নয়।

আমি কোনো মহান নেতাকে অসম্মান করার জন্য বলছি না। কারণ, এখনকার দশ বছরের একটা বাচ্চাও বলতে পারবে, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে কিন্তু সক্রেটিস, এরিস্টটল, প্লেটোর মতো মহাজ্ঞানীরাও তাদের সময়ে একথা জানতো না। তারমানে এই নয় যে, এখনকার ওই দশ বছরের বাচ্চাটা তখনকার ওই মহাজ্ঞানীদের থেকেও বেশি জ্ঞানী। এটা যুগের পরিবর্তনের বিষয়। নেতাদের ক্ষেত্রেও তাই।

কেন যুগের লিজেন্ডারি নেতা তৈরি হচ্ছে না? হতে দেওয়া হচ্ছে না? জ্ঞানবুদ্ধির সীমাবদ্ধতার কারণে আপনারা লিজেন্ডারি নেতা হতে পারছেন না বলেই আপনাদেরকে এখনও আগের প্রজন্মের নেতাদের স্বপ্ন ফেরি করে যেতে হচ্ছে। পারিবারিক, পৈত্রিক সম্পত্তি না থাকলে নিজের যোগ্যতায় যার নিজের সংসার চালানোর ক্ষমতা নাই, সেরকম লোককে দেওয়া হয়েছে মন্ত্রী-সংসদ সদস্য হয়ে দেশ চালানোর দায়িত্ব। মাটি ও মানুষের সাথে সম্পর্কহীন হয়ে, এলিট ধারায়, উচ্চ বাঁশের মাচায় বসে চলানো হচ্ছে দেশের রাজনীতি। দেশের সকল মানবিক উন্নয়নের চর্চা নিম্নমুখী। সরকারি কার্যালয়গুলোতে সাধারণ মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে অসম্মান করা, মানুষকে হয়রানি করে ঘুষ খাওয়া সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। চারিদিকে হতাশার কালো ছায়া। কেউ ভালো নাই।

এই সকল ব্যর্থতার ইমপ্যাক্টই তরুণদের বিপথগামী করেছে, দায়িত্বহীন করেছে। তাদের দৃষ্টি বিশ্বদৃষ্টি না হয়ে ক্ষুদ্র হয়ে চাকরিদৃষ্টিতে নিবদ্ধ হয়েছে। এর দায় এই রাষ্ট্রের।

;