দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান



মহীবুল আজিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এরইমধ্যে আলিম বক্স একদিন গোপন বাহক মারফত জানতে পারে পল্লীসুন্দরীর ঘাতক-ব্যাধির কথা। তার সমগ্র অস্তিত্ব ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে যখন সে জানল, এইড্স্ রোগের জীবাণু শরীরে নিয়ে মেয়েটি তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক অব্যাহত রেখেছিল। মধ্যপ্রাচ্য-ফেরত যুবকের সঙ্গে সংসর্গের প্রতিশোধ নিয়েছিল আলিম মেয়েটিকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে। কিন্তু এবারে সে মেয়েটির সত্তাকেই নির্জীব সত্তায় পরিণত করে তাকে হত্যা করার মাধ্যমে। চূড়ান্ত প্রতিশোধই নেয় আলিম বক্স। পরিণাম হাজতবাস। তার আইনজীবী আলিমের মার্ডারকে ম্যানস্লটারে ঘুরিয়ে দিয়ে তার চৌদ্দ বছরের কারাবাসের ব্যবস্থা করে। প্রাণে বেঁচে গেলেও এক নতুন ভাবনা তাকে কাবু করে দেয়- সেটা হলো মৃত্যুভয়। কারাগারে বন্দি সে ভাবে, মরন-ব্যাধির ছোবল অচিরে তার শরীরে ভয়ানক আঁচড় বসাতে শুরু করবে এবং সে মৃত্যুর অতল কেন্দ্রে তলিয়ে যাবে। অথচ অলৌকিক ঘটনার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ হয়ে সে বেঁচে থাকে। বেঁচে থেকে সে মনে-মনে ভাবে জীবনে এত অপরাধ করেছি আর এত নারী ভোগ করেছি নিশ্চয়ই আমার জন্যে অপেক্ষা করছে পৃথিবীর সবচাইতে মারাত্মক দু’টি ব্যাধির যে-কোন একটি অথবা একই সঙ্গে দু’টিই- এইড্স্ এবং ক্যান্সার। অথচ সে মরে না। এমনকি মরবার পূর্বলক্ষণ হিসেবে অসুস্থতাও তাকে ছোঁয় না। বলা যায়, এখান থেকেই তার নবোদ্যমের সূচনা। কী করে কী করে যেন পুলিশের সঙ্গে ভাব জমিয়ে একদিন পুলিশের পোশাক পরেই সে দেশের এক কুখ্যাত-বিখ্যাত কারাগার থেকে পালিয়ে যায়। প্রথমবার সে অন্ধকার থেকে আলোকের সংবাদ হয়েছিল বিখ্যাত পল্লীসুন্দরীকে হত্যা করে এবং দ্বিতীয়বার সে বিখ্যাত হয় জেল পালিয়ে।

তারপর তার আর কোন হদিস থাকে না। কেউ বলে, সে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে গেছে। কেউ বলে, ভারতকে ট্রাঞ্জিট হিসেবে ব্যবহার করে সে আসলে চলে গেছে পাকিস্তানে। আবার, কারো-কারো ভাষ্য, ভারত এবং পাকিস্তান উভয় দেশকে ব্যবহার করে সে চলে গেছে মধ্যপ্রাচ্যে। সেখানে নাকি দাউদ ইব্রাহিমের দলে যোগ দিয়ে সে তারই স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে কাজ করতে শুরু করেছে। দাউদের একজন সহযোগী নিহত হলে খবর আসে, আলিম বক্স নিহত হয়েছে। কিন্তু পরে নিশ্চিত হওয়া যায় আলিম বক্সের মুখে একটি বড় ক্ষতচিহ্ন ছিল যেটা দাউদের লোকের ছিল না। তবু কিছুদিন পর-পরই তার সম্পর্কে পত্রপত্রিকায় নানা সংবাদ ছাপা হতে থাকে। হতে পারে সেসব উড়ো খবর বা গুঞ্জনই। এমনও ভয়ধরানো খবরও আসে, আলিম না থাকলেও আলিমের জাল সারা দেশে ছড়ানো। বিশেষ করে রাজধানি এবং একটি-দু’টি বড়-বড় শহরের ব্যবসায়ীদের নিকটে প্রায়ই ফোন আসতে থাকে আলিমের নামে। সবই অর্থের চাহিদাসংক্রান্ত এবং সঙ্গে গাঁথা মৃত্যু-পরোয়ানা। অর্থ অনাদায়ে মৃত্যু অবধারিত। সন্ত্রস্ত ব্যবসায়ীরা শেষে সম্মিলিত হয়ে আলিম-ভীতি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে দফায়-দফায় সভা করে এবং সেই সভায় এমন সিদ্ধান্ত হয়, আসলে আলিম একটি অদৃশ্য ভীতির নাম। হয়তো তার মিথটাকে ব্যবহার করে, ব্যবসায়ে যেমন গুডউইলের একটা পূর্ব-প্রতিষ্ঠিত মূল্য থাকে তেমনি হুমকিদাতা সন্ত্রাসীরাও আলিমের ব্যাড-উইলকে ব্যবহার করে সফলতা পেতে চায়। ব্যবসায়ীদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়, আমরা যে-কোন পরিস্থিতিতে অটল-অবিচল। এর তিন দিন পরেই প্রকাশ্য রাজপথে একটি হত্যাকা- ঘটে এবং মৃত লোকটির পকেটে পাওয়া যায় একটি সংক্ষিপ্ত পত্র- দশ লক্ষ টাকা অথবা মৃত্যু, কোন্টি বাছিয়া লইবে ভাবিয়া দেখো। পত্রটি রচিত হয় দৈনিক পত্রিকার মাঝারো ধরনের মোটা হরফে ছাপা বিভিন্ন শিরোনাম থেকে কেটে নেওয়া বর্ণমালার সাহায্যে। সেখানে আলিম বক্সের নাম সবচাইতে বড় হরফে সাঁটা।

আরও পড়ুন দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান (পর্ব-১)

আলিম-ভীতি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে লোকেরা নানারকম তৎপরতা অব্যাহত রাখে। এমনও শোনা যায় ত্যক্তবিরক্ত ব্যবসায়ীরা আইনবিরুদ্ধ হলেও নিজেরা চাঁদা তুলে নিজেদের একটি কিলিং মিশনও গঠন করে। মিশনটির একমাত্র লক্ষ্য- যে কোন প্রকারে হোক আলিমকে হত্যা করা। বাস্তবে তেমন কোন মিশন আসলেই ছিল কিনা সেটা জানা না গেলেও সুবর্ণদ্বীপেই শেষ পযন্ত মিলল মুক্তির আভাস। আলিম-ভীতির বিপরীতে ছিল আলিমের নিজস্ব ভীতি। লোকে তার ভয়ে ভীত আর সে আলিম ভীত লোকভয়ে। ব্যাপারটা অদ্ভুত শোনালেও আলিমের ভয় ছিল ধরা পড়বার। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে আলিমের অবয়বের ছবি দেশের সমস্ত থানায় পৌঁছে যায়। ছদ্মবেশ নিলে আলিমকে দেখতে কেমন হয় তারও কম্প্যুটার-সিমুলেমন করে পোস্টার এবং বিভিন্ন প্রচারণা চালাতে কর্তৃপক্ষও থাকে সদাতৎপর। সুবর্ণদ্বীপে যে-লোকেরা নারীর ছদ্মবেশে অবতরণ করতে গিয়ে ধরা পড়ে তাদের মধ্যে যে কুখ্যাত আলিম বক্সও থাকবে সেটা অন্তত পুলিশের ধারণায় ছিল না। তাদের ধারণা ছিল, কখনও দাড়ি রেখে কখনও দাড়ি না রেখে কখনও ন্যাড়া মাথা ও দাড়ি সংযোগে, কখনও ন্যাড়া হয়ে এবং দাড়িবিহীনতায় গণিত না জেনেও নিজস্ব উদ্ভাবনার এরকম নানা পারম্যুটেশন ও কম্বিনেশনে সে আত্মগোপন করে থাকবে। এমন খবরও পুলিশের নিকটে পৌঁছায়, সে ইসকনের লোকেদের ধরনে চুলদাড়ি ফেলে দিয়ে শুধুমাত্র টিকির নির্ভরতায় আত্মগোপনের কাজ চালু রেখেছে।

সুবর্ণদ্বীপ বিবর্ণদ্বীপে রূপ নিল আলিম বক্সের জন্যে। পুলিশ তখনও জানে না, আলিমসমেত জনাবিশেক লোককে পাকড়াও করে তারা মনে-মনে প্রসন্নতার মেঘ কামনা করে অথচ তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি নামে। বৃষ্টি নামে সুবর্ণদ্বীপে আর প্লাবিত হয়ে যেতে থাকে রাজধানি। কী করে যেন সম্পূর্ণরূপে জলপরিবেষ্টিত দ্বীপ থেকে তার পাকড়াও হওয়ার সংবাদ সারা দেশে চাউর হয়ে যায়। পত্রিকার অফিসগুলো বড়-বড় প্রিন্টার্স-লাইন সাজিয়ে ফেলে নিশ্চিত খবর পেয়ে। অফিসপাড়ায়, কর্পোরেট অফিসের সদর দপ্তরে, ব্যবসায়ীদের কল্যাণ সমিতির প্রধান কার্যালয়ে এবং বড় লোকেদের সম্মিলনকেন্দ্রগুলিতে পারস্পরিক মিষ্টি বিতরণের ধুম পড়ে গেল আলিমের ধৃত হওয়ার তাজা-টাটকা বার্তায়। পত্রিকা-অফিসের নিজস্ব সংগ্রহে থাকা ফাইল-ছবি ছাপবার হিড়িক পড়ে যায়। এত গুরুত্বসহকারে তার ছবি ছাপে পত্রিকাঅলারা, হয়তো কোন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতাধারীর ছবিও তারা অতটা গুরুত্ব দিয়ে ছাপে না। আলিমের ছবি এবং তার পাকড়াও হওয়ার সংবাদে বিশেষ নিবন্ধ ও উপসম্পাদকীয়ও ছাপা হতে থাকে পাল্লা দিয়ে। সেখানে বলা হয়, দেশে চোর-ডাকাত-গুন্ডা-বদমাশ-খুনি এইরকম লোকেরা ছিল আছেই এবং থাকবেও। কিন্তু তাদের যতটা সম্ভব কারাগারে রেখে দিতে পারলে দেশ ও জাতির মঙ্গল। তাই আলিম বক্সের মত লোকেরা যত বেশি ধরা পড়বে ততই জনমনে শান্তি নিশ্চিত হবে।

আরও পড়ুন➥ দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান(পর্ব-২)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান (পর্ব-৩)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান(পর্ব-৪)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান(পর্ব-৫)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান(পর্ব-৬)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান(পর্ব-৭)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান(পর্ব-৮)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান (পর্ব-৯)

দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান (পর্ব-১০)

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;

স্বপ্নের পদ্মা সেতু



রিঝুম ইতি
স্বপ্নের পদ্মা সেতু

স্বপ্নের পদ্মা সেতু

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি জন্মেছি বাংলায়-

গর্বিত আমি,
শেখ হাসিনার মহিমায়।
পেয়েছি আমি,
স্বপ্নের পদ্মা সেতু।
একদিন যেটা,
স্বপ্নই ছিলো শুধু।
আজ, পদ্মাসেতুর প্রয়োজন -
বুঝবে সেই,
ভুক্তভুগী যেজন।
মাঝরাতে-
বেড়েছিলো মায়ের অসুখ।
ফেরিঘাটে-
গুণেছি শুধু প্রহর।
অবশেষে -
পারিনি মাকে বাঁচাতে,
পেরেছো কি দায় এড়াতে?
অভাবের সংসার-
একটা চাকরি,খুব দরকার।
একদিন-
ডাক পড়লো আমার,
ইন্টারভিউ দেবার।
পড়লাম এসে-
ফেরিঘাটের জ্যামে,
স্বপ্ন নষ্ট-
কিছু সময়ের দামে।
বাংলাদেশে-
হয়নি কোন চাকরি,
ভেবেছি তাই-
বিদেশ দেবো পাড়ি।
ভিটেমাটি সব বেঁচে,
সব টাকা যোগাড় করে।
রওনা দিলাম ভোরে,
চারপাশের-
কুয়াশা ঘিরে ধরে।
ফেরি চলাচল বন্ধ,
হারালো,জীবনের ছন্দ।
সারা বছর-
হাড়ভাংগা পরিশ্রমে,
জন্মাই ফসল-বাংলার মাটির বুকে।
পাইনা ভালো দাম,
এই কি তবে-
আমার ঘামের দাম।
শহরে আমি-
সবজি বেঁঁচবো দামে,
কিন্তু-
ঘাটে সবজি যাবে পঁচে।
শুধু-
পাইনি সুবিধা আমি,
পেয়েছে আরো-
তিন কোটি বাঙালি।
হাজারো-
ব্যর্থতার গল্প,
এভাবেই-
রচনা হতো।
হয়েছে স্বপ্ন পূরণ,
পদ্ম সেতুর দরুণ।

লেখক-রিঝুম ইতি, অনার্স- ১ম বর্ষ, প্রাণীবিদ্যা, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ

;

সত্য-মিথ্যার মাঝখানে!



ড. মাহফুজ পারভেজ
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

১.

ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে ইউলিসিস প্রবেশ করেছিলেন নিজেরই প্রাসাদে, ইথাকায়। ইথাকা সাধারণত ইতিহাসে চিহ্নিত হয় হোমারের ইথাকা নামে। ওডিসিয়াস-এর বাড়ি। যে দ্বীপটিতে বিলম্বিত প্রত্যাবর্তন ঘিরে ক্লাসিকাল গ্রিক গল্প 'ওডিসি' আবর্তিত।

প্রত্নতাত্ত্বিককাল থেকেই ইথাকাকে পৌরাণিক বীরের বাড়ি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ওডিসি'তে হোমার ইথাকাকে এভাবে বর্ণনা করেন:

"পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ইথাকাতে বাস করুন, সেখানে এক পাহাড়, নেরিটন। বনের সাথে বসতি। অনেকগুলো দ্বীপের একটি। কাঠবাদাম জ্যাসিয়েন্টসকে ঘিরে রেখেছে। ইথাকা নিজেই মূল ভূখন্ডের কাছাকাছি ঘেঁষার দিকে খুব আগ্রহী। অন্যরা ভোর ও সূর্যের দিকে পৃথক হয়ে পড়েছে। কিন্তু অতিপ্রাকৃত দ্বীপ ইথাকা যুবকদের জন্য একজন ভাল নার্সের মতো প্রণোদন জাগ্রতকারী। "

২.

ইথাকায় ইউলিসিসের ফিরে আসার মধ্যে পেরিয়ে গিয়েছিল কুড়ি বছর। এতই প্রাচীন তাঁর অনুপস্থিতি যে, স্ত্রী পেনেলোপির একাধিক প্রণয়প্রার্থী তাঁরই প্রাসাদে এসে জড়ো হয়েছে, বসবাস করছে এই আশায় যে, হয়তো এবার পেনেলোপি-কে পাওয়া যাবে।

পেনেলোপি প্রথমে অপেক্ষায় ছিলেন, স্বামী ফিরবেন। তাই তাঁর প্রণয়াকাঙ্ক্ষীদের দূরে রাখতেন এক চতুর ছলনায়। সকলকে বলতেন, তিনি ইউলিসিসের পিতা লেয়ার্তেসের জন্য একটি শবাচ্ছাদনবস্ত্র বুনছেন, বোনা শেষ হলেই সাড়া দেবেন মনোমতো এক ভালবাসার আবেদনে। কিন্তু সে-বোনা অনন্তকাল ধরে যেন চলতে থাকল, চলতেই থাকল। আসলে, সকালের বুনন রাতে বিনষ্ট করে ফেলতেন তিনি।

ইউলিসিস ফিরবেন, সময় ক্রয় করে চলেছেন পেনেলোপি তাই। এটাই ছিল সত্য। আর সব মিথ্যা।

অবশেষে একটা সময় এমন এল, যখন সমস্ত আশা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ল। দু’দশক পেরিয়ে গেল যে। ইউলিসিস সম্ভবত আর ফিরবেন না, তাঁদের পুত্র টেলেম্যাকাস-ও বড় হয়ে গিয়েছে। এবার তা হলে পেনেলোপি অন্য পুরুষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে পারেন।

এমনই এক ক্ষণে ফিরে এলেন ইউলিসিস। তবে, ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে। তারপর যখন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে স্বয়ম্বরসভা, তখন দেখা গেল, এই ভিক্ষুকই হলেন সেরা পাণিপ্রার্থী পেনেলোপির। স্বপরিচয়ে প্রত্যাবর্তন এবার তাঁর। একে একে হত্যা করলেন স্ত্রী-র সকল পাণিপ্রার্থীকে। তিনিই তো অধিকর্তা, প্রমাণ করতে হবে তাঁকে। প্রমাণ করলেনও তিনি।

৩.

লুইজ় গ্লিক-এর 'মেডোল্যান্ডস' কবিতাগ্রন্থে ইউলিসিস-পেনেলোপির যে-মিথ, তার ভেতর এক গাঢ় অন্তরঙ্গতা আছে। 'গাঢ়' শব্দটা বললে নিমেষে মাথায় আসে বাংলা ভাষার সেই কবিকে, শহরের পথহাঁটা যাঁকে স্মরণ করিয়ে দিত, ‘বেবিলনে একা একা এমনই হেঁটেছি আমি রাতের ভিতর’।

বস্তুত, অনুভব বা বোধ গাঢ় না-হলে স্মৃতি অবাধ বিচরণ করতে পারে না। জীবনের স্মৃতি প্রস্তরীভূত হতে পারে না কালাতিক্রমী কল্পস্মৃতির সঙ্গে। যেমনভাবে, শরীরের শত প্রলোভন থাকা সত্ত্বেও মন মিশতে পারে না মনের সঙ্গে।

কারো কারো কবিতাভাষায় প্রচ্ছন্ন রয়েছে সেই গাঢ় অনুভব, যে-কারণে কবিতা আর জীবন পাশাপাশি বসবাস করতে পারে। পুরাণকাহিনিকণা আর বাস্তবের খণ্ডাংশ একাকার হতে পারে। পৌরাণিক আখ্যান পেরিয়ে সামনে এসে দাঁড়াতে পারেন একজন ইউলিসিস। একজন পেনেলোপি নব-নির্মাণে উত্থিত হতে পারেন। কালান্তরের দাগ মুছে আমাদের কালের নারী-পুরুষে পরিণত হতে পারেন তাঁরা।

৪.

বাস্তবের জীবনে ছুঁয়ে যাওয়া পৌরাণিক ভাষ্যের অপর নাম 'মিথ'। আদিতে যা গ্রিক শব্দ 'mythos' থেকে উদ্ভূত।  শব্দটি হোমারের বিভিন্ন কাজে প্রচুর দেখা গেছে। এমন কি হোমার যুগের কবিরাও এই শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার করেছেন তাদের সাহিত্য কর্মে।

মূলগত অর্থে 'mythos' শব্দটি সত্য অথবা মিথ্যার মাঝে পার্থক্য বোঝাতে প্রয়োগ করা হয়। David Wiles এর মতে, প্রাচীন গ্রিসে শব্দটি বিপুল তাৎপর্য বহন করতো। এটি ব্যবহার করা হত মিথ্যাচারমূলক ধর্মীয় বা সামাজিক ব্যাপারগুলোকে উপস্থাপন করার সময়।

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, মিথ নিজেই এখন সত্য ও মিথ্যার মাঝখান থেকে জীবনের বাস্তবে রূপান্তরিত হয়েছে। 'এটা ছিল' বা 'এটা হতে পারতো' ধরনের বহু মিথ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে সত্যের চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ অবয়বে। কিংবা মিথ প্রতিষ্ঠিত করতে দাঙ্গা, হাঙ্গামা, হত্যাকাণ্ড ও রক্তপাতের বন্যা বইছে। একদা মিথ্যাচারমূলক ধর্মীয় বা সামাজিক ব্যাপারগুলোকে উপস্থাপন করতো যে মিথ, তা-ই এখন ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার মজবুত হাতিয়ারে পরিণত হয়ে হত্যা করছে মানুষ ও মানবতাকে।

৫.

সত্য আর মিথ্যার স্পষ্ট বিভাজনের পাশে মিথ দাঁড়িয়ে আছে অমীমাংসিত উপস্থিতিতে। কারো কাছে তা সত্য, কারো কাছে মিথ্যা, কারো কাছে অনির্ধারিত চরিত্রে। ব্যক্তি বা সামাজিক চর্চার বাইরে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমেও সত্যের পাশাপাশি মিথ্যা ও মিথের বাড়বাড়ন্ত।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে মার্কিন দেশে সাংবাদিকতা বললেই 'ফেইক নিউজ' শব্দটি সামনে চলে আসতো৷ বিরুদ্ধে গেলে মিথ্যা বা ফেইক বলাটা এখন ক্ষমতাসীনদের ট্রেন্ড বা ট্রেডমার্ক৷

এদিকে, তথ্যের সুনামির মধ্যে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তা আলাদা করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে৷ এর পেছনে কার দায় সবচেয়ে বেশি, তা এক গভীর গবেষণার বিষয়।

প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমে ও সংবাদ প্রবাহে কতো কতো সংবাদ আসে৷ আজকাল সবচেয়ে জরুরি আর গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো ফেসবুকে পাওয়া যায় শেয়ার-কমেন্টের কারণে৷ কিন্তু  ধীরে ধীরে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে। এখন সত্য, মিথ্যা বা মিথ ফেসবুক স্ট্যাটাস বা কমেন্টে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে না। সংবাদমাধ্যমও সঠিক তথ্য দেওয়ার চেয়ে কিভাবে প্রকাশ করলে ক্লিক আর শেয়ার বাড়বে, সেদিকে বেশি মনোযোগী৷

ফলে সত্য, মিথ্যা, মিথের ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতি চারপাশে। আর মাঝখানে অসহায় মানুষের বিপন্ন অবস্থান।

পাদটীকা: ইউলিসিস আইরিশ লেখক জেমস জয়েস (জন্ম-২ ফেব্রুয়ারি ১৮৮২, মৃত্যু-১৩ জানুয়ারি ১৯৪১, বয়স ৫৮)-এর কালজয়ী সৃষ্টি। ১৯২২ সালে এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। অধিকাংশ সাহিত্য সমালোচক ইউলিসিস-কে ইংরেজি ভাষায় লিখিত বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলে গণ্য করে থাকেন। ইউলিসিস-এর কাহিনী একটিমাত্র দিনকে ঘিরে। ১৯০৪ সালের ১৬ জুন। এই সাধারণ একটি দিনে এক সাধারণ নাগরিক লেওপোল্ড ব্লুম (Leopold Bloom) ডাবলিন শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে বেড়ান নানা কাজে। প্রাচীন গ্রিক কবি হোমার-এর রচিত মহাকাব্য ওডিসি-র সাথে উপন্যাসটির অনেক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। ওডিসি কাব্যের বীর ইউলিসিস-এর নামেই উপন্যাসের নামকরণ। জয়েস-এর ভক্তরা ১৬ জুন দিনটিকে ব্লুম-দিবস (Bloomsday) হিসেবে পালন করে থাকেন। জয়েসের ইউলিসিস বিশাল এক গ্রন্থ। কোন কোন সংস্করনের দৈর্ঘ্য হাজার পৃষ্ঠার উপরে চলে গিয়েছে। বিগত আশি বছর ধরে সাহিত্য বিশারদরা বইটির চুলচেরা বিশ্লেষণ করে যাচ্ছেন। বইটি সাহিত্যাঙ্গণে অনেক বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। বিংশ শতকের শুরুতে আধুনিকতাবাদ (modernism) নামে যে সাহিত্যধারার সৃষ্টি হয়, ইউলিসিস তার অতি উৎকৃষ্ট একটি উদাহরণ। বিরতিহীন চৈতন্যবর্ণনার (stream of consciousness) অনবদ্য প্রয়োগের জন্যে উপন্যাসটি যথার্থই বিখ্যাত। এ ছাড়াও জয়েস-এর অভিনব গদ্যশৈলী, গদ্য নিয়ে বিচিত্র সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কুশলী চরিত্রায়ন ও চমৎকার রসবোধ বইটিকে স্বতন্ত্রতা এনে দিয়েছে। তবে বইটি বেশ দুরূহপাঠ্য যে কারণে কেউ কেউ এর সমালোচনা করেছেন। ১৯৯৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত প্রকাশক মডার্ন লাইব্রেরি শতাব্দীর সেরা ১০০টি ইংরেজি উপন্যাসের তালিকা প্রনয়ন করে। ইউলিসিস তালিকার শীর্ষে স্থান পায়। ২০২২ সাল জেমস জয়েসের ইউলিসিস প্রকাশের শতবর্ষ।

ড. মাহফুজ পারভেজ,  প্রফেসর,  রাজনীতি বিজ্ঞান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম

;