রাইটার্স ব্লক

দেবদুলাল মুন্না
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

সাহিত্যিক লিখতে চান। কিন্তু পারছেন না লিখতে। কী সমস্যা? লেখা কোনোভাবেই আসছে না। একেই ইংলিশে বলে ‘রাইটার্স ব্লক’। বাংলায় কী বলা যায়? লেখকের বন্ধ্যাত্ব! ঘটনাটি কেমনভাবে ঘটে দেখা যাক।

মার্শেল প্রুস্তের ‘ইন সার্চ অব লস্ট টাইম’-এর প্রথম খণ্ড বেরিয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশকের কাছে জমা দেওয়া কিন্তু তৃতীয় খণ্ড লেখার সময় ১৭ পৃষ্ঠা লিখে আটকে গেলেন এক শীতের রাতে। টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। তিনি পরপর তিনটা চুরুট শেষ করলেন রিভলভিং চেয়ারে বসে হেলেদুলে। কিন্তু না একটি কালো অক্ষরও বেরুলো না তার কলম থেকে। উঠে গিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দূর পাহাড়ের দিকে অন্ধকার দেখলেন। একটু ওয়াইন খেলেন। না কাজ হচ্ছে না। শ্বাসকষ্ট যেন বাড়ছে। ভাবলেন, ছোটবেলার হাঁপানি রোগটা কি তাড়া করে আসছে কিনা! শুয়ে পড়লেন। পরদিন সকালে বসলেন লিখতে। হলো না। এভাবে পাক্কা নয়দিন কেটে গেল। না পারছেন কিছু লিখতে, না পারছেন অন্য কোনো কাজে মনোযোগী হতে। দশমদিনে তিনি পাক্কা চারঘণ্টা ফুন্তে শহরে উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ালেন। সেইরাতে লিখতে বসলেন। কালো কালো অক্ষরগুলো আবার ঝরতে থাকল তার কলমে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার আত্মজীবনীর এক জায়গায় লিখেছিলেন, সেদিন সকাল থেকেই মাথায় লেখাটা চেপে বসেছিল। তাই সকালে মা বাজারে যেতে বললেও আর যাননি। বিশেষ করে লেখার চেয়েও বেশি ভাবনা ছিল কড়া রোদ নিয়ে। ফিরতে ফিরতে রোদ চড়ে যাবে সেই ভয়েই বাজারে যাননি। কিন্তু বেলা বারোটায় যখন সিগারেটের প্যাকেটের শেষ কাঠিটায় আগুন ধরালেন তখন তার মাথায়ও যেন আগুন ধরল। লেখা আর এগোয় না। তখন তিনি সেই কড়া রোদ মাড়িয়ে গিয়ে সিগারেট আনতে গেলেন। এরপর ফিরে এসে ওই লেখা টানা চারদিন লিখতে পারেননি। ওই একবারই হয়েছিল তার এ সমস্যা।

ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির ‘শাইনেস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক বার্নার্ডো কার্দুসি বলেছেন, “রাইটার্স ব্লকের নমুনা লেখকভেদে ভিন্ন ভিন্নরকম হয়। ফলে সমস্যার বিষয়ে—যাদের হয়, তারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে যারা হুট করে লেখালেখি একেবারেই ছেড়ে দেন সেটি ঘটে লেখকের নিত্য আবিষ্কারের নেশার ঘোর কেটে গেলে।”

আমাদের মাহমুদুল হকের ঘোরও কি তবে কেটে গিয়েছিল? জীবন আমার বোন, কালো বরফ, নিরাপদ তন্দ্রা, খেলাঘর, অনুর পাঠশালা, মাটির জাহাজ প্রভৃতি উপন্যাস আর ‘কালো মাফলার’, ‘প্রতিদিনি একটি রুমাল’, ‘হৈরব ও ভৈরব’ প্রভৃতি গল্পের আমাদের মাহমুদুল হক একসময় লেখালেখি ছেড়েই দিয়েছিলেন। সারাদিনরাত ঘরেই বসে থাকতেন। কোথাও যেতেন না। কারো সাথে মিশতেন না। তিনি এক ইন্টারভিউতে বলেন, “আমি তো সবসময় বিশ্বাস করে এসেছি, শিল্পীদের লোভ থাকতে নেই। লোভ থাকলে শিল্প হয় না। আমি শুধুমাত্র সাহিত্য জগতের ভণ্ডামি দেখে লেখালেখি থেকে দূরে সরে এসেছি, সেটা বলা ঠিক হবে না। এটা একটা কারণ ছিল বটে, তবে আরো কারণ নিশ্চয়ই আছে। আগেই তো তোমাকে বলেছি, আমি শেষের দিকে এসে একঘেঁয়েমিতে ভুগছিলাম। আর তাছাড়া একটা সময় এসব কিছুকেই ভীষণ অর্থহীন মনে হচ্ছিল আমার কাছে। কী করছি, কেন করছি, এসবের ফলাফল কী, আদৌ এসব করার কোনো অর্থ হয় কি না, এই সব আর কি! সব মিলিয়ে লেখালেখিটা আর ভালো লাগেনি। অবশ্য একবারে পরিকল্পনা করে, সিদ্ধান্ত নিয়ে লেখালেখি বন্ধ করেছিলাম তা নয়। এরকম তো সব লেখকেরই হয় যে, মাঝে মাঝে ক্লান্তি আসে, মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিতে ইচ্ছে করে, মাঝে মাঝে বন্ধ্যাত্বও দেখা দেয়। আমার সেটাই হয়েছিল। কিন্তু সব লেখকই সেই সময়টি পেরিয়ে আবার লেখালেখিতে ফিরে আসেন। আমার আর ফিরে আসা সম্ভব হয়নি।”

রাইটার্স ব্লক থেকে পার পাননি বহু বিখ্যাত লেখক। ভারতের কমলকুমার মজুমদারও এ সমস্যায় ভুগে লেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন। স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজ, ফিটজেরাল্ড, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, ভার্জিনিয়া উলফ, লিও টলস্টয়, জোসেফ কনরাড প্রমুখ প্রবাদপ্রতিম লেখকদেরও রাইটার্স ব্লকের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ উইলিয়াম ওর্ডসওর্থের সাথে ‘লিরিকাল ব্যালাডস’ লিখেছিলেন। তার প্রায় সকল কবিতাই বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে লেখা হয়েছে। এর পরবর্তী সময়ে যে কোনো লেখার প্রতিই তার একপ্রকার অনীহা লক্ষ করা যায়। তার অবশিষ্ট জীবন তিনি আফিম সেবন করে কাটান। তার এক বন্ধু তার কাছে একবার জানতে চেয়েছিলেন, কেন তিনি আর আগের মতো লেখেন না। উত্তরে কোলরিজ বলেছিলেন, “প্যারালাইসিস আক্রান্ত ব্যক্তিকে সুস্থ হবার জন্য তার দুই হাত একসাথে ঘষা একই কথা।” মাত্র ৩২ বছর বয়সে তার জন্মদিনের পরের দিন নোটবুকে তিনি লিখেছিলেন, “So completely has a whole year passed, with scarcely the fruits of a month.—O Sorrow and Shame. . . . I have done nothing!”

এবার যে গল্পটি শোনাব সেটি অনেক রহস্যময়। পড়ে ভাববেন এমনও হয়! জোসেফ মিশেল একসময় একজন নিজেকে সেরা কল্পকাহিনীলেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। নিউইয়র্কার ম্যাগাজিনে তার সব লেখা প্রকাশিত হতো। মজার ব্যাপার তিনি এত খ্যাতি পেয়েছিলেন অন্য এক রাইটার্স ব্লকে আক্রান্ত হওয়া লেখকের ডায়েরি লিখে। সেই ডায়েরিটি ছিল জো গুল্ড নামের আরেক বিখ্যাত লেখকের। জো গুল্ড ‘প্রফেসর সি-গাল’ হিসেবেও সাহিত্যমোদীদের কাছে পরিচিত। তো, জো গুল্ড একসময় দাবি করেছিলেন, ‘ওরাল হিস্টোরি’ হচ্ছে সবধরনের ইতিহাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। ‘ওরাল হিস্টোরি’র মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন তার সমসাময়িক মানুষ ও আশেপাশের সবকিছুর দৈনন্দিন জীবনকে লেখনীতে প্রকাশ করা। জোসেফ মিশেল অত্যন্ত আকর্ষণ বোধ করেন জো গুল্ডের এমন কথায়। তিনি জো গুল্ডকে নিয়ে একটি বই লিখে ফেলেন। নাম, ‘জো গুল্ড’স সিক্রেট’। এ বইতে জো গুল্ডের জীবনী উঠে আসে। এ বই থেকে জানা যায়, জো গুল্ড আসলে ওরাল হিস্টোরি বলে কিছু লেখেনইনি কখনো। তিনি যা লিখেছেন তা শুধুই তার প্রতিদিনের রুটিন। কখন ঘুম থেকে উঠতেন, কী নাস্তা করতেন, আর কী কী করতেন এমনকি সেক্সের বিষয়ও। এ বইটি ছিল ৯ কোটি শব্দের। কিন্তু কথা হলো জো গুল্ড মারা যাবার পর জোসেফ মিশেল বইটি লেখেন। জো গুল্ড লেখক হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন এবং একসময় লেখালেখি ছেড়ে দিয়েছিলেন। আর সেই লেখালেখি করবেন না বলে অজুহাত দিতেন যে ওরাল হিস্টোরিই আসল। রহস্য কিন্তু তারপরও আছে। কারণ জোসেফ মিশেল ‘জো গুল্ডস সিক্রেট’ লেখার পর আর একলাইনও লিখতে পারেননি। এমনকি এ বইটিও প্রকাশ করতে পারেননি। দিনরাত মদ খেতেন না লিখতে পারার বিষণ্ণতায়। তার অন্য অপ্রকাশিত লেখার সাথে এ বই সংগ্রহ করা হয় এবং ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয়। জোসেফ মিশেল ১৯৯২ সালে ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছিলেন, “জো গুল্ডের সাথে এত বছর কথা বলতে বলতে একভাবে সে আর আমি একই ব্যক্তি হয়ে গেছি।” রীতিমতো সাসপেন্স।

সাসপেন্স কম নয় হার্পার লি-র সাহিত্য জীবনে। আমেরিকার বর্ণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে ১৯৬০ সালে হার্পার লি লিখেছিলেন উপন্যাস ‘হাও টু কিল অ্যা মকিংবার্ড’। ৪০টি ভাষায় অনূদিত হয় এই বই। পুলিৎজার পুরস্কার জেতেন। প্রকাশকদের ভিড় তার দরোজায়। কিন্তু একি হায় তিনি লিখতে পারছেন না আর। ওই বইটিই ছিল তার প্রথম ও শেষ সাফল্য। প্রকাশকদের অগ্রীম দেওয়া টাকা ফিরিয়ে দিচ্ছেন। তারা ভাবছেন এক বই লিখে এত দেমাগ কেন। কিন্তু হারপার লি-র কী আর করার ছিল। তিনি পরাজিত। ২০১৫ সালে, তার ৮৯ বছর বয়সে প্রকাশিত হয় তার উপন্যাস ‘গো সেট অ্যা ওয়াচম্যান’। এটি ‘হাও টু কিল অ্যা মকিংবার্ড’-এর আগেই লেখা হয়েছিল।

হারপর লি তার এক বন্ধুর কাছে বলেছিলেন, “আমি আর লিখতে পারছি না। আমার প্রায় ৩০০ জন বন্ধু রয়েছে যারা প্রায়ই কফি পানের ছুতোয় চলে আসে। আমি ভোর ৬টায় ওঠার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তখন সব ৬টায় জাগা ব্যক্তিরা এক জায়গায় জড়ো হয়!” হার্পার লি একা সময় পাচ্ছিলেন না এবং তার লিখতে না পারার পেছনে তিনি এই ভিড়বাট্টাকে দায়ী করেছিলেন। ২০১৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

তবে আরেকটা গল্প বলি, সেটি হচ্ছে ইসরাইলী লেখক ইবাদি খোরাসানকে নিয়ে। তিনি ২০০১ সালে একটি বই বের করলেন, বইটির নাম, ‘ট্রাভেলার’। মানে ইংরেজি নাম এটি। অনুবাদক জেমস লয়েড। ওই বছর বেশ বিক্রি হলো বইটির। কিভাবে জানি এক বোদ্ধা পাঠক তার বিরুদ্ধে মামলা করলেন আলবেয়ার কামুর আউটসাইডার ও খলিল জিবরানের দ্য প্রোফেট বইয়ের ভাব মিশিয়ে নকলের। প্রমাণিতও হলো। এরপর আদালতে ইবাদি খোরাসান এটি স্বীকার করলেন। সেই যে আর লিখতে পারলেন না। পারলেনই না। ২০১৫ সালে নদীতে ঝাঁপিয়ে সুইসাইডই করলেন তিনি। কারণ তার লেখকখ্যাতি ছিল ঈর্ষণীয়। কিন্তু ওই মামলার পর থেকেই তিনি আর লিখতে পারেননি।

১৯৯১ সালে টাইম ম্যাগাজিনে ‘রাইটারস ব্লকের ৩০ বছর’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। এই প্রবন্ধটি পাবেন তাদের আর্কাইভে গেলে। সেখান থেকে জানতে পারি হারোল্ড ব্রডের গল্প। নিউ ইয়র্কার ম্যাগাজিনের স্বনামধন্য ছোটগল্প লেখক, যার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য রানওয়ে সোল’। এর আগে ছোটগল্প লিখে নাম কুড়িয়েছিলেন। কিন্তু যেই ‘দ্য রানওয়ে সোল’ উপন্যাসটি লিখতে গেলেন শুরু হলো যতসব বিপত্তি। বারবার লেখেন। বারবার কাটেন। একসময় দেখেন আর লিখতেই পারছেন না। মানে উপন্যাসের শেষ পরিণতি টানতে পারছেন না। বিশ্বাস করেন, এ বইটি প্রকাশিত হতে লাগে ৩০ বছর! কিন্তু ৩০ বছর ধরে তিনি লড়াই করে যান তার উপন্যাসটিকে শেষ করতে। ১৯৯১ সালে প্রকাশ পাওয়া ৮৩৫ পৃষ্ঠার দীর্ঘ এই উপন্যাসট জনপ্রিয়ও হয়নি। সমালোচকরাও বিরূপ সমালোচনা লেখেন। পরে এইডসে আক্রান্ত হয়ে ১৯৯৬ সালে মারা যান। অবশ্য অসুস্থ জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি লিখেছিলেন ‘দিস ওয়াইল্ড ডার্কনেস: দ্য স্টোরি অফ মাই ডেথ।’ সেই বইটি অবশ্য পাঠকপ্রিয় হয়েছিল।

রাইটার্স ব্লককে এড়িয়ে চলার জন্য গাব্রিয়েল গারসিয়া মার্কেজ বলেছিলেন, “তাড়াহুড়ো করে শেষ করার দরকার নেই। আপনি খেলছেন আপনমনে। এমনভাবে লিখে যান। তবেই সমস্যা হবে না।” স্টেফান কিংয়েরও ওইরকমই কথা, তিনি বলেছেন, “আটকে গিয়েছি, ঠিক আছে, অন্য কিছুতে মন দিই, তা লেখালেখি না-ও হতে পারে। সেক্সের সময় যদি তীব্র উত্তেজনা কাজ করে তবে যেমন সফল সঙ্গম হয় না তেমনই লেখালেখিতে অতি সিরিয়াস হওয়ার দরকার নেই। যা হওয়ার হবে তো। এ মুডে লিখলেই আর সমস্যা নেই।” মারিও ভার্গাস য়োসার কথা আবার এদের চেয়ে ভিন্ন। তিনি বলেছেন, “লিখতে পারছি না, তাই বলে টেবিল ছেড়ে উঠে পড়ব, কখনো না। জোর করে প্রেরণা-ট্রেরনা ছাড়াই লিখে যাব, পরে দেখা যাবে।” তার কথার সঙ্গে মিলে যায় উইলিয়াম ফকনোরের কথা। ফকনোর বলছেন, “লেখা তো আর আধ্যাত্মিক কিছু না। যে আজ পারব কাল পারব না! লেখালেখি একটা টেকনিক। সেই টেকনিকটা রপ্ত করেন। দেখবেন আপনার কোনো সমস্যা নেই।” ফকনোরের মতোই যেন মার্কিন কবি উইলিয়াম স্ট্যাফোর্ডের কথা। তার কথা, “এ রোগে সবাই কেন আক্রান্ত হবে? যাদের কল্পনাশক্তি দুর্বল, মেধা অল্প, যাঁদের লেখার মান যথেষ্ট নিচু (লো এনাফ) তাদের জন্য এ সমস্যা।” এরমানে কি তবে রবীন্দ্রনাথ, লিও টলস্টয়, বোদলেয়ার, ভারতের সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ বা আমাদের দেশের আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে মেধাবী সাহিত্যিক বলব না? কেন বলব না? আলবত বলব। এখানে উইলিয়াম স্ট্যাফোর্ডের বা ফকনোরের কথাকে ইগনোর করব আমরা। রবীন্দ্রনাথ এসব সমস্যা কাটাতেন যখন তার গদ্য বা কবিতা লিখতে সমস্যায় ভুগতেন তখনই গান লিখে। এ কাজটি আমাদের দেশের হুমায়ূন আহমেদও করেছেন। তিনি লেখালেখিতে যাতে একঘেয়েমি না আসে সেজন্য নাটক, মুভি বানাতেন, এমনকি গানও লিখেছেন। এসব কথা তিনি তার সাক্ষাৎকারে বলেছেন। আমরা দেখি অনেক বিখ্যাত লেখকই এই সমস্যা দ্রুতই কাটিয়ে ওঠেন। তাদের কাজ সেরা কি না সেটাই বিবেচ্য। মার্কেজ ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লিখে না’—এই ছোট লেখা লিখতেই সময় নিয়েছিলেন চার বছর। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ অলীক মানুষ লেখার মাঝপথে অনেক দিন কলম বন্ধ করে বসে ছিলেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস খোয়াবনামা উপন্যাসের গোড়ার দিকের কয়েক চ্যাপ্টার লিখে মাসের পর মাস বসে ছিলেন। ঢাকা ছেড়ে বগুড়ায় গিয়ে করতোয়ার পাড়ে ঘুরে বেড়াতেন। এবং নদীপাড়ে ঘুরতে ঘুরতেই আবার কালো অক্ষরগুলো চলে আসত। তিনি লিখতে বসতেন এবং সফলভাবে এ উপন্যাসটি আমাদের সামনে হাজির করেছেন। দস্তয়ভস্কি যখন এ সমস্যায় ভুগতেন তখন ব্রথেলে যেতেন ঘনঘন। সকাল সন্ধ্যা কাটাতেন। ‘জুয়াড়ি’ লেখার সময় এমন হয়েছিল। টানা ১৩ দিন ছিলে ব্রিটেনের একটি ব্রথেলে। এরপর রাশিয়া ফিরে গিয়ে সেই বিখ্যাত ‘জুয়াড়ি’ লিখে শেষ করেন।

কিন্তু সমস্যা হয়ে যায় তখনই যখন মনে এ প্রশ্ন ঢুকে পড়ে ‘কেন লিখব?’ এই সিনড্রোমই মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক বার্নার্ডো কার্দুসি বলেছেন, “এই সিনড্রোম শুরু হয় কসমিক লোনলিনেস থেকে। তখন শুধু মনে হয় সবই রিপিটেশন রিপিটেশন।”

রিপিটেশনই ভেবেছিলেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। ভারতের দেবেশ রায়, বোদলেয়ার, আর আমাদের দেশের কথাসাহিত্যিক রশীদ করিম। তাই একসময় লেখালেখিরে জীবন থেকেই নির্বাসন নেন। ভিক্টর হুগোর কথাই ভাবুন। বা আমাদের মাইকেল মধুসূদনের কথা। হুগোর বাবা ছিলেন সম্রাট প্রথম নেপোলিয়নের অধীনে একজন সেনা কর্মকর্তা। সেই সুবাদে অল্প বয়সেই বাবার সাথে ইতালি, স্পেনসহ বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন। প্যারিসের একটি প্রিপারেটরি স্কুলে তাঁকে ভর্তি করানো হয়েছিল। সেই স্কুলটিতে মাত্র তিন বছর লেখাপড়া করেছেন হুগো। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন বলতে এটুকুই। হুগোর সাহিত্য জীবনের সূচনা কবিতা দিয়ে। প্রথম কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৮২২ সালে। প্রকাশের পরপরই এটি ব্যাপক প্রশংসিত হয়। এরপর একে একে রচিত হয় ট্রাজেডি, অপেরা, অনুবাদসহ নানান সৃষ্টি। তাঁর রচনার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ ছিল মানুষের মুক্তি। ফ্রান্সের জনগণকে অন্ধকার আর গ্লানি থেকে মুক্তির আলোয় আলোকিত করে সমাজ রূপান্তরের স্বপ্ন দেখিয়েছেন তিনি। এজন্যে হুগোকে সমাজ সংস্কারকও বলা হয়ে থাকে। সম্রাটের স্বেচ্ছাচারিতা তাঁকে ভীষণভাবে পীড়া দিত। হুগো রাজা লুইস নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে তীব্র শ্লেষ জানান তাঁর লেখনীর মাধ্যমে। এরপর স্বেচ্ছায় দেশ ছেড়ে চলে যান। গারনসি দ্বীপে দীর্ঘ ঊনিশ বছর নির্বাসিত জীবনযাপনকালে তিনি রচনা করেন বিখ্যাত গ্রন্থ ‘লা মিজারেবল’, ‘দ্য ম্যান হু লাভস’, এবং ‘টয়লার্স অব দ্য সি’। স্বদেশে ফেরার পর জনগণ তাকে বিপুল সম্মানে অভিষিক্ত করে। তার অন্যান্য বিখ্যাত রচনাসমূহের মধ্যে রয়েছে ‘হ্যাঞ্চব্যাক অব নতরদাম’, ‘এর্নানি’, ‘লুই ব্লা’, ‘রিগোলেত্তো’ ইত্যাদি। ১৮৮৫ সালের ২২ মে ৮৩ বছর বয়সে হুগো মারা যাওয়ার আগে সুস্থ থাকতেই স্বেচ্ছা নির্বাসনে আবার দ্বীপে চলে গিয়েছিলেন। যাবার আগে বলেছিলেন, “একজন লেখককে সারাজীবনই লিখতে হবে কেন? লেখকেরও তো অন্যান্য পেশাজীবীদের মতো অবসরে যাওয়া উচিত।” একথা বলেছিলেন ঠিকই কিন্তু তার বন্ধু দিম্য স্ত্রেসে পরে জানান, “হুগো আর লিখতে পারছিলেন না। তার কাছে লেখালেখি কেন, জীবন ও জগতকেই মনে হতো তুচ্ছ।” সেই জীবনকে তুচ্ছ ভেবেই শেষের দিকে মাইকেল মধুসূদন দত্ত তার প্রতিভাকে অপচয়ই করেছেন। কেশব দীক্ষিত তার ‘বাংলার দুঃখ মাইকেল মধু’ বইতে জানাচ্ছেন, মাইকেল মধুসূদন দত্ত নীরবে লেখালেখি থেকে কোনো ঘোষণা না দিয়েই সরে পড়েছিলেন। শুধু ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বলেছিলেন, “জীবনকে কাব্যময় করতে গিয়ে জুয়ো মনে হয় বেশি খেলে ফেলেছিলুম। তাই আজ কাব্য’র প্রতি এত বিরাগ আমার আর এই বিরাগ আমাকে মাতালে পরিণত করেছে। কম টাকা নিইনি তো আপনার কাছ থেকে। কী লাভ হলো আপনার বা আমার বা বাংলাসাহিত্যের।”


কোলাজ মন্তাজ ১. মহান শিল্পীদের ক্ষত ও ভালোবাসাসমূহ
কোলাজ মন্তাজ ২. বিখ্যাত সৃষ্টিশীলদের অবসাদ ও স্যাটায়ার
কোলাজ মন্তাজ ৩. স্মরণীয় ১০ জন যারা পেয়েছিলেন রাষ্ট্রের অবমাননা ও অবিচার (পর্ব ১)
কোলাজ মন্তাজ ৪. স্মরণীয় ১০ জন যারা পেয়েছিলেন রাষ্ট্রের অবমাননা ও অবিচার (পর্ব ২)
কোলাজ মন্তাজ ৫. শীতে পাওয়া সাহিত্য
কোলাজ মন্তাজ ৬. সাহিত্যে জ্বলে নেভে ফ্যাসিস্ট ও বিপ্লবীর চরিত্র
কোলাজ মন্তাজ ৭. চে, বিপ্লব ও বাজার
কোলাজ মন্তাজ ৮. সাহিত্যে যৌনতা
কোলাজ মন্তাজ ৯. তবু সে দেখিল কোন ভূত
কোলাজ মন্তাজ ১০. স্ট্রিট লিটারেচার
কোলাজ মন্তাজ ১১. সাহিত্যে জেনারেশন
কোলাজ মন্তাজ ১২. সৃষ্টিশীলদের খেয়ালিপনা
কোলাজ মন্তাজ ১৩. সাহিত্যে নোবেল, প্রত্যাখ্যান ও কেড়ে নেওয়ার গল্প
কোলাজ মন্তাজ ১৪. শিল্পসাহিত্যে ‘স্বাধীনতা’
কোলাজ মন্তাজ ১৫. সাহিত্য করে ‘ধনী’ ও ধনী হয়ে ‘সাহিত্য’ করার গল্প
কোলাজ মন্তাজ ১৬. বাংলা সাহিত্যে দেশভাগ
কোলাজ মন্তাজ ১৭. সাহিত্যে চুরি
কোলাজ মন্তাজ ১৮. সাহিত্যে ‘নারীবাদ’
কোলাজ মন্তাজ ১৯. সৃষ্টিশীলদের বন্ধুত্ব ও বিবাদ
কোলাজ মন্তাজ ২০. সাহিত্যে যুদ্ধ

আপনার মতামত লিখুন :