বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি এভাবেই চলবে?

মাছুম বিল্লাহ
মাছুম বিল্লাহ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

মাছুম বিল্লাহ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা আবরার হত্যা ঘটনার ঠিক এক মাসের মাথায় আবার সেই ছাত্রলীগই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ওপর হামলা চালাল। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের আন্দোলনের ওপর ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা হামলা চালিয়ে আটজন শিক্ষকসহ ৩৫ জনকে আহত করেছে। ছবিতে দেখলাম একজন ছাত্রীর পেটে লাথি মারায় সে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। কয়েকজন সাংবাদিককেও মার খেতে হয়েছে।

মারধরের সময় উপাচার্যপন্থী শিক্ষকরা 'ধর ধর,' 'জবাই কর', ও 'মার মার' বলে চিৎকার করছিলেন। শুধু তাই নয়, ছাত্রলীগ যখন হামলা চালাচ্ছে তারা তখন হাততালি দিচ্ছিলেন এবং ছাত্রলীগকে স্বাগত জানাচ্ছিলেন। জাতির পুরো সর্বনাশ করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা পেশায় কারা ঢুকে পড়েছেন তার প্রমাণ বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে আমরা দেখেছি।

হামলা চলার সময় উপাচার্যের বাসভবনের সামনে থাকা পুলিশ নীরব ছিল। এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, 'উভয়পক্ষেই ছাত্র-শিক্ষকেরা ছিলেন। সংগত কারণেই কারো ওপর হাত তুলতে পারি না। তারা নিজেরাই নিজেদের মতো করে এর সমাধান করবেন।' পুলিশ কর্মকর্তা তো ঠিকই বলেছেন, ওনারা কার ওপর লাঠিচার্জ করবেন আর কেনই বা করবেন? কার নির্দেশে করবেন? পুলিশ সদস্যরা দেখে গেলেন বিদ্যাশিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে কী হয়। চিরদিনের জন্য তাদের কাছে ধারণা জন্মাল যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষকরা ভেতরে কী করেন। এ ঘটনা অবশ্যই তারা বিভিন্ন জায়গায়ই দেখেছেন। তারপরেও আমার লজ্জা হচ্ছে! আমি নিজে জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্র ছিলাম। কত উত্তাল, কত ভয়ংকর এবং কুৎসিত এই শিক্ষক ও ছাত্ররাজনীতি হতে পারে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষীবাহিনীর সদস্যদের কী করার আছে এখানে?

মারধরের ঘটনার আধা ঘণ্টা পর উপাচার্যপন্থী শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও পুলিশের কড়া পাহারায় উপাচার্য তার বাসভবন থেকে বেরিয়ে কার্যালয়ে এসেছেন। দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনিক ভবনের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দেওয়াকে তিনি 'গণঅভ্যুত্থান' আখ্যা দিয়ে বলেন, সহকর্মী শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষার্থী, বিশেষ করে ছাত্রলীগের কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ কারণ তারা দায়িত্ব নিয়ে এ কাজটি করেছে। তিনি জানান, সুষ্ঠুভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য তারা তাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবেন। এটি কোনো ভিসির কথা হতে পারে? আপনি পুলিশ প্রহরায়, ছাত্রলীগের প্রহরায় অফিসে এসে বলছেন সুষ্ঠভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করায় তারা আপনাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।

বিশ্ববিদ্যালয় কাদের জন্য? শুধু কি আপনার সমর্থকদের জন্য নাকি সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্যও? আপনি ক’দিন আগেও প্রধানমন্ত্রীর কাছে নালিশ করলেন, যে, ছাত্রলীগের নেতারা আপনার কাছে বিরাট অঙ্কের চাঁদা দাবি করেছে। তারা আপনার কাছ থেকে অনেক টাকা নিয়েছেও, আরও বেশি চাচ্ছে বিধায় আপনি নালিশ করতে বাধ্য হয়েছেন। এর মধ্যেই তাদের কাছে আপনি এত বেশি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন?

ছাত্রলীগকে কী দোষ দেব? আপনারাই তো নিজেদের স্বার্থে তাদের ব্যবহার করছেন? তারা তো তরুণ শিক্ষার্থী! তারা তো বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতেই এসেছিলো। কিন্তু আপনারা তাদেরকে ব্যবহার করে করে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। আমরা কথায় কথায় রাজনীতিকদের দোষ দেই, ক্যাসিনো সম্রাটদের দোষ দিই। তাদের দোষ দিয়ে লাভ কী? আপনারা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে খেলা খেলছেন তাতো ঐসব খেলার চেয়ে মোটেও কম কিছু নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, শিক্ষকদের কাছ থেকে কী শিখছে? কী দিবেন তারা দেশকে? আমরা একবারও কি তা ভেবে দেখেছি? কী মধু আছে ঐ ভিসিগিরিতে?

হামলার পর সিন্ডিকেট সভা করে কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে। তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বন্ধের ঘোষণা মানছেন না, তারা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি গভীর রাত পর্যন্ত আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান করেছেন। মেয়ে শিক্ষার্থীরা হলের তালা ভেঙ্গে আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। তারা ৬ নভেম্বর সকাল ন’টায় ক্যাম্পাসের মুরাদ চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিল এবং পরে শহীদ মিনারে সংহতি সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একটি পুরনো কৌশল। হঠাৎ বন্ধ ঘোষণা করা মানের হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের সাক্ষাৎ বিপদের মধ্যে ফেলে দেয়া। আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম। পুরো এরশাদ আমল কেটেছে এই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা, ছাত্র শিক্ষক, শিক্ষার্থী পুলিশ সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে। বিলম্বিত হয়েছিল আমাদের শিক্ষাজীবন, কেটে গিয়েছিল দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম।

বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করায় ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক প্রথম বর্ষে ভর্তি কার্যক্রমে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ভর্তি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গত ৩ নভেম্বর থেকে অনলাইনে বিষয় নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়। চলবে ৯ নভেম্বর পর্যন্ত। তবে ক্যাম্পাসে হাজির হয়ে বাকি ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিষয়গুলো আপাতত বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে পরীক্ষা পরিচালন কমিটি। তবে, কর্তৃপক্ষকে মনে রাখতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা কোনো সমাধান নয়। এটি সাময়িক, অকার্যকর ও অদক্ষ একটি পদক্ষেপ।

প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ক্যাম্পাস পুলিশ প্রয়োজন। বিষয়টি নিয়ে আরও কয়েকবার লিখেছি। বিষয়টি শুনলেই প্রথমেই হয়তো অনেক শিক্ষার্থী ও ছাত্রসংগঠন এর বিরোধিতা করবেন কিন্তু বর্তমান পদ্ধতিতে যে পুলিশি অভিযান, হামলা, লাঠিচার্জ এবং পুলিশের নীরব ভূমিকা ইত্যাদি বিষয়গুলো চালু আছে তার চেয়ে নিরাপদ ও পড়াশুনার উপযোগী ক্যাম্পাস তৈরি করার ক্ষেত্রে 'ক্যাম্পাস পুলিশ' পালন করতে পারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা।

আজকাল সরকারি বেসরকারি সব ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়েই কোনো না কোনোভাবে অস্থির ও উত্তাল। কোথাও নেই পড়াশুনার পরিবেশ, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক কেউই নেই নিরাপদে। আগে তো তাদের নিরাপদে থাকতে হবে তারপর পড়াশুনা। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিং, ছাত্র রাজনীতি, ভিসি অপসারণ, ভিসির দুর্নীতি, শিক্ষকদের যৌন হয়রানি ইত্যাদি বিভিন্ন ইস্যুতে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় অশান্ত। কী হবে আমাদের উচ্চশিক্ষার? কে ভিসি, কে রেজিস্টার এ নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাথা ঘামানোর কথা নয়। কথায় কথায় আন্দোলনে নামার কথা নয়। শিক্ষক শিক্ষার্থী সম্পর্ক হবে মধুর, প্রকৃত সম্মানের। কিন্তু হচ্ছেটা কী? মূল কারণ রাজনীতির নামে অপরাজনীতি। এই অপরাজনীতি থেকে বিশ্ববিদ্যলয়গুলোকে মুক্ত করতে হবে জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থে।

জাহাঙ্গীরনগরেই আওয়ামী পন্থী ড. এনামুল হককে অপসারণের জন্য আন্দোলন হয়েছে, ড. আনোয়ার হোসেনকে সরানোর জন্য আন্দোলন হয়েছে। আবার বর্তমান ভিসিও আওয়ামী পন্থী। তাহলে 'শিবির' বলে যে শিক্ষার্থীদের মারা হলো, তার মানে কি? রাজনীতির নামে চতুর, নিষ্ঠুর ও কুৎসিত খেলা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এসব খেলা কি চলতে দেয় উচিত?

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশুনার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ক্যাম্পাস পুলিশ অচিরেই চালু করা প্রয়োজন। এই পুলিশের সাধারণ সদস্য হবেন কমপক্ষে স্নাতক পাস। তাদের বেতন স্কেলও হবে আলাদা। প্রক্টর ও সহকারী প্রক্টর এখানকার পুলিশদের কমান্ড করবেন। বড় বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে একজন পুলিশ সুপার এবং ছোটগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সমমর্যাদার পুলিশ অফিসার রাখা যেতে পারে। তখন শিক্ষার্থীরা কোনো ঘটনা, দুর্ঘটনার জন্য প্রক্টরকে দায়ী করতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে এই একটি পোষ্ট! ঢাল নেই, তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ঘটান ঘটলেই সবাই ধরেন, কথা বলেন, জবাব চান প্রক্টর ও সহকারী প্রক্টরের কাছে। ভাবখানা এমন বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সবাই অতি ভদ্র মানুষ, প্রক্টর ও সহকারী প্রক্টরকে তারা খুব সম্মান করেন। ওনারা আসার সাথে সাথে তারা সবাই লজ্জা পেয়ে যাবেন এবং লজ্জায় সবকিছু বাদ দিয়ে যে যার যার কাজে ফিরে যাবেন।

আমরা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকরণে অনেক কিছু করি কিন্তু অনেক বিষয়ই যে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে মিলে না তা খেয়াল করি না। এখন তাকে দায়ী করলে তিনি কী করবেন? আমরা হলে হলে যে টর্চার সেলের কথা জেনেছি ও দেখেছি, ক্যাম্পাস পুলিশ এসব ক্ষেত্রে জোরালো ভূমিকা পালন করতে পারেন। কোনো ছাত্র সংগঠন বা শিক্ষার্থী তখন আইন হাতে তুলে নিবেন না। ভিসি রেজিস্ট্রারসহ সব প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বেও নিয়োজিত থাকবেন এই ক্যাম্পাস পুলিশ।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আমরা জেলখানা বানাতে পারি না যেভাবে হলে হলে টর্চার সেল বানানো হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রকৃত জ্ঞানের আঁধার তৈরি করতে হলে ভিসি নিয়োগে পরিবর্তন আনতে হবে, ক্যাম্পাস পুলিশ চালু করতে হবে, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত রাজনীতি করতে হবে যা তাদের শেখাবে দেশপ্রেম, মানবপ্রেম, সহানুভূতি, মানবতা ও নৈতিকতা। এই অপরাজনীতি নয়। এটি কারোর জন্য হয়তো সাময়িক লাভ নিয়ে আসতে পারে কিন্তু জাতীয় জীবনে এর গভীর কালো ছায়া গোটা সমাজকে কলুষিত করছে। এ থেকে জাতিকে রেহাই পেতে হবে।

 

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা গবেষক, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত এবং ভাইস-প্রেসিডেন্ট: বাংলাদেশ ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ টিচার্স এসোসিয়েশন (বেল্টা)।

আপনার মতামত লিখুন :