রাইটার্স ব্লক



দেবদুলাল মুন্না
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

সাহিত্যিক লিখতে চান। কিন্তু পারছেন না লিখতে। কী সমস্যা? লেখা কোনোভাবেই আসছে না। একেই ইংলিশে বলে ‘রাইটার্স ব্লক’। বাংলায় কী বলা যায়? লেখকের বন্ধ্যাত্ব! ঘটনাটি কেমনভাবে ঘটে দেখা যাক।

মার্শেল প্রুস্তের ‘ইন সার্চ অব লস্ট টাইম’-এর প্রথম খণ্ড বেরিয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশকের কাছে জমা দেওয়া কিন্তু তৃতীয় খণ্ড লেখার সময় ১৭ পৃষ্ঠা লিখে আটকে গেলেন এক শীতের রাতে। টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। তিনি পরপর তিনটা চুরুট শেষ করলেন রিভলভিং চেয়ারে বসে হেলেদুলে। কিন্তু না একটি কালো অক্ষরও বেরুলো না তার কলম থেকে। উঠে গিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দূর পাহাড়ের দিকে অন্ধকার দেখলেন। একটু ওয়াইন খেলেন। না কাজ হচ্ছে না। শ্বাসকষ্ট যেন বাড়ছে। ভাবলেন, ছোটবেলার হাঁপানি রোগটা কি তাড়া করে আসছে কিনা! শুয়ে পড়লেন। পরদিন সকালে বসলেন লিখতে। হলো না। এভাবে পাক্কা নয়দিন কেটে গেল। না পারছেন কিছু লিখতে, না পারছেন অন্য কোনো কাজে মনোযোগী হতে। দশমদিনে তিনি পাক্কা চারঘণ্টা ফুন্তে শহরে উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ালেন। সেইরাতে লিখতে বসলেন। কালো কালো অক্ষরগুলো আবার ঝরতে থাকল তার কলমে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার আত্মজীবনীর এক জায়গায় লিখেছিলেন, সেদিন সকাল থেকেই মাথায় লেখাটা চেপে বসেছিল। তাই সকালে মা বাজারে যেতে বললেও আর যাননি। বিশেষ করে লেখার চেয়েও বেশি ভাবনা ছিল কড়া রোদ নিয়ে। ফিরতে ফিরতে রোদ চড়ে যাবে সেই ভয়েই বাজারে যাননি। কিন্তু বেলা বারোটায় যখন সিগারেটের প্যাকেটের শেষ কাঠিটায় আগুন ধরালেন তখন তার মাথায়ও যেন আগুন ধরল। লেখা আর এগোয় না। তখন তিনি সেই কড়া রোদ মাড়িয়ে গিয়ে সিগারেট আনতে গেলেন। এরপর ফিরে এসে ওই লেখা টানা চারদিন লিখতে পারেননি। ওই একবারই হয়েছিল তার এ সমস্যা।

ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির ‘শাইনেস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক বার্নার্ডো কার্দুসি বলেছেন, “রাইটার্স ব্লকের নমুনা লেখকভেদে ভিন্ন ভিন্নরকম হয়। ফলে সমস্যার বিষয়ে—যাদের হয়, তারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে যারা হুট করে লেখালেখি একেবারেই ছেড়ে দেন সেটি ঘটে লেখকের নিত্য আবিষ্কারের নেশার ঘোর কেটে গেলে।”

আমাদের মাহমুদুল হকের ঘোরও কি তবে কেটে গিয়েছিল? জীবন আমার বোন, কালো বরফ, নিরাপদ তন্দ্রা, খেলাঘর, অনুর পাঠশালা, মাটির জাহাজ প্রভৃতি উপন্যাস আর ‘কালো মাফলার’, ‘প্রতিদিনি একটি রুমাল’, ‘হৈরব ও ভৈরব’ প্রভৃতি গল্পের আমাদের মাহমুদুল হক একসময় লেখালেখি ছেড়েই দিয়েছিলেন। সারাদিনরাত ঘরেই বসে থাকতেন। কোথাও যেতেন না। কারো সাথে মিশতেন না। তিনি এক ইন্টারভিউতে বলেন, “আমি তো সবসময় বিশ্বাস করে এসেছি, শিল্পীদের লোভ থাকতে নেই। লোভ থাকলে শিল্প হয় না। আমি শুধুমাত্র সাহিত্য জগতের ভণ্ডামি দেখে লেখালেখি থেকে দূরে সরে এসেছি, সেটা বলা ঠিক হবে না। এটা একটা কারণ ছিল বটে, তবে আরো কারণ নিশ্চয়ই আছে। আগেই তো তোমাকে বলেছি, আমি শেষের দিকে এসে একঘেঁয়েমিতে ভুগছিলাম। আর তাছাড়া একটা সময় এসব কিছুকেই ভীষণ অর্থহীন মনে হচ্ছিল আমার কাছে। কী করছি, কেন করছি, এসবের ফলাফল কী, আদৌ এসব করার কোনো অর্থ হয় কি না, এই সব আর কি! সব মিলিয়ে লেখালেখিটা আর ভালো লাগেনি। অবশ্য একবারে পরিকল্পনা করে, সিদ্ধান্ত নিয়ে লেখালেখি বন্ধ করেছিলাম তা নয়। এরকম তো সব লেখকেরই হয় যে, মাঝে মাঝে ক্লান্তি আসে, মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিতে ইচ্ছে করে, মাঝে মাঝে বন্ধ্যাত্বও দেখা দেয়। আমার সেটাই হয়েছিল। কিন্তু সব লেখকই সেই সময়টি পেরিয়ে আবার লেখালেখিতে ফিরে আসেন। আমার আর ফিরে আসা সম্ভব হয়নি।”

রাইটার্স ব্লক থেকে পার পাননি বহু বিখ্যাত লেখক। ভারতের কমলকুমার মজুমদারও এ সমস্যায় ভুগে লেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন। স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজ, ফিটজেরাল্ড, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, ভার্জিনিয়া উলফ, লিও টলস্টয়, জোসেফ কনরাড প্রমুখ প্রবাদপ্রতিম লেখকদেরও রাইটার্স ব্লকের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ উইলিয়াম ওর্ডসওর্থের সাথে ‘লিরিকাল ব্যালাডস’ লিখেছিলেন। তার প্রায় সকল কবিতাই বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে লেখা হয়েছে। এর পরবর্তী সময়ে যে কোনো লেখার প্রতিই তার একপ্রকার অনীহা লক্ষ করা যায়। তার অবশিষ্ট জীবন তিনি আফিম সেবন করে কাটান। তার এক বন্ধু তার কাছে একবার জানতে চেয়েছিলেন, কেন তিনি আর আগের মতো লেখেন না। উত্তরে কোলরিজ বলেছিলেন, “প্যারালাইসিস আক্রান্ত ব্যক্তিকে সুস্থ হবার জন্য তার দুই হাত একসাথে ঘষা একই কথা।” মাত্র ৩২ বছর বয়সে তার জন্মদিনের পরের দিন নোটবুকে তিনি লিখেছিলেন, “So completely has a whole year passed, with scarcely the fruits of a month.—O Sorrow and Shame. . . . I have done nothing!”

এবার যে গল্পটি শোনাব সেটি অনেক রহস্যময়। পড়ে ভাববেন এমনও হয়! জোসেফ মিশেল একসময় একজন নিজেকে সেরা কল্পকাহিনীলেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। নিউইয়র্কার ম্যাগাজিনে তার সব লেখা প্রকাশিত হতো। মজার ব্যাপার তিনি এত খ্যাতি পেয়েছিলেন অন্য এক রাইটার্স ব্লকে আক্রান্ত হওয়া লেখকের ডায়েরি লিখে। সেই ডায়েরিটি ছিল জো গুল্ড নামের আরেক বিখ্যাত লেখকের। জো গুল্ড ‘প্রফেসর সি-গাল’ হিসেবেও সাহিত্যমোদীদের কাছে পরিচিত। তো, জো গুল্ড একসময় দাবি করেছিলেন, ‘ওরাল হিস্টোরি’ হচ্ছে সবধরনের ইতিহাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। ‘ওরাল হিস্টোরি’র মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন তার সমসাময়িক মানুষ ও আশেপাশের সবকিছুর দৈনন্দিন জীবনকে লেখনীতে প্রকাশ করা। জোসেফ মিশেল অত্যন্ত আকর্ষণ বোধ করেন জো গুল্ডের এমন কথায়। তিনি জো গুল্ডকে নিয়ে একটি বই লিখে ফেলেন। নাম, ‘জো গুল্ড’স সিক্রেট’। এ বইতে জো গুল্ডের জীবনী উঠে আসে। এ বই থেকে জানা যায়, জো গুল্ড আসলে ওরাল হিস্টোরি বলে কিছু লেখেনইনি কখনো। তিনি যা লিখেছেন তা শুধুই তার প্রতিদিনের রুটিন। কখন ঘুম থেকে উঠতেন, কী নাস্তা করতেন, আর কী কী করতেন এমনকি সেক্সের বিষয়ও। এ বইটি ছিল ৯ কোটি শব্দের। কিন্তু কথা হলো জো গুল্ড মারা যাবার পর জোসেফ মিশেল বইটি লেখেন। জো গুল্ড লেখক হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন এবং একসময় লেখালেখি ছেড়ে দিয়েছিলেন। আর সেই লেখালেখি করবেন না বলে অজুহাত দিতেন যে ওরাল হিস্টোরিই আসল। রহস্য কিন্তু তারপরও আছে। কারণ জোসেফ মিশেল ‘জো গুল্ডস সিক্রেট’ লেখার পর আর একলাইনও লিখতে পারেননি। এমনকি এ বইটিও প্রকাশ করতে পারেননি। দিনরাত মদ খেতেন না লিখতে পারার বিষণ্ণতায়। তার অন্য অপ্রকাশিত লেখার সাথে এ বই সংগ্রহ করা হয় এবং ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয়। জোসেফ মিশেল ১৯৯২ সালে ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছিলেন, “জো গুল্ডের সাথে এত বছর কথা বলতে বলতে একভাবে সে আর আমি একই ব্যক্তি হয়ে গেছি।” রীতিমতো সাসপেন্স।

সাসপেন্স কম নয় হার্পার লি-র সাহিত্য জীবনে। আমেরিকার বর্ণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে ১৯৬০ সালে হার্পার লি লিখেছিলেন উপন্যাস ‘হাও টু কিল অ্যা মকিংবার্ড’। ৪০টি ভাষায় অনূদিত হয় এই বই। পুলিৎজার পুরস্কার জেতেন। প্রকাশকদের ভিড় তার দরোজায়। কিন্তু একি হায় তিনি লিখতে পারছেন না আর। ওই বইটিই ছিল তার প্রথম ও শেষ সাফল্য। প্রকাশকদের অগ্রীম দেওয়া টাকা ফিরিয়ে দিচ্ছেন। তারা ভাবছেন এক বই লিখে এত দেমাগ কেন। কিন্তু হারপার লি-র কী আর করার ছিল। তিনি পরাজিত। ২০১৫ সালে, তার ৮৯ বছর বয়সে প্রকাশিত হয় তার উপন্যাস ‘গো সেট অ্যা ওয়াচম্যান’। এটি ‘হাও টু কিল অ্যা মকিংবার্ড’-এর আগেই লেখা হয়েছিল।

হারপর লি তার এক বন্ধুর কাছে বলেছিলেন, “আমি আর লিখতে পারছি না। আমার প্রায় ৩০০ জন বন্ধু রয়েছে যারা প্রায়ই কফি পানের ছুতোয় চলে আসে। আমি ভোর ৬টায় ওঠার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তখন সব ৬টায় জাগা ব্যক্তিরা এক জায়গায় জড়ো হয়!” হার্পার লি একা সময় পাচ্ছিলেন না এবং তার লিখতে না পারার পেছনে তিনি এই ভিড়বাট্টাকে দায়ী করেছিলেন। ২০১৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

তবে আরেকটা গল্প বলি, সেটি হচ্ছে ইসরাইলী লেখক ইবাদি খোরাসানকে নিয়ে। তিনি ২০০১ সালে একটি বই বের করলেন, বইটির নাম, ‘ট্রাভেলার’। মানে ইংরেজি নাম এটি। অনুবাদক জেমস লয়েড। ওই বছর বেশ বিক্রি হলো বইটির। কিভাবে জানি এক বোদ্ধা পাঠক তার বিরুদ্ধে মামলা করলেন আলবেয়ার কামুর আউটসাইডার ও খলিল জিবরানের দ্য প্রোফেট বইয়ের ভাব মিশিয়ে নকলের। প্রমাণিতও হলো। এরপর আদালতে ইবাদি খোরাসান এটি স্বীকার করলেন। সেই যে আর লিখতে পারলেন না। পারলেনই না। ২০১৫ সালে নদীতে ঝাঁপিয়ে সুইসাইডই করলেন তিনি। কারণ তার লেখকখ্যাতি ছিল ঈর্ষণীয়। কিন্তু ওই মামলার পর থেকেই তিনি আর লিখতে পারেননি।

১৯৯১ সালে টাইম ম্যাগাজিনে ‘রাইটারস ব্লকের ৩০ বছর’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। এই প্রবন্ধটি পাবেন তাদের আর্কাইভে গেলে। সেখান থেকে জানতে পারি হারোল্ড ব্রডের গল্প। নিউ ইয়র্কার ম্যাগাজিনের স্বনামধন্য ছোটগল্প লেখক, যার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য রানওয়ে সোল’। এর আগে ছোটগল্প লিখে নাম কুড়িয়েছিলেন। কিন্তু যেই ‘দ্য রানওয়ে সোল’ উপন্যাসটি লিখতে গেলেন শুরু হলো যতসব বিপত্তি। বারবার লেখেন। বারবার কাটেন। একসময় দেখেন আর লিখতেই পারছেন না। মানে উপন্যাসের শেষ পরিণতি টানতে পারছেন না। বিশ্বাস করেন, এ বইটি প্রকাশিত হতে লাগে ৩০ বছর! কিন্তু ৩০ বছর ধরে তিনি লড়াই করে যান তার উপন্যাসটিকে শেষ করতে। ১৯৯১ সালে প্রকাশ পাওয়া ৮৩৫ পৃষ্ঠার দীর্ঘ এই উপন্যাসট জনপ্রিয়ও হয়নি। সমালোচকরাও বিরূপ সমালোচনা লেখেন। পরে এইডসে আক্রান্ত হয়ে ১৯৯৬ সালে মারা যান। অবশ্য অসুস্থ জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি লিখেছিলেন ‘দিস ওয়াইল্ড ডার্কনেস: দ্য স্টোরি অফ মাই ডেথ।’ সেই বইটি অবশ্য পাঠকপ্রিয় হয়েছিল।

রাইটার্স ব্লককে এড়িয়ে চলার জন্য গাব্রিয়েল গারসিয়া মার্কেজ বলেছিলেন, “তাড়াহুড়ো করে শেষ করার দরকার নেই। আপনি খেলছেন আপনমনে। এমনভাবে লিখে যান। তবেই সমস্যা হবে না।” স্টেফান কিংয়েরও ওইরকমই কথা, তিনি বলেছেন, “আটকে গিয়েছি, ঠিক আছে, অন্য কিছুতে মন দিই, তা লেখালেখি না-ও হতে পারে। সেক্সের সময় যদি তীব্র উত্তেজনা কাজ করে তবে যেমন সফল সঙ্গম হয় না তেমনই লেখালেখিতে অতি সিরিয়াস হওয়ার দরকার নেই। যা হওয়ার হবে তো। এ মুডে লিখলেই আর সমস্যা নেই।” মারিও ভার্গাস য়োসার কথা আবার এদের চেয়ে ভিন্ন। তিনি বলেছেন, “লিখতে পারছি না, তাই বলে টেবিল ছেড়ে উঠে পড়ব, কখনো না। জোর করে প্রেরণা-ট্রেরনা ছাড়াই লিখে যাব, পরে দেখা যাবে।” তার কথার সঙ্গে মিলে যায় উইলিয়াম ফকনোরের কথা। ফকনোর বলছেন, “লেখা তো আর আধ্যাত্মিক কিছু না। যে আজ পারব কাল পারব না! লেখালেখি একটা টেকনিক। সেই টেকনিকটা রপ্ত করেন। দেখবেন আপনার কোনো সমস্যা নেই।” ফকনোরের মতোই যেন মার্কিন কবি উইলিয়াম স্ট্যাফোর্ডের কথা। তার কথা, “এ রোগে সবাই কেন আক্রান্ত হবে? যাদের কল্পনাশক্তি দুর্বল, মেধা অল্প, যাঁদের লেখার মান যথেষ্ট নিচু (লো এনাফ) তাদের জন্য এ সমস্যা।” এরমানে কি তবে রবীন্দ্রনাথ, লিও টলস্টয়, বোদলেয়ার, ভারতের সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ বা আমাদের দেশের আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে মেধাবী সাহিত্যিক বলব না? কেন বলব না? আলবত বলব। এখানে উইলিয়াম স্ট্যাফোর্ডের বা ফকনোরের কথাকে ইগনোর করব আমরা। রবীন্দ্রনাথ এসব সমস্যা কাটাতেন যখন তার গদ্য বা কবিতা লিখতে সমস্যায় ভুগতেন তখনই গান লিখে। এ কাজটি আমাদের দেশের হুমায়ূন আহমেদও করেছেন। তিনি লেখালেখিতে যাতে একঘেয়েমি না আসে সেজন্য নাটক, মুভি বানাতেন, এমনকি গানও লিখেছেন। এসব কথা তিনি তার সাক্ষাৎকারে বলেছেন। আমরা দেখি অনেক বিখ্যাত লেখকই এই সমস্যা দ্রুতই কাটিয়ে ওঠেন। তাদের কাজ সেরা কি না সেটাই বিবেচ্য। মার্কেজ ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লিখে না’—এই ছোট লেখা লিখতেই সময় নিয়েছিলেন চার বছর। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ অলীক মানুষ লেখার মাঝপথে অনেক দিন কলম বন্ধ করে বসে ছিলেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস খোয়াবনামা উপন্যাসের গোড়ার দিকের কয়েক চ্যাপ্টার লিখে মাসের পর মাস বসে ছিলেন। ঢাকা ছেড়ে বগুড়ায় গিয়ে করতোয়ার পাড়ে ঘুরে বেড়াতেন। এবং নদীপাড়ে ঘুরতে ঘুরতেই আবার কালো অক্ষরগুলো চলে আসত। তিনি লিখতে বসতেন এবং সফলভাবে এ উপন্যাসটি আমাদের সামনে হাজির করেছেন। দস্তয়ভস্কি যখন এ সমস্যায় ভুগতেন তখন ব্রথেলে যেতেন ঘনঘন। সকাল সন্ধ্যা কাটাতেন। ‘জুয়াড়ি’ লেখার সময় এমন হয়েছিল। টানা ১৩ দিন ছিলে ব্রিটেনের একটি ব্রথেলে। এরপর রাশিয়া ফিরে গিয়ে সেই বিখ্যাত ‘জুয়াড়ি’ লিখে শেষ করেন।

কিন্তু সমস্যা হয়ে যায় তখনই যখন মনে এ প্রশ্ন ঢুকে পড়ে ‘কেন লিখব?’ এই সিনড্রোমই মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক বার্নার্ডো কার্দুসি বলেছেন, “এই সিনড্রোম শুরু হয় কসমিক লোনলিনেস থেকে। তখন শুধু মনে হয় সবই রিপিটেশন রিপিটেশন।”

রিপিটেশনই ভেবেছিলেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। ভারতের দেবেশ রায়, বোদলেয়ার, আর আমাদের দেশের কথাসাহিত্যিক রশীদ করিম। তাই একসময় লেখালেখিরে জীবন থেকেই নির্বাসন নেন। ভিক্টর হুগোর কথাই ভাবুন। বা আমাদের মাইকেল মধুসূদনের কথা। হুগোর বাবা ছিলেন সম্রাট প্রথম নেপোলিয়নের অধীনে একজন সেনা কর্মকর্তা। সেই সুবাদে অল্প বয়সেই বাবার সাথে ইতালি, স্পেনসহ বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন। প্যারিসের একটি প্রিপারেটরি স্কুলে তাঁকে ভর্তি করানো হয়েছিল। সেই স্কুলটিতে মাত্র তিন বছর লেখাপড়া করেছেন হুগো। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন বলতে এটুকুই। হুগোর সাহিত্য জীবনের সূচনা কবিতা দিয়ে। প্রথম কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৮২২ সালে। প্রকাশের পরপরই এটি ব্যাপক প্রশংসিত হয়। এরপর একে একে রচিত হয় ট্রাজেডি, অপেরা, অনুবাদসহ নানান সৃষ্টি। তাঁর রচনার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ ছিল মানুষের মুক্তি। ফ্রান্সের জনগণকে অন্ধকার আর গ্লানি থেকে মুক্তির আলোয় আলোকিত করে সমাজ রূপান্তরের স্বপ্ন দেখিয়েছেন তিনি। এজন্যে হুগোকে সমাজ সংস্কারকও বলা হয়ে থাকে। সম্রাটের স্বেচ্ছাচারিতা তাঁকে ভীষণভাবে পীড়া দিত। হুগো রাজা লুইস নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে তীব্র শ্লেষ জানান তাঁর লেখনীর মাধ্যমে। এরপর স্বেচ্ছায় দেশ ছেড়ে চলে যান। গারনসি দ্বীপে দীর্ঘ ঊনিশ বছর নির্বাসিত জীবনযাপনকালে তিনি রচনা করেন বিখ্যাত গ্রন্থ ‘লা মিজারেবল’, ‘দ্য ম্যান হু লাভস’, এবং ‘টয়লার্স অব দ্য সি’। স্বদেশে ফেরার পর জনগণ তাকে বিপুল সম্মানে অভিষিক্ত করে। তার অন্যান্য বিখ্যাত রচনাসমূহের মধ্যে রয়েছে ‘হ্যাঞ্চব্যাক অব নতরদাম’, ‘এর্নানি’, ‘লুই ব্লা’, ‘রিগোলেত্তো’ ইত্যাদি। ১৮৮৫ সালের ২২ মে ৮৩ বছর বয়সে হুগো মারা যাওয়ার আগে সুস্থ থাকতেই স্বেচ্ছা নির্বাসনে আবার দ্বীপে চলে গিয়েছিলেন। যাবার আগে বলেছিলেন, “একজন লেখককে সারাজীবনই লিখতে হবে কেন? লেখকেরও তো অন্যান্য পেশাজীবীদের মতো অবসরে যাওয়া উচিত।” একথা বলেছিলেন ঠিকই কিন্তু তার বন্ধু দিম্য স্ত্রেসে পরে জানান, “হুগো আর লিখতে পারছিলেন না। তার কাছে লেখালেখি কেন, জীবন ও জগতকেই মনে হতো তুচ্ছ।” সেই জীবনকে তুচ্ছ ভেবেই শেষের দিকে মাইকেল মধুসূদন দত্ত তার প্রতিভাকে অপচয়ই করেছেন। কেশব দীক্ষিত তার ‘বাংলার দুঃখ মাইকেল মধু’ বইতে জানাচ্ছেন, মাইকেল মধুসূদন দত্ত নীরবে লেখালেখি থেকে কোনো ঘোষণা না দিয়েই সরে পড়েছিলেন। শুধু ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বলেছিলেন, “জীবনকে কাব্যময় করতে গিয়ে জুয়ো মনে হয় বেশি খেলে ফেলেছিলুম। তাই আজ কাব্য’র প্রতি এত বিরাগ আমার আর এই বিরাগ আমাকে মাতালে পরিণত করেছে। কম টাকা নিইনি তো আপনার কাছ থেকে। কী লাভ হলো আপনার বা আমার বা বাংলাসাহিত্যের।”


কোলাজ মন্তাজ ১. মহান শিল্পীদের ক্ষত ও ভালোবাসাসমূহ
কোলাজ মন্তাজ ২. বিখ্যাত সৃষ্টিশীলদের অবসাদ ও স্যাটায়ার
কোলাজ মন্তাজ ৩. স্মরণীয় ১০ জন যারা পেয়েছিলেন রাষ্ট্রের অবমাননা ও অবিচার (পর্ব ১)
কোলাজ মন্তাজ ৪. স্মরণীয় ১০ জন যারা পেয়েছিলেন রাষ্ট্রের অবমাননা ও অবিচার (পর্ব ২)
কোলাজ মন্তাজ ৫. শীতে পাওয়া সাহিত্য
কোলাজ মন্তাজ ৬. সাহিত্যে জ্বলে নেভে ফ্যাসিস্ট ও বিপ্লবীর চরিত্র
কোলাজ মন্তাজ ৭. চে, বিপ্লব ও বাজার
কোলাজ মন্তাজ ৮. সাহিত্যে যৌনতা
কোলাজ মন্তাজ ৯. তবু সে দেখিল কোন ভূত
কোলাজ মন্তাজ ১০. স্ট্রিট লিটারেচার
কোলাজ মন্তাজ ১১. সাহিত্যে জেনারেশন
কোলাজ মন্তাজ ১২. সৃষ্টিশীলদের খেয়ালিপনা
কোলাজ মন্তাজ ১৩. সাহিত্যে নোবেল, প্রত্যাখ্যান ও কেড়ে নেওয়ার গল্প
কোলাজ মন্তাজ ১৪. শিল্পসাহিত্যে ‘স্বাধীনতা’
কোলাজ মন্তাজ ১৫. সাহিত্য করে ‘ধনী’ ও ধনী হয়ে ‘সাহিত্য’ করার গল্প
কোলাজ মন্তাজ ১৬. বাংলা সাহিত্যে দেশভাগ
কোলাজ মন্তাজ ১৭. সাহিত্যে চুরি
কোলাজ মন্তাজ ১৮. সাহিত্যে ‘নারীবাদ’
কোলাজ মন্তাজ ১৯. সৃষ্টিশীলদের বন্ধুত্ব ও বিবাদ
কোলাজ মন্তাজ ২০. সাহিত্যে যুদ্ধ

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;