বইমেলায় সামিহা মাহজাবিন অর্চি’র ‘পালংকি রহস্য’

  ‘এসো মিলি প্রাণের মেলায়’


নিউজ ডেস্ক
বইমেলায় সামিহা মাহজাবিন অর্চি’র ‘পালংকি রহস্য’

বইমেলায় সামিহা মাহজাবিন অর্চি’র ‘পালংকি রহস্য’

  • Font increase
  • Font Decrease

কোনো বিখ্যাত কবির কবিতার বিখ্যাত চরণ নয়, এটি ধাঁধা! পাহাড় গর্ভের এক অজানা বৈভব খুঁজে বের করবার ধাঁধা! প্রাচীন একটি পাণ্ডুলিপিতে লেখা রয়েছে এ ধাঁধা। যা খুঁজে বের করতে উঠে পড়ে লাগে এক তরুণ ও এক কিশোরী, শুভ ও সুহানী।

বাবা-মা’র সাথে তারা বেড়াতে এসেছে কক্সবাজার। সমুদ্র-স্নান, সূর্যাস্ত দেখার ফাঁকে তাদের হাতের নাগালে আসে একটি পাণ্ডুলিপি। নিজেদের অজান্তেই সুহানী ও শুভ জড়িয়ে পড়ে পাণ্ডুলিপিটির রহস্যময় জটিল ধাঁধার জালে।

ধাঁধাটির সমাধান পেলেই তারা পেয়ে যাবে এক অজানা, অমূল্য গুপ্তধনের সন্ধান! কিন্তু এ গুপ্তধন কার? কী রয়েছে এ গুপ্তধনের মধ্যে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে পরিস্থিতি জটিল থেকে আরও জটিলতর হতে থাকে। রহস্য যত ঘন হয়, বুকের ধুকপুকানি তত বাড়ে। অনেক প্রশ্ন জড়ো হয়।

সুহানী ও শুভ কি খুঁজে পাবে জটিল ধাঁধার সমাধান? তারা কি পারবে গুপ্তধনের রহস্য উদ্ধার করতে? যে গুপ্তধনের ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে রয়েছে ‘কক্সবাজার’ নামকরণের ইতিহাস।

কিন্তু ধাঁধার সমাধান খুঁজে পাবার আগেই পাণ্ডুলিপিটি হারিয়ে যায়। তবে কি ধাঁধার সমাধান, পাণ্ডুলিপিটির মর্মার্থ রহস্যাবৃতই থেকে যাবে? সুহানী ও শুভ কি আবার উদ্ধার করতে পারবে প্রাচীন পাণ্ডুলিপিটি?

তাদের সামনে এসে সমাধান ছাড়াই সমুদ্রের অগুনতি ঢেউয়ের মতো মিলিয়ে যাচ্ছে। এসব প্রশ্নের তল-থই খুঁজে পাবে কী না তারা? তা জানতে চাইলে পড়তে হবে সামিহা মাহজাবিন অর্চি’র শিহরণ জাগানো, রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ পরিপূর্ণ রহস্য-উপন্যাস ‘পালংকি রহস্য’।

   

বাংলাদেশের বৈশাখি মেলা

  ‘এসো হে বৈশাখ’



সাইমন জাকারিয়া
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশ হাজারো মেলার দেশ। এদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রাম-শহর জুড়ে প্রতি বছর এখনও প্রায় পাঁচ হাজারের অধিক মেলা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে প্রচলিত প্রতিটি মেলা আয়োজনের পিছনে কোনো না কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে। সেটি হয় ধর্মীয়, নয় ব্রত-পালা-পার্বন অথবা যে কোনো একটি নির্ধারিত বিষয় বা ঐতিহ্যকে স্মরণ করে।

মেলার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে- নির্ধারিত স্থানে নির্ধারিত তারিখ বা তিথি-লগ্নে এক একটি মেলাতে নর-নারী, শিশু-কিশোর এমনকি আবাল বৃদ্ধরাও সমাগম ও সমাবেশ করে থাকে। উল্লেখ্য, একটি জায়গায় অনেক লোকের সমাবেশ ও সমাগম মানেই সাধারণ বাংলা অর্থে মেলা বলা হয়। তবে, মেলার বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে- ব্যবহার্য পণ্য ও গৃহ সামগ্রীর বিরাট সমাবেশ এবং চিত্তবিনোদনের জন্যে যাত্রা, সার্কাস, পুতুল নাচ ইত্যাদির আসর।

আধুনিক এই যুগের খেয়ালে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মেলাসমূহ এখন অনেকটাই তার চরিত্র বদলের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এরমাঝে তাকে নানা উত্থানপতন ও অবক্ষয়ের ধকল সইতে হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশের মেলাগুলো কিছুতেই তার ঐতিহ্য বিলুপ্তির পথে পুরোপুরি যেতে নারাজ। বাংলাদেশের মেলাগুলো এখন আগের সনাতন চেহারা থেকে রূপান্তরিত হয়ে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।

স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। কোভিড-১৯ সংক্রমণ ও অতিমারি কালে বাংলাদেশের বহু ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির মতো মেলাগুলোও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেনি। তবে, মানুষের জীবিকার চাহিদা ও মননশীল মনের তাগিদে ঐতিহ্যগত মেলাগুলো আয়োজনে সাময়িক বাধাপ্রাপ্ত হলেও কোভিড-১৯ উত্তরকালে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যগত মেলাগুলো আবার আগের মতো অনুষ্ঠিত হতে শুরু করেছে।

উল্লেখ্য, এদেশের প্রচলিত মেলাগুলির প্রকৃতি বহুবিধ ধরনের। এক বাক্যে তার প্রকৃতি অনুসারে শ্রেণী করণ দুঃসাধ্য। আলোচনার সুবিধার্থে এখানে এদেশে প্রচলিত মেলাগুলির একটি সরল শ্রেণীকরণ করা হয়েছে। অতীতে বাংলাদেশের মেলা প্রায় সর্বাংশই ছিল গ্রামকেন্দ্রিক, যুগের পরিবর্তনে ধীরে ধীরে সেই চিত্র পাল্টে গিয়ে এদেশের মেলা বর্তমানে গ্রাম ও শহর উভয় স্থানেই ছড়িয়ে পড়েছে।

চারিত্র্য বিচারে এদেশে প্রচলিত মেলাসমূহকে মোটামুটি সাতটি শ্রেণীতে বিন্যস্ত করা যেতে পারে, যথা- ১. ধর্মীয় উপলক্ষে অনুষ্ঠিত মেলা, ২. কৃষি উৎসব উপলক্ষে অনুষ্ঠিত মেলা, ৩. ঋতুভিত্তিক মেলা, ৪. সাধু-সন্তের ওরশ উপলক্ষে ফকিরী মেলা ৫. জাতীয় জীবনের বিভিন্ন বরেণ্য ব্যক্তি যেমন, কবি-সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক ইত্যাদির স্মরণোৎসব উপলক্ষে স্মারক মেলা, ৬. জাতীয় দিবসসমূহ উদ্যাপন উপলক্ষে অনুষ্ঠিত সাংস্কৃৃতিক মেলা, ৭. বাণিজ্যিক সামগ্রী প্রদর্শনী ও বিক্রয় মেলা। উল্লেখ্য, যেসকল মেলার ঐতিহ্য বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রচলিত আছে এই শ্রেণীবিন্যাসে কেবল সেসকল মেলাগুলিকেই বিবেচনায় আনা হয়েছে। তবে, ভিন্ন বিবেচনায় ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের মেলাসমূহের এমন সরলকৃত শ্রেণীবিভাগকে যে কেউ নতুনভাবেও পুনর্বিন্যস্ত করতে পারেন।

এক

উপলক্ষই বাংলাদেশের মেলা উদ্যাপনের স্বাভাবিক উৎস কথা। কিন্তু উপলক্ষ যা-ই থাকুক বাংলাদেশের মেলার একটা সার্বজনীন রূপ কিন্তু আছেই। এদেশের মেলায় অংশগ্রহণে সম্প্রদায় বা ধর্মের ভিন্নতা কোনো দিনই বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। বাংলাদেশের সবগুলো মেলাই আর্থ-সাংস্কৃৃতিক বৈশিষ্ট্য ছাপিয়ে মানুষের মধ্যে মিলন কথাকেই প্রকাশ করে থাকে। সে কারণে এদেশের মেলায় সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল ধর্ম ও শ্রেণীর মানুষের আনাগোনা ঘটে। অতএব, বাংলাদেশের মেলা মানে মৈত্রী সম্প্রীতির এক উদার মিলনক্ষেত্র। নারী-পুরুষ, শিশু -কিশোর সকলেই আসে এই মেলাতে।

এখানে সকলের অভিন্ন আকাক্সক্ষা একটিই, আর তা হলো- মেলা বা আড়ৎ দেখা। যার সঙ্গে খুব স্বাভাবিকভাবে আরেকটি বিষয় জড়িয়ে থাকে, তা হচ্ছে-বিকিকিনির আশা আর বিনোদনের টান। মেলাতে গাঁয়ের বধুর ঝোঁক থাকে আলতা-সিঁদুর-স্নো-পাউডার-সাবান আর ঘর-গৃহস্থালির টুকিটাকি সামগ্রীর প্রতি। আরেকটি আকর্ষণ থাকে বিনোদনের প্রতি, আর তা হচ্ছে- যাত্রা, পুতুল নাচ বা সার্কাস প্রদর্শনী দেখা।

তবে, শিশু-কিশোরদের টান থাকে মূলত খেলনার দিকে, যেমন- মাটির পুতুল, কাঠের ঘোড়া, টিনের জাহাজ। শিশু-কিশোরদের আরেক আকর্ষণের বস্তু হচ্ছে- খই, বাতাসা, রসগোল্লা, চমচম, কদমা, খাগড়াই, মুড়ি-মুড়কি, জিলিপি আর দানাদার। তার সঙ্গে বিভিন্ন ধরণের খেলনা বাঁশির কথাও বলা যায়। মেলার প্রাঙ্গণে গিয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি শিশু-কিশোরই বাঁশি কিনে থাকে।

বাংলাদেশের মেলার একটি দিকে থাকে অনিবার্যভাবেই বিনোদনের ব্যবস্থা। যেমন- নাগরদোলা, পুতুলনাচ, ম্যাজিক, সার্কাস, যাত্রা, বাউল-ফকির বা কবি গান, বায়োস্কোপ, লাঠিখেলা, কুস্তি, জারিগান ইত্যাদি। কিছু কিছু মেলাকে মাতিয়ে রাখে সঙ-এর কৌতুক ও মশকরা, তারা স্বাধীনভাবে মেলাতে ঘুরে ঘুরে রঙ্গ করে থাকে। এছাড়া, মেলায় বিশেষ ব্যবস্থাপনায় তাড়ি-মদ আর জুয়ার আসর বসে থাকে। নেশায় এমন ডুবে এবং জুয়ার খেলায় সর্বস্ব হারিয়ে ফেলে অনেকেই। এটা বাংলাদেশের মেলার একটি প্রাত্যহিক চিত্র।

তবে, বাংলাদেশে বর্তমানে চিত্তবিনোদনের ক্ষেত্রেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। এদেশের মেলায় এখন হর-হামেশাই মাইকে বা সাউন্ড বক্সে উচ্চ আওয়াজে গান বাজে। মেলায় পসরা সাজিয়ে বসা দোকানে দোকানে এখন মোবাইল বা ল্যাপটপের মাধ্যমে ইউটিউব থেকে পছন্দমতো গান বেছে নিয়ে তা সাউন্ডবক্সে বাজানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো করা হয়।

সময় বদলের সঙ্গে এদেশের মেলার চিত্র-চরিত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ মেলার রূপ ও মেজাজ অনেকখানিই বদলে গেছে। সনাতন ধর্ম সম্প্রদায়ের বিভিন্ন পার্বণ উপলক্ষে এইদেশে যে সকল মেলার আয়োজন হতো তার মধ্যে অনেক মেলার আয়োজন এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে, এবং অনেক মেলা এখন বিলুপ্তির পথে, কিছু মেলা এরই মাঝে রূপান্তরিত হয়ে নতুন রূপ গ্রহণ করে বেঁচে আছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের অধিকাংশ গ্রামীণ মেলাতে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। এদেশের গ্রামীণ মেলার স্বাভাবিক ও সাধারণ চিত্র কুটির শিল্পজাত গ্রামীণ পণ্যের বদলে দেশী-বিদেশী চোখ ধাঁধানো বাহারি পণ্যের জৌলূস ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি চ্যানেলে প্রচলিত কাটুনের চরিত্রের মুখ ও নকশা এখন প্লাস্টিক ও বাতাস দিয়ে ফোলানো বেলুনের উপর শহর থেকে গ্রামের মেলায় বাতাসে উড়তে দেখা যায়। বিশেষ করে জনপ্রিয় কাটুন চরিত্র মটু-পাতলু সারা বাংলাদেশের মেলাগুলোতে প্রত্যক্ষ করা যায়। এগুলোই এখন শিশুদের প্রধান আকর্ষণের বস্তু হয়ে গেছে।

এদেশের বহু নাগরিক প্রয়াসের সঙ্গেই বাংলায় প্রচলিত মেলার লৌকিক ধারা এসে মিশেছে। যেমন- বৈশাখীমেলা, ঈদমেলা, বইমেলা, বিজয় মেলা ইত্যাদি মূলত এদেশে প্রচলিত মেলার লোকধারার প্রেরণা নিয়ে নতুন আঙ্গিক ও মাত্রায় আজ নগরজীবনে প্রতিষ্ঠিত এবং তা এর মধ্যেই ঐতিহ্যে পরিণতি লাভ করেছে। এমত ধারায় সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে বিজয়মালা, যা যথার্থ অর্থেই ‘ঐতিহ্য ও আধুনিক চেতনার.. অপূর্ব সমন্বয়’।

দুই

বাংলা নববর্ষ ১৪৩১-এর শুরু উপলক্ষে এখানে এদেশের বৈশাখি মেলার অতীত ও বর্তমান চালচিত্র সম্পর্কে কিছু কথা উল্লেখ করতে চাই।
বৈশাখ হচ্ছে বাংলা সনের প্রথম মাস। ঐতিহাসিকদের তথ্যমতে, ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১১ এপ্রিল থেকে যখন বাংলা সনের গণনা শুরু হয় তখন বছর সূচনার মাস হিসেবে বৈশাখকেই প্রথমে রাখা হয়। অনেকের ধারণা, সম্ভবত তখন থেকেই নববর্ষ উদ্যাপনের অংশ হিসেবে বৈশাখী মেলার সূচনা। বৈশাখী মেলার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এ মেলা ধর্মসম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল বাঙালির মেলা।

বৈশাখি মেলার অসাম্প্রদায়িক বৈশিষ্ট্যকে কোনো দিনই কোনো ধর্মের গোঁড়ামী খর্ব করতে পারেনি। যুগ যুগ ধরে প্রচলিত এই বৈশাখী মেলারও রয়েছে অন্যান্য মেলার মতো দুটো দিক। একটি বাণিজ্যিক আর একটি সাংস্কৃতিক। বাংলার ব্যবসায়ীরা চৈত্রের শেষ দিন বা ‘চৈত্রসংক্রান্তি’তে এবং বৈশাখের প্রথম দিনে ‘হালখাতা’ করে থাকে। আসলে ‘চৈত্রসংক্রান্তি’র দিনটা পালন করে বাংলাদেশের মানুষেরা পুরনো বছরকে বিদায় দেওয়ার উৎসব করে থাকে।

এতে মেলা, গান-বাজনা ও খাওয়া-দাওয়ার মধ্য দিয়ে এক আনন্দঘন পরিবেশে বাংলার একটা বছর বিদায় নেয় এবং নতুন একটা বছরের সূচনা হয়। এই দেশে তাই বৈশাখি মেলার সূচনা হয় বৈশাখের আগে থেকেই মানে চৈত্রের শেষ দিক থেকে। তবে, বৈশাখের প্রথম দিনটিই আসলে উৎসবের মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সবাই পরিষ্কার ও সুন্দর জামা-কাপড় পরে। ঘরে ঘরে পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যায়। আর ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে ছোটে মেলাতে।

বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে কৃষক, কামার, কুমোর, তাঁতি, ময়রা এবং অন্যান্য শিল্পী-কারিগরেরা যে সব সামগ্রী তৈরি করে, বৈশাখী মেলায় তা প্রদর্শন ও বিক্রি করার সুযোগ এনে দেয়। গ্রামীণ কৃষিজাত পণ্য, মিষ্টান্ন দ্রব্য, কুটির শিল্পজাত পণ্য, মাটি ও বেতের তৈরি শিল্পসামগ্রী প্রভৃতি নিয়ে ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা দোকান সাজায় এই মেলায়। বাঁশ ও তালপাতার রঙিন বাঁশি, ভেঁপু, একতারা, দোতারা, ডুগডুগি, বেলুন, লাটিম, মার্বেল, ঘুড়ি-লাটাই, চরকি, পুতুল, মাটির ঘোড়া, কাঠের ঘোড়া, কাঠ, কাগজ ও বাঁশের পাখি, মাটির হাড়ি-বাসন, কলস, কাচের চুরি, পুঁতির মালা ইত্যাদি জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসে ছোট ছোট দোকানিরা।

এছাড়া আছে কাঠের আসবাবপত্র, খাট, পালঙ্ক, চৌকি, চেয়ার-টেবিল, আলনা, আলমারি, ঢেঁকি, পিঁড়ি, গাড়ির চাকা প্রভৃতি। মেলায় আরও পাওয়া যায় পিতলের হাড়ি, কলস, বাসন-কোসন, লাঙল-জোয়াল, লোহার দা, বটি, কুড়–ল, খন্তা, কাচি, নিড়ানি, গরুর গলার ঘুঙুর। ময়রারা তৈরী করে নানা রকমের মিষ্টান্নদ্রব্যÑ কদমা, জিলিপি, বাতাসা, খাজা, ছাঁচের মিঠাই, খাগড়াই আরো কতো কি। বলে রাখা ভালো এসব মিষ্টান্নদ্রব্য মেলাতে আগেও যেমন ছিল এখনও তেমনি আছে মেলার প্রচলিত রীতিকে ধরে। মুড়ি, মুড়কি, খই, চিড়ে, ছাচ খাজা, মোয়া, নারিকেলের নাড়–, বুট, চানাচুর, বাদাম ভাজা আর দিল্লির লাড্ডু, মটরভাজা, তিলের খাজা আজও মেলা আগত মানুষের প্রিয় খাবার।

বৈশাখি মেলার আরেক আকর্ষণ হচ্ছে তাঁতবস্ত্র। এই মেলাতে তাঁতিরা নিয়ে আসে নক্সীপাড়ের শাড়ি, ধুতি, লুঙ্গি, গামছা, বিছানের চাদর প্রভৃতি। মেলার একপাশে ছেলেমেয়েদের জন্য তৈরি জামা-কাপড়ও পাওয়া যায়। স্যাকরার দোকানে মেয়েরা ভীড় জমায় রূপা, তামা ও পিতলের গহনা কিনতে। বৈশাখী মেলায় গ্রামের কৃষিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের উন্নত জীবন গঠনের উপযোগী কিছু শিক্ষামূলক প্রদর্শনীর ব্যবস্থা থাকে।

এরমধ্যে রয়েছেÑ পশু প্রদর্শনী, চরকায় সুতা কাটা, গালার কারিগরি, গাছের চারা বা নার্সারি এবং অন্যান্য শিক্ষামূলক প্রদর্শনী। গ্রামের মেয়েদের তৈরি নানাপ্রকার পাখা, মাদুর, কাঁথা, শিকে, বেত ও বাঁশের তৈরি হরেক রকম জিনিসপত্র সাজানো হয়। আর থাকে উন্নত ধরনের শাক-সবজি,উন্নত জাতের হাঁস-মুরগি, শস্যের বীজ প্রদর্শনী ও কেনার ব্যবস্থা।

যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের মেলার যে রীতি ও ধরন আমাদের দেশে চালু রয়েছে, বৈশাখি মেলা তার সবটাই ধারণ করে আছে। যেমনÑ ১. বহু মানুষের সমাবেশ, ২. গানবাজনাসহ চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা, ৩. গ্রামীণ ব্যবহারিক শিল্পসামগ্রীর প্রদর্শনী ও বিক্রয়, ৪. বিভিন্ন রকমের খেলার আয়োজন।

মেলায় এসে মানুষ আনন্দের উপকরণ খোঁজে। তাই এখানে থাকে আনন্দলাভের নানা আয়োজন। পালাগান, বাউলগান, যাত্রা, কবিগান, গম্ভীরা, আলকাপ, জারিগান, পুতুলনাচ, সার্কাস প্রভৃতি বৈশাখি মেলার প্রধানতম সাংস্কৃতিক দিক। দেশজ খেলাধূলাও যে মানুষকে আনন্দ দিতে পারে তার প্রমাণ মেলে আমাদের বৈশাখি মেলায়। লাঠিখেলা, কুস্তি, হা-ডু-ডু, ঘুড়ি ওড়ানো, ষাঁড়ের লড়াই, ঘোড়দৌড়, মোরগের লড়াই, বানেরর খেলা ইত্যাদি দেশজ মজার খেলা সবাইকে মাতিয়ে রাখে।

গ্রামই ছিল একসময় বৈশাখি মেলার প্রধান ক্ষেত্র। সাধারণত পথের তেমাথায়, তিন নদীর মিলনস্থানে, ফাঁকা মাঠে, কিংবা বিশাল অশ্বত্থ বা বট গাছের নিচে এই মেলা বসত। যেখানে নানান দিক থেকে অনেক লোক এসে জড়ো হতে পারত। কালক্রমে মেলার স্থান গ্রাম থেকে শহরে বি¯তৃত হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলা নববর্ষ আমাদের জাতীয় উৎসব হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

এখন তাই পহেলা বৈশাখ বর্ষবরণ সারাদেশের সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তবে, রাজধানী ঢাকা থাকে এই উৎসবের কেন্দ্রস্থলে। ছায়ানট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ঢাকায় নববর্ষের উৎসব উদ্যাপিত হয়ে আসছে।

বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প সংস্থা (বিসিক) বৈশাখি মেলার আয়োজন করে আসছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত বিসিকের বৈশাখি মেলা দেশব্যাপী মানুষের মধ্যে বিপুল সাড়া জাগিয়েছে। কয়েকটি লক্ষ্য সামনে রেখে বিসিক বৈশাখী মেলার আয়োজন করে, যেমন- ১. কুটির ও হস্তশিল্পজাত পন্যের বাজার সৃষ্টি,

২. গ্রামীণ কারুপণ্য শহুরে মানুষ ও বিদেশীদের সামনে তুলে ধরা, ৩. ক্রেতার চাহিদা সম্বন্ধে উৎপাদকদের অবহিত করা, ৪. কারুশিল্পীদের বিভিন্ন পণ্য, নক্সা ও নমুনার সঙ্গে মানুষের পরিচিতি ঘটানো। এবছর ঈদের ছুটির পর পরই পহেলা বৈশাখ পড়ে গেছে বিধায় বিসিক বৈশাখী মেলা ঈদের পর সুবিধাজনক সময়ে করবে বলে আশা করা যায়।

মনে রাখা দরকার, বৈশাখি মেলা কেবল একদিনেই শেষ হয় না। একদিন, তিনদিন, সাতদিন, পক্ষকাল, পুরো মাস আবার কোথাও-বা দুই মাসব্যাপীও বৈশাখি মেলা চলে। সারা বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতেই কোনো না কোনো স্থানে বৈশাখি মেলা বসে। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, বগুড়া, দিনাজপুর, যশোর, বরিশালসহ আরো অনেক জেলায় পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে মাসব্যাপী বৈশাখি মেলা চলতে থাকে।

উত্তরবঙ্গের উল্লেখযোগ্য বৈশাখি মেলার মধ্যে দিনাজপুরের আমবাড়ির মেলা, বগুড়ার গাঙনগরমেলা, যশোরের নিশিনাথ তলার মেলা, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা-বিত্তিপাড়ার ঘোড়াপীরের মেলা এবং বরিশালের বাকালের মেলার ইতিহাস প্রসিদ্ধ।

কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়ার চান্দনা গ্রামের বৈশাখি মেলা ছিল বিখ্যাত। এই মেলার আড়ম্বর, জাঁকজমক অন্যান্য মেলার চেয়ে বেশি হতো। এছাড়া, কুমিল্লা জেলার সিদলাই, কান্দুঘর, ময়নামতিসহ বিভিন্ন স্থানে বৈশাখি মেলার ঐতিহ্যের সুখ্যাতি রয়েছে। এ অঞ্চলে বৈশাখি মেলায় বিক্রির জন্য বাঁশের বাঁশি তৈরির জন্য প্রসিদ্ধ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভাদুঘর, গোকর্ণঘাট, নবীনগর, খড়মপুর প্রভৃতি স্থানে বৈশাখি মেলা বসে।

চট্টগ্রামে বৈশাখী মেলার অন্যতম পর্ব ‘জব্বারের বলীখেলা’। একদিনের এই বলীখেলা উপভোগ করতে সমবেত হয় অসংখ্য মানুষ। চৈত্রের শেষে চট্টগ্রামের বৌদ্ধরা আয়োজন করে ‘মহামুনির মেলা’। এই মেলা বর্ষবরণেরই অংশ। চট্টগ্রামের আদিবাসী মারমা, চাকমা ও ত্রিপুরাদের বর্ষবরণ উৎসব পরিচিত সাংগ্রাই, বিঝু বা বিষু নামে। এই উৎসব উপলক্ষেও মেলা জমে ওঠে।

বর্তমানে প্রচলিত বৈশাখিমেলার তালিকা প্রণয়ন ও তার সম্পূর্ণ বিবরণসহ আলোকচিত্র ও ভিডিওচিত্রে নথিভুক্ত করা জরুরি। ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিম-লে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এই বৈচিত্র্যময় রূপ তুলে ধরতে পারলে প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের সময় এদেশে যেমন প্রচুর বিদেশী পর্যটকের আগমন ঘটতো, তেমনি নতুন প্রজন্ম বৈশাখি মেলার ঐতিহ্য সুরক্ষায় সচেতন হতো।

বিদেশী পর্যটকের আগমন ঘটলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতো এবং বৈশাখি মেলায় অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা উদ্ধুদ্ধ হতেন ঐতিহ্যপ্রেমে। এমনকি এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির সাধনা বিস্তার ঘটতো এবং বর্হিবিশ্বে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়তো।

লেখক: বিশিষ্ট লোক-ঐতিহ্য গবেষক, নাট্যকার ও উপ-পরিচালক, সংস্কৃতি উপবিভাগ, বাংলা একাডেমি। 

  ‘এসো মিলি প্রাণের মেলায়’

;

কায়মনে বাঙালি হবার বড়ো অনুপ্রেরণার উৎসব বাংলা নববর্ষ

  ‘এসো হে বৈশাখ’



ড. আতিউর রহমান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৬৭ সনে রমনার বটমূলে এই অনুষ্ঠানের সূচনা ছায়ানটকে বৃহত্তর জনসম্মূখে আনতে সাহায্য করেছে। এ কথা তো সত্যি রবীন্দ্রনাথ বাঙালি সংস্কৃতিকে হিমালয়ের মতো রক্ষা করে চলেছেন। রবীন্দ্রনাথ বরাবরই বলে এসেছেন যে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে হলে এর ভেতরের শক্তিকে জাগ্রত করতে হবে সমাজে, সংস্কৃতিতে। তাই বাঙালির উৎসবগুলোর পুনরুজ্জীবনের পক্ষে ছিলেন তিনি। গ্রামীণ মেলাগুলো পরিচালনা করতে তিনিই বলেছেন।

এর ফলে বাঙালির সামাজিক বন্ধন পোক্ত হবে বলে তিনি মনে করতেন। সেই অভিপ্রায়েই ছায়ানট বাঙালির নিজস্ব ‘শুভ নববর্ষ’ উদযাপনের এই আয়োজনের সূত্রপাত করে। বলা যায় ছায়ানট রবীন্দ্রনাথের সেই জাগরণের অগ্রগামী এক প্রতিষ্ঠানের নাম। এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পেছনের ভাবনাটির কথা সনজীদা খাতুন এভাবে জানিয়েছেন, “আমরা এক সময় ‘শ্রোতার আসর’ নামে একটা অনুষ্ঠান করতাম। গান শুনিয়ে আমরা ‘অতীতচারী’ করতে চাইতাম। সেইসব গান বাঙালির বলে মনে করিয়ে দেবার চেষ্টা করতাম। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে দেখা গেল, আমাদের দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা খুবই কম। কারণ শিক্ষার ব্যবস্থা নেই। তখন শুধুমাত্র ঐ বুলবুল একাডেমী ছিল। সেইজন্য আমরা একটা স্কুল করা দরকার বলে মনে করতাম। ... গান মানুষের জীবনে সংস্কৃতির বড় একটা ছাপ ফেলে।” 

সেই ছায়ানট এখন এক মহিরূহে পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া জমিতে সকলের প্রচেষ্টায় এক কর্মচঞ্চল সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নাম ছায়ানট। এর সঙ্গে সম্পূরক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাঙালির মননকে সিক্ত করে চলেছে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ। এই পরিষদের সাথে আমি গভীরভাবে যুক্ত। সারাদেশে রবীন্দ্রচর্চা ও রবীন্দ্রসংগীত প্রসারে আমরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছি।

এই সংস্কৃতিভবন উদ্বোধনের দিন প্রয়াত ওয়াহিদুল হক বলেছিলেন, “নগরের মানুষদের অসাম্প্রদায়িক করার আন্দোলনে ছায়ানট খানিকটা সফল হয়েছে। এবারে গ্রামের সাধারণ মানুষকেও শুদ্ধ সংস্কৃতির পরশ দিতে হবে। সকলকে সঙ্গে নিতে পারলে সম্পূর্ণ বাঙালি হওয়া যাবে।”

সুদীর্ঘ তিপ্পান্ন বছরে আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। রমনা বটমূলের এই নববর্ষ উদ্যাপন এখন সারা দেশ এবং বাঙালি অধ্যুষিত বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। লক্ষ লক্ষ বাঙালি বাংলা নববর্ষে পথে নেমে পড়ে। নুতন জামা-কাপড় পড়ে এক উজ্জ্বল সকালে তাদের আনন্দঘন উপস্থিতি বাঙালির অস্তিত্বের জানান দেয়। পাশাপাশি চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশের এক অসাধরণ অগ্রযাত্রার প্রতীক বাঙালির এসব আয়োজন।

কিন্তু তা সত্ত্বেও সম্প্রতি ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে আমাদের আলোর পথযাত্রাকে পুরোনো সেই সাম্প্রদায়িক শক্তিসমূহ অন্ধকারাচ্ছন্ন করতে চাইছে। কোমলমতি তরুণদের বিভ্রান্ত করে ফেলতে চাইছে। অথচ সেই কতো আগে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “যে দেশে প্রধানত ধর্মের মিলেই মানুষকে মেলায়, অন্য কোন বাঁধনে তাকে বাঁধতে পারে না, সে দেশ হতভাগ্য। সে দেশ স্বয়ং ধর্মকে দিয়ে যে বিভেদ সৃষ্টি করে সেইটে সকলের চেয়ে সর্বনেশে বিভেদ। মানুষ বলেই মানুষের যে মুল্য সেইটেকেই সহজপ্রীতির সঙ্গে স্বীকার করাই প্রকৃত ধর্মবুদ্ধি।” (রবীন্দ্র রচনাবলী, দ্বাদশ খণ্ড, পৃ. ৬৬৬)। বড়ই দুর্ভাগ্য আমাদের পাঠক্রম নির্ণয়েও ধর্মীয় বিভেদ বিতর্ক আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনকে কুলষিত করে চলেছে।

এমন বিভেদকে ঠেকানোর একটা বড়ো উপায় হতে পারে সংগীত চর্চা। কেননা, সংগীতই পারে জীবনের অসামঞ্জস্যগুলোর অবসান ঘটিয়ে এক নয়া পারসপেকটিভ দিতে। সংগীত শিল্পের এই অসাধারণ ক্ষমতার কথা রবীন্দ্রনাথই তাঁর ছিন্নপত্রে বলে গেছেন ।

কিন্তু সংস্কৃতির এই সক্ষমতার কথা অনুদার বিভেদকামীরাও জানে। তাই তো এই বটমূলেই নিক্ষিপ্ত হয়েছিল মানবতা বিধ্বংসী বোমা। সংস্কৃতি প্রিয় কয়েকজনের প্রাণ যায় ওই বোমা হামলায়। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যাই আমিও। যেখানে বোমাটি পড়েছিল সেখানেই দাঁড়িছিলাম সস্ত্রীক আমি। তাড়া ছিল বলে মাত্র কয়েক মিনিট আগেই সেখান থেকে বের হয়েছিলাম আমরা। তবে উদার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আক্রমণ কিন্তু এখনও থামে নি।

প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে মানবতার শত্রুরা বড়ই সোচ্চার এই ক্ষণে। আর সে কারণেই মুক্তমনা মানুষের শক্তি সঞ্চয়ের উৎস হতে পারে বাঙালির পহেলা বৈশাখ উদযাপন। আশার কথা স্বদেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করা হচ্ছে বেশ জোরেসোরেই। এ বছর নিউইর্য়কের টাইমস্কোয়ারে সহ¯্র কণ্ঠে উচ্চারিত হতে যাচ্ছে পহেলা বৈশাখের গান। বাংলা নববর্ষের আয়োজন সারা বিশ্বেই এখন প্রবাসীদের মনে ফেলে আসা বাংলা মায়ের জন্য বিশেষ দরদ ও আকর্ষণ বাড়ায়। কায়মনে বাঙালি হবার, সম্পূর্ণ বাঙালি হবার অসাম্প্রদায়িক বাঙালি হবার বড়ো অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে বাংলা নববর্ষ।

লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক, রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গবন্ধু গবেষক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর।

  ‘এসো মিলি প্রাণের মেলায়’

;

অখণ্ড আকাশ



শরীফুল আলম
অখণ্ড আকাশ

অখণ্ড আকাশ

  • Font increase
  • Font Decrease

একদিন তোমার সব অবহেলা আমি দ্বিগুণ করে
তোমাকেই ফিরিয়ে দেব,
তোমার সাবলীল ভঙ্গির ঘাতক সময় গুলো
আমাকে এখনও হানা দেয় ঘুমের ঘোরে ,
এ কেমন তোমার অনাকাঙ্ক্ষিত বিচ্যুতি ?
লতার মত তুমি জড়িয়ে থাকো সময়ের শূন্যতায়
প্রবল বাতাসে হৃদয় কেঁপে উঠে ,
আমার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য কোথায় , আমি তা জানিনা
হয়ত ভুলে যেতে হবে একদিন স্বপ্নের গল্প গুলো
তোমার ছবির ভাষা
রৌদ্রের গন্ধে ভরা বেবাক আকাশ ।

সংঘাত সরালে চেনা যায় অন্য আরেকটি সংঘাত
ভালোবাসার নিপুণ প্রতিশ্রতি , অবিনশ্বর আগামী ,
বৈপরিত্ব যেটুকু ছিল
তা তোমার বিভ্রমে ভরা নিগূঢ় রহস্য
আলতো ছাপ যেটুকু তুমি দিয়েছ আমায় তা লুকোবে কি করে ?
দায়সারা , চেনাশোনা , আধাচেনা , অচেনা রয়েই গেলে তুমি
শূন্য এ বুকে বিশাল আঁধার ঢেলে
মৃদু জল ঢেলে তুমি চলে গেলে ।

ফ্যাকাশে মুহূর্ত গুলো
প্রত্যহিক নিয়মেই এখন চলে ,
তবুও মাঝে মধ্যে উঁকি দেয় জীবনানন্দ , রবীন্দ্রনাথ
পদ্মা , মেঘনা , যমুনা ।

তুমি নিরুদ্দেশ হবে হও
ষোড়শী চাঁদের আলো এখনও আমায় ঘুম পাড়িয়ে দেয়
তাই জলের অতলে এখন আর খুঁজিনা সুখের মুক্তা ,
এ বুকের তলায় এখনও এক অখন্ড আকাশ ,
পূর্ণিমা নিয়ে আমি কোন কথা বলবো না
অমবস্যার দুভাগ নিয়েও কোন কথা হবেনা
তবুও তুমি শচীন , মান্না হয়ে থেকো আমার ,
একদিন সকল অভিমান ভুলে
নিশ্চয় তুমি হাঁটু গেড়ে বসবে আমার সম্মুখে
জমানো কৃষ্ণচূড়া হাতে নিয়ে ।

-

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

  ‘এসো মিলি প্রাণের মেলায়’

;

বার্তা২৪.কম’র বর্ষপূর্তি বিশেষ সাময়িকী

‘সপ্তবর্ণ’-এ অভিভূত মুহম্মদ জাফর ইকবাল যা বললেন



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

৭ম বর্ষপূর্তি ও ঈদ উপলক্ষ্যে দেশের শীর্ষ মাল্টিমিডিয়া নিউজপোর্টাল বার্তা২৪.কম প্রকাশ করেছে বিশেষ সাময়িকী ‘সপ্তবর্ণ’। এতে লিখেছেন বাংলাদেশ ও ভারতের খ্যাতিমান লেখকরা। সপ্তবর্ণে স্থান পেয়েছে শিক্ষাবিদ, কথাসাহিত্যিক মুহম্মদ জাফর ইকবালের নিবন্ধও।

মুদ্রিত সংবাদপত্রের ঐতিহ্যিক পরম্পরাকে বজায় রাখতে ২৪ ঘণ্টার নিউজপোর্টালবার্তা২৪.কম’র বিশেষ সাময়িকীর কপি হাতে নিয়ে উচ্ছ্বসিত মুহম্মদ জাফর ইকবাল ডিজিটাল এই সংবাদমাধ্যমটির ভূয়শী প্রশংসা করেছেন। সপ্তবর্ণ সম্পাদক ও বার্তা২৪.কম এর পরিকল্পনা সম্পাদক আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে আলাপচারিতায় এসময় তিনি সমকালীন সংবাদপত্রের বিবর্তন নিয়েও কথা বলেন।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘বার্তা২৪.কম সপ্তমে পৌছেছে। আমার হিসেবে প্রথম পাঁচ বছর হচ্ছে ক্রুশিয়াল। কেউ যদি প্রথম পাঁচ বছর অতিক্রম করতে পারে, তখন ধরে নেওয়া যায়, হ্যা-পরবর্তী সময়টিতে তারা সাকসেসফুললি এগিয়ে যাবে।’

খ্যাতিমান এই কথাসাহিত্যিক বলেন, ‘বার্তা২৪.কম এর বিশেষ সাময়িকী সপ্তবর্ণ আমার হাতে। আমি চোখ বুলিয়ে দেখেছি, এতে কারা লিখেছেন। আমি খুবই অবাক হয়েছি এজন্য যে, বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে এত লেখকের এতগুলি লেখা তারা সুন্দর করে যত্ন নিয়ে একত্র করেছে। শুধু তাই না, আমার মত যে কোন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে-পুরো বিষয়টি আসলে ফোর কালার।’

‘খুবই সুন্দর, চমৎকার ঝকঝকে। চমৎকার সব ছবি। আমি যথেষ্ট আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি লেখাগুলো পড়ার জন্য। আমি তাদের অভিনন্দন জানাই, এত চমৎকার প্রকাশনা করার জন্য। নিঃসন্দেহে এটা বলে দেওয়া যায়, যখন কোন একটা চমৎকার কিছু কেউ দেখে, তখন মনে করতে হবে এটা এমনি এমনি হয় নাই। ধরেই নিতে হবে এর পেছনে অনেক মানুষের অনেক শ্রম আছে। আমি অভিনন্দন জানাই তাদের, যারা এমন একটি সুন্দর প্রকাশনা করতে অনেক পরিশ্রম করতে রাজি আছেন, যখন যখন মানুষদের কাগজের কিছু দেখার আর সময় নাই’-বলেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল।

আগামীতে বার্তা২৪.কম-কে এই দায়িত্ব আরও সুন্দরভাবে পালনের আহ্বানও জানান নন্দিত এই লেখক।

বার্তা২৪.কম টিমের সঙ্গে কথা বলছেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল

যে দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমকে দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শিক্ষাবিদ মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘আমরা যেখাবে বড় হয়েছি, এখন সময়টা আসলেই পাল্টে গেছে। আমরা কাগজের খবর দেখে অভ্যস্ত। সবকিছু আমরা কাগজে পড়তাম। এখন যেটুকু কাগজে আসে তার চেয়ে অনেক বেশি আসে ইন্টারনেটে-ডিজিটাললি। সেটা অনেক বড় একটা পরিবর্তন। এবং আমরা যারা কাগজে অভ্যস্ত তাদের জন্য এই জিনিসটি গ্রহণ করতে এখনও সময় লাগছে। যেহেতু বেশির ভাগ তথ্যই ডিজিটাললি আসছে, এর ভেতরে কিন্তু গ্রহণযোগ্যতার একটা ব্যাপার আছে।’

‘মাঝে মাঝেই আমার মনে হয় অনেকটা অশিক্ষিতি মানুষের মতো। যেহেতু আমরা কাগজে পড়ে অভ্যস্ত, যখন ডিজিটাললি কিছু দেখি-প্রশ্ন আসে এটি কতটা বিশ্বাসযোগ্য? কারণ যারা এটা তৈরি করছে, প্রকাশ করছে তারা কতটুকু দায়িত্ব নিতে পারবে? সত্যিই বিশ্বাসযোগ্য কিনা? আমি দেখছি, আজকাল বেশিরভাগ মানুষ সংবাদপত্র থেকে যতটুকু তথ্য সংগ্রহ করে তার থেকে অনেক বেশি নেয় বিভিন্ন স্যোশাল নেটওয়ার্ক থেকে। এখানে একজন আরেক জনের সঙ্গে তথ্যের আদান-প্রদান করে, এবং যে যে ধরণের তথ্য চায়, তাকে সে ধরণের তথ্যই দেওয়া হয়। ঘুরে ফিরে সে ওই ধরণের চক্রের ভেতরে পড়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘কাজেই একজন সম্পূর্ণ ইন্ডিপেন্ডেন্ট তথ্য পেয়ে যাচ্ছে, কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে ততোই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সেজন্য আমরা যদি, ডিজিটাল নেটওয়ার্কে যারা তথ্য দিচ্ছেন তাদের প্রথম দায়িত্ব হবে-এটা যেন বিশ্বাসযোগ্য হয়। যে জিনিসটা খুবই উত্তেজনার সৃষ্টি করে, পপুলার-সেই জিনিসই যদি প্রচার করি তাহলে কিন্তু হবে না। নির্মোহভাবে আমাকে এমন তথ্য দিতে হবে যেটা বিশ্বাস করতে পারি। আমি অপেক্ষা করছি সেজন্য। আমি বিভিন্ন জায়গায় দেখি আর নিজেকে প্রশ্ন করি এটি কতটুকু বিশ্বাস করতে পারব।’

  ‘এসো মিলি প্রাণের মেলায়’

;