দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান



মহীবুল আজিজ
গ্রাফিক্স: বার্তা২৪.কম

গ্রাফিক্স: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রকৃত বিস্ময়ের তখনও কিছু বাকি। কাদামাটি-লাগা হাত ডোবায় ধুয়ে নিতে গিয়ে খায়ের দেখলো ডোবার পানি দেখতে কেমন অস্বাভাবিক দেখায়। কিন্তু কয়েকদিন আগেও ব্যাপারটা ছিল না। তাহলে কী ডোবার পানি দূষিত হয়ে পড়লো এরিমধ্যে। আঁজলা ভরে জল নিয়ে চোখের কাছে ধরতেই সে লক্ষ্য করলো একটা তেলতেলে ভারি ধরনের তরল জল সে ধারণ করে রয়েছে। পানিতে তৈলাক্ত কিছু মিশে আছে। জিভে পরখ করে দেখলে কষা আর বিস্বাদ লাগে। তারপর খায়ের কৌতূহল পরিপূর্ণরূপে মেটানোর জন্যে মগ ভরে পানি নেয় ডোবা থেকে। দেখে মনে হয় কেউ যেন তেল মিশিয়ে দিয়েছে ডোবার পানিতে। ভোজবাজি নয়তো-ভাবলো খায়ের। আগুনের প্রসঙ্গে জান্নাত বেশ খুশিই হয় যখন তার হাতেনাতে ফল হিসেবে পাওয়া যায় স্বামীর হাতে বানানো গরম চা। কিন্তু তৈলাক্ত জলের কথা ভেবে সে চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এদিকে আগুন আবার তার সঙ্গে-সঙ্গে পানির তৈলাক্ত হয়ে যাওয়া সবই তার একটা অশুভ বার্তার আভাস বলে মনে হতে থাকে। খায়ের তাকে চিন্তামুক্ত করে। প্রথমত আগুন আর তৈলাক্ত পানির কথা যতটা সম্ভব গোপন রাখা চাই। তাদের ঘরটা এক প্রান্তে এবং সুপুরি গাছের পাতা দিয়ে সেটির চারদিক ঘেরা থাকায় কারও পক্ষে সে-সংবাদ পাওয়া সম্ভব নয়ও তবু যে-কেউই এসমস্ত আবিষ্কারের খবর জেনে ফেলতে পারে। হঠাৎ করে কেউ হাঁটতে-হাঁটতে এদিকটায় এসে পড়লে তাকে ঠেকানো সম্ভব না-ও হতে পারে। খায়ের বোঝাতে থাকে জান্নাতকে। তার কণ্ঠে আশ্বাস-বার্তা। নিশ্চয়ই তাদের এই ঘর যেখানটায় তার নিচে প্রচুর পরিমাণে মজুদ রয়েছে গ্যাস। আবার, গ্যাসের পাশাপাশি তেলের মজুদও থাকা সম্ভব। কিন্তু জান্নাতের দুর্ভাবনা তাতে কমে না। তার জিজ্ঞাসা, তেল-গ্যাস দিয়ে তারা করবে কী! খায়ের বলে,

: হোনো, গ্যাস দিয়া কী করন যায় হেইডা তো তুমি নিজের চোহেই দেখলা। আর সত্য-সত্য যদি তেল থাইক্যাই থাহে তাইলে এই পানি এই যে আগুন দেখতাছো হেই আগুনে জাল দিয়া আমরা তেল করমু। তারপর সেই তেল দেখবা কত কী কাজে লাগতাছে। তেল দিয়া আবার রান্না করন যায়, বাত্তি জালান্ যায়, ভাগ্য ভাল হইলে হেই তেল দিয়া গাড়িও চালান যায়। আমাগো অবশ্য গাড়ি নাই কিন্তু তেল বেচলে হেই তেলের ট্যাহা দিয়া গাড়ি কিনন কোনো ব্যাপারই না!

আরও পড়ুন: দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান (পর্ব-১)

মোটামুটি ব্যাপারটা এতদূর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। সেটা ছিল, ধরা যাক সন্ধ্যার পূর্ব পর্যন্ত। আবুল খায়েরের দৃষ্টি সীমাবদ্ধ ছিল দিনের আলোতেই। ফলে, রাতের বাস্তবতা তার ভাবনাতে কী করে যেন অনুপস্থিত থেকে যায়। আর রাত নামতেই দ্রুত পটপরিবর্তনের ফলে সবকিছু এলোমেলো হওয়ার লক্ষণ প্রকট হতে থাকে এবং পুরো ব্যাপারটার নিয়ন্ত্রণও আর আবুল খায়েরের হাতে থাকলো না। দিনের আলো উদ্ভূত অগ্নিশিখাকে শোষণ করে নিলে সেই আগুন দূর থেকে আর তত দর্শনযোগ্য হয় না। কিন্তু যখন সন্ধ্যা হয়, ভাল করে রাত হয়, গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয় অন্ধকার তখন এক ফুটের মত উঁচু শিখাকেও তীব্র আর ভীতিকর দেখায়। ঘরের ভেতর থেকে সেই শিখা দেখে অবাক হয়ে যায় জান্নাত। ঐটুকু শিখার আলো অনেকটা জায়গা আলোকিত করে দেয়। এমন অনিঃশেষ আলোকশিখা হঠাৎ ভয়ও ধরিয়ে দেয়। জান্নাত ভাবে, এমন যদি হয়, এই শিখা ধীরে-ধীরে তার সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে অকস্মাৎ প্রবল বেগে বিপুল ধাবমানতা নিয়ে ছড়িয়ে পড়লো চতুর্দিকে, তাহলে! তাহলে কী সে এবং তার স্বামী পারবে সেই বিস্তৃতিকে থামাতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে। ঐটুকু শিখাকে মগের পানি ঢেলেও নেভানো যায় নি। বিস্তৃত শিখাকে তারা সামলাবে কী করে। আরেক ভয় চেপে ধরে তাকে। এমন যদি হয়, তারা গভীর নিদ্রার জগতে বিভোর হয়ে রয়েছে আর তখন আগুনের শিখা ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ ও বৃহত্তর হতে-হতে নিদ্রিত তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করে ফেলল, তাহলে! মনের ভয়টাকে স্বামীর নিকটে প্রকাশ না করে পারে না জান্নাত-

: আইচ্ছা, আমারে কও তো, আগুন যদি নাকি বাইড়্যা যায়, বাইড়্যা গিয়া যদি নাকি আমাগো ইদিকে আউগাইয়া আহে তাইলে তো আমাগো ঘর-টর সব পুইড়্যা ছাই অইয়া যাইবো! তহন কী অইবো?

: হ, তোমারে কইছে! বাড়লে এতক্ষণে বাইড়্যা যাইতো, বুঝছো? আগুন বাড়বো না। তুমি নাক ডাইক্যা ঘুমাইতে পারবা। আর সহালবেলা ঘুম থেইক্যা উইঠ্যা দেখবা আগুন যেমন ছিল তেমনই জ্বলতাছে। আর রাইতের মধ্যে যদি জইম্যা থাকা গ্যাস শেষ অইয়া যায় তাইলে আর আগুন জ্বালাবো না।

যেটুকু ঘুমের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল খায়েরের আশ^স্তিমূলক কথায় সেটাও উবে গেল রাত না-বাড়ার আগেই। কৌতূহলী দ্বীপবাসীদের কয়েকজনের নজরে আসে খায়েরের বাড়ির ডোবার জ্বলতে থাকা আগুনের শিখা। তারা দূর থেকে আলোকময় আভা লক্ষ করে কেবল কৌতূহলের বশেই এগোয়। অনেকেই রাতে ডোবা-পুকুরের কিনারায় হ্যারিকেন হাতে নিয়ে কোঁচ দিয়ে মাছ মারে। সুস্বাদ বেলে মাছগুলো তখন কিনারার মাটি কামড়ে পড়ে থাকে। উৎসাহীরা আগুয়ান হয়, পরিচিত হলে বলে, কী, কেমন পাইল্যা মাছ? আর অপরিচিত হলেও মাছ সম্পর্কেই আলাপ আরম্ভ করে। জনাতিনেক লোক জায়গাটা পেরিয়ে যাচ্ছিল খানিকটা দূর দিয়েই। কিন্তু আগুন দেখে তারা এগোয়। প্রথমে ভাবে, ভূতের আগুন জ্বলে। খালে-বিলে-মাঠে-প্রান্তরে অনেক সময় এমন আগুন জ্বলতে তারা শুনেছে এবং দেখেছেও। ভয়-উৎকণ্ঠা আর কৌতূহলে তিনজনের সাহস একজোট করে তারা সন্নিকটে আসে। এসে দেখে শুধু আগুনই জ্বলে না, জ্বলতে থাকা আগুনকে আসলে জ্বালানোও হচ্ছে। খায়ের-নির্মিত চিহ্নিত ব্যূহ এবং চুল্লির কাঠামো তাদের সামনে উদ্ঘাটিত হলে তারা নিশ্চিত বুঝতে পারে, সন্নিহিত গৃহবাসীরা প্রাকৃতিকভাবে লব্ধ গ্যাসে রান্নাবান্নার কাজ শুরু করে দিয়েছে। তাদের পারস্পরিক আলাপ আর কথকতায় সাড়া পেয়ে খায়ের আঙ্গিনায় এসে দেখে পশ্চিম পাড়ার কাসেম, লতিফ আর হাশেম জটলা করে আগুন এবং গ্যাস বিষয়ে আলাপরত।

আবুল খায়ের তাদের একবিন্দু মিথ্যে বলে না। তার সদ্য বিয়ে করা সৌভাগ্যের চিহ্ন জান্নাতের বুদ্বুদ দেখা থেকে শুরু করে তার আগুন জ্বালিয়ে চা বানিয়ে খাওয়া সবটাই সে উপস্থাপন করে বিশ্বস্ততার সঙ্গে। যদিও ডোবার তৈলাক্ত জলের ব্যাপারটা সে গোপন রাখে। তারপর, উৎসাহী সেই দ্বীপবাসীদের প্রস্থানের পর খায়ের আর জান্নাত আগুনকে সাক্ষী রেখে ঘুমাতে যায়। মাঝে-মাঝে ঘুম ভেঙে গেলে তারা দু’জনেই শয্যা ছেড়ে উঁকি মেরে দেখে, আগুন জ¦লেই চলেছে। এভাবে তাদের রাত শেষ হয়, তখনও শেষ হয়ে যায় না আগুন। ভোর হতে না হতেই শুরু হয় প্রকৃত ঘটনা বা ঘটনার প্রতিক্রিয়া। আগুনের ফলও তাকে বলা যেতে পারে। একে-একে লোকেরা আসতে থাকে দ্বীপের নানা দিক হতে। লোক থেকে লোকান্তর হয়ে ছড়িয়ে পড়ে আগুন প্রায় সারা দ্বীপে। পঁচিশ বর্গমাইলের দ্বীপে আগুনের খবর ছড়াতে পঁচিশ মিনিটও লাগে না। আগুন দেখতে আসে পরিচিত অপরিচিত লোকেরা। অধিকাংশ লোকই খায়েরদের অচেনা। কিন্তু তারা এসে পরিচিত হয় খায়েরদের সঙ্গে। তারা বলে, আগুন যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে বলতে হবে খায়ের যথার্থই ভাগ্যবান। এখন আগুন যেহেতু খায়েরের আঙ্গিনার ধারে, তার বউ জান্নাত আগুনের স্বকীয় অধিকারে আপনমনে নির্দ্বিধায় তার রান্নার কাজ সেরে নিতে থাকে। তাতে কারও আপত্তিও থাকে না। তবে, জান্নাতের রান্নার কাজ শেষ হলে অদূরের পশ্চিম পাড়ার সেই লোকেদের বাড়ির সদস্যরা হাড়িপাতিল সঙ্গে এনে নিজ-নিজ রান্নার কাজ সেরে নেওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করলে খায়ের এবং জান্নাত দেখল, আগুনের প্রকৃত মালিক তো প্রকৃতিই। আগুন তো নিজেই জ¦লে যেতে থাকবে। কেউ যদি সেই জ্বলতে থাকা আগুনকে কাজে লাগিয়ে একটু উপকৃত হয় হোক না, ক্ষতি কী! খায়ের বলে, তোমরা তোমগো রান্না করবা, আমাগো আপত্তি কিসের! আমাগো রান্না তো আমরা সাইর‌্যা ফেলছি। ব্যাপারটা একটা বন্ধুত্বপূর্ণ পরিণতির মধ্য দিয়ে মীমাংসিত হয়ে যায়। এর মধ্যে জটিলতার কোন ইঙ্গিত থাকবার কথা নয়। তবে হ্যাঁ, খায়ের বলে লোকেদেরকে, দোয়া করো যাতে এই আগুন না নিভ্যা যায়। নিভ্যা গেলে তো সব শেষ। যে-ক’দিন কপালে থাহে আগুনরে লাগান যাইবো কাজে।

আরও পড়ুন: দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান(পর্ব-২)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান (পর্ব-৩)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান(পর্ব-৪)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান(পর্ব-৫)

চলবে...

৭তম পর্ব পড়ুন আগামী শুক্রবার

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেলেন যারা



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২১ ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষণা অনুযায়ী ১১ বিভাগে ১৫ জন এবার বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন।

রোববার (২৩ জানুয়ারি) বাংলা একাডেমির সদস্য সচিব এ এইচ এ লোকমান স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম জানানো হয়।

পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন:

কবিতায় আসাদ মান্নান ও বিমল গুহ, কথা সাহিত্যে ঝর্না রহমান ও বিশ্বজিৎ চৌধুরী, প্রবন্ধ/গবেষণায় হোসেন উদ্দিন হোসেন, অনুবাদে আমিনুর রহমান, রফিক উম মুনীর চৌধুরী, নাটকে সাধনা আহমেদ, শিশুসাহিত্যে রফিকুর রশীদ, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় পান্না কায়সার, বঙ্গবন্ধু বিষয় গবেষণায় হারুন-অর-রশীদ, বিজ্ঞান/কল্পবিজ্ঞানে পরিবেশ বিজ্ঞানে শুভাগত চৌধুরী, আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা বা ভ্রমণকাহিনীতে সুফিয়া খাতুন, হায়দার আকবর খান রনো এবং ফোকলোর বিভাগে আমিনুর রহমান সুলতানা।

অমর একুশে বইমেলা-২০২২ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি অথবা ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। 

;

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন আহমদ রফিক ও মাসরুর আরেফিন



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

  • Font increase
  • Font Decrease

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিক।

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০১৯ পেয়েছেন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন। ‘ভাষা আন্দোলন: টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ প্রবন্ধের জন্য আহমদ রফিককে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসের জন্য মাসরুর আরেফিনের নামের পাশে যোগ হয়েছে পুরস্কারটি।

করোনা মহামারির কারণে এবার অনলাইনের মাধ্যমে নির্বাচিত দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিককে সম্মাননা জানানো হয়। গত ১৫ জানুয়ারি এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। এছাড়া ছিলেন আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী শাহ এ সারওয়ার।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সমসাময়িক লেখকদের স্বীকৃতি দিতে আইএফআইসি ব্যাংক ২০১১ সালে চালু করে ‘আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার’। প্রতিবছর পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয় সেরা দুটি বই। নির্বাচিত প্রত্যেক লেখককে পাঁচ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র পেয়ে থাকেন।

;

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;