একজন ডা. শিশির, তার গেরিলা যুদ্ধের গল্প

  বিজয়ের ৫০ বছর



জুয়েল সাদাত
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

 

ডা. সিরাজুল ইসলাম। একজন অসাধারণ মানবিক মানুষ। একজন মুক্তিযোদ্ধা ট্রেইনার। ১৪০০ মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেইনিং করেছিলেছেন। শিশির ভাদুড়ি ছন্মনামে গেরিলা যুদ্ধ করেছেন। অসাধারণ দেশপ্রেমিক একজন চিকিৎসক মুক্তিযোদ্ধা। পরিবারের দুই ভাই যুদ্ধ করেছেন। ধার্মিক পরিবারে বেড়ে উঠা ডাক্তার ইসলাম তাবলিগের দাওয়াত নিয়ে সারা আমেরিকার মসজিদে মসজিদে কাটিয়েছেন। দারুণ গান গাইতে পারতেন। ওস্তাদের কাছে গান শিখেছেন। দাওয়াতি কাজে জড়িয়ে গান ছাড়েন। ফ্লোরিডায় ৬/৭টি মসজিদ তৈরি করেছেন। দান করেন হিসাব ছাড়া। বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা নিয়ে কোন আপোষ করেন না।  ছিলেন মরহুম শেখ কামালের বন্ধু।  একাধারে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসকও।

মন খুলে যুদ্ধের গল্প, জীবনের গল্প, নিয়ে কথা বলেছেন কমিউনিটি এক্টিভিস্ট সাংবাদিক কলামিস্ট জুয়েল সাদাতের সাথে।   

জুয়েল সাদাত - আপনার পড়াশুনা বা ছাত্র জীবন কেমন ছিল?

ডা. শিশির: নাটোরের গুরুদাসপুরে প্রাথমিক শিক্ষা। তারপর পাবনা জেলা স্কুলে পড়াশুনা করি। স্কুল জীবনে স্কাউট লিডার, আবৃত্তি, লেখালেখি ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জড়িত ছিলাম। তারপর ঢাকা কলেজে পড়াশুনা করি। তারপর ফাস্ট গ্রেট স্কলারশিপ নিয়ে আমরা মাত্র দুজন ইস্ট পাকিস্তান থেকে লাহোরে যাই। ঢাকা কলেজে পড়াশুনা কালীন সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে কলেজের ছাত্র সংসদের জেনারেল সেক্রেটারি হই। তখন মরহুম শেখ কামাল আমার সহপাটি ছিলেন। তিনি বলতেন, তোমরা মেধাবী পড়াশুনা করো। প্রযোজন মতো আমাদের সাপোর্ট কর। তিনি আমার নির্বাচনে আমাকে ভোট দিতে বলতেন সবাইকে। ১৯৬৯ সালে লাহোরে পড়াশুনার জন্য যাই। তারপর যুদ্ধের কারণে সেখানে থাকা সম্ভব না হওয়ায় ১৮ এপ্রিল ১৯৭১ বাংলাদেশে যুদ্ধচলাকালীন চলে আসি। যুদ্ধের পর ঢাকা মেডিকেল থেকে ডাক্তারি পাস করি।

জুয়েল সাদাত:  আপনার সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল সম্পর্ক জানতে চাই?

ডা. শিশির: পাবনা জেলা স্কুলেই আমার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জড়ানো। লেখালেখি, স্কাউটিং এর নানা একটিভিটিস, গল্প কবিতা নাটক সব কিছু শুরু স্কুল জীবনেই। তারপর ঢাকা কলেজে বড়ো পরিসরে জড়ানো। ঢাকা কলেজের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ওতোপ্রোতো জড়িত ছিলাম। সবগুলো স্টেজ শোতে আমি থাকতাম। নাটক করতাম। ঢাকার অগ্নিবিনাতে জড়িত ছিলাম।  ওস্তাদের নিকট গান শিখি।  টেলিভিশনে অনুষ্ঠান প্রযোজনা করি। স্বাস্থ্য বিষয়ক অনুষ্ঠান করতাম। ভাল গান গাইতে পারতাম। একবার আমার এক গানের উস্তাদ অসুস্থ হলেন, উনাকে বিশেষ যত্ন নিয়ে সুস্থ করে তুলি। তারপর উনি আমাকে ও অনেক যত্ন করে গান শেখান। উস্তাদ গুল মোহাম্মদসহ আরো অনেকের  সান্নিধ্যেই গানের সব মাধ্যমেই পারদর্শিতা অর্জন করি।

জুয়েল সাদাত: মুক্তিযুদ্ধে জড়ানো কিভাবে, আর কিভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেইনার হলেন?

ডা. শিশির: যখন লাহোরে ছিলাম, ২৫ মার্চের পরে একদিন হোস্টেলে আমাকে আটক করে  বলতে  থাকে  পাকিস্তান নট ফর বাংলাদেশি বাস্টার্ড। সেদিন নেপালি ছাত্ররা আমাকে মুক্ত করে। তখন তারা আমাকে মেরে ফেলতে চাইছিল। তখন প্রিন্সিপাল আমাকে বলেন  ন্যাশনাল ক্রাইসিস চলছ, তোমাদের হোস্টেলে থাকা নিরাপদ নয়। তখন অনেকেই হোস্টেল থেকে চলে গিয়েছিল। আমি যেহেতু গভর্নর স্কালারশিপে ছিলাম,  তখন তারা আমাদের আর্মির সহায়তায় দেশে ফেরত পাঠাতে চাইছিল। আমরা দুই তিন জন ছিলাম। এয়ারপোর্টে আমাদের হত্যা করতে পারে তাই অনেকেই আসেনি। আমি একা ঢাকা আসলাম ১৮  এপ্রিল ১৯৭১ সালে। পায়ে হেঁটে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে চলে আসি, তিনদিন পর চলে যাই নাটোরের গুরিদাসপুর গ্রামের বাড়ি। মা বলেন, পাশের গ্রামের ১৮ জনকে  পাক আর্মি মেরে ফেলছে। তখন আমরা বাড়িতে থাকতাম না মাঠে ঘুমাতাম । কাউকে রাজি করাতে পারছিলাম না মুক্তিযুদ্ধে যেতে। মাত্র তিনজন আমরা চলে যাই বাঙালিপুর ক্যাম্পে। সেই ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে পরবর্তিতে পরিচিত আব্দুল জলিল ভাই, তিনি আমার আব্বার পরিচিত সেই হিসাবে আমাকে সুযোগ দিলেন । আমার পূর্বের মিলিটারি ট্রেনিং ছিল, সেই সাথে স্কাউটিংসহ নানা রকম ট্রেনিং থাকায় তিনি আমাকে ট্রেইনার হিসাবে কাজে লাগান। তিন মাস ট্রেনিং করাই । আমরা বেশীর ভাগ সময় রাতে অপারেশন করতাম দিনে।

জুয়েল সাদাত: গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে কিভাবে জড়ালেন

ডা. শিশির: আমাদের ক্যাস্পের কাছে১০ জন মুক্তিযোদ্ধা চাইল। তখন আমাদের দশ জনকে সিলেক্ট করে। আমাদের বলা হল তোমাদের বিশেষ ট্রেনিং এর জন্য নেয়া হচ্ছে। কই যাচ্ছ?  কেন যাচ্ছ?  প্রশ্ন করতে পারবে না। আমাদের ইন্ডিয়ান আর্মির ট্রাকে করে উচ্চতর ট্রেনিংয়ের জন্য জলপাইগুড়ি হয়ে শিলিগুড়ি নিয়ে গেল। সেখানে আমরা তৃতীয় ব্যাচ হিসাবে ট্রেনিং এ যোগ দেই। সেখানে সিরাজুল ইসলাম খান, তোফায়েল আহমদ, আব্দুর রাজ্জাক ভাইদের সাথে দেখা হয়। তখন তারা বললেন তোমাদের গেরিলা যুদ্ধের জন্য প্লেনে নেয়া হবে, অনেক কষ্ট, যারা কষ্ট সহ্য করতে পারবে না, তাদের যাওয়ার দরকার নাই। আমরা দশজনই যেতে রাজি হই। আমাদের আর্মির পোশাক দেয়া হয়। 

ইনু ভাইরা দ্বিতীয় ব্যাচে ট্রেনিং নেন, আমরা তৃতীয় ব্যাচে ট্রেনিং শেষ করি। তারা বললেন, এটা একটা ইন্টারন্যাশনাল ক্যান্টনমেন্ট, তাই সবার মুসলিম নাম থাকা ঠিক হবে না।  তখন সেখানে আমাদের প্রত্যেককে একটি হিন্দু নাম ধারণ করতে হয়। আমার নাম দেয়া শিশির ভাদুড়ি ৷

পরবর্তিতে আমার জীবনে শিশির নামটা রেখে দেই স্মৃতি হিসাবে৷ গেরিলা ট্রেনিং এ নানা পরীক্ষা হত ৷ আমি ভাল ইংরেজি জানতাম, আমি কর্নেল মালহাতরার ইংরেজি স্পিচ ও নানা কৌশল ট্রেনিং শিট বাংলায় ট্রান্সলেট করতাম,  তাই সেখানে ও আমাকে স্কোয়াড লিডার বানানো হয়। কর্নেল মালাহাতরা আমাকে ট্রেইনার হিসাবে রেখে দেন। তখন আমার মুক্তিযোদ্ধারা  কর্নেল মালহাতরাকে অনুরোধ করেন, আমাকে নিয়ে দেশে যেতে। কারণ  সিরাজুল ইসলাম  (শিশির)  দেশে না গেলে উনার মা চিন্তা করবেন। আর তাকে ছাড়া আমরা কিভাবে  যুদ্ধ করব।  কি মনে করে কর্নেল মালহাতরা  আমাকে দেশে পাঠান৷  গেরিলা যুদ্ধারা অনেক কৌশলী, তাদের মাধ্যমেই বড় বড় অপারেশন হত। গেরিলা যুদ্ধের কৌশলেই অনেক বড় বড় সফল অপারেশন হয়েছিল।

জুয়েল সাদাত: আপনি রাজাকারদের কিভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন? বুলেট নিয়ে নাকি আপনারা শপথ নিয়েছিলেন?

ডা. শিশির:  আমি গেরিলাযোদ্ধা ছিলাম। রাজাকারদের কাছে অনেক অস্ত্র আছে, গুলি ছিল। আমি তাদের নানা ভাবে কৌশলে আত্মসমর্পণ করাই। তারা আমাদের কাছে যে কোন কারণে বা ভয়ে হউক বা জীবনের মায়ায় হউক একত্রিত হয়। তখন কোরআন শরিফের উপর আমার হাত, তারপর তাদের হাত তারপর বুলেট রেখে শপথ করালাম। শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ মেনে চলব, দেশের সাথে বেইমানি করব না। যদি করি তাহলে এই বুলেটেই যেন জীবন যায়।

জুয়েল সাদাত: আপনারা কোন জায়গায় যুদ্ধ করেছেন?

ডা. শিশির: আমরা মূলত আগস্ট থেকে ডিসেম্বর যুদ্ধ করি। আত্রাই - গুরুদাসপুর- সিংরাই পুরো এলাকাতে নানা স্কুলে স্কুলে গিয়ে আমরা দশজনই মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দেই, শেষ পর্যন্ত যার সংখ্যা দাড়ায় ১৪০০ জন। তারপর আমাদের এই বাহিনী এমন আক্রমণ করে পাকিস্তানী বাহিনী পালানোর সুযোগ পায়নি। এই সময়টাই মুক্তিযুদ্ধের অনেক সফলতা আসে। আমাদের নানা কৌশলের কারণে পাক বাহিনী দুর্বল হয়ে যায়। 

জুয়েল সাদাত : আপনাদের মানে গেরিলা যুদ্বাদের লজিস্টিক সাপোর্ট কেমন ছিল।

ডা. শিশির: আসলে অস্ত্র যুদ্ধ করে না, অস্ত্রের পেছনের মানুষ যুদ্ধ করে, আবার পেছনের মানুষ যুদ্ধ করে না। একটা আদর্শকে সামনে রেখে যুদ্ধ হয়ে থাকে। একজন গেরিলা  যুদ্ধা ১০০ জন কনভেশনাল আর্মির সমান। গেরিলা যুদ্ধ হল কৌশল। আমরা রাতে ডানে বামে গুলাগুলি করতাম, তাদের ঘুমাতে দিতাম না। রাতের পর রাত  পাকিস্তানি বাহিনী ঘুমাতে না পেরে কাহিল হয়ে পড়ত। তখন তাদের আক্রমণ করলে সহজে জয়লাভ সম্ভব হত। তারপর নানা কৌশল কাজে লাগিয়ে থানার ওসিকে কাবু করে থানার গোলাবারুদ আয়ত্ব করতে হত।  গেরিলা যুদ্ধ মানে কৌশলের নানা প্রয়োগ।

জুয়েল সাদাত:  যুদ্বকালীন সময়ে কি মনে হয়েছিল যুদ্ধ জয়লাভ সম্ভব

ডা. শিশির: গেরিলা যুদ্ধ করতে প্রচুর পড়াশুনা করতে হত। আমি অনেক পড়াশুনা করেছি। যুদ্ধের ইতিহাস পড়তে হয়। আমাদের ভাষা, কৃস্টি, মানুষের দেশপ্রেম আমাদের যুদ্ধ জয়ের উৎসাহ জোগাত। আমাদের দাবিয়ে রাখা যাবে না  এই বিশ্বাস ছিল। বন্ধু প্রতীম দেশ ভারত আমাদের শেষের দিকে সহযোগিতা করেছে। তাই যুদ্ধটা দ্রুত শেষ হয়েছে। তবে তাদের সহযোগিতা ছাড়াও আমরা যুদ্ধ জয় করতে পারতাম, একটু সময় লাগত। আর পাকিস্তান বাহিনী মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল তাদের সৈন্যদের নিরাপত্তার জন্য। সেখানেও রাজনীতি থাকতে পারে। তবে আমি বা আমরা জয়ি হব এই আত্মবিশ্বাস কাজ করত।

জুয়েল সাদাত: মুক্তিযুদ্ধা, ভুয়া মুক্তিযোদ্বা রাজাকার সম্পর্কে কিছু বলেন।

ডা. শিশির: আমি আমার থানার ৩৯ নং মুক্তিযোদ্ধা। পূর্বের ৩৮ জন কোথায় যুদ্ধ করেছেন জানা নাই। সঠিক মুক্তিযুদ্বার তালিকা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা নানা রাজনৈতিক কারণে হয়নি। তবে তা করা সম্ভব। অনেকেই যুদ্ধ না করেই মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেন। যা দুঃখজনক। প্রকৃত মুক্তিযোদ্বারা কিছু পাবার জন্য যুদ্ধ করেননি।

আমরা রাজাকার আল বদরদের বুঝিয়েছি, বলেছি এই নাও স্টেনগান পাকিস্তানীদের হাতে মারা যাব কেন?  তোমরা আমাদের মার। জনে জনে বুঝিয়ে তাদেরকে নিয়েই  আমাদের যুদ্ধের জন্য এগোতে হয়েছে। দেশের ভেতরের শত্রুরাই আমাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তাই তাদের জন্য বেশী সময় ব্যয় করতে হয়েছে। এবং পুরো মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে বেশী ড্যামেজ তাদের মাধ্যমেই হয়েছে।

জুয়েল সাদাত: যুদ্ধ পরবর্তি সময়ে আপনার কি ভূমিকা ছিল?

ডা. শিশির: দেশ স্বাধীন হবার পর আমাদের লিডার সম্বোধন করা হত। আমাদের সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া হল দেশ পুনর্গঠনে। আমরা রাজাকারদের আলবদরদের কাজে লাগালাম। বললাম যদি কারও ঘরে লুটের মাল পাওয়া যাবে তার জন্য কঠিন শাস্তি। দু'সপ্তাহের মধ্য হিন্দুদের বাড়ি ঘর পুননির্মাণ করে দেয়া হল। অনেকেই ফিরে এসে টিনের ঘর পেয়ে গেল। যাদের টিনের ঘর ছিল না অতীতে। তখন বড়লোকদের নিকট থেকে ২০০ টাকা চাঁদা নিয়ে এই কাজটা আমরা করে দেই। গমের সিড দেই, অনেকেই কৃষিতে মনোনিবেশ করেন। আমাদের এলাকাটাকে পুনর্গঠন করি।  আমি বলেছিলাম আমার ছেলেদের  রাজাকারদের পিটাইতে পারবে, জানে মারা যাবে না।  তাদের দেশ পুনর্গঠনে কাজে লাগাই। তারপর আমি ঢাকা মেডিকেলে পড়তে চলে যাই। সেখানে তখন অবাধে নকল হত। আমি স্যারদের বলি, আমরা মেধাবী ছাত্র আমাদের সহপাটিরা কেন নকল করবে। তারপর নকল বন্ধ হয়ে। সেখানে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখি। তারপর আমি বিপুল ভোটে জেনারেল সেক্রটারি নির্বাচিত হই। অভিষেকের টাকা বাঁচিয়ে ২০০০ গাছ লাগাই। যা আজও কালের সাক্ষী।  দেশ গঠনে গ্রামে ও ঢাকায় জড়িত ছিলাম  নানাভাবে।

জুয়েল সাদাত: যুদ্ধ পরবর্তি বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের তিন বছর কেমন ছিল।

ডা. শিশির: আমাদের দেশের যুদ্ধ পরবর্তি সময়টাতে কিছু টানাপোড়ন ছিল। সর্বহারা পার্টি ও সিরাজ সিকদার অন্য মোটিভ ছিল। আবার জাতির জনকের ক্লিয়ার কনসেপ্ট ছিল কিভাবে বাংলাদেশের মানুষের মুখে হাসি ফুটানো যায়। বঙ্গবন্ধু তার দৃঢ়তায় একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তুলেছেন। আমেরিকা আমাদের কোন সময় সহযোগিতা করেনি, উল্টো বটমলেস বাস্কেট বলেছিল। আজ সেই বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। জাতির জনক তার দৃঢ়তায় দেশকে গড়ে তুলেছিলেন। যদিও তিনি তা শেষ করে যেতে পারেন নি। অনেকেই ভেবেছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী যাবে না। অনেক মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছিল উনার শাসনামলে। তবে তিনি দেশকে অনেক কম সময়ে গড়ে তুলেছিলেন। কম  সময়ে সংবিধান রচনা, নিবার্চন দেয়া, রাস্তা ঘাট  ব্রিজ কালভার্ট সবাই কিছুই করতে পেরেছিলেন নিজের দৃঢ় চেতনা নিয়ে।

জুয়েল সাদাত: যুদ্ধ পরবর্তি কালে দেশ গঠনে সাধারণ মানুষদের কি ভূমিকা ছিল।

ডা. শিশির: বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করায় বাংলাদেশ এক বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি হয়। তারপর যারা ছিলেন, তারা নিজেদের মেধা মনন কাজে লাগিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা দাড় করান। সাধারণ মানুষ দেশ গঠনে সক্রিয় ভুমিকা রাখে। মুক্তিযোদ্বার অস্ত্র আত্মসমর্পণ করে দেশের নানা কাজে মনোনিবেশ করেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত স্বাধীন দেশটাকে সকলে গড়ে তুলেন। 

জুয়েল সাদাত: আপনার সাথে যুদ্বের প্রানবন্ত গল্প শুনে মনে হচ্ছে এ রকম কখনও শুনিনি আগে। আপনার উচিত বই লেখা। সাধারণ যুদ্ধের গল্প, গেরিলা যুদ্ধের গল্প, নানা ট্রেনিং এর গল্প। আপনার অনেক বেশি বেশি লেখা উচিত।

ডা. শিশির:  জি। আমার হাতে এখন অনেক সময়। আমি লিখব৷ সিরাজুল আলম খান ও হাসানুল হক ইনু বেঁচে আছেন। আমার লেখা গুলোর ঘটনার তারা জীবন্ত উদাহরণ। আমি ক্যাস্পে গান গাইতাম তারা শুনেছেন। একবার প্রধানমন্ত্রীর সামনে তাদের সাথে দেখা তখন সেই ক্যাস্পের গল্পের কথা উঠে আসে। তারা আমার লম্বা দাড়ি দেখে চিনতে পারেন নি। আমি শিঘ্রই লিখতে শুরু করব।

জুয়েল সাদাত: আপনি কবে আমেরিকা আসেন। ধর্মীয় ব্যাপারে আপনার সিরিয়াসনেস কবে থেকে।

ডা. শিশির:  আমি ৭৭ সালে আমেরিকা আসি। আমার মা নামাজ কালামের ব্যাপারে খুব আপোষহীন ছিলেন। নামাজ না পড়লে ভাত দিতেন না। আমি  আমেরিকায় এসে ব্যাপক পড়াশুনা করে তাবলিগে জড়িয়ে যাই৷ আমি চারমাস না পুরো সাত মাস তাবলিগে এক নাগাড়ে ছিলাম। আমি অনেক দিন হসপিটালে ও প্রাকটিসের বাহিরে ছিলাম। যখন আমার হসপিটালের চাকরি চলে যাবার নোটিশ আসে তখন আমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসি।

জুয়েল সাদাত: আপনাকে দেখা গেছে ভাল গান গাইতে পারেন, আবার একজন গেরিলা যুদ্ধা। আবার আপনাকে দেখা গেল তাবলিগ জামাতে জড়িত। একটু বলবেনঅনেক গুলো মসজিদ তৈরি করেছেন।

ডা. শিশির: আমি স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের ঢাকা মেডিকেল থেকে পাস করে  ডাক্তারি পেশায় মনোনিবেশ করি । তারপর ১৯৭৭ সালে আমেরিকায় আসি। তখন এখনকার মতো বিদেশে আসা সহজ ছিল না। সরকারি ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যেত না। তারপর ৮৭ সালে ওরলান্ডো ( ফ্লোরিডা)   আমেরিকা আসি। যেখানে আমার জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটালাম। গ্যাস্ট্রোলজির উপর ডিগ্রি নিলাম। সাথে সাথে দাওয়াতে যোগ দেই। তাবলিগ জামাতে যোগ দেই  জীবনের পরিবর্তন আসে। তারপর গান টান আর গাওয়া হয় না। অনেক মসজিদ মাদ্রাসা তৈরি করি।  দাওয়াতের জন্য সারা আমেরিকা ঘুরে বেড়াই। আলহামদুলিল্লাহ আজ গ্রেটার ওরলান্ডোতে ছোট বড় ৩৮ টি মসজিদ। একটা মজার ঘটনা বলি,  ওরলান্ডো জামে মসজিদ যেটা ডিজনি এরিয়াতে, সেটা আমার যখন মাত্র ৫০ জন্য মুসল্লি ছিলাম এই শহরে তখন ১ লাখ ডলারে জায়গা কিনে সর্বমোট ৬ লাখ ডলারে তৈরি করি। ৬০০ জনে নামাজ পড়ার জন্য বানাই। অনেকে আমাকে বলে এত নামাজি হবে না। আপনি জানেন এখন সেই মসজিদটাই আমরা ৫ হাজার মুসল্লির জন্য বানাচ্ছি।

জুয়েল সাদাত: শুনেছি আপনার গ্রামের বাড়িতে অনেক বড় কারিগরি মাদ্রাসা করেছেন।

ডা. শিশির:  আসলে আমার বড় ভাই যিনি আজ আমাদের মাঝে নাই। উনি শুরু করেছিলেন। পরবর্তিতে আমরা সব ভাই বোন এটাকে বড়ো করেছি। আমি এটার সাথে বেশী সম্পৃক্ত। অনেক বৃহৎ এলাকা নিয়ে মাদ্রাসা। যা রাজশাহী বিভাগের একটি আইডল প্রতিষ্ঠান। সেখানে হাফিজদের কারিগরি ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে ৪০ জন শিক্ষকদের জন্য অ্যাপার্টমেন্ট বানিয়ে দিচ্ছি। তারা পরিবার পরিজন নিয়ে মাদ্রাসায় থাকবেন, ছাত্রদের পড়াশুনাটাও ভাল হবে। যা বাংলাদেশে প্রথম। শিক্ষকরা ফ্রি থাকার বাসস্থান পাচ্ছেন। পুরো প্রজেক্টটি বিশাল এলাকা জুড়ে। এখানে আমি একটি আন্তর্জাতিক মানের লাইব্রেরি করব, যা হবে রাজহাশী বিভাগের অন্যতম। অনেক বই কেনা হচ্ছে। ভবিষ্যতে হাজার হাজার কোরআনে হাফেজ বের হবেন, উচ্চতর শিক্ষা নিয়ে। বর্তমানেও হাফেজ বের হচ্ছেন। পুরো কমপ্লেক্সটা বিরাট এলাকা জুড়ে।

জুয়েল সাদত: আপনি হোপ ফাউন্ডেশনের সাথে যুক্ত আছেন, কি কি কাজে আপনারা জড়িত।

ডা. শিশির: আমার প্রিয় মানুষ, ডাক্তার ইফতেখার মাহমুদ হোপ ফাউন্ডেশন তৈরি করেন ১৯৯৮ সালে। আমি এটার বোর্ড অব ডাইরেক্টর। কক্সবাজার ও রামুতে আমাদের ৪০ বেডের হসপিটাল আছে। আমরা রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করছি। ডাক্তার ইফতেখার আমাকে বড় আকারে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন। হোপ ফাউন্ডেশেনর সাথে ১৬০০ ডাক্তার নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী জড়িত।

জুয়েল সাদাত: আপনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক। একটু যদি বলেন।

ডা. শিশির: শেখ কামালের সহপাটি হিসাবে সম্পর্কটা অনেক কাছের। যখনই তিনি আমেরিকায় আসতেন আমার তত্বাবধানেই উনার চিকিৎসা হত। একবার উনার গল্ডব্লাডার  অপারেশন হল, উনার ইচ্ছানুযায়ী আমি অপারেশন থিয়েটারে ছিলাম। সারা রাত পাশেই ছিলাম। শেখ রেহানা তখন শেখ হাসিনাকে জানান আমি বাড়ি যাইনি সারা রাত পাশে ছিলাম ৷ ভাইয়ের মতো সম্বোধন করেন। আমি গ্যাস্ট্রোলজির ডাক্তার একবার আপাকে বললাম, বাংলাদেশে গ্যাস্ট্রোলজির একটি বিশেষ হসপিটাল করতে পারলে ভাল  হত। তখন তিনি বলেছিলেন যদি সরকারে যাই তখন করব৷ তারপর ২০০৮ সালে তিনি  সেটার কাজ শুরু করেন। আমি এর শুরু থেকে জড়িত ছিলাম ৷ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমাকে থাকতে হয়েছিল। আপনারা জেনে আনন্দিত হবেন, সেই হসপিটালটা ভাল চলছে। বৃটিশ একটি টিম সম্প্রতি ভিজিট করে এটাকে লন্ডনের চাইতেও ভাল বলে রিপোর্ট করেছেন।

আমি যেহেতু দীর্ঘদিন থেকে উনার শারীরিক সুস্থতা অসুস্থতা নিয়ে নিবেদিত। তাই তিনি আমার পরামর্শকে গুরুত্ব দেন। সেভাবেই আমার পরামর্শে  আলহামদুলিল্লাহ তিনি ভাল আছেন। আপনারা জেনে খুশি হবেন উনার বড় কোন শারিরীক অসুবিধা না।

জুয়েল সাদাত: একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে দেশের বর্তমান উন্নতিকে কিভাবে দেখেন। মুক্তিযোদ্বাদের ভাতা বেড়েছে কেমন বোধ করেন?

ডা. শিশির: স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে দেশের আশাতিত উন্নতিতে মনে হয়ে স্বাধীনতার সুফল আমরা পেয়ে গেছি। যা দেখে আমি নিজে গর্বিত। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের নিকট রোল মডেল। মুক্তিযোদ্বাদের ভাতা বেড়েছে, আজ মুক্তিযোদ্ধারা  নিজেকে অসহায় বোধ করেন না। তারা গৃহঋণ পাচ্ছেন। নানা রকম পন্থায় মুক্তিযোদ্বাদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে, সেটা দেখে আনন্দিত হচ্ছি। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে।

জুয়েল সাদাত:  আপনার নিকট বাংলাদেশের এই মুহূর্তে বড়ো সমস্যা কি?

ডা. শিশির: আমাদের দেশের ডেভেলপমেন্ট দেখে বিশ্বের অনেক দেখ স্তম্ভিত। জাতীসংঘ বাংলাদেশের উন্নতিকে রুল মডেল হিসাবে দেখাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক- জাতিসংঘ এর কাছে বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনার নাম। তবে এখন নতুন প্রজন্মকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করতে হবে। যদি দুর্নীতিকে কমিয়ে আনা যায় তাহলে দেশ আরো এগিয়ে যাবে। দুর্নীতি বর্তমানে অসহনীয় পর্যায়ে, সেটাকে জিরো টলারেন্স নিয়ে আনতে হবে। তবে সম্ভাবনার বাংলাদেশ। আমাদের দেশটা আসলেই সোনায় মোড়ানো। সোনার বাংলায় সোনা ফলতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের একটি পজেটিভ রোল মডেল।

জুয়েল সাদাত - আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি?

ডা. শিশির: আমি এই বছরের শেষের দিকে বাংলাদেশে যাব। স্থায়ী ভাবে বসবাস করার ইচ্ছা। সেখানে অনেক কাজ, অনেক বড় বড় প্রজেক্ট অসমাপ্ত সেগুলোতে মনোনিবেশ করব। দেশের মাটিতে শেষ জীবন কাটাতে চাই। একটি গান আছে " তোরা দে না, দেনা, সেই মাটি আমর অঙ্গে " আমি সেই মাটিতেই ফিরে যেতে চাই। আমি আমার পিতা মাতার কবরের পাশেই থাকব। আমর জন্য দোয়া করবেন। যদি নিজের অজান্তে কোন ভুল ভ্রান্তি হয়ে থাকে তার জন্য ক্ষমা চাচ্ছি। 

জুয়েল সাদাত: আপনাকে ধন্যবাদ।

ডা.শিশির:  আপনাকেও ধন্যবাদ। আল্লাহ হাফেজ।

লেখক: জুয়েল সাদাত, সাংবাদিক কলামিস্ট, আমেরিকা, ফ্লোরিডা

  বিজয়ের ৫০ বছর

পক্ষিকূলের ভ্রমণবৃত্তান্ত



বিভোর বিশ্বাস, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
বাইক্কা বিলে ডানা মেলেছে পরিযায়ীর দল। ছবি: এবি সিদ্দিক

বাইক্কা বিলে ডানা মেলেছে পরিযায়ীর দল। ছবি: এবি সিদ্দিক

  • Font increase
  • Font Decrease

আদিকাল থেকেই পাখিদের সাময়িক অন্তর্ধান ও পুনরায় আবির্ভাবের রেওয়াজ রয়েছে; যা আজও মানুষের কাছে রহস্যময়। ধারণা করা হয়, পাখিদের স্থানান্তর শুরু হয় প্রায় ৫ কোটি বছর আগে।

অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত যখন শীতকালে পাখিদের তাদের স্ববাসে দেখা যেত না; তখন মানুষ মনে করত, পাখিরা শীতকালটা পানির নিচে ডুব দিয়ে অথবা সরীসৃপের ন্যায় গর্তে কাটায়। পরে বিজ্ঞানীরা মানুষের ভুল ভাঙতে সক্ষম হন। পাখিরা পরিবেশগত চাপে, আরামদায়ক পরিবেশের আশায় ও জিনগত নিয়মের কারণে দেশান্তরী হয়।

কোনো কোনো তত্ত্বমতে, পাখিদের উৎপত্তি হয়েছিল উত্তর গোলার্ধ্বে এবং প্লায়োস্টোসিন সময়ের হিমবাহ তাদের বাধ্য করেছিল দক্ষিণে আসতে আর সে অভ্যাসগত কারণেই পাখিরা আজও দক্ষিণে আসে।

অন্য এক তত্ত্বমতে, পাখিদের আবির্ভাব দক্ষিণ গোলার্ধ্বেই; তবে খাদ্যের প্রাচুর্য ও অন্যান্য অনুকূল পরিবেশের কারণে তারা সেখানে চলে যায়। পূর্বপুরুষের ভিটায় তারা প্রতিবছর একবার আসে। তবে পাখিদের প্রথম আবির্ভাব যেখানেই হোক না কেন; বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, খাদ্য ও পরিবেশগত সুবিধার জন্য তারা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেশান্তর হয়।

বস্তুত প্রচণ্ড শীতে স্ববাসে যখন বাঁচা-মরার প্রশ্ন দেখা যায়, দেখা দেয় খাদ্য ও আশ্রয়ের চরম সঙ্কট; তখন শীতপ্রধান দেশের পাখিরা অতিথি হয়ে আসে আমাদের দেশে। হিমালয়, সাইবেরিয়া, আসাম, ফিলিপাইন্স, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ পশ্চিম চীনের মালভূমি, রাশিয়া, ফিনল্যান্ড, তিব্বতের উপত্যকা প্রভৃতি অঞ্চল থেকে প্রতিবছর শীতের প্রকোপে পাখিরা এখানে আসে।

পরিযায়ী পাখিদের একত্রিত উড্ডয়ন। ছবি: এবি সিদ্দিক

একটু উষ্ণতা, আর্দ্রতা ও শ্যামলিমার আশায় হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে চলে আসে পরিযায়ীরা। খুঁজে নেয় নির্জন স্থান, জলাশয় ও বনাঞ্চল।

দুর্ভাগ্যজনক হলো, এ সকল পরিযায়ী পাখিরা এদেশে অতিথি হয়ে থাকতে পারছে না; এক শ্রেণীর শিকারীর হাতে তারা শিকার হচ্ছে। পাখিরা মানুষের কাছে একসময় বিস্ময় হিসেবে থাকলেও আজ তা কারও কারও কাছে সৌখিন খাবারে পরিণত হয়েছে। অতিথি পাখি শিকার করা হলে ভবিষ্যতে হয়তো এদের আসা চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে প্রায় ছয় শতাধিক প্রজাতির পাখি রয়েছে, এর মধ্যে দুই শতাধিক প্রজাতির রয়েছে দেশান্তরী বা পরিযায়ী পাখি। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এসব পাখি ৩/৪ মাসের জন্য আশ্রয় নেয়। উড়ে বেড়ায় হাওর, বিল ও বিভিন্ন জলাশয়ে। রক্ষা করে পরিবেশের ভারসাম্য।

 

  বিজয়ের ৫০ বছর

;

পরিযায়ীরা এসেছে অনেকটা পথ পেরিয়ে



বিভোর, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
ডানায় আকাশ দখল করে রেখেছে লেঞ্জা হাঁস। ছবি: এবি সিদ্দিক

ডানায় আকাশ দখল করে রেখেছে লেঞ্জা হাঁস। ছবি: এবি সিদ্দিক

  • Font increase
  • Font Decrease

পাখিরা কেন ‘পরিযান’ করে -এর সঠিক কারণ এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে বিজ্ঞানীরা কিছু তত্ত্ব উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছেন। অনেক গবেষক বিভিন্ন ধরনের উপাত্ত আবিষ্কার করেছেন। যে কারণই থাকুক না কেন শীত আসলে পাখিরা আসবেই -এটাই নিয়ম। প্রধানত শীতের হাত থেকে বাঁচতেই পাখিরা পরিযান করে। পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের দেশগুলো অর্থাৎ সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, রাশিয়াসহ অন্যান্য অঞ্চলে শীত যখন জেঁকে বসে তখনই পাখিরা পরিযান করে উষ্ণ এলাকার দিকে চলে আসে।

আবার উষ্ণ এলাকায় গরম পড়ার আগেই তারা ফিরে যায় উত্তরের দিকে। শীত আসতে না আসতেই সুদূর তিব্বত, মালয়, সাইবেরিয়া, লাইবেরিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা ও অষ্ট্রেলিয়া থেকে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে আমাদের এই চির সবুজের দেশে এরা আসে।

এরা আসলে ‘পরিযায়ী পাখি’ (মাইগ্রেটরি বার্ড)। মানুষের বেঁধে দেয়া সীমানা ডিঙিয়ে পাখিরা ছড়িয়ে পড়ে। গোটা পৃথিবী যেন তাদের এক দেশ, এক ঘর এখানে কোন বন্ধন নেই। পাখিরা আসে মনের সুখে। এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে তাদের তো আর অনুমতি লাগে না।

প্রকৃতি তখন তাদের আগমনের প্রত্যাশায় প্রহর গুণতে থাকে। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিদের দেখে কে না মুগ্ধ হয়। কত বাহারি রঙের পাখি! বাংলার নদ-নদী বিল-ঝিল হাওর-বাওর পাখিদের যে খুব চেনা-জানা, কতই না ভালবাসার অনুভূতি প্রকাশ করে কলকাকলিতে। হাওর-বাওর, বিল-ঝিল, জলাশয়ে যেন উৎসব লেগে যায়। চার ধারের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দিয়ে মধুর কাকলিতে পাখিরা মুখর করে তুলে। পাখিরা ভেসে বেড়ায় পানির উপরে আর দোল খেতে থাকে ঢেউয়ের তালে তালে। কী অপরূপ দৃশ্য!

 আপন মনে উড়ছে টিকি হাঁস। ছবি: এবি সিদ্দিক

প্রতিবছর ঠিক একই সময়ে গৃহ থেকে যাত্রা শুরু করে আবার ভ্রমণ শেষে একই স্থানে একই দিনে ফিরে আসে। ব্যাপারটি বিজ্ঞানীদের ভাবিয়েছে যুগের পর যুগ। কীভাবে ঘটে প্রক্রিয়াটি। বছরের ঠিক কোন সময়ে দেশান্তরে যেতে হবে, আবার ঠিক কখন ফিরতে হবে। তা তারা বুঝে কীভাবে? আকাশের বুকে পাথটাই বা চিনে রাখে কেমন করে! বিস্ময়ের অন্ত নেই।

আকাশ পথে তাদের গতিবেগ ঘণ্টায় ৫০ থেকে ৬০ মাইল। তখন এই চর্বি খাদ্য হিসেবে কাজ করে। তারা এক নাগাড়ে ৯০ থেকে ১২০ ঘন্টা পর্যন্ত ওড়ে। বিজ্ঞানীরা রাডার যন্ত্রে দেখেছেন পাখিরা দেশান্তর হয় আকাশের ৫ হাজার ফুট থেকে ১০ হাজার এমনকি ১৫ হাজার ফুট উঁচু দিয়ে।

শীতে আমাদের দেশে যে সমস্ত পরিযায়ী পাখিরা আসে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: লেঞ্জা হাঁস, টিকি হাঁস, পিয়াং হাঁস, সিঁথি হাঁস, খুস্তে হাঁস, রাজ সরালি হাঁস, নাকটা, চখাচখি, বালি হাঁস, মেটে হাঁস, বাঙ্গি হাঁস, গিরিয়া হাঁস প্রভৃতিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি রয়েছে। এরা উড়ে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকির হাওর, বাইক্কা বিল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় জলাশয়, ছোট-বড় নদীর মোহনায় ইত্যাদি স্থানে।

  বিজয়ের ৫০ বছর

;

শিল্প পরিবারের শিল্পিত জীবন



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
শিল্প পরিবারের শিল্পিত জীবন

শিল্প পরিবারের শিল্পিত জীবন

  • Font increase
  • Font Decrease

উৎসব-পার্বণ ছাড়াও প্রায় প্রতি সপ্তাহে বাড়িতে বসে গানের আসর। তিনি গান করেন, গিটার আর স্যাক্সোফোন বাজিয়ে তাকে সংগত করেন দুই ছেলে। বড় ছেলে গিটারের সঙ্গে গানও করেন। সেজো জন স্যাক্সোফোনে তোলেন মোহনীয় সুর। চতুর্থ জন কবিতা আবৃত্তি করেন। পঞ্চম ছেলে কবিতাপ্রেমী এবং কবি। সাত ছেলে ও তাদের স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে যৌথ বসবাস। এমন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব আর পারিবারিক বন্ধন যার, তিনি হলেন দেশের খ্যাতনামা শিল্প গ্রুপ পিএইচপি গ্রুপের চেয়ারম্যান সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।

মাইজভান্ডারি গানের ভক্ত এই শিল্পপতির বাড়িটি যেন মরমি সংগীত লালন, মাইজভান্ডারি আর কাওয়ালি গানের কেন্দ্র। তার বাড়িতে নিয়মিতই ভক্তিমূলক গানের আসর বসে। পরিবারের সব সদস্যের পাশাপাশি ঘনিষ্ঠজনদের অনেকেই উপস্থিত থাকেন সেই আসরে। ‘মন অহংকারে দিন কাটালি মানুষ হবি কেমন করে। তোর সাধন ভজন নষ্ট হইল, হিংসা নিন্দা অহংকারে’-কবিয়াল রমেশ শীলের এ গানটি সুযোগ পেলেই গেয়ে শোনান সুফি মিজান।

শিল্পপতি মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে সুফি উপাধি দেওয়া হয় প্রায় ২৫ বছর আগে। আল্লামা রুমী সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আহমদুল হক তাকে এই উপাধি দেন বলে জানা যায়।

দেশের সেরা শিল্পগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পিএইচপি। ২৯টি শিল্প প্রতিষ্ঠান নিয়ে গড়া গ্রুপটির টার্নওভার বছরে ৪ হাজার কোটি টাকা। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার সুফি মিজানুর রহমান। সাত ছেলেকে দিয়েছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব।

এমন বর্ণাঢ্য জীবন যার, তার শুরুটা হয়েছিল ১০০ টাকা বেতনের চাকরি দিয়ে। কিন্তু মেধা, পরিশ্রম আর নিষ্ঠার অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে তুলেছেন পিএইচপি, যার মানে হলো শান্তি, সুখ ও সমৃদ্ধি (পিস, হ্যাপিনেস, প্রসপারিটি)। এই তিন শব্দের অনুপ্রেরণা সঙ্গে নিয়ে বাবা ও ছেলেরা মিলে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এমন বড় ও স্বনামখ্যাত শিল্প গ্রুপটিকে। একই সঙ্গে মাইজভাণ্ডারি ও মরমি সংগীতকে অমর ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য কাজ করে চলেছেন সুফি মিজান ও তার সন্তানেরা।

আবদুল গফুর হালির মতো অসাধারণ গীতিকার ও সুরকার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সুফি মিজানের সান্নিধ্য পান। তার সব সৃষ্টিকে অমর করার জন্য নানামুখী উদ্যোগ নেন সুফি মিজান। গফুর হালির গান সংরক্ষণ করা, শিল্পীদের দিয়ে নতুন করে গান গাইয়ে নেওয়ার মতো অতিপ্রয়োজনীয় কাজটি করা ছাড়াও সুফি পরিবার মরমি শিল্পী কবিয়াল রমেশ শীলের সৃষ্টিকেও অমরত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। চট্টগ্রামের এই শিল্পীর গানগুলোও সংরক্ষণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে পরিবারটি।

বাংলা লোকগানের অন্যতম ধারা চাটগাঁইয়া গানের কিংবদন্তি গীতিকার, সুরকার শিল্পী গফুর হালি তার ‘চাটগাঁইয়া নাটক সমগ্র’ গ্রন্থে ‘তুলনাহীন মানুষ শিরোনামে’ লেখা একটি কবিতায় এই শিল্পপতি সম্পর্কে লিখেছেন, ‘আমি একজন মানুষকে চিনি/মনুষ্যত্বের সব গুণ যার কাছে বিদ্যমান/আমার সেই প্রিয় মানুষটির নাম/আলহাজ্জ শাহ সুফি মিজানুর রহমান।’

গফুর হালি ও আঞ্চলিক গানের গবেষক সাংবাদিক নাসির উদ্দিন হায়দার সুফি মিজানুর রহমান সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, ‘সুফি সাহেব সেই ছোটবেলা থেকেই গানের সঙ্গে য্ক্তু ছিলেন। একসময় রেডিও-টিভিতেও গিয়েছিলেন। তবে তিনি চট্টগ্রামে আসার পর মাইজভান্ডারির খলিফা আবদুস সালাম ইছাপুরীর মুরিদ হন। আর তখন থেকেই তিনি মাইজভান্ডারি গানের প্রতি দরদি হয়ে ওঠেন। মাইজভান্ডারি গান শোনা, এই গানের শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা করা, যন্ত্রসংগীত শিল্পীদের সহায়তা করা এসবই করছেন তিনি। সুফি সাহেবের কাছ থেকে প্রায় অর্ধশত শিল্পী সম্মানী পেয়ে আসছেন।’

কারখানায় লোহা গলিয়ে স্টিল নির্মাণ কিংবা কাচ তৈরিতে দেশের কিংবদন্তি হওয়ার পথে থাকা এই শিল্প পরিবার শিল্প উৎপাদনে যেমন ব্যস্ত, তেমনিভাবে নিজেদের জীবনযাপনকে শিল্পিত করে তুলতে সমান মনোযোগী। গান-বাজনার পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধনের অনন্য উদাহরণও এ পরিবারটি। পাশাপাশি দুটি ভবনে সুফি মিজানুর রহমানসহ সাত ছেলে তাদের পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। পরিবারের সব সদস্য একসঙ্গে খাবার খেতে রয়েছে ২০ চেয়ারের ডাইনিং টেবিল। যেখানে সুফি মিজানুর রহমান ও তাহমিনা রহমান দম্পতি সব ছেলে ও তাদের স্ত্রী-সন্তাদের সঙ্গে নিয়ে খাবার খেয়ে থাকেন।

বড় শিল্পপতি হলেও কারও সঙ্গে দেখা হলেই দীর্ঘ সালাম দিয়ে শুভেচ্ছা জানান সুফি মিজান। এ মানুষটি নিজে খাওয়ার চেয়ে খাওয়াতেই বেশি ভালোবাসেন। অতিথি আপ্যায়নে তার জুড়ি মেলা ভার। তার প্রিয় খাবারের তালিকায় রয়েছে করলা ভাজি, ইলিশ মাছ, কই মাছ ও ছোট মাছ। খাওয়ার আগে ও পরে দুই দফা মোনাজাত করে মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, গান-বাজনা, হজ-জাকাত, খেলাধুলা, চিকিৎসাসেবা, এতিমখানাসহ সব ক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এ জন্য সুফি মিজান ফাউন্ডেশন নামে একটি সংস্থাও গঠন করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে সমাজসেবায় কাজ করে আসা সুফি মিজানুর রহমানকে ২০২০ সালে একুশে পদক দেওয়া হয়।

নিজে সুমধুর কণ্ঠে পবিত্র কোরআন যেমন তেলাওয়াত করতে পারেন, তেমনিভাবে মোয়াজ্জিন ও নামাজের জামাতে ইমামের দায়িত্বও পালন করতে পারেন এই শিল্পপতি। ধর্মীয় এসব আয়োজন সুন্দরভাবে করতে পারা ৮০ বছর বয়সী গুণী এই মানুষটির জন্ম হয়েছিল ১৯৪৩ সালের ১২ মার্চ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে। স্থানীয় ভারত চন্দ্র বিদ্যালয় থেকে ১৯৬১ সালে এসএসসি, ১৯৬৩ সালে সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একই কলেজ থেকে পরে তিনি বিকম ও ব্যাংকিং বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি নেন। ছাত্রাবস্থায় এইচএসসি পাসের পরপরই তিনি নারায়ণগঞ্জের জালাল জুট মিলে ১০০ টাকা বেতনে চাকরি দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। ১৯৬৫ সালে তিনি তৎকালীন ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান (বর্তমানে সোনালী ব্যাংক) চট্টগ্রামের লালদীঘি শাখায় জুনিয়র ক্লার্ক হিসেবে যোগ দেন। এই ব্যাংক ছেড়ে ১৯৬৭ সালে যোগ দেন তৎকালীন মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেড (বর্তমানে পূবালী ব্যাংক) খাতুনগঞ্জ শাখায় ৮০০ টাকা বেতনে। বৈদেশিক বিভাগের ব্যবস্থাপক হিসেবে যোগদান করে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি ওই ব্যাংকেই কাজ করেন। আর এ শাখায় কাজ করতে গিয়েই দেশের বিভিন্ন ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সুফি মিজান ব্যবসা শুরু করেন। গড়ে তোলেন শিল্পকারখানা। প্রথমে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড, পরে রি-রোলিং মিল, ঢেউটিন, কাচ তৈরি, মালয়েশিয়ান ব্র্যান্ডের প্রোটন গাড়ি কারখানা থেকে শুরু করে বর্তমানে ২৯টি শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার।

ব্যক্তি সুফি মিজানুর রহমান ও তাহমিনা রহমান দম্পতির সাত ছেলে ও এক মেয়ে। এই সাত ছেলের প্রথম তিনজন যথাক্রমে মোহাম্মদ মহসিন, মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন ও মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক পড়াশোনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। পরের চারজন যথাক্রমে মোহাম্মদ আলী হোসেন সোহাগ, মোহাম্মদ আমীর হোসেন সোহেল, মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম রিংকু ও মোহাম্মদ আকতার পারভেজ হিরু পড়েছেন অস্ট্রেলিয়ায়। একমাত্র মেয়ে ফাতেমা তুজ জোহরা।

বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে যেখানে তরুণরা এখন বিদেশেই স্থায়ী হয়ে যান, সেখানে সুফি মিজানুর রহমানের সব ছেলে দেশে ফিরে এসেছেন। বাবার সঙ্গে ব্যবসায় হাল ধরেছেন। বাবা ও সাত ছেলের সম্মিলিত মেধা ও পরিশ্রমে এগিয়ে গেছে পিএইচপি গ্রুপ। ব্যবসায় ক্রান্তিকাল এলেও তাদের সম্মিলিত প্রয়াসে তা ঠিকই সব উতরে যায়।

ছেলেদের সম্পর্কে বাবা সুফি মিজানুর রহমানের মন্তব্য, ‘আমার সাত ছেলে সাতটি সোনার টুকরো।’

বাবাদের কাছে সন্তান সব সময় সোনার টুকরোই হয়ে থাকে। কিন্তু সুফি মিজানের সন্তানরা প্রকৃতপক্ষেই ব্যতিক্রম। বাবার বিনয়ী আচরণ সব সন্তানের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। তারা যেমন সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন, তেমনি মানবিক গুণাবলী ও সমাজসেবায়ও বাবার মতো।

এসবের বাইরেও তাদের রয়েছে শৈল্পিক মন। বাড়িতে যখন গানের আসর বসে, তখন গিটারে সুর ছড়িয়ে গান করেন বড় ছেলে মোহাম্মদ মহসিন। বড় ছেলে যখন গিটার বাজান, তখন সেজো ছেলে আনোয়ারুল হক স্যাক্সোফোনে সুর তোলেন। পঞ্চম ছেলে আমির হোসেন কবিতাপ্রেমী। নিজেও কবিতা লেখেন। চতুর্থ ছেলে আলী হোসেন কাজী নজরুল ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা আবৃত্তি করেন দারুণ ছন্দে।

সৌজন্য: দেশ রূপান্তর

  বিজয়ের ৫০ বছর

;

জানকিছড়ার উঁচু ডালে ‘জার্ডনের বাজ’



বিভোর বিশ্বাস, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
ডালে বসে রয়েছে ডর্জানের বাজ। ছবি: সাঈদ জামাল

ডালে বসে রয়েছে ডর্জানের বাজ। ছবি: সাঈদ জামাল

  • Font increase
  • Font Decrease

জানকিছড়া বিটের উঁচু গাছের উপর এক অচেনা পাখি। এই বিট শ্রীমঙ্গল উপজেলার সংরক্ষিত একটি বন। পাখিটি ডালের উপর বসেই রইল। খুব ভালোভাবে না দেখতে পারলেও মাথার উপরের ঝুঁটিকে দেখে বুঝতে অসুবিধে হলো না যে এটি ‘জর্ডানের বাজ’। সে অবসর সময় পার করছে গাছের ডালে! অথবা শিকারী চোখ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে চারদিক।

প্রথম ডর্জানের বাজ দেখার এ অনুভূতি সব রৌদ্রক্লান্ত ব্যথা ভুলিয়ে দিল। বিশেষ করে তার ঝুঁটিসৌন্দর্য মরে রাখার মতো। যা তাকে রাজার মর্যাদায় অভিসিক্ত করে রেখেছে। স্মৃতিতে নতুন পাখি দেখার সেই উজ্জ্বল সঞ্চয় নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।

বাংলাদেশের প্রখ্যাত পাখি গবেষক, লেখক এবং বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হক বলেন, ‌‌‌‘জর্ডানের বাজের ইংরেজি নাম Jerdon’s Baza এবং বৈজ্ঞানিক নাম Aviceda jerdoni। এরা মিশ্র চিরহরিৎ সবুজ বনের পাখি। শুধুমাত্র সিলেট আর চট্টগ্রামের বন ছাড়া দেশের কোথাও এদের খুঁজে পাওয়া যায় না। আমাদের প্রাকৃতিক বনগুলোর বিরামহীন ধ্বংসের মাঝে যে কয়টা জর্ডানের বাজ এখানো টিকে আসে এগুলো আমাদের জন্য অমূল্য ধন। আমি নিজেও একটা জর্ডানের বাজ থেকে সীমাহীন উচ্ছ্বাসিত হয়ে পড়ি।’

প্রাপ্তি স্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান, রেমাকালেঙ্গা বন্যপ্রাণি অভয়ারণ্য, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, দুধ পুকুরিয়া ধোপাছড়ি বন্যপ্রাণি অভয়ারণ্য এসব ছোট ছোট বনেই ওরা এখনও একটা-দুটো কোনোক্রমে টিকে আছে। এর বেশি নেই কিন্তু। এগুলো সবই ছোট-ছোট বন, খন্ড বন; ধ্বংস হয়ে একেবারে কোনো রকম দাঁড়িয়ে রয়েছে। এখানেই এই পাখিটির বসবাস। জর্ডানের বাজ আমাদের দেশেরই পাখি। সারা বছর আমাদের দেশেই ওরা থাকে। বাসা তৈরি করে ছানা ফোটায়।’

পাতার আড়ালে পাখিটাকে ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। ছবি: সাঈদ জামাল

পাখিটির খাবার সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ওরা কীট-পতঙ্গ এবং পোকা ধরে ধরে খায়। এই সব বনগুলোর প্রকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হওয়ার ফলে এবং ব্যাপকহারে পর্যটক পরিভ্রমণের ফলে ওর খাবারও অনেক কমে গেছে। আমাদের দেশে বাজ প্রজাতির মধ্যেই এই জর্ডানের বাজটিই আমরা এখনো পাহাড়ি বনে দেখতে পারি। যদিও তার সংখ্যা অত্যন্ত কম। তবে অন্যান্য বাজগুলোকে তো দেখতেই পাই না। সে হিসেবে বলা যেতে পারে জর্ডানের বাজটাই তুলনামূলকভাবে ভালো আছে।’

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব সূত্রে জানা যায়, জার্ডনের বাজ আমাদের দেশের বিরল আবাসিক পাখি। এদের দৈর্ঘ্য ৪৮ সেমি এবং ডানার দৈর্ঘ্য ৩০.৫ সেমি। দেহ বাদামি। মাথার পেছনে খাড়া ঝুঁটির আগা সাদাটে। এরা উচু স্বরে বিড়ালের মতো : ‘পি-আউ’ কিংবা ‘কিকিয়্যা...কিকিয়্যা’ এভাবে ডাকে।

এরা চিল, শকুনের মতো মানুষের বর্জ্য খেলে বাঁচে না। শুধুমাত্র বনের পোকা-মাকড়, কীট-পতঙ্গ, ছোট ছোট সরীসৃপ খায়। এরা পুরোপুরিভাবে বনের খাদ্যের উপর নির্ভরশীল। ফলে বন যেহেতু প্রায় শেষ করে দিয়েছি আমরা তাই ধীরে ধীরে বনের উপর নির্ভরশীল পাখিগুলোও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বলে জানান এই পাখি বিজ্ঞানী।

  বিজয়ের ৫০ বছর

;