মহামতি সিদ্ধার্থ গৌতম



প্রদীপ কুমার দত্ত
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি।
ধর্মং শরণং গচ্ছামি।

সিদ্ধার্থ গৌতম খৃষ্টপূর্ব ৫৬৪সালে(এই সাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে) কপিলাবস্তুর লুম্বিনীতে (বর্তমানে নেপালের অন্তর্গত) শাক্য রাজা শুদ্ধোধন এর প্রাসাদে তাঁর মহিষী মায়া দেবীর ঔরষে জন্মগ্রহণ করেন। দিনটি ছিল বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথি।

তিনি শৈশব থেকেই ছিলেন ভাবুক প্রকৃতির। রাজকার্য তাঁকে আকর্ষণ করতো না। জীবনের গূঢ় রহস্য নিয়ে তিনি চিন্তা করতেন। তিনি লক্ষ্য করলেন সংসারে কর্মই প্রধান। বাকি সবই অনিত্য। তিনি ভাবতেন জরা, ব্যাধি, মৃত্যু থেকে মুক্তির উপায় নিয়ে। যৌবনের এক পর্যায়ে প্রাসাদে মাতা, পিতা, স্ত্রী ও শিশুপুত্রকে রেখে এক রাতে তিনি বেরিয়ে পড়েন পথে। গ্রহণ করলেন শ্রমণের জীবন।

একসময় তিনি গয়ার নিকট উরুবিল্ব (বর্তমানে ভারতের বিহারের বৌদ্ধগয়া) গ্রামে এক বৃক্ষতলে মোক্ষলাভের উপায় ভাবতে জাগতিক সমস্ত আকর্ষণ ত্যাগ করে ধ্যান করতে বসেন। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ইত্যাদি বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত অবস্থায় এক বৈশাখী পূর্ণিমায় তিনি আলোকপ্রাপ্ত হন। তিনি লাভ করলেন দিব্যজ্ঞান। এই জ্ঞানই হলো অজ্ঞানতা ও অশিক্ষা, লোভ এবং আকাঙ্খা, রোগ ও দুঃখভোগ এবং পুনর্জন্ম থেকে মুক্তি। সেই মুক্তিলাভের উপায় হলো জীবন যাপনে শুদ্ধাচার।

তাঁর আশি বছরের জীবনের বাকি অংশ তিনি কাটালেন তাঁর মোক্ষলাভের সূত্র এবং লোভ, হিংসা-দ্বেষহীন পরোপকারের জীবন ধারণের জন্য শিষ্য এবং শিষ্যদের মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে উদ্বুদ্ধ করে। বারানসীর অদূরে সারনাথে প্রথম পাঁচজনকে তিনি শিষ্যত্বে বরণ করেন। এই সংখ্যা ধীরে ধীরে বর্ধিত হতে থাকে এবং প্রচার ছড়িয়ে পড়তে থাকে দিকে দিকে। বৃহৎ এক জনগোষ্ঠীকে আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় তাঁর এই প্রচার।প্রথমে গাঙ্গেয় অববাহিকাতে চলে এই প্রচারাভিযান। পরে তা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

এইভাবে শান্তির অমোঘ বাণী প্রচারে বাকি জীবন কাটিয়ে তিনি যখন বুঝলেন তাঁর ধরাধাম ত্যাগের সময় হয়েছে, তখন তিনি তাঁর প্রচার সাথী শিষ্যদের উদ্দেশ্যে শেষ দেশনা প্রদান করেন। সেখানে তিনি তাঁর শিষ্যদের বলেন যে তিনি তাঁদের পথের দিশা দেখিয়ে গেলেন মাত্র। মানুষ মরণশীল।মানব জীবনে দুঃখ,কষ্ট জরা,ব্যাধি অবশ্যম্ভাবী।তাই জীবদ্দশায় উচিৎ সর্বোচ্চ চেষ্টার মাধ্যমে সৃষ্টির সকল জীবের কল্যাণসাধন করা।তাঁদেরকে নিজের আত্মাকে আলোকিত করে নিজেকেই আলোকপ্রাপ্ত হতে হবে।

মল্ল রাজত্বভুক্ত কুশিনগরে তিনি মহাপরিনির্বাণ প্রাপ্ত হন। কি আশ্চর্য! সেই দিনটিও ছিল বৈশাখী পূর্ণিমা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই তিন বিশেষ দিনের সমষ্টিকে ভেসাক ডে হিসাবে পালন করা হয়। ভারত থেকে তিব্বত হয়ে চীন, জাপান, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর সহ পুরো দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় বৌদ্ধ ধর্ম একসময় ছড়িয়ে পড়ে। যার বিপুল প্রভাব এখনো বিদ্যমান।

শাক্যমুণি গৌতমবুদ্ধর প্রধানতম শিক্ষা ও প্রার্থনা হলো জগতের সকল প্রাণী সুখী হউক। সিদ্ধার্থ গৌতমের ধর্ম গ্রহণ করে সম্রাট অশোক তা তাঁর রাজত্বের দিকে দিকে ছড়িয়ে দেন। সম্রাট অশোক লুম্বিনীতে তীর্থভ্রমণ করাকালীন একটি স্তম্ভ স্থাপন করেন। সেই স্তম্ভে ব্রাহ্মী লিপিতে শাক্যমুনি বুদ্ধ কথাটি পাওয়া যায়। এর অর্থ করা যায় শাক্যদের মধ্যে তপস্বী ও আলোকপ্রাপ্ত।

মহামতি বুদ্ধের বাণী প্রথম দিকে ছিল শ্রুতি নির্ভর। পরবর্তীতে তা ভিনায়া বা প্রচারকদের (বর্তমানকালের শ্রমন বা ভান্তে) জন্য প্রতিপালনীয় বিধান ও সুত্ত পিতাকা বা বুদ্ধদেবের উপদেশসমূহ তাঁর শিক্ষা হিসাবে লিপিবদ্ধকরণ করা হয়। আরও পরে তাঁর অনুসারীরা অভিধর্ম, জাতক কাহিনী, মহাযান সূত্র ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থ প্রকাশ করেন। তার মধ্যে জাতক কাহিনীতে সিদ্ধার্থ গৌতমের পূর্ববর্তী জন্মসমূহের কথা লিপিবদ্ধ আছে। আলোকপ্রাপ্ত হয়ে পুনর্জন্ম থেকে মহামুক্তির আগে তিনি পূর্ব জন্মসমূহের কথা স্মরণ করতে পেরেছিলেন।বেশিরভাগ বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ আদিকালে পালি ভাষায় লিখিত হয়েছিল।

জ্ঞান অন্বেষণকে বৌদ্ধ ধর্ম সর্বোচ্চ মর্যাদা দেয়। বৌদ্ধ যুগেই পৃথিবীর বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় রূপে পরিচিত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। আমরা গর্ব বোধ করতে পারি যে আমাদের মাটির সন্তান অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান বৌদ্ধ ধর্মকে তিব্বতে প্রচারে প্রধানতম ভূমিকা রাখেন।তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্ম রাজধর্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ও সেখান থেকে চীন,কোরিয়া,জাপান সহ এশিয়ার দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

ইতিহাসের এক পর্যায়ে ভারতবর্ষের বিশাল এলাকায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রাবল্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।সম্রাট অশোকের কন্যা সংঘমিত্রা এই ধর্মকে সিংহল দ্বীপে(বর্তমান শ্রীলঙ্কা) প্রসারিত করেন।আজও পৃথিবীতে বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীরা বিভিন্ন ধারায় তাঁদের মহান শান্তির ধর্মকে পালন ও সংরক্ষণ করে যাচ্ছেন। 

লেখক: প্রাবন্ধিক ও পরিব্রাজক

   

শুভ জন্মতিথি মহীয়সী কবি সুফিয়া কামাল



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
কবি সুফিয়া কামাল

কবি সুফিয়া কামাল

  • Font increase
  • Font Decrease

সুফিয়া কামাল কেবল একটি নাম নয়, এ যেন পরিবর্তনের জোয়ার। বাঙালি নারীর অন্ধকার জীবনে অধিকারের একটি মশাল আলোকিত ব্যক্তি ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। এখনকার নারীবাদী দেখলে অধিকাংশ মানুষ কেমন আতঙ্ক প্রকাশ করে নাক সিটকায়! তবে প্রকৃত নারীবাদী, যারা হাজার হাজার নিপীড়িত নারীকে শোষণ ও অত্যাচার থেকে বাঁচিয়ে স্বাধিকারে সোচ্চার করতে সাহায্য় করেছেন তেমন নারীবাদীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কবি সুফিয়া। নারী প্রগতি আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তি গড়ে এবং একাধারে আন্দোলনের অংশ ছিলেন তিনি। অনন্য ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এই মহীয়সী নারীর জন্মতিথি আজ।

১৯১১ সালের ২০ জুন (১০ আষাঢ় ১৩১৮ বঙ্গাব্দ) বরিশালের শায়েস্তাবাদে জন্মগ্রহণ করেছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। আজ (বৃহস্পতিবার) আমাদের দেশের ই ‘নারী জাগরণের অগ্রদূত’ মহীয়সী এই নারীর ১১৩ তম জন্মবার্ষিকী। ‘জননী সাহসিকা’ হিসেবে খ্যাত কবি সুফিয়ার ছোটবেলা কেটেছিল তার মাতুতালয়ে। করি জন্মের পরপরই তার বাবা সাধক অনুসারী হয়ে সংসার ত্যাগ করেন। তারপর থেকে মা সাবেরা খাতুনের সঙ্গে তার নানাবাড়ি শায়েস্তাবাদের নবাব পরিবারে থাকার সময়ই তার হাতেখড়ি হয়। নারীশিক্ষার প্রথা প্রচলিত না থাকায় অন্দরেই অন্য শিশুদের সাথে তিনি উর্দু, আরবি, ফারসি ভাষা শিখতেন। পরবর্তীতে একটু বড় মায়ের কাছেই তিনি বাংলা শিখতে শুরু করেন। কে জানতো,পরবর্তীতে এই বাংলার সাহিত্য তারই হাত ধরে বিশাল এক যাত্রা সম্পন্ন করবে!

রক্ষণশীল পরিবারে বড় হওয়ায় তার ব্যক্তিত্ব ছিল বিশেষ। মাত্র ৭ বছর বয়েসে তিনি বেগম রোকেয়ার সাক্ষাৎ পান কলকাতায়। তবে পারিবারিক কারণেই সুযোগ পেয়েও বেগম রোকেয়ার ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল’ স্কুলে ভর্তি হওয়া হয়নি। তবে স্কুলে কখনো যাওয়া না হলেও ছোটথেকেই তার মেধা সুপ্ত রাখার উপায় ছিল না। যদিও মাত্র ১২ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়ে যায় মামাতো ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সঙ্গে। তবে স্বামীর সহযোগিতায় বাংলা সাহিত্য চর্চার পথ সুগম হয় কবির। স্বামী নেহাল ছিলেন একজন নারীশিক্ষা সমর্থক এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তাচেতনাসম্পন্ন ব্যক্তি। পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়েও তিনি স্ত্রী সুফিয়াকে পত্রিকায় লেখা ছাপানোর সুযোগ করে দিয়ে সাহায্য করেন।      

কবি সুফিয়া কামাল

১৯২৬ সালে তার প্রথম কবিতা বাসন্তী ছাপা হয় সওগাত পত্রিকার চৈত্র সংখ্যায়। এরপর আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সাঁঝের মায়া, কেয়ার কাঁটা, মায়া কাজল, মন ও জীবন, প্রশস্তি ও প্রার্থনা, উদাত্ত পৃথিবী, ইতল-বিতল, দিওয়ান, সোভিয়েতে দিনগুলি, অভিযাত্রিক, মৃত্তিকার ঘ্রাণ, একাত্তরের ডায়েরী, নওল কিশোরের দরবারে, একালে আমাদের কাল- সহ আরও অসংখ্য সাহিত্যকর্মের সৃষ্টি করেছেন তিনি। কলকাতায় থাকার সময় তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র, বেগম রোকেয়া নানান কিংবদন্তী সাহিত্যিকের সান্নিধ্যে আসেন। তার চিন্তা-চেতনা এবং সাহিত্যের অনুপ্রেরণা হিসেবে সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগান তিনি।

জীবনের মাঝামাঝি স্বামী নেহাল হোসেনের হঠাৎ মৃত্যুতে (১৯৩২ সাল) বেসামাল হয়ে পড়েছিলেন কবি সুফিয়া। তখন তিনি কলকাতা কর্পোরেশন স্কুলে শিক্ষকতা এবং বেগম পত্রিকার সম্পাদনা করতে শুরু করেন একাধারে। এর কিছু বছর পর তিনি ১৯৩৯ সালে কামালউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে দ্বিতীয়বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন কবি এবং এখানে সাহিত্যচর্চা ও নারীস্বার্থে কাজ চালিয়ে যান। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এমনকি ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধকরণের প্রতিবাদে তিনি পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধেও যান।

কবি সুফিয়া কামাল

তার গঠিত নারী সংগঠন ১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলনে সমাবেশ ও মিছিরে অংশগ্রহণ করে, যার মূলহোতা ছিলেন কবি সুফিয়া নিজেই। মুক্তযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও পাকিস্তানী গোয়েন্দাদের নজর ফাঁকি দিয়ে তিনি সাহসিকতার সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করে গেছেন। সুযোগ পেয়েও দেশের বাইরে চলে যাওয়াকে প্রত্যাখ্যান করে, মৃত্যুর সম্ভাবনাকে একপাশে ঠেলে সরিয়ে অনবরত ষোলআনা দেশপ্রেমের প্রমাণ দিয়ে গেছেন।        

যুদ্ধের পরও তিনি আমৃত্যু বাংলা সাহিত্য এবং নারী অধিকার উন্নতির লক্ষ্যে সংগ্রাম ও সাহায্য করে গেছেন। বাঙালি আজীবন মহীয়সী এই নারীকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। যতদিন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য রয়েছে,  কবি সুফিয়া কামালের কৃতিত্ব অমলিন রয়ে যাবে।

;

চিড়িয়াখানায় বাঘদের খুনসুটি আর ভালোবাসার একান্ত মুহূর্ত



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
একে অপর আদর করে দিচ্ছেন দুই বাঘ/ছবি: নূর এ আলম

একে অপর আদর করে দিচ্ছেন দুই বাঘ/ছবি: নূর এ আলম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঈদের ২য় দিন; মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। রাজধানীজুড়ে বিশ্রি রকমের ভ্যাপসা গরম। এর মধ্যেও ঢাকার চিড়িয়াখানা পশু-প্রাণী দেখতে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। মা-বাবার হাত ধরে উৎসুক শিশুরা পশু-প্রাণীর খাঁচায় খাঁচায় উঁকি দিচ্ছে।

চিড়িয়াখানাজুড়ে দর্শনার্থীদের পদচারণা দেখে খাঁচাবন্দি বাঘগুলোও যেন উচ্ছ্বসিত। খাঁচার ভেতরে সবুজ ঘাসে একে অন্যের সঙ্গে মেতে উঠেছে খুনসুটি ও খেলাধুলোতে। একের অন্যটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। একে অপরকে খেলাচ্ছলে কামড়ে ধরছে। কেউ আবার অদূরে চুপটি করে বসে অন্যদের খুনসুটি দেখছে।

চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের মতে, বাঘ-বাঘিনীদের এমন দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। তবে ঈদের পরের দিন সেই উচ্ছল বাঘদের খেলার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেছেন বার্তা২৪.কম এর ফটো এডিটর নূর এ আলম।

সঙ্গী ছাড়া হতে চাচ্ছে না বাঘটি, তাই তো আঁকড়ে দিচ্ছে পা টেনে ধরে/ছবি: নূর এ আলম


আদরে ভরিয়ে দিচ্ছে একে অপরকে, আর ভালোবাসার এই খুনসুটি চেয়ে দেখছে আরেকটি বাঘ/ছবি: নূর এ আলম


চিড়িয়াখানায় বাঘদের এমন খেলার দৃশ্য তেমন একটা দেখা যায় না/ছবি: নূর আলম


খুনসুটি আর মায়ার আলিঙ্গন/ছবি: নূর এ আলম


চিড়িয়াখানায় বাঘটি আয়েশি মুডে নিরিবিলি সময় কাটাচ্ছে/ছবি: নূর এ আলম


চিড়িয়াখানা পশুদের মধ্যে বাঘ অন্যতম আকর্ষণ, তাই তাদের উচ্ছল চলাফেরা বেশ উপভোগ্য ছিল/ছবি: নূর এ আলম


;

সরেজমিন কৌশল্যা: বদলে যাচ্ছে গ্রাম



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
সরেজমিন কৌশল্যা: বদলে যাচ্ছে গ্রাম

সরেজমিন কৌশল্যা: বদলে যাচ্ছে গ্রাম

  • Font increase
  • Font Decrease

কৌশল্যা, দাগনভূঁইয়া, ফেনী থেকে: "অবারিত মাঠ গগন ললাট, চুমে তব পদধূলি; ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়, ছোট ছোট গ্রামগুলি", রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার গ্রাম এখন বইয়ের পাতায় আছে, বাস্তবে নেই। ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় গ্রামগুলো এখন পরিবর্তমান। আধুনিক জীবনের ছোঁয়ায় বদলে গেছে চিরায়ত গ্রামের চিরচেনা দৃশ্যপট।

"গ্রামের ফসলের মাঠ কমছে। টিনের বাড়িঘর হারিয়ে যাচ্ছে। সর্বত্র পাকা সড়ক। যান্ত্রিক যান চলে আসে ঘরের দুয়ারে। বিদ্যুৎ সহজলভ্য। জোনাকির আলোজ্বলা নিঝুম গ্রাম খুঁজে পাই না আমরা", বললেন জামাল স্যার। তার সাথে কথা হচ্ছিল কৌশল্যা গ্রামের কাজী বাড়ির দহলিজে।

কৌশল্যা গ্রামটি বেশ চমৎকার। ভৌগোলিক দিক থেকেও কৌশলপূর্ণ। ফেনী জেলা সর্বউত্তরের গ্রাম এটি। তার পশ্চিমে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ও নাঙলকোট উপজেলার সীমান্ত। দক্ষিণে লাগোয়া নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ি ও সেনবাগ উপজেলা।


বুধবার (১৯ জুলাই) ভোরে চট্টগ্রাম থেকে গাড়ি অতিদ্রুতই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী-মহিপাল পয়েন্টে চলে এসেছে। মহিপাল থেকে ডানের রাস্তা গিয়েছে ফেনী শহরে। বামে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর। এ পথে কিছুদূর এগিয়ে দাগনভূঁইয়া। তারপর উপসড়ক ধরে কৌশল্যা গ্রাম। পথেঘাটে ঈদের আমেজ থাকায় যানজটের বালাই নেই। আমরা খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছেছি ছুটির ঢিলেঢালা ট্রাফিক পেরিয়ে।

গ্রামে এসেও অবাক হতে হলো। গ্রাম কোথায়? পাকা সড়ক, পাকা বাড়ি, মাঝেমাঝে কিছু সবুজ ধানখেত। কিছুক্ষণ পর পর দামী গাড়ি ছুটে যাচ্ছে গ্রামে ভেতর দিয়ে।

"এই গ্রামের প্রতিটি ঘরে প্রবাসী আছেন। চাকরিজীবীও কম নন। ঈদের ছুটিতে তারা সপরিবারে বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। সবারই নিজের কিংবা রেন্টাল কার আছে। সোজা হাজির হচ্ছেন বাড়ির উঠানে", বললেন 'ফেনী রিডার্স ফোরাম'-এর এক সদস্য।

Caption

'ফেনী রিডার্স ফোরাম' নিয়মিত স্টাডি সার্কেল করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী নিয়ে। সদস্যরা সকলেই স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর। চাকরি ও ব্যবসায় জড়িত। অবসরে পড়াশোনার অভ্যাস চালিয়ে রেখেছেন।

গ্রামে আরো কয়েকজন শিক্ষিত যুবকের সঙ্গে কথা হলো। অধিকাংশই চাকরিজীবী। ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ফেনীতে চাকরি করেন না। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাড়ি আসেন। তাীা জানালেন, "মানুষের আয়-রোজগার বেড়েছে। জমিজমার দামও বাড়ছে। অনেকেই পাকা বাড়ি করায় ফসলী জমি কমছে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না বাড়ায় শিক্ষার হার বাড়ছে না"।

কৌশল্যা গ্রামের উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো সবুজায়ন। নানা পরিবর্তনের পরেও পুরো গ্রাম সবুজে ছাওয়া। প্রায়-প্রতিটি বাড়ির আঙিনা ও খোলা জায়গা শাকসবজি চাষ করা হচ্ছে। হাঁস-মুরগী পালিত হচ্ছে প্রত্যেক বাড়িতে।


গ্রামের সাংস্কৃতিক জীবন পুরোপুরিভাবে গ্রাস করেছে টিভি চ্যানেলগুলো। পথে বের হলেও টিভির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। "খেলার মাঠ নেই গ্রামে। ফসল কাটা হলে ক্ষেতগুলোতে ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করে। বাকি সময় টিভি বা মোবাইলে ব্যস্ত থাকে তার", বললেন জামাল স্যার।

মেঘলা আকাশে টিপটিপ বৃষ্টিতে গ্রাম ঘুরে ফিরে আসার সময় একটি ট্রানজিশনাল পিকচার নিয়ে এলাম। গতানুগতিক গ্রাম ক্রমশ আধুনিকায়নের পথে পাড়ি দিচ্ছে এক তুমুল সন্ধিক্ষণ। সমাজ বদলের ধারায় হয়ত অচিরেই আদি গ্রামের জায়গা দখল করবে আধুনিক নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনা। যুক্ত হবে নতুন অনেক কিছু। আবার হারিয়েও যাবে ঐতিহ্যবাহী অনেক বিষয়ও। এই বদলের সবটাই ভালো হবে, এমন নয়। ভালোগুলোকে ধরে রাখার মাধ্যমে পালাবদলকে গ্রহণ করতে পারলেই হবে প্রকৃত উন্নয়ন। নইলে বদল হবে, উন্নয়ন হবে না।

;

দিল্লি: মৃত্যুহীন এক মহানগরী



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
দিল্লি: মৃত্যুহীন এক মহানগরী

দিল্লি: মৃত্যুহীন এক মহানগরী

  • Font increase
  • Font Decrease

দিল্লির অস্তিত্ব ও আত্মা বেঁচে আছে পুরনো শহরে। নতুন দিল্লি, গুরগাঁও, নয়ডা মিলিয়ে ভারতের জাতীয় রাজধানী দিল্লির বিশাল চৌহদ্দীর মধ্যে নতুনত্ব থাকলেও ঐতিহ্য সামান্যই। ইতিহাস ও ঐতিহ্য মিশে আছে পুরনো দিল্লির ইমারতে, হর্ম্যে, অট্টালিকায়. দুর্গে, পথেঘাটে, ধ্বংসস্তূপে, বাতাসে।

পুরনো দিল্লির ইতিহাস লিখতে গিয়ে আশির দশকের গোড়ার দিকে নারায়ণী গুপ্ত মন্তব্য করেছিলেন, ‘দিল্লির যে কত বার মৃত্যু হয়েছে!’ বিশিষ্ট ইতিহাসবিদের এই উক্তি স্মরণ করে কল্যাণী দেবকী মেনন মেকিং প্লেস ফর মুসলিমস ইন কন্টেম্পোরারি ইন্ডিয়া গ্রন্থে লিখেছেন, ‘প্রতিটি মৃত্যু এক একটি রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক রূপান্তর সাধন করেছে। মুঘল শাহজাহানাবাদ হয়েছে ব্রিটিশ-শাসিত দিল্লি। ব্রিটিশরা তাদের রাজধানী নয়াদিল্লিতে সরিয়ে নিয়ে গেলে আদি শহর হয়ে গেছে পুরানা দিল্লি। ঔপনিবেশিক জমানার সংঘাতময় অবসানের পরেও দিল্লি বার বার ভেতর থেকে আক্রান্ত হয়েছে। মরেছে। এবং পুনর্জন্ম লাভ করেছে।’

১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, পরবর্তীতে নানা কারণে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক হিংসা, বিশেষত আশির দশকে ইন্দিরা গান্ধী নিহত হলে শিখ নিধন আর করোনার আগে আগে নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকালে মুসলিমদের বিরুদ্ধে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ দিল্লির অস্তিত্বে রক্ত ও কলঙ্কের ছাপ রেখেছে। কর্পোরেট আগ্রাসনের প্রতিবাদে দীর্ঘমেয়াদী কৃষক আন্দোলন অনতি-অতীতে দিল্লির প্রতিবাদী চেহারা সামনে নিয়ে আসে। দিল্লি হালআমলে আলোচিত বায়ু দুষণের কারণে শীর্ষস্থান লাভকারী শহর হিসাবে। এমনকি, দিল্লির ইতিহাসে সর্বোচ্চ উষ্ণতার রেকর্ডও হয়েছে ২০২৪ সালে। চরম উত্থান ও পতনে, সঙ্কটে ও সন্ধিক্ষণে দিল্লি যেন মৃত্যুহীন এক মহানগরী: স্ফিনিক্স পাখির মতো ছাইভষ্মের ভেতর থেকে বার বার পুনর্জন্ম পেয়েছে দিলওয়ালাদের এই শহর দিল্লি। সংখ্যাতীত রাজা-বাদশাহের পাশাপাশি যে শহরের দ্যুতিময় চরিত্র হয়ে আছেন আমীর খসরু, তানসেন, মীর্জা গালিব থেকে শুরু করে দিল্লিওয়ালা শাহরুখ খান। দিল্লির বাসিন্দাদের বলা হয় দেহলভি, যে টাইটেল গ্রহণ করে বহু খ্যাতনামা দিল্লিবাসী স্থান পেয়েছেন ইতিহাসের অলিন্দে।       

অক্টাভিও পাজ (লোজানো) নোবেল বিজয়ী (১৯৯০) লাতিন কবি ও কূটনীতিবিদ দিল্লিতে বাস করেন মেক্সিকান রাষ্ট্রদূত হিসাবে। তার কাছে দিল্লির স্থাপত্য ছিল শব্দ ও কবিতার একটি সংমিশ্রণ। পুরনো দিল্লিতে তিনি দেখেছিলেন ‘প্রাচীন স্থাপনার চিত্ররূপ‘সমাবেশ an assemblage of images more than buildings. তিনি নতুন দিল্লিকে চিহ্নিত করেন অবাস্তব (unreal)। আর পুরনো দিল্লিতে খুঁজে পান উনিশ শতকের গথিক স্থাপত্যের লন্ডন ও প্রাচীন ব্যাবিলন শহরের ছাপ। যে শহরের নন্দনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য সুরম্য দালানের ছায়া পেরিয়ে শত শত গল্প, উপন্যাস, ইতিহাস বইয়ের পাতায় মিশে আছে অক্টোভিও পাস ছাড়াও ভিক্টর হুগো, ওয়াল্টার স্কট, আলেকজান্ডার দ্যুমা প্রমুখের লেখনির মাধ্যমে। ভারতের অভিজ্ঞতায় ওক্টাভিও পাজ আস্ত একটি গ্রন্থ রচনা করেন In Light of India শিরোনামে।

দিল্লি জনপদের প্রথম উল্লেখ করে প্রাচীন মহাকাব্য মহাভারত, যেখানে যুদ্ধরত চাচাত ভাইদের দুটি দল, পা-ব এবং কৌরবদের সম্পর্কে রোমাঞ্চকর-মহাকাব্যিক বর্ণনা রয়েছে। পা-ব এবং কৌরব, উভয়েই ভরতের বংশধর ছিলেন। আখ্যান অনুসারে, পা-বদের রাজধানী ছিল দেবতা ইন্দ্রের শহর ইন্দ্রপ্রস্থ। যদিও ইন্দ্রপ্রস্থ নামে কিছুই অবশিষ্ট নেই তথাপি কিংবদন্তি অনুসারে এটি ছিল একটি সমৃদ্ধ শহর, যা দিল্লির পূর্বনাম। তবে দিল্লি নামক স্থানের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতকে, যখন রাজা ধিলু দক্ষিণ-পশ্চিম দিল্লিতে বর্তমান কুতুব মিনার টাওয়ারের স্থানে একটি শহর তৈরি করেছিলেন এবং নিজের নাম ধিলু থেকে দিল্লি নামকরণ করেছিলেন।

পরবর্তীতে বর্তমান দিল্লি টায়াঙ্গেল নামে পরিচিত এলাকার অনঙ্গপুর বা আনন্দপুরে নামক স্থানে তোমারা রাজবংশের কথা জানা যায়, যারা আরো পশ্চিম দিকে ‘লালকোট’ নামের প্রাচীর ঘেরা দুর্গে চলে আসেন। ১১৬৪ সালে পৃথ্বীরাজ সেখানে আরো বিশাল প্রাচীর নির্মাণ করে জায়গাটির ‘কিলা রাই পিথোরা‘ নাম দেন। ১২ শতকের শেষের দিকে মুসলিম বিজয়ী মুহাম্মদ ঘোরী রাজা পৃথ্বীরাজকে পরাজিত করে দিল্লিসহ সমগ্র উত্তর ভারত অধিকার করেন। তিনিই প্রথম দিল্লির পরিকল্পিত বিকাশের সূচনা করেন। দিল্লিকে রাজধানী করে তিনি তার সেনাপতি কুতুবুদ্দীন আইবেককে শাসনকার্যের দায়িত্ব দিয়ে নিজ স্বদেশ আফগানিস্তান-ইরান সংলগ্ন ঘোর প্রদেশে ফিরে যান। ইতিহাসকারগণ মুহাম্মদ ঘোরীকে রাজধানী দিল্লির প্রতিষ্ঠাতা মনে করেন।

১৩ শতকের শেষের দিকে খিলজি বংশ দিল্লির ক্ষমতায় আসে। খিলজিদের রাজত্বকালে মোঙ্গল লুণ্ঠনকারীরা দিল্লি শহরকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। মোঙ্গলদের পরবর্তী আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা হিসাবে দিল্লির শাসক আলাউদ্দিন খিলজি কুতুব মিনার থেকে অল্প দূরে উত্তর-পূর্ব দিকে ‘সিরি’ নামক স্থানে একটি নতুন বৃত্তাকার সুরক্ষিত শহর তৈরি করেছিলেন, যাকে খিলজি রাজধানী রূপে মনোনীত করা হয়। দিল্লির ভেতরে ‘সিরি‘ছিল প্রথম নতুন ও পরিকল্পিত শহর। আর আলাউদ্দির খিলজি ছিলেন বাইরের শত্রুর আক্রমণ থেকে দিল্লিকে রক্ষাকারী প্রথম সফল শাসক।

খিলজিদের পর দিল্লি ১৩২১ সালে তুঘলক রাজবংশের অধীনস্থ হয়। গিয়াসউদ্দিন তুঘলক ‘তুঘলকাবাদ‘ নামে একটি নতুন রাজধানী নির্মাণ করেন। কিন্তু কুতুব মিনারের কাছাকাছি স্থানটিকে পানির অভাবের কারণে পরিত্যাক্ত ঘোষণা করতে হয়। আরেক শাসক মুহাম্মদ ইবনে তুঘলক শহরটিকে আরো উত্তর-পূর্ব দিকে প্রসারিত করেন। তিনি চারপাশে শক্ত প্রাচীর বেষ্টিত একটি দুর্গও নির্মাণ করেন। তিনিই আবার রাজধানীকে দক্ষিণ দিকে প্রসারিত করে দেওগিরি মালভূমির প্রান্তে দৌলতাবাদ নামের আবাস গড়েন। পরবর্তী শাসক ফিরোজ শাহ তুঘলক দৌলতাবাদ পরিত্যাগ করে ১৩৫৪ সালে উত্তর দিকের ইন্দ্রপ্রস্থের প্রাচীন স্থানের পাশে ফিরোজাবাদ নামে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন, বর্তমানে যা ‘ফিরোজ শাহ কোটলা‘ নামে প্রসিদ্ধ।  

দিল্লির শান-শওকত বাড়াতে মুহাম্মদ ঘোরির পদাঙ্ক অনুসরণ করে খিলজি, তুঘলক, তৈমুর, সাইয়িদ, লোদি রাজবংশ পুরনো রাজধানী ফিরোজাবাদের আশেপাশে নানা নির্মাণ ও স্থাপনায় ভরিয়ে দেন, যা আরো সমৃদ্ধি লাভ করে মুঘল শাসনামলে। মুঘল শাসনের প্রতিষ্ঠাতা জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর ১৫২৬ সালে দিল্লির সন্নিকটের পানিপথ প্রান্তরের যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে আগ্রায় তার ঘাঁটি স্থাপন করেন। বাবরের পুত্র নাসিরউদ্দিন মুহাম্মদ হুমায়ুন দিল্লির যমুনা তীরে একটি নতুন আবাসস্থল গড়েন। শেরশাহের কাছে হুমায়ুন পরাজিত হলে তার আবাসও গুরুত্ব হারায়। শেরশাহ দিল্লির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে শেরশাহী কিল্লাহ স্থাপন করেন, যা বর্তমানে পুরনো কিল্লাহ দুর্গ নামে পরিচিত।

শেরশাহের মৃত্যুর পর দিল্লি তথা ভারতের শাসন পুনরায় মুঘলদের হস্তগত হয়। হুমায়ুন-পুত্র আকবর এবং পরবর্তী শাসকগণ দিল্লির উন্নতিতে কাজ করেন। যদিও তাদের রাজধানী ছিল আগ্রা, ফতেহপুর সিক্রি, লাহোর তথাপি সামরিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অক্ষুন্ন থাকে। মুঘল স¤্রাট শাহজাহানের নাম দিল্লির ইতিহাসে একজন অন্যতম প্রধান নির্মাতা রূপে উজ্জ্বল হয়ে আছে। তিনি তার প্রকৌশলী, স্থপতি ও জ্যোতিষীদের রাজধানী আগ্রা ও লাহোরের মধ্যবর্তী কোথাও হালকা জলবাযু ও কৌশলগত অবস্থানের একটি জায়গায় নতুন রাজধানী স্থাপনের নির্দেশ দেন। সর্বসম্মতভাবে শেরশাহ নির্মিত দিল্লির পুরনো কিল্লাহর ঠিক উত্তরে যমুনা নদীর পশ্চিম তীরে স্থান নির্বাচিত হয়। স¤্রাট শাহজাহান তার দুর্গ ‘উর্দু-ই-মুয়াল্লা‘কে কেন্দ্র করে নতুন রাজধানী ‘শাহজহাানাবাদ‘ নির্মাণ শুরু করেন, যা বর্তমানে লাল কিল্লাহ নামে পরিচিত। লাল কিল্লাহ নির্মাণে সময় লাগে আট বছর। সঙ্গে জামা মসজিদসহ আরো অনেক নান্দনিক স্থাপনা তৈরি করেন শাহজাহান। যেগুলোর অধিকাংশই ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত ওয়াল্ড হেরিটেজ বা বিশ^ঐতিহ্যের অংশ। শাহজাহান তার নতুন রাজধানীকে অনেকগুলো প্রাচীর ও গেট দিয়ে সুশোভিত করেন। যার মধ্যে কাশ্মীরি গেট, দিল্লি গেট, আজমেরি গেট, তুর্কমান গেট বর্তমানেও দাঁড়িয়ে আছে। বস্তুতপক্ষে, পুরনো দিল্লির বৃহত্তর অংশ শাহজাহান কর্তৃক নিমিত। এ কারণে, পুরনো দিল্লির আরেক নাম শাহজাহানাবাদ।

১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনকালে দিল্লি নানা শক্তির দ্বারা লুণ্ঠিত ও আক্রান্ত হয়। যেহেতু শেষ দিকের দিল্লির শাসকগণ যথেষ্ট শক্তিশালী ছিলেন না, ছিলেন দুর্বল ও ক্ষয়িষ্ণু, সেহেতু শিখ, মারাঠা, পারসিক সেনাদল দিল্লি আক্রমণ ও লুটপাট করে। সবচেয়ে জঘন্য হামলা চালিয়ে দিল্লি দখল করে ইংরেজরা। সিপাহী বিদ্রোহের সময় দিল্লির শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর স্বাধীনতার নেতৃত্ব দিয়ে ইংরেজদের হাতে পরাজিত হওয়ায় চরম লাঞ্ছনা, প্রতিহিংসা ও বর্বরতার সম্মুখীন হন। মুঘল রাজপুরুষ ও নারীদের ধরে ধরে হত্যা করা হয়। নগরে চালানো হয় গণহত্যা। মুঘল ঐতিহ্যের নানা নিদর্শন তথা বই, পুস্তক, অলঙ্কার, চিত্রশিল্প লুট করা হয়। অনেক কিছুই জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। হাজার বছরের দিল্লি ইংরেজের আগমনে মÍব্ধ কবরগাহের চেহারা লাভ করে।

১৯১১ সালে কলকাতা থেকে ব্রিটিশ শাসনের রাজধানী দিল্লি স্থানান্তরিত হলে ঐতিহ্যবাহী নগরের মর্যাদা ও সমৃদ্ধি আবার ফিরে আসে। নতুন ব্রিটিশ প্রশাসনিক কেন্দ্র রূপে দিল্লিকে গড়ে তুলতে স্যার এডউইন লুটিয়েন্স-এর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠিত হয়। তিনি যে শহরের রূপ দেন তা বর্তমানের নতুন দিল্লি। ১৯৩১ সালে পরিকল্পিত নতুন দিল্লির নির্মাণ সমাপ্ত হয়, যাকে বলা হয় ‘লুটিয়েন্সের দিল্লি‘।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানে ভারতের স্বাধীনতা অর্জিত হলে দিল্লিকে রাজধানী করা হয়। ক্রমেই শাহজাহানাবাদ ও লুটিয়েন্সের দিল্লি একটি আধুনিক মেট্রোপলিটনের অবয়ব লাভ করে যমুনা নদী বরাবর উত্তর ও দক্ষিণ দিক ছাড়িয়ে পূর্ব ও পশ্চিমেও প্রসারিত হয়। জাতীয় রাজধানীর মর্যাদা পেয়ে বৃহত্তর দিল্লির পাশের উত্তর প্রদেশ ও হরিয়ানা রাজ্যের কিছু অংশকেও নিজের অন্তর্ভূক্ত করে। প্রাথমিকভাবে দেশভাগের পর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত শিখ শরণার্থীদের চাপ বৃদ্ধি পায় দিল্লিতে। পরে সিন্ধিসহ আরো অনেক জনগোষ্ঠী নতুন দিল্লির নানা স্থানে বসতি স্থাপন করে। দিল্লিতে উর্দুভাষী মুসলিমরা প্রাচীনকাল থেকেই বসবাস করছেন। তদুপরি ভারতের নানা প্রান্তের মানুষের আগমনে দিল্লি একটি বৈচিত্র্যময় ম্যাগাসিটিতে পরিণত হয়েছে, যা এখন বাযু দূষণ ও তাপবৃদ্ধির কারণে দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষতম বিপদজনক শহর। রাজনৈতিক কারণেও দিল্লি সর্বদা উতপ্ত থাকে। নানামুখী আন্দোলন, দাঙ্গা-হাঙ্গামা দিল্লির ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। যাবতীয় সমস্যা ও অসঙ্গতি নিয়েও দিল্লি এক মৃত্যুহীন এক মহানগরী হয়ে বেঁচে  থেকে ইতিহাসের স্পন্দন জাগাচ্ছে।

ড. মাহফুজ পারভেজ: অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম; চেয়ারম্যান ও প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ, বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

;