মাটি ও মানুষের ক্ষমতায়নের পথে 'গেম চেঞ্জার' পদ্মা সেতু

  ‘স্বপ্ন ছুঁয়েছে’ পদ্মার এপার-ওপার



ড. মাহফুজ পারভেজ
মাটি ও মানুষের ক্ষমতায়নের পথে 'গেম চেঞ্জার' পদ্মা সেতু

মাটি ও মানুষের ক্ষমতায়নের পথে 'গেম চেঞ্জার' পদ্মা সেতু

  • Font increase
  • Font Decrease

কৃষি-বাংলার অধিকারের দাবিতে পদ্মার তীর থেকে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকের ভিত্তি কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন হাজী শরিয়তউল্লাহ। পদ্মা ও তার শাখা নদীগুলো পরিবেষ্টিত দক্ষিণবঙ্গের প্রান্ত থেকে কৃষক-প্রজার সংগঠিত শক্তিতে ব্রিটিশ-বাংলার রাজনীতির মূল চালিকা শক্তিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক। কলকাতার শাসনকেন্দ্রে তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের মাধ্যমে সৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র যখন বাংলাকে 'অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশ' বানিয়ে বাঙালি জাতিকে শাসন ও শোষণ করছি, তখন পদ্মা-বিধৌত জনপদ থেকে গর্জে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।

সহস্র বর্ষের বাংলা ও বাঙালির পলিমাটি অঙ্কিত কৃষি সংস্কৃতির রাজনৈতিক বিজয় নিশ্চিত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আর বঙ্গবন্ধু-কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপহার দিয়েছেন মাটি ও মানুষের ক্ষমতায়নের পথে 'গেম চেঞ্জার' পদ্মা সেতু।

ঐতিহাসিক পদ্মা সেতু স্থাপনা হিসাবে বিশ্বের বিস্ময়। যোগাযোগ অগ্রগতির ক্ষেত্রে স্মরণীয়। বিপণন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে জাতীয় প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সূচক বৃদ্ধিতে সহায়ক। কৃষি, শিল্পায়ন, উন্নয়ন, পর্যটন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য,  শিক্ষা, বিনোদন, সামাজিক-সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী গুরুত্বের অনুঘটক।

কিন্তু পদ্মা সেতুর সবচেয়ে তাৎপর্যবাহী অবদান রাজনৈতিক, যা বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের ক্ষমতায়নের পথে 'গেম চেঞ্জার'। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও গতিপ্রবাহে পালন করবে ভ্যানগার্ডের ভূমিকা। গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার রক্ষায় ঐক্যবোধে প্রাণিত করবে সমগ্র জাতিকে।

ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটিশ-বাংলা ও পাকিস্তানি রাজনীতির যে দুষ্ট প্রেতাত্মা বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুঃখজনকভাবে এখনও প্রবহমান, তার চির অবসান হবে পদ্মা সেতুর মাধ্যমে সৃজিত মানুষের রাজনৈতিক সক্ষমতা ও ক্ষমতায়নের শক্তিতে। ব্রিটিশ আমলে ইংরেজ আর বাবু জমিদারদের কব্জায় ছিল রাজনীতি। পাকিস্তান আমলে ফৌজি আর এলিটরা প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অবদমিত করেছিল জনতা ও তাদের রাজনৈতিক অধিকারকে। বাংলাদেশ আমলেও প্রায়শই সেই অপধারার প্রভাবে কতিপয় সাফারি পরিহিত এলিটচক্র রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামে বসে বার বার পাশাখেলার ছকে জনতাকে বঞ্চিত করে নিয়ন্ত্রণ করেছে রাজনীতিকে।

ফলে দেশের মালিক-মোক্তার জনগণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্নভাবে দেখতে বাধ্য হয়েছে হত্যা, ক্যু, জবরদখলের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে লাঞ্ছিত করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের মচ্ছব। পলাশীর প্রান্তরের অসহায় দর্শকের মতো বাংলাদেশের জনগণ বার বার থেকেছে অশগ্রহণের অধিকারহীন এবং দেখেছে নিজেদের রাজনৈতিক ভাগ্য বিপর্যয়ের করুণ ধারা।

পদ্মা সেতু সেই বিচ্ছিন্নতা ও অংশগ্রহণহীনতার অধ্যায় প্রমত্তা নদীর স্রোতে ভাসিয়ে দিয়ে সম্পন্ন করবে জনতার প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। শিবচরের কৃষক, জাজিরার দোকানদার, টেকেরহাটের ব্যবসায়ী, আলফাডাঙ্গার নারীসমাজ, খেপুঁপাড়ার জেলে, বরগুনার কালামেঘের মাঝি, পাথরঘাটার প্রান্তিক মানুষ, সুন্দরবনের মাওয়ালি, চরফ্যাশনের সমুদ্রগামী সারেঙ অতন্দ্র প্রহরীর মতো পাহারা দেবে ঢাকায় আবর্তিত রাজনীতি। রাজনৈতিক সঙ্কটের পরিস্থিতিতে ও অবৈধ হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে সরব, সোচ্চার ও সক্রিয় হবে বাংলাদেশের কেন্দ্র এবং প্রান্তে প্রান্তে বসবাসকারী বাঙালি।

গণতন্ত্রকে সজিব ও সচল রাখতে জনঅংশগ্রহণের যে আবশ্যিক পূর্বশর্ত রয়েছে, তা পদ্মা সেতুর মাধ্যমে সম্ভব হবে বহুলাংশে। বাংলাদেশের রাজনীতি ও প্রাণকেন্দ্র ঢাকা অরক্ষিত থেকে পরিণত হতে পারবে না ক্ষমতালোভী ও অবৈধ শক্তির শাঠ্য-যড়যন্ত্র ও ক্ষমতা দখলের চারণক্ষেত্রে। জাতীয় রাজনৈতিক সঙ্কটে সমগ্র বাংলাদেশ নিমেষে পরিণত হবে প্রতিবাদের পল্টনে। ঢাকা থেকে সর্বদক্ষিণের ছেঁড়াদ্বীপ পর্যন্ত সক্রিয় জনতার সম্মিলিত সমাবেশ উড়িয়ে দিতে সক্ষম হবে যাবতীয় অপতৎপরতা।

মাটি ও মানুষের ক্ষমতায়নের পথে 'গেম চেঞ্জার' পদ্মা সেতু বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি জাতিগঠনের চলমান ধারাকেও বেগবান করবে। জনতার রক্তাক্ত সংগ্রামে অর্জিত বাংলাদেশের গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও ঐক্যের পথকেও করবে আরও মসৃণ এবং সুদৃঢ়।

ড. মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম। 

  ‘স্বপ্ন ছুঁয়েছে’ পদ্মার এপার-ওপার

‘ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞান’ কোর্স প্রচলন সময়ের দাবি



মো. বজলুর রশিদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আমাদের জীবন এখন প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়েছে। ইন্টারনেট সুবিধাযুক্ত স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন স্মার্ট ডিভাইস এর উপর আমাদের দৈনন্দিন কার্যাবলী এখন অনেকটাই নির্ভর করে। আমরা এগুলিকে বিভিন্ন উপায়ে ব্যবহার করি যেমন যোগাযোগ এবং নেটওয়ার্কিং, তথ্য আদান-প্রদান, অনলাইন কেনাকাটা, ডকুমেন্টেশন, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক তথ্য বিনিময়, ভাব ও আবেগ বিনিময়, রোমান্স, বিনোদন, শিক্ষা, সংগঠন এবং উৎপাদনশীলতা ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য এবং অবসর উপভোগের মাধ্যম হিসাবে এবং আরও অনেক কিছু এখন আমরা ইন্টারনেট সুবিধাযুক্ত ডিজিটাল ডিভাইস এর মাধ্যমে করে থাকি।

সামগ্রিকভাবে প্রযুক্তির এই ব্যবহার আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময় প্রভাব ফেলে। ইন্টারনেট প্রযুক্তি নির্ভর মানুষের কার্যাবলী সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আমেরিকাতে সর্বপ্রথম ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞান বিষয়টি নিয়ে পঠন, পাঠন ও গবেষণা শুরু হয়। ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞান ধারণাটি ২০০০ সালের শেষের দিকে ইন্টারনেটের সমাজবিজ্ঞান থেকে উৎপত্তি লাভ করে।

১০১২ সাল থেকে কয়েকজন সমাজবিজ্ঞানী ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানের বিষয়সমূহ সংজ্ঞায়িত করার উপর এবং এটিকে গবেষণা ও শিক্ষার একটি ক্ষেত্র হিসাবে প্রচার করার উপর মনোনিবেশ করেন। অস্ট্রেলীয় সমাজবিজ্ঞানী ডেবোরা লুপটন তার ২০১৫ সালে ‘ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞান’ শিরোনামে প্রকাশিত বইতে উল্লেখ করেছেন যে মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী ড্যান ফারেল এবং জেমস সি পিটারসন ২০১০ সালে সমাজবিজ্ঞানীদেরকে কেবল ওয়েব-ভিত্তিক ডেটা নিয়ে গবেষণা না করার জন্য আহবান জানিয়েছিলেন। কারণ, এ বিষযে গবেষণার আরও ক্ষেত্র ছিল। ২০১২ সালে সাবফিল্ডটি যুক্তরাজ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে চর্চা শুরু হয় যখন মার্ক ক্যারিগান, এমা হেড এবং হু ডেভিস সহ ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞান সমিতির সদস্যরা ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানের সর্বোত্তম অনুশীলনের জন্য একটি নতুন অধ্যয়ন গ্রুপ তৈরি করে। তারপরে, ২০১৩ সালে, এই বিষয়ে প্রথম সম্পাদিত ভলিউম প্রকাশিত হয়েছিল, যার শিরোনাম ছিল ‘ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞান: সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি’। ২০১৫ সালে নিউইয়র্কের সম্মেলনটি এ বিষয়ের ওপর ফোকাস করে অনুষ্ঠিত হয়।

ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞান হল সমাজবিজ্ঞানের একটি উপবিভাগ, যেখানে গবেষকরা দেখার চেষ্টা করেন কীভাবে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মধ্যে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে যোগাযোগ ঘটে ও পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। কীভাবে এটি ভার্চুয়ালি সামাজিক জীবনকে আরও বিস্তৃতভাবে প্রভাবিত করে। সমাজবিজ্ঞানের একটি উপক্ষেত্র হিসেবেই এটি প্রযুক্তি নির্ভর অনলাইন যোগাযোগ, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া এবং বাণিজ্য সম্পর্কিত বিষয়গুলোর উপর ফোকাস করে।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তি হয় ইন্টারনেটের সমাজবিজ্ঞান থেকে। ইন্টারনেটের সমাজবিজ্ঞান নব্বই এর দশকের শেষের দিকে একটি উপক্ষেত্রের রূপ নেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলিতে ইন্টারনেটের আকস্মিক বিস্তার এবং গ্রহণযোগ্যতা এই প্রযুক্তি দ্বারা প্রবর্তিত মানুষের ক্রিয়াকলাপ প্রাথমিক প্ল্যাটফর্ম হিসাবে সমাজবিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ইমেল এর মাধ্যমে বার্তা আদান প্রদান, অনলাইন আলোচনা, অনলাইন ফোরাম, অনলাইন সংবাদ, চ্যাটিং, কর্মসূচী সংক্রান্ত যোগাযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগ ইত্যাদি ক্ষেত্র নিয়ে এটি কাজ শুরু করে।

ইন্টারনেট প্রযুক্তি যোগাযোগের নতুন ফর্ম, তথ্যের নতুন উৎস এবং প্রচারের নতুন উপায়ের পথ বাতলে দেয়। সুতরাং সমাজবিজ্ঞানীরা বুঝতে চেয়েছেন যে কীভাবে এটি মানুষের জীবন, সাংস্কৃতিক ধরণ এবং সামাজিক প্রবণতা, সেইসাথে অর্থনীতির মতো বৃহত্তর সামাজিক কাঠামোকে প্রভাবিত করে। এবং সেই সাথে রাজনীতিও কিভাবে প্রভাবিত হয় তাও তারা বোঝার চেষ্টা করেন।

সমাজবিজ্ঞানীরা যারা প্রথম ইন্টারনেট-ভিত্তিক যোগাযোগ অধ্যয়ন করেছিলেন তারা সামাজিক নেটওয়ার্কগুলিতে মানুষের পরিচিতি এবং এর প্রভাব নিয়ে অধ্যয়নে আগ্রহী ছিলেন। বিশেষ করে যারা তাদের মত প্রকাশের কারণে সামাজিক সমালোচনার সম্মুখীন হন তাদের নিয়ে অধ্যয়নে অধিকতর আগ্রহী হন। তারা তাদেরকে "অনলাইন সম্প্রদায়" হিসাবে বুঝার চেষ্টা করে যা ব্যক্তির জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যেমন তাদের অনলাইন ক্রিয়াকলাপগুলো বাস্তব পরিবেশে বিদ্যমান ফর্মগুলির পরিপূরক কি না তা জানার চেষ্টা করা।

সমাজবিজ্ঞানীরা ভার্চুয়াল বাস্তবতা, পরিচয় এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় এর প্রভাব এবং ইন্টারনেটের প্রযুক্তিগত আবির্ভাবের মাধ্যমে শিল্প থেকে তথ্য অর্থনীতিতে সমাজের ব্যাপক রূপান্তরের প্রভাব সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তারা দেখার চেষ্টা করেছেন যে অনেক কর্মী এবং রাজনীতিবিদদের দ্বারা ইন্টারনেট প্রযুক্তি গ্রহণের সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। গবেষণার বেশিরভাগ বিষয় জুড়ে, সমাজবিজ্ঞানীরা অনলাইন ক্রিয়াকলাপগুলিতে মনোনিবেশ করেছেন এবং পর্যবেক্ষণ করেছেন যে অনলাইনে সম্পর্কিত ব্যক্তিদের অফলাইনে জড়িত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি হতে পারে।

অনলাইন সম্পর্ক অধ্যয়নের এই প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবহৃত প্রচলিত পদ্ধতিগুলির মধ্যে রয়েছে নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ, যা ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রবেশাধিকারযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে সম্পূরক পরীক্ষা করতে ব্যবহৃত হয়েছিল;। ভার্চুয়াল এথনোগ্রাফি আলোচনা ফোরাম, চ্যাট রুমে পাঠানো মেসেজ এবং অনলাইন ডেটা বিশ্লেষণও এ পর্যায়ে করা হয়।

ইন্টারনেট কমিউনিকেশন টেকনোলজি (আইসিটি) যেমন বিকশিত হয়েছে, তেমনি আমাদের জীবনে এর ভূমিকা এবং সামগ্রিকভাবে সামাজিক সম্পর্ক এবং সমাজে এর প্রভাব রয়েছে। ইন্টারনেটের সমাজবিজ্ঞান এবং অনুশীলন যা এখনও বিদ্যমান এবং অনলাইন সোসাইটির বিভিন্ন ফর্মে অংশগ্রহণ করার জন্য ইন্টারনেটযুক্ত ডেস্কটপ পিসি বা ইন্টারনেটযুক্ত মোবাইল ডিভাইসের মাধ্যমে যোগাযোগ ও পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া অতি সাধারণ বিষয় হয়ে ওঠেছে। নতুন যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম এবং নতুন নতুন ডিজিটাল ডিভাইসের উদ্ভাবন মানুষের অনলাইন যোগাযোগ ও ক্রিয়াকলাপগুলোকে আরো সহজ করে তুলেছে।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমাদের সামাজিক জীবনে বর্তমানে ডিজিটাল মিডিয়া বা ডিজিটাল প্রযুক্তি আমাদের আচরণ, সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন ক্রিয়াকলাপ ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রন করছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি এখন আমাদের জীবনের কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং সমাজবিজ্ঞানীদের অবশ্যই এদিকটাকে গুরুত্বসহ বিবেচনা করতে হবে এবং ডিজিটাল সামাজিক সম্পর্ক ও এর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করতে হবে।

এখানে উল্লেখ্য যে, সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপক ব্যবহার এবং হ্যাশট্যাগের ব্যবহার সমাজবিজ্ঞানীদের জন্য অনেক তথ্য প্রদান করছে। ব্যক্তিগত অনুভূতি, সমসাময়িক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সমস্যা এবং জনমানসের প্রবণতা সম্পর্কে ধারণা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা গবেষণা করতে পারেন। বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, এসবের পরিচালনা ও কী বিষয় প্রচারের জন্য ব্যবহার করে এসব নিয়ে গবেষণা করা যেতে পারে।

ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন বিষয় এবং ঘটনা অধ্যয়ন করতে পারেন যেমন, সামাজিক সম্পর্কের উপর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রভাব, তরুণ প্রজন্মের বন্ধুত্বে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা, অন্যদের সাথে মিথস্ক্রিয়া এবং শিষ্টাচারের নিয়ম; ডিজিটাল যুগে তরুণ প্রজন্মের প্রেম, ভালোবাসা এবং রোম্যান্স, ইত্যাদি। এসব নিয়ে তারা গবেষণা করতে পারেন।

ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞান জাতিগত সংখ্যালঘু, চরমপন্থী গোষ্ঠী এবং ঘৃনা ও বিদ্বেষ ছড়ানো গোষ্ঠীগুলোর ক্রিয়াকলাপ নিয়ে গবেষণা করতে পারে। এছাড়াও সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে ব্যক্তি ও দল যত ধরনের বার্তা আদান-প্রদান করে, যে সব বিষয় আপলোড করে, যে সব বিষযে যে ধরনের মন্তব্য করে, ও কিভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় এসব বিষয় ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গবেষণার বিষয়বস্তু হতে পারে। এছাড়াও আরও অনেক বিষয় রয়েছে যা ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানের আওতাভুক্ত হতে পারে।

সাম্প্রতিককালে গণমাধ্যমে আমরা দেখছি যে বিভিন্ন দেশের নাগরিকের সাথে আমাদের দেশের নাগরিকদের অনলাইনে সম্পর্ক হচ্ছে। প্রেম, ভালোবাসা হচ্ছে এবং বিয়েও হচ্ছে। এসব বিষয়গুলো ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানে আলোচিত হতে পারে। এছাড়াও এমন প্রবণতাও আমরা দেখছি যে ছেলে মেয়েরা তাদের বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত মায়ের বিয়ে দেয়ার জন্য অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন যা সাধারণ মানুষের আগ্রহের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সুতরাং এ বিষয়গুলো ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানের আওতায় পঠন পাঠন হতে পারে।

ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ অধ্যয়নের বিষয় হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার, অপব্যবহার ও প্রভাব নিয়ে বস্তনিষ্ঠ গবেষণা হতে পারে। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমাদের দেশের মোট জনগোষ্ঠীর বৃহৎ একটি অংশ এখন সামাজিক যোগযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে। তবে এই মাধ্যমের সঠিক ব্যবহার সংক্রান্ত জ্ঞান সবার মাঝে এখনও তৈরি হয়নি। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব, অপ-প্রচার ছড়ানো, ব্লাকমেইলিং, নারীদের নিয়ে কটূক্তি ইত্যাদির মাত্রা বেড়ে গেছে। ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানের পঠন, পাঠন এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

ডিজিটাল বিপ্লবের ফলে দেশ এখন ‘ ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এ পরিণত হয়েছে। শহর থেকে গ্রাম পর্যায়ে ডিজিটাল বিপ্লবের ফলস্বরূপ শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই এখন কম বেশি ডিজিটাল প্রযুক্তির আওতায় চলে এসেছে। ডিজিটাল বিপ্রবের ছোঁয়ায় তাদের আচার, আচরণ, ক্রিয়াকলাপ ও সংস্কৃতিও পরিচালিত হচ্ছে। অনেকেই এখন অনলাইনে নাটক, সিনেমা, ভিডিও ব্লগ ইত্যাদির মাধ্যমে অবসর বিনোদন করে থাকেন। ভবিষ্যতে এ ধারা আরো বাড়বে। কাজেই ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানের পঠন, পাঠন ও গবেষণায় এগুলো অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

উন্নত দেশগুলোতে যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অষ্ট্রেলিয়ার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্ডার গ্রাজুয়েট ও মাস্টার্স পর্যায়ে ‘ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞান’ কোর্স পঠন, পাঠন হয়ে থাকে। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমাজবিজ্ঞান ও অন্যান্য সাবজেক্টে এ বিষয়ে কিছু পঠন, পাঠন হলেও সরাসরি ‘ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞান’ শীর্ষক কোনো কোর্স আছে বলে জানা নেই। সুতরাং উচ্চ শিক্ষায় বিশেষ করে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের একটি কোর্স হিসাবে ‘ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞান’ চালু করা সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়টি ভেবে দেখবেন বলে প্রত্যাশা করি।

মো. বজলুর রশিদ: সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা।

 

  ‘স্বপ্ন ছুঁয়েছে’ পদ্মার এপার-ওপার

;

চীনকে সাথে নিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করতে হবে



ব্রিঃ জেঃ (অবঃ) হাসান মোঃ শামসুদ্দীন
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

 

পাঁচ বছর ধরে চলমান রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কোন কার্যকরী প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয় নাই। রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘ সময় চলমান থাকলে বাস্তুচ্যুত এই জনগোষ্ঠীর কট্টরপন্থা, সন্ত্রাস এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ছে এবং এর ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও বৃহত্তর এ অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে।উদ্ভুত এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের এবংআঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন জরুরি হয়ে পড়েছে। বর্তমানে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ২৪ টি ক্যাম্পে অমানবিক পরিস্থিতিতে প্রায় ১,৩০,০০০ রোহিঙ্গাকে রাখা হয়েছে। এসব ক্যাম্পে জীবিকা, চলাচল, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পর্যাপ্ত খাদ্য ও আশ্রয়ের উপর গুরুতর সীমাবদ্ধতা এবং মানবিক সহায়তা প্রায় না থাকার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের শুরুতে এসব ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদেরকে তাঁদের পূর্বের আবাসস্থলে এবং গ্রামগুলোতে পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসিত করার কার্যক্রম  শুরু করলে সামগ্রিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া গতি লাভ করবে বলে আশা করা যায়।

২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারের সার্বিক পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত। সামরিক সরকার এখন চীনের উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। এ কারণে চীন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করে রোহিঙ্গাদের দ্রুত মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করতে পারে। চীনের এই পদক্ষেপ রাখাইনে স্থিতিশীলতা এবং চীনা বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে। জাতীয় ঐক্যের সরকার (এন ইউ জি) ৭ সেপ্টেম্বর জনগণের প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধের ডাক দেওয়ার কারণে সামরিক বাহিনী এবং বিদ্রোহী দলগুলির মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা বাড়তে থাকে এবং পরিস্থিতি ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে। এই অবনতিশীল পরিবেশে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদে প্রত্যাবাসনের কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় চীন আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ স্বত্বেও এই সংকট সমাধানে এখন পর্যন্ত কোন উল্লেখ যোগ্য অগ্রগতি হয়নি।চীন মিয়ারমারে বন্ধু প্রতিম দেশ এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য।  চীন তার বৈশ্বিক অবস্থান প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মিয়ানমারের উপর তার অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে ও বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদও মিয়ানমারকে জবাবদিহি করতে কোনো দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে পারেনি কারণ চীন ও রাশিয়া এ ধরনের কোনো পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। জাতিসংঘের ৭৫তম সাধারণ অধিবেশনে মিয়ানমারের পক্ষে প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে চীন ও রাশিয়া।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রোহিঙ্গা সংকটের একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের জন্য এবং আমেরিকা এবং পশ্চিমাবিশ্বের রাষ্ট্রগুলো মিয়ানমারের উপর চাপ অব্যাহত রাখার পরও রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং বলেছেন যে চীন একটি "যোগাযোগের সেতু" হিসাবে কাজ করে যাবে এবং দ্রুত ফলাফলের সুবিধার্থে যথাসাধ্য চেষ্টা করবে কারণ বাংলাদেশ মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন চায়।চীন প্রত্যাবাসন শুরু করার জন্য বাংলাদেশের আগ্রহকে সমর্থন করে এবং এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সমাধানে দুই বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীকে সাহায্য করার জন্য চীনের ভুমিকা চলমান থাকবে।এটি একটি মানবিক সমস্যা এবং চীন এটি কার্যকরভাবে মোকাবেলা করার চেষ্টা চালাবে। এই সংকটের সমাধান হলে শুধু বাংলাদেশই লাভবান হবে তা নয়, এই অঞ্চলের দেশগুলোর পাশাপাশি বিশ্বেও অন্তত একটি সংকটের অবসান হবে।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর প্রত্যাবাসন চুক্তি করে বাংলাদেশ। চুক্তির ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন হয়। এর পর ২০১৮ সালেবাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, ওই বৈঠকে প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত মাঠপর্যায়ের চুক্তি সই হয়। এই প্রক্রিয়ায় মিয়ানমারের সদিচ্ছার পাশাপাশি চীনের উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ।প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয়, ত্রিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।বাংলাদেশ ৯ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর তালিকা মিয়ানমারকে দিয়েছে, এর মধ্যে থেকে মাত্র ২৯ হাজার রোহিঙ্গাকে নিজেদের নাগরিক বলে স্বীকার করেছে মিয়ানমার। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময়মিয়ানমার, বাংলাদেশ এবং চীন একত্রে বাংলাদেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য একটি ত্রিপক্ষীয় কার্যপ্রণালী তৈরি করে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নের জন্য তিন দেশ একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে সম্মত হয়।২০১৯ সালে দুই দফা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে প্রত্যাবাসন সম্ভব হয় নাই।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে চীন।২০১৯ সালের জুলাই মাসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেইজিং সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন। ২০১৮ সালে চীনের উদ্যোগে প্রথম দফায় ত্রিপক্ষীয় বৈঠক এরপর ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারিতে ভার্চুয়ালি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।আলোচনা শেষে ২০২১ সালের জুনের মধ্যে প্রত্যাবাসন শুরু করার বিষয়ে আশা করেছিল যদিও বাস্তবে তা শুরু হয়নি। চীনের নেতৃত্বে রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ তৈরির করার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। ২০২২ সালের ১৯ জানুয়ারীতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে চীনের মধ্যস্থতায় মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে অনুষ্ঠিতভার্চুয়াল বৈঠকে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি চীনের উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুও ঝাওহুই উপস্থিত ছিলেন এবং আলোচনা শেষে প্রত্যাবাসন শুরু করতে সব পক্ষ সম্মত হয়। চীনের আন্তরিক উদ্যোগ সংকটকে সমাধানের দিকে এগিয়ে নিতে পারে।মিয়ানমারের উপর চীনের প্রভাব থাকায়চীন এ সংকট সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থনৈতিক, ভু‚-রাজনৈতিক, কৌশলগত নিরাপত্তাসহ আরও নানা ইস্যুতে মিয়ানমার ও চীন একে অপরের ওপর অনেক নির্ভরশীল এবং তাদের মধ্যে সম্পর্কও বেশ ঘনিষ্ঠ। চীন মিয়ানমারের সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষার মাধ্যমে তাঁদের ভূখণ্ডে গ্যাস এবং জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করছে।রাখাইন রাজ্যের চকপিউতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পাওয়ার প্ল্যান্ট, গভীর সমুদ্র বন্দরতৈরির কাজ চীনের অর্থনৈতিক সহযোগিতায় চলছে।মলাক্কা প্রণালী দিয়ে চীনের ৮৫ শতাংশ তেল এবং জ্বালানি গ্যাস আসে।মালাক্কা সংকটের কথা মাথায় রেখে এই তেল এবং জ্বালানি গ্যাস সরবরাহের জন্য বিশাল অর্থ বিনিয়োগ করে চীন ওই বন্দর দিয়ে দুটি পাইপলাইন বসিয়েছে এবং তা দিয়ে জ্বালানী তেল এবং গ্যাস চীনের কুনমিংয়ে পাঠানো হয়।এই পাইপলাইন রাখাইন অঞ্চলে থাকায় রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সরকারের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় বন্ধু চীন। ভারত মহাসাগরে উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাখাইন অঞ্চল চীনের সামরিক কৌশলগত কারণেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামরিক বিবেচনায় ও অর্থনৈতিক কারণে চীনের জন্যে মিয়ানমারকে নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। এসবের প্রেক্ষিতে বলা যায় যে চীন আন্তরিক উদ্যোগ নিলে বাংলাদেশরোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে সক্ষম হবে এবং মিয়ানমারও এগিয়ে আসবে। ২০১১ সাল থেকে, মিয়ানমারে প্রায় ৯০ শতাংশ বৈদেশিকবিনিয়োগ এসেছে এশিয়ার দেশগুলো থেকে, এইদেশগুলোমিয়ানমারেরসাথেক্রমাগত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়াচ্ছে।চীন মিয়ানমারে বৃহত্তম বিদেশী বিনিয়োগকারী দেশ। মিয়ানমারে অসংখ্য উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক বিনিয়োগের মাধ্যমে, চীন শুধুমাত্র দেশের অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক বিষয়েই নয় বরং ব্যাপকভাবে কৌশলগত স্তরেও তার দৃঢ় এবং পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করছে।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন চায় বাংলাদেশ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও সহায়তা নিশ্চিত করছে। যতই দিন যাচ্ছে এই বাস্তুচ্যুত নাগরিকরা বাংলাদেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।প্রতি বছর ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ৩৫ হাজার শিশু জন্ম নিচ্ছে, জনসংখ্যার এই বাড়তি চাপ মোকাবেলা ক্রমেই মানবিক সহায়তার উপর চাপ ফেলছে। ইউক্রেন, আফগানিস্তান ও চলমান বৈশ্বিক সংকটে  রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তা তহবিল সংকটের আশঙ্কায় মে মাসে ঢাকা সফরে এসেছিলেন জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি।রোহিঙ্গা তহবিল সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করে আঞ্চলিক দেশগুলোকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনেরক্ষেত্রে জোরালো ভুমিকা রাখতে এগিয়ে আসার আহ্বান  জানান ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ৬ আগস্ট বাংলাদেশ সফরকরবেন। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেক গভীর এবং বিস্তৃত। রোহিঙ্গা ইস্যু এই সফরে বাংলাদেশের টপ প্রায়োরিটিতে থাকা এজেন্ডা। এই সফরে রোহিঙ্গা ইস্যু গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। বাংলাদেশ এই সফরে রোহিঙ্গা সংকটে চীনের আরও জোরালো ভূমিকার আহ্বান জানাবে ও প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে রাজনৈতিক সমাধানের জন্য চীনের সহযোগিতা চাইবে। বাংলাদেশের অনেক অর্থনৈতিক প্রকল্পে চীনের সহায়তা রয়েছে এবং বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে চীনের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা আছে।বাংলাদেশের সাথে চীনের শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কের পাশাপাশি চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার এবং উন্নয়ন সহযোগী।রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ওই দেশের ওপর চীনের বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে। এজন্য রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে চীন বড় ভূমিকা রাখতে পারে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীন ত্রিপক্ষীয় মেকানিজমে কাজ করছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের সময়ে এটি নিয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। এর ফলে প্রত্যাবাসনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের অগ্রাধিকার হচ্ছে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন এবং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের সময়ে এ বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।

চলমান বিশ্ব পরিস্থিতি মানবিক সহায়তার উপর চাপ ফেলছে যা ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলার জন্য উদ্বেগজনক। এর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে চলমান সংকট এই অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে, যা কারো কাম্য নয়। এই সংকটের সমাধানে আঞ্চলিক ক্ষমতাধর দেশগুলোকে এখনই এগিয়ে আসতে হবে। আঞ্চলিক ও ভু-রাজনীতিতে ক্ষমতাধর বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম দেশ চীন রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করে এই অঞ্চলের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এটাই হোক সবার প্রত্যাশা।

ব্রিঃ জেঃ (অবঃ) হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এনডিসি,  এএফডব্লিউসি,  পিএসসি, এমফিল, মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক।

  ‘স্বপ্ন ছুঁয়েছে’ পদ্মার এপার-ওপার

;

সময়ের শ্রেষ্ঠ যুব নায়ক শেখ কামাল



নিয়াজ মোর্শেদ এলিট
সময়ের শ্রেষ্ঠ যুব নায়ক শেখ কামাল

সময়ের শ্রেষ্ঠ যুব নায়ক শেখ কামাল

  • Font increase
  • Font Decrease

মঞ্চ অভিনয়, আবৃত্তি বা সঙ্গীতের কাজ তিনি করেছেন। কিন্তু পর্দার নায়ক ছিলেন না। তারপরও আমরা আজ যখন পেছন ফিরে ইতিহাসে চোখ বোলাই, দেখতে পাই এই বাংলাদেশের সবচেয়ে স্মার্ট নায়ক ছিলেন তিনিই। একাধারে মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সাংস্কৃতিক কর্মী, ক্রীড়া সংগঠক, খেলোয়াড় এবং রাজনীতিবিদ ছিলেন তিনি।

হ্যাঁ- বলছিলাম এই বাংলাদেশের তারুণ্যের অহংকার শেখ কামালের কথা।

আমরা যারা যুব রাজনীতি করি, তাদের কাছে শেখ কামালের চেয়ে বড় শিক্ষক সম্ভবত আর কেউ নেই। এই দেশে কী করে ছাত্র রাজনীতি করতে হয়, তরুনদের এই রাজনীতিতে টেনে আনতে হয়, তার শিক্ষাটা তিনিই দিয়ে গেছেন। শাহীন স্কুল থেকে পাশ করার পর নিজের এই দারুণ প্রতিভাটা দেখিয়েছেন।

স্কুলে থাকতে ছিলেন বন্ধুদের প্রিয় মানুষ এবং ঈর্ষার পাত্র। খেলাধুলা, গান, আবৃত্তি; সবখানে ছিলো তার দাপট। ঢাকা কলেজে আশার পর দেখা মিললো রাজনীতিবিদ শেখ কামালের। এই ঢাকা কলেজে তখন পাকিস্তানপন্থী গুন্ডাদের যন্ত্রণায় ছাত্রলীগের নাম নেওয়াই কঠিন ছিলো। তেমন একটা সময়ে এখানে তিনি ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড শুরু করলেন। সে সময়ের সেরা সেরা ছাত্রদের নিজের ক্যারিশমা দিয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে নিয়ে এসেছিলেন। এমনকি তখনকার তুখোড় ক্রিকেটার রকিবুল হাসানকেও তিনি রাজনীতিতে এনেছিলেন।

এর ফল হিসেবে ঢাকা কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগকে বিজয়ী করতে পেরেছিলেন তিনি। নেপথ্যে থেকে পুরো কলকাঠি নেড়েছিলেন শেখ কামাল। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখালেন নিজের রাজনীতি প্রতিভার পুরোটা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন পাকিস্তান সরকারপন্থী এনএসএফ-এর গুন্ডাদের দাপট। সেখানে ছাত্রলীগের অবস্থান ছিলো একেবারে মৃদু। গুন্ডাদের জ্বালায় ছাত্রলীগ একটা মিছিলও বের করতে পারতো না। সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড দিয়ে প্রথমে নিজেদের পায়ের নিচে মাটি শক্ত করেছিলেন শেখ কামাল। সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান, গান, নাটক; প্রতিদিন শেখ কামালের কোনো না কোনো আয়োজন ছিলোই। এখানে একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে জমজমাট আয়োজন করেছেন তিনি।

উল্লেখ করা যেতে পারে এখনকার ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের লেখা একুশে ফেব্রুয়ারির ওপর প্রথম নাটক টিএসসিতে মঞ্চস্থ হয়েছিলো। আর সেই আয়োজনের প্রধান নায়ক ছিলেন এই শেখ কামাল। নিজের গাড়ি নিয়ে সারা শহর দাপিয়ে বেড়িয়ে সেই নাটক সফল করেছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, সেখানে নিজে অভিনয়ও করেছিলেন।

এরপর তো মুক্তিযুদ্ধ এলো। নিজে ফ্রন্টে মুক্তিবাহিনীর একজন হিসেবে ট্রেনিং নিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর সন্তান হিসেবে চাইলে পায়ের ওপর পা রেখে ভারতে বসে থাকতে পারতেন। তা করেন নি; ফ্রন্টে ছিলেন। পরে তাকে মুক্তিবাহিনী ও সেনাবাহিনীর প্রধান কর্নেল আতাউল গনি ওসমানীর এডিসি করে থিয়েটার রোডে নিয়ে যাওয়া হয়।

মুক্তিযুদ্ধের পর, দেশ স্বাধীন হলে সেনাবাহিনীর পদ ত্যাগ করে আবার পড়াশোনা আর রাজনীতিতে মন দেন। আর এই সময়ই দেশ গড়ার জন্য শেখ কামাল বেছে নেন খেলাধুলাকে। ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি।

আমি নিজে একজন ক্ষুদ্র ক্রীড়া সংগঠক। ফলে আমি জানি যে, এই কাজটি করার আসল মন্ত্র কী। আর এটাও আমাদের দেখিয়ে দিয়ে গেছেন শেখ কামাল। সদ্য স্বাধীন দেশে তখন তরুণ ও যুবকদের সামনে বিভ্রান্ত হওয়ার, কু-পথে যাওয়ার অনেক আশঙ্কা ছিলো। আর সেখান থেকেই সরিয়ে এনে তাদের খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করেছেন শেখ কামাল।

শেখ কামাল নিজে এক সময় খেলাধুলা করেছেন। ক্রিকেট খেলেছেন, অ্যাথলেটিক্স করেছেন, ফুটবল খেলেছেন। তবে খেলার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন খেলোয়াড় ও ক্রীড়া সংগঠন তৈরি করার ব্যাপারে। তার হাত ধরেই সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশের কিংবদন্তী ক্লাব আবাহনী।

সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশে নতুন ক্লাব আবাহনীতে যোগ দেওয়ার মত তারকা পাওয়া কঠিন ছিলো। শেখ কামাল নিজে খেলোয়াড়দের বাসায় বাসায় গেছেন। বন্ধুত্ব কাজে লাগিয়ে আবাহনীতে নিয়ে এসেছেন কাজী সালাউদ্দিন থেকে শুরু করে সে সময়ের সব সেরা তারকাদের। পুরো শহর মাতিয়ে রেখেছেন খেলাধুলায়।

ক্রিকেট সরঞ্জামে বাড়তি কর বসানোর প্রস্তাব ছিলো তৎকালীন অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে। নিজে ক্রিকেটারদের সাথে নিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করেছেন। ক্রিকেট খেলার পথ খুলে দিয়েছেন।

আরও অনেক কিছু তার করার ছিলো। এই দেশটার রাজনীতিকে, এই দেশটার খেলাধুলাকে, এই দেশটার সংস্কৃতিকে আরও অনেক কিছু দেওয়ার ছিলো। কিন্তু ঘাতকেরা তা হতে দেয়নি। শেষ অবধি এই দেশের জন্য বড় এক আফসোসের নাম থেকে গেছেন শেখ কামাল।

আজ এই মহানায়কের জন্মদিনে আমার সশ্রদ্ধ শুভেচ্ছা।

লেখক: নিয়াজ মোর্শেদ এলিট, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।

  ‘স্বপ্ন ছুঁয়েছে’ পদ্মার এপার-ওপার

;

ছিন্নমূল মানসিক বিকারগ্রস্থ নারীদের জীবনের বাস্তবতা



চিত্রা গোস্বামী       
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

গত ২৫-২৭ জুলাই অনুষ্ঠিত হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা । আমার বাসায় কয়েকজন আত্মীয় পরীক্ষা দিতে এসেছিলো । গত ২৬ জুলাই পরীক্ষা দিয়ে ওরা ২৭ জুলাই চলে যায়। ২৭ জুলাই সকাল ছয়টার সময় আমি ওদের নিয়ে ট্রেন স্টেশনে গিয়েছিলাম ট্রেনে তুলে দিতে।

স্টেশনে অনেক ভিড় দেখে আমার ড্রাইভার বললো ম্যাডাম আপনি গাড়িতেই বসে থাকুন আমি গিয়ে তুলে দিয়ে আসছি।  আমি কয়েক দিন আগে পায়ে একটু ব্যাথা পেয়েছিলাম বিধায় আমি আর  এগোলাম না। কারণ আমার পায়ের যে অবস্থা তাতে আমার পক্ষে ট্রেনে ওঠাটা কষ্টকর হয়ে যেত।  তাই আমি গাড়িতেই বসে থাকলাম। 

গাড়িতে বসে থেকে বাইরে মানুষগুলো দেখছিলাম। অনেক পরীক্ষার্থী এবং তাদের বাবা-মা সবাই ছুটছে ট্রেন ধরবার জন্য গাড়িতে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ আমার চোখ পড়ল একটা মেয়ের দিকে।  তার দিকে চোখ যাওয়ার পর থেকে আমি কিছুতেই আমার চোখ সরাতে পারলাম না। মেয়েটির বয়স কতই বা হবে? হয়ত আঠারো /উনিশ? অথবা আর একটু কম বেশি। ওকে দেখে আমার মেয়ের বয়েসই মনে হচ্ছিল। মেয়েটার গায়ে একটা ছেঁড়া জামা ও ছেঁড়া পায়জামা এবং কোলে একটি ফুটফুটে বাচ্চা। বাচ্চাটির বয়স হয়তো দুই তিন মাস।

মেয়েটিকে দেখে বুঝতে পারলাম সে পুরোপুরি না হলেও কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন। সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল হয়তো রাতের আঁধারে মেয়েটির অসুস্থ্যতার সুযোগ নিয়ে কেউ তার সর্বনাশ করেছে। আর তারই ফলশ্রুতিতে আজকের এই সন্তান তার কোলে। আমাদের সমাজে গরীব অসহায় মেয়েদের-যাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, লজ্জা নিবারণের জন্য একটা ভালো কাপড় নেই , রাস্তায় একমাত্র ভরসা।

এই ধরণের মেয়েদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই বিধায় যে কেউ চাইলেই তাদের দেহটা নিজেদের খুশি মতো ভোগ করতে পারে। আবার কাম -লালসা চরিতার্থ হলে সাথে সাথে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে রাস্তায়। আমার মনে হয় এদের জন্ম হয় শুধু মাত্র একশ্রেনীর মানুষের কাম - লালসা মেটানোর জন্য।

আমি মেয়েটি ও তার বাচ্চাটিকে দেখে ভাবছিলাম মেয়েটি নিজেও হয়তো জানেনা কে তার সন্তানের বাবা! এই বাচ্চাটি যখন বড় হবে তখন আমাদের এই সমাজ কি তাকে স্বীকৃতি দিবে? যখন স্কুলে ভর্তি হতে যাবে তখন স্কুল কি তাকে তার পিতৃ পরিচয় ছাড়াই ভর্তি নিবে? আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি যে এই বাচ্চাটি কোনো দিনই তার বাবাকে খুঁজে পাবে না। কোনো দিনও জানবে না কে তার বাবা?

মেয়েটি মানসিক ভারসাম্য হীন হওয়ায় তা একেবারেই সম্ভব না। হয়তো বাচ্চাটির বাবা তারই আশেপাশে থাকবে কিন্তু সে কোনো দিনই জানবে না বা খোঁজ নিবেনা যে, রাস্তা -ঘাটে তারা এরকম কত সন্তানের জন্ম দেয়!

তাদেরই রক্ত রাস্তা -ঘাটে অবহেলায় পড়ে থেকে মানুষ হয়। মেয়েটিকে দেখলাম বাচ্চাটা কোলে নিয়ে এক পাশে বসলো এবং বাচ্চাটাকে দুধ খাওয়াতে লাগলো। অত্যন্ত অবহেলায় বাচ্চাটার একহাত ধরে টেনে তুলছিলো এবং এপাশ - ওপাশ করাচ্ছিল। বাচ্চাটার মনে হয় হাতে ব্যাথা লাগছিল বিধায় সে খুব কান্নাকাঁটি করছিল। মেয়েটি তার বাচ্চাটাকে খাওয়াতে খাওয়াতে বার বার ওরনা দিয়ে তার নিজের গা হাত- পা ঢাঁকছিলো।তার পরণের জামা পায়জামা দুটোই ছেঁড়া।

আমি জানিনা যে মেয়েটি আদৌও জানে কিনা যে সন্তান কি জিনিস!

আমাদের সমাজের কত বিত্তবান মানুষ আছে যারা একটা সন্তান পাবার জন্য সারাজীবন হাহাকার করছে! লাখ লাখ টাকা ডাক্তারের পেছনে খরচ করছে একটা সন্তানের জন্য! তারপরেও ঈশ্বর তাদের কোলজুড়ে একটা সন্তান দেয়না! যে সন্তান তাদের জন্য মানুষ করা কোনো ব্যাপারই না। আবার সন্তানের অভাবে কোটিকোটি টাকার সম্পত্তির মালিকানা পেয়ে যাচ্ছে অন্যরা। অথচ মানসিক ভারসাম্যহীন সে মা হয়তো বুঝেই না সন্তান কি জিনিস! তার কোলজুড়ে ঈশ্বর দিয়ে রেখেছেন ফুটফুটে একটি দেবদূত!!

যে কিনা মানুষ হবে রাস্তা ঘাটে পড়ে থেকে, একবেলা খেয়ে না খেয়ে, মানুষের ঝাঁটা -লাথি খেয়ে! হায়রে ঈশ্বরের কি অসম বণ্টন!!!!!

মেয়েটিকে দেখার পর থেকে আমি কেন যেন তাকে ভুলতেই পারছিনা! এই সকল মেয়েদের দায়িত্ব কি রাষ্ট্র নিতে পারে না? বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তাঁর বাবা সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নিরলসভাবে পরিশ্রম করে চলেছেন। তিনি দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য বিভিন্ন ধরণের কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন। গৃহহীনদের জমির মালিকানাসহ ঘর প্রদান করছেন। এবার প্রয়োজন এই ছিন্নমূল মানুষদের দিকে দৃষ্টি দেওয়া। বাংলাদেশে হাজার হাজার এই ধরনের মানসিক ভারসম্যহীন ছিন্নমূল নারী রয়েছে। আমাদের সমাজে এক শ্রেণির মানসিক বিকারগ্রস্থ পুরুষ রয়েছে যারা এই ধরণের মেয়েদেরকে ভোগের বস্তু হিসেবে মনে করে। তাদের বুদ্ধিহীনতার সুযোগ নিয়ে তাদের ভোগ করে রেখে যার ভোগের চিহ্ন হিসেবে অনাগত সন্তান। এই সন্তানরাই এক সময় বিভিন্ন অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পরে।

ফলে সময় এসেছে এই সকল মেয়েদের জন্য কিছু করার। আমার জানি যে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ রয়েছে এই সকল মেয়েদের দেখাশোনা করবার জন্য। প্রতিটি জেলায় এই ধরণের মেয়েদের খুঁজে বের করে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যেয়ে তাদের চিকিৎসাসহ অন্যান্য সকল প্রকার প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান করা প্রয়োজন। এ ধরণের মেয়েদের সন্তানদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা করা হলে একটি প্রজন্ম নষ্ট হবার হাত থেকে বেঁচে যাবে। আমি বিশ্বাস করি আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়গুলি বিবেচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এই বিষয়গুলি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে উন্নয়ন অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।

লেখিকা গৃহিণী।   

  ‘স্বপ্ন ছুঁয়েছে’ পদ্মার এপার-ওপার

;