দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান



মহীবুল আজিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

দারোগা তাদের বোঝাতে থাকে। তারা যেভাবে হাসিঠাট্টা আর গল্পগুজবের মধ্য দিয়ে উদ্গত আগুনের ব্যবহারে লিপ্ত সেটা কোনভাবেই আইনসঙ্গত কর্মতৎপরতা নয়। কেননা, প্রথমত এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি। আগুন যে ক্ষুদ্র শিখা থেকে বৃহৎ ও বৃহত্তর হয়ে দিক-দিগন্তে ছড়িয়ে পড়বে না তার গ্যারান্টি কে দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, যদি সেখানে গ্যাস বা তেল থেকেও থাকে সেটা ব্যবহার করবার মালিক খায়ের বা তার প্রতিবেশী বা এমনকি দ্বীপের কেউই নয়। দেশের যে-কোন স্থানে তেল-গ্যাস দেখা দিলে সেটা কর্তৃপক্ষের গোচরে আনা এবং কর্তৃপক্ষকে জানানো নাগরিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এক্ষেত্রে স্পষ্টত তার ব্যত্যয় এবং লঙ্ঘন ঘটেছে। সে-হিসেবে খায়ের এবং তার স্ত্রী জান্নাত প্রাথমিকভাবে অপরাধমূলক কাজ সম্পাদন করেছে। পুলিশের কাছে খবর রয়েছে, খায়েরই প্রথম উদ্গত গ্যাসে প্রথম আগুনের শিখাটি জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং সেই শিখা এখন আর নিভছে না। নিভভে কেবল গ্যাস ফুরিয়ে গেলে বা যারা এসব বিষয়ে অভিজ্ঞ একমাত্র তাদের পক্ষেই এর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। যদি ক্ষেত্রটিতে গ্যাস মিলেই যায় তাহলে অবশ্যই খায়েরের কাজটি প্রশংসনীয় বলে বিবেচিত হবে। কিন্তু সামগ্রিক নিরাপত্তা এবং সম্পদ-সুরক্ষার উদ্যোগ হিসেবে আশু-দায়িত্ব পালন করবার জন্যেই দারোগা-পুলিশের আগমন। দারোগার কথার ফাঁকে-ফাঁকে যুবক আলোকচিত্রী অগ্নিশিখা, ডোবা, ডোবার চারপাশ, খায়েরের ঘরবাড়ি, বাড়িতে সুপুরির বেড়া এসবের ছবি তুলতে থাকে। এইসব দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্যে গর্ব অনুভব করতে থাকে খায়ের। স্মিত সে তাকায় জান্নাতের দিকে। জান্নাতও গর্বিত হয়েছে, এমন ভাব তার অবয়বে থাকে।

এসবই হলো তাত্ত্বিক কথা মানে সবটাই অনুমাননির্ভরতা। বাস্তবের মুখোমুখি হলে খায়ের কিংবা জান্নাতের সামনে একটা বড় জীবন-ঝুঁকি এসে দাঁড়ায়। দারোগা তাদের জানিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত। খায়ের এবং জান্নাতকে জায়গাটা ছেড়ে দিতে হবে। তাদের জন্যে সুবিধাজনক একটা ঘরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতির মীমাংসা না-হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের বাসস্থানে থাকতে পারবে না। পুরো জায়গাটা চিহ্নিত করে দেওয়া হবে বিশেষ ধরনের সীমানা-নির্ধারক ফিতের মাধ্যমে। অনুমোদিত লোক ছাড়া কেউ সেই সীমানা অতিক্রম করে সীমানার অভ্যন্তরে যেতে পারবে না। যদি সেই নির্দেশের কোন লঙ্ঘন পরিলক্ষিত হয় সরকারি আইনে সেটিকে গর্হিত কাজ বলে গণ্য করা হবে। শুনে প্রথমে ভয়ে সিঁটিয়ে যেতে থাকলেও তাদের জন্যে থাকবার ব্যবস্থা হয়েছে শুনে কিছুটা স্বস্তি বোধ করে খায়ের। তাদেরকে একদিন সময় দিয়ে দারোগা বলে, একদিনেও অনেক বিপদ ঘটতে পারে। তবে খায়ের এবং জান্নাতের সংসার তত সম্পদশালী না-হওয়ার কারণে বাসস্থানত্যাগ খুব ঝক্কির ব্যাপার নয়। কিন্তু খায়েরের মনে অন্য আশঙ্কা জেগে উঠেছিল- যদি সত্যি-সত্যি তেল-গ্যাস এ-ক্ষেত্রে মিলেই যায় তাহলে এর আদি আবিষ্কর্তা হিসেবে সে কী এর অংশভাক্ হবে যদি সে তার জায়গাটা ছেড়ে চলেই যায়। দারোগা-পুলিশেরা কোন ফন্দিফিকির নিয়ে হাজির না তো! মনের মধ্যে একটা ধাঁধার ধোঁয়াশা তৈরি হয়। আবার তার অন্য মন বলে, যেহেতু দারোগা-পুলিশ তাদের কর্তব্যরত অবস্থায় ইউনিফর্ম পরিহিত হয়ে এসেছে সেহেতু তারা মিথ্যে বলছে না। তাই সে আর কালবিলম্ব না করে তাগাদা দেয় স্ত্রী জান্নাতকে- তাড়াতাড়ি গোছগাছ কইরা লও। ওগো কথা না মানলে আবার না প্যাদানি লাগায়। দারোগার হাতে তার কর্তব্যসুলভ লাঠি দেখা যায়।

আরও পড়ুন দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান (পর্ব-১)

কিছুদিনের মধ্যেই সুবর্ণদ্বীপ পরিণত হয় আন্তর্জাতিক বিষয়বস্তুতে। দ্বীপের লোকেদের তা জানবার কথা নয়। প্রথমে সংবাদ ছাপে জাতীয় কয়েকটি দৈনিকে। তারপর একজন/দু’জন করে প্রায় সবাই জানতে পারে, পশ্চিমপাড়ায় গ্যাস-তেলের সন্ধান-লাভ। কত কথা যে ছেপেছে পত্রিকায়। উৎসের কাছাকাছি থেকেও এসবের কিছুই জানা নেই তাদের। অথচ তারা বলছে, অনেক গ্যাস আর তেল নাকি মজুদ আছে সুবর্ণদ্বীপে মাটির নিচে। একদিন গোটা মাটিটাই ছিল সাগরতলে। হয়তো সেই মাটির সঙ্গে লাগানো সাগরেও বয়ে চলেছে তেলের নহর। অনেকেই বলছে, একশ’ বছর ধরে জ্বালালেও সেই গ্যাস ফুরাবে না। ভাবা যায়, একে শূন্য দশটা বছর ধরে গোটা দ্বীপের সব লোক ভাত-মাছ-মাংস-তরিতরকারি-নাস্তা তৈরি করছে এই গ্যাসে। আবার, খাওয়ার পানি সেদ্ধ করছে। কিংবা বর্ষাকালে প্রয়োজনে ভেজা কাপড় শুকিয়ে নিচ্ছে গ্যাসের চুলোর ওপরে ঝুলিয়ে রেখে। সে এক এলাহি কাণ্ড। জাতীয় দৈনিকের স্থানীয়তার সীমানা ডিঙ্গিয়ে যখন খায়ের-জান্নাতের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাজাত সেই গ্যাস-তেলের সংবাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘দ্য ফ্রিকনমিস্ট’ পত্রিকায় ছাপা হলো তখন সেটা রীতিমত হৈচৈ তুলে দিল। যে-ডোবাটা খায়ের-জান্নাত রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখতে পেতো, এখনও পায়, খানিকটা দূর থেকে এসে এবং দেখতে পায় দ্বীপের প্রায় সমস্ত লোক সেই ডোবার ছপি ছেপেছে হাজার-হাজার মাইল দূরের দেশের কাগজে। শুনে অভিভূত বোধ করে সবাই। খায়ের এবং জান্নাতের কথাও সেই বিদেশি কাগজের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে। লোকে এসে জানিয়ে যায় তাদেরকে।

প্রতিবেদনটিতে সুবর্ণদ্বীপের একমাত্র বিদেশি লুইগি পালোমারের কথাও থাকে। লুইগি জানতো না, এমন তেল-গ্যাসের ব্যাপার তার নিরাময়-কেন্দ্রের কাছাকাছি কোথাও ঘটে যাচ্ছে। সেদিনকার সেই ঘটনায় একটু সে বিষন্নই হয়েছিল যখন ফিলিস্তিনে ইজরায়েলি হামলার প্রতিশোধে দুই যুবক রাতে তাকে হত্যা করবার জন্যে এসে এখন জেলখানার খাবার খাচ্ছে। তবে, লুইগি খুব উৎফুল্ল সংবাদটিতে। সে জানায়, সুবর্ণদ্বীপের বাসিন্দারা গরিব হলেও সুখি এবং তারা সহজ-সরল, বিভিন্ন পরিবেশে নিজেদের খাপ খাওয়ানোর এক বিস্ময়কর দক্ষতা তাদের রয়েছে। তবে তারা অত্যধিক পরিমাণে ভাত-নির্ভর। লুইগি এ-ও জানায়, একই ভাত, শুনেছে কেউ খাচ্ছে দামি মাছ-মাংস-ডিম এসব দিয়ে আবার কেউ খাচ্ছে একটুখানি আলুভর্তা-ডাল বা এমনকি সবুজ রংয়ের কাঁচামরিচ প্লেটে ভাতের মধ্যে চটকে দিয়ে সামান্য একটু নুন মিশিয়ে। অথচ তারা নির্বিকারভাবে এই ভাতের সন্তুষ্টি নিয়ে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ কাটিয়ে দিচ্ছে। সত্যি আশ্চর্য এই সুবর্ণদ্বীপের অধিবাসীরা। এক ধরনের উত্তেজনার সঞ্চার ঘটে সুবর্ণদ্বীপে। তবে অধিকাংশ লোকের তাতে উৎসাহ কম। এইসব উত্তেজনায় যেহেতু পয়সার কামাই নেই, অর্থের নগদ সম্ভাবনা নেই তাই তারা চিবুকে হাত ঠেকিয়ে তাদের আকাশের দিকে তাকিয়ে উদাসভাবে মন্তব্য করে, কার তেল কার গ্যাস, পাওয়া গেল আমার পায়ের তলে আর পাইপ লাগাইয়া টাইনা লইয়া যাইবো গা অন্য মাইন্ষে, অত লাফালাফি কইর‌্যা লাভ কী!

আরও পড়ুন➥ দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান(পর্ব-২)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান (পর্ব-৩)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান(পর্ব-৪)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান(পর্ব-৫)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান(পর্ব-৬)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান(পর্ব-৭)