দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান



মহীবুল আজিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এরইমধ্যে আলিম বক্স একদিন গোপন বাহক মারফত জানতে পারে পল্লীসুন্দরীর ঘাতক-ব্যাধির কথা। তার সমগ্র অস্তিত্ব ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে যখন সে জানল, এইড্স্ রোগের জীবাণু শরীরে নিয়ে মেয়েটি তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক অব্যাহত রেখেছিল। মধ্যপ্রাচ্য-ফেরত যুবকের সঙ্গে সংসর্গের প্রতিশোধ নিয়েছিল আলিম মেয়েটিকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে। কিন্তু এবারে সে মেয়েটির সত্তাকেই নির্জীব সত্তায় পরিণত করে তাকে হত্যা করার মাধ্যমে। চূড়ান্ত প্রতিশোধই নেয় আলিম বক্স। পরিণাম হাজতবাস। তার আইনজীবী আলিমের মার্ডারকে ম্যানস্লটারে ঘুরিয়ে দিয়ে তার চৌদ্দ বছরের কারাবাসের ব্যবস্থা করে। প্রাণে বেঁচে গেলেও এক নতুন ভাবনা তাকে কাবু করে দেয়- সেটা হলো মৃত্যুভয়। কারাগারে বন্দি সে ভাবে, মরন-ব্যাধির ছোবল অচিরে তার শরীরে ভয়ানক আঁচড় বসাতে শুরু করবে এবং সে মৃত্যুর অতল কেন্দ্রে তলিয়ে যাবে। অথচ অলৌকিক ঘটনার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ হয়ে সে বেঁচে থাকে। বেঁচে থেকে সে মনে-মনে ভাবে জীবনে এত অপরাধ করেছি আর এত নারী ভোগ করেছি নিশ্চয়ই আমার জন্যে অপেক্ষা করছে পৃথিবীর সবচাইতে মারাত্মক দু’টি ব্যাধির যে-কোন একটি অথবা একই সঙ্গে দু’টিই- এইড্স্ এবং ক্যান্সার। অথচ সে মরে না। এমনকি মরবার পূর্বলক্ষণ হিসেবে অসুস্থতাও তাকে ছোঁয় না। বলা যায়, এখান থেকেই তার নবোদ্যমের সূচনা। কী করে কী করে যেন পুলিশের সঙ্গে ভাব জমিয়ে একদিন পুলিশের পোশাক পরেই সে দেশের এক কুখ্যাত-বিখ্যাত কারাগার থেকে পালিয়ে যায়। প্রথমবার সে অন্ধকার থেকে আলোকের সংবাদ হয়েছিল বিখ্যাত পল্লীসুন্দরীকে হত্যা করে এবং দ্বিতীয়বার সে বিখ্যাত হয় জেল পালিয়ে।

তারপর তার আর কোন হদিস থাকে না। কেউ বলে, সে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে গেছে। কেউ বলে, ভারতকে ট্রাঞ্জিট হিসেবে ব্যবহার করে সে আসলে চলে গেছে পাকিস্তানে। আবার, কারো-কারো ভাষ্য, ভারত এবং পাকিস্তান উভয় দেশকে ব্যবহার করে সে চলে গেছে মধ্যপ্রাচ্যে। সেখানে নাকি দাউদ ইব্রাহিমের দলে যোগ দিয়ে সে তারই স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে কাজ করতে শুরু করেছে। দাউদের একজন সহযোগী নিহত হলে খবর আসে, আলিম বক্স নিহত হয়েছে। কিন্তু পরে নিশ্চিত হওয়া যায় আলিম বক্সের মুখে একটি বড় ক্ষতচিহ্ন ছিল যেটা দাউদের লোকের ছিল না। তবু কিছুদিন পর-পরই তার সম্পর্কে পত্রপত্রিকায় নানা সংবাদ ছাপা হতে থাকে। হতে পারে সেসব উড়ো খবর বা গুঞ্জনই। এমনও ভয়ধরানো খবরও আসে, আলিম না থাকলেও আলিমের জাল সারা দেশে ছড়ানো। বিশেষ করে রাজধানি এবং একটি-দু’টি বড়-বড় শহরের ব্যবসায়ীদের নিকটে প্রায়ই ফোন আসতে থাকে আলিমের নামে। সবই অর্থের চাহিদাসংক্রান্ত এবং সঙ্গে গাঁথা মৃত্যু-পরোয়ানা। অর্থ অনাদায়ে মৃত্যু অবধারিত। সন্ত্রস্ত ব্যবসায়ীরা শেষে সম্মিলিত হয়ে আলিম-ভীতি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে দফায়-দফায় সভা করে এবং সেই সভায় এমন সিদ্ধান্ত হয়, আসলে আলিম একটি অদৃশ্য ভীতির নাম। হয়তো তার মিথটাকে ব্যবহার করে, ব্যবসায়ে যেমন গুডউইলের একটা পূর্ব-প্রতিষ্ঠিত মূল্য থাকে তেমনি হুমকিদাতা সন্ত্রাসীরাও আলিমের ব্যাড-উইলকে ব্যবহার করে সফলতা পেতে চায়। ব্যবসায়ীদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়, আমরা যে-কোন পরিস্থিতিতে অটল-অবিচল। এর তিন দিন পরেই প্রকাশ্য রাজপথে একটি হত্যাকা- ঘটে এবং মৃত লোকটির পকেটে পাওয়া যায় একটি সংক্ষিপ্ত পত্র- দশ লক্ষ টাকা অথবা মৃত্যু, কোন্টি বাছিয়া লইবে ভাবিয়া দেখো। পত্রটি রচিত হয় দৈনিক পত্রিকার মাঝারো ধরনের মোটা হরফে ছাপা বিভিন্ন শিরোনাম থেকে কেটে নেওয়া বর্ণমালার সাহায্যে। সেখানে আলিম বক্সের নাম সবচাইতে বড় হরফে সাঁটা।

আরও পড়ুন দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান (পর্ব-১)

আলিম-ভীতি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে লোকেরা নানারকম তৎপরতা অব্যাহত রাখে। এমনও শোনা যায় ত্যক্তবিরক্ত ব্যবসায়ীরা আইনবিরুদ্ধ হলেও নিজেরা চাঁদা তুলে নিজেদের একটি কিলিং মিশনও গঠন করে। মিশনটির একমাত্র লক্ষ্য- যে কোন প্রকারে হোক আলিমকে হত্যা করা। বাস্তবে তেমন কোন মিশন আসলেই ছিল কিনা সেটা জানা না গেলেও সুবর্ণদ্বীপেই শেষ পযন্ত মিলল মুক্তির আভাস। আলিম-ভীতির বিপরীতে ছিল আলিমের নিজস্ব ভীতি। লোকে তার ভয়ে ভীত আর সে আলিম ভীত লোকভয়ে। ব্যাপারটা অদ্ভুত শোনালেও আলিমের ভয় ছিল ধরা পড়বার। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে আলিমের অবয়বের ছবি দেশের সমস্ত থানায় পৌঁছে যায়। ছদ্মবেশ নিলে আলিমকে দেখতে কেমন হয় তারও কম্প্যুটার-সিমুলেমন করে পোস্টার এবং বিভিন্ন প্রচারণা চালাতে কর্তৃপক্ষও থাকে সদাতৎপর। সুবর্ণদ্বীপে যে-লোকেরা নারীর ছদ্মবেশে অবতরণ করতে গিয়ে ধরা পড়ে তাদের মধ্যে যে কুখ্যাত আলিম বক্সও থাকবে সেটা অন্তত পুলিশের ধারণায় ছিল না। তাদের ধারণা ছিল, কখনও দাড়ি রেখে কখনও দাড়ি না রেখে কখনও ন্যাড়া মাথা ও দাড়ি সংযোগে, কখনও ন্যাড়া হয়ে এবং দাড়িবিহীনতায় গণিত না জেনেও নিজস্ব উদ্ভাবনার এরকম নানা পারম্যুটেশন ও কম্বিনেশনে সে আত্মগোপন করে থাকবে। এমন খবরও পুলিশের নিকটে পৌঁছায়, সে ইসকনের লোকেদের ধরনে চুলদাড়ি ফেলে দিয়ে শুধুমাত্র টিকির নির্ভরতায় আত্মগোপনের কাজ চালু রেখেছে।

সুবর্ণদ্বীপ বিবর্ণদ্বীপে রূপ নিল আলিম বক্সের জন্যে। পুলিশ তখনও জানে না, আলিমসমেত জনাবিশেক লোককে পাকড়াও করে তারা মনে-মনে প্রসন্নতার মেঘ কামনা করে অথচ তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি নামে। বৃষ্টি নামে সুবর্ণদ্বীপে আর প্লাবিত হয়ে যেতে থাকে রাজধানি। কী করে যেন সম্পূর্ণরূপে জলপরিবেষ্টিত দ্বীপ থেকে তার পাকড়াও হওয়ার সংবাদ সারা দেশে চাউর হয়ে যায়। পত্রিকার অফিসগুলো বড়-বড় প্রিন্টার্স-লাইন সাজিয়ে ফেলে নিশ্চিত খবর পেয়ে। অফিসপাড়ায়, কর্পোরেট অফিসের সদর দপ্তরে, ব্যবসায়ীদের কল্যাণ সমিতির প্রধান কার্যালয়ে এবং বড় লোকেদের সম্মিলনকেন্দ্রগুলিতে পারস্পরিক মিষ্টি বিতরণের ধুম পড়ে গেল আলিমের ধৃত হওয়ার তাজা-টাটকা বার্তায়। পত্রিকা-অফিসের নিজস্ব সংগ্রহে থাকা ফাইল-ছবি ছাপবার হিড়িক পড়ে যায়। এত গুরুত্বসহকারে তার ছবি ছাপে পত্রিকাঅলারা, হয়তো কোন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতাধারীর ছবিও তারা অতটা গুরুত্ব দিয়ে ছাপে না। আলিমের ছবি এবং তার পাকড়াও হওয়ার সংবাদে বিশেষ নিবন্ধ ও উপসম্পাদকীয়ও ছাপা হতে থাকে পাল্লা দিয়ে। সেখানে বলা হয়, দেশে চোর-ডাকাত-গুন্ডা-বদমাশ-খুনি এইরকম লোকেরা ছিল আছেই এবং থাকবেও। কিন্তু তাদের যতটা সম্ভব কারাগারে রেখে দিতে পারলে দেশ ও জাতির মঙ্গল। তাই আলিম বক্সের মত লোকেরা যত বেশি ধরা পড়বে ততই জনমনে শান্তি নিশ্চিত হবে।

আরও পড়ুন➥ দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান(পর্ব-২)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান (পর্ব-৩)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান(পর্ব-৪)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান(পর্ব-৫)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান(পর্ব-৬)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান(পর্ব-৭)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান(পর্ব-৮)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান (পর্ব-৯)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান (পর্ব-১০)