৩ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় দিবস: শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এগিয়ে চলা



এনামুল হক
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

শিক্ষা- একটা জাতির উন্নতির চাবিকাঠি। দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য পূরণে শিক্ষাই হচ্ছে প্রধান অবলম্বন। মেধা ও মননে আধুনিক এবং চিন্তা-চেতনায় প্রাগ্রসর একটি সুশিক্ষিত জাতিই একটি দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। তাই, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড! ন্যায়ভিত্তিক আধুনিক সমাজ বিনির্মাণের প্রতিজ্ঞায় ৪৮ থেকে ৭০ সাল পর্যন্ত যে জাতীয় মুক্তি আন্দোলন, তারই ফলে আজকের এই বাংলাদেশ। বাঙালি ছাত্রসহ আপামর জনসাধারণ রাজপথে যে সংগ্রাম করেছে সেই আন্দোলন-সংগ্রামেই বোনা হয়ে গিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের ভিত, যা একটি আধুনিক রাষ্ট্রগঠনের দার্শনিক মন্ত্র।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি সুখী, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার আগামী প্রজন্মকে নৈতিক মূল্যবোধ, জাতীয় ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে। শিক্ষাকে উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও। গঠন করেন ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন। এই কমিশন মুক্তিযুদ্ধের শিক্ষাদর্শনই প্রতিফলিত।

নেত্রকোনায় প্রতিষ্ঠিত শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়

উচ্চশিক্ষাকে সবার দ্বারে সহজলভ্য করার লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। জোর দেওয়া হচ্ছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর। এরই আলোকে ২০১৮ সালে অবহেলিত বাংলাদেশের ‘ভাটি অঞ্চল’ বলে খ্যাত নেত্রকোনায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়’। এর আগে ২০১৭ সালের ৩০ জানুয়ারি মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ‘শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় আইনে’র নীতিগত অনুমোদন হয়। ২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গেজেট আকারে আইনটি (২০১৮ সালের ৯নং আইন) পাস হয়।

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক ড. রফিকুল্লাহ খানকে প্রথম ভিসি হিসেবে নিয়োগদানের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। ২০১৯ সালের ৩ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পাঠদান তথা শিক্ষা-কার্যক্রম শুরু হয়। তাই প্রতিবছর ৩ মার্চকে ‘শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ হিসেবে উদযাপন করে আসছে কর্তৃপক্ষ।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার একজন দূরদর্শী নেতৃত্ব। তাঁর নেতৃত্বেই বিশ্বমঞ্চে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে লাল-সবুজের বাংলাদেশ। মানবতার নেত্রীর নামে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর স্বপ্নের সমান উচ্চতায় পৌঁছাতে চায়। আর সে লক্ষ্যেই নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শিক্ষাপ্রশাসনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতালব্ধ দক্ষতায় দেশের প্রখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানী উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম কবির বিশ্ববিদ্যালয়টিকে উচ্চশিক্ষার ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ে তোলার ব্রত নিয়ে এগিয়ে চলেছেন।

তিনি স্বপ্ন দেখেন, শিক্ষা ও গবেষণায় শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় নতুন উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে নতুন ধারণা ও উদ্ভাবনে এক অনন্য মাইলফলক অর্জন করবে। সেই সঙ্গে প্রাগ্রসরমান বিশ্বে নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম, আলোকিত ও দক্ষ পেশাদার জনশক্তি তৈরি করবে; যারা দেশ ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের কল্যাণে সর্বদা নিয়োজিত থাকবে।

তাই তো অনেক সম্ভাবনা, অনেক প্রতিশ্রুতি আর আশ্বাসের ডালি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবকাঠামো নির্মাণের কাজও এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে দুয়েকটি ভবনের কার্যক্রম দৃশ্যমানও হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, শিক্ষার অভিজাত বলয়ে প্রবেশের সর্বজনীন যে আকাঙ্ক্ষা, তা অতি অল্প সময়ে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা কিংবা ব্যবস্থাপনায় শুধু দেশে নয়, উন্নত বিশ্বেরও নজর কাড়বে ‘শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়’।

বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্যাম্পাস স্থাপনে ইতোমধ্যে সমতল প্রায় ৫০০ একর ভূমির উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে ১০ তলাবিশিষ্ট একাডেমিক ভবন-৩ এবং ৪ তলাবিশিষ্ট প্রশাসনিক ভবনের কাজ চলমান। নির্মাণের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে- টিএসসি, ক্যাফেটেরিয়া, ছাত্রহল, ছাত্রীহল, লাইব্রেরি, মেডিকেল সেন্টার, ডে-কেয়ার ও ইয়োগা সেন্টার।

পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হলে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষ, আন্তর্জাতিকমানের ল্যাবরেটরি, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, খেলার মাঠ, সুস্থ বিনোদনকেন্দ্র, সুচিকিৎসার জন্য উন্নত যন্ত্রপাতিসম্পন্ন মেডিকেল সেন্টার, ক্যাফেটেরিয়া, শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্র, মেডিটেশন হলসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সুপেয় পানির সুব্যবস্থা থাকবে অর্থাৎ একটি বৈশ্বিকমানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যা থাকা প্রয়োজন, সবই থাকবে এই ক্যাম্পাসে।

শুরুতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্থাপনের উদ্যোগ থাকলেও সাধারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অনুমোদন লাভ করে। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় হলেও শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটি তার গন্তব্য ঠিক করে নিয়েছে।

পাঠ্যক্রমে অর্থনীতি, ইতিহাস, সভ্যতা, ভাষা, সাহিত্য যেমন রয়েছে, তেমনই আসন্ন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকিবেলায় বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তিবিদ্যার বিষয়গুলোকেও প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩টি অনুষদের অধীনে ৪টি বিভাগ আছে। এগুলো হচ্ছে- কলা অনুষদে বাংলা বিভাগ ও ইংরেজি বিভাগ, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে অর্থনীতি বিভাগ, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ।

শিক্ষার্থী সংখ্যা ৫৫১ জন, শিক্ষক ১৫ জন এবং কর্মকর্তা রয়েছেন ২৩ জন। কর্মচারী নিয়োজিত আছেন ৫৬ জন। গুণগত শিক্ষা কার্যক্রম বজায় রাখার লক্ষ্যে মেধাবী ও জ্ঞান অনুসন্ধিৎসু শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনকে গতিশীল রাখতে দক্ষ ও মেধাবী কর্মকতা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে; যারা বিশ্ববিদ্যালয়টিকে সুচারুভাবে এগিয়ে নিতে সর্বদা সচেষ্ট।



মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনস্টিটিউট অব বঙ্গবন্ধু অ্যান্ড লিবারেশন ওয়ার, ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ, ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান এসই স্টাডি, ইনস্টিটিউট অব স্ট্যাটিসটিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং, ইনস্টিটিউট অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্স, ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ইনস্টিটিউট অব ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ, ইনস্টিটিউট অব মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজ, ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকস, ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি, ইনস্টিটিউট অব এনার্জি, ইনস্টিটিউট অব ডিজেস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারাবেল স্টাডিজ, ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হবে।

নেত্রকোনার জীব-বৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা কর্ম পরিচালনার জন্য রিভার অ্যান্ড শিক্ষা নিয়ে গবেষণার জন্য থাকবে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট। বিদেশি ছাত্রদের উচ্চশিক্ষায় শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। তাদের জন্য নির্মাণ করা হবে আন্তর্জাতিক হোস্টেল।

অভীষ্ট ও ভাবনার বৈচিত্র্যে এ বিশ্ববিদ্যালয় হবে অনন্য। সুন্দরবন ও উপকূল নিয়ে বিশ্বে প্রথম এখানেই স্থাপিত হয় ইনস্টিটিউট ফর ইন্টিগ্রেটেড স্টাডিজ অন দ্য সুন্দরবনস।

অ্যাকাডেমিক এক্সেলেন্সের জন্য ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল স্থাপন করা হবে। প্রতিটি বিভাগেই আউটকাম বেইজড কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য প্রথাবদ্ধ ছক থেকে বেরিয়ে প্রয়োজনমুখী শিক্ষাদান। বিশ্বজনীন শিখন প্রক্রিয়ার সঙ্গে অভিযোজন। গবেষণাগারে আধুনিক মানের গবেষণা সহায়ক নানা যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে। বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে থাকবে স্মার্ট ক্লাসরুম। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ওয়াইফাই কর্নার, পর্যাপ্ত ই-বুক আর লাইব্রেরিকে অটোমেশন করে আরো সমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয় করে তোলা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দর্শনেই নিহিত ছিল পিছিয়েপড়া মানুষকে এগিয়ে নেওয়ার সংকল্প আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই সামাজিক সমতার এই আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করেছিল। সেই মহান ঐতিহ্য থেকে শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় এতটুকু বিচ্যুত হয়নি। ভবিষ্যতেও হবে না। পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাসে জাতির পিতার সৌম্যদর্শন মুখচ্ছবি, শহিদ মিনার, স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ করা হবে।

নেত্রকোনার বারহাট্টার কাশবনে জন্ম নেওয়া দেশের অন্যতম আধুনিক কবি নির্মলেন্দু গুণ প্রতিষ্ঠিত ‘কবিতাকুঞ্জ’কে বিশ্ববিদ্যালয়ে আত্তীকরণ করা হয়েছে। আমরা মনে করি, মূল্যবোধের গভীরে থাকা এসব অভিজাত অনুভবই শিক্ষার্থীদের দেশের প্রতি সম্মানবোধ বাড়িয়ে দেবে।

শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়। অবকাঠামোসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই এগিয়ে চলছে। শহরের রাজুর বাজারে অবস্থিত টিটিসি-এর একটি ভবনে অস্থায়ী ক্যাম্পাস স্থাপন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলছে। ফলে, শিক্ষার্থীদের আবাসিক সংকটসহ নানান সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। নানান সমস্যার মুখেও শিক্ষার্থীরা যে ‘নতুনের সৃষ্টি’র জন্য পাহাড়সম বিসর্জন কিংবা ত্যাগ স্বীকার করছেন, এটা সত্যিই আমাদের মুগ্ধ করে।

এসব চ্যালেঞ্জ স্বত্ত্বেও উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম কবিরের সার্বিক তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিকমানের দুটি কম্পিউটার ল্যাব, একটি হার্ডওয়্যার ল্যাব, ভার্চুয়াল ক্লাসরুম পরিচালিত হচ্ছে। আছে স্মার্টবোর্ড ব্যবহারের সুবিধাও। শিক্ষার্থীদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত করার লক্ষ্যে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধ কর্নার’ স্থাপন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের যোগযোগব্যবস্থা সহজীকরণের জন্য দুটি মিনিবাস ও তিনটি মাইক্রোবাস রয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিতকরণে নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স-সুবিধা রয়েছে।

শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন। প্রতিটি বিভাগের নিজস্ব ক্লাব বিশ্ববিদ্যালয়কে করেছে আরো সমৃদ্ধ। ক্লাবগুলোতে শিক্ষার্থীরা বিষয়ভিত্তিক বিতর্ক, আলোচনা, সেমিনার ও গ্রুপ স্টাডিতে ব্যস্ত থাকেন।

শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে নেত্রকোনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব সাজ্জাদুল হাসান, নেত্রকোনা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আশরাফ আলী খান খসরুসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের অবদান অনস্বীকার্য। স্থানীয় জনসাধারণও সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে চলেছেন।

৩ মার্চ শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস। এদিন ক্যাম্পাসে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই ক্ষণে প্রত্যাশা জাগে, বিশ্ববিদ্যালয়টি যেন জ্ঞান সৃজন ও মুক্তবুদ্ধির চারণভূমিতে পরিণত হয়। যে শিক্ষা মানুষকে ক্ষুদ্র হতে বৃহৎ করে, মনকে মুক্ত করে, সে শিক্ষার পরিচর্যা কেন্দ্র হোক আমাদের প্রিয় শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়। দক্ষতা ও জ্ঞান সৃষ্টির কারিগর হয়ে উঠুক মগড়া তীরের এ বিদ্যাপীঠ। শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভাশিস!

লেখক: পিএস টু ভিসি, শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়, নেত্রকোনা

   

মুক্তিপণের প্রতিষ্ঠা বনাম দায়িত্বশীলতা



কবির য়াহমদ, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

১৪৩১ বঙ্গাব্দ শুরু হয়েছে সুখবর দিয়ে। বাংলা বর্ষের প্রথম সকালে দেশবাসী জেনেছে সাগরে জিম্মি ২৩ বাংলাদেশি নাবিক মুক্ত হয়েছেন। তাদেরকে রেখে সরে যেতে হয়েছে সোমালিয়ান জলদস্যুদের। বাংলাদেশিরা এখন সাগরপথে আরব আমিরাত অভিমুখে এবং সেখান থেকে উড়োজাহাজে করে ফিরবেন দেশে।

এই ২৩ বাংলাদেশি নাগরিকের মুক্তিতে একটা বড় ফাঁড়া কাটল। বাঁচল মানুষের প্রাণ, বাঁচল দেশের ইজ্জত। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, দূরদর্শিতার সব জয় হয়েছে। তৃতীয়পক্ষের মাধ্যমে বাংলাদেশ শক্তি প্রয়োগের পথে না গিয়ে মানুষের জীবনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার পথ বেছে নিয়েছে। এখানে শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল মুক্তিপণের। এই ঘটনার সুন্দর সমাধানের পর আদৌ কি মুক্তিপণের কিছু ঘটেছে, ঘটলে টাকার অঙ্কে সেটা কত এ নিয়ে আলোচনা চলছে, যদিও এই আলোচনাকে অবান্তর বলে মনে করছি। কারণ এখানে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন নেই, নেই ইজ্জত বাড়ার মতো কিছু। আছে কেবল বিশাল এক শ্রেণির শ্রোতা-দর্শক-পাঠকের তুমুল আগ্রহ; তবে এই আগ্রহ জাতীয় স্বার্থ কিংবা অপরাপর ক্ষেত্রে অগুরুত্বপূর্ণই।

বাংলাদেশিদের মুক্তি প্রক্রিয়ায় যদি আক্রান্ত নাবিকদের পরিবার যদি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো, তবে এটা নিয়ে আলোচনা হতো যৌক্তিক। এখানে যদি পাবলিক ফান্ডিংয়ের বিষয় জড়িত থাকত তবে সেটা নিয়েও আলোচনা জরুরি ছিল, কিন্তু এর কিছুই নেই এই প্রক্রিয়ায়। তাহলে কী কারণে এই আলোচনা, এত আলোচনা?

এটা সাধারণ বোধজ্ঞানের বিষয় যে, এইধরনের পরিবহন কিংবা যাত্রায় বীমা কোম্পানির বিবিধ অংশগ্রহণ থাকে। এখানেও এর ব্যতিক্রম থাকার কথা নয়। মুক্তিতে যদি বীমা কোম্পানির অংশগ্রহণ থাকে, তবে সেটার ব্যবসায়িক দিক তাদের। এই ব্যবসায়িক দিক নিয়ে মুখরোচক গল্প ফাঁদার প্রয়োজনীয়তা দেখি না।

২৩ বাংলাদেশি মুক্তিতে ৫০ লাখ ডলার ব্যয় করতে হয়েছে বাংলাদেশকে। দুই জলদস্যুর বরাত দিয়ে রয়টার্সের সূত্রে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দেশের একাধিক গণমাধ্যম। রয়টার্সের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এক জলদস্যু তাদের জানিয়েছে, দু’দিন আগেই হাতে পৌঁছে মুক্তিপণের অর্থ। তারপর তারা সেগুলো নকল কিনা যাচাই করে দেখেছে। আসল মুদ্রা নিশ্চিত হওয়ার পর নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছে। কিছু গণমাধ্যম জানিয়েছে, হেলিকপ্টার করে তিন বস্তা টাকা পানিতে ফেলা হয়। বিষয়টি অনেকটাই সিনেম্যাটিক। প্রতিবেদনে ভ্রম হয় সিনেমার দৃশ্যের বর্ণনা কিনা! অবশ্য সোমালিয়ান জলদস্যুদের নিয়ে একাধিক সিনেমা এরইমধ্যে তৈরি হয়েছে। হতে পারে সে সব সিনেমার কোন একটা দৃশ্যের সঙ্গে মিল রেখে এমনভাবে বলছেন কেউ কেউ। কারণ জাহাজের মালিকপক্ষ কেএসআরএম নিজ থেকে বলেনি তারা মুক্তিপণ পরিশোধ করেছে।

বাংলাদেশের নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী মুক্তিপণ পরিশোধের বিষয় অস্বীকার করেছেন। প্রতিমন্ত্রীর অবস্থান যৌক্তিক। তার অবস্থানে থেকে মুক্তিপণের বিষয় নিয়ে স্বীকার-অস্বীকার করা যায় না। তিনি বলেছেন, ‘জাহাজ ও নাবিকদের উদ্ধারে মুক্তিপণ দেয়ার বিষয়ে সরকারের কাছে কোনো তথ্য নেই।’

নাবিকদের মুক্তির পর রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে কেএসআরএম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুল করিম বলেছেন, ‘নাবিকদের মুক্ত করতে সোমালিয়া, কেনিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র- এই চার দেশের নিয়মকানুন মেনেই সমঝোতা হয়েছে। সবকিছুই বৈধভাবেই শেষ হয়েছে। তবে সমঝোতার শর্ত অনুযায়ী অনেক কিছু আমরা প্রকাশ করতে পারছি না।’ সমঝোতার সব শর্ত প্রকাশের কিছু নেই। এখানে এমন কিছু থাকতে পারে যা ভবিষ্যৎ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। এটা নিয়ে টানাটানিও তাই অযৌক্তিক।

প্রতিমন্ত্রী বলেননি, কেএসআরএম কর্তৃপক্ষ বলেনি তারা ৫০ লাখ ডলার মুক্তিপণ দিয়েছে। সুতরাং কথিত মুক্তিপণের এই অঙ্ক প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা থেকে সরে যাওয়া উচিত আমাদের। কারণ মুক্তিপণের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করা হলে সাগরপথে এইধরনের একটা অঙ্কের খরচ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। গভীর সাগরে জলদস্যুদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়া এবং টাকা দিয়ে উদ্ধার পাওয়ার বিষয়টি নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়ে যাবে। ভবিষ্যতে এখানে কেউ নতুনভাবে সুযোগ নিতে চাইবে। এখান থেকে বেরুনো যাবে না।

উদাহরণ দিতে গেলে এখানে আসতে পারে, কয়েক বছর আগে একই কোম্পানির আরেকটি জাহাজ সোমালিয়ান জলদস্যুদের হাতে জিম্মি হয়েছিল। একশ দিন পর উদ্ধার হয়েছিল সে জাহাজ ও নাবিকেরা। তখনো নাকি এমন মুক্তিপণের বিষয় ছিল। এবারের জিম্মির ঘটনার পর আগের সেই ঘটনার অতি-আলোচনা হয়েছে, এবং সেই অতি-আলোচনা এখানে প্রভাবক হয়ে পড়েছিল কিনা সন্দেহ।

একজন প্রতিমন্ত্রী, একটা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলরা বলতে পারেন না মুক্তিপণ দিয়ে মুক্ত করে এনেছি জিম্মি বাংলাদেশিদের। যে অবস্থানে তারা সেটা দায়িত্বশীল অবস্থান, যে বক্তব্য তাদের সেটা প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বশীল বক্তব্য; সেটা যদি আমরা বুঝে থাকি, তারা মুক্তিপণের বিষয় যদি স্বীকার করতেন কী প্রভাব পড়তে পারে, সেটা যদি আমরা বুঝে থাকি তবে এও বুঝা উচিত মুক্তিপণকে প্রতিষ্ঠা করা অনুচিত। এর চেষ্টা করা অনাকাঙ্ক্ষিত। বিষয়টি নিয়ে অযথা টানাটানি না করে অন্যের কাছ থেকে আমরা যেমন দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশা করি তেমনি নিজেই যেন সেটা অনুশীলনের চেষ্টা করি।

জিম্মি বাংলাদেশিদের ছেড়ে যাওয়ার পর আট জলদস্যু গ্রেফতার হয়েছে- ঠিক এই সংবাদে বুঝার চেষ্টা করুন ছেড়ে কথা বলেনি বাংলাদেশ। নিজেদের নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিল। এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফল জলদস্যুদের গ্রেপ্তার। জিম্মি বাংলাদেশিদের জীবন আর অন্যায়কে অন্যায় বলতে পারার বাংলাদেশের এই সফল প্রচেষ্টা অভিনন্দনযোগ্য।

জাহানমণি উদ্ধারে লেগেছিল ১০০ দিন; এমভি আব্দুল্লাহকে মুক্ত করতে লেগেছে মাত্র ৩২ দিন। মুক্ত বাংলাদেশিদের অভিনন্দন, ধন্যবাদ সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে।



;

জীবনে সুখী হওয়া



ড. হাসিন মাহবুব চেরী, সিনিয়র স্পেশালিস্ট সায়েন্টিস্ট, ইউকে
জীবনে সুখী হওয়া

জীবনে সুখী হওয়া

  • Font increase
  • Font Decrease

মানুষের বয়স বৃদ্ধির কোনো এক পর্যায়ে জীবনবোধের বিষয়গুলো তীক্ষ্ণ হয়। সে সময় সবার মনে একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরে ফিরে আসে: কীভাবে জীবনটাকে আরও সুন্দর আর উপভোগ্য করা যায়? কীভাবে দীর্ঘদিন জীবনে আনন্দ নিয়ে বেঁচে থাকা যায়?

প্রশ্নটা খুব সহজ হলেও এর উত্তর পাওয়া কিন্তু এতোটা সহজ নয়। এমনকি, সারাটা জীবন সুখ নামের মরীচিকার খোঁজে পাগলের মতো ঘুরেও বেশিরভাগ মানুষই তার দেখা পায় না! আশায় আশায় জীবন কেটে যায়। সুখী হওয়ার আশা পূরণ হয় না।

আসল সমস্যা হলো, জীবনে সুখী হওয়ার জন্যে ছোটোবেলা থেকে আমাদের মস্তিষ্কে চাপ তৈরি করে দেওয়া হয়। মাথার মধ্যে সুখী হওয়ার যে ফরমুলা ঢুকিয়ে দেয়া হয়, তা হলো নিজেকে সমাজে অনেক সাকসেসফুল করতে হবে। রাত দিন কাজে ডুবে গিয়ে প্রচুর টাকার মালিক হতে হবে, ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে, অথবা অনেক ফেমাস কোনো ব্যক্তি হতে হবে। যাতে করে সবাই আপনাকে চেনে, জানে এবং এভাবেই আপনার খ্যাতি অথবা পয়সা আপনাকে সুখ এনে দেবে অটোমেটিক।

কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা একেবারেই ভিন্ন! চলুন দেখি এ ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা কি বলছেন। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের বিজ্ঞানীরা গত ৭৫ বছর যাবৎ এক গবেষণা চালিয়ে খুঁজে বের করেছেন মানুষের জীবনে সুখী হওয়ার রহস্য। গবেষণাটি শুরু হয় ১৯৩৮ সাল থেকে। গবেষণাটিতে বিজ্ঞানীরা ৭২৪ জন মানুষের জীবনকে গত ৭৫ বছর যাবৎ ফলো করে এসেছেন। এই গবেষণায় তারা ৭৫ বছর ধরে এই প্রত্যেকটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে তাদের শারীরিক ও মানসিক সব রকম পরীক্ষা, ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা সব কিছুই অন্তর্ভুক্ত করেন।

গবেষণাকালীন দীর্ঘ ৭৫ বছরে এই মানুষদের অনেকেই মারা যায়, কেউবা মদ্যপ হয়, আবার অনেকে নানা রকম মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে মানসিক রোগী হয়। অনেকেই ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হন, আবার একজন আমেরিকার প্রেসিডেন্টও নির্বাচিত হন! অর্থাৎ, বিচিত্র তাদের জীবনের ফলাফল পরিণতি।

শেষ পর্যন্ত এদের সবার জীবন থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান যে, একমাত্র জীবনে ভালো রিলেশনশিপের উপস্থিতি মানুষকে সুখী এবং দীর্ঘজীবী করে! আর কিছু পাসিং স্যাডো: ভাসমান মেঘের মতো ক্ষণস্থায়ী, হালকা ও অস্থায়ী।

এক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা প্রথমেই জোর দিয়েছেন খুব কাছের সম্পর্কের মানুষের সাথে সম্পর্কের কোয়ালিটি নিয়ে। তারা দেখেছেন যেসব মানুষের জীবনে খুব ভালোবাসার এবং নির্ভর করার মতো একজন মানুষও থাকে তারা অনেক সুখী এবং দীর্ঘজীবী হয়।

এই গবেষণায় আরো দেখা যায়, যেসব ব্যক্তি অন্যের সাথে নিজের কোনো কিছু শেয়ার করতে পারে না, খুব ক্লোজ রিলেশনশিপ মেনটেন করতে চায় না বা পারে না, তারা অতি দ্রুত শারীরিক এবং মানসিক অবক্ষয়ের দিকে চলে যায়। এক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা বারবার জোর দিয়েছেন এমন কাছের মানুষের সাথে সম্পর্ক মেনটেন করতে, যার ওপর আস্থা, বিশ্বাস ও নির্ভরতা রাখা যায়।

গুরুত্বপূর্ণ এই গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সারাজীবন বিবাহিত থেকে অশান্তিকর ভালোবাসাহীন জীবন-যাপন করা মানুষের চেয়ে যারা সেই অশান্তি থেকে বের হয়ে এসেছে ডিভোর্সের মাধ্যমে, তারা পরবর্তীতে সুখী এবং দীর্ঘজীবনের অধিকারী হয়েছে। এই গবেষণায় দেখা যায় যে, ৫০ বছরের পর যেই কাপলদের মধ্যে গভীর ভালোবাসা বজায় ছিল তারা ৯০ বছরের অধিক সময় ধরে বেঁচে আছে।

ভালোবাসার সম্পর্ক বলতে বিজ্ঞানীরা এমনটা বোঝেননি যে ঝগড়া বা ইমোশনাল ups এন্ড downs থাকবে না, বরং বুঝিয়েছেন সব কিছুর পরেও যদি দিনশেষে একে অপরের উপর এই বিশ্বাসটা রাখার মতো সম্পর্কটা হয় যে, আমার এমন একজন আছে, যে আমার বিপদে আমার পাশে আছে, সেটাই পরবর্তীতে সুখী এবং দীর্ঘজীবন যাপনে মূল ভূমিকা পালন করে।

এই গবেষণায় আরেকটি চমকপ্রদ পয়েন্ট উঠে আসে আর সেটি হলো: যাদের জীবনে আস্থা এবং গভীর ভালোবাসার মানুষের উপস্থিতি থাকে, তারা তুলনামূলকভাবে যেকোনো তীব্র ব্যথা অনেক কম অনুভব করেন। যখন ব্যথার তীব্রতা তুলনা করা হয় সেসব মানুষের সাথে, যাদের জীবনে ভালোবাসার সম্পর্ক অনুপস্থিত!

বিজ্ঞানীরা দ্বিতীয় যে বিষয়টার ওপর জোর দিয়েছেন সেটি হলো, ভালো সামাজিক সম্পর্ক তৈরির ওপর। কারণ, দেখা গেছে যেসব মানুষ ভালো সামাজিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে বন্ধু বান্ধবের সাথে, তারা অনেক বেশি সুখী ও স্বাস্থ্যবান জীবন-যাপন করে, যখন তুলনা করা হয় সেসব মানুষের সাথে, যারা অপেক্ষাকৃত একাকী জীবন যাপন করে।

বাস্তবেও একাকিত্ব মানুষকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে দুর্বল করে ফেলে, তাদের ব্রেইনের কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং তারা অপেক্ষাকৃতভাবে কম দিন বাঁচে। নিঃসঙ্গ ও একাকী মানুষের তীব্র যন্ত্রণার বিষয়গুলোও গবেষণায় উত্থাপিত হয়েছে।

এই গবেষণার ফলাফল থেকে দেখা যায় যে, মানুষের কতগুলো বন্ধু আছে অথবা সে বিবাহিত কিনা সেটার চেয়ে বড়ো ব্যাপার হলো তার কয়জন বিশ্বস্ত বন্ধু আছে অথবা তার স্বামী স্ত্রী অথবা প্রেমিক-প্রেমিকার সাথে তার সম্পর্কের কোয়ালিটিটা কেমন। ৫০ বছর বয়সে যেসব মানুষ তাদের সম্পর্ক নিয়ে satisfied ছিল তারা high cholesterol থাকার পরেও কোলেস্টেরল না থাকা মানুষদের চেয়ে দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনযাপন করে।

আরেকটি বিষয় যা গবেষণাকালে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন তা হলো, যদি কোনো মানুষ একটি securely attached caring রিলেশনশিপে থাকে এবং বিশ্বাস করে যে, সে তার সবচেয়ে কাছের একজনের ওপর নির্ভর করতে পারে, তাহলে এটি তাদের ব্রেইনকে রক্ষা করে এবং তাদের মেমোরি শার্প থাকে ৮০ বছরের পরেও! এই মানুষগুলোর সম্পর্ক যে খুব স্মুথ ছিল তা কিন্তু নয়। বরং প্রতিদিন ঝগড়া করেও যদি দিনশেষে তারা একে অপরের ওপর নির্ভর করতে পারে তাহলে তাদের মেমোরি ও স্বাস্থ্য দীর্ঘদিন ভালো থাকে।

মোট কথা, গভীর ভালোবাসায় থাকা সম্পর্কের মানুষের জীবন অনেক সুখের এবং তাদের মন, মেজাজ, ব্রেন ও স্বাস্থ্য অনেক ভালো থাকে বলে তারা দীর্ঘজীবী হয়। কেননা গভীর ভালোবাসা, আস্থা, বিশ্বাস, নির্ভরযোগ্যতা মানুষকে sense অফ protectovity দেয় এবং সুখী রাখে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো- এতো কিছুর পরেও কেন আমরা আমাদের সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোকে অবহেলা করি? এর উত্তর হলো, মানুষ সহজে যা পেয়ে যায় তার মূল্য দেয় না, আর ভালো রিলেশনশিপ বজায় রাখতে হলে যে মূল্য দিতে হয়, সেটাও মানুষ সহজে দিতে চায় না। ভালো রিলেশনশিপ মেনটেন করা সহজ কাজ নয় এবং এজন্যে প্রচুর ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, যা মানুষ সচরাচর করতে চায় না। কারণ তারা সব কিছু রেডিমেড উপভোগ করতে চায়। কিন্তু আমরা ভুলে যাই যে: ‘When we love, we always strive to become better than we are. When we strive to become better than we are, everything around us becomes better too.’ — Paulo Coehlo

তাই আসুন ভালোবাসার সম্পর্কগুলোকে যত্ন করি এবং একটি আনন্দময় সুখী সার্থক দীর্ঘজীবনের অধিকারী হই।

;

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দুবাই বৈঠক: বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে তাৎপর্য ও করণীয়



ড. মোস্তাফিজুর রহমান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

একটি উত্তরণকালীন স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য সদ্য সম্প্রতি সময়ে সংযুক্ত আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ত্রয়োদশ মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন (২৬ ফেব্রুয়ারি-১ মার্চ ২০২৪) ছিল আলাদাভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সুবিদিত যে, বাংলাদেশ নভেম্বর ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে স্বল্পোন্নত-বহির্ভূত উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হবে। ত্রয়োদশ বৈঠকে (এম. সি. ১৩) বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ছিল ত্রিমাত্রিক পরিচয়কে ধারণ করে: স্বল্পোন্নত দেশ, উত্তরণকালীন স্বল্পোন্নত দেশ ও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে।

বাংলাদেশকে একদিকে স্বল্পোন্নত দেশসমূহের সাথে সংহতি রাখতে হয়েছে; একই সাথে উত্তরণকালীন স্বল্পোন্নত দেশ হিসাবে নিজস্ব স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হয়েছে, আবার অন্যদিকে নিকট ভবিষ্যতের একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে তার স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয় ও ইস্যু সমূহকেও বিবেচনায় রাখতে হয়েছে। সম্মেলনে নাগরিক সমাজের একজন প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায় যে, এবারের এম.সি. ১৩ তে বাংলাদেশের সরকারি প্রতিনিধি দলের প্রস্তুতি ছিল বেশ ভাল। এ ধরণের সম্মেলনের ক্ষেত্রে প্রস্তুতিমূলক আলোচনা সবসময়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে পরামর্শক্রমে বাংলাদেশের জেনেভাস্থ মিশন জেনেভাতে এম.সি ১২ ও এম. সি. ১৩ এর মধ্যবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিভিন্ন আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে এবং তার সুফল আবুধাবিতে দেখা গেছে। এম. সি. ১৩-তে মাননীয় বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী জনাব আহসানুল ইসলাম এম. পি.’র নেতৃত্বে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও জেনেভাস্থ বাংলাদেশ মিশন প্রধান ও অন্যান্য সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত সরকারি ডেলিগেশন আবুধাবিতে গ্রিনরুম (বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাভূক্ত সীমিত সংখ্যক দেশের অংশগ্রহণমূলক আলোচনা) ও সাধারণ আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন এবং দ্বিপাক্ষিক মতবিনিময়ের বিভিন্ন সুযোগকেও কাজে লাগিয়েছেন। ফলশ্রুতিতে, সর্বক্ষেত্রে সম্ভব না হলেও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্তসমূহ বাংলাদেশের অনুকূলে এসেছে, যা সম্মেলন শেষে এম. সি. ১৩ এর মন্ত্রীপর্যায়ের ঘোষণায় প্রতিফলিত হয়েছে।

এবারের মন্ত্রীপর্যায়ের বৈঠকে উত্তরণকালীন স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয় ছিল বেশ কয়েকটি: ক) শুল্কমুক্ত, কোটামুক্ত বাজার সুবিধার প্রসারণ; খ) স্বল্পোন্নত দেশসমূহকে প্রদেয় অন্যান্য আন্তর্জাতিক সহায়তা কার্যক্রমের সময়-নির্দিষ্ট প্রসারণ, গ) মৎস্যখাতের ভর্তুকির আলোচনায় উত্তরণকালীন স্বল্পোন্নত দেশসমূহের জন্য সময়-নির্দিষ্ট বিশেষ সুবিধা; ঘ) বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সংস্কার বিষয়ক আলোচনায় বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশসমূহের স্বার্থের নিশ্চয়তা বিধান। এর বাইরে সরকারি খাদ্য সংগ্রহে প্রদত্ত কৃষি ভর্তুকিকে কৃষিখাতে প্রদত্ত ভর্তুকির সর্বোচ্চ হিসাবের (যা কৃষি জিডিপির ১০% এর সমপরিমাণ) বাইরে রাখা, ই-কমার্সের ওপর ১৯৯৮ সাল থেকে প্রচলিত শুল্ক নিষেধাজ্ঞার সমাপ্তি, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রাতিষ্ঠনিক প্ল্যাটফর্মের বাইরে অনুষ্ঠিত বহুপাক্ষিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করার বিষয়ে অবস্থান নির্ধারণ ইত্যাদি।

উত্তরণকালীন স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধার প্রসারণ। এ বিষয়ে অবশ্য ইতিপূর্বে, ২৩ অক্টোবর ২০২৩-এ বিশ^ বাণিজ্য সংস্থার সাধারণ অধিবেশনে একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল, যা এম. সি. ১৩-তে অনুমোদিত হয়। এ ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় প্রণিধানযোগ্যঃ প্রথমত, সিদ্ধান্তটি ‘বেস্ট এনডিয়েভার’ (সেরা প্রচেষ্টা) আকারে গৃহীত হয়েছে, অর্থাৎ এটা মেন্ডেটরি বা বাধ্যতামূলক নয়, বরং সদস্যদের সদিচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এক্ষেত্রে কোন সুনির্দিষ্ট সময়ের কথা বলা হয়নি, যদিও স্বল্পোন্নত দেশসমূহের এ সংক্রান্ত প্রথম প্রস্তাবে ১২ বছরের কথা বলা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ৬-৯ বছরে নামিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল। তৃতীয়ত প্রস্তাবটি কেবলমাত্র সেসব দেশের জন্য প্রযোজ্য যাদের স্বল্পোন্নত দেশ-নির্দিষ্ট বাজার সুবিধা স্কিম আছে। উদাহরণস্বরূপ, যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এধরণের কোন স্কিম নেই, সিদ্ধান্তটি সে দেশের জন্য প্রযোজ্য হবে না।

এতদসত্ত্বেও এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এম. সি. ১৩-এর সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশ ও অন্যান্য উত্তরণকালীন স্বল্পোন্নত দেশের জন্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে বাজার সুবিধা সম্প্রসারণের একটি সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এখানে উল্লেখ্য যে, ইউরোপিয় ইউনিয়ন (এভরিথিং বাট আর্মস বা ই. বি. এ.) ও যুক্তরাজ্য (ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিম বা ডি. সি. টি. এস) তাদের স্ব-স্ব এলডিসি স্কিম এর মেয়াদকাল উত্তরণকালীন স্বল্পোন্নত দেশসমূহের জন্য উত্তরণ-পরবর্তী আরো তিন বছর বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। অন্য দেশসমূহের সাথে বাজার সুবিধা সম্পর্কিত আলোচনায় এটা একটা মানবিন্দু (রেফারেন্স পয়েন্ট) হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। বাংলাদেশকে এখন দ্বিপাক্ষিকভাবে কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ভারতসহ অন্যান্য দেশসমূহের সাথে এম. সি. ১৩ এর সিদ্ধান্তের আলোকে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। এম. সি. ১৩-তে এ সিদ্ধান্তও হয়েছে যে, উত্তরণকালীন স্বল্পোন্নত দেশসমূহকে কারিগরি সহায়তা ও সক্ষমতাবৃদ্ধিমূলক সাহায্য উত্তরণ পরবর্তীতে আরো তিন বছরের জন্য প্রদান করা হবে।

গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি সিদ্ধান্ত হল-উত্তরণকালীন স্বল্পোন্নত দেশসমূহ স্বল্পোন্নত দেশসমূহের অনুরূপ ডিউ রেসট্রেইন্ট (যথাযথ সংযম) সুবিধা উত্তরণ-পরবর্তী আরও তিন বছরের জন্য ভোগ করতে পারবে। এর অর্থ হল-স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর তিন বছর পর্যন্ত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্যভূক্ত কোন দেশ এসব দেশের বিরুদ্ধে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিরোধ নিষ্পত্তি বডি (ডিসপিউট সেটেলম্যান্ট বডি)-তে নালিশ করতে পারবে না।

স্বল্পোন্নত দেশগুলি এর বাইরে যেসব সুবিধা ভোগ করে সেসবগুলিও যাতে উত্তরণ-পরবর্তীতে তারা বাড়তি সময়ের জন্য ভোগ করতে পারে এমন একটি প্রস্তাবও রাখা হয়েছিল উত্তরণকালীন স্বল্পোন্নত দেশের স্বার্থসমূহ বিচেনায় রেখে। তবে এ সম্বন্ধে সুনির্দিষ্ট কোন সিদ্ধান্ত এম. সি. ১৩-এ গৃহীত হয়নি। মেধাসত্ব অধিকার, ওষুধ ও মেধাসত্ব অধিকার, রপ্তানিতে ভর্তুকি প্রদান ইত্যাদি ইস্যুতে বাড়তি সময় সুবিধা ভোগ করতে সমর্থ হলে উত্তরণকালীন স্বল্পোন্নত দেশসমূহ, বিশেষ করে বাংলাদেশ, উপকৃত হত। এম. সি. ১৩ এর সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে যে, এ সম্বন্ধীয় আলাপ-আলাচেনা জেনেভাতে অব্যাহত থাকবে এবং এম. সি. ১৪-তে এ বিষয়ে আলোচনার ফলাফল উপস্থাপন করা হবে। জেনেভাস্থ বাংলাদেশ মিশন নিশ্চয়ই এম. সি. ১৩ পরবর্তী আলোচনায় সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব (তথাকথিত এনেক্স ২ প্রস্তাব) এর প্রেক্ষিতে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হবার জন্য সক্রিয় ভূমিকা রাখবে। বিশেষত বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের বিকাশে মেধাসত্ব অধিকার বিষয়ক নমনীয়তার যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে তা সুবিদিত।

মৎস্য খাতে ভর্তুকি বিষয়ক আলোচনায় কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়নি, যদিও নিয়মবহির্ভূত, অনথিভূক্ত, অপ্রতিবেদিত মৎস্য শিকারের ক্ষেত্রে প্রদেয় ভর্তুকির প্রেক্ষিতে একটি সিদ্ধান্ত এম. সি. ১২-তে গৃহীত হয়েছিল। দ্বিতীয় ধাপের আলোচনায় ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মৎস্য আহরণের ক্ষেত্রে প্রদেয় ভর্তুকি হ্রাস ছিল মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।

উত্তরণকালীন স্বল্পোন্নত দেশসমূহকে যাতে মৎস্য খাতে ভর্তুকী প্রদানের ক্ষেত্রে স্বল্পোন্নত দেশসমূহের অনুরূপ সুবিধা দেয়া হয়; বাংলাদেশ সে বিষয়ে সচেষ্ট ছিল, জেনেভাতে এ বিষয়ে যে টেক্সট নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাতে মতৈক্যে পৌছান সম্ভব হয়নি (এ সংক্রান্ত টেক্সট-এ অনেক ব্র্যাকেট থেকে গিয়েছিল)। আবুধাবিতে বিশেষতঃ ভারতের সাথে উন্নত ও ধনী দেশসমূহের ভর্তুকি বিষয়ে বিরাজমান বড় পার্থক্যের নিরসন করা সম্ভব হয়নি। ভারতের যুক্তি ছিল ছোট ও আর্টিসানাল মৎস্য শিকারের ক্ষেত্রে প্রদেয় ভর্তুকির ক্ষেত্রে কোন ধরণের সীমা আরোপ করা যাবে না (অন্ততঃ ২৫ বছরের জন্য)। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ ছিল ভারতের অনুরূপ, বিশেষতঃ আগামীর উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে।

সামুদ্রিক মৎস্য শিকারে ভর্তুকির ক্ষেত্রে শৈথিল্য প্রাপ্তির জন্য বিশ^ সামুদ্রিক মৎস্য শিকারের ০.৮% এর একটি সীমারেখা আলোচ্য টেক্সটে ছিল, যে সীমারেখাটি বৃদ্ধি করতে বাংলাদেশ সচেষ্ট ছিল (যেহেতু ইলিশকে সামুদ্রিক মাছ হিসেবে গণ্য করলে বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্য শিকার ০.৮% এর সীমারেখা অতিক্রম করে)। আলোচ্য টেক্সটে বৃহৎ মৎস্যশিকারী দেশসমূহের বড় বড় সামুদ্রিক মৎস্যশিকারী কোম্পানিসমূহের জন্য প্রদত্ত ভর্তুকির বিষয়ে যেসব ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, সে বিষয়েও অনেক উন্নয়নশীল দেশের জোরাল আপত্তি ছিল। অবশ্য এ বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত না হওয়া ও স্থিতাবস্থা বিরাজমান থাকায় বাংলাদেশের সংক্ষুব্ধ হবার তেমন কোন কারণ নেই। তবে এম. সি. ১৩ ও এম. সি. ১৪ এর অন্তবর্তীকালীন আলোচনায় বাংলাদেশকে উত্তরণকালীন স্বল্পোন্নত দেশ ও উন্নয়নশীল দেশ-এ দ্বিবিধ স্বার্থ বিবেচনায় রেখে অংশগ্রহণ করতে হবে।

কৃষিখাত সংক্রান্ত ‘পিস ক্লজ’ এর আলোচনায় বেশ বড় ধরণের মতপার্থক্য থেকে যায় যার কারণে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়নি। ভারতের প্রদেয় কৃষি খাতের ভর্তুকি ১০% সীমা অতিক্রম করে যদি সরকারি খাদ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রদত্ত ভর্তুকি এ হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হয়; ভারতের যুক্তি ছিল এ ভর্তুকি ‘গ্রিন সাবসিডি’র অনুরূপ যেহেতু এর লক্ষ্য হল প্রান্তিক মানুষের জন্য খাদ্য সহায়তা। বেশ কিছু দেশ এর বিরোধিতা করে এই যুক্তি দিয়ে যে, এই খাদ্যের একটি অংশ ভারত আবার রপ্তানিও করে। ভারতের দাবি ছিল ‘পিস ক্লজ’-কে চিরস্থায়ী করা। অন্য বেশ কয়েকটি দেশের অবস্থান ছিল, এ সংক্রান্ত আলোচনা কৃষি খাত বিষয়ক বৃহত্তর পরিসরের আলোচনার অংশ হতে হবে। শেষ অবধি দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে এ বিষয়ে কোন ঐক্যমতে পৌছান সম্ভব হয়নি।

ই-কমার্সের ওপর শুল্ক আরোপে যে নিষেধাজ্ঞা ১৯৯৮ সাল থেকে বর্তমান, সে বিষয়ে ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইন্দোনেশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশের অবস্থান ছিল, এতে ই-পণ্য ও সেবা রপ্তানিকারক উন্নত দেশগুলিই লাভবান হচ্ছে; আর আমদানিকারক উন্নয়নশীল দেশসমূহ শুল্ক আহোরণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এক অর্থে এই যুক্তি প্রযোজ্য। সিপিডি-র গবেষণায় দেখা যায়, প্রতিবছর বাংলাদেশ সরকার এ নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার শুল্ক থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ই-কমার্সের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্য কিছুটা মিশ্র। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের রক্ষণাত্মক স্বার্থ (ডিফেন্সিভ ইন্টারেস্ট) যেমন আছে, তেমনি আছে আক্রমণাত্মক স্বার্থ (অফেন্সিভ ইন্টারেস্ট)। তার কারণ বাংলাদেশ সেবাখাতে রপ্তানিও করে থাকে এবং নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে গন্তব্য দেশসমূহে রপ্তানির ওপর শুল্ক আরোপিত হবে যা এসব রপ্তানির প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। আবুধাবিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যদি পরবর্তী আলোচনায় অগ্রগতি না হয় তাহলে ৩১ মার্চ ২০২৬ বা এম. সি. ১৪ এ দুটোর মধ্যে যেটিই আগে আসবে সে তারিখ থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে। উত্তরণকালীন স্বল্পোন্নত দেশের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ রপ্তানির ওপর কোনো শুল্ক বসবে না (নির্দিষ্ট সময়ের জন্য), এমন একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে বাংলাদেশের জন্য তা ইতিবাচক হবে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সংস্কার বিষয়ক আলোচনা জেনেভা ও পরবর্তীতে আবুধাবি এম. সি. ১৩-তে বিশেষ গুরুত্ব পায়। স্মর্তব্য যে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ডি. এস. বি. বর্তমানে অনেকাংশে অকেজো হয়ে আছে কারণ সংস্কার আলোচনার পরিসমাপ্তি ব্যতিরেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ডি. এস. বি.’র আপিল বডিতে কোন নিয়োগ প্রদান করতে বাধা দিচ্ছে। অথচ ডি. এস. বি.’-কে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘জুয়েল ইন দি ক্রাউন’ বলা হয় যা এ সংস্থাকে ব্যতিক্রমী বিশিষ্টতা দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশকিছু উন্নত রাষ্ট্রের যুক্তি হচ্ছে ব্যাপক সংস্কারের অনুপস্থিতিতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। তারা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও চলমান সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া দুটোরই বিরোধিতা করে আসছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ঐকমতভিত্তিক সিদ্ধান্ত ‘সব কিছুতে সহমত না হলে কোন কিছুতেই সিদ্ধান্ত নয়’ (নাথিং ইজ এগ্রিড আনলেস এভরিথিং ইজ এগ্রিড) এবং ‘একক অঙ্গীকার’ (সিঙ্গল আন্ডারটেকিং) -এসব পদ্ধতিগত বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে বেশ কিছু উন্নত দেশের পক্ষ থেকে। বিশেষত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এসব ক্ষেত্রে অনেকটাই অনড়। এসব বিষয়ে আবুধাবিতে বিশেষ অগ্রগতি হয়নি। উন্নয়নশীল দেশসমূহের অবস্থান হল সংস্কারের নামে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাতে যেন শক্তিশালী ও উন্নত দেশসমূহের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা না করা হয় এবং যে কোন সংস্কার কর্মসূচির নামে এ সংস্থার ‘উন্নয়ন মাত্রা’ (ডেভেলপমেন্ট ডাইমেনশন) যেন দুর্বল না হয়।

আবুধাবিতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, ভারত, বাংলাদেশের মত দেশসমূহ অংশগ্রহণ না করলেও ‘বহুপাক্ষিক আলোচনা’ (প্লুরিলেটারেল ডিসকাশন) ক্রমান্নয়ে অধিকতর গুরুত্ব পাচ্ছে। বিনিয়োগ (ইনভেস্টমেন্ট ফেসিলেটেশন ফর ডেভেলপমেন্ট), পরিবেশ (ট্রেড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট সাসটেইনেবিলিটি, স্ট্রাকচারড ডিসকাশন), ই-কমার্স (জয়েন্ট ইনিশেয়েটিভ অন ই-কমার্স) ও অন্যান্য ইস্যুর ওপর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম সমূহের বাইরে অনেক সদস্য দেশ শুল্ক হার, রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন সংক্রান্ত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

উদ্দেশ্য হল, ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হলে এসব আলোচনাকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মূলধারাতে নিয়ে আসা। আবুধাবিতে এভাবেই সেবা সংক্রান্ত অভ্যন্তরীন রেগুলেশন্সকে প্লুরিলেটারেল থেকে বহুপাক্ষিক রূপ দেওয়া হয়েছে, যা পরবর্তীতে সবার জন্য ‘মোস্ট ফেবারড নেশানন্স বা এম. এফ. এন.’ ভিত্তিতে প্রয়োগ হবে। পূর্বেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখনো কোন প্লুরিলেটারেল আলোচনায় অংশগ্রহণ করেনি যদিও বেশ কিছু সংখ্যক স্বল্পোন্নত দেশ বেশ ক’টিতে সক্রিয় আছেঃ যেমন-বিনিয়োগ সংক্রান্ত আলোচনায় ২৫টি স্বল্পোন্নত দেশ অংশগ্রহণ করছে। এসব আলোচনায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ করা সমীচীন হবে। তাহলে রুলস নির্ধারণে ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাংলাদেশ প্রভাব রাখতে পারবে এবং উন্নয়নশীল দেশ সমূহের স্বার্থরক্ষায় অবদান রাখতে পারবে।

স্বল্পোন্নত দেশসমূহের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিভিন্ন আলোচনায় ধারাবাহিতভাবে উদ্যোগী ও অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। আগামীতে এ ভূমিকা অব্যাহত রাখতে হবে, একই সাথে উত্তরণকালীন স্বল্পোন্নত দেশ ও উন্নয়নশীল দেশসমূহের স্বার্থও বিবেচনায় রাখতে হবে। বাংলাদেশ সরকার টেকসই উত্তরণের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতায় উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করেছে, যার অধীনে সাতটি উপ-কমিটি কাজ করে যাচ্ছে। ‘স্মুথ গ্রেজুয়েশন’ এর লক্ষ্যে এসব সাব-কমিটি অনেকগুলি সুনির্দিষ্ট পরামর্শও প্রণয়ন করেছে। লক্ষ্য ও সময় নির্দিষ্টভাবে এগুলি বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সাথে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অধীনে উন্নয়নশীল সদস্য দেশসমূহকে যেসব বিশেষ ও বিভাজিত (স্পেশাল অ্যান্ড ডিফারেনসিয়াল) সুবিধা দেওয়া হয়েছে এবং উত্তরণশীল স্বল্পোন্নত দেশসমূহের ক্ষেত্রে যেসব বিদ্যমান সুবিধা আছে (যেমন টেকনোলজি ব্যাংক এবং বাণিজ্যের জন্য সহায়তা ফান্ড থেকে উত্তরণ-পরবর্তী আরো পাঁচ বছরের জন্য সহায়তা প্রাপ্তি, এল. ডি. সি. ক্লাইমেট ফান্ড, লিগ্যাল সাপোর্ট) সেগুলিরও সুযোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশের জন্যও টেকসই এল. ডি. সি. উত্তরণ-কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি মূল করণীয় হতে হবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার এম. সি. ১৩ পরবর্তী আলোচনার প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন ইস্যুতে নিজস্ব অবস্থান নির্ধারণ, এসব আলোচনার অভিঘাত বিচার-বিশ্লেষণ ও তার প্রেক্ষিতে কৌশল নির্ধারণ। স্বল্পোন্নত দেশের গ্রুপ থেকে উত্তরণের পূর্বে কেমেরুনে ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিতব্য এম. সি. ১৪-ই হবে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের শেষ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক। এসবের প্রেক্ষিতে এম. সি. ১৩ এর পরবর্তীতে জেনেভায় পরিচালিত বিভিন্ন আলোচনায় বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।

লেখক: সম্মানীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

;

সময়ের পরিক্রমায় পহেলা বৈশাখ

  ‘এসো হে বৈশাখ’



সায়েম খান
সময়ের পরিক্রমায় পহেলা বৈশাখ

সময়ের পরিক্রমায় পহেলা বৈশাখ

  • Font increase
  • Font Decrease

সপ্তম শতাব্দীতে গৌড় সাম্রাজ্যের সার্বভৌম নৃপতি ও বাংলা অঞ্চলে একীভূত রাষ্ট্রের প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজা ছিলেন রাজা শশাঙ্ক। রাজা শশাঙ্ক ছিলেন বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার ভূবনেশ্বর পর্যন্ত একচ্ছত্র অধিপতি। তাকে অনেক ইতিহাসবিদ 'গৌড়াধিপতি'ও বলে থাকেন। আজ থেকে একহাজার ৪শ বছর আগে রাজা শশাঙ্কের শাষণামলে তার রাজ্যাভিষেককে স্মরণীয় করে রাখতে সৌরপঞ্জিকার ভিত্তিতে তিনি বঙ্গাব্দের সূচনা করেন। বঙ্গাব্দের প্রথম দিনে এই রাজ্যাভিষেককে ঘিরে নানা উৎসব ও আয়োজনের মাধ্যমে প্রজাদের নিয়ে এই দিনটি উদযাপন করতেন বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজা শশাঙ্ক। এজন্য বাংলা নববর্ষের ১২ মাসের নাম নক্ষত্রের নামানুসারে রাখা হয়। 'বিশাখা' নক্ষত্র থেকে বৈশাখ, 'জায়ীস্থা' থেকে জ্যৈষ্ঠ, 'শার' থেকে আষাঢ়, 'শ্রাবণী' থেকে শ্রাবণ, 'ভদ্রপদ' থেকে ভাদ্র, 'আশ্বায়িনী' থেকে আশ্বিন, 'কার্তিকা' থেকে কার্তিক, 'আগ্রায়হণ' থেকে অগ্রহায়ণ, 'পউস্যা' থেকে পৌষ, 'ফাল্গুনী' থেকে ফাল্গুন এবং 'চিত্রা' নক্ষত্র থেকে চৈত্র, এমন করেই নক্ষত্রের নামে মাসের নামকরণ হয়।

কালের বিবর্তনে সেই বঙ্গাব্দ হয়ে যায় ইতিহাস। ষোড়শ শতাব্দীতে ভারতবর্ষে শুরু হয় মোগলদের শাসনামল। মোগলদের শাসনামলে চন্দ্রপঞ্জিকার ভিত্তিতে আরবি মাস গণনার মাধ্যমে "তারিখ-এ-এলাহী" হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রচলন ঘটানো হয়। "তারিখ-এ-এলাহীর" ১২ মাসের নাম ছিল 'কার্বাদিন', 'আর্দি', 'বিসুয়া', 'কোর্দাদ', 'তীর', 'আমার্দাদ', 'শাহরিয়ার', 'আবান', 'আজুর', 'বাহাম' ও 'ইস্কান্দার মিজ'।

মাসের এই শব্দগুলো আসলে আরবি ও ফার্সি শব্দ থেকে উদ্ভুত। কিন্তু মোগলদের ও প্রজাদের সমস্যা তৈরি হয় কর আদায়ের ক্ষেত্রে। মোগলদের শাসন ব্যবস্থায় প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তৎকালীন ভারতবর্ষের ভূমি ও কৃষি কর আদায়ের ক্ষেত্রে চন্দ্রবর্ষ বা 'হিজরি' সালকে অনুসরণ করা হতো। কৃষকেরা চাষাবাদ করতেন সৌরবর্ষের ভিত্তিতে আর মোগলদের শাসন ব্যবস্থা ভূমি ও কৃষিকর আদায় করতেন চন্দ্রবর্ষের ভিত্তিতে।

চন্দ্রবর্ষ অনুসরণ করলে কর আদায়ের সময় কৃষকদের কাছ থেকে কর আদায় করা যেতো না। কারণ, হিজরি বর্ষের শুরুতে প্রজা সাধারণের কাছে অর্থের অভাব থাকতো। কিন্তু কৃষকেরা নবান্নে ফসল ঘরে তোলার পর বঙ্গাব্দের শুরুতে তাদের কাছে অর্থের জোগান থাকে। সেই ক্ষেত্রে তারা ন্যায্য কর প্রদানে বাধাগ্রস্ত হয় না। এহেন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সম্রাট আকবরের দরবারে ডাক পড়ে মোগল সাম্রাজ্যের সেই সময়কার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজি'র।

সম্রাটের আদেশে তাকে এই সমস্যার সমাধান করতে বলা হয়। ফতেহউল্লাহ সিরাজি তখন সৌরবর্ষ (বঙ্গাব্দ) ও হিজরি বর্ষকে একীভূত করে বাংলা সনের নিয়ম তৈরি করেন। ফসল কাটা ও খাজনা আদায়ের জন্য এই বছরের নাম দেওয়া হয়েছিল ফসলি সন। পরে তা বঙ্গাব্দ থেকে বাংলা সন করা হয়। বাংলা সনের শুরুর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখের দিনে জনসাধারণ কর প্রদান করতে আসতেন রাজ দরবারে। সম্রাট আকবরের পক্ষ থেকে তাদের মিষ্টি বিতরণ করা হতো ও প্রজাদের চিত্ত বিনোদনের জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো।

মোগল সম্রাট আকবরের প্রজাকর আদায়ের এই দিবস সময়ের পরিক্রমায় বাংলা সনের প্রথম দিন 'পহেলা বৈশাখ' হিসেবে রূপান্তরিত হয় বাঙালি সভ্যতার ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে। বাঙালির রন্ধ্রে রন্ধ্রে জাগরিত হয় এই উৎসব। বাংলা বর্ষবরণের এই মহোৎসব উদযাপিত হয়, গোটা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে। যদিও পহেলা বৈশাখ পালন নিয়ে এখনও কিছু বিভেদ আমরা লক্ষ করি। হিন্দু সম্প্রদায়ের তিথি পঞ্জিকা অনুসারে, পহেলা বৈশাখ পশ্চিমবঙ্গে পালিত হয় ১৫ এপ্রিল। আর বাংলাদেশে বাংলা একাডেমির নির্দেশনা অনুযায়ী, গ্রেগরিয় পঞ্জিকা অনুসারে পহেলা বৈশাখ পালিত হয় ১৪ এপ্রিল।

পহেলা বৈশাখ মূল: প্রাচীন হিন্দু নববর্ষ উৎসবের সাথে সম্পর্কযুক্ত যা সনাতন ধর্মের বিক্রমী দিনপঞ্জির সাথে মিল আছে। খ্রিস্টপূর্ব ৫৭ অব্দে রাজা বিক্রমাদিত্য বাংলা দিনপঞ্জির আবির্ভাব করেন বলে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন। যদিও বিক্রমাদিত্যের বাংলা দিনপঞ্জির আবির্ভাব নিয়ে অনেক ইতিহাসবিদ দ্বিমত পোষণ করেন।

প্রাচীনকাল থেকে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের মাঝে বাংলা নববর্ষ পালনের রীতি পরিলক্ষিত হয়। ভারতের আসাম রাজ্যে অসমীয়রা "রঙালি বিহু "উৎসবে মেতে ওঠেন বর্ষবরণের শুরুর এই দিনে। 'বিহু' অসমীয়দের ফসল কেটে ঘরে তোলার পর আনন্দে মেতে ওঠার একটি উৎসব যা বাংলা নববর্ষেরই অনুরূপ। ঠিক তেমনইভাবে ভারতের শিখধর্মের লোকেরাও "বৈশাখী" নামে পহেলা বৈশাখের দিনে উৎসব উদযাপন করেন। একইভাবে থাইল্যান্ডেও "ফ্যাসটিভাল অব ওয়াটার" বা পানি উৎসব নামে বর্ষবরণ উদযাপিত হয়, যাকে থাই ভাষায় বলা হয়ে থাকে 'সংক্রান'। পানি উৎসব দিয়ে বছর শুরুর দিনটি উদযাপনের চিত্র আমরা দেখতে পাই, আমাদের দেশের কিছু প্রাচীন নৃ-গোষ্ঠীর সম্প্রদায়ের মাঝে।

আধুনিককালে পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়, ১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে পূজা অর্চনার মাধ্যমে। একবিংশ শতাব্দীতে নববর্ষ উদযাপনে আমরা দেখতে পাই, এক বাণিজ্যিক ধারার রূপ। বহু প্রাচীন এই উৎসবের ধারায় নেই আগের মতো কোনো স্বকীয়তা। কর্পোরেট কালচার ও পুঁজিবাদের চাপে জৌলুসময় পহেলা বৈশাখ যেন ব্যবসায়িক ফায়দার একটি পন্থা বৈ আর কিছুই নয়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে একত্রে মিলে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মাধ্যমে নতুন দিনের ও নতুন বছরের সূচনা হোক এক সুখময় আবেশে।

সায়েম খান, লেখক ও কলামিস্ট

;