আগুন শুধু পোড়ায় না, কিছু বিষয় আঙুল দিয়ে দেখায়ও

  সীতাকুণ্ডে ডিপোতে আগুন



হাসান হামিদ
বিএম ডিপোর আগুন

বিএম ডিপোর আগুন

  • Font increase
  • Font Decrease

 

পত্রিকায় দেখি প্রায় প্রতিদিন বাংলাদেশের কোথাও না কোথাও আগুন লাগে। পুড়ে মারা যায় মানুষজন। এই খবর আমাদের দেশে নতুন নয়। ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটের এক পরিসংখ্যান বলছে, সারাদেশে বছরে আনুমানিক ৬ লক্ষ লোক আগুনে পুড়ে যায়। আগুনে পুড়ে গড়ে প্রতিদিন বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিতে আসেন ২০ থেকে ২৫ জন। আর ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, বিগত ৬ বছরে সারাদেশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৮৮ হাজারের মতো। এতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ২৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এসবে প্রাণহানি হয়েছে ১ হাজার ৪ শ' জন, আহত হয়েছে অন্তত ৫ হাজার মানুষ। প্রতিদিন যেসব খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এর মধ্যে ধর্ষণ, সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু বাদ যায় না। এসব নিয়ে সরকারের কী ভাবনা তা জানি না। তবে এমন খবর পড়তে পড়তে এখন আর আমাদের মনেই হয় না, একটি মানুষের মৃত্যু মানে শুধু তার চলে যাওয়া নয়; পাশাপাশি একটি পরিবারের সারা জীবনের হাহাকার রচনা হওয়া। অথচ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে পাটের গুদাম পুড়েছিল বলে বঙ্গবন্ধু নিজে দৌলতপুরে গিয়ে পোড়া পাট ধরে কেঁদেছিলেন। কিন্তু এখন এতো যে মানুষ মারা যায়, পরবর্তীতে কে রাখে তাদের খবর?

সর্বশেষ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে গত শনিবার রাত আনুমানিক এগারোটায়। বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে ঘটনাস্থলের আশপাশের অন্তত চার বর্গকিলোমিটার এলাকা। বিস্ফোরণ-আগুনে নিহত হয়েছেন অন্তত ৪৯ জন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৯ জন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যও আছেন। অন্যদের প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে তারা নিহত হয়েছেন। আর যারা মারা গেছেন তারা প্রায় সকলেই পরিবহনশ্রমিক এবং ডিপোর কর্মকর্তা-কর্মচারী। এর বাইরে এই ঘটনায় আহত হয়েছেন ফায়ার সার্ভিস, পুলিশের সদস্যসহ দুই শতাধিক শ্রমিক-কর্মচারী। কেন ঘটেছে এই বিস্ফোরণ? প্রাথমিক ভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ডিপোর কনটেইনারে থাকা রাসায়নিকের কারণে ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। এই কনটেইনারে ছিল হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড নামের রাসায়নিক যৌগ। যদি উত্তপ্ত করা হয়, তাহলে তাপীয় বিয়োজনে হাইড্রোজেন পারক্সাইড বিস্ফোরক হিসেবে আচরণ করে। বিএম ডিপোতে হাইড্রোজেন পারক্সাইডবাহী কনটেইনার ছিল ২৬টি। ডিপোর টিনশেডে এবং প্লাস্টিকের বিভিন্ন জারে এই রাসায়নিক ছিল। আগুন লাগার পর কনটেইনারে থাকা রাসায়নিকভর্তি জার ফেটে যায়। এতে হাইড্রোজেন পারক্সাইড বের হয়ে কনটেইনারের সংস্পর্শে আসে। অক্সিজেন নির্গত হয়ে পানি ও আগুনের সংস্পর্শে কনটেইনারের ভেতরে তাপমাত্রা বেড়ে বিস্ফোরণ ঘটে। কনটেইনার ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে স্প্রিন্টারের মতো। এতে বিস্ফোরণের তীব্রতা বেড়ে যায় ভয়াবহভাবে।

পত্রিকার খবরে পড়েছি, বিএম কনটেইনার ডিপোর আশপাশের অন্তত দুই কিলোমিটার এলাকায় বসবাসকারীরা বেশির ভাগই শ্রমিক। এলাকার বসতঘরগুলো টিনশেডের। এখানকার বাড়িঘরের অনেকের দরজা খুলে পড়ে গেছে, ঘরের বেড়া উড়ে গেছে কিংবা জানালার কাচ ভেঙে গেছে। বিস্ফোরণের তীব্রতা এত মারাত্নক ছিল যে এতে এই এলাকার ঘরবাড়ির দরজা-জানালাই শুধু ভেঙে যায়নি, টেলিভিশন, ফ্রিজ ও বৈদ্যুতিক পাখাও নষ্ট হয়েছে। প্রায় তিন দিন চলছে এই অগ্নিকাণ্ডের, এখনও আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলা যাচ্ছে না। কারণ কেউ কেউ বলছেন এখনো ধোঁয়া উড়ছে। আবার কখন কী ঘটে, সেই ভয়ে দুই রাত ধরে অনেকেই ঘুমাতে পারছেন না। কেউ কেউ এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন আতঙ্কে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স সম্প্রতি বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে ঘটা অগ্নিদুর্ঘটনা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনে তারা বলেছে, বাংলাদেশে প্রায়ই নিরাপত্তার নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়। বিশেষ করে শিল্পখাতে। ২০০৫ সালের পর থেকে এখানে কারখানা ও বিভিন্ন ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ফলে শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের প্রতিবেদনে কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের কথা বলা হয়েছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে সুগন্ধা নদীতে একটি লঞ্চের ইঞ্জিন রুম থেকে আগুন লেগে অন্তত ৩৮ জনের মৃত্যু হয়। লঞ্চটি ঢাকার সদরঘাট থেকে বরগুনায় যাচ্ছিল। এ বছরের জুলাই মাসে রাজধানী ঢাকার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জের একটি জুস তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ৫২ জন নিহত ও ২০ জন আহত হন। ২০২১ সালের মার্চ মাসে কক্সবাজারে অবস্থিত রোহিঙ্গা শিবিরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১৫ জন নিহতের পাশাপাশি ৫৫০ জন আহত হন। তাছাড়া বাস্তুচ্যুত হয় ৪৫ হাজার মানুষ। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকার সামান্য বাইরে একটি মসজিদের গ্যাস লাইনে বিস্ফোরণ হয়। ওই ঘটনায় নিহত হন ১৭ জন ও আহত হয় কয়েক ডজন। নামাজ যখন প্রায় শেষের দিকে তখন মারাত্মক দুর্ঘটনাটি ঘটে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার কাছে একটি ফ্যানের কারাখানায় আগুন লাগে। যাতে কমপক্ষে ১০ জন মানুষ নিহত হন। আর নভেম্বরে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে গ্যাসের পাইপ লাইন বিস্ফোরণে সাতজন নিহত ও আটজন আহত হন। একই বছর মার্চ মাসে ঢাকার একটি ২২ তলাবিশিষ্ট বাণিজ্যিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় কমপক্ষে ১৯ জন নিহত ও ৭০ জন আহত হন। এ সময় ভবনটিতে বহু মানুষ আটকা পড়েন। আর ২০১৯ সালে ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে দুইটি ভয়াবহ প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এসময় পুরান ঢাকার একটি এলাকায় অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৭০ জনের প্রাণহানি হয়। তাছাড়া চট্টগ্রামের একটি বস্তিতে আগুন লেগে দুই শতাধিক ঘর পুড়ে যায়। এতে আটজন নিহতের পাশাপাশি ৫০ জনের বেশি আহত হন। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি টেক্সটাইল কারখানায় আগুন নেভানোর আগেই ছয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকার উপকণ্ঠে একটি প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১৩ জনের মৃত্যু ও কয়েক ডজন আহত হন। ২০১২ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের ইতিহাসে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। ঢাকার তাজরীন ফ্যাশনস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১১২ জন শ্রমিক নিহত ও ১৫০ জনেরও বেশি আহত হন। বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে কারখানাটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকার বাইরের একটি ক্রীড়া পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে কমপক্ষে ২৬ জন নিহত ও প্রায় ১০০ জন আহত হন। একই বছর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার উপকণ্ঠে একটি পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ২১ শ্রমিক নিহত ও প্রায় ৫০ জন আহত হন। ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চট্টগ্রামে একটি টেক্সটাইল কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৬৫ জন শ্রমিক নিহত ও কয়েক ডজন আহত হন। ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে ঢাকার বাইরে একটি পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ২২ জন নিহত ও ৫০ জনের বেশি আহত হন। এগুলো কেবল গত কয়েক বছরে বড় অগ্নিকাণ্ডের তথ্য। এর বাইরে ছোট ছোট অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে প্রায় প্রতিদিন।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, গত এক বছরে সারা দেশে আঠারো হাজারেরও বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে এবং এতে  অর্ধ শতেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আর এসব অগ্নিকাণ্ডে দেশের ক্ষতি হয়েছে ৪৩০ কোটি টাকার মতো, যা উদ্বেগজনক। কলকারখানায় অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে এক হাজারের মতো, আর দোকান-পাটে প্রায় দুই হাজার। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে গার্মেন্টস ব্যবসা শুরু হওয়ার পর গত দুই দশকে ৭০০ গার্মেন্টস শ্রমিক অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। আমাদের মনে আছে, তাজরীন ফ্যাশনে লাগা আগুনে ১১১ জন শ্রমিকের পুড়ে মারা যান। গুরুতর অগ্নিদগ্ধ হন আরও অনেক শ্রমিক। বাঁচার আশায় ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ে পঙ্গু হয়ে যান কেউ কেউ। এরপর কারখানায় নিরাপদ কর্ম-পরিবেশ এবং নিরাপত্তা নিয়ে দেশে-বিদেশে বিস্তর কথা-বার্তা হলেও, থেমে নেই কারখানা দুর্ঘটনার খবর।

আমাদের দেশে বহুবার অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনায় সবারই সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। এতবড় বড় প্রতিষ্ঠানে যেখানে হাজার হাজার কর্মী কর্মরত, সেখানে কেন পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে না? কোনো আইন নেই? আর কেমিক্যালের মজুদ কেন এমন অনিরাপদে থাকবে? এখন আরও যেসব এলাকায় এসব মৃত্যুকূপ আছে, তার কতটুকুইবা সরানো হবে! মানুষের মৃত্যুর পাশাপাশি এসব অগ্নিকাণ্ডে অর্থনৈতিক ক্ষতিও কিন্তু কম নয়। আমরা একবারও ভাবি না, ক্রমাগত  অগ্নিকাণ্ডের ফলে  দেশের বিভিন্ন শিল্প খাতে ভয়াবহ অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষত পোশাকশিল্পে আগুনের কারণে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়, সেজন্য বিদেশীরা এই খাতে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হবে স্বাভাবিক। আর এভাবে ক্রমশঃ শিল্পের বাজার ছোট হয়ে আসবে। বেড়ে যাবে বেকারত্বের হার; আর সেইসাথে বৃদ্ধি পাবে অপরাধকর্ম। এভাবে অর্থনৈতিকভাবে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই এখনো সময় আছে সুচিন্তিত পদক্ষেপ নেবার। আমাদের ভাবতে হবে, এই অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায়ই আসলে কী? আর অবশ্যই সরকারি কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নাগরিক হিসেবে আমাদের সচেতন হতে হবে। তাছাড়া এই ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সেজন্য সরকারকে আরও কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

অতীতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কথা আমরা কি ভুলে গেছি? হ্যাঁ, ভুলে গেছি! আমরা কি সেখান থেকে শিক্ষা নিয়েছি? না, নেইনি। আমরা এমনই সব খুব দ্রুত ভুলে যাই। আমরা সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোর ঘটনাও ভুলে যাবো, যেমন আমরা প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনার পর কিছুদিন খুব সোচ্চার হই এবং তা ভুলেও যাই; যেমন নিরাপদ সড়কের দাবির কথা আমরা এখন প্রায় ভুলে গিয়েছি। কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক খুললেই শুধু ধ্বংসস্তুপের ছবি আর স্বজনহারা মানুষের আহাজারি। ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও সংবাদকর্মীদের পরিশ্রম ও ব্যস্ততা উল্লেখ করার মতো। সাধারণ মানুষও এগিয়ে এসেছেন সাধ্য মতো। সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২ লাখ টাকা করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিছুদিন পর প্রধানমন্ত্রী হয়তো কয়েকজন কিংবা কয়েকটি পরিবারের দায়িত্বও নেবেন। কিন্তু যে শিশু আর কোনোদিন বাবা বলে ডাকতে পারবে না, যে মা কোনোদিন তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবেন না, যে ভাই আর কোনোদিন তার ভাইকে পাবেন না, যে পিতা কোনোদিন সন্তানের সফলতায় অহংকার করতে পারবেন না, যে স্ত্রী আর ফিরে পাবেন না তার স্বামীকে; তার কিংবা তাদের সেই ক্ষতি কি কোনোদিন পূরণ করা সম্ভব? সম্ভব নয়। তবে এই ধরনের ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেই ব্যবস্থা করা কিন্তু সম্ভব। আমরা একটু সচেতন হলেই এই ধরনের দুর্ঘটনা এড়িয়ে চলতে পারি। আমাদের সেই বোধের উদয় কবে হবে?

*লেখক- কথাসাহিত্যিক।

  সীতাকুণ্ডে ডিপোতে আগুন

গ্রামীণ চট্টগ্রামে শীতের সংস্কৃতি: ঐতিহ্য ও রূপান্তর



মোহাম্মদ আলম চৌধুরী
গ্রামীণ চট্টগ্রামে শীতের সংস্কৃতি: ঐতিহ্য ও রূপান্তর

গ্রামীণ চট্টগ্রামে শীতের সংস্কৃতি: ঐতিহ্য ও রূপান্তর

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। ঋতুবৈচিত্র্যের কারণে গ্রামীণ সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন দেখা যায়। এ পরিবর্তন শুধু পোশাক-পরিচ্ছদে নয় খাবার, খেলাধূলা আর উৎসবেও থাকে। তাই প্রত্যেক ঋতুতেই প্রকৃতির খেয়ালের প্রতি খেয়াল রেখে প্রস্তুতি নিতে হয় ঋতু বরণের, যা গড়ে উঠেছে চট্টগ্রামের জনসমাজের চিরায়ত ঐতিহ্যে পরম্পরায় এবং সমাজ প্রগতির রূপান্তরের ধারাবাহিকতায়।

পৌষ আর মাঘ মাস নিয়েই শীতকাল। কিন্তু আমার নানী বলতেন ‘শীতের জন্মের মাস হচ্ছে ভাদ্র মাস’। ভাদ্র মাসের শেষের দিকেই শীত অনুভূত হতে থাকে। বাঙালির সংস্কৃতিতে শীত একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। শীতকে কেন্দ্র করে পুরো জাতি মেতে উঠে নানা রকম উৎসবে। শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথেই শুরু হয় পিঠা উৎসব। হরেক রকমের পিঠা দিয়ে নিজেদের চাহিদা মেটানোর পর অতিথি আপ্যায়নের চল রয়েছে। আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত করে পিঠা খাওয়ানো হয় আবার ক্ষেত্রবিশেষে আত্মীয়ের বাড়িতেও পাঠানো হয়।
কয়েক দশক ধরে দেখা যাচ্ছে আনুষ্ঠানিকভাবে শীতকালে পিঠা মেলার আয়োজনও হচ্ছে। রসনাবিলাসী হিসেবে বাঙালির তো সুনামই রয়েছে। বিচিত্র রকমের পিঠা মনে যেমন আনন্দের সূচনা করে ঠিক তেমনি রসনার পূর্ণতাও দেয়। শুধু তাই নয়, পিঠা এখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ারও একটি উপকরণে পরিণত হয়েছে। তাই বাণিজ্যিকভাবে এখন পিঠা বানানো হয়। হাতের সাহায্যে যেমন পিঠা বানানো হয় তেমনি মেশিনের মাধ্যমেও এখন পিঠা বানানো হচ্ছে। বিভিন্ন রঙ আর নকশায় খচিত পিঠা দৃষ্টিনন্দন আর রুচির পরিচায়ক, যা বাঙালির খাদ্য-সংস্কৃতির নান্দনিক উপমা।

শীতের সকালে গাঁছি কাঁধে করে খেঁজুরের রস বিক্রি করে। সামর্থ্যানুযায়ী যে যতটুকু পারে সংগ্রহ করে রসনা তৃপ্ত করে। শুধু তাই নয় আঁখের গুড় দিয়েও শীতকালে বিভিন্ন রকমের পিঠা বানানো হয়। খেঁজুরের রস দিয়ে রাফ বানানো হয় আর সেই রাফে ভাপা পিঠা ও চিতল পিঠা চুবিয়ে খেতে দারুণ লাগে।

শীতকালে চট্টগ্রামের গ্রামীণ জনপদের সংস্কৃতি বড়ই বৈচিত্র্যময়। বাচ্চারা আমপারা বুকে জড়িয়ে মক্তবে ছুটে আর রাখাল গরু-ছাগলের পাল নিয়ে মাঠে যায়। কাঠুরিয়া কাঠ কাটতে যায় বনে। বিভিন্ন ধাচের পেশাজীবিরা পেশানুযায়ী কাজে বেরিয়ে পড়ে। সন্ধ্যার আগে-ভাগেই বাড়ি ফেরার চেষ্টা থাকে শীতের কামড় থেকে নিজেকে রক্ষার্থে। পাহাড় ও সমুদ্রের রাখিবন্ধনে চটগ্রামে দৃশ্যমান হয় বহুবিচিত্র এক সাংস্কৃতিক প্রভা, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অনন্য এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাংস্কৃতিক মিথষ্ক্রিয়ার প্রোজ্জ্বল।

কুয়াশামাখা ভোরেই চিড়া আর মুড়ির মোয়া কাঁধে বেপারি পাড়ায় পাড়ায় ডাক হাঁকে। গুড়ের জিলাপী মাটির হাঁড়িতে করে গ্রামের আনাচে-কানাচে ছুটে বেপারি। কনকনে শীতে তাজা মচমচে মোয়া আর গরম জিলাপীতে রসনা তৃপ্ত হয়।

টাকা অথবা ধান-চালের বিনিময়ে নগদ কিংবা বাকিতে বিকিকিনি হয়। বয়স্করা কাঁথা-কম্বল, শাল জড়িয়ে আর জাম্পার ও সোয়েটার গায়ে কম বয়স্করা রাস্তার দিকে খেয়াল রাখে কখন বেপারি আসে।

শীতকালীন পিঠার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ফুলপিঠা, পাটিসাপটা, চিতলপিঠা, পাকনপিঠা, গুরাপিঠা, ভাপাপিঠা (ধুঁইপিঠা) বেশ জনপ্রিয়। দিন পরিবর্তনের পালায় এখন আরও বহু রকমের পিঠা বানানো হয়। এখন অবশ্য নানামাত্রিক ব্যস্ততার কারণে আগের সেই উৎসবমুখরতা নেই গ্রামীণ জীবনে।

গ্রামীণ জনপদে শীতের সকালে আগুন পোহানোর সংস্কৃতি বেশ পুরনো। উঠানের এককোণে লতাপাতা আর লাকড়ি দিয়ে আগুনের উত্তাপ নিতে সবাই গোল হয়ে বসে পড়ে। আগুন পোহানোর কালে নানা রকমের গল্প চলে আর লাল টুকটুকে কয়লায় ভাপাপিঠা পুঁড়ে খাওয়ার ধুম চলে। সত্যি বলতে কি এ সংস্কৃতি এখন অনেকাংশে সচরাচর গোচরীভূত হয় না। নগরায়নের আছরে গ্রামীণ সংস্কৃতি হুমকির সম্মুখীন আর বিদায় নিয়েছে ইতোমধ্যে অনেক কিছু। পালাবদলের প্রহরে গ্রামীণ সংস্কৃতিও নানা রূপান্তরের সম্মুখীন।

ছোটবেলায় দেখেছি পাশ্ববর্তী কুমোরপাড়া থেকে মাটির তৈরি নানা রকমের তৈজসপত্র কাঁধে করে কুমোর ফেরি করতো প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদে। নানা রঙের নকশা করা মাটির ব্যাংক আর ছোট আকারের হাড়ি যেগুলোকে আমরা কুয়াশা বলতাম তা কিনে খুশিতে আত্মহারা হতাম। মাটির ব্যাংকে পয়সা জমানোর রীতিমতো প্রতিযোগিতা ছিল। এখন কুমোর পাড়া আছে কিন্তু কুমোরের পেশা নেই। তাঁরা পূর্ব-পুরুষের পেশা ছেড়ে বিভিন্ন রকমের কর্মে যোগ দিয়েছে।

স্কুল ও মক্তব বন্ধের দিন শীতের সকালে গ্রামের ছেলেমেয়েরা বিলে সদ্য ধানকাটা সারা হওয়ার পর ইদুরের গর্তে ধান কুড়োতে যেত। আইলের ফাঁকে হাত ঢুকিয়ে কিংবা কোদাল দিয়ে ইদুরের গর্ত খুঁড়ে ধান সংগ্রহ করতো আর সেই ধান দিয়ে নিজের পছন্দ মতো কিছু কেনাকাটা করতো কিংবা মোয়া ও জিলাপী খেত। এখনও প্রত্যন্ত গ্রামে এ সংস্কৃতি রয়েছে।

শীতকালে গ্রামে বিয়ের ধুমধামও বেশি হয়। আগে গ্রামের বাড়ির উঠানে বড় তাঁবু দিয়ে পাটি ও ছফ (বিশেষ ধরনের পাটি) বিছিয়ে আপ্যায়ন করা হতো এখন যেটা অতি নগন্য পরিমাণে হয় আর এখন সেটা কমিউনিটি ক্লাবে সম্পন্ন হয়।

মাঘ মাসে শীতের বেশ তীব্রতার কারণে মাঘের শীত নিয়ে বচনও রয়েছে যা আমি আমার নানীর মুখ শুনেছিলাম আর আঞ্চলিক প্রবচনে তা হচ্ছে ‘মাঘের শীতে বাঘ গুজুরে (কাঁদে)’। তাই মাঘ মাসের শীতে থাকে কামড়যন্ত্রনা। মাঘ মাসে পুকুরের পানিও কমতে থাকে আর এ সময় পুকুরের মাছ দিয়ে নানা পদের রেসিপি তৈরি করা হয়। শীতকালীন সবজি দিয়েও নানা প্রকার ভর্তা বানানো হয়।

শীতের সন্ধ্যায় আমরা পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে শিয়ালের ডাক শুনতাম। শিয়ালের হুক্কাহুয়া ডাকের সাথে সাথে আমাদের কুকুর টাইগার আর রাজুইল্যাও ঘেউ ঘেউ ডাকে কানফাটা আওয়াজ তুলতো। দুই বিরোধী শিবিরের চিৎকার চেচাঁমেচিতে ছাগল আর মুরগীর ঘরে খিল দিতো আমাদের রাখাল মন্তাজ মিয়া। হালে চারপাশের অসভ্য মানুষের কুৎসিত চিৎকারের কাছে হার মেনেছে পশুদের প্রাকৃতিক কোলাহল!

জলবায়ু পরিবর্তনের এবং সামাজিক বিন্যাসের অধঃপতনের কারণে শীতের সেই আমেজ, অনুষঙ্গ ও তাৎপর্য হারিয়ে যাচ্ছে বহুলাংশে। ইতোমধ্যে ঋতুচক্রে ব্যাপক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমরা যারা প্রত্যন্ত গ্রামীণ সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠেছি তাদের কাছে শীতের যে অমোঘ স্মৃতি তা ভবিষ্যতে 'রূপকথার গল্পে' রূপ নেবে। শীতের রাতে উঠোনে ব্যাডমিন্টন খেলা, খড়ের গাদায় লাফালাফি, প্রতিবেশির বাড়িতে ওয়াজ মাহফিলে যাওয়া, কিচ্ছা-কাহিনী শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যাওয়া, মুয়াজ্জিনের আজানের পর আস-সালাতু খায়রুম মিনান নাউম বলে নামাজের দিকে আহ্বান জানিয়ে মসজিদে যেতাম।

আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতি এখন পাল্টে গেছে। বৈশ্বিক প্রভাবে গ্রাম এখন আর শাশ্বত-গ্রাম নেই। শীতের রাতে এখন আগের মতো প্রাকৃতিক কোলাহলও নেই। শীত মোকাবেলার প্রস্তুতি হিসেবে শীতের আগমনের আগে-ভাগেই কাঁথা সেলাইয়ের ধূম পড়ে যেত। এখন এসব আর চোখে পড়ে না।

ঘন গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ গ্রাম এখন বিরান ভূমি। বন উজাড় করে ইটের ভাটায় লাকড়ি জ্বালানোর কারণে বাড়ির ফলদবৃক্ষও রক্ষা পাচ্ছে না। গ্রামীণ খেলাধূলায়ও ব্যাঘাত হচ্ছে মাঠ সঙ্কট ও রাজনৈতিক কোন্দলের কারণে। শীতকালে রোদের তেজ কম থাকার কারণে দুপুরের পরেই বিলে ডাংগুলি, ফুটবল হা ডু ডু আর ভলিবল খেলার আয়োজন হতো। রাস্তার সরুপথে চলতো মার্বেল খেলা। এসব ক্রমশ চলে যাচ্ছে স্মৃতির অতল গর্ভে।

শীতকাল চট্টগ্রামবাসীর, বিশেষত লোকায়ত গ্রামীণ সমাজের কাছে শুধু একটি ঋতুর নাম নয়- সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ আর ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা, যা নানা পরিবর্তন ও রূপান্তরের আঘাতে ক্রমেই অপসৃত।

লেখক: প্রফেসর, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

  সীতাকুণ্ডে ডিপোতে আগুন

;

কুইজে পশুর হাসি ও বাম কান নড়ানো



প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ছুটির দিন ছাড়া আজকাল শখের বাগানে কাজ করার সময় পাবার উপায় নেই। তবে বড়দিনের আগে সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দেবার পরও কিছুটা বাড়তি সময় পাওয়া গেল। শীতের ঠান্ডা আমেজের সাথে দুপুরের রোদটা বেশ মিষ্টি অনুভূত হয়। তাই নিয়মিত বাগান তদারককারীদের কাজে সহায়তা করতে শুরু করলাম। কাজের ফাঁকে ওরা গল্প করতে ভালবাসে। ওদের কারো কারো সমসাময়িক ঘটনার জ্ঞান আমার থেকে অনেক গুণ বেশি। সেটা আগে থেকেই আমি জানি। কাজের দিকে মনযোগ দিয়েও একজন হঠাৎ কথার আসর জমিয়ে ফেলল।

তার প্রশ্ন ছিল- একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্ন নিয়ে। ছোট ছেলের সেই এমসিকিউ পরীক্ষায় প্রশ্ন এসেছে- শুধু একটি পশু হাসতে জানে। সেটি কোনটি? চারটি প্রাণীর নাম লেখা আছে। একটিতে টিক চিহ্ন দিতে হবে। ছেলে ভুল হবে বলে কোনটিতেই টিক চিহ্ন না দিয়ে বাসায় এসেছে। সেখানে গরু, ঘোড়া, হায়েনা ও বানরের নাম দেয়া ছিল। সে দাদাবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে গরু, –মহিষ দেখেছে। চিড়িয়াখানায় হায়েনা ও অনেকগুলো বানরের লাফালাফি ও ঝগড়া দেখেছে। কোনটিকেই হাসতে দেখেনি। কিন্তু সেদিন টিভিতে খবরে শুনেছে- একটি রাজনৈতিক দলের ২৭ দফায় রাষ্ট্র মেরামত কর্মসূচির ঘোষণা শুনে গাধাও হাসে। সে ছোট্ট মানুষ, তাই ভেবেছিল গাধা আসলেই হাসতে পারে। প্রশ্নে চারটি অপশনের মধ্যে গাধা নামক পশুর নাম ছিল না। তাই সে উত্তর দেয়নি।

প্রাথমিকে পড়ুয়া একজন শিক্ষার্থীর মনে টিভির সংবাদ এমন প্রভাব বিস্তার করতে পারে তা শুনে ওর বাবা তো অবাক! আমার কাছে সে জানতে চাইলো- এর সঠিক সমাধান কি হতে পারে স্যার?

আমিও ওর ছেলের কাণ্ড শুনে এই প্রশ্নের তাৎক্ষণিক কোন উত্তর দিতে না পেরে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। এমন জটিল প্রশ্নে উত্তর দিতে না পেরে শখের কাজ ফেলে বাসায় চলে এলাম। প্রাণীবিদ এক বন্ধুকে ফোন করলাম। তিনি জানালেন আজকাল কিছু গাইড বইয়ে অনেক আজগুবি তথ্য দেয়া থাকে। সেগুলো দেখে কুইজ এসব কুইজ টাইপ প্রশ্ন তৈরি করা হয়। আপনি ইন্টারনেট খুঁজলে পেতে পারেন।

কোন প্রাণী হাসতে পারে তা কোন বইয়ে লেখা আছে বা আমি কোথাও এমন কিছু পড়েছি বলে আমার মনে পড়ছে না। ছাত্রজীবনের সাধারণ জ্ঞানের সকল বই অন্যদেরকে দিয়ে দিয়েছি। অগত্যা গুগল খুঁজতে হলো। হ্যাঁ, সেখানে পাওয়া গেল। সেটাও একটি চাকুরির পরীক্ষার কুইজ। বলা হয়েছে, শুধু ‘হায়েনারা’ হাসতে জানে। তবে তাদের হাসির ভিডিও দেখে মনে হলো ওরা হো হো করে হাসতে জানে না। বরং শিকারকে ধরা বা ঝগড়া করা ও প্রজননের সিজনে নিজের ঘাড়ের লোম ও লেজ ফুলিয়ে শত্রুর দিকে তেড়ে আসে। এরপর বিশ্রি শব্দ করে দাঁত বের করে চোখে এক ধরণের জ্বলজ্বলে ভাব ফুটিয়ে তোলে। যেটাকে অনেকে সহজাত, হিংসা ও বিদ্রুপের হাসির সাথে তুলনা করেছেন মাত্র।
আমরা জানি ঘোড়া ডিম পাড়ে না। গাধারাও হাসতে জানে না। এগুলো প্রবাদ-প্রবচন। এসব প্রবাদ-প্রবচন দিয়ে অনেক শিক্ষামূলক ঘটনাকে বুঝানো হয়। আবার অনেক প্রবাদ-প্রবচন আছে যেগুলো মানুষ বানিয়ে বানিয়ে ভিন্নভাবে বলে। যেগুলোর মাধ্যমে অন্যকে তিরস্কার করা হয়, অনেকে আঘাত পান, কষ্ট পেয়ে থাকেন।

যতদূর জানা গেছে তাতে বলা যায়, রক্ত-মাংসের প্রাণীকূলের মধ্যে শুধু মানুষ হাসতে জানে। শিম্পাঞ্জি, বানর, ওরাংওটাং হাসির মতো করে ভেংচি কাটে। ঘোড়া, গাধা, জেব্রা ইত্যাদি হা করে সব দাঁত বের করতে পারে। কোন কিছু শুঁকে ঘ্রাণ নিয়ে দাঁত উচিয়ে নিজেদের মতো শব্দ করে অভিব্যাক্তি প্রকাশ করতে পারে। ছড়া-কবিতায় ‘খোলসে মাছের হাসি দেখে হাসেন পাঁতিহাস’ ও বালু সম্বলিত পরিষ্কার অল্প পানিতে পুঁটি মাছের ঝিলিক দিয়ে চলাফেরাকে অনেকে হাসের সাথে তুলনা করেছেন। কাণি ও সাদা বকেরা তখন সেসব পুঁটিমাছকে হাসিখুশি মনে ঠোঁট দিয়ে পটাপট শিকার করে গিলে ফেলে উদর পুর্তি করে। আদতে সেগুলো কোন হাসি নয়।

এমনকি ফেরেশতা, জ্বিন-পরী, দৈত্য-ভূত ইত্যাদি হাসতে জানে বলে গল্প শুনলেও আমি বাস্তবে তাদেরকে হাসতে দেখিনি। হয়তো তারা ভিন্ন জিনিষ দিয়ে তৈরি বলে আমাদের সাধারণ দৃষ্টিতে ধরা পড়ে না। যাক্ সেসব কথা। ঘণ্টাখানেক বাসায় কাটিয়ে আবার নিচে নেমে বাগানে ওদের নিকট গেলাম। আমি কিছু বলার আগে সে আবার প্রশ্ন করলো, স্যার, ‘গাধা হাসে, কিন্তু গাধা কি কখনো কাঁন্দে না?’

ওর জটিল প্রশ্ন শুনে আবার বিপদের আঁচ করলাম। এবার মনে করলাম গাধারা হাসতে পারে না। কিন্তু কাঁদতে পারে। গাধা বিপদের সময় কখনও কাঁদে। মনিবের পিটুনি খেয়ে কেঁদে দুচোখে পানি গড়িয়ে মুখে কালো দাগ করে ফেলে। অভিমান করে, রাগ করে, গোস্বা করে, ফুপিয়ে চিঁহিঁ-হিঁ করে চিৎকার করে মালিক বা মনিবের মনোযোগ আকর্ষণ করে।

ভাল খাবার বিশেষ করে গাজর-মূলো তাদের প্রিয় খাবার। সামনে একটি মূলো ঝুলিয়ে দিয়ে গাধাকে যে সামনের দিকে চালিত করা যায়। পিছনে মূলো ঝুলিয়ে দিয়ে গাধাকে সামনে চলতে বললে সে সামনে যায় না-বরং পিছনের পা দিয়ে পেছাতে থাকে। এজন্য বলা হয় গাধারা লোভী ও স্বার্থপর। শুধু নিজের পেটের চিন্তা করে।

তবে গাধা প্রাকৃতিকভাবে কিছু গুণ ধারণ করে থাকে। বিশেষ করে ভারবাহী গাধারা সন্মুখের বিপদ আঁচ করতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা পথের মধ্যিখানে নিজের বিপদ ঘটতে পারে এমন কিছু আঁচ করতে পারলে গাধারা শুয়ে পড়ে। তখন গরুর মতো নাকে পানি ঢাললেও তারা উঠতে চায় না। সুদূর অতীতকাল থেকে বেদ্ঈুনরা ভারবাহী উট, ঘোড়া ইত্যাদি দিয়ে পণ্য পরিবহণ বা মরুপথে চলার সময় সংগে গাধা রাখতো। অতীতে হজ্জ কাফেলার সময় গাধাকে সঙ্গী করা হতো। গাধা যে মরুপথে চলতে চাইতো না সে পথকে পরিহার করে সম্ভাব্য বিপদ এড়ানো হতো।

গাধা খুব পরিশ্রমী প্রাণী। অনের ভারী বোঝা পিঠে নিয়ে দূর-দূরান্তের বন্ধুর পথ পাড়ি দেবার জন্য গাধার সুখ্যাতি রয়েছে। এজন্য তারা নিজের পিঠের অবস্থা নিয়ে চিন্তা করে না। এতকিছু শুনে সে বললো- স্যার গাধার এত গুণ। জানতাম না। আমি বাড়িতে ক’টি ছাগল পুষি। তবে এত এত গুণের সাথে যদি হাসতে জানে এমন একটি গাধা পেতাম সেটাকেও পুষতাম। তাহলে আমার বাড়িতে সেই হাসি জানা গাধাকে অনেকে দেখতে আসতো। তখন একটি মিনি চিড়িয়াখানা খুলে দর্শনীর বিনিময়ে মানুষকে সেই হাসি জানা গাধাকে দেখার সুব্যবস্থা করতাম। এই দুর্মূল্যের বাজারে আমার কিছু বাড়তি আয় হলে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সংসারটা একটু ভালভাবে চালাতে পারতাম। অসুস্থ মায়ের চিৎিসার জন্য টাকা পাঠাতে পারতাম।

ওর চমৎকার ভাবনার কথা শুনে বললাম, বাস্তবে সেই হাসি জানা গাধা পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া গেলে তো! মনে মনে ভাবলাম আরা অনেকেই ঘোড়ার পিএচডি-র জন্য আবেদনের গল্প বলে মজার কৌতুক করে থাকি। ওকে একটা কৌতুক শোনালে কেমন হয়?

বললাম, তাহলে একটি কৌতুক শোনো।

‘এক রাজা যাবেন শিকারে। তিনি প্রিয় উজিরকে জিজ্ঞাসিলেন, আজকের আবহাওয়ার খবর কি? শিকারে গিয়ে ঝড়-বৃষ্টির কবলে পড়ব না তো? উজির শুধালেন, আজ আবহাওয়া চমৎকার। ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই।

কিছুদূর যাবার পর পথিমধ্যে এক ধোপার দেখা হলো। ধোপা বলল, মহারাজ, শিকারে তো চললেলন, কিন্তু সামনে যে বড় ঝড়-বৃষ্টি অপেক্ষা করছে! রাজা আর কিছুদূর যেতেই প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টির কবলে পড়লেন। তখন তিনি ঐ উজিরকে বরখাস্ত করে সেই পদে বসালেন ধোপাকে।

রাজা ধোপাকে বললেন, তুমি কি করে ঝড়ের কথা আগেই জান? ধোপা বলল, মহারাজ, যখন ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে তখন আমার পোষা গাধাটি সামনে চলতে চায় না, ও গোঁ ধরে, আর তার বাম কান নড়ে। আমার গাধার বাম কান নড়া দেখে আমি বুঝেছি আজ ঝড়-বৃষ্টি হবে।

রাজামশাই তাৎক্ষণিক ধোপাকে বরখাস্ত করে গাধাটাকে উজির বানালেন।’

সে কৌতুকটা শুনে খুব খুশী হলো বলে মনে হলো। আর কোন প্রশ্ন করলো না।

গাধারা বাস্তবে হাসতে না জানলেও আমাদের চারদিকে মানুষরূপী গাধায় ভরপুর। তারা শুধু হাসেই না। বরং কপট হাসি দেয়। ইর্ষা ও শয়তানির হাসি দিয়ে অট্টহাসি করে। মানুষের দু:খ-কষ্ট শুনে তারা জোর করে হাসার চেষ্টা করে তিরস্কৃত হয়। চেহারায় ভয়, উষ্মা ফুটে উঠলেও সে সময় জোর করে মুচকি হেসে ফটোসেশন করে। মুখটা হাসি হাসি করে কি আর হাসি হয়? মানুষ মিনি পর্দায় কপটতাপূর্ণ সেসব দৃশ্য অবলোকন করে কষ্ট পায়, কেউ কেউ অভিশাপ দেয়। এরাই সেইসব গাধা যারা নানা চরিত্রে হাসতে জানে। মানুষরূপী গাধাদের এসব ভণ্ড হাসির ফলে সুনাগরিক তস্করপদী চোর-ডাকাত, বদমাশ, ঘুষখোররা আরো বেশি বেশি অন্যায় করার আস্কারা পায়। এসব গাধা তাদের পোষা অনুচরদের নিয়ে সাময়িক হাসাহাসি করে, তাচ্ছিল্য করে।

আর এসব পোষা অনুচররা সামনে কোন বিপদ দেখলে মনিবের নিরাপত্তার জন্য বাম কান নাড়িয়ে সংকেত না দিয়ে আগে নিজেরাই সটকে পড়ে। এজন্য মনিবকে একদিন তার হীন কৃতকর্মের জন্য একাই পস্তাতে হয়। কাঁদতে হয় জন্ম-জন্মান্তরে। তাইতো এসব ছোট কানওয়ালা মানুষরূপী গাধার চেয়ে লম্বা কানওয়ালা আসল গাধারাই মনিবের বিপদের বন্ধু হিসেবে প্রমাণিত।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

  সীতাকুণ্ডে ডিপোতে আগুন

;

করোনা মহামারি, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অর্থনীতির গতি



ড. মাহফুজ পারভেজ
করোনা মহামারি, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অর্থনীতির গতি

করোনা মহামারি, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অর্থনীতির গতি

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনাকালের চীনা অর্থনৈতিক মন্দার লক্ষণীয় বিষয় হলো দেশটির ব্যবসায় সঙ্কুচিত পরিসর, বহু দেশই চেষ্টা করছে সেই জায়গা নিতে। 'ইকোনমিক হাব' নামে উত্থিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বৈশ্বিক মহামারি করোনার বহুবিধ প্রভাবের মধ্যে এখন ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে মন্দার চিত্র। এরই সঙ্গে আর্থিক পরিস্থিতিকে পাল্লা দিয়ে করোনার দোলাচলে ত্রস্ত চীন। এমতাবস্থায়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা বৃহত্তর ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলের সামরিক ও নিরাপত্তাগত মেরুকরণকে ছাপিয়ে সামনে চলে আসছে অর্থনৈতিক প্রপঞ্চসমূহ এবং এর বহুমাত্রিক পালাবদলের দৃশ্যপট। জনস্বাস্থ্যের মতোই মহামারিকালে আর্থিক রূপান্তরের চিত্রও এতে স্পষ্ট হয়েছে।

একটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষক সংস্থার হিসাবে, নববর্ষের জমায়েতের কারণে চীনে করোনায় দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা ৩৬ হাজার ছুঁতে পারে। সংস্থাটির হিসাবে কোভিডের কারণে চীনে এখন পর্যন্ত ৬ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যদিও সরকারি তরফে বলা হচ্ছে নিয়ন্ত্রণে এসেছে কোভিড পরিস্থিতি, তথাপি চীনে এখনও চোখ রাঙাচ্ছে করোনাভাইরাস। দেশটির এক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মিডিয়াকে জানিয়েছেন, ১৩ জানুয়ারি থেকে ১৯ জানুয়ারির মধ্যে সে দেশে ১৩ হাজার মানুষ কোভিড আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন। ওই অফিসার আরও জানিয়েছেন যে, শূন্য কোভিড নীতি তুলে নেওয়ার পর সে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ কোভিডে আক্রান্ত হয়েছেন।

চীনের ‘ডিজ়িজ কনট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনে’র তরফে চলতি সপ্তাহের শুরুতে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে জানানো হয়েছে, ১৩ হাজার জনের মধ্যে ৬৮১ জন সরাসরি কোভিড আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন। বাকি ১১ হাজার ৯৭৭ জনও কোভিড আক্রান্ত হয়েছিলেন, তবে তাঁদের অন্যান্য শারীরিক সমস্যা ছিল। অবশ্য বাড়িতে নিভৃতবাসে থাকা নাগরিকদের কত জন মারা গিয়েছেন, সে সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি এই বিবৃতিতে।

চীনে বর্তমানে চান্দ্র নববর্ষ উপলক্ষে উৎসব উদ্‌যাপন চলছে। কঠোর কোভিড নীতি উঠে যাওয়ায় দীর্ঘ দিন পরে দেশের নানা শহরে হইহুল্লোড়ে মেতেছে জনতা। এ অবস্থায় নতুন করে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা করছে বেজিং প্রশাসন।

একটি নিরপেক্ষ সমীক্ষক সংস্থার হিসাবে, চাইনিজ নববর্ষের হুল্লোড় এবং জমায়েতের কারণে সে দেশে দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা ৩৬ হাজার হতে পারে। ওই সমীক্ষক সংস্থাটির হিসাব বলছে কোভিড নীতি শিথিল করার পর চীনে ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৬ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে, পশ্চিমি মিডিয়াগুলোর একাংশের দাবি, চীন যদি প্রথম থেকে কোভিডে আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা প্রকাশ্যে আনত, তবে হয়তো সম্ভাব্য এই বিপর্যয় এড়ানো যেত। পশ্চিমা দেশের কোনও কোনও নেতা চীনের 'কোভিড নীতি' এবং 'রক্ষণশীল মনোভাব' সম্পর্কে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আসছেন। তারা মনে করছেন, মহামারির আঘাত ও প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য ও পরিসংখ্যান প্রকাশের ক্ষেত্রে চীনের 'গড়িমসি কৌশল' বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং অপরাপর দেশের প্রস্তুতি গ্রহণকে 'বিভ্রান্ত' ও 'বিলম্বিত' করেছে।

করোনা মহামারির নেতিবাচক প্রভাব চীনের সামাজিক জীবনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রকেও নাড়া দিয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। বিশ্বঅর্থনীতির শীর্ষস্থান অধিকারের প্রত্যাশায় যে চীনের গতি ছিল অব্যাহত ও তেজি, সেখানে থেকে সাম্প্রতিক কালে বহু দেশই তাদের উৎপাদন কেন্দ্র সরিয়ে নিচ্ছে। পূর্ব এশিয়ার বিনিয়োগ অর্থনীতিতে যে ফাঁকা জায়গা তৈরি হচ্ছে, তা পূরণ করতে নানা ফন্দিফিকির কষছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলো, বিশেষত চীনের পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত এক দশক জুড়ে ক্রমান্বয়ে এগিয়ে চলার পর বস্তুত করোনার ধাক্কায় চীনের অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতির পিছনে আরও কাজ করছে চীনের বাইরে অবস্থিত কারখানা এবং জোগান ব্যবস্থার দিকে উৎপাদন তথা অর্থনীতির অভিমুখ ঘুরে যাওয়ার ঘটনা। ফলে সাম্প্রতিক চার দশক ধরে উৎপাদন এবং বাণিজ্যে চীনের সাফল্য, যা তাকে ‘বিশ্বের কারখানা’ বলে পরিচিত করেছে, তা থেকে এক নতুন হাওয়ার ঘূর্ণিতে পৃথিবীর যাবতীয় কর্পোরেট পরিচালকদের নজর একেবারে উল্টো দিকে ঘুরে যাওয়ার বিষয়টি চীনের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দৃঢ়তার প্রতিষ্ঠিত ধারণার সঙ্গে একেবারেই মানানসই নয়। তা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, চীন ব্যতীত অন্য প্রতিযোগী দেশগুলোর শিল্পনীতিতেও কিছু বদল ঘটেছে, যা বিভিন্ন সংস্থাকে চীনের বিকল্প নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

পরিস্থিতির প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় চীন থেকে জাপানের সংস্থাগুলোকে তাদের উৎপাদন কেন্দ্রগুলো দেশে ফিরিয়ে আনতে অর্থ বিনিয়োগ করছে টোকিও প্রশাসন। গত গ্রীষ্মে জাপান এক নতুন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা আইন পাশ করেছে যার দ্বারা ১৪টি ক্ষেত্রকে একটি সামাজিক পরিকাঠামোর অঙ্গীভূত করা সম্ভব হয়েছে। তদ্রূপ,  দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ান তুলনামূলক ভাবে ‘রি-শোরিং’ বা 'দেশের বাইরে চলে যাওয়া কোনও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া' শুরু করেছে।

এসব নীতিগত পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হলো, চীন থেকে তাদের ব্যবসাকে গুটিয়ে আনা। সুতরাং, এশিয়ার সব থেকে বেশি শিল্পায়িত ৩টি দেশ তাদের সংস্থাগুলোকে চীন থেকে দেশের মাটিতে কিংবা সুবিধাজনক দেশে ফিরে আসতে ইনসেন্টিভ দিচ্ছে। এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী এবং বিশ্বের ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাৎপর্যবাহী।

জাপানের নীতিগত পরিবর্তনের নিরিখে দৃশ্যমান হয়েছে যে, 'রি-শোরিং’-এর জন্য টোকিওর বাজেট বেড়ে ২৫০ কোটি আমেরিকান ডলার হয়েছে। কমবেশি আড়াইশো জাপানি সংস্থা গত কয়েক বছরে চীন ছেড়ে চলে গিয়েছে। আর এই চীন-ত্যাগের ইস্যুকে ইউরোপের ব্রেক্সিটের অনুসরণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নামকরণ করা হয়েছে ‘চেক্সিট’। লক্ষণীয় বিষয় হলো সবগুলো সংস্থা যে চীন ছেড়ে সব সময় জাপানে ফিরে যাচ্ছে, তা-ও নয়। বরং ওই ভূগোলের অন্যসব আশেপাশের দেশেই তারা আস্তানা গাড়ছে। অর্থনৈতিক এই পরিবর্তমান গতিশীলতা চীনকে কেন্দ্র করে চলমান আর্থিক ধারাকে বহুলাংশে শ্লথ করবে।

জাপানের সংবাদমাধ্যম ‘আসাহি শিমবুন’-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী গত বছর ১৩৫টি সংস্থা চীন ছেড়ে অন্য দেশে তাদের উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি করেছে। এই সব সংস্থা মূলত সেমিকন্ডাক্টর, মোটরগাড়ি, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি এবং পোশাক নির্মাতা। সোনি তার স্মার্টফোন উৎপাদনের একাংশকে থাইল্যান্ডে নিয়ে গিয়েছে। লক্ষণীয়, এই স্থানান্তরণের ফলে ২০২১ নাগাদ সেখানে উল্লেখযোগ্য রকমের বিদেশি বিনিয়োগ ঘটেছে। আরও লক্ষ করার বিষয় এই যে, বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ কিন্তু চীনেরই বিভিন্ন সংস্থা।

দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্থাগুলোও যে শুধুমাত্র ‘ফ্রেন্ড-শোরিং’ বা বন্ধুরাষ্ট্র বা যে সব দেশ পরস্পরের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তির দ্বারা আবদ্ধ, সেখানে যন্ত্রাংশ তৈরির বরাত দেওয়া বা সরবরাহের পরিধিকে সেই সব দেশের মধ্যে আবদ্ধ রাখার নীতি করছে, এমন নয়। যেমন, স্যামসাং ভিয়েতনামে আগ্রহ প্রকাশ করেছে সে দেশ গুগলকে তার পিক্সেল ফোন বানাতে। অ্যাপলকে তার ম্যাকবুক এবং আইফোন উৎপাদনে এবং এমনকি নাইকি ও অ্যাডিডাসকেও বিনিয়োগে আকৃষ্ট করেছে।

এমনকি, চীন থেকে বত্রিশটি প্রকল্প সরিয়ে নিয়ে গিয়ে মালয়েশিয়া লাভবান হয়েছে। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের তরফে এশিয়ার শিল্প-দানবদের চেয়ে বেশি ইনসেন্টিভ দেওয়ার ঘোষণার উত্তরে হুন্ডাই পাল্টা ঘোষণা করেছে যে, তারা জর্জিয়ায় একটি বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং ব্যাটারি কারখানা গড়ে তুলবে। পাশাপাশি, হোন্ডার সঙ্গে যৌথ ভাবে এলজি ওহায়োতে একটি নতুন ব্যাটারি কারখানার উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে এসব পরিবর্তনের ফল আমেরিকানদের জন্য আশাবাদী হওয়ার মতো পরিস্থিতির জন্ম দিচ্ছে, তা বলা চলে না।

পক্ষান্তরে চীন এসব ব্যাপারে আগ্রাসী আচরণ দেখাতে অবশ্যই বাকি রাখেনি। তারা তৈরি করেছে এক দ্বিমুখী ভিসা নিষিদ্ধকরণ, যা জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়াকে আঘাত করেছে এবং যা থেকে রাজনীতির আঙিনাতেও উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। কোরিয়ায় লোত্তে-র খুচরো ব্যবসার পরিকাঠামো, সুইডেনের এরিকসন, অস্ট্রেলিয়ার সুরা-নির্মাতারা, তাইওয়ানের আনারস চাষিরা এবং লিথুয়ানিয়ার সকলেই চীনা ড্রাগনের আগুনে নিশ্বাসের উত্তাপ পেয়েছে।

স্বাভাবিক ভাবেই, বিশ্ববাণিজ্য মহল সার্বিক অর্থে চীনে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ঝুঁকি দেখতে পেয়েছে, সে দেশে বিভিন্ন রকমের বৈষম্য, ক্রমাগত বাড়তে থাকা উৎপাদন ব্যয়, যেমন, ভিয়েতনামে অদক্ষ শ্রমিকের মজুরি চীনের থেকে ৬০ শতাংশ কম, পরিবেশ সংক্রান্ত কঠোর নিয়মকানুন, কোভিড সংক্রমণ এবং অবশ্যই বার বার বিঘ্নিত সরবরাহ ব্যবস্থার সম্পর্কে শুনেছে। শুধু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোই নয়, বরং ইউরোপের একটি সমীক্ষা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, মহাদেশটির ২৩ শতাংশ সংস্থা চীন থেকে সরে আসার কথা ভাবছে।

আপাতত এসব নেতিবাচক কারণগুলো কিন্তু চীনকে উৎপাদন কেন্দ্র বা বাজার হিসেবে খাটো করে দেখাচ্ছে না। ২০২২ সালে নানা বিঘ্নের পরও চীনে প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ কার্যত বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, জার্মানির বিএএসএফ তার কর্মকাণ্ড চীনে ফিরিয়ে আনছে। ‘ফিন্যান্সিয়াল টাইমস’ চীনের আর্থিক শক্তিতে কোনধরনের ধ্বস হয়েছে বলে মানতে নারাজ। তাদের সাম্প্রতিক অনেকগুলো প্রতিবেদন চীনের ক্ষেত্রে নানা সঙ্কুলতার কথা উল্লেখ করলেও দেশটির সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেনি। বরং, কী উপায়ে অ্যাপলের উৎপাদন পদ্ধতি চীনের পরিবেশের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে যুক্ত, তা ফলাও করে প্রচার করেছে।

এ সব সত্ত্বেও বলা যায়, পরিবর্তনের হাওয়া কিন্তু বইছেই। সিএনবিসি এক সরবরাহ ব্যবস্থা সংক্রান্ত ‘হিট ম্যাপ’ (ডেটা প্রদর্শনকারী পদ্ধতি বিশেষ)-এ দেখাচ্ছে যে, চীন ক্রমে ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ, ভারত এবং তাইওয়ানকে হারাতে চলেছে।

সুতরাং, বিশ্বায়নের দিনগুলোতে করোনাকালে যত পরিহাসই করা হয়ে থাকুক না কেন, জাতীয় শিল্পনীতির পুনরুজ্জীবন এক বাস্তব ঘটনা, যা কার্যত জাতীয় নিরাপত্তা, সরবরাহ-শৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক উদ্বেগের দ্বারা চালিত হয়। এবং এই সমস্ত কিছুই একত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গত সেপ্টেম্বরে চীন নিজেই এক বিস্তারিত জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা ঘোষণা করেছিল, যার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ না করেই। যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘সমস্ত কিছুরই নিরাপত্তা বিধান’। এর মানে হলো পরিবর্তন আঁচ করেছে খোদ চীন এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েও তারা ভাবছে।

চীনের পরিস্থিতি ফায়দা তুলতে মুখিয়ে আছে বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বী আমেরিকা ও আঞ্চলিক প্রতিযোগী ভারত। ভারতের সাম্প্রতিক উৎপাদন বিষয়ক ইনসেন্টিভ, পুঁজির ক্ষেত্রে ভর্তুকি প্রদান ইত্যদি নীতির উপর জোর দেওয়ার ব্যাপার কিন্তু বিশেষ ভাবে চীন তথা পুর্ব এশিয়া এবং ব্যাপকার্থে বিশ্বের প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের প্রত্যাশার নিবিড় সম্পর্ক রাখে। যদিও ভারত ২০২১ সালের জাতিসংঘের বৈদেশিক বিনিয়োগ-তালিকায় সপ্তম স্থানে রয়েছে এবং চীনের বিকল্প হিসাবে তাকে বিশ্বের বৃহৎ সংস্থাগুলো বিবেচনা করেনা, তথাপি আর্থিক ক্ষেত্রে নিজেকে এগিয়ে নেওয়ার ভারতীয় তৎপরতা থেমে নেয়। দেখছে না। ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা পুর্ব এশিয়ার সঙ্গে আরও বেশি মাত্রায় বাণিজ্য সম্পর্ক তৈরি, শুল্কনীতির শিথিলায়ন, শ্রমক্ষমতার গুণগত মানের উন্নয়ন ইত্যাদির মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় যোগ্য হয়ে উঠার তাগিদ দিচ্ছেন। এরই মাঝে বহু পূর্ব এশীয় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তিসম্পদ দেশগুলো প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জনের পথে সামনের পরিস্থিতিতে সুবিধাজনক অবস্থান হাসিলের লক্ষ্যে চলতে শুরু করেছে।

ড. মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম

  সীতাকুণ্ডে ডিপোতে আগুন

;

‘বাস্কেট কেস’ থেকে উন্নয়নের সেরা গল্প!



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

হেনরি কিসিঞ্জার নামে এক মার্কিনীর পরিচয় যতটা জানে মানুষ তার চেয়ে বেশি জানে বাংলাদেশ সম্পর্কে তার মূল্যায়ন, একটা মন্তব্য। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ যখন ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজছিল তখন সেই মার্কিনী বাংলাদেশকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে। হেনরি কিসিঞ্জারের মন্তব্যের সেই বাংলাদেশ এখন নেই, কিন্তু তার সেই মন্তব্য আছে। এই মন্তব্যের রাজনৈতিক প্রচারণাও আছে। এই প্রচারণা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে চালানো হয়। বাংলাদেশকে ‘বাস্কেট কেস’ হিসেবে দেখার সেই প্রচারণায় গা ভাসিয়েছিল তৎকালীন মার্কিন কিছু গণমাধ্যম। বাংলাদেশ নিয়ে আশা নাই, এমনই ছিল ইঙ্গিত।

‘বাস্কেট কেস’ শব্দযুগল ব্যবহার কেবল বাংলাদেশকে নিয়েই হয়েছে এমন না। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীতে এই শব্দদ্বয়ের ব্যবহার হয়েছিল। প্রথমবার পা হারানো আহত সৈনিকদের ক্ষেত্রে, যারা অপরের সাহায্য ছাড়া দাঁড়াতে পারত না। দ্বিতীয়বার এর ব্যবহার হয় আরও বিস্তৃতভাবে, তখন কেবল আহত সৈন্যরাই নয় ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বলা শুরু হয় ‘বাস্কেট কেস’। ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠান হয়ে এর ব্যবহার হয় ১৯৭১ সালের সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ সম্পর্কে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিই কেবল এমন নয়, তৎকালে প্রভাবশালী দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমসের একাধিক নিবন্ধেও বাংলাদেশ ছিল ‘বাস্কেট কেস’। বদলেছে সেই দিন। এখন কেবল পশ্চিমা নেতারাই নয় পশ্চিমা মিডিয়াও বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক যুগ আগে বাংলাদেশ সম্পর্কে লিখেছিল ‘বাংলাদেশ, ‘বাস্কেট কেস’ নো মোর’।

শনিবার (২১ জানুয়ারি) বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংকের সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনদিনের সফরে ঢাকা এসেছেন বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অপারেশন) এক্সেল ভন টর্টসেনবার্গ। অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রশংসা করেছেন। বিশ্বব্যাংকের এমডি বলেছেন, ‘গত পাঁচ দশকে বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ থেকে অন্যতম দ্রুত প্রবৃদ্ধির দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ হলো উন্নয়নের সেরা গল্প।’ নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র দূরীকরণ ও করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্যের প্রশংসা করেছেন বিশ্বব্যাংকের দ্বিতীয় প্রধান এই কর্মকর্তা।

বিশ্বব্যাংকের এমডি যখন বাংলাদেশে এসে বাংলাদেশকে ‘উন্নয়নের সেরা গল্প’ হিসেবে আখ্যা দিলেন তখন আমাদের মনে পড়ে এক যুগ আগে এই বিশ্বব্যাংকই বাংলাদেশের অন্যতম মেগা প্রকল্প পদ্মা সেতু থেকে তাদের প্রতিশ্রুত অর্থায়ন ফিরিয়ে নিয়েছিল। ২০১২ সালে বিশ্বব্যাংকের সদর দফতর ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বৈশ্বিক সংস্থাটি পদ্মা সেতু নির্মাণে পরামর্শক নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার সহযোগিতা না করায় অভিযোগে তাদের প্রতিশ্রুত ১২০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।

বিশ্বব্যাংকের সেই অভিযোগ পরবর্তীতে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। সেই ঋণ বাতিল করার পর বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করার সাহস দেখিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঋণ বাতিলের পর থেমে থাকেনি বাংলাদেশ, একের পর এক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। মেট্রোরেল, পাতাল রেল, কর্ণফুলী টানেলসহ আরও অনেক মেগা প্রকল্প বাংলাদেশের আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণ হয়ে রয়েছে। এখন তাই ওয়াশিংটন থেকে বিবৃতি দিয়ে ঋণ বাতিল করা নয়, ঢাকায় এসে বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়ার ঘোষণাও দিতে হচ্ছে বিশ্বব্যাংকে।

ঋণ কারা পায়? উত্তর খুব সহজ যাদের পরিশোধের ক্ষমতা রয়েছে। এডিবি, বিশ্বব্যাংক, জাইকাসহ বৈশ্বিক উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য সম্পর্কে নিঃসন্দেহ বলে তারা বাংলাদেশকে ঋণ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করছে। অথচ এই দেশের আর্থিক সামর্থ্য নিয়ে কদিন আগেও না কত ধরনের সংশয়-শঙ্কার হাওয়া বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হয়ে যাচ্ছে, বৈদেশিক রিজার্ভ আশঙ্কাজনক অবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে, ব্যাংকে টাকা পাচ্ছে না মানুষ; এমন অগণন গুজবে গা ভাসাচ্ছিল মানুষ। রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির সেই সব গুজব শেষ পর্যন্ত মিথ্যা বলে প্রমাণের পথে। বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হয়ে যায়নি, ব্যাংকে গিয়ে টাকা না পেয়ে ফিরে আসছে না মানুষ; ওসব ছিল রাজনৈতিক অপপ্রচার। ওসব যদি সত্য হতো তবে এডিবি, বিশ্বব্যাংক, জাইকাসহ কোন উন্নয়ন সহযোগী বাংলাদেশে অর্থায়ন করতে সাহস করত না।

বাংলাদেশকে বটমলেস বাস্কেট, বাস্কেট কেস যারা বলত সেই পশ্চিমারা এখন এই বাংলাদেশকে দেখছে উন্নয়নের সেরা গল্প হিসেবে। অর্থনৈতিক সামর্থ্যের প্রমাণের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টাতে পেরেছে বাংলাদেশ। এটা আমাদের অর্জন। বাংলাদেশের লক্ষ্য ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা। লক্ষ্য কঠিন, তবে বাংলাদেশ যে গতিতে এগুচ্ছে তাতে আশাবাদী হওয়াই যায়!

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক

  সীতাকুণ্ডে ডিপোতে আগুন

;