একজন ডা. শিশির, তার গেরিলা যুদ্ধের গল্প

  বিজয়ের ৫০ বছর


জুয়েল সাদাত
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

 

ডা. সিরাজুল ইসলাম। একজন অসাধারণ মানবিক মানুষ। একজন মুক্তিযোদ্ধা ট্রেইনার। ১৪০০ মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেইনিং করেছিলেছেন। শিশির ভাদুড়ি ছন্মনামে গেরিলা যুদ্ধ করেছেন। অসাধারণ দেশপ্রেমিক একজন চিকিৎসক মুক্তিযোদ্ধা। পরিবারের দুই ভাই যুদ্ধ করেছেন। ধার্মিক পরিবারে বেড়ে উঠা ডাক্তার ইসলাম তাবলিগের দাওয়াত নিয়ে সারা আমেরিকার মসজিদে মসজিদে কাটিয়েছেন। দারুণ গান গাইতে পারতেন। ওস্তাদের কাছে গান শিখেছেন। দাওয়াতি কাজে জড়িয়ে গান ছাড়েন। ফ্লোরিডায় ৬/৭টি মসজিদ তৈরি করেছেন। দান করেন হিসাব ছাড়া। বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা নিয়ে কোন আপোষ করেন না।  ছিলেন মরহুম শেখ কামালের বন্ধু।  একাধারে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসকও।

মন খুলে যুদ্ধের গল্প, জীবনের গল্প, নিয়ে কথা বলেছেন কমিউনিটি এক্টিভিস্ট সাংবাদিক কলামিস্ট জুয়েল সাদাতের সাথে।   

জুয়েল সাদাত - আপনার পড়াশুনা বা ছাত্র জীবন কেমন ছিল?

ডা. শিশির: নাটোরের গুরুদাসপুরে প্রাথমিক শিক্ষা। তারপর পাবনা জেলা স্কুলে পড়াশুনা করি। স্কুল জীবনে স্কাউট লিডার, আবৃত্তি, লেখালেখি ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জড়িত ছিলাম। তারপর ঢাকা কলেজে পড়াশুনা করি। তারপর ফাস্ট গ্রেট স্কলারশিপ নিয়ে আমরা মাত্র দুজন ইস্ট পাকিস্তান থেকে লাহোরে যাই। ঢাকা কলেজে পড়াশুনা কালীন সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে কলেজের ছাত্র সংসদের জেনারেল সেক্রেটারি হই। তখন মরহুম শেখ কামাল আমার সহপাটি ছিলেন। তিনি বলতেন, তোমরা মেধাবী পড়াশুনা করো। প্রযোজন মতো আমাদের সাপোর্ট কর। তিনি আমার নির্বাচনে আমাকে ভোট দিতে বলতেন সবাইকে। ১৯৬৯ সালে লাহোরে পড়াশুনার জন্য যাই। তারপর যুদ্ধের কারণে সেখানে থাকা সম্ভব না হওয়ায় ১৮ এপ্রিল ১৯৭১ বাংলাদেশে যুদ্ধচলাকালীন চলে আসি। যুদ্ধের পর ঢাকা মেডিকেল থেকে ডাক্তারি পাস করি।

জুয়েল সাদাত:  আপনার সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল সম্পর্ক জানতে চাই?

ডা. শিশির: পাবনা জেলা স্কুলেই আমার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জড়ানো। লেখালেখি, স্কাউটিং এর নানা একটিভিটিস, গল্প কবিতা নাটক সব কিছু শুরু স্কুল জীবনেই। তারপর ঢাকা কলেজে বড়ো পরিসরে জড়ানো। ঢাকা কলেজের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ওতোপ্রোতো জড়িত ছিলাম। সবগুলো স্টেজ শোতে আমি থাকতাম। নাটক করতাম। ঢাকার অগ্নিবিনাতে জড়িত ছিলাম।  ওস্তাদের নিকট গান শিখি।  টেলিভিশনে অনুষ্ঠান প্রযোজনা করি। স্বাস্থ্য বিষয়ক অনুষ্ঠান করতাম। ভাল গান গাইতে পারতাম। একবার আমার এক গানের উস্তাদ অসুস্থ হলেন, উনাকে বিশেষ যত্ন নিয়ে সুস্থ করে তুলি। তারপর উনি আমাকে ও অনেক যত্ন করে গান শেখান। উস্তাদ গুল মোহাম্মদসহ আরো অনেকের  সান্নিধ্যেই গানের সব মাধ্যমেই পারদর্শিতা অর্জন করি।

জুয়েল সাদাত: মুক্তিযুদ্ধে জড়ানো কিভাবে, আর কিভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেইনার হলেন?

ডা. শিশির: যখন লাহোরে ছিলাম, ২৫ মার্চের পরে একদিন হোস্টেলে আমাকে আটক করে  বলতে  থাকে  পাকিস্তান নট ফর বাংলাদেশি বাস্টার্ড। সেদিন নেপালি ছাত্ররা আমাকে মুক্ত করে। তখন তারা আমাকে মেরে ফেলতে চাইছিল। তখন প্রিন্সিপাল আমাকে বলেন  ন্যাশনাল ক্রাইসিস চলছ, তোমাদের হোস্টেলে থাকা নিরাপদ নয়। তখন অনেকেই হোস্টেল থেকে চলে গিয়েছিল। আমি যেহেতু গভর্নর স্কালারশিপে ছিলাম,  তখন তারা আমাদের আর্মির সহায়তায় দেশে ফেরত পাঠাতে চাইছিল। আমরা দুই তিন জন ছিলাম। এয়ারপোর্টে আমাদের হত্যা করতে পারে তাই অনেকেই আসেনি। আমি একা ঢাকা আসলাম ১৮  এপ্রিল ১৯৭১ সালে। পায়ে হেঁটে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে চলে আসি, তিনদিন পর চলে যাই নাটোরের গুরিদাসপুর গ্রামের বাড়ি। মা বলেন, পাশের গ্রামের ১৮ জনকে  পাক আর্মি মেরে ফেলছে। তখন আমরা বাড়িতে থাকতাম না মাঠে ঘুমাতাম । কাউকে রাজি করাতে পারছিলাম না মুক্তিযুদ্ধে যেতে। মাত্র তিনজন আমরা চলে যাই বাঙালিপুর ক্যাম্পে। সেই ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে পরবর্তিতে পরিচিত আব্দুল জলিল ভাই, তিনি আমার আব্বার পরিচিত সেই হিসাবে আমাকে সুযোগ দিলেন । আমার পূর্বের মিলিটারি ট্রেনিং ছিল, সেই সাথে স্কাউটিংসহ নানা রকম ট্রেনিং থাকায় তিনি আমাকে ট্রেইনার হিসাবে কাজে লাগান। তিন মাস ট্রেনিং করাই । আমরা বেশীর ভাগ সময় রাতে অপারেশন করতাম দিনে।

জুয়েল সাদাত: গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে কিভাবে জড়ালেন

ডা. শিশির: আমাদের ক্যাস্পের কাছে১০ জন মুক্তিযোদ্ধা চাইল। তখন আমাদের দশ জনকে সিলেক্ট করে। আমাদের বলা হল তোমাদের বিশেষ ট্রেনিং এর জন্য নেয়া হচ্ছে। কই যাচ্ছ?  কেন যাচ্ছ?  প্রশ্ন করতে পারবে না। আমাদের ইন্ডিয়ান আর্মির ট্রাকে করে উচ্চতর ট্রেনিংয়ের জন্য জলপাইগুড়ি হয়ে শিলিগুড়ি নিয়ে গেল। সেখানে আমরা তৃতীয় ব্যাচ হিসাবে ট্রেনিং এ যোগ দেই। সেখানে সিরাজুল ইসলাম খান, তোফায়েল আহমদ, আব্দুর রাজ্জাক ভাইদের সাথে দেখা হয়। তখন তারা বললেন তোমাদের গেরিলা যুদ্ধের জন্য প্লেনে নেয়া হবে, অনেক কষ্ট, যারা কষ্ট সহ্য করতে পারবে না, তাদের যাওয়ার দরকার নাই। আমরা দশজনই যেতে রাজি হই। আমাদের আর্মির পোশাক দেয়া হয়। 

ইনু ভাইরা দ্বিতীয় ব্যাচে ট্রেনিং নেন, আমরা তৃতীয় ব্যাচে ট্রেনিং শেষ করি। তারা বললেন, এটা একটা ইন্টারন্যাশনাল ক্যান্টনমেন্ট, তাই সবার মুসলিম নাম থাকা ঠিক হবে না।  তখন সেখানে আমাদের প্রত্যেককে একটি হিন্দু নাম ধারণ করতে হয়। আমার নাম দেয়া শিশির ভাদুড়ি ৷

পরবর্তিতে আমার জীবনে শিশির নামটা রেখে দেই স্মৃতি হিসাবে৷ গেরিলা ট্রেনিং এ নানা পরীক্ষা হত ৷ আমি ভাল ইংরেজি জানতাম, আমি কর্নেল মালহাতরার ইংরেজি স্পিচ ও নানা কৌশল ট্রেনিং শিট বাংলায় ট্রান্সলেট করতাম,  তাই সেখানে ও আমাকে স্কোয়াড লিডার বানানো হয়। কর্নেল মালাহাতরা আমাকে ট্রেইনার হিসাবে রেখে দেন। তখন আমার মুক্তিযোদ্ধারা  কর্নেল মালহাতরাকে অনুরোধ করেন, আমাকে নিয়ে দেশে যেতে। কারণ  সিরাজুল ইসলাম  (শিশির)  দেশে না গেলে উনার মা চিন্তা করবেন। আর তাকে ছাড়া আমরা কিভাবে  যুদ্ধ করব।  কি মনে করে কর্নেল মালহাতরা  আমাকে দেশে পাঠান৷  গেরিলা যুদ্ধারা অনেক কৌশলী, তাদের মাধ্যমেই বড় বড় অপারেশন হত। গেরিলা যুদ্ধের কৌশলেই অনেক বড় বড় সফল অপারেশন হয়েছিল।

জুয়েল সাদাত: আপনি রাজাকারদের কিভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন? বুলেট নিয়ে নাকি আপনারা শপথ নিয়েছিলেন?

ডা. শিশির:  আমি গেরিলাযোদ্ধা ছিলাম। রাজাকারদের কাছে অনেক অস্ত্র আছে, গুলি ছিল। আমি তাদের নানা ভাবে কৌশলে আত্মসমর্পণ করাই। তারা আমাদের কাছে যে কোন কারণে বা ভয়ে হউক বা জীবনের মায়ায় হউক একত্রিত হয়। তখন কোরআন শরিফের উপর আমার হাত, তারপর তাদের হাত তারপর বুলেট রেখে শপথ করালাম। শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ মেনে চলব, দেশের সাথে বেইমানি করব না। যদি করি তাহলে এই বুলেটেই যেন জীবন যায়।

জুয়েল সাদাত: আপনারা কোন জায়গায় যুদ্ধ করেছেন?

ডা. শিশির: আমরা মূলত আগস্ট থেকে ডিসেম্বর যুদ্ধ করি। আত্রাই - গুরুদাসপুর- সিংরাই পুরো এলাকাতে নানা স্কুলে স্কুলে গিয়ে আমরা দশজনই মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দেই, শেষ পর্যন্ত যার সংখ্যা দাড়ায় ১৪০০ জন। তারপর আমাদের এই বাহিনী এমন আক্রমণ করে পাকিস্তানী বাহিনী পালানোর সুযোগ পায়নি। এই সময়টাই মুক্তিযুদ্ধের অনেক সফলতা আসে। আমাদের নানা কৌশলের কারণে পাক বাহিনী দুর্বল হয়ে যায়। 

জুয়েল সাদাত : আপনাদের মানে গেরিলা যুদ্বাদের লজিস্টিক সাপোর্ট কেমন ছিল।

ডা. শিশির: আসলে অস্ত্র যুদ্ধ করে না, অস্ত্রের পেছনের মানুষ যুদ্ধ করে, আবার পেছনের মানুষ যুদ্ধ করে না। একটা আদর্শকে সামনে রেখে যুদ্ধ হয়ে থাকে। একজন গেরিলা  যুদ্ধা ১০০ জন কনভেশনাল আর্মির সমান। গেরিলা যুদ্ধ হল কৌশল। আমরা রাতে ডানে বামে গুলাগুলি করতাম, তাদের ঘুমাতে দিতাম না। রাতের পর রাত  পাকিস্তানি বাহিনী ঘুমাতে না পেরে কাহিল হয়ে পড়ত। তখন তাদের আক্রমণ করলে সহজে জয়লাভ সম্ভব হত। তারপর নানা কৌশল কাজে লাগিয়ে থানার ওসিকে কাবু করে থানার গোলাবারুদ আয়ত্ব করতে হত।  গেরিলা যুদ্ধ মানে কৌশলের নানা প্রয়োগ।

জুয়েল সাদাত:  যুদ্বকালীন সময়ে কি মনে হয়েছিল যুদ্ধ জয়লাভ সম্ভব

ডা. শিশির: গেরিলা যুদ্ধ করতে প্রচুর পড়াশুনা করতে হত। আমি অনেক পড়াশুনা করেছি। যুদ্ধের ইতিহাস পড়তে হয়। আমাদের ভাষা, কৃস্টি, মানুষের দেশপ্রেম আমাদের যুদ্ধ জয়ের উৎসাহ জোগাত। আমাদের দাবিয়ে রাখা যাবে না  এই বিশ্বাস ছিল। বন্ধু প্রতীম দেশ ভারত আমাদের শেষের দিকে সহযোগিতা করেছে। তাই যুদ্ধটা দ্রুত শেষ হয়েছে। তবে তাদের সহযোগিতা ছাড়াও আমরা যুদ্ধ জয় করতে পারতাম, একটু সময় লাগত। আর পাকিস্তান বাহিনী মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল তাদের সৈন্যদের নিরাপত্তার জন্য। সেখানেও রাজনীতি থাকতে পারে। তবে আমি বা আমরা জয়ি হব এই আত্মবিশ্বাস কাজ করত।

জুয়েল সাদাত: মুক্তিযুদ্ধা, ভুয়া মুক্তিযোদ্বা রাজাকার সম্পর্কে কিছু বলেন।

ডা. শিশির: আমি আমার থানার ৩৯ নং মুক্তিযোদ্ধা। পূর্বের ৩৮ জন কোথায় যুদ্ধ করেছেন জানা নাই। সঠিক মুক্তিযুদ্বার তালিকা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা নানা রাজনৈতিক কারণে হয়নি। তবে তা করা সম্ভব। অনেকেই যুদ্ধ না করেই মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেন। যা দুঃখজনক। প্রকৃত মুক্তিযোদ্বারা কিছু পাবার জন্য যুদ্ধ করেননি।

আমরা রাজাকার আল বদরদের বুঝিয়েছি, বলেছি এই নাও স্টেনগান পাকিস্তানীদের হাতে মারা যাব কেন?  তোমরা আমাদের মার। জনে জনে বুঝিয়ে তাদেরকে নিয়েই  আমাদের যুদ্ধের জন্য এগোতে হয়েছে। দেশের ভেতরের শত্রুরাই আমাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তাই তাদের জন্য বেশী সময় ব্যয় করতে হয়েছে। এবং পুরো মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে বেশী ড্যামেজ তাদের মাধ্যমেই হয়েছে।

জুয়েল সাদাত: যুদ্ধ পরবর্তি সময়ে আপনার কি ভূমিকা ছিল?

ডা. শিশির: দেশ স্বাধীন হবার পর আমাদের লিডার সম্বোধন করা হত। আমাদের সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া হল দেশ পুনর্গঠনে। আমরা রাজাকারদের আলবদরদের কাজে লাগালাম। বললাম যদি কারও ঘরে লুটের মাল পাওয়া যাবে তার জন্য কঠিন শাস্তি। দু'সপ্তাহের মধ্য হিন্দুদের বাড়ি ঘর পুননির্মাণ করে দেয়া হল। অনেকেই ফিরে এসে টিনের ঘর পেয়ে গেল। যাদের টিনের ঘর ছিল না অতীতে। তখন বড়লোকদের নিকট থেকে ২০০ টাকা চাঁদা নিয়ে এই কাজটা আমরা করে দেই। গমের সিড দেই, অনেকেই কৃষিতে মনোনিবেশ করেন। আমাদের এলাকাটাকে পুনর্গঠন করি।  আমি বলেছিলাম আমার ছেলেদের  রাজাকারদের পিটাইতে পারবে, জানে মারা যাবে না।  তাদের দেশ পুনর্গঠনে কাজে লাগাই। তারপর আমি ঢাকা মেডিকেলে পড়তে চলে যাই। সেখানে তখন অবাধে নকল হত। আমি স্যারদের বলি, আমরা মেধাবী ছাত্র আমাদের সহপাটিরা কেন নকল করবে। তারপর নকল বন্ধ হয়ে। সেখানে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখি। তারপর আমি বিপুল ভোটে জেনারেল সেক্রটারি নির্বাচিত হই। অভিষেকের টাকা বাঁচিয়ে ২০০০ গাছ লাগাই। যা আজও কালের সাক্ষী।  দেশ গঠনে গ্রামে ও ঢাকায় জড়িত ছিলাম  নানাভাবে।

জুয়েল সাদাত: যুদ্ধ পরবর্তি বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের তিন বছর কেমন ছিল।

ডা. শিশির: আমাদের দেশের যুদ্ধ পরবর্তি সময়টাতে কিছু টানাপোড়ন ছিল। সর্বহারা পার্টি ও সিরাজ সিকদার অন্য মোটিভ ছিল। আবার জাতির জনকের ক্লিয়ার কনসেপ্ট ছিল কিভাবে বাংলাদেশের মানুষের মুখে হাসি ফুটানো যায়। বঙ্গবন্ধু তার দৃঢ়তায় একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তুলেছেন। আমেরিকা আমাদের কোন সময় সহযোগিতা করেনি, উল্টো বটমলেস বাস্কেট বলেছিল। আজ সেই বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। জাতির জনক তার দৃঢ়তায় দেশকে গড়ে তুলেছিলেন। যদিও তিনি তা শেষ করে যেতে পারেন নি। অনেকেই ভেবেছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী যাবে না। অনেক মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছিল উনার শাসনামলে। তবে তিনি দেশকে অনেক কম সময়ে গড়ে তুলেছিলেন। কম  সময়ে সংবিধান রচনা, নিবার্চন দেয়া, রাস্তা ঘাট  ব্রিজ কালভার্ট সবাই কিছুই করতে পেরেছিলেন নিজের দৃঢ় চেতনা নিয়ে।

জুয়েল সাদাত: যুদ্ধ পরবর্তি কালে দেশ গঠনে সাধারণ মানুষদের কি ভূমিকা ছিল।

ডা. শিশির: বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করায় বাংলাদেশ এক বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি হয়। তারপর যারা ছিলেন, তারা নিজেদের মেধা মনন কাজে লাগিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা দাড় করান। সাধারণ মানুষ দেশ গঠনে সক্রিয় ভুমিকা রাখে। মুক্তিযোদ্বার অস্ত্র আত্মসমর্পণ করে দেশের নানা কাজে মনোনিবেশ করেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত স্বাধীন দেশটাকে সকলে গড়ে তুলেন। 

জুয়েল সাদাত: আপনার সাথে যুদ্বের প্রানবন্ত গল্প শুনে মনে হচ্ছে এ রকম কখনও শুনিনি আগে। আপনার উচিত বই লেখা। সাধারণ যুদ্ধের গল্প, গেরিলা যুদ্ধের গল্প, নানা ট্রেনিং এর গল্প। আপনার অনেক বেশি বেশি লেখা উচিত।

ডা. শিশির:  জি। আমার হাতে এখন অনেক সময়। আমি লিখব৷ সিরাজুল আলম খান ও হাসানুল হক ইনু বেঁচে আছেন। আমার লেখা গুলোর ঘটনার তারা জীবন্ত উদাহরণ। আমি ক্যাস্পে গান গাইতাম তারা শুনেছেন। একবার প্রধানমন্ত্রীর সামনে তাদের সাথে দেখা তখন সেই ক্যাস্পের গল্পের কথা উঠে আসে। তারা আমার লম্বা দাড়ি দেখে চিনতে পারেন নি। আমি শিঘ্রই লিখতে শুরু করব।

জুয়েল সাদাত: আপনি কবে আমেরিকা আসেন। ধর্মীয় ব্যাপারে আপনার সিরিয়াসনেস কবে থেকে।

ডা. শিশির:  আমি ৭৭ সালে আমেরিকা আসি। আমার মা নামাজ কালামের ব্যাপারে খুব আপোষহীন ছিলেন। নামাজ না পড়লে ভাত দিতেন না। আমি  আমেরিকায় এসে ব্যাপক পড়াশুনা করে তাবলিগে জড়িয়ে যাই৷ আমি চারমাস না পুরো সাত মাস তাবলিগে এক নাগাড়ে ছিলাম। আমি অনেক দিন হসপিটালে ও প্রাকটিসের বাহিরে ছিলাম। যখন আমার হসপিটালের চাকরি চলে যাবার নোটিশ আসে তখন আমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসি।

জুয়েল সাদাত: আপনাকে দেখা গেছে ভাল গান গাইতে পারেন, আবার একজন গেরিলা যুদ্ধা। আবার আপনাকে দেখা গেল তাবলিগ জামাতে জড়িত। একটু বলবেনঅনেক গুলো মসজিদ তৈরি করেছেন।

ডা. শিশির: আমি স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের ঢাকা মেডিকেল থেকে পাস করে  ডাক্তারি পেশায় মনোনিবেশ করি । তারপর ১৯৭৭ সালে আমেরিকায় আসি। তখন এখনকার মতো বিদেশে আসা সহজ ছিল না। সরকারি ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যেত না। তারপর ৮৭ সালে ওরলান্ডো ( ফ্লোরিডা)   আমেরিকা আসি। যেখানে আমার জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটালাম। গ্যাস্ট্রোলজির উপর ডিগ্রি নিলাম। সাথে সাথে দাওয়াতে যোগ দেই। তাবলিগ জামাতে যোগ দেই  জীবনের পরিবর্তন আসে। তারপর গান টান আর গাওয়া হয় না। অনেক মসজিদ মাদ্রাসা তৈরি করি।  দাওয়াতের জন্য সারা আমেরিকা ঘুরে বেড়াই। আলহামদুলিল্লাহ আজ গ্রেটার ওরলান্ডোতে ছোট বড় ৩৮ টি মসজিদ। একটা মজার ঘটনা বলি,  ওরলান্ডো জামে মসজিদ যেটা ডিজনি এরিয়াতে, সেটা আমার যখন মাত্র ৫০ জন্য মুসল্লি ছিলাম এই শহরে তখন ১ লাখ ডলারে জায়গা কিনে সর্বমোট ৬ লাখ ডলারে তৈরি করি। ৬০০ জনে নামাজ পড়ার জন্য বানাই। অনেকে আমাকে বলে এত নামাজি হবে না। আপনি জানেন এখন সেই মসজিদটাই আমরা ৫ হাজার মুসল্লির জন্য বানাচ্ছি।

জুয়েল সাদাত: শুনেছি আপনার গ্রামের বাড়িতে অনেক বড় কারিগরি মাদ্রাসা করেছেন।

ডা. শিশির:  আসলে আমার বড় ভাই যিনি আজ আমাদের মাঝে নাই। উনি শুরু করেছিলেন। পরবর্তিতে আমরা সব ভাই বোন এটাকে বড়ো করেছি। আমি এটার সাথে বেশী সম্পৃক্ত। অনেক বৃহৎ এলাকা নিয়ে মাদ্রাসা। যা রাজশাহী বিভাগের একটি আইডল প্রতিষ্ঠান। সেখানে হাফিজদের কারিগরি ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে ৪০ জন শিক্ষকদের জন্য অ্যাপার্টমেন্ট বানিয়ে দিচ্ছি। তারা পরিবার পরিজন নিয়ে মাদ্রাসায় থাকবেন, ছাত্রদের পড়াশুনাটাও ভাল হবে। যা বাংলাদেশে প্রথম। শিক্ষকরা ফ্রি থাকার বাসস্থান পাচ্ছেন। পুরো প্রজেক্টটি বিশাল এলাকা জুড়ে। এখানে আমি একটি আন্তর্জাতিক মানের লাইব্রেরি করব, যা হবে রাজহাশী বিভাগের অন্যতম। অনেক বই কেনা হচ্ছে। ভবিষ্যতে হাজার হাজার কোরআনে হাফেজ বের হবেন, উচ্চতর শিক্ষা নিয়ে। বর্তমানেও হাফেজ বের হচ্ছেন। পুরো কমপ্লেক্সটা বিরাট এলাকা জুড়ে।

জুয়েল সাদত: আপনি হোপ ফাউন্ডেশনের সাথে যুক্ত আছেন, কি কি কাজে আপনারা জড়িত।

ডা. শিশির: আমার প্রিয় মানুষ, ডাক্তার ইফতেখার মাহমুদ হোপ ফাউন্ডেশন তৈরি করেন ১৯৯৮ সালে। আমি এটার বোর্ড অব ডাইরেক্টর। কক্সবাজার ও রামুতে আমাদের ৪০ বেডের হসপিটাল আছে। আমরা রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করছি। ডাক্তার ইফতেখার আমাকে বড় আকারে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন। হোপ ফাউন্ডেশেনর সাথে ১৬০০ ডাক্তার নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী জড়িত।

জুয়েল সাদাত: আপনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক। একটু যদি বলেন।

ডা. শিশির: শেখ কামালের সহপাটি হিসাবে সম্পর্কটা অনেক কাছের। যখনই তিনি আমেরিকায় আসতেন আমার তত্বাবধানেই উনার চিকিৎসা হত। একবার উনার গল্ডব্লাডার  অপারেশন হল, উনার ইচ্ছানুযায়ী আমি অপারেশন থিয়েটারে ছিলাম। সারা রাত পাশেই ছিলাম। শেখ রেহানা তখন শেখ হাসিনাকে জানান আমি বাড়ি যাইনি সারা রাত পাশে ছিলাম ৷ ভাইয়ের মতো সম্বোধন করেন। আমি গ্যাস্ট্রোলজির ডাক্তার একবার আপাকে বললাম, বাংলাদেশে গ্যাস্ট্রোলজির একটি বিশেষ হসপিটাল করতে পারলে ভাল  হত। তখন তিনি বলেছিলেন যদি সরকারে যাই তখন করব৷ তারপর ২০০৮ সালে তিনি  সেটার কাজ শুরু করেন। আমি এর শুরু থেকে জড়িত ছিলাম ৷ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমাকে থাকতে হয়েছিল। আপনারা জেনে আনন্দিত হবেন, সেই হসপিটালটা ভাল চলছে। বৃটিশ একটি টিম সম্প্রতি ভিজিট করে এটাকে লন্ডনের চাইতেও ভাল বলে রিপোর্ট করেছেন।

আমি যেহেতু দীর্ঘদিন থেকে উনার শারীরিক সুস্থতা অসুস্থতা নিয়ে নিবেদিত। তাই তিনি আমার পরামর্শকে গুরুত্ব দেন। সেভাবেই আমার পরামর্শে  আলহামদুলিল্লাহ তিনি ভাল আছেন। আপনারা জেনে খুশি হবেন উনার বড় কোন শারিরীক অসুবিধা না।

জুয়েল সাদাত: একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে দেশের বর্তমান উন্নতিকে কিভাবে দেখেন। মুক্তিযোদ্বাদের ভাতা বেড়েছে কেমন বোধ করেন?

ডা. শিশির: স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে দেশের আশাতিত উন্নতিতে মনে হয়ে স্বাধীনতার সুফল আমরা পেয়ে গেছি। যা দেখে আমি নিজে গর্বিত। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের নিকট রোল মডেল। মুক্তিযোদ্বাদের ভাতা বেড়েছে, আজ মুক্তিযোদ্ধারা  নিজেকে অসহায় বোধ করেন না। তারা গৃহঋণ পাচ্ছেন। নানা রকম পন্থায় মুক্তিযোদ্বাদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে, সেটা দেখে আনন্দিত হচ্ছি। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে।

জুয়েল সাদাত:  আপনার নিকট বাংলাদেশের এই মুহূর্তে বড়ো সমস্যা কি?

ডা. শিশির: আমাদের দেশের ডেভেলপমেন্ট দেখে বিশ্বের অনেক দেখ স্তম্ভিত। জাতীসংঘ বাংলাদেশের উন্নতিকে রুল মডেল হিসাবে দেখাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক- জাতিসংঘ এর কাছে বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনার নাম। তবে এখন নতুন প্রজন্মকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করতে হবে। যদি দুর্নীতিকে কমিয়ে আনা যায় তাহলে দেশ আরো এগিয়ে যাবে। দুর্নীতি বর্তমানে অসহনীয় পর্যায়ে, সেটাকে জিরো টলারেন্স নিয়ে আনতে হবে। তবে সম্ভাবনার বাংলাদেশ। আমাদের দেশটা আসলেই সোনায় মোড়ানো। সোনার বাংলায় সোনা ফলতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের একটি পজেটিভ রোল মডেল।

জুয়েল সাদাত - আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি?

ডা. শিশির: আমি এই বছরের শেষের দিকে বাংলাদেশে যাব। স্থায়ী ভাবে বসবাস করার ইচ্ছা। সেখানে অনেক কাজ, অনেক বড় বড় প্রজেক্ট অসমাপ্ত সেগুলোতে মনোনিবেশ করব। দেশের মাটিতে শেষ জীবন কাটাতে চাই। একটি গান আছে " তোরা দে না, দেনা, সেই মাটি আমর অঙ্গে " আমি সেই মাটিতেই ফিরে যেতে চাই। আমি আমার পিতা মাতার কবরের পাশেই থাকব। আমর জন্য দোয়া করবেন। যদি নিজের অজান্তে কোন ভুল ভ্রান্তি হয়ে থাকে তার জন্য ক্ষমা চাচ্ছি। 

জুয়েল সাদাত: আপনাকে ধন্যবাদ।

ডা.শিশির:  আপনাকেও ধন্যবাদ। আল্লাহ হাফেজ।

লেখক: জুয়েল সাদাত, সাংবাদিক কলামিস্ট, আমেরিকা, ফ্লোরিডা

   

বুদ্ধ পূর্ণিমার তাৎপর্য



অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বে বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব বুদ্ধ পূর্ণিমা। বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এক মহান দিন এটি। এই দিনে গৌতম বুদ্ধ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন। একই দিনে মহাজ্ঞানী বুদ্ধত্ব এবং বুদ্ধ মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। এই তিথিকে বলা হয় বৈশাখী পূর্ণিমা, যা আজ বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক ভেসাক ডে হিসেবে পালন করা হয়। বৈশাখ মাসের এই তিথিতে মহামতি গৌতম বুদ্ধের জীবনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংগঠিত হয়েছিল। ত্রি-স্মৃতিবিজড়িত এ তিথির গুরুত্ব ও তাৎপর্য অত্যন্ত বিশাল।

খ্রিস্টপূর্ব ৬২৩ অব্দে এই দিনে আড়াই হাজার বছর আগে মহামতি গৌতম বুদ্ধ ভারতবর্ষের তৎকালীন কপিলাবস্তু দেবদহ নগরের মধ্যবর্তী লুম্বিনী কাননে মাতা রানী মায়াদেবীর পিতৃগৃহে যাবার পথে শালবৃক্ষের নিচে জন্মগ্রহণ করেন। খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৮ অব্দে ৩৫ বছর বয়সে বোধিবৃক্ষমূলে কঠোর সাধনা বলে তিনি বুদ্ধত্ব লাভ করেন। খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৩ অব্দে ৮০ বছর বয়সে একই দিনে ৪৫ বছর দুঃখ মুক্তির ধর্ম প্রচার করে কুশীনগরে যুগ্মশাল তরুণমূলে চিরনির্বাসিত হয়ে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন অর্থাৎ তিনি দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করেছেন। পৃথিবীতে আর জন্মলাভ করবেন না। গৌতম বুদ্ধের পিতার নাম ছিল রাজা শুদ্ধধন ও গৃহী নাম ছিল সিদ্ধার্থ। ২৫২৭ বছর আগে ভারতবর্ষে যখন ধর্মহীনতা মিথ্যা দৃষ্টি সম্পন্ন বিশ্বাস্বে ধর্মে সমাজের শ্রেণি বৈষম্যের চরম দুরবস্থা ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত, প্রাণী হত্যায় চরম তুষ্টি ,তখন শান্তি মৈত্রী অহিংস সাম্য ও মানবতার বার্তা নিয়ে মহামতি বুদ্ধের আবির্ভাব ঘটে।

গৌতম বুদ্ধ অহিংস ও মৈত্রীর বাণী প্রচার করেছেন। এই জীবজগৎ অনিত্য দুঃখ অনাত্মাময় প্রাণমাত্রই প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। অস্থায়ী বা অনিত্য কার্যতকারণের অধীন। তিনি জীবনের প্রগাঢ় খাটি চার আর্যসত্য আবিষ্কার করলেন। জগতে দুঃখ আছে, দুঃখের অবশ্যই কারণ আছে, দুঃখের নিবৃত্তি আছে, দুঃখ নিবৃত্তির উপায় আছে। দুঃখ নিবৃত্তির উপায় হলো নির্বান লাভ। এই নির্বান লাভের ৮টি মার্গ আছে। যেমন সম্যক বা সঠিক দৃষ্টি , সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা, সম্যক প্রচেষ্টা, সম্যক স্মৃতি, সম্যক সমাধি। এই পথ পরিক্রমায় শীল সমাধি প্রত্তোয় নির্বাণ লাভের একমাত্র উপায়। সব প্রাণী সুখী হোক, পৃথিবীর সবচেয়ে পরম, মহৎ বাণী তিনি প্রচার করেছেন। শুধু মানুষের নয়, সব প্রাণ ও প্রাণীর প্রতি, প্রেম, ভালোবাসা, অহিংসা, ক্ষমা, মৈত্রী, দয়া, সহনশীলতা, সহমোর্মিতা, সহানুভূতি, মমত্ববোধ, প্রীতি, সাম্য, সম্প্রীতির কথা তিনি বলেছেন।

১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ৫৪/১১৫ রেজুলেশন এ দিনটিকে আন্তর্জাতিক ভেসাক ডে হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। সেই থেকে এই দিনটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ “ভেসাক ডে” হিসেবে পালন করে আসছে। বুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত পবিত্র এই দিনকে বিভিন্ন নামে পালন করা হয়। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলংকা, নেপালে বুদ্ধ পূর্ণিমা, লাওসে বিশাখ পূজা, ইন্দোনেশিয়া হারি ওয়াইসাক ডে, মালয়শিয়ায় ওয়েসাক ডে, মায়ানমারে ফুল ডে অব কাসন, সিঙ্গাপুরে হারি ভেসাক ডে নামে পালন করে থাকে আবার কেউ বুদ্ধ জয়ন্তী দিবস হিসেবেও পালন করে থাকে।

জাতিসংঘের মহাসচিব এস্তেনিও গুতেরেজ ভেসাক ডে উপলক্ষে বলেছেন, “On the day of Vesak, Let us celebrate Lord Buddha’s wisdom by taking action for others with compassion and solidarity and by renewing our commitment to build a peaceful world.”

ফিলিস্তিনে আজ চরমভাবে মানবতা বিপন্ন হচ্ছে। অশান্তিময় এই পৃথিবীতে বুদ্ধের মৈত্রী, সংহতি, সাম্য, মানবতা ও শান্তির বাণী বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় আজও প্রাসঙ্গিক এবং খুব প্রয়োজন। বিশ্ব আজ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি। পরিবেশ দূষণ, গ্লোবাল ওয়ার্মিং, জলাবদ্ধতা, বৃক্ষ নিধন, বন উজাড়, জীব বৈচিত্র্য হ্রাস ও জলবায়ু পরিবর্তন এই সবুজ গ্রহের ইতিহাসে নজিরবিহীন। গৌতম বুদ্ধই প্রথম বৃক্ষকে এক ইন্দ্রিয় বিশিষ্ট জীবরূপে আখ্যায়িত করেছেন। বুদ্ধ ছিলেন বিশুদ্ধ পরিবেশবাদী দার্শনিক। পরিবেশ রক্ষা ও সংরক্ষণে তিনি সব সময় সোচ্চার ছিলেন। তাই বুদ্ধের জন্ম বুদ্ধত্ব লাভ ও মহা পরিনির্বাণ বৃক্ষের পদমূলের বিশুদ্ধ পরিবেশ মন্ডিত পরিবেশে সংগঠিত হয়েছিল।

এই পবিত্র দিনে বৌদ্ধরা বিভিন্ন দেশে দেশে সব প্রাণীর সুখ শান্তি কামনায় সমবেত প্রার্থনা করেন। অশান্ত পৃথিবীতে পরিবেশ সংরক্ষণে বুদ্ধের বাণী নীতি ও আদর্শ বিশ্ব মানবতার শিক্ষা, দর্শন, চিন্তা চেতনা ,ভাবনা সুন্দর, শান্ত, সাম্যময় পৃথিবী গড়ার বিকল্প নাই। সব প্রাণী সুখী হোক, দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করুক।

অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া
চিকিৎসক, লেখক, সংগঠক ও গবেষক

  বিজয়ের ৫০ বছর

;

মহামতি সিদ্ধার্থ গৌতম



প্রদীপ কুমার দত্ত
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি।
ধর্মং শরণং গচ্ছামি।

সিদ্ধার্থ গৌতম খৃষ্টপূর্ব ৫৬৪সালে(এই সাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে) কপিলাবস্তুর লুম্বিনীতে (বর্তমানে নেপালের অন্তর্গত) শাক্য রাজা শুদ্ধোধন এর প্রাসাদে তাঁর মহিষী মায়া দেবীর ঔরষে জন্মগ্রহণ করেন। দিনটি ছিল বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথি।

তিনি শৈশব থেকেই ছিলেন ভাবুক প্রকৃতির। রাজকার্য তাঁকে আকর্ষণ করতো না। জীবনের গূঢ় রহস্য নিয়ে তিনি চিন্তা করতেন। তিনি লক্ষ্য করলেন সংসারে কর্মই প্রধান। বাকি সবই অনিত্য। তিনি ভাবতেন জরা, ব্যাধি, মৃত্যু থেকে মুক্তির উপায় নিয়ে। যৌবনের এক পর্যায়ে প্রাসাদে মাতা, পিতা, স্ত্রী ও শিশুপুত্রকে রেখে এক রাতে তিনি বেরিয়ে পড়েন পথে। গ্রহণ করলেন শ্রমণের জীবন।

একসময় তিনি গয়ার নিকট উরুবিল্ব (বর্তমানে ভারতের বিহারের বৌদ্ধগয়া) গ্রামে এক বৃক্ষতলে মোক্ষলাভের উপায় ভাবতে জাগতিক সমস্ত আকর্ষণ ত্যাগ করে ধ্যান করতে বসেন। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ইত্যাদি বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত অবস্থায় এক বৈশাখী পূর্ণিমায় তিনি আলোকপ্রাপ্ত হন। তিনি লাভ করলেন দিব্যজ্ঞান। এই জ্ঞানই হলো অজ্ঞানতা ও অশিক্ষা, লোভ এবং আকাঙ্খা, রোগ ও দুঃখভোগ এবং পুনর্জন্ম থেকে মুক্তি। সেই মুক্তিলাভের উপায় হলো জীবন যাপনে শুদ্ধাচার।

তাঁর আশি বছরের জীবনের বাকি অংশ তিনি কাটালেন তাঁর মোক্ষলাভের সূত্র এবং লোভ, হিংসা-দ্বেষহীন পরোপকারের জীবন ধারণের জন্য শিষ্য এবং শিষ্যদের মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে উদ্বুদ্ধ করে। বারানসীর অদূরে সারনাথে প্রথম পাঁচজনকে তিনি শিষ্যত্বে বরণ করেন। এই সংখ্যা ধীরে ধীরে বর্ধিত হতে থাকে এবং প্রচার ছড়িয়ে পড়তে থাকে দিকে দিকে। বৃহৎ এক জনগোষ্ঠীকে আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় তাঁর এই প্রচার।প্রথমে গাঙ্গেয় অববাহিকাতে চলে এই প্রচারাভিযান। পরে তা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

এইভাবে শান্তির অমোঘ বাণী প্রচারে বাকি জীবন কাটিয়ে তিনি যখন বুঝলেন তাঁর ধরাধাম ত্যাগের সময় হয়েছে, তখন তিনি তাঁর প্রচার সাথী শিষ্যদের উদ্দেশ্যে শেষ দেশনা প্রদান করেন। সেখানে তিনি তাঁর শিষ্যদের বলেন যে তিনি তাঁদের পথের দিশা দেখিয়ে গেলেন মাত্র। মানুষ মরণশীল।মানব জীবনে দুঃখ,কষ্ট জরা,ব্যাধি অবশ্যম্ভাবী।তাই জীবদ্দশায় উচিৎ সর্বোচ্চ চেষ্টার মাধ্যমে সৃষ্টির সকল জীবের কল্যাণসাধন করা।তাঁদেরকে নিজের আত্মাকে আলোকিত করে নিজেকেই আলোকপ্রাপ্ত হতে হবে।

মল্ল রাজত্বভুক্ত কুশিনগরে তিনি মহাপরিনির্বাণ প্রাপ্ত হন। কি আশ্চর্য! সেই দিনটিও ছিল বৈশাখী পূর্ণিমা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই তিন বিশেষ দিনের সমষ্টিকে ভেসাক ডে হিসাবে পালন করা হয়। ভারত থেকে তিব্বত হয়ে চীন, জাপান, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর সহ পুরো দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় বৌদ্ধ ধর্ম একসময় ছড়িয়ে পড়ে। যার বিপুল প্রভাব এখনো বিদ্যমান।

শাক্যমুণি গৌতমবুদ্ধর প্রধানতম শিক্ষা ও প্রার্থনা হলো জগতের সকল প্রাণী সুখী হউক। সিদ্ধার্থ গৌতমের ধর্ম গ্রহণ করে সম্রাট অশোক তা তাঁর রাজত্বের দিকে দিকে ছড়িয়ে দেন। সম্রাট অশোক লুম্বিনীতে তীর্থভ্রমণ করাকালীন একটি স্তম্ভ স্থাপন করেন। সেই স্তম্ভে ব্রাহ্মী লিপিতে শাক্যমুনি বুদ্ধ কথাটি পাওয়া যায়। এর অর্থ করা যায় শাক্যদের মধ্যে তপস্বী ও আলোকপ্রাপ্ত।

মহামতি বুদ্ধের বাণী প্রথম দিকে ছিল শ্রুতি নির্ভর। পরবর্তীতে তা ভিনায়া বা প্রচারকদের (বর্তমানকালের শ্রমন বা ভান্তে) জন্য প্রতিপালনীয় বিধান ও সুত্ত পিতাকা বা বুদ্ধদেবের উপদেশসমূহ তাঁর শিক্ষা হিসাবে লিপিবদ্ধকরণ করা হয়। আরও পরে তাঁর অনুসারীরা অভিধর্ম, জাতক কাহিনী, মহাযান সূত্র ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থ প্রকাশ করেন। তার মধ্যে জাতক কাহিনীতে সিদ্ধার্থ গৌতমের পূর্ববর্তী জন্মসমূহের কথা লিপিবদ্ধ আছে। আলোকপ্রাপ্ত হয়ে পুনর্জন্ম থেকে মহামুক্তির আগে তিনি পূর্ব জন্মসমূহের কথা স্মরণ করতে পেরেছিলেন।বেশিরভাগ বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ আদিকালে পালি ভাষায় লিখিত হয়েছিল।

জ্ঞান অন্বেষণকে বৌদ্ধ ধর্ম সর্বোচ্চ মর্যাদা দেয়। বৌদ্ধ যুগেই পৃথিবীর বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় রূপে পরিচিত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। আমরা গর্ব বোধ করতে পারি যে আমাদের মাটির সন্তান অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান বৌদ্ধ ধর্মকে তিব্বতে প্রচারে প্রধানতম ভূমিকা রাখেন।তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্ম রাজধর্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ও সেখান থেকে চীন,কোরিয়া,জাপান সহ এশিয়ার দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

ইতিহাসের এক পর্যায়ে ভারতবর্ষের বিশাল এলাকায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রাবল্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।সম্রাট অশোকের কন্যা সংঘমিত্রা এই ধর্মকে সিংহল দ্বীপে(বর্তমান শ্রীলঙ্কা) প্রসারিত করেন।আজও পৃথিবীতে বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীরা বিভিন্ন ধারায় তাঁদের মহান শান্তির ধর্মকে পালন ও সংরক্ষণ করে যাচ্ছেন। 

লেখক: প্রাবন্ধিক ও পরিব্রাজক

  বিজয়ের ৫০ বছর

;

বিশ্ব চা দিবস



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
চা / ছবি: বিং এআই

চা / ছবি: বিং এআই

  • Font increase
  • Font Decrease

কনকনে শীতে কাপছেন। সোয়েটার-চাদর মুড়ে বসলেও গা ভেতর থেকে কাঁপুনি কমছে না। অথবা কাজ করতে করতে মাথা ঝিমঝিম করছে। অস্বস্তি সহ্যও হচ্ছে না, অথচ এই স্বল্প ব্যথায় ঔষধও তো খাওয়া যায় না! কিংবা বাসায় আসা কোনো মেহমান বা বিকেলে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় বসেছেন। শুধু মুখে বসে থেকে গল্প করতে কতক্ষণই বা ভালো লাগে? এরকম সব পরিস্থিতি সামাল দিতেই রয়েছে- চা।

আজ ২১ মে বিশ্ব চা দিবস। তথ্য অনুযায়ী ২০০৪ সালে সর্বপ্রথম চায়ের গুরুত্ব বিবেচনা করে একে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা চিন্তা করা হয়। বিশ্ব সামাজিক ফোরাম এই সিদ্ধান্ত নেয় এবং তারপরের বছর ২০০৫ সালে প্রথমবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লীতে বিশ্ব চা দিবস উদযাপন করা হয়। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে শ্রীলঙ্কায়েএই দিবস পালন করা হয়। ২০১৫ সালে চা দিবসে উদযাপন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যায়। ২০১৯ সালে জোতিসংঘ কয়েকটি দেশের সম্মিলিত উপস্থিতিতে ২১ , চা দিবসের আয়োজন করে।   

 চা পাতা তোলা / ছবি: বিং এআই

চায়ের জন্ম হয় ঠিক কবে হয়েছিল তার নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ধারণা করা হয়, আজ থেকে ৫ হাজার বছরেরও আগে সৃষ্টি হয় এই পানীয়। এশিয়ারই বৃহত্তর দেশ চীনে এর জন্ম হয়। তৎকালীন সময়ের পাওয়া জিনিসপত্রে চায়ের অস্তিত্বের প্রমান মেলে। ক্যামেলিয়া সিনেনসিস উদ্ভিদ থেকে উৎপন্ন হয় এই পানীয় তাই চীনের নামের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।  সাধারণ পাহাড়ি অঞ্চলে শক্ত পাথুরে মাটিতে জুমচাষে চা উৎপন্ন করা হয়। আমাদের দেশেও বৃহত্তর সিলেটঅঞ্চল এবং চট্টগ্রামের কিছু অংশে চা পাতা চাষকরা হয়।    

কম-বেশি চা খান না- এমন মানুষ হাতে গুনতে পারা যায়। মূলত উদ্ভিজ এই পানীয় জনপ্রিয় তার অনন্য স্বাদ, ঘ্রাণ এবং উপকারের জন্য। কফি অনেকেই পছন্দ করেন। তবে চিকিৎসকরা অনেককে কফির উপর নিষেধাজ্ঞা দেন। চায়ের ক্ষেত্রে সেই বালাই নেই। তাই চা-কে অন্য সব পানীয়ের মতো শুধু একটি পানীয় হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। বরং একে খাদ্যতালিকার পানির পরে পানীয় হিসেবে এক বিশেষ অংশ হিসেবে মনে করা হয়।  

চাষ করা চা পাতা শুকিয়ে নিয়ে, গরম পানি বা দুধে চিনি ও অনেকক্ষেত্রে মশলা মিশিয়ে শুকনো সেই পাতা দিয়ে বানানো হয় চা। আমাদের দেশ হোক বা বাইরের দেশে, অধিকাংশ মানুষের জীবন ধারার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো এই পানীয়।   

  বিজয়ের ৫০ বছর

;

অকালে আম পাকে!



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
অপরিপক্ক পাকা আম / ছবি: পিক্সাবে

অপরিপক্ক পাকা আম / ছবি: পিক্সাবে

  • Font increase
  • Font Decrease

‘বৈশাখে তোর রূদ্র ভয়াল,

কেতন ওড়ায় কালবৈশাখী!

জষ্ঠি মাসে বনে বনে

আম কাঠালের হাট বসে কি...’

রবিঠাকুরের কলমে রচিত এ পংক্তি যেন, কেবল কাগজের উপর কালিতে সাজানো কিছু শব্দ নয়। বাংলা বছরের প্রথম ঋতুর সকল বৈশিষ্ট্য খুব অল্প ভাষায় সুসজ্জ্বিত করে গানের রূপে সামনে আনেন বিশ্বকবি।

দিন গুনতে গুনতে বছরের প্রথম মাসটি অনায়াসে কেটে গেল। চলছে জৈষ্ঠ্য মাস। ভয়ংকর কাল বৈশাখী ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হওয়ার আশঙ্কাকে পাশ কাটিয়ে; জৈষ্ঠ্যের পাকা আম, জাম, কাঁঠাল, লিচুই যেন গ্রীষ্মের আসল আনন্দ।  

গ্রীষ্মের পরিপূরক হলো আম। আম পছন্দ নয়, এমন মানুষটি খুঁজে পাওয়া দায়! এজন্যই আমকে বলে ফলের রাজা। ত্যক্ত-বিরক্ত করা গরমেও পাকা টসটসে আমের সুঘ্রাণই যেন আনন্দের স্বস্তি। তবে সে আনন্দেও বালি ঢেলে দেয় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। ভোজন-রসিক মানুষরা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকে রসে টসটসে তাজা ফলের স্বাদ আস্বাদনের জন্য। অনেক ভোক্তদের সেই অপেক্ষা বৃথা হয়ে যায় অপরিপক্ক ফলের কারণে।

অনেক ব্যবসায়ী অতিরিক্ত লাভের আশায় রাসায়নিক উপাদান ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহার করে আম পাকানোর চেষ্টা করে। আম যখন কাঁচা অবস্থায় থাকে তখন এর মধ্যে সাইট্রিক এসিড ম্যালিক এসিড, টারটারিক এসিড থাকে। এ কারণে আমের হাইড্রোজেন আয়নের ঋণাত্মক ঘনমাত্রার লগারিদম মান খুব কম হয়, ফলে আম অম্লধর্মী হয়। এছাড়া কাঁচা অবস্থায় আমে উচ্চ ওজনের পেকটিনের মজুদ বেশি থাকে।

অপরিপক্ক পাকা আম

সাধারণত প্রাকৃতিকভাবে পাঁকার সময় এই পেকটিনের ওজন কমতে থাকে। আমের মধ্যকার ভিটামিন ‘সি‘ কালক্রমে বদলে ভিটামিন ‘এ’ তে রূপান্তরিত হয়। একই সঙ্গে ক্লোরোফিল পরিবর্তিত হয়ে গ্লোবুলার ক্রোমোপ্লাস্টে রূপান্তরিত হয়। অ্যান্থোসায়ানিন পিগমেন্ট ফিনাইলপ্রোপানয়েডের সেকেন্ডারি মেটাবোলাইটসের  উপসি্থতি বাড়তে থাকে।(‘বিজ্ঞানচিন্তা’র তথ্যমতে) এই কারণে কাঁচা আমের সবুজ রঙ পরিবর্তন হয়ে লালচে-হলুদাভাব বর্ণ ধারণ করে। এভাবে পাকার ফলে আম হয় সুস্বাদু। আমের মৌ মৌ গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে যায়।

তবে ক্যালসিয়াম কার্বাইড (CaC2)  এর প্রয়োগের কারণে আমের মধ্যে পরিবর্তন আসে। এর মধ্যে থাকা (৮০থেকে৮৫ভাগ) ক্যালসিয়ামের কারণে আমের অম্লত্ব নষ্ট হতে শুরু করে। অম্ল-ক্ষারের প্রশমনের কারণে আমের মধ্যে থাকা ম্যালিক এসিড ও সাইট্রিক এসিডের পরিমাণ কমতে থাকে। তাই কাঁচা অবস্থাতেই আমের রঙ পরিবর্তন হতে শুরু করে।

আমের ভিটামিন বি১ পানিতে দ্রবনীয়। আমের আর্দ্র অংশের সঙ্গে ক্যালসিয়াম কার্বাইড বিক্রিয়া করে অ্যাকটেলিন গ্যাস উৎপন্ন করে। এতে আম অসময়েই পাক শুরু করে। সামগ্রিকভাবে আমের রাসায়নিক পরিবর্তন না ঘটলেও বাহ্যিকভাবে রঙের পরিবর্তনের কারণে দেখলে মনে হয় আম পেকেছে। এই অপরিপক্ক আম খেলে কেবল রুচি ও ভাবমূর্তি নষ্ট হয়, তাই নয়! শরীরের জন্যও অনেক বেশি ক্ষতিকর হতে পারে।

  বিজয়ের ৫০ বছর

;