ইলিশ আহরণে দরকার ‘অভিন্ন সময়' নিষেধাজ্ঞা



প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
ছবি: সংগৃহীত, প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম

ছবি: সংগৃহীত, প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম

  • Font increase
  • Font Decrease

ইলিশ ভ্রমণপিয়াসী মৌসুমি মাছ। প্রজনন মৌসুমে এরা সমুদ্র থেকে বড় নদী, ছোট নদী সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।

খরস্রোতা মিঠাপানির সন্ধান পেলে হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে হাওর-বিল পেরিয়ে বর্ষাকালে উত্তরের পাহাড়ের কোল পর্যন্ত গিয়ে ডিম ছেড়ে ফের সমুদ্রের দিকে ফিরে আসে। তবে মিঠাপানিতে ডিম ছাড়তে আসার সময় ও সমুদ্রে ফেরার পথে মৎস্য শিকারীদের হাতে ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়ে।

উন্মুক্ত পানির মাছ বৈদেশিক জলসীমা মানতে জানে না। ইলিশমাছ এদিক দিয়ে আরো বেশি বেপরোয়া। তারা একদেশ থেকে আরেক দেশের জলসীমায় অবাধে বিচরণ করতে থাকার সময় দেশে দেশে জেলেদের জালে বন্দি হয়ে যায়। ইলিশ তার অতুলনীয় স্বাদ ও সুঘ্রাণের জন্য মানুষের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে। সে কারণে বিভিন্ন দেশে এদের কদর খুব বেশি এবং মূল্যও অনেক বেশি।

আমাদের দেশে জাতীয় মাছের মর্যাদা লাভ করেছে রূপালি ইলিশ। কিন্তু নির্বিচারে সারাবছর ইলিশ শিকার করায় এই জীববৈচিত্র্য টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে। তাই, জাতীয় মাছ ইলিশকে রক্ষা ও এর বংশবিস্তার করে টিকিয়ে রাখার তাগিদে এর আহরণে সময়সীমা বেঁধে দিয়ে বিশেষ নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে।

অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ইলিশ আহরণের নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রাখতে সরকারের মৎস্য বিভাগ হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে আমাদের দরিদ্র জেলেদের প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়গলোতে বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় তাদের পরিবারসহ বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা না মানায় মানুষকে সচেতন করার অংশ হিসেবে মোটিভেশন কর্মসূচি চালানো হচ্ছে। এতকিছুর পরেও চুরি করে মৎস্য আহরণ ঠেকানোর জন্য নৌপুলিশ নিয়োগ করা হয়েছে। শাস্তি হিসেবে জাল পুড়িয়ে দেওয়া ও জেল-জরিমানার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

কিন্তু বাংলাদেশে ইলিশ আহরণের নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রাখতে যা করা হচ্ছে, তাতে তেমন কোনো সুফল নেই। ইলিশ বৈদেশিক জলসীমা মানতে জানে না। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর জেলেরা ইলিশ আহরণে আমাদের দেশের নিষেধাজ্ঞা মানবেন কেন! তারা গোপনে আমাদের জলসীমায় ঢুকে নির্দ্বিধায় ইলিশ শিকার করে নিয়ে যায়।

ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, চীন তাদের দৈত্যাকার বিশাল ফিশিংবোট দিয়ে দিনরাত সমুদ্র থেকে ইলিশসহ নানান মৎস্য আহরণ করে থাকে। আমরা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মাছের পোনা না ধরে বড় করি আর বিদেশিরা সেগুলো তাদের জলসীমায় ঢুকে গেয়ে ছেঁকে ধরে নিয়ে যায়!

বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের ইলিশ আহরণের ‘নিজস্ব সময় নিষেধাজ্ঞা’ রয়েছে। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞার সময়সূচি আমাদের দেশের সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইলিশ ধরার জন্য প্রতিবেশী মিয়ানমারের কোনো নিজস্ব ‘সময় নিষেধাজ্ঞা’ নেই।

এবছর (২০২৪) বাংলাদেশে ২০ মে থেকে ৬৫ দিনের সরকারি ‘সময় নিষেধাজ্ঞা’ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভারতের ইলিশ আহরণের ‘নিজস্ব সময় নিষেধাজ্ঞা’র সঙ্গে বাংলাদেশের সময়ের হেরফের রয়েছে। ভারতের জেলেরা বাংলাদেশের ইলিশ আহরণের ‘সময় নিষেধাজ্ঞা’ শেষ হওয়ার ৩৭ দিন আগেই নদী-সমুদ্রে মাছ ধরতে নেমে গেছেন। এতে তাদের জেলেদের সুবিধা বেড়েছে।

মিয়ানমারের জেলেরা যে কোনো সময় এবং ভারতীয় জেলেরা ৩৭ দিন আগে জলসীমায় ঢুকে ট্রলার ভর্তি করে মাছ ধরে নিয়ে যাওয়ার পর আমাদের জেলেরা যখন নদী-সমুদ্রে নামেন তখন সেখানে মাছশূন্য। আমাদের জেলেরা ট্রলারের তেল পুড়িয়ে, সময় নষ্ট করে রিক্ত হাতে ঘাটে ফিরে আসেন।

খালি ট্রলার নিয়ে শূন্যহাতে ঘাটে ফিরে এলে তাদের ঋণের টাকা শোধ হবে কীভাবে! আমাদের জেলেদের ৬৫ দিনের খাবার খরচের ভর্তূকি দেওয়ার উপকারিতা কীভাবে যাচাই করা হবে! দেশি জেলেদের পেটের দায় ও বিদেশি জেলেদের চুরি করে মাছ আহরণ ঠেকানোর প্রবণতা দমন করার উপায় কী!

আমাদের জলসীমা পাহারা দেওয়ার মতো এত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। যদিও কিছু ব্যবস্থা যা নেওয়া হয়েছে, সেটা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের স্থানীয় জেলে ও অধিবাসীদের বিস্তর অভিযোগ শোনা যায়। কারণ, তারা নাকি বিদেশি ট্রলারকে অর্থের বিনিময়ে মাছ ধরার সুযোগ করে দেন। বাংলাদেশের ইলিশ আহরণের নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন অনেক সময় আমাদের কিছু অসাধু ট্রলার মাছ ধরে গভীর সমুদ্রে বিদেশে গিয়ে পাচার করে শূন্যহাতে ঘাটে ফিরে আসে। দেশের বাজারে ইলিশ ক্রয়-বিক্রি নিষেধ থাকায় তারা এধরনের দুর্নীতির আশ্রয় নিতে দ্বিধা করেন না।

এভাবে সবদিক দিয়ে অন্ধকার আর বিপদ! শুধু ধ্বংস হয় ইলিশ! আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজার ইলিশশূন্য হলেও আমাদের ইলিশ বিদেশের বাজারে সারাবছর দেদারসে কেনা-বেচা হয় এবং হচ্ছেও।

আমরা এবছর যখন ৬৫ দিনের নিষোধাজ্ঞায় পড়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে ইলিশ কেনা-বেচা এবং খাওয়া থেকে বিরত থাকছি, তখন বিদেশের বাজারে বাংলাদেশি ইলিশ অনেক কমমূল্যে বিকিকিনি করতে দেখা যাচ্ছে।

কোলকাতার গড়িয়াহাট, মানিকতলা, যদুবাবুর বাজার কিংবা ইয়াঙ্গুনের সুয়াতি বড় বাজার ছাড়াও লন্ডনের ব্রিকলেনের বাংলাবাজার, নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের বাঙালি পাড়ার মাছের দোকানে, টোকিওর নিহোমবাসী, তোয়সু-র বাঙালি দোকান ছাড়াও ‘তাক্কিওবিনে’ অর্ডারের মাধ্যমে সবসময় বাংলাদেশি ইলিশমাছ কেনা যায়।

এসব ইলিশমাছের বেশিরভাগ অংশ যোগসাজশের মাধ্যমে গোপনে সমুদ্র থেকে ধরার পর অবৈধপথে বিদেশের বাজারে চালান হয়ে যায়। তারা সরকারকে ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে ইলিশ চোরাচালান করে। বিদেশি বাজারে ডিমওয়ালা বাংলাদেশি ইলিশ মাছের চাহিদা অনেক বেশি। এসব ডিমওয়ালা ইলিশ আমাদের দেশে ইলিশ আহরণের নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন গোপনে ধরা হয়ে থাকে। এধরনের চুরি সাধারণ নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ঠেকানো কঠিন। নদীর মোহনা ও গভীর সাগর সব জায়গায় পাহারা বসানোর মতো সক্ষমতা ও নৈতিকতা কী আমাদের আছে!

বাংলাদেশি ডিমওয়ালা ইলিশ যদি বিদেশের বাজারে সারাবছর বিক্রি করা চলে, খাওয়া চলে, তাহলে আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে ৬৫ দিনের এত কৃচ্ছতা সাধনের দরকার কী!

আরেকটি বিষয় হলো, গ্রামের সাধারণ মানুষ নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে জানার আগেই বিত্তশালীরা অভ্যন্তরীণ বাজারের ছোট ইলিশটিও বেশিদামে কিনে নিয়ে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখেন নিজেদের রসনা বিলাসের জন্য। এতে দেশের কিছু বড় বড় শহর ছাড়া সারা দেশের মানুষ মৌসুমের সময়ও বাজারে ইলিশমাছের আগমণ দেখতে ভুলে গেছে।

এছাড়া ইলিশ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চালিয়ে পুকুরে ইলিশ চাষ করার মতো চমকপ্রদ কথা শোনা গেলেও সেটার ফলাফল সুদূর পরাহত বলে মনে হচ্ছে।

প্রকৃতির নিয়মে বৃষ্টিপাতের সময় পরিবর্তিত হয়েছে। জলবায়ু আগের মতো আচরণ করছে না। ইলিশের ডিম ছাড়ার মৌসুম পরিবর্তিত হয়েছে। এবছর বন্যা, খরা, অনাবৃষ্টি, সমুদ্রঝড়, দীর্ঘ তাপপ্রবাহ ইত্যাদির ফলে ইলিশের গবেষণা ক্ষেত্রে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে।

আমাদের দেশে ইলিশ আহরণের নিষেধাজ্ঞার সময় বিদেশি ট্রলারের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইলিশ ধরে নিয়ে যাওয়ার কথা সংবাদমাধ্যমে বেশ ঘটা করে প্রচারিত হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো বিকার লক্ষ করা যায়নি। তাই তো এবছর নীতি মেনেও মৌসুমের সময় বাজারে পর্যাপ্ত ইলিশ মেলেনি।

অন্যদিকে, প্রকৃতিক মৎস্য আহরণে দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞায় ঋণগ্রস্ত জেলে পরিবারের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর সুযোগ হারিয়ে গেছে। কারণ, তাদের জন্য বরাদ্দ নিতান্তই অপ্রতুল বলে প্রতিবাদ করতে দেখা যায়। এসময় তাদের কোনো কাজ না থাকায় তারা ঘরে বসে বসে অলস সময় কাটান। তাদের জন্য মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা সময়সীমা কমিয়ে আনার দাবি উঠেছে।

পাশাপাশি কমপক্ষে ভারতের সময়সূচির সঙ্গে মিল রেখে মাছ ধরার ‘নিষেধাজ্ঞা সময়সীমা’ একই সময়মতো করার কথা উঠেছে। এজন্য আমাদের ইলিশবিষয়ক মৎস্যনীতিতে আশু পরিবর্তন আনা দরকার।

ইলিশের প্রজনন ও আহরণে মৌসুমের পরিবর্তনের দিকে খেয়াল রেখে একই সময়ে সর্বদেশীয় বা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা জারি ও সময়মতো তুলে নেওয়ার বিষয়টি খুবই জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। সেইসঙ্গে সমুদ্র থেকে গোপনে ইলিশ আহরণ, বৈদেশিক জেলেদের চুরি ঠেকানো, সমুদ্র থেকে চোরাই পথে বিদেশে ইলিশ পাচার ইত্যাদি বিষয়কে অবহেলার চোখে দেখার আর কোনো সুযোগ নেই।

এছাড়া দেশের সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করে বিদেশে ইলিশ রফতানি করাটাও খুবই অমানবিক কাজ বলে মনে হয়। কারণ, দেশের সিংহভাগ মানুষ ইলিশের স্বাদ ভুলেই গেছেন। ধনীরা বিদেশের অভিজাত রেস্টুরেন্টে গিয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করে হলেও চোরাই ইলিশের স্বাদ নিতে চেষ্টা করেন। এসব বিষয় আজকাল চরম বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। তাই, ইলিশ আহরণে সর্বদেশীয় ‘একক’ বা ‘অভিন্ন সময় নিষেধাজ্ঞা’ বলবৎ করার পাশাপাশি অবৈধভাবে ইলিশ পাচার রোধে অতি কঠোর হওয়া দরকার।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন। E-mail: [email protected]

কোটা আন্দোলন: চেতনার থেকে চেতনা-নাশকের প্রভাব অধিক হবার ফল



অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান, লেখক ও গবেষক
ছবি: অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান

ছবি: অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

গত কয়েকদিন ধরে আমার পরিচিত সুধীমহল ক্রমাগত আমাকে অনুরোধ করে যাচ্ছে, আমি যেন কোটা এবং কোটা আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে একটা লেখা প্রকাশ করি। কোটা এখন ‘টক অব দ্যা কান্ট্রি’, এমন একটা আলোচ্য বিষয় নিয়ে কেনইবা লিখছি না, সেটাও তাদের উৎসুক প্রশ্ন। এ বিষয়ে যদিও আমি একটা দায়সারা গোছের লেখা প্রকাশ করেছি কিন্তু সেটা নাকি আমার মানের হয়নি এবং তাদের মনও ভরেনি। তাদের মতে- আমার লেখা মানেই প্রথাবিরোধী, ব্যতিক্রমী, যৌক্তিক এবং তথ্যবহুল- সুতরাং এ বিষয় নিয়ে আমাকে লিখতেই হবে। আমি আমার সুহৃদদের কাছে করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে বলছি- কোটা এবং কোটা আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে আমি লিখব না। এই কঠিন সময়ে বরং আসেন হালকা টপিক, কবিতা নিয়ে আলাপ করি।

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ও সুরারোপিত ‘সন্ধ্যা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘নতুনের গান’ নামক দাদরা তালের গানটি, বাংলা ১৩৩৫ সনে শিখা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এই সংগীতটিকে ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে বাংলাদেশের রণ-সংগীত হিসেবে নির্বাচন করা হয়। বাংলাদেশের যে-কোনো সামরিক অনুষ্ঠানে গানটির ২১ লাইন যন্ত্রসংগীতে বাজানো হয়। ২০০৬ সালে বিবিসি বাংলার জরিপে গানটি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বিশটি বাংলা গানের মধ্যে ১৮তম স্থান অধিকার করে। পুরো গানটিই তরুণদের উদ্দেশ্যে, তারুণ্যের অপরিমেয় শক্তিকে আহ্বান করে লেখা। আমি মাত্র কয়টি লাইন নিয়ে লিখব।

চলরে নও-জোয়ান,
শোনরে পাতিয়া কান-
মৃত্যু-তোরণ-দুয়ারে-দুয়ারে
জীবনের আহ্বান।
ভাঙরে ভাঙ আগল,
চলরে চলরে চল।
চল চল চল।

ব্রিটিশ শাসিত পরাধীন ভারতবর্ষের প্রতিটি ক্ষেত্র ছিল মৃত্যুফাঁদ, যে দরোজা দিয়ে, যে সেক্টরের, যেখানেই প্রবেশ করা হোক-না-কেন, সেটাই ছিল প্রাণনাশী দরজা অর্থাৎ মৃত্যু-তোরণ। ওই মৃত্যু-তোরণকে পরিবর্তন করে জীবনের আহ্বান জানানো তোরণে পরিণত করে, সমস্ত অন্যায্য বাধাবিপত্তি বা আগলকে ভেঙেচুরে দুমড়ে-মুচড়ে দৃঢ় প্রত্যয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার জন্য কবি তারুণ্যকে উদ্দীপ্তভাবে উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। যেহেতু এটিকে জাতীয় রণ-সংগীত করা হয়েছে সুতরাং এই গানে যে আহ্বান জানানো হয়েছে বাঙালি জাতি তা বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর ও অঙ্গীকারবদ্ধ বলেই করা হয়েছে। অর্থাৎ জাতি হিসেবে আমরা কবির এই আহ্বানের সাথে সম্পূর্ণ একমত।

দুই. ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের ইংরেজি ডিসেম্বর মাস অনুযায়ী বাংলা ১৩২৮ সালের অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে কবি কাজী নজরুল ইসলাম মাত্র ২২ বৎসর ৬ মাস বয়সে আড্ডার ফাঁকে একটুখানি সময়ের মধ্যে ‘ভাঙার গান’ শিরোনামে ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ কবিতাটি গানের সুরে রচনা করেন। 'ভাঙার গান' শিরোনামেই কবিতাটি 'বাঙ্গলার কথা' পত্রিকার ২০ জানুয়ারি ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দ অনুযায়ী বাংলা পৌষ-মাঘ ১৩২৮ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়। কবিতা হলেও এটি ছিল মূলত একটি বিদ্রোহাত্মক গান।

১৯২৪ সালের আগস্ট মাস অনুযায়ী বাংলা ১৩৩১ সালে ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকার আষাঢ়-শ্রাবণ সংখ্যায় কবিতাটির সাথে আরও ১০টি কবিতা যোগ করে মোট ১১টি কবিতা নিয়ে ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের দুই মাস পর ১১ নভেম্বর ১৯২৪ তারিখে তৎকালীন ব্রিটিশ-ভারত শাসনাধীন বঙ্গীয় সরকার গ্রন্থটি বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ করে। ব্রিটিশ সরকার আর কখনো এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেনি। ফলে পরাধীন ব্রিটিশ-ভারতে গ্রন্থটি আর প্রকাশিত হতে পারেনি। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর ১৯৪৯ সালে স্বাধীন ভারতে ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। আমি এখানে কবিতাটির কয়েকটি লাইন আলোচনা করছি।

ওরে ও তরুণ ঈশান!
বাজা তোর প্রলয় বিষাণ!
ধ্বংস নিশান
উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদী।

ঈশান শব্দের অর্থ শিব, মহাদেব, মহেশ্বর। এর আরেকটা অর্থ উত্তরপূর্ব কোণ। হিন্দুমতে শিব প্রলয়ের দেবতা এবং ধ্বংসের রাজা বা নটরাজ। এখানে কবি ‘তরুণ ঈশান’ বলতে শিবশক্তির প্রলয়ের সাথে তুলনীয় পরাধীন ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামী তরুণ বীর সন্তান ও বিপ্লবীদের বুঝিয়েছেন। ‘প্রলয়’ অর্থ ধ্বংস, ‘বিষাণ’ শব্দের অর্থ শিঙা। ইসলামি মতে ইসরাফিল শিঙায় ফু দিলে পৃথিবীর প্রলয় বা ধ্বংস শুরু হবে। কবি পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতাকামী তরুণ বীর সন্তানদেরকে তাদের ‘প্রলয় বিষাণ’ বাজানোর আহ্বান জানিয়ে সকল অন্যায়-অনাচার, পরাধীনতার শৃঙ্খলকে ভেঙেচুরে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন।

‘নিশান’ মানে পতাকা,‘ধ্বংস নিশান’ মানে যে পতাকা ধ্বংসের প্রতীক, ধ্বংসের নির্দেশনা দেয়। ‘প্রাচীর’ অর্থ দেওয়াল, ‘ভেদী’ মানে ভেদ করা বা ভেঙে-ফুড়ে বেরিয়ে আসা। কবি স্বাধীনতাকামী তরুণ বীর সন্তানদেরকে এমনভাবে ‘ধ্বংস নিশান’ বা ধ্বংসের পতাকা ওড়াতে বলেছেন যেন তা স্বাধীনতাকামী সূর্যসন্তানদেরকে যে বদ্ধ কারাগারে আটক রেখেছে, সে কারাগারের পরাধীনতার প্রাচীর ভেদ করে মাথা উঁচু করে বেরিয়ে আসে। সে পতাকা দেখে যেন সমগ্র পরাধীন ভারতবাসী মুক্ত-স্বাধীন হবার লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ হয়।

মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সাহস যোগাতে, দেশবাসীর মনোবলকে চাঙ্গা রাখতে স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে অসংখ্যবার এই গানটি বাজানো হয়েছে। আমাদের জাতীয় ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলিতে গানটির কদর আজো আকাশছোঁয়া। গানটির মর্মবাণী আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার এবং সর্বকালের জন্য প্রযোজ্য।

তিন. ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের কাব্যগ্রন্থ ‘বলাকা’। এই কাব্যগ্রন্থের উল্লেখযোগ্য কবিতাগুলির মধ্যে একটি হলো ‘সবুজের অভিযান’। কবিতাটি একসময়ে স্কুলের টেক্সটবুকে ছিল। এখনকার অতিপ্রত্যাশি, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যহীন, হাইব্রিড, কাউয়া কারিকুলামে আছে কিনা জানি না। কারিকুলামে থাকা মনেই হলো, আমরা আমাদের শিশুদেরকে যেভাবে মানুষ করতে চাই, তাদেরকে যেভাবে দেখতে চাই, সেই ধরনের কন্টেন্ট ওই কবিতাটিতে আছে। আমি ‘সবুজের অভিযান’ কবিতার কয়েকটি লাইন আলোচনা করছি।

ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা,
ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ,
আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।

বাহিরপানে তাকায় না যে কেউ,
দেখে না যে বাণ ডেকেছে
জোয়ার-জলে উঠছে প্রবল ঢেউ।

চলতে ওরা চায় না মাটির ছেলে
মাটির 'পরে চরণ ফেলে ফেলে,
আছে অচল আসনখানা মেলে
যে যার আপন উচ্চ বাঁশের মাচায়,
আয় অশান্ত, আয় রে আমার কাঁচা।

কবিতাটি, বয়সে অগ্রগামী কিন্তু প্রাচীনপন্থী জড়-চিন্তার মানুষদের কঠিন সমালোচনা করেছে এবং তরুণ প্রজন্মকে উদ্দীপ্ত হবার গুরুত্বপূর্ণ আস্থা দিয়েছে। প্রাচীনপন্থী জড়-চিন্তার সুবিধাভোগী মানুষদেরকে কবি বলছেন ‘আধমরা’ এবং তাদেরকে ঘা মেরে বাঁচানোর জন্য তরুণ প্রজন্মকে আহ্বান জানিয়েছেন। এর পরেই কবি সুবিধার মোড়কে মোড়ানো ওই আধমরাদের উদ্দেশ্যে বলছেন- ওরা বাহিরপানে তাকায় না, অর্থাৎ পৃথিবী যে এগিয়ে যাচ্ছে সেদিকে এদের খেয়াল নাই। পরিবর্তিত পৃথিবীর যুতসই পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে নেবার যোগ্যতাও এদের নাই।

ওরা মাটির ছেলে অর্থাৎ দেশের জলবায়ু, কৃষ্টি-সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে উঠলেও, মুখে মুখে দেশ-জাতির মূল্যবোধের বুলি ছড়ালেও ওরা এগুলো কেয়ার করে না। এরা উচ্চ বাঁশের মাচায় এক অচল আসনে বসে আছে, অর্থাৎ সাধারণ মানুষের আয়ত্তের বাইরে এক অধরা, সুনিশ্চিত, সুরক্ষিত অবস্থান দখল করে এরা সুখের ঢেকুর তুলে জীবনযাপন করছে। এরা আত্মমগ্ন, দুনিয়ার কোনোদিকে এদের খেয়াল নাই। বড়ো বড়ো বুলি আওড়ানো ছাড়া কোনোকিছুর প্রতি এদের কোনো দায়বোধ নাই। অশান্ত, কাঁচা, তরুণ প্রজন্মকে কবি আহ্বান করছেন তারা যেন তাদের তারুণ্যের দীপ্ত দিয়ে এই অযোগ্য, অপদার্থ, আধমরাদের উৎখাত করে সুন্দর পৃথিবী গড়তে ব্রতী হয়।

চার. সারাবিশ্বের তরুণ সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে, তারা তাদের মেধার প্রতিফলন ঘটিয়ে তাদের দেশকে পাল্টে দিচ্ছে। তাদের দেশ তাদের মেধা বিকাশের সেই সুযোগ দিয়েছে। তাদের দেশের রাষ্ট্র পরিকল্পনা, তাদের মেধা বিকাশের জন্য সহায়ক। তাদের মেধা বিকাশের জন্য জীবনের নির্ভরতা, নিশ্চয়তা, আস্থা সবকিছুর জন্য তাদের দেশ তাদেরকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। শুধু তাদের জন্যই নয়, আমাদের দেশের মেধাবীরাও দেশে মেধার যথাযথ প্রয়োগ ও কাঙ্ক্ষিত সম্মান ও সম্মানী না পেয়ে ওইসব দেশে চলে যাচ্ছে এবং মেধার বিনিময়ে সেই পরবাসে থেকে যাচ্ছে। নিজের দেশের চেয়ে সে দেশে তারা বেশি মূল্যায়িত হচ্ছে।

স্বাধীনতার ৫৩ বছর পেরিয়ে গেছে, আমরা আমাদের শিক্ষিত তরুণ সমাজের ভবিষ্যৎ প্রতিষ্ঠার জন্য কী নিশ্চয়তা দিতে পেরেছি? তার মন-মানসিকতার বিকাশ ঘটিয়ে মন প্রশস্ত করতে কী উদাহরণ সামনে রেখেছি? প্রতিদিন মিডিয়াতে সে কী দেখছে, যাতে আত্মবিশ্বাসী হয়ে দেশের প্রতি তার কমিটমেন্ট বাড়বে? রাস্তা-ঘাট, অফিস-আদালত, আলয়-আগার কোথায় গেলে সে প্রমিত ও অনুকরণীয় চর্চা দেখছে যা তাকে আস্থা দেবে, তাকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে? শুধু এই দেশে জন্মেছে বলে? এই দেশের আলো-ছায়া-মাটিতে বড়ো হয়েছে বলে? তাহলে এই দেশের জড়পদার্থের সাথেই তার আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হবে, মানুষের সাথে নয়।

যে তরুণ আজ প্রশস্ত মনের অধিকারী হবে, শিক্ষা-গবেষণা, উন্নয়নের নতুন নতুন দিক উন্মোচনের চিন্তা করবে- সেই তরুণটিকে কেন আজ সামান্য একটা চাকরির নিশ্চয়তার জন্য আন্দোলন করতে হবে? কেন তাকে রাস্তা বন্ধ করে তার মূল্যবান সময় নষ্ট করতে হবে? পৃথিবীর সব চিন্তা ভুলে, দেশ, সমাজ, জাতি বাদ দিয়ে কেন তার ধ্যান, জ্ঞান, চিন্তা সবকিছু আজ একটা চাকরিকেন্দ্রিক হবে? তরুণদের কথা না হয় বাদই দিলাম, এই তরুণদের অভিভাবকদেরকে এই দেশ তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎকে নির্ভয় করতে কতটুকু অভয় দিচ্ছে? অভিভাবকরা কতটুকু আস্থা ও নির্ভরতার যায়গায় আছে?

যদি বলেন, এই তরুণ প্রজন্ম অযোগ্য, অপদার্থ, লোভী, আত্মকেন্দ্রিক, অজ্ঞানী- তাহলে এর বিপরীতে প্রশ্ন আসে, কেন? এতো বড়ো একটা প্রজন্ম কেন এমন হয়ে গেলো? দেশের সার্বিক পরিকল্পনা, কাঠামো ও বাস্তবায়নের কোথায় ভুল ছিল? রাষ্ট্রের কোন ব্যর্থতার কারণে এতো বড়ো প্রজন্মকে আজ দায়-দায়িত্বহীন, অপদার্থ হতে হলো? বিগত ৫৩ বছর ধরে যারা দেশের নেতৃত্ব দিয়েছে, যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে এর জন্য কি তাদের কোনোই দায়ই নাই? এই ব্যর্থতা কি তাদের নয়? মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ বখে গেলে তার দায় হয়তো ব্যক্তির উপরে বর্তায় কিন্তু একটা প্রজন্মের অধিকাংশ তরুণ বখে যাবার দায় তো ব্যক্তির উপরে চাপানোর সুযোগ নাই! এ দায় রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র কোনোভাবেই এ দায় এড়াতে পারে না। ফলে তরুণদের গালি দেবার আগে নিজেদেরকে গালি দিন। ওদের বখে যাবার দায় আপনার।

এতো বড়ো সমস্যার রুট খুঁজে দেখুন, দায়িত্বশীল পদে থেকে ইফেক্ট দেখে ভাসা ভাসা মন্তব্য করে নিজেদের আর সঙ বানাবেন না।

বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন রিপোর্ট ২০২০-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৩৫ থেকে ৩৯ এই ৫টা বিসিএস পরীক্ষায় মোট নিয়োগ পেয়েছে ১৪ হাজার ৮১৩ জন। বছরে গড়ে ৩ হাজার জনেরও কম! প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশে বছরে মাত্র ৩ হাজার! বছরে কতজন তরুণ শিক্ষা সমাপ্ত করে বের হচ্ছে আর কতজনের জন্য কর্মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে? এই তরুণদের সমালোচনা করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করে জানার চেষ্টা করুন, ওদের আশঙ্কা ও অনাস্থার জায়গাটা কোথায়?

আপনি-আমি কর্মঠ, দায়িত্বশীল, বিনয়ের অবতার, ফেরেশতা বা দেবতা ছিলাম আর ওরা সব হয়েছে শয়তান! কেন হয়েছে? আপনি-আমি দেবতা, ও শয়তান- তাহলে আপনি-আমি কী করেছি? আপনার আমার মতো আদর্শ দেবতারাই আজ আবেদ আলী, বেনজীর। আপনার কয় টাকা বেতন আর কেমনে জীবনযাপন করেন তা ওরা বোঝে। আদর্শ দেখে তৈরি হয়, ওরা যা দেখছে তাই শিখছে।

উল্লিখিত ৫টি বিসিএস পরীক্ষায় পিএসসির বিদ্যমান পদ্ধতিতে মেধায় নিয়োগ হবার কথা ৪৪% এবং কোটায় ৫৬%। কিন্তু কোটায় উপযুক্ত প্রার্থী না থাকায় মেধায় নিয়োগ হয়েছে ৬৬.২% এবং কোটায় পেয়েছে ৩৩.৮%। অর্থাৎ কোটা থাকলেই যে সেখানে অযোগ্য প্রার্থী নিয়োগ পেয়ে যাবে বিষয়টা তেমন নয়। কোটায় বিবেচনাকারী পরীক্ষার্থীকেও প্রিলিমিনারি, রিটেন, ভাইবা, মানসিক স্বাস্থ্য, শারীরিক স্বাস্থ্য ইত্যাদি পরীক্ষার ধাপ যোগ্যতাবলে পেরিয়েই কোয়ালিফাই হতে হয়। কারণ, একেবারে সর্বশেষ ধাপে, নিয়োগের আগে গিয়ে তবেই কোটার সুবিধা বিবেচনা করা হয়।

মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০% বরাদ্দ থাকলেও উল্লিখিত ৫টি বিসিএস পরীক্ষায় মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পেয়েছে মোট ১ হাজার ২৯৮ জন, যা বরাদ্দকৃত কোটার মাত্র ৮.৭%। অর্থাৎ উপযুক্ত যোগ্যতা না থাকলে কাউকে কোটার জন্য এমনকি মুক্তিযোদ্ধা কোটার জন্যও বিবেচনা করা হয় না। যারা মনে করছেন মুক্তিযোদ্ধা কোটায় অমেধাবীরা চাকরি পেয়ে যাচ্ছে তারা পুরোপুরি ঠিক ভাবছেন বলে মনে হয় না।

কোটা থাকবে, কোটা থাকার যৌক্তিকতা আছে এবং এ কারণে পৃথিবীর বহু দেশেই কোটা আছে। কিন্তু কোটা হতে হবে যৌক্তিক। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় উল্লিখিত ৫টি বিসিএস-এর গড় ৮.৭%, তাহলে এই কোটায় কেন ৩০% রাখা হয়েছে সেটি আমি জানি না। তবে আমি বিষয়টাকে একটু ভিন্নভাবে দেখি।

দেশের ক্ষমতায় থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দলকে কেন আজ মুক্তিযোদ্ধার কোটা বেশি রেখে মুক্তিযুদ্ধপ্রীতির প্রমাণ দিতে হবে? কেন তাদের এই কোটার বরাদ্দকে জোরেশোরে প্রচার করে দেখানোর প্রয়োজন পড়বে? তারা যদি সত্যিই মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজ করতো তবে তো দেশের এই হতাশাজনক অবস্থা হতো না! একটা চাকরির জন্য আজ এভাবে তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন করার প্রয়োজন পড়তো না। সরকারি চাকরি লোভনীয় হয়ে উঠত না। কোনো ভালো বিকল্প নাই বলে, কোনো ভালো বিকল্প তৈরি করা হয়নি বলে, দেশের মানুষের জীবন আজ ওষ্ঠাগত বলে, অনিয়ম-ঘুষ-দুর্নীতিতে দেশ ছেয়ে গিয়ে সমস্ত জায়গায় আস্থার ভয়াবহ সঙ্কট তৈরি হয়েছে বলে- এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

দেশে কতজন পিকে হালদার, আফজাল হোসেন, লোকমান হোসেন, বনখেকো ওসমান গণি, মোশাররফ হোসেন, বেনজীর, আবেদ আলী, মতিউর প্রমুখ তৈরি করেছেন এবং এর বিপরীতে কতজন প্রখ্যাত গবেষক, বিজ্ঞানী, কবি-লেখক, সাংবাদিক ইত্যাদি তৈরি করেছেন?

যে প্রযুক্তি দিয়ে বর্তমান পৃথিবী চলছে, আমাদের দেশ চলছে তার একটি প্রযুক্তিও আমাদের তৈরি নয়। এই পৃথিবী, এই দেশ চলার জন্য যা কিছু আছে তার কোনো মৌলিক ভিত্তি তৈরিতে আমাদের কোনো অবদান নাই। আমরা সবকিছুতে পরনির্ভরশীল। কাকের পিছনে পুচ্ছ লাগানো ময়ূর। এতেই আমাদের গর্ব ও অহংকারের কোনো সীমা-পরিসীমা নাই। গর্বে আমাদের মাটিতে পা পড়ে না।

পৃথিবীর বুদ্ধিবৃত্তিক ইনডেক্সে আমাদের জাতির জ্ঞান পৃথিবীর গড় ইনডেক্সেরও নিচে। অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেও আমরা একটা পঙ্গু জাতি। মুক্তচিন্তার স্বাধীনতা যেখানে নাই, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সে জাতির তো পঙ্গুই থাকার কথা।

মুক্তিযুদ্ধের কোটা কত বছর থাকবে সেটা নির্ধারণ করা উচিত। হতে পারে স্বাধীনতার হীরক জয়ন্তী বা ৬০ বছর, প্লাটিনাম জুবিলি বা ৭৫ বছর। অনন্ত কাল ধরে এটা চলতে পারে বলে মনে করি না। সব সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধার প্রজন্ম রাখতে চাইলে, সরাসরি স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকা করে তাদের প্রজন্মকে ওই সময়ের জন্য সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া বন্ধ রাখুন। কিন্তু সে তালিকা তো নাই। নিজের ঘরে ঘোগের বাসা হলে ঘোগের তালিকা করা মুশকিলই বটে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রতি এই প্রজন্মের আস্থা ও শ্রদ্ধা এমনিতে আসবে না। কোটা তৈরি করেও সেটা তৈরি করা যাবে না। তাদের আস্থা আসবে ক্ষমতায় থাকা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের চর্চা দেখে। মুক্তিযুদ্ধের শক্তির ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়া এবং ক্ষমতায় থেকে সোনার বাংলা তৈরির সাধনা দেখে তারা শিখছে। কী শিখছে তা আমি জানি না। তবে যা দেখেছে তা শিখেছে এটা ধারণা করতে পারি।

পৃথিবী প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। ছয়মাস আগের টেকনোলজি পাল্টে নতুন টেকনোলজি আসছে। অথচ আমরা এখনো ঢাকঢোল পিটিয়ে মহাগৌরবে চার/পাঁচ দশক আগে বিগত হওয়া আমাদের প্রয়াত মহান নেতাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। কেন? এখন পৃথিবী যেখানে এসেছে চার/পাঁচ দশক আগে এগুলো ছিল স্বপ্নেরও অতীত। এখনকার জন্য যে উন্নয়ন দরকার সেই সময়ে এ স্বপ্ন দেখার সুযোগ ছিল না। দুনিয়া এতো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে যে, এখনকার স্বপ্ন তখন দেখার কথাও নয়।

আমি কোনো মহান নেতাকে অসম্মান করার জন্য বলছি না। কারণ, এখনকার দশ বছরের একটা বাচ্চাও বলতে পারবে, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে কিন্তু সক্রেটিস, এরিস্টটল, প্লেটোর মতো মহাজ্ঞানীরাও তাদের সময়ে একথা জানতো না। তারমানে এই নয় যে, এখনকার ওই দশ বছরের বাচ্চাটা তখনকার ওই মহাজ্ঞানীদের থেকেও বেশি জ্ঞানী। এটা যুগের পরিবর্তনের বিষয়। নেতাদের ক্ষেত্রেও তাই।

কেন যুগের লিজেন্ডারি নেতা তৈরি হচ্ছে না? হতে দেওয়া হচ্ছে না? জ্ঞানবুদ্ধির সীমাবদ্ধতার কারণে আপনারা লিজেন্ডারি নেতা হতে পারছেন না বলেই আপনাদেরকে এখনও আগের প্রজন্মের নেতাদের স্বপ্ন ফেরি করে যেতে হচ্ছে। পারিবারিক, পৈত্রিক সম্পত্তি না থাকলে নিজের যোগ্যতায় যার নিজের সংসার চালানোর ক্ষমতা নাই, সেরকম লোককে দেওয়া হয়েছে মন্ত্রী-সংসদ সদস্য হয়ে দেশ চালানোর দায়িত্ব। মাটি ও মানুষের সাথে সম্পর্কহীন হয়ে, এলিট ধারায়, উচ্চ বাঁশের মাচায় বসে চলানো হচ্ছে দেশের রাজনীতি। দেশের সকল মানবিক উন্নয়নের চর্চা নিম্নমুখী। সরকারি কার্যালয়গুলোতে সাধারণ মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে অসম্মান করা, মানুষকে হয়রানি করে ঘুষ খাওয়া সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। চারিদিকে হতাশার কালো ছায়া। কেউ ভালো নাই।

এই সকল ব্যর্থতার ইমপ্যাক্টই তরুণদের বিপথগামী করেছে, দায়িত্বহীন করেছে। তাদের দৃষ্টি বিশ্বদৃষ্টি না হয়ে ক্ষুদ্র হয়ে চাকরিদৃষ্টিতে নিবদ্ধ হয়েছে। এর দায় এই রাষ্ট্রের।

;

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে কতদিন অচল থাকবে শিক্ষাঙ্গন?



কবির য়াহমদ অ্যাসিস্ট্যান্ট, এডিটর বার্তা২৪.কম
ছবি: শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে কতদিন অচল থাকবে শিক্ষাঙ্গন

ছবি: শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে কতদিন অচল থাকবে শিক্ষাঙ্গন

  • Font increase
  • Font Decrease

কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরুর আগে থেকেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর আন্দোলনে অস্থির দেশের শিক্ষাঙ্গন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বেগ পাওয়ায় আলোচনা থেকে সরে গেছে সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রত্যয়’ নামক স্কিম নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষাঙ্গন সংশ্লিষ্টদের আন্দোলন। পেনশন নিয়ে এই আন্দোলন আলোচনার বাইরে গেলেও এখনো এটা চলমান। সর্বজনীন পেনশন স্কিম প্রত্যয় প্রত্যাহারের দাবিতে ১ জুলাই থেকে ধর্মঘটে রয়েছেন শিক্ষক ও শিক্ষাঙ্গন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। দাবি না মানা পর্যন্ত আন্দোলনে থাকার ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন তারা।

আগে থেকেই অচল দেশের শিক্ষাঙ্গন। এবার যোগ হয়েছে কোটা আন্দোলন। এই আন্দোলন শিক্ষা বিষয়ক নয়, শিক্ষা শেষে চাকরির। আন্দোলনরতদের দাবি সম-সুযোগ, সম-অধিকারের। তারা কোটা নয়, মেধার ভিত্তিতে সরকারি চাকরির সুবিধা চায়। তাদের দৃষ্টিতে এ দাবি অন্যায্য নয় যদিও, যদিও ‘ন্যায্য দাবি’ করতে গিয়ে তারা অন্যায়ভাবে দেশের সূর্যসন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটাকে প্রশ্নের মুখে তুলে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কটাক্ষ করতে উঠেপড়ে লেগেছে অনেকেই। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পর মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের অংশগ্রহণের কারণকে উপহাস করছেন অনেকে। এটা অনাকাঙ্ক্ষিত, এবং হওয়া উচিত আইনি প্রতিকারের বিষয়। ‘হলোকস্ট ডিনাইয়াল অ্যাক্ট’ অনুসরণে দেশে ‘মুক্তিযুদ্ধ অস্বীকার অপরাধ আইন’ প্রণয়নের যে দাবি দীর্ঘদিনের, সেটা যদি প্রণয়ন হতো, তবে সময়ে-সময়ে নানা ছুতোয় মুক্তিযুদ্ধ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এমন অপমানের মুখে পড়তে হতো না।

এটা সকলের জানা যে, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর সরকার কোটা ব্যবস্থা তুলে দেয়। ওই বছরের ৪ অক্টোবর জারি করা পরিপত্রে বলা হয়, ৯ম (পূর্বতন প্রথম শ্রেণি) এবং ১০ম থেকে ১৩ তম গ্রেডের (পূর্বতন দ্বিতীয় শ্রেণি) পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হবে। ৯ম গ্রেড (পূর্বতন প্রথম শ্রেণি) এবং ১০ম থেকে ১৩ তম গ্রেডের (পূর্বতন দ্বিতীয় শ্রেণি) পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি বাতিল করা হলো। সরকারের ওই পরিপত্রের পর এটা চ্যালেঞ্জ করে রিট করেন ৭ শিক্ষার্থী। গত মাসের ৫ তারিখ হাইকোর্ট ওই পরিপত্র বাতিল করে রায় দেন। এরপর ৯ জুন হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। ১০ জুলাই আপিলের রায়ে আদালত হাইকোর্টের রায়ের ওপর স্থিতাবস্থা দিয়ে চার সপ্তাহ পর বিষয়টির পরবর্তী শুনানি করার দিন নির্ধারণ করেন।

আন্দোলনের শুরু থেকেই সরকার বলছে, কোটা নিয়ে নিষ্পত্তি করবে আদালত। শিক্ষার্থীরা বলছেন, সরকারকে নিতে হবে সিদ্ধান্ত। এমন অবস্থায় ১১ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করে ২০১৮ সালে জারি করা পরিপত্র অবৈধ ঘোষণার সংক্ষিপ্ত রায় প্রকাশ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াতের বেঞ্চ সংক্ষিপ্ত রায় প্রকাশ করেন। প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত এ রায়ে বলা হয়, সরকার প্রয়োজনে কোটার অনুপাত পরিবর্তন, হ্রাস বা বৃদ্ধি করতে পারবে। আর এই রায় সরকারের ওপর কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না। কোনো পাবলিক পরীক্ষায় কোটা পূরণ না হলে সরকার সাধারণ মেধা তালিকা থেকে শূন্য পদ পূরণ করতে পারবে। রায়ে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, নাতি–নাতনিদের জন্য কোটা পুনর্বহাল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে জেলা, নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, উপজাতি–ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য কোটা বজায় রাখতে বলা হয়। রায় পাওয়ার ৩ মাসের মধ্যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হাইকোর্টের আংশিক রায়ে বলা হয়।

আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থার রায়ের পর পর হাইকোর্টের আংশিক রায় প্রকাশিত হয়, যেখানে দেখা যাচ্ছে এটা এখন পুরোপুরি সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া। সরকার চাইলে কোটা নিয়ে নির্বাহী সিদ্ধান্ত জানাতে পারবে। স্থিতাবস্থার কারণে এই মধ্যবর্তী সময়ে ফিরে এসেছে মূলত ২০১৮ সালের কোটা নিয়ে সরকারের পরিপত্র। তবে বিষয়টি যেহেতু আপিল শুনানি এবং রায়ের জন্যে অপেক্ষমাণ তখন এটাকে প্রকৃত অর্থে সরকারের হাতেই যে রয়েছে সেটা বলা যাচ্ছে না। আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থায় হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা নাই; কার্যকারিতা নাই সব কোটা বহাল রেখে কোটার অনুপাত হ্রাস-বৃদ্ধির যে আদেশ সেটারও। রিটের নিষ্পত্তিতে হাইকোর্ট যখন একটা রায় দিয়েছে, সেই রায় আবার যখন আপিল বিভাগ স্থগিত করেছে, তখন প্রকৃত অর্থে ২০১৮ সালের পরিপত্রও থাকছে আপিল বিভাগের বিচারাধীন বিষয়। এখানে তাই সরকার আন্দোলনকারী আশ্বস্ত করতে পারে কেবল, তবে আগের পরিপত্র কিংবা হাইকোর্টের রায়ের (আপিলে স্থগিত) আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না।

কোটা ব্যবস্থা, হাইকোর্টের রায়, আপিলে স্থগিতাদেশ—পুরো বিষয়টি কি তবে আইনি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং অপেক্ষার মধ্যে পড়ে গেল না? এখন কোটা বাতিলের আন্দোলন, নতুন সিদ্ধান্তের জন্যে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের বিষয়গুলো বিচারাধীন বিষয় হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কোন পথে যাওয়া উচিত? আন্দোলন থেকে সরে না দাঁড়ালে দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে অগ্রাহ্য করা হবে তাদের, পড়তে পারে তারা আদালত অবমাননার দায়ে; আবার আন্দোলনকারীদের শান্ত করতে সরকারের কোটা নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত দেওয়াও একইভাবে হতে পারে আদালতকে অগ্রাহ্য করারই নামান্তর। তাছাড়া সরকার ও আদালত যখন বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখতে শুরু করেছে, তখন কেবল রাজপথেই এর নিষ্পত্তি হওয়ার সুযোগ নেই।

আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থার পর ফিরে এসেছে কোটা নিয়ে সরকারের ২০১৮ সালের পরিপত্র। শুনানি শেষে আপিলের রায়ের আগ পর্যন্ত সরকার সেই পরিপত্র প্রতিপালন করতে পারবে, তবে এখানে হ্রাস-বৃদ্ধি নিয়ে নতুন কিছু করতে পারবে না। যদিও হাইকোর্টের প্রকাশিত আংশিক রায়ে বলা হচ্ছিল হ্রাস-বৃদ্ধির কথা। তবে পরিপত্র বাতিলের রায়ের সঙ্গে এই হ্রাস-বৃদ্ধির বিষয়টিও আপিলে স্থগিত। সুতরাং এই মধ্যবর্তী সময়ে আগের পরিপত্রের হুবহু প্রতিপালন ছাড়া কম-বেশি অন্য কিছু করা সমীচীন নয়। আপিলের রায়ে যদি সরকারকে হ্রাস-বৃদ্ধির বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়, বা অন্য কিছু নির্ধারণ করে দেওয়া হয় তখন সেটাই হবে পরবর্তী প্রতিপালনীয় অধ্যায়। এই মধ্যবর্তী সময়ে তাই আন্দোলনকারীদের আশ্বস্ত করতে পারে সরকার, অপেক্ষা করতে বলতে পারে আন্দোলনকারীদের। আন্দোলনকারীদের সুযোগ আছে আদালতে তাদের বক্তব্য উপস্থাপনের। আদালত নিশ্চয় সবার বক্তব্য শুনে পরবর্তী নির্দেশনা দেবেন।

কোটা নিয়ে আন্দোলন না হয় একটা সময়ে নিষ্পত্তি হবে। আশা করতে চাই সকল পক্ষের জন্যে সম্মানজনক কিছু আসবে আদালত এবং সরকারের কাছ থেকে। এরবাইরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে আন্দোলন তার কী হবে? বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের আন্দোলনে অচল দেশের শিক্ষাঙ্গন। তারা সর্বজনীন পেনশনের প্রত্যয় স্কিমের প্রত্যাহার চাইছেন। তাদের এই দাবি যৌক্তিক, নাকি অযৌক্তিক সে আলোচনায় না গিয়ে বলছি, এর কি কোন সমাধান নাই? শিক্ষক নেতাদের দাবি তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না, তারা তাদের বক্তব্য সরকারের নীতিনির্ধারকদের জানাতে পারছেন না। অর্থাৎ সরকার পাত্তাই দিচ্ছে না এই আন্দোলনকে। বিবিধ ব্যস্ততায় তারা না হয় প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পাচ্ছেন না, কিন্তু এত বড় বিষয় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী কেন উদ্যোগ নিচ্ছেন না? শিক্ষাঙ্গনের এই অস্থিরতা, অস্থিতিশীলতা নিরসনে ভূমিকা রাখা তো তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

কোটা হোক, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী হোক, যেকোনো পর্যায়ে যে কারো যৌক্তিক স্বার্থ সংরক্ষণের দায়িত্ব সরকারের। এই স্বার্থ রক্ষায় কেউ যৌক্তিক দাবি করতে পারে, কেউ অযৌক্তিক দাবি করতে পারে; তবে সকল দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত সরকারের। জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট দাবি গ্রহণ করবে সরকার, জনস্বার্থের পরিপন্থী কিছু হলে সেটা গ্রহণ করবে না—এটাই তো সংগত। কিন্তু পূর্ব-ধারণাজাত সিদ্ধান্তে সবকিছু অগ্রাহ্য করার মানসিকতা সমস্যার সমাধান করবে না, বরং ছোট সমস্যাকে বিশাল করে তুলবে। শিক্ষক আন্দোলন নাড়া দেওয়ার সময়ে শিক্ষার্থী আন্দোলনে দেশ কেঁপেছে বলে পেনশন নিয়ে শিক্ষকদের এই আন্দোলনকে হালকা ভাবে দেখার অবকাশ নাই। কারণ এই পেনশন আন্দোলন আগে থেকেই অচল করে রেখেছে দেশের শিক্ষাঙ্গনকে।

দেশে নানামুখী সমস্যা থাকবে, কিন্তু সঙ্গে থাকতে হবে সমাধানের উদ্যোগ। কোটা আন্দোলনের সঙ্গে তাই সম-গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে পেনশন নিয়ে আন্দোলনকেও। তা না হলে অচল শিক্ষাঙ্গন সচল হবে না।

;

চেতনা ও সংঘবদ্ধতা জরুরি



সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

দেশে হত্যা, আত্মহত্যা, ধর্ষণ আমরা দেখছি, মন্তব্যও করছি, এবং যথারীতি বিষন্ন হচ্ছি। আইন আছে, তবে বোঝাই যাচ্ছে যে, আইন দিয়ে কুলাচ্ছে না। গোটা ব্যবস্থাটাই নারীর প্রতি বিরূপ। আগেও তা-ই ছিল; এখন কমেনি, বরং বেড়েছে। মেয়েদেরকে নিরাপদ রাখা যাচ্ছে না। একাত্তরে হানাদার পাকিস্তানি দস্যুরা যা করতো, এখন স্বদেশি যুবকরা সেই একই কাজ করছে। একাত্তরে আমরা লড়ছিলাম দস্যুদের তাড়াতে; ভরসা ছিল তারা পালাবে। এখন তো সেই ভরসাটা আর নেই; এখন তো স্বদেশিরাই ঘাতক।

তা স্বাধীনতা পেয়ে আমরা অবশ্যই অনেক দূর এগোলাম; মেয়েরাও এগিয়েছে। সর্বক্ষেত্রেই, বলা যাবে। যে চারজন নারী ঢাকা শহরের অভিজাত এলাকার মদের দোকানের সামনে মদ্যপ অবস্থায় মারামারি করেছেন, চুলোচুলিতেও থামেননি, পরস্পরকে বিবস্ত্র করার উদ্যোগ নিয়েছেন, একাত্তরের আগে তাঁরা যে অতটা স্বাধীনতা ভোগ করতেন এমনটা অবশ্যই বলা যাবে না; কিন্তু ওই যে বললাম মেয়েদের নিরাপত্তার খবর কী? যৌন হয়রানি বাড়লো না কমলো? বোরখা ও হিজাবের ব্যবহার তো স্বাধীনতার আগে অতটা দেখা যায়নি, এখন যতোটা দেখা যাচ্ছে। এসবের ব্যাখ্যা কী? ব্যাখ্যা একটাই, এবং সেটা বেশ সরল। ব্যাখ্যা হলো উন্নতি অবশ্যই ঘটেছে, তবে সেটা পুঁজিবাদী লাইনে। পুঁজিবাদী উন্নয়ন পিতৃতান্ত্রিক এবং বৈষম্যমূলক। সে-উন্নয়ন সবলকে প্রবল করে, দুর্বলকে করে দুর্বল। সকল ক্ষেত্রেই সেটা সত্য, বিশেষ ভাবে সত্য মেয়েদের বেলাতে।

নারীর নিরাপত্তাহীনতার কাহিনী শেষ হবার নয়। লেখাটি শেষ করবার আগেই জানা গেল যে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার এলাকাতে সংঘবদ্ধ একটি ডাকাত দল গভীর রাতে একটি গৃহে প্রবেশ করে। সেখানে ঘুমাচ্ছিলেন এক মা ও তার কন্যা। ডাকাতরা যথারীতি তাঁদের হাত পা বেঁধে জিনিসপত্র খুঁজতে থাকে। মূল্যবান কিছু না পেয়ে তারা ক্রুদ্ধ হয়; এবং কিশোরী কন্যাটিকে পার্শ্ববর্তী ঝোপে নিয়ে গিয়ে সবাই মিলে ধর্ষণ করে।

জানা গেছে যে ডাকাত দলের সর্দার স্থানীয় একটি সুতার কলে কাজ করতো। কাজ ছেড়ে দিয়ে সে এখন পেশাদার ডাকাত হয়েছে; এবং ১০-১২ জনের একটি দল গড়েছে [খবরের কাগজ, ২১ মে]। আরও একটি খবর : চট্টগ্রাম থেকে : ডেকে নিল পুলিশ, নিয়ে গেল র‌্যাব, পরে পাওয়া গেল লাশ, একজন মহিলার [আজকের পত্রিকা, ১৯ এপ্রিল]। ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় এক মহিলাকে শেকলে বেঁধে দলবদ্ধ ভাবে ধর্ষণের খবরও বের হয়েছে কয়েকটি পত্রিকাতে। নাকি তাঁকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছিল প্রবাসী এক ব্যারিস্টারের নির্দেশে। কারণ পারিবারিক কলহ।

ওদিকে মেয়েরাও যে বেপরোয়া হতে পারে তার নজিরও একেবারে বিরল নয়। যেমন এই খবরটা বলছে যে মেয়ে তার মা’কে হত্যা করেছে, মা তার বিয়ে দিচ্ছেন না বলে [প্রতিদিনের বাংলাদেশ, ২৯ এপ্রিল]। গাজীপুরে দু’জন পোশাক-কর্মী গেছিলেন বৈশাখী মেলায়। একজন পুরুষ সহকর্মী ছিলেন তাঁদের সঙ্গে। সন্ধ্যার পরে স্থানীয় কয়েকজন যুবক তাদেরকে ধরে নিয়ে যায় স্থানীয় একটি ক্লাবে। পুরুষটিকে আটক করে রেখে মহিলাদেরকে নিকটবর্তী এক জঙ্গলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ভাবে ধর্ষণ করে [ডেইলি স্টার, ১৯ এপ্রিল]। ব্রিটিশ আমলে অনেক ক্লাব বিপ্লবীরা শরীর চর্চার জন্য ব্যবহার করতেন; পাকিস্তান আমলেও ক্লাব ছিল খেলাধুলার জায়গা; এখন সেখনে কাজকর্ম হয় ভিন্ন ধরনেরও।

২.
এই যে ছোট ছোট সব গল্প, এগুলো তো আসলে বড় একটা গল্পেরই অংশ। সে গল্পটা উন্নতির। উন্নতি ঘটছে-সবেগে এবং সশব্দে। সভ্যতার ওপরের দিকে ওঠার ব্যাপারে বিশ্ব জুড়েই এখন কোনো বিরাম নেই। প্রকৃতি জয়ের তেমন কিছু আর বাকি আছে বলেও তো মনে হয় না। মহাকাশে মানুষের যাতায়াত যে শুধু শুরু হয়েছে তা-ই নয়, সেখানে রেস্তোরাঁ পর্যন্ত চালু হতে যাচ্ছে, বিনোদনের জন্য। আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তো দরজায় টোকা দেওয়া শেষ করে এখন ধাক্কা দেবার জন্য অস্থির হয়ে রয়েছে।

কিন্তু গল্পটা তো একথাও বলছে যে, এই উন্নতি মানুষকে অবনত করে দিচ্ছে। মানুষ আত্মকেন্দ্রিক, মুনাফালিপ্সু ও ভোগবাদী হয়ে উঠছে। মানুষের মানুষ্যত্ব খর্ব করার সব রকমের বন্দোবস্তই পাকাপোক্ত করা হয়ে গেছে। যে কোনো ঘটনা থেকেই এটা টের পাওয়া যায়।

গল্প নয়, সম্পূর্ণ বাস্তবিক একটি ঘটনার দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। উন্মুক্ত কয়লাখনি তৈরির সর্বনাশা উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের এক সমাবেশে ফুলবাড়ীতে গিয়েছিলেন; ফেরার পথে ট্রেন থেকে নামার সময় তাঁর এক পা আটকে যায় ট্রেনের চাকার নিচে, তাঁর সঙ্গে একজন সহকর্মী ছিলেন, তিনি ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে না দিলে যা ঘটেছে তার চেয়েও ভয়ঙ্কর কিছু ঘটতে পারতো। আহত হয়ে আনু মুহাম্মদ যখন পড়ে গেছেন উপস্থিত লোকজনের মধ্যে তখন দু’ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

অধিকাংশই ভূমিকা নিয়েছেন দর্শকের; কিন্তু দর্শকদের ভেতরও ইতরবিশেষ ছিল। কোনো কোনো দর্শক ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন মোবাইলে ছবি তোলাতে। একজন নাকি ভিডিও ক্যামেরাও ব্যবহার করছিলেন। একটি উল্লেখযোগ্য একটি দৃশ্য, সব সময় পাওয়া যায় না। উপভোগ্য, ফেসবুকে তুলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করার মতো। বলা যাবে নিজের সচক্ষে দেখেছি। কিন্তু অন্তত একজন মানুষ ছিলেন, যিনি ওই ট্রেন থেকে নেমেছেন, এবং ভিড় ঠেলে অতিদ্রুত এগিয়ে এসেছেন আহত অধ্যাপককে সাহায্য করতে।

এগিয়ে গিয়ে তিনি আনু মুহাম্মদের সঙ্গীর সঙ্গে মিলে রক্তাক্ত মানুষটিকে ধরাধরি করে সিএনজিতে তুলেছেন, এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইমার্জেন্সি বিভাগে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর সহায়তা না পেলে ভীষণভাবে আহত ও অসহ্য যন্ত্রণায়-কাতর মানুষটির পক্ষে অবশ্যম্ভাবী বিলম্ব ঘটতো হাসপাতালে পৌঁছতে। আনু মুহাম্মদের সঙ্গে কিন্তু ওই মানুষটির কোনো পরিচয় ছিল না, জানতেন না তিনি আনু মুহাম্মদ কে। তিনি দেখেছেন একজন মানুষ আহত হয়েছে, দেখে ভেতর থেকে তাগিদ অনুভব করেছেন তাঁকে সাহায্য করতে। তাই এগিয়ে গেছেন।

পরে খবরের কাগজ পড়ে তিনি অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের পরিচয় জেনেছেন। জানতে পেরে মেডিকেলের ইমার্জেন্সিতে খোঁজ নিয়েছেন, এবং রোগী বার্ন ইউনিটে রয়েছেন জেনে সেখানে গেছেন জানতে আনু মুহাম্মদ কেমন আছেন। নিজের পরিচয় দিয়েছেন এই পুরাতন ঢাকার একজন বাসিন্দা বলে। মসলার ব্যবসা করেন। এ রকমের মানুষ কিন্তু সমাজে অনেক আছেন।

এই লেখাটি লেখার সময়েই তো কলেজের এক শিক্ষার্থীর খবর পড়লাম, যে তার প্রাণ দিয়েছে একটি শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে। গাইবান্ধাতে। সেটাও ট্রেনেরই ঘটনা। মা তাঁর দেড় বছর বয়স্ক শিশু সন্তানটিকে নিয়ে চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে পড়েছিলেন, আত্মহত্যা করবেন বলে। শিক্ষার্থীটি ছুটে গেছে তাদেরকে বাঁচাতে। শিশুটিকে বাঁচাতে পেরেছে, মা’কে বাঁচাতে পারেনি; বাঁচাতে পারেনি সে নিজেকেও [সমকাল, ২ এপ্রিল]। এরকমের ভালো মানুষরা আছেন বলেই বিপন্ন সমাজ এখনও টিকে আছে। তবে তারা বিচ্ছিন্ন, তাই ক্ষমতাহীন। ক্ষমতাবানরা তাঁদেরকে পীড়ন করে, এবং পীড়নের আদর্শ চাপিয়ে দেয় সমাজের কাঁধে ও মস্তিষ্কে। তারা ছবি তোলে, সাহায্য করে না।

এই যে বৈপরীত্য এটাও বাস্তবতা। তবে শেষ ভরসা কিন্তু ওই অচেনা অজানা মানুষেরাই। আরও স্পষ্ট বলা চলে ভরসা এঁদের মনুষ্যত্বই, যে মানুষ্যত্বকে অবদমিত, পারলে নিশ্চিহ্ন করে দেবার সব রকমের চেষ্টায় পুঁজিবাদী উন্নয়নের ধারাটি সর্বদা ব্যস্ত রয়েছে। ভালো মানুষেরা আছেন, এবং তাঁদের সংখ্যাই অধিক; তাঁরা একত্র হলে সমাজে বিপ্লব ঘটবেÑকোনো এক দেশে নয়, সারা পৃথিবী জুড়েই।

কিন্তু তাঁদের একত্র হবার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সংগঠন। এবং প্রয়োজন বঞ্চিত মানুষের ভেতর এই বোধের সক্রিয় সঞ্চার যে বিদ্যমান ব্যবস্থাটা কোনো মতোই গ্রহণযোগ্য নয়, একে বদলানো দরকার; এবং বদলানো সম্ভব। প্রতিপক্ষের ক্ষমতা আছে, কিন্তু মানুষের জাগরণ ঘটলে সেই ক্ষমতা তৃণকূটার মতো ভেসে যেতে বাধ্য। তবে এটা অত্যন্ত সত্য যে, বঞ্চিত মানুষ মাত্রেই বিপ্লবী নয়, বঞ্চিতরা হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারে, এবং করেও। তাদের জন্য এমনকি ভিক্ষুকে পরিণত হওয়াটাও কোনো কঠিন কাজ নয়। বঞ্চিত মানুষেরা বিপ্লবী হবে না যদি না বিপ্লবী চেতনায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে; এবং সংঘবদ্ধ হয়।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

;

পরিকল্পিত নগর পরিবহন সময়ের দাবি



মো: বজলুর রশিদ
মো: বজলুর রশিদ, ছবি: বার্তা২৪.কম

মো: বজলুর রশিদ, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের নগরসমূহ, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে যানজট ও পরিবহন সংকট। বর্তমান পরিস্থিতিতে, একটি পরিকল্পিত নগর পরিবহন ব্যবস্থা সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। নগর পরিবহনের এই সংকট নাগরিক জীবনকে কঠিন করে তুলছে। এছাড়াও অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি কমিয়ে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ঢাকার যানজট একটি সাধারণ সমস্যায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকেন। এর ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার কর্মঘণ্টা অপচয় হয়, যা অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতায় বড় ধরনের ক্ষতি করছে।

পরিবহন সমস্যার আরেকটি গুরুতর প্রভাব হলো বায়ু দূষণ। ঢাকার বায়ুর মান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডের চেয়ে অনেক নিচে। যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া ও গ্যাস বায়ুর গুণমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যা নাগরিকদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার পরিমাণ বেড়ে চলেছে।

নগর পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতা দেশের অর্থনীতির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। যানজটের কারণে পণ্য পরিবহন দেরি হয়, উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এইসব সমস্যার সম্মুখীন হয়ে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত খরচ করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

নগর পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। একটি কার্যকরী ও টেকসই নগর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করা যেতে পারে-

গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন: আধুনিক ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মেট্রোরেল, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (BRT), এবং ট্রাম সিস্টেমের মতো আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এগুলি নাগরিকদের সহজ, নিরাপদ এবং সাশ্রয়ী যাতায়াতের সুযোগ প্রদান করবে।

সাইকেল ও পদযাত্রার প্রচার: ছোট দূরত্বের যাতায়াতের জন্য সাইকেল ও পদযাত্রাকে উৎসাহিত করতে হবে। সাইকেল লেন ও পায়ে চলার পথ উন্নয়ন করে একটি পরিবেশ-বান্ধব ও স্বাস্থ্যকর যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।

ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ: যানজট কমানোর জন্য আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রয়োজন। ট্রাফিক সংকেতের সমন্বয়, ইলেকট্রনিক টোল সংগ্রহ, এবং স্মার্ট ট্রাফিক লাইট ব্যবহারের মাধ্যমে যানজট কমানো যেতে পারে।

সড়ক নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন: নগরের সড়ক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন করতে হবে। নতুন সড়ক নির্মাণ, ওভারপাস ও আন্ডারপাস তৈরি, এবং বিদ্যমান সড়কগুলির প্রশস্তকরণ করে যানজট কমানো সম্ভব।

পার্কিং ব্যবস্থার উন্নয়ন: নগরীর বিভিন্ন স্থানে সুসংহত পার্কিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। সঠিক পার্কিং নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগের মাধ্যমে রাস্তা দখল কমিয়ে যানজট নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।

নগর পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। সরকার, নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিকদের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। নগরীর ভবিষ্যত উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং সেগুলি সময়মতো বাস্তবায়ন করতে হবে।

বর্তমান নগরায়নের যুগে, পরিকল্পিত নগর পরিবহন ব্যবস্থা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে নগরায়ন দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেখানে সুষ্ঠু ও কার্যকর নগর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার গুরুত্ব অপরিসীম। নগরীর জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক কার্যক্রম এবং জীবনের গুণমানের ওপর একটি উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার প্রভাব অনেক গভীর।

ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী এবং খুলনা শহরের মতো নগরীগুলোতে যানজট একটি প্রচলিত সমস্যা। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এবং অন্যান্য গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকেন। এর ফলে প্রতিদিন অসংখ্য কর্মঘণ্টা অপচয় হয়। এই সময়ের অপচয় শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতা একটি বড় ধরনের পরিবেশগত সমস্যার সৃষ্টি করে। যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া এবং অন্যান্য দূষণকারী গ্যাস বায়ুর গুণমান নষ্ট করে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। পরিকল্পিত নগর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুললে বায়ু দূষণ কমিয়ে পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।

নগর পরিবহন ব্যবস্থার সমস্যার কারণে নাগরিকদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। যানজট, ধোঁয়া, শব্দ দূষণ, এবং অব্যবস্থাপিত গণপরিবহন ব্যবস্থার কারণে শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ, এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। একটি পরিকল্পিত পরিবহন ব্যবস্থা এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে সহায়ক হবে।

একটি উন্নত ও কার্যকর নগর পরিবহন ব্যবস্থা অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করতে পারে। পণ্য ও সেবার দ্রুত স্থানান্তর, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, এবং ব্যবসার জন্য একটি সহজ ও সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করে সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।

পরিকল্পিত নগর পরিবহন ব্যবস্থা একটি সুস্থ, সুশৃঙ্খল এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে সহায়ক। এটি নাগরিকদের জন্য সহজ এবং সাশ্রয়ী যাতায়াতের সুযোগ সৃষ্টি করে, যা সমাজে সাম্য ও ন্যায়বিচারের পরিবেশ তৈরি করে। বিশেষ করে, কম আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য সহজে যাতায়াতের ব্যবস্থা করে তাদের সামাজিক উন্নয়নের সুযোগ বৃদ্ধি করা সম্ভব।

পরিকল্পিত নগর পরিবহন ব্যবস্থা একটি সুস্থ, সুশৃঙ্খল এবং টেকসই নগর গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য। এটি শুধুমাত্র নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করবে না, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পরিবেশের সুরক্ষা এবং সামগ্রিক সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাই, সময়ের দাবি মেনে পরিকল্পিত নগর পরিবহন ব্যবস্থার দিকে আমাদেরকে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।

মো: বজলুর রশিদ: সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা।

;