বাংলাদেশ এগিয়েছে ও পিছিয়েছে যেসব খাতে

  সালতামামি



দেবদুলাল মুন্না
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

এ লেখাটি তৈরি করতে বেশ কিছু রিপোর্টের সাহায্য নিতে হয়েছে। সব রিপোর্ট গুলো যে নিরপেক্ষ সমীক্ষা চালিয়েছে এমনটি ভাবার কারণ নেই। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই কিছু  ‘হিডেন উদ্দেশ্য’ থাকে।

দেশ স্বাধীনের পর ৫০ বছরে এসেও বাংলাদেশ উদার গণতান্ত্রিক সূচকে ভাল অবস্থানে নেই। ১৭৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫৪তম। এমনকি নির্বাচনী ব্যবস্থাও নিরপেক্ষ নয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের ‘রুল অব ল ইনডেক্স’ এর রিপোর্টে এ তথ্য জানানো হয়েছে। আরও জানানো হয়, সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০২০-২১ সালের পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এ রিপোর্ট দিয়েছে সংস্থাটি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্প্রতি কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বেশ কিছু তথাকথিত নিরপেক্ষ সংস্থার হিসেবমতে বাংলাদেশের সাফল্যও অনেক বেশি। উন্নয়ন হচ্ছে। যেমন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় বাংলাদেশ সফল।  

এছাড়া অন্তত ১৩টি খাতে বিশ্বে গৌরবোজ্জ্বল অবস্থান তৈরি করেছে। এসব খাতে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক সুবিধা পেয়েছে বাংলাদেশ। এখন কিছু কিছু ক্ষেত্রে চীন ও ভারতের মতো বড় দেশের পরেই উচ্চারিত হচ্ছে বাংলাদেশের নাম। কয়েকটি ক্ষেত্রে তো চীন-ভারতকে পেছনে ফেলে প্রথম অবস্থানে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বাংলাদেশ ব্যাংক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য–উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ১৩টি খাতে দেশে সাফল্যের ধারা অব্যাহত আছে।

বিশ্বে মোট ইলিশের ৮৬ শতাংশই বাংলাদেশে উৎপাদিত হচ্ছে,। চারবছর আগে হতো  তবে  ৬৫ শতাংশ। গত দুইবছরে বেড়েছে ১৬ শতাংশ। ইলিশ উৎপাদনে ভারত দ্বিতীয়, মিয়ানমার তৃতীয়। এ ছাড়া ইরান, ইরাক, কুয়েত, পাকিস্তানেও সামান্য ইলিশ উৎপাদন হয়। পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে দ্বিতীয়। গত ২০১৯–২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২ হাজার ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের পোশাক রপ্তানি করেছে, যা বিশ্বের মোট পোশাক রপ্তানির ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। পোশাক রপ্তানিতে প্রথম হচ্ছে চীন। একসময় বাংলাদেশের চেয়ে ভিয়েতনাম এগিয়ে ছিল। রেমিট্যান্স আহরণে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। গত অর্থবছরে দেশে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার। একই অর্থবছরে ভারত ৭ হাজার ৮০০ কোটি ডলার নিয়ে প্রথম এবং ৬ হাজার ৭০০ কোটি ডলার পেয়ে চীন দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। সবজি উৎপাদনে তৃতীয় ও ধান উৎপাদনে চার নাম্বার অবস্থানে রয়েছে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিবিভাগ কৃষিখাতের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরেছে।

আম, কাঠাল, পেয়ারা রুপ্তানি করেও আয় হচ্ছে ভাল। মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়। নদ-নদীর খারাপ অবস্থা সত্ত্বেও এফএওর মতে,আগামী বছর বিশ্বের যে চারটি দেশ মাছ চাষে বিপুল সাফল্য অর্জন করবে, তার মধ্যে প্রথম বাংলাদেশ। এরপর থাইল্যান্ড, ভারত ও চীন। গত ১০ বছরে মাছের উৎপাদন ৫৩ শতাংশ বেড়েছে। আর মাছ রপ্তানি বেড়েছে ২০ শতাংশের বেশি। আউটসোর্সিং এ ভাল করছে শিক্ষিত তরুণ তরুণীরা। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতে ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা ছয় লাখ, যা শতকরা হারে বিশ্বের প্রায় ২৭ শতাংশ। এ মন্ত্রণালয় দাবি করছে,  বাংলাদেশ এ খাতে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যায় প্রথম হচ্ছে ভারত।

যদিও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ওকলার ‘স্পিডটেস্ট গ্লোবাল ইনডেক্স’র মতে, ইন্টারনেটের গতির ক্ষেত্রে বিশ্বের ১৩৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৫ নম্বরে। পেছনে রয়েছে আফগানিস্তান এবং ভেনেজুয়েলা। বিশ্বের প্রধান সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সার্ফশার্ক প্রকাশিত ‘ডিজিটাল কোয়ালিটি অব লাইফ ইনডেক্স ২০২১’ ডিজিটাল জীবনযাত্রার সূচকে ১১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১০৩তম।

বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল প্রথম পাঁচটি দেশের তালিকায় রয়েছে। জলবায়ুর ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জনের লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’ নামের শতবর্ষের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ভারতের সঙ্গে ৬৮ বছরের অমীমাংসিত স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের ফলে ছিটমহলের মানুষ অভিশপ্ত জীবনে মুক্তির আস্বাদ পেয়েছে। ১১১টি ছিটমহলের ১৭ হাজার ৮৫১ একর জায়গা বাংলাদেশের সীমানায় যুক্ত হয়েছে। সমুদ্রসীমায়ও প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার ৯৮ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা যুক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নের প্রতিবেদন মতে, ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তি মিশনে যোগদানের পর এ পর্যন্ত বিশ্বের ৩৯টি দেশের ৬৪ শান্তি মিশনে খ্যাতি ও সফলতার সাথে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এ যাবৎকালে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী ১১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এগিয়ে। কিন্তু ঠিক কতো নাম্বারে বলা হয়নি।

বিদ্যুৎখাতে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে রয়েছে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ৬ হাজার ৩২৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সংযোজন, যার ফলে বিদ্যুতের সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৪৭ শতাংশ থেকে ৬২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। একই সাথে মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ২২০ কিলোওয়াট ঘণ্টা থেকে বেড়ে ৩৪৮ কিলোওয়াট ঘণ্টায় দাঁড়িয়েছে। নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান করা হয়েছে ৩৫ লক্ষ গ্রাহককে।নির্মাণ করা হয়েছে নতুন ৬৫টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র।

তবে বেশ কিছু ক্ষেত্রে বদনামও কুড়িয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় নেই, হচ্ছে ধারাবাহিক অবনতি।এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে হচ্ছে না কোন গবেষণা বলে দাবি করেছে বিশ্ব শিক্ষা উন্নয়ন সংস্থা ( ডব্লিউএডেও ) । যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডসের (কিউএস) সর্বশেষ হিসাবেও তাই বলা হয়েছে। বিশ্বের ১ হাজার ৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৮০১ থেকে ১০০০-এর মধ্যে। অথচ ২০১২ সালেও ৬০১তম ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৯৫ সালে ছিল ৪০৭।

করোনার কারণে বন্ধ ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে, ক্লাস-পরীক্ষা হয়নি। তবে, সংক্রমণ কমে আসায় বছরের শেষদিকে সীমিত পরিসরে হয়েছে অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষা। ২০২১ সালের ৩০ জানুয়ারি প্রকাশ করা হয় ২০২০ সালের এইচএসসি অটোপাসের ফল। করোনা মহামারির কারণে হয়নি এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। জেএসসিতে প্রাপ্ত নম্বরের ২৫ শতাংশ ও এসএসসিতে প্রাপ্ত নম্বরের ৭৫ শতাংশের যোগফলের ভিত্তিতে এইচএসসি‘র অটোপাসের ফল প্রকাশ করা হয়।সম্প্রতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলেছে ও পরীক্ষা হচ্ছে। পাঠদানও চলছে।২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে দেশের ২০টি সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো গুচ্ছ পদ্ধতিতে স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা হয়েছে।

বিশ্বে পাসপোর্টের মান নির্ধারণকারী সূচক ‘হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স-২০২১’ সূচকের মোট ১১৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১০৮তম স্থানে রয়েছে। ২০০৭ সালের ৬৮তম অবস্থান থেকে ক্রমশ অবনতি ঘটছে এ বিষয়েও। বিশ্বব্যাংকের মতে, ১৪০টি মেগাসিটির মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৮তম। ট্র্যাফিক জ্যামের শিকার ৯১ শতাংশ মানুষ।আর রাজধানীর ৭১ শতাংশ মানুষ ডিপ্রেসনে ভোগেন।

ইউএনডিপির মানব উন্নয়ন সূচকে ১৮৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৩তম। এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য সেটি হলো, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রকাশিত গ্লোবাল ওয়েজ রিপোর্ট ২০২০-২১-এ জানানো হয়েছে, এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ন্যূনতম মজুরিতে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে,নারী নির্যাতন বেড়েছে। স্ত্রী নির্যাতনের সূচকে  বিশ্বে চতুর্থ বাংলাদেশ। বাল্যবিয়ে তেও চতুর্থ। যৌন সহিংসতায় ঢাকা বিশ্বের মধ্যে চতুর্থ অবস্থানে এবং  নারীর প্রতি আরও সহিংসতা আরও বাড়বে বলে মনে করে সংস্থাটি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আরও বলছে, চিকিৎসাব্যয় মেটাতে মানুষ আরও গরিব হচ্ছে। প্রতিবছর ১ কোটি ১৪ লাখের মতো মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার জিডিপির মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশ খরচ করে স্বাস্থ্য খাতে, যা বৈশ্বিক তলানিতে। এছাড়া স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর মতে, দুর্নীতিবাজদের ঘুষের পাতা ফাঁদ সরকারঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। দুর্নীতিবাজদের কারণে দেশের ৭৯ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই ঘোষিত ওই প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ পায়নি।

আইকিউএয়ারের বায়ুমান সূচক অনুযায়ী বিশ্বের শীর্ষ দূষিত ১০০ শহরের মধ্যে ঢাকা শহরের অবস্থান তিন নম্বরে। এফএও’র ‘স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ডস ফরেস্ট-২০১৬’ প্রতিবেদনে মতে, বনভুমি উজাড় হচ্ছে বেশি।

করাচির গবেষণা সংস্থা ইন্সটিটিউট অব হিস্টোরিকাল এবং সোশ্যাল রিসার্চের পরিচালক ড. সৈয়দ জাফর আহমেদ বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ১৯৭১ নিয়ে পাকিস্তানে সরকারি ব্যাখ্যা গত ৫০ বছরে তেমন বদলায়নি।কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশ অনেক খাতে পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা এবং পাকিস্তান সেনা গোয়েন্দা সংস্থার (আইএসআই) সাবেক প্রধান লে. জে. (অবসরপ্রাপ্ত) আসাদ দুররানি বিবিসিকে বলেন, গত ৫০ বছরে সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কোনো স্বীকারোক্তি না এলেও পাকিস্তানের মানুষ এখন অনেকটাই বুঝতে পারছে কোথায় গলদ হয়েছিল।মানুষের মনে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই যে ভুল হয়েছিল। সেনাবাহিনীর ভুল হয়েছিল। নির্বাচনের পর (সত্তরের নির্বাচন) শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব মেনে না নিয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টো ভুল করেছিলেন।

লেখক পরিচিতি: কথাসাহিত্যিক সিনিয়র সাংবাদিক

  সালতামামি

পার্বত্য চট্টগ্রামের কোটা সুবিধা অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ মানুষের প্রাপ্য



কনক জ্যোতি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
পার্বত্য চট্টগ্রামের কোটা সুবিধা অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ মানুষের প্রাপ্য

পার্বত্য চট্টগ্রামের কোটা সুবিধা অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ মানুষের প্রাপ্য

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণের মতোই পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো উচ্চশিক্ষা এবং চাকরি ক্ষেত্রে বিদ্যমান কোটাব্যবস্থার সুবিধা পেয়ে জীবনমান ও আর্থ-সামাজিক সূচকে অভূতপূর্ব অগ্রগতি করেছে। তবে সব নৃগোষ্ঠী সমভাবে কোটার সুবিধা পেয়ে নিজেদের ভাগ্য বদলাতে পারছে না এবং কিছু সম্প্রদায়ের দ্বারা একচ্ছত্রভাবে কোটা সুবিধা ব্যবহার করার মতো পরিস্থিতি চলছে। এতে পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বৈষম্য ও ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হচ্ছে। বাড়ছে বঞ্চিত উপজাতি গোষ্ঠীগুলো ও পার্বত্য বাঙালিদের মধ্যে ক্ষোভ, অসাম্য ও বঞ্চনা।

কয়েকটি গবেষণায় প্রাপ্ত্য তথ্যে জানা যায়, প্রধান কিছু উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী আরও শক্তিশালী হয়ে অপরাপর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে পশ্চাৎপদ ও প্রান্তিক পরিস্থিতিতে ঠেলে দিচ্ছে, যা সুষম উন্নয়ন ও সব নাগরিকের সম-অধিকারের সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে সামাজিক ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব ও বিভেদের অন্যতম মূল কারণ।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সংবিধানের ২৯-এর ৩ (ক) অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশের উপজাতি/ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়গুলোকে অনগ্রসর শ্রেণি হিসেবে বিবেচনা করে ১৯৮৫ সালে সরকারি চাকরিতে তাদের জন্য শতকরা পাঁচ ভাগ কোটা সংরক্ষণের বিধান রাখা হয়। এ ছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে উপজাতি কোটা রাখা হয়। ২০১৫ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, বিধি-১ শাখা কর্তৃক সিনিয়র সচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক সার্কুলারে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসে নিয়োগের ক্ষেত্রে বরাদ্দকৃত কোটার ক্ষেত্রে ‘উপজাতীয়’ শব্দ ব্যবহারের পরিবর্তে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে প্রতিস্থাপন করা হয়। উপরন্তু তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির সরকারি চাকরি এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপজাতি/ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটা বিদ্যমান থাকার পাশাপাশি ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে উপজাতি/ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের সদস্যগণ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়ে থাকেন।

কিন্তু তথ্য-পরিসংখ্যানগত বাস্তবতা এই যে, উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য চাকরি ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রদত্ত কোটা সুবিধার দ্বারা পার্বত্য চট্টগ্রামের সব নৃগোষ্ঠী সমভাবে উপকৃত হচ্ছে না। কোটার সিংহভাগ সুবিধা এককভাবে চাকমা ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে মারমা ও ত্রিপুরা উপজাতিরা পেয়ে থাকে আর বাকি ১০-১১টি উপজাতি বলতে গেলে বঞ্চিত হচ্ছে। সবচেয়ে বৈষম্যমূলক চিত্র এটাই যে, একই পাহাড়ের দুর্গম ও বিরূপ পরিস্থিতিতে বসবাস করলেও পার্বত্য বাঙালি জনগোষ্ঠী কোটা সুবিধাবঞ্চিত হয়ে শিক্ষা, চাকরি, আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদায় চরমভাবে পিছিয়ে পড়ছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে জনসংখ্যার অর্ধেক হয়েও পরিসংখ্যানগত বাস্তবতায় তারাই অবহেলিত, প্রান্তিক ও দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হচ্ছে বলে অভিযোগ করছে।

২০১৬ সালে খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট কর্তৃক পরিচালিত গবেষক সুগত চাকমার গবেষণায় বলা হয়, খাগড়াছড়ি জেলায় বসবাসকারী চাকমা জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থা, শিক্ষার হার ও পেশাগত ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। কোনো কোনো চাকমা গ্রামের সর্বোচ্চ শতকরা ৮০ থেকে সর্বনিম্ন শতকরা ৪০ ভাগ লোক শিক্ষিত। শিক্ষিত চাকমাদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি সংস্থা, ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পদে চাকরি করছেন। উদাহরণস্বরূপ, খাগড়াছড়ি জেলার ৯টি কলেজে চাকমা জনগোষ্ঠীর ৭০ জন শিক্ষকতায় নিয়োজিত। জেলায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চাকমা নৃগোষ্ঠীর ৩০ চিকিৎসক কর্মরত। ৯টি ব্যাংকের শাখায় ৬৮ চাকমা কর্মরত, যার মধ্যে ৪৬ জন পুরুষ এবং ২২ জন নারী। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন আর্থিক সেক্টরেও চাকমারা নেতৃস্থানীয় অবস্থানের অধিকারী। চাকমাদের উল্লেখযোগ্য উন্নতি চাকরি ও উচ্চশিক্ষায় কোটাব্যবস্থার সুফল।

তবে শহরে বসবাসকারী চাকমারা এসব ক্ষেত্রে যত সুবিধা পাচ্ছে, গ্রামের চাকমা সম্প্রদায় তা পাচ্ছে না। অনুরূপভাবে চাকমাদের উন্নতির নিরিখে পার্বত্য বাঙালি সম্প্রদায় এবং বাকি ১২-১৩টি উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অনেক পেছনে। এ কারণে বাঙালিরা কোটা ও চাকরিসহ অধিকার ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে সম-অধিকারের দাবি করছে। অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সম্প্রদায়, যেমন, বম, খুমি, পাংখোয়া, লুসাই, খিয়াং, মং, চাক প্রভৃতি কোটা ও চাকরির সুবিধার ক্ষেত্রে একচ্ছত্র অগ্রাধিকার ও সুবিধার মাধ্যমে অতি অগ্রসর চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গা নৃগোষ্ঠীর সমপর্যায়ে আসার প্রয়োজনে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার ও তাদের অনুকূলে সমন্বয়সাধনের দাবি করেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষণা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে বিগত ১০ বছরের (২০১১-২০২১) সময়কালে উপজাতি/ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটায় ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের পরিসংখ্যানে চাকমাসহ কয়েকটি সম্প্রদায়ের একচ্ছত্র প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়, যা থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ‘অভ্যন্তরীণ বঞ্চনা ও আধিপত্য’র বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।

বিগত ১০ বছরের পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের অর্ধশতাধিক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত মোট ৩১০৮টি আসনের অর্ধেকের চেয়ে বেশি (শতকরা ৫৬ ভাগ) এককভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা শিক্ষার্থীরা অধিকার করে। অথচ চাকমারা বাংলাদেশের মোট ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনসংখ্যার শতকরা ২৮ ভাগ। অনুরূপভাবে, মারমা সম্প্রদায় মোট ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শতকরা ১৫ ভাগ এবং তারা মোট সংরক্ষিত কোটা আসনের শতকরা ১৪ ভাগ, ত্রিপুরা সম্প্রদায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনসংখ্যার শতকরা ৮ ভাগ এবং কোটা আসনের শতকরা ৭ ভাগ আসনে ভর্তির সুযোগ গ্রহণ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে কোটা সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য লক্ষ করা যায়। সাঁওতাল সম্প্রদায় মোট উপজাতি জনসংখ্যার শতকরা ৯ ভাগ হলেও শতকরা ৩ ভাগ এবং মনিপুরী সম্প্রদায় শতকরা ৭ ভাগ হয়েও কোটার শতকরা ২ ভাগ সুবিধা লাভ করতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে আরও অর্ধশত নৃগোষ্ঠী মিলিতভাবে কোটার মাত্র শতকরা ১৮ ভাগ সুবিধা নিতে পেরেছে, যদিও তাদের মিলিত জনসংখ্যা মোট উপজাতি জনসংখ্যার শতকরা ৩৩ ভাগ।

মূলত রাজনৈতিক প্রভাব, যোগাযোগ, নিজ সম্প্রদায়ের প্রতি পক্ষপাত ও আঞ্চলিকতার মাধ্যমে চাকমা সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা কোটার সিংহভাগ সুযোগ গ্রহণ করছে। তাদের মধ্যে শিক্ষার হার বেশি হওয়ায় উচ্চশিক্ষায় বা চাকরিতে চাকমা আবেদনকারীর সংখ্যাও অধিক হয়। দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আগে থেকেই বহু চাকমা শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত, যারা চাকমা সম্প্রদায়ের ভর্তিচ্ছুদের দিকনির্দেশনা ছাড়াও থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে। বিভিন্ন তথ্যও তারা দ্রুত নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে পাঠিয়ে দিতে পারে। কিন্তু অন্যান্য উপজাতি সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা এমন সুযোগ না পেয়ে কোটার সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ছে। অনেক সময় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা উপজাতিসংক্রান্ত সনদ ও কাগজপত্র পেতে বিপত্তির সম্মুখীন হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন অফিসের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রাধান্য থাকায় তারা নিজ নিজ সম্প্রদায়কে সহযোগিতা ও অন্যান্য সম্প্রদায়কে অসহযোগিতা করে। কখনো কখনো অন্য নৃগোষ্ঠীর সম্ভাবনাময় ভর্তিচ্ছুদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে ও ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা হয়। ফলে অন্য নৃগোষ্ঠী সদস্য পাওয়া যায় না। তখন তদবিরের মাধ্যমে শূন্য কোটা আসনে চাকমা শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভর্তি নিশ্চিত করে।

একটি-দুটি নৃগোষ্ঠীর অতিরিক্ত সুবিধাপ্রাপ্তির কারণে অন্য নৃগোষ্ঠীগুলো পিছিয়ে পড়ছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে বলে গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীগুলো শিক্ষা ও পেশার ন্যায্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় সরকারের উন্নয়ন নীতি ও পরিকল্পনার সুফল সবার জন্য সমভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে না বলেও তারা মনে করেন।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের গড় শিক্ষার হার শতকরা ৭২.৯ ভাগ হলেও প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদে বঞ্চিত থাকার অভিযোগ উত্থাপনকারী চাকমাদের শিক্ষার হার শতকরা ৭৩ ভাগ। এই অগ্রগতি বঞ্চনা ও পশ্চাৎপদতার পরিচায়ক নয়। শিক্ষার কারণে পেশা ও কর্মক্ষেত্রে একচ্ছত্রভাবে চাকমা নৃগোষ্ঠীর প্রাধান্য বিরাজমান।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য নৃগোষ্ঠীগুলোর শিক্ষার হার মাত্র শতকরা ৪৫ ভাগ, যা গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সুযোগের তারতম্য, ভারসাম্যহীনতা ও অভ্যন্তরীণ বৈষম্যের প্রমাণবহ। যার আরেকটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী পার্বত্য বাঙালি সম্প্রদায়। কোটা সুবিধা ও অন্যান্য সাংবিধানিক সম-অধিকার না পাওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের কিছু বেশি হওয়ার পরেও তাদের মধ্যে শিক্ষার হার মাত্র শতকরা ২৩ ভাগ।

এতে শুধু সম্প্রদায় ও জাতিগত বৈষম্যই হচ্ছে না, দেশের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাগরিককে যোগ্য মানবসম্পদে পরিণত করে দেশ ও জাতি গঠনের কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে জাতির বিরাট ক্ষতি হচ্ছে। এ কারণে কোটাব্যবস্থার সামগ্রিক সুফল একতরফাভাবে নেতৃস্থানীয় গোষ্ঠীর কব্জা থেকে জনসংখ্যার অনুপাতে এবং সম্প্রদায়গত পশ্চাৎপদতার নিরিখে সুবিধাবঞ্চিত উপজাতি ও পার্বত্য বাঙালি সম্প্রদায়কে দেওয়ার আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠছে। এতে পার্বত্য চট্টগ্রামের টেকসই ও সমন্বিত উন্নয়ন হবে এবং সম্প্রদায়গত বৈষম্য ও অসন্তোষ দূর হবে।

উল্লেখ্য, শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৩-১৪টি নৃগোষ্ঠীর অধিকাংশই উচ্চশিক্ষা ও পেশা গ্রহণের সুযোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে নিজেদের দাবি ও বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতির একতরফা সুযোগ নিচ্ছে চাকমা ও আরও দুই-একটি নৃগোষ্ঠী, যারা তাদের গোষ্ঠীগত স্বার্থ এবং নেত্বত্ব-কর্তৃত্বকে ‘সমগ্র নৃগোষ্ঠীর দাবি’র নামে চাপিয়ে দিচ্ছে। যদিও এসব রাজনৈতিক তৎপরতায় অপরাপর নৃগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও বক্তব্যের কোনো সুযোগ ও স্বীকৃতি নেই। পার্বত্য উপজাতি দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামো ও নেতৃত্বের শতকরা ৯০-৯৫ ভাগই চাকমা নিয়ন্ত্রণাধীন।

ফলে ‘জুম্মু জাতীয়তাবাদ’কে প্রকারান্তরে ‘চাকমা জাতীয়তাবাদ’ বলা হয়। যেমনভাবে অতীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘জাতিগত সংঘাত’কে ‘চাকমাদের সশস্ত্র সংঘাত’ নামে আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও নানা গবেষণায় নামকরণ করা হয়। বর্তমানেও উপজাতি তথা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নামে পরিচালিত নানা আন্দোলনে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল ও জনগণের ওপর ‘চাকমা প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক প্রচেষ্টা’ স্পষ্ট, যাকে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ ‘চাকমা গোষ্ঠীগত আধিপত্যবাদ’ নামে চিহ্নিত করে, যার আশু অবসান হওয়া প্রয়োজন এবং পাহাড়ে সব শ্রেণি, পেশা, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য সম-অধিকার ও সমসুযোগ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

গবেষকগণ মনে করেন, এ ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামে জনসংখ্যা অনুপাতে এবং চাহিদা ও পশ্চাৎপদতার নিরিখে প্রকৃত অবহেলিত ও বঞ্চিতদের শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে এগিয়ে আনার প্রয়োজনে কোটা সুবিধার আইনগত পরিবর্তন করাও আবশ্যক।

একটি বা দুটি গোষ্ঠী কোটা সুবিধার সিংহভাগ পাবে আর অন্যরা বঞ্চিত হবে তা বাংলাদেশের সব নাগরিকের অধিকার রক্ষা, বৈষম্য নিরসন ও সুযোগের সমতা নিশ্চিতের মর্মার্থকে ব্যাহত করার মাধ্যমে বরং নতুন অসন্তোষ ও বৈষম্যের সৃষ্টি করে। ফলে উচ্চশিক্ষা ও চাকরিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটার ভালোমন্দ দিকগুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা দরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে চরমভাবে অবহেলিত, পশ্চাৎপদ ও বঞ্চিত পার্বত্য-বাঙালিদেরও কোটার আওতায় আনা একান্ত প্রয়োজন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে গবেষণাকারী ড. মাহের ইসলাম বার্তা২৪.কম'কে বলেন, "সামগ্রিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সব নাগরিকের জন্যই মৌলিক অধিকার, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক সুযোগসহ সাংবিধানিক সব অধিকার সমভাবে ও বৈষম্যহীনভাবে প্রয়োগ করার আইনগত কাঠামো নিশ্চিত করা পাহাড়ের স্থায়ী শান্তি, সামাজিক সম্প্রীতি ও টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে অতীব জরুরি।"

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গ্রন্থকার ও গবেষক প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, "বাংলাদেশের সব নাগরিকের অধিকার রক্ষা, বৈষম্য নিরসন ও সুযোগের সমতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে নারীসমাজ, অনগ্রসর নাগরিক গোষ্ঠী, দুর্গম এলাকার জনগণের জন্য শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতার মাপকাঠি কিছুটা শিথিল করে এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন সংরক্ষিত রেখে বিশেষ বিধান তথা কোটাব্যবস্থা চালু রয়েছে। ১৯৭২ সালে জাতির সূর্যসন্তান, বীরমুক্তিযোদ্ধাদের সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে সর্বপ্রথম কোটাব্যবস্থা চালু করা হলেও ক্রমান্বয়ে দেশের অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীকে উন্নত ও অগ্রসর করার প্রয়োজনে কোটার পরিধি বৃদ্ধি করা হয়, যার আওতায় রয়েছে উপজাতি তথা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের সদস্যরা। কোটাব্যবস্থার সুবিধা অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ মানুষের প্রাপ্য, তা যথাযথভাবে নিশ্চিত করা জরুরি।"

  সালতামামি

;

নিউইয়র্কের দিনলিপি-৮



আমান-উদ-দৌলা
নিউইয়র্কের দিনলিপি

নিউইয়র্কের দিনলিপি

  • Font increase
  • Font Decrease

১. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে আসবেন। আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৭৭তম সাধারণ অধিবেশনে তিনি বাংলায় ভাষণ দেবেন। বিভিন্ন মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে।

বর্তমানে তিনি লন্ডনে আছেন। বিভিন্ন সভায় যোগ দিচ্ছেন। তিনি সেখানে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের শেষকৃত্যে যোগ দিয়ে নিউইয়র্কে আসবেন। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে তার সংবর্ধনা। বিএনপি প্রতিবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর যাত্রাপথে বিক্ষোভ প্রদর্শন করবে।

২. প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন শনিবার লন্ডনের উদ্দ্যেশে রওয়ানা হয়ে গেছেন। আগামী সোমবার ১৯ সেপ্টেম্বর সেখানে প্রায় ১০০টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে মিলিত হয়ে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। এরআগে তিনি বৃটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বি-পাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেবেন। তথ্য: দি গার্ডিয়ান।

রানির শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে থাকবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ইইউ প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভনদরলেন, জাপানের সম্রাট নারুহিতো, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো, স্পেনের রাজা ৬ষ্ঠ ফিলিপ, নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আর্ডান, ভারতের রাষ্ট্রপ্রতি দ্রোপদী মুর্মুসহ আরও অনেকে। রাণী গত ৮ সেপ্টেম্বর ৯৬ বছর বয়সে মারা যান।

৩. আমেরিকার মধ্যে সবচেয়ে বড় স্কুল ডিস্ট্রিক্ট নিউনিয়র্ক সিটি। গত বৃহস্প্রতিবার সিটির প্রায় ১৭০০ স্কুলে নতুন শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৯ লাখ শিক্ষার্থী নিয়ে স্কুল খুললো। Back to School শিরোনামে এইসব স্কুলে শিক্ষার্থীরা কোনো মাস্ক ও ডিসটেন্স ছাড়াই স্কুলে প্রবেশের অনুমতি পেয়েছে। দুই বছর পর পরিস্থিতির উন্নতি ঘটায় ভ্যাক্সিন নেয়া আছে কিনা তা পরীক্ষা ছাড়াই স্কুলে প্রবেশ করানো হলো। গোটা আমেরিকায় তাদের স্কুলে প্রবেশকে একটা অগ্রগতি হিসেবে চিহ্নিত হলো।

৪. আমেরিকার নাগরিক এখনো হন নি তারা মেডিকেইড এবং চিলল্ড্রেনস হেলথ ইন্সুরেন্স প্রোগ্রামের সুবিধাগুলো নিতে পারেন। তাদের মর্যাদা হারাবে না। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ গত ৮ সেপ্টেম্বর সেকথা জানিয়েছে।

৫. নতুন রুল কার্যকর করা হচ্ছে এসাইলাম আবেদনের জন্য। আবেদনের ২১ দিনের মধ্যে তাকে ইন্টারভিউতে হাজির হতে হবে।

৬. ২০২৩ সাল থেকে নিউইয়র্কে মজুরি বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। বর্তমানে ঘন্টায় ১৫ ডলার। বৃদ্ধি পাবে ২০ ডলার পর্যন্ত। নিউইয়র্ক শহরের বাইরে চলছে ১৩.৫০ ডলার। এরআগে শেষবার মজুরি বাড়ানো হয় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে। অক্টোবরের শেষে নিউইয়র্ক সিনেটে বিলটি ওঠার কথা।

৭. শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য প্রতিটি ক্লাসে সর্বাধিক ২৫ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী নেয়া যাবে। নিউইয়র্ক স্টেট এসেম্বলি ও সিনেটে তা পাশ হবার পর বিলে স্বাক্ষর করলেন গভর্নর ক্যাথি হকুল। গত বৃহস্প্রতিবার বিলটি পাশ হয়।

৮. নিউইয়র্কে আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর ইমিগ্রেশন ডে ও ট্রেড ফেয়ার হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ও আমেরিকার সম্পর্কের ৫০ বছর উদযাপন করবে বাংলাদেশীরা। ৩ দিন ব্যাপী এই অনুষ্ঠানটির উদ্বোধন হবে ২৩ তারিখ সন্ধ্যা ৬টায় টাইমস স্কোয়ারের ম্যারিয়ট মার্কি হোটেলের ৭ম তলায় এস্টোর বলরুমে। সেখানে বাংলাদেশ এফবিসিসিআই ও নিউইয়র্কের বাংলাদেশ বিজনেস লিংক আয়োজিত ট্রেড ফেয়ার চলবে ৩ দিন। এতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও থাকছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য পুরস্কার দেয়া হবে ৫ জন আমেরিকানকে। তারা হলেন, সেন্টার ফর বাংলাদেশের কো ফাউন্ডার ও যুদ্ধ পূর্ব বাংলাদেশের কলেরা হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক ডাঃ ডেভিড নেলিন। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন প্রান্তরে মুক্তির গানের চিত্রধারনকারী লিয়ার লেভিন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ওয়াশিংটনে স্থাপিত বাংলাদেশ সেন্টারের উদ্যোক্তা ডেভিড ওয়েজবোর্ড। মুক্তির গানের অন্যতম পরিচালক ক্যাথেরিন মাসুদ। ৭১ সালে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত কনসার্ট ফর বাংলাদেশের অন্যতম শিল্পী প্রয়াত ওস্তাদ আলী আকবর খান, তারপক্ষে পুত্র আশীষ খান পুরস্কারটি নেবেন।

৯. আমেরিকায় বাংলাদেশের নিযুক্ত নতুন রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরান গত ১৫ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটন ডিসিতে পৌছেছেন। সেখানে তিনি দায়িত্ব গ্রহন করবেন। এরআগে তিনি নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রদূত এম শহীদুল ইসলামের স্থলাভিষিক্ত হলেন।

(bbc, nytimes, cnn, wsj, apnews সহ সকল ওয়েবনিউজ ও স্থানীয় পত্রপত্রিকা থেকে বাছাই করা সংক্ষিপ্ত সংবাদ প্রতি ৭ দিনে বার্তা২৪-এর পাঠকদের জন্য 'নিউইয়র্কের দিনলিপি' পরিবেশন করা হচ্ছে।)

আমান-উদ-দৌলা, সিনিয়র সাংবাদিক। সাবেক সম্পাদক-বাংলা বিভাগ, রেডিও ফ্রি এশিয়া, ওয়াশিংটন ডিসি ( ২০১৪-১৬)। সাবেক কূটনৈতিক রিপোর্টার-দৈনিক জনকন্ঠ ( ১৯৯৪-২০০০) One of the founders and First GS of DCAB in 1998. ( Dilpomatic Correspondent Association, Bangladesh)

  সালতামামি

;

কাঁদায় মুখগুজে খাবার খুঁজে দুর্লভ পরিযায়ী সবুজ বাটান



বিভোর বিশ্বাস, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
জলাভূমির কাঁদায় খাবার খুঁজছে সবুজ বাটান। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

জলাভূমির কাঁদায় খাবার খুঁজছে সবুজ বাটান। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

  • Font increase
  • Font Decrease

কিছু কিছু পাখির জলাভূমিই জীবন। সেখানকার কাঁদায়, পানির নিচে, জলাভূমির পাড়ে নানা খাবারে জীবন কাটে তাদের। যেখানে খাবার, যেখানেই বিচরণ করে এ সকল প্রজাতির পাখিরা। পাখিরাজ্যে কিছু প্রজাতির পাখির সাথে তাই কাঁদার সম্পর্ক নিবিড়।


শীত মৌসুম নিয়ে আসে দূরদেশের পাখিদের ডানা মেলার আহ্বান। কিভাবে যেন উপলব্ধি করে তারা – এখনই ডানা মেলার চূড়ান্ত ক্ষণ। এভাবেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটে চলে পরিযায়ী পাখিরা।

পাখি বিজ্ঞানীরা এমন সব পাখির নাম দিয়েছেন ‘মাইগ্রেটরি বার্ড’ অর্থাৎ পরিযায়ী পাখি। জেলার প্রসিদ্ধ সংরক্ষিত জলাভূমি বাইক্কা বিল এখন মুখর এমন সব পাখিদের কলকাকলিতে। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে পরিযায়ীরা আসর জমিয়েছে এখানে।

সৈকতে বিচরণকরা এই ‘সবুজ বাটান’ একটি পরিযায়ী পাখী। এর ইংরেজি নাম Green Sandpiper এবং বৈজ্ঞানিক নাম Tringa ochropus। জলাভূমিতে যখন এরা ঘুরে ঘুরে খাবার সংগ্রহ করে করে তখন স্বচ্ছ পানিতে তাদের ছায়াটি অপূর্ব সৌন্দর্য নিয়ে ফুটে ওঠে।

সবুজ বাটানের উড়ন্ত সৌন্দর্য। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক বলেন, এরা বাংলাদেশের দুর্লভ পরিযায়ী পাখি। শীত মৌসুমে হঠাৎ হঠাৎ এদের সৈকতে ঘুরে বেড়ানো পাখিদের দলে দেখা যায়। ইউরোপ, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত উপমহাদেশের প্রায় সকল দেশসহ এশিয়ার এদের বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।

পাখিটির শারীরিক বর্ণনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৭৫ গ্রাম। প্রজননকাল ছাড়া প্রাপ্তবয়স্ক পাখির কালচে বাদামি দেহতলে খুব ছোট ফিকে তিলা দেখা যায়। তাদের পেট, বগল ও চোখের সামনের ভ্রু-রেখা সাদা। মাথা ও ঘাড় ছাইবাদামি এবং পা ও পায়ের পাতা জলপাই সবুজ। এর রয়েছে সোজা খাটো অনুজ্জ্বল সবুজভ ঠোঁট। যার আগা কালো। ব্রিডিং প্রিরিয়ডে (প্রজননকাল) এদের পিঠে বড় সাদা তিলা, ঘাড়ে ও বুকের উপরের অংশে বাদামি ডোরা হয়ে থাকে। ছেলে এবং মেয়ে পাখির চেহারা অভিন্ন।

সবুজ বাটানের স্বভাব সম্পর্কে ইনাম আল হক বলেন, মজার বিষয় হলো- বিরক্ত হলে এরা মাথা উঠানাম করে রাগ প্রকাশ করে। উড়ে যাবার সময় বাঁশির মতো তীক্ষ্মস্বরে ডাকে। সচরাচর একা বা জোড়ায় থাকে। লতাপাতায় ঘেরা অগভীর মিঠাপানির জলাভূমি, নদীর পাড়, বর্জ্য রাখার জায়গা, ছোট পুকুর, ডোবা, সরু খাদ ও পাহাড়ি নদীতে বিচরণ করে। অগভীর পানিতে হেঁটে নরম কাঁদায় ঠোঁট ঢুকিয়ে এরা খাবার খায়।

শামুক ও চিংড়ি জাতীয় প্রাণী, কেঁচো, পানির অমেরুদন্ড উদ্ভিজ্জ উপাদান রয়েছে সবুজ বাটানের খাদ্য তালিকায় । এপ্রিল-জুন এদের প্রজনন মৌসুম। তখন এরা সাইবেরিয়াতে অন্য পাখির বাসায় ৩ থেকে ৪টি ডিম পাড়ে বলে জানান এ পাখি গবেষক।

  সালতামামি

;

ওয়াহেদুল করিম বাবুল: জীবন-উদযাপন করা আমার বাবা



সেমন্তী ওয়াহেদ
ইনসেটে লেখকের বাবা ওয়াহেদুল করিম বাবুল

ইনসেটে লেখকের বাবা ওয়াহেদুল করিম বাবুল

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি, আমার একজন সহপাঠী ওর বাবার হাতে প্রতিনিয়ত নিজের ও ওর মায়ের নির্যাতনের ঘটনার কথা উল্লেখ করে ভীষণ কেঁদেছিলো। আমার স্পষ্ট মনে আছে, সেই দিনের পর, আমি, ঈশ্বর/আল্লাহ/ভগবান/প্রকৃতি, আমরা যে যেই শক্তিতেই বিশ্বাস করিনা কেন- আমি সেই পরম শক্তির কাছে কখনও নিজের জন্য কিছু চাইনি। সেই মুহূর্তে এগারো আর বারোর মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা আমি দিব্যি উপলব্ধি করেছিলাম যে মানবিক গুণসম্পন্ন বাবা-মায়ের সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠা সকলের জীবনে নাও হয়ে উঠতে পারে, সে নিশ্চয়তা হয়তো অনেকের জীবনকে এঁড়িয়েই চলে যায়; জীবনের বাঁক আঁধারে নিমজ্জিত করে। আমার মত যে সব সন্তানের প্রয়াত বাবার স্মৃতিচিহ্ন মিশে আছে রন্ধ্রে-রন্ধ্রে, প্রতি নিঃশ্বাসে, থমকে না যাওয়ার প্রতি বিশ্বাসে; সেই বাবার কথা লিখতে গিয়ে অক্ষর মিশে যায়-ভেসে যায়, অশ্রুভেলায়।

ছোটবেলায় বাবাই প্রথম বলেছিলো," শোন, তোকে যদি কেউ বলে তুই নিনি আর বাবুলের একমাত্র মেয়ে, সুন্দর করে বলবি, না, আমি আমার মা-বাবার একমাত্র সন্তান"। আট বছরের আমি তোতা পাখির মত প্রায়ই অগ্রজদের এই ভুল শুধরে দিতাম। বাবা মুচকি মুচকি হাসতো। আর বেড়ে উঠতে উঠতে সেই আমি অনুধাবন করেছি কত সহজেই পুত্র কিংবা কন্যা সন্তানের সামাজিক কাঠামোতে আবদ্ধ না করে বাবা আমাকে শুধুই মানুষ, এক মুক্ত-স্বাধীন সত্তা হিসেবে গড়ে তুলতে ছিল সহায়ক শক্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্ত্রে কিংবা বোভোয়ার একাধিকবার পাঠ করে যে দর্শনের নির্যাস আন্দোলিত করেছে মন, সেই মানসপট বহু আগেই নির্মাণ করেছিল বাবা।

বাবা-মায়ের সঙ্গে সেমন্তী ওয়াহেদ

আমাদের বাসায় বাবার কিছু পরিচিতজন এসেছিলেন একদিন। তাঁদের কথপোকথনের এক পর্যায়ে বাবা বেশ সহজ ভাষায় তবে কঠিন কণ্ঠে বলেছিল, "কি বললে? নিনিকে আমি স্বাধীনতা দিয়েছি? নিনিতো পরাধীন নয় তাই ওকে স্বাধীনতা দেবার প্ৰশ্নই ওঠে না। আমি যেমন, ঠিক নিনিও তেমন, দুজনেই সমান ও স্বাধীন"। নারীর উন্নয়ন, ক্ষমতায়ন ও সমঅধিকার বাবার উচ্চারণের মতন স্পষ্ট করে যেন ধারণ, লালন ও পালন করে বিশ্ব। 

কৈশোরপ্রাপ্তি থেকে কৈশোর উত্তীর্ণ বয়সী মেয়েদের জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসা আমাদের উপমহাদেশের গন্ডি পেরিয়ে অভিবাসী বাঙালি সমাজের জন্যও সমান প্রযোজ্য। মানুষ সামাজিক জীব এবং বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া সামাজিকতার সেই অংশ যা নিজের ইচ্ছায় চাইলে বেছে নিতে পারি, কোন পারিবারিক বা সামাজিক বাধ্যবাধকতা ছাড়া, এই পরিচ্ছন্ন দৃ‌ষ্টিভঙ্গি যতটা মায়ের তার চাইতেও বেশি, বোধহয়, বাবাই প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছে, "বিয়ে করতেই হবে কেন?" কেউ যদি জানতে চাইতো, "বাবুল ভাই, সেমন্তীর বিয়ে দেবেন না?" অথবা " মেয়ের বিয়ে হয়নি?" সেই সময়ে প্রতিবার বাবাকে বলতে শুনেছি, "আমাদের পরিবারে মেয়েদের বিয়ে দেই না, হয়ও না, আমাদের পরিবারে মেয়েরা বিয়ে করে, তাও চাইলে"। কন্যার বিয়ে দেওয়া, হওয়া ও করা নিয়ে বাবার যেই উক্তি শুনে বেড়ে উঠেছি তা আমি আজও বলি। আজ তা বোধ করি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। 

শিক্ষা ও জ্ঞান নিয়ে যেই কথাটি আমি হরহামেশা আমার "ছাও-পাও" অর্থাৎ আমারই প্রজন্মের তবে আমার চাইতে বয়সে ছোট এই মাটিতে জন্ম কিংবা বেড়ে ওঠা প্রজন্মকে বলে থাকি, তা বাবার বোঝানো আরও একটি কথা। "আপনার এত মেধাবী মেয়ে কেন বিজ্ঞান, আইন বা অর্থনীতি, এই ধরণের কোন বিষয় নিয়ে পড়লো না? ওতো অনায়াসে কোন আইভি লীগে পড়তে পারতো?" এই সব প্রশ্নের উত্তরে বাবার বরাবর ঠোঁটের ভাজে হাসি মাখানো অভিব্যক্তি জ্বলজ্বল করে ভাসে। আমার পড়াশোনা প্রসঙ্গে বাবা-মা কখনও জোর করেনি; না বিষয় নিয়ে, না বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে। শুধু একটি অনুরোধ করেছিল বাবা, আমার শিক্ষা যেন জ্ঞানে পরিণত হয়, তাতে যেন মানুষের কল্যাণ হয়, শুধু চারকোণে একটি তকমা-সম্পন্ন কাগজে সীমাবদ্ধ না রয়ে যায়। 

বাবা জীবনযাপনে নয়, জীবন-উদযাপনে ছিল দৃঢ় বিশ্বাসী আর তাই বাবা জীবন উদযাপন করেছে দুটি অধ্যায়ে। প্রথম অধ্যায় যেমন জ্ঞান ও অর্থে প্রাচুর্যপূর্ণ দ্বিতীয় অধ্যায় তেমনি বিকশিত বোধ ও রুচিশীলতায় পরিপূর্ণ। সাতচল্লিশে বাবারা সপরিবারে নদিয়া শান্তিপুর থেকে বসতি গড়ে ঢাকার গেন্ডারিয়ায়। পঞ্চাশ থেকে আশির দশকের শেষ পর্যন্ত বাবার জীবন যেন এক বাস্তব রূপকথা। বাবা ভীষণ মেধাবী ছিল, ওর ছিল তুখোড় স্মরণশক্তি। ক্রিকেটের মাঠে তখন বাবার অল রাউন্ডার হিসেবে ছিল খ্যাতি। মন চাইলেই বাবা উড়োজাহাজে চড়ে শারজার মাঠে ক্রিকেট খেলা উপভোগ করতে যেত। বাবার সাদা ড্যাটসান সাজিয়ে সেই সময়ে গেন্ডারিয়ায় বিয়ে হয়নি বোধহয় এমন কেউ নেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবার ৪৯ দিনোনাথ সেন রোডের সুবিশাল বাড়ি ছিল আশ্রয় স্থল। আমার মায়ের সাথে এক দশক প্রণয়ের সময়ে কলকাতার মঞ্চে উৎপল দত্ত, সম্ভু ও তৃপ্তি মিত্রের অভিনয় দুজনে দেখতে গেছে বহুবার; লরেন্স অলিভিয়ার ও গ্রেগরী পেক থেকে দিলীপ কুমার ও মধুবালা কিংবা উত্তম-সুচিত্রার প্রতিটি সিনেমা বাবার বারবার দেখা। বাবা নিমগ্ন হয়ে সব ধরনের গান শুনতো। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত ও পুরনো দিনের বাংলা ও হিন্দি সিনামার গান শুনতে বাবা বেশি ভালোবাসতো। মোহাম্মদ রফির কণ্ঠ বাবার কাছে ছিল বিশেষ প্রিয়।

সেই সময়ের উচ্চশিক্ষিত, ধনাঢ্য বনেদি-জমিদার পরিবারের সুদর্শন এক পুত্রের অকল্পনীয় জীবন বাস্তবে অতিবাহিত করা আমার বাবা সেই বর্ণাঢ্য জীবন সম্পূর্ণভাবে স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে নব্বই সালে হঠাৎই পারি জমিয়েছিল নিউইয়র্ক নগরীতে। বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত ৩৬ এভিনিউর যেই ওয়াশিংটন টাওয়ারে বাবা প্রথম এসে উঠেছিল, সেই বিল্ডিং-এই বাবা থেকেছে আমৃত্যু। নিজের সাদা ড্যাটসান নয়, টি এল সির হলুদ গাড়ি গর্বভরে চালিয়েছে বাবা; কাজ করেছে রেস্তোরাঁয়। গাড়ি চালানো, বিল্ডিং সিকিউরিটি অথবা দোকান বা রেস্তোরাঁয়ে কাজ করাকে অনেকেই আখ্যায়িত করে "odd job" হিসেবে আর ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা আইনজীবীদের কর্মকে বলা হয়ে থাকে "career"। কোনো প্রকার সৎ উপার্জন "odd" অর্থাৎ উদ্ভট বা অস্বাভাবিক নয়, শুধুই চাকরি, কাজ বা "job" এবং এই ধরণের শ্রেণী বৈষম্য দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সমাজের শিক্ষিত মানুষেরাই করে থাকে এবং এর ফলে শুধু শ্রেণী বৈষম্যই বৃদ্ধি পায় না, ব্যক্তি মনে বাসা বাঁধে হীনমন্যতা- মনস্তাত্ত্বিক এমন অনেক বিশ্লেষণ শুনেছি বাবার মুখে। 

আমাদের সামাজিকতায় আমরা সাধারণত বয়সে ছোটদেরকে বেয়াদব বা বেত্তমিজ বলে থাকি। আমার ছোটবেলায়, বাবা, একজনের আচরণের প্রেক্ষিতে বুঝিয়েছিল, "মা, অনেক সময় বয়সে বড়রাও এই শব্দ দুটির আভিধানিক অর্থের মত আচরণ করে থাকে, অনেক সময় বয়সের সঙ্গে রুচির মিল তুই নাও খুঁজে পেতে পারিস, তবে নিরাশ হবি না"। জীবনে কথার মূল্য আছে, বিশেষ করে এক একটি শব্দের অর্থের- তা যেমন মা শিখিয়েছে, সেই শব্দের মূল্যায়ন ও প্রাত্যহিক ব্যবহার প্রতি মুহূর্তে শিখিয়েছে বাবা। 

বাবা সাহিত্যিক, গবেষক, বা বুদ্ধিজীবী ছিল না। মানসম্পন্ন লেখক, সুবক্তা, গুণী বিশ্লেষক বা পন্ডিত চিন্তাবিদ হবার জন্য যে চর্চা ও অধ্যবসায় প্রয়োজন বাবা কখনোই তা করেনি। নামের আগে একাধিক বিশেষণের ভার বহন করে বাবার ওজন কখনো বাড়েনি। কোন আসন কিংবা সম্ভাষণে মুখ্য বা প্রধান হিসেবে বাবাকে দেখা বা নাম শোনা যায়নি। বাবা সবসময়ই নিজেকে আড়াল করে রেখেছিল। অতি সহজ-সরল, সাদা-মাটা, সাধারণ আমার বাবা ওর মতো করে জীবন পরখ করেছে, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাবা ওর ইচ্ছা অনুযায়ী জীবন উদযাপন করেছে। আমার ৩৫ বছরের জীবনে পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষার চাইতে পৈতৃক সম্পদ হিসেবে পাওয়া বাবার দৈনন্দিন জীবন উদযাপনের জ্ঞান আমার কাছে অমূল্য, অসামান্য- আমার বাকি জীবন অতিবাহিত করবার পাথেয়।

  সালতামামি

;