কওমি মাদরাসার মুহতামিমদের প্রতি অনুরোধ

মুহাম্মদ এহসানুল হক, অতিথি লেখক
দেশের অন্যতম শীর্ষ কওমি মাদরাসা, জামিয়া রাহমানিয়া, মোহাম্মদপুর, ঢাকা, ছবি: সংগৃহীত

দেশের অন্যতম শীর্ষ কওমি মাদরাসা, জামিয়া রাহমানিয়া, মোহাম্মদপুর, ঢাকা, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনাভাইরাস আতঙ্কে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ এখন গৃহবন্দী। থেমে গেছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। স্থবির হয়ে আছে প্রাণচাঞ্চল্য। পৃথিবী আবার কবে স্বমহিমায় জেগে উঠবে- সেটা বলা মুশকিল। তবে এটা নিশ্চিত- পরিস্থিতি সহসাই উন্নতি হচ্ছে না। বিপদ শুধু করোনাই নয়, চলমান লকডাউন আর অঘোষিত কারফিউর ফলে সামনে ধেয়ে আসছে অর্থনৈতিক সঙ্কটও।

কওমি মাদরাসায় শিক্ষকতা করে যাদের জীবন চলে তাদের অনেকের জীবন এখন এই গভীর সঙ্কটের মুখোমুখি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু মাদরাসা শিক্ষকের অর্থ কষ্টের বেদনাদায়ক সংবাদ এসেছে। এটা নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। গুটিকয়েক মুহতামিমের (পরিচালক, অধ্যক্ষ) ভুল সিদ্ধান্তের কারণে গোটা মুহতামিম সমাজকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে। তৈরি হয়েছে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

মনে রাখা দরকার, কওমি মাদরাসাগুলোর চলমান অবস্থান, শিক্ষা কার্যক্রমের সাফল্য, অবকাঠামো ও আবাসন ব্যবস্থার উন্নতিসহ সবকিছুর পেছনে সিংহভাগ অবদান মুহতামিমদের। এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। মুহতামিমদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর সাধনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে মাদরাসাগুলো।

প্রায় দশ বছর হচ্ছে, কওমি মাদরাসায় শিক্ষকতা করছি। এই এক দশকে কিছু অভিজ্ঞতাও অর্জন করার সুযোগ হয়েছে। আশপাশে অনেক মুহতামিমকে দেখেছি তাদের জীবন-যৌবন মাদরাসার কল্যাণে উৎসর্গ করতে। মাদরাসার উন্নতি-অগ্রগতির জন্য তাদের পরিশ্রম, প্রবীন উস্তাদদের প্রতি তাদের সম্মান, ছোটদের প্রতি তাদের স্নেহ দেখে মুগ্ধ হয়েছি। এভাবে প্রতিটি মাদরাসার মুহতামিম নিজেদের সবোর্চ্চ মেধা ও শ্রম ব্যয় করে তিলে তিলে গড়ে তুলেন প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে হ্যাঁ, ব্যতিক্রম কিছু ঘটনাও রয়েছে। তাই, বিচ্ছিন্ন দু’একটি ঘটনার কারণে ঢালাওভাবে মুহতামিমদের সমালোচনা করা সমীচীন নয়। এটা প্রত্যাশিত ও ভদ্রতাপূর্ণ আচরণ নয়।

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, করোনাকালীন এই সঙ্কটকালেও মুহতামিমরাই হাল ধরবেন- ইনশাআল্লাই। আল্লাহ না করুক এ সঙ্কট সামনের দিনগুলোতে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। সে জন্য আমাদের এখনই প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। সাধ্যের সবটুকু দিয়ে মুহতামিমদের কল্যাণকর ভূমিকা পালন করতে হবে। একজন মাদরাসা শিক্ষকও যেন কষ্টে না থাকেন সেই চেষ্টা করতে হবে। মাদরাসা পরিচালনা করতে যেয়ে অতীতে প্রচুর সঙ্কট তারা মোকাবিলা করেছেন, বর্তমান সঙ্কটে তাদের করণীয় কী- এটা আমার চেয়ে তারা ভালো বুঝেন। তবুও কিছু ভাবনা বিনিময় করি। দু'একটি কথা কারও কাজে লাগতে পারে।

এক. কওমি মাদরাসা গুলোর অভিভাবক সংগঠন বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বেফাক। বেফাকের পক্ষ থেকে মাদরাসা বন্ধের ঘোষণা ছাড়া এখন পযর্ন্ত আর কোনো দিক-নিদের্শনা আসেনি। কিন্তু আসা দরকার ছিল। ঢাকার বড় মাদরাসাগুলোর মুহতামিমদের অনেকেই বেফাকের দায়িত্বশীল। এমতাস্থায় আপনারা আলোচনা করে করণীয় ঠিক করুন। অর্থকষ্টে থাকা মাদরাসাগুলোর জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা অপরিহার্য। নির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে এ তহবিল গঠন ও অর্থ বন্টন হতে পারে।

দুই. বর্তমানের এই স্থবির অবস্থায় শুধু দরিদ্র শ্রেণি নয়, মধ্যম আয়ের অনেকেই এখন অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে। দিন দিন এটা তীব্র হবে। এই শ্রেণির মানুষের জন্য সাহায্য চাওয়াটা কঠিন। লকডাউনের অজুহাতে রজব, শাবান, রমজান কোনো মাসের বেতন স্থগিত করা উচিত হবে না। মাদরাসার ফান্ডে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলে আবাসন উন্নয়ন বা অন্যকোনো ফান্ড থেকে করজ নেওয়া যেতে পারে। আগে বাচঁতে হবে। উন্নয়ন পরেও করা যাবে।

লালবাগ মাদরাসা, প্রতিষ্ঠাতা হজরত সদর সাহেব হুজুর রহ., ঢাকা, ছবি: সংগৃহীত

তিন. ঢাকার বড় মাদরাসাগুলোতে অর্থ সংকট নেই বললেই চলে। অনেক মাদরাসা কমিটি কর্তৃক পরিচালিত। প্রায় সকল মাদরাসারই বিত্তশালী শুভাকাঙ্খী মহল আছে। ঢাকার মুহতামিমরা ইচ্ছা করলে তাদের সহযোগিতায় ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি বিপদগ্রস্ত মাদরাসাগুলোর সহায়তার লক্ষ্যে কল্যাণ ফান্ড গঠন করতে পারেন।

চার. গ্রামের অধিকাংশ ছোট মাদরাসা ঢাকার কোনো মুহতামিম অথবা মুরুব্বির পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হয়। সেই মাদরাসাগুলোর দিকে একটু নজর দিন। কল্যাণ ফান্ড থেকে তাদের দুই বা তিন মাসের বেতনের ব্যবস্থা করা গেলে আশা করা যায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে।

পাঁচ. সব মাদরাসাই এখন বন্ধ। শিক্ষকরা বাড়িতে। মাদরাসা ফান্ডে অর্থ থাকলে বেতন বাকি রাখা ঠিক হবে না। কোন শিক্ষকের বেশি প্রয়োজন সেটা মুহতামিমরা অবশ্যই জানেন। অনেকে হয়তো চাইতেও পারছে না। ফোন করে একটু তাদের খোঁজ নিন। সম্ভব হলে কিছু টাকা বিকাশে পাঠিয়ে দিন। মাদরাসার এই অবদান সে আজীবন স্মরণ রাখবে।

ছয়. মুহতামিম ও শিক্ষকদের হতে হবে একে অপরের সহযোগী, প্রতিপক্ষ নয়। কোনো মাদরাসায় অর্থ সংকট থাকতেই পারে। মুহতামিমদের উচিত হলো বাস্তব অবস্থা শিক্ষকদের সামনে উন্মুক্ত রাখা। এতে করে শিক্ষকরা ত্যাগ স্বীকার করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকবেন। কোনো প্রশ্ন থাকবে না।

সাত. ঢাকার বাইরে প্রায় সব জেলাতেই বিভিন্ন নামে আলেমদের ঐক্যবদ্ধ ফোরাম আছে, ইত্তেফাক, উলামা পরিষদ ইত্যাদি নামে। এই বিপদের মুহূর্তে এসব সংগঠন বিপদগ্রস্ত মাদরাসার পাশে দাঁড়াতে পারে। আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি একটু সহযোগিতা করা যায়, তাহলে তাদের কষ্টের ভার অনেকটাই লাঘব হবে।

আট. গ্রামাঞ্চলের যেসব মাদরাসার সঙ্কট এরপরও কাটবে না। ওই সব মাদরাসার মুহতামিমদের উচিত হবে স্থানীয় দায়িত্বশীলদের মাধ্যমে বেফাকের সঙ্গে যোগাযোগ করা। এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নিতান্তই কম হবে। শুধু এই শ্রেণির মাদরাসাগুলো পাশে দাড়াঁনোর জন্য বেফাকের প্রতি আমাদের আবেদন থাকবে। কারণ তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।

সবশেষে কওমি মাদরাসার অভিভাবক সংস্থাগুলোর প্রতি নিবেদন, এই কঠিন পরিস্থিতিতে আপনাদের এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা, কওমি মাদরাসার ছাত্র শিক্ষকদের এই দূর্দিনে বেফাক সাধ্যমতো ভূমিকা রাখবে। এসব পদ্ধতি অবলম্বন শুধুমাত্র উসিলা। আমাদের একমাত্র ভরসা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ওপর। করোনা ভাইরাসের এই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে তিনিই আমাদের রক্ষা করতে পারেন। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, এই মহামারি থেকে তিনি আমাদের মুক্তি দেন। মাদরাসাগুলোকে যাবতীয় সঙ্কট থেকে হেফাজত করেন।

মুহাম্মদ এহসানুল হক: শিক্ষক, জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

আরও পড়ুন:
কওমি মাদরাসার শিক্ষকদের জন্য আপৎকালীন তহবিল গঠন আবশ্যক

দুই লক্ষাধিক কওমি শিক্ষকের কথা ভাববার কেউ নেই!

কওমি শিক্ষকদের আর্থসামাজিক নিরাপত্তা বিষয়ে কিছু প্রস্তাবনা

কওমি মেরুদণ্ড যেভাবে সোজা রাখতে পারি

করোনার কবলে কওমি মাদরাসার শিক্ষক-পরিচালক, অতঃপর...

বিপদগ্রস্ত কওমি শিক্ষকের কথা বলা কী অন্যায়?

আপনার মতামত লিখুন :